হোম কবিতা খবর-ই-আমিন

খবর-ই-আমিন

খবর-ই-আমিন
289
0

রবি-আল আওয়াল

অযাচিত পরম কৃপাপূর্ণ আল্লাহর নাম স্মরণপূর্ব্বক আরম্ভ করিতেছি। যেদিন অবধি খবর শুনিবার পরিবর্ত্তে পড়িবার বিষয় হইল ও ইতিহাস নির্ম্মাণ করিবার পরিবর্ত্তে রচিবার বস্তু হইল সেইদিন বুঝিলাম নবযুগ আসিয়াছে। পলাশীর জঙ্গ খতম হইয়া পঞ্চাশৎ বর্ষ অতিক্রান্ত হইল ও বুজুর্গ পাঠকগণ দেখিলেন এই অনিত্য দুনিয়ায় এক ইঙ্গরাজগণের স্থাপিত বন্দোবস্ত চিরস্থায়ী হইল। ইতোমধ্যে আমারদিগের যুবক বয়সে হিকী নাম্নী এক শ্বেতাঙ্গী এক আজব কীর্তি রাখিল খবর জ্ঞাপক এক কাগজ প্রকাশ করিল বঙ্গাল গেজেট নামে আমরা বিস্ফারিত নেত্রে দেখিলাম। কালে ২ ওয়ারেণ হেস্টিঙ্গসের বিবিরে বাক্যবাণ ছুড়িয়া হিকী যদিবা হেস্টিঙ্গস সাহেবের রোশনেত্রে পড়িয়া হতভাগ্য হইল আমরা এই কলিকাতাস্থ সূফীসমাজ আমারদিগের সুখ দুঃখ আলাপবিলাপ করিবাজন্য কেন এক খবরকাগজ প্রকাশ না করি এমত ভাবিয়া পরম কৃপাপূর্ণ আল্লাহর কৃপাভিক্ষা করিয়া ও বুজুর্গ পাঠককুলকে সালাম জানাইয়া আপনারদিগের বৃদ্ধ সম্পাদক খবর-ই-আমিন মারফৎ বাতচিৎ শুরু করিলেন ও এমত তিনি প্রতি মাসে করিবেন বলিয়া মনস্থ করিলেন। এক্ষণে পৃষ্ঠদেশে প্রভাতসূর্যালোক রাখিয়া যখন তিনি এই সম্পাদকবার্ত্তা লিখেতেছেন তখন বারংবার এই কথাই তাহান মনে জাগিতেছে যে প্রভাতসূর্য প্রবীণ হইলে নবপ্রভাতের উদয় ঘটে না বরং মধ্যাহ্ন আইসে। অতঃপর মধ্যাহ্ন সূর্যালোকে আমারদিগের ক্ষুদ্র ঘরগুলি অধিক আলোকিত হইবে অথবা আমারদিগের পৃষ্ঠদেশ পুড়িয়া ঝামা হইবে অথবা উভয়তই ঘটিবে তাহা গফুরার রহীম আল্লাহই জানিবেন। শরীয়তী পাবন্দী ও শাদীদ এবাদৎ আমারদিগের বহুকাল হল গিয়াছে এইবার এই ভ্রূকুঞ্চনউদ্রেককারী সূর্যকিরণে চক্ষুদয় হইতে ঈশক নামক মোমপট্টিটিও বুঝিবা গলিয়া পড়ে। মিটিমিটি চক্ষুরুন্মীলন করিয়া বিগত পঞ্চাশৎ বৎসরের দিকে দৃষ্টিক্ষেপ করিয়া আমরা দেখিতেছি গোলাম হোসেন মনিব জোর্ড য়ুডনি সাহেবকে সালাম করিয়া সিরাজের নিন্দাকীর্ত্তক এক ইতিহাস লিখিতেছে। হেস্টিঙ্গস ও বুলকিদাস নন্দকুমারের ঝুলন্ত মৃতদেহের সম্মুখে বসিয়া পাশা খেলিতেছে। ভোঁ তুলিয়া রামদুলাল সরকারের জাহাজ আম্রিকা নাম্নী বিদেশ হইতে সেই অঞ্চলের মুদ্রা লইয়া স্বদেশে ফিরিতেছে। ওই মুদ্রার বিনিময়ে বঙ্গবাজারে দুমুঠা অন্নও মিলিবে কি না ভাবিতে গিয়া বুঝিতে পারি পরিস্থিতি অতি দুরূহ। এক্ষণে এমত আলোক একমাত্র প্রার্থনীয় বলিয়া মনে হয় যাহাতে অন্ধকূপের ভিতরেও দৃষ্টিচালনা সম্ভবে। মনোবাঞ্ছা বুঝিতে পারিয়া কৃপাময় আল্লাহ এমত আন্ধার প্রদান করেন যাহাতে অন্ধও নিজেরে চক্ষুষ্মান ভাবিয়া আত্মপ্রসাদ লভিতে পারে। এমত আন্ধার যাহার অন্দরমহলে বসিয়া সকল জীবন্মৃত ভাইয়ের উদ্দেশে মাসে ২ একটি প্রকাশ্য পত্ররচনা সম্ভবে। এমত আন্ধার যাহার সপ্তম মহল্লায় আসীন বুজুর্গ পাঠকগণ আপনাপন অন্তরদীপালোকে উক্ত পত্রসকল পাঠ করিয়া হর্ষবিলাপধ্বনি উচ্চারণ করতঃ ক্ষণে ২ মূর্চ্ছা ও চৈতন্যের খেয়া পারাপার করিতে পারেন।

 

রবি-আত-থানি

অযাচিত পরম কৃপাপূর্ণ আল্লাহর নাম স্মরণপূর্ব্বক আরম্ভ করিতেছি। যদিচ সূফীগণ সুলতানী আযকার অর্থে দমবন্ধ মুরাকাবায় নিমগ্ন তথাপি দশদিক হইতে রণদামামার আওয়াজ তাহানদিগের প্রাচীরসম মুজাহমতের কোন ছিদ্রপথে প্রবেশিয়া রূহ পর্যন্ত প্রকম্পিয়া যায় তাহা কেবল পরম করুণাময় জানিবেন। ওয়াহেদাতুল-ওজুদ অতএব সকলই আল্লাহ হইল অথবা ওয়াহেদাতুল-শহুদ অতএব সকলই আল্লাহর হইল এইরূপ নামাজী পাঠকগণ জানিলেন তথাপি আল্লাহর কৃপা কাহার উপর বর্ষিত হইল ও কে পতনের আলামত গণিল তাহা অদ্যাপি না বুঝিলেন। ফাজিল পাঠকগণ অজনবী শ্বেতাঙ্গীগণের বেগানা ক্রিয়াকর্ম দেখিয়া হাসিবেন অথবা অশ্রুবিসর্জ্জন করিবেন তাহা স্থির করিতে অক্ষম। উক্ত শ্বেতাঙ্গী কাফিরগণ সম্প্রতি এক ফারসীতে লিখিত পুস্তক প্রচারিয়া ইসলাম হইতে আপন ধর্ম্মের শ্রেষ্ঠতা প্রতিপন্ন করিতে চাহিল তথাপি চিন্তিয়া না দেখিল যদি খ্রীস্তধর্ম্ম শ্রেষ্ঠ হইবে তবে মারুফ আল-কারখী তুল্য সূফী মহাত্মা খ্রীস্তধর্ম্ম ত্যাগ করিবেন কেন। সূফীগণ সূফ অর্থে পশমী বস্ত্র পরিধানের তরিকা খ্রীস্তধর্ম্মের অনুসরণে শিখিল এইরূপ ইকবাল করিতে অনেকানেক সূফী শরম বোধ না করেন। তথাপি খ্রীস্তধর্ম্মীগণ আমারদিগের প্রতি বেশরম হইবে কেন। উপরন্তু পরধর্ম্মের নিন্দাকীর্ত্তণ কোন শ্রেষ্ঠত্বের নমুনা। তবে এক্ষণে বিশারত এই হইল যে দিনেমার সম্রাট শ্রীরামপুরে আদেশ পাঠাইয়াছেন যে উক্ত পুস্তকসকল অবিলম্বে অগ্নিতে নিক্ষেপ করিতে হইবে। শ্বেতাঙ্গীগণের সকলকেই আল্লাহ বদজল হইতে দেন নাই। তথাপি আমারদিগের ক্ষুদ্র মস্তিস্কের পরেশানী দূর হইবে কেমনে। হেস্টিঙ্গস সাহেব কিছুকাল পূর্ব্বে কলিকাতায় এক মাদ্রাসা নির্ম্মাণ করিলেন তথাপি দর্স-ই-নিজামীর মোহ কাটাইতে প্রয়াস না পাইলেন উপরন্তু মাদ্রাসায় কেবল আশরফ মুসলমান পুত্রগণ আরবী ফারসী পড়িল ও আজলফ ও আরজল মুমিন বালকগণ তাহারদিগের মাতৃভাষার ন্যায় কৃষিক্ষেত্রে নিযুক্ত রহিল। অবশ্য ইত্যাকার তফরীক না হইবে কেন যদি শিক্ষালয় নির্ম্মিত হয় নমক হারামী মারফৎ অর্জ্জিত অর্থে। বুজুর্গ পাঠকের স্মরণে থাকিবে নবকৃষ্ণ দেব কীরূপে স্বদেশী নবাবের বিরুদ্ধতা করিয়া পরদেশী ক্লাইভের সহায় হইয়া রাজা খিতাব জিতিল ও দুর্গ্গাপূজা ও মাতৃশ্রাদ্ধে প্রভূত অর্থ ব্যয়পূর্ব্বক বাজারের শোভা বর্ধিল ও তৎসহ নবাবের রত্নভাণ্ডার হইতে লুণ্ঠিত অর্থ হেস্টিঙ্গস মারফৎ ব্যয় করিয়া মাদ্রাসা তৈয়ার করিয়া হেস্টিঙ্গসকে মশহুর করিয়া গেল। অনুরূপ পন্থাবলম্বনে কৃষ্ণচন্দ্র রায় রাজেন্দ্র বাহাদুর খিতাব অর্জ্জিল ও পলাশীর যুদ্ধক্ষেত্র হইতে বারখানি কামান শ্বেতাঙ্গী কর্ত্তৃক উপহৃত হইল। শুনা যায় কৃষ্ণচন্দ্র সেই দ্বাদশ কামান পরিবেষ্টিত হইয়া দীনদরিদ্রকে অর্থদান করিয়া তাহারদিগের হৃদয় জয় করিতে প্রয়াস পাইতেন। এক্ষণে রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায় নামধেয় এক ব্যক্তি কম্পনীর আদেশে উক্ত বাঘীর নামমহিমা প্রচার করিতেছেন ও সিরাজের নিন্দাকীর্ত্তণ করিতেছেন। সিরাজ উত্তম না হইল তথাপি রাজদ্রোহী অধম না হইবে কেন অথবা নফস সর্বস্ব ব্যক্তিলোক দুনিয়ায় থাকিয়া বেহেশত তুল্য আইশো আশরাৎ পাইবে কেন। মহামতি জালালুদ্দীন তাব্রীজী নদীবক্ষে পদচারণা করিয়া মুশরিক লক্ষণ সেনকে বশীভূত করিলেন যদিচ কম্পনীর আমলে সেই কারামতী দেখাইবার লোক ও কারামতী দেখিবার চোখ গিয়াছে। যদি গিয়াছে তবে না ফিরে কেন যদি না ফিরে তবে দিলমধ্যে শূলস্বরূপ সেই বেদনা লাফানী হইয়া থাকে কেন। যিকর-ই-রাবিতাহ অনুগামী মুরীদ ইত্যাকার সওয়াল উত্থাপন করিলে মুর্শীদ কেবল হাস্য করিবেন অথবা তসবি পড়িতে ২ মুহূর্তেকের জন্য সুবহান আল্লাহ উচ্চারিতে তাহান জবান পক্ষাঘাতগ্রস্ত হইবে তাহা সর্ব্বজ্ঞ আল্লাহই জানিবেন। তবে এক্ষণে খবর এই হইল যে কিড সাহেব সম্প্রতি এক বন্দর তৈয়ার করিয়াছেন ও সেই কারণে পরদেশী জাহাজের গতায়াত এতদঞ্চলে বাড়িতেছে ও কেবল আকিল পাঠকগণ দেখিতেছেন বাজারের শোভা ক্রমে ২ সমগ্র দেশে ব্যাপ্ত হইতেছে।

 

জুমাদা-আল-উলা

অযাচিত পরম কৃপাপূর্ণ আল্লাহর নাম স্মরণপূর্ব্বক আরম্ভ করিতেছি। মধ্যে ২ বোধ করি সকল বুজুর্গ পাঠকেরই আমার ন্যায় এমত চিন্তার উদ্রেক হয় যে আপনারে সম্পূর্ণ বেহিমৎ ও সর্দ করিয়া তোলাই খোদাতালার নিকটস্থ হওনের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ তরিকা। নিজেরে সম্পূর্ণ নিষ্কর্ম্ম করিয়া ফেলিলে দেখা যায় আল্লাহর নাম স্মরণ ব্যতীত সময় যাপনের উপায় নাই। মহামতি মুহম্মদ (দঃ) কী বলিয়া যান নাই যে রাত্রিকালে কর্ম্মক্লান্ত ব্যক্তির গুণাহ পরম কারুণিক আল্লাহ মাফ করিয়া দেন। আমরা না হয় আলস্যক্লান্ত হইয়াই আল্লাহর করুণাজন্য এবাদৎ করিব। অথবা এই বদনশিব দেশে বসিয়া আলস্য উপভোগ ব্যতীত আর কী বা করিবার থাকে। প্রকৃত অর্থে এক্ষণে আমাদের করিবার কিছু নাই। পরদেশী শাসকগণ তন্তুবায়গণের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ কাটিয়া লইবে। স্বজাতি সহজে বশ্য হয় বুঝিয়া আমারদিগকে ইঙ্গরাজি শিখাইয়া খ্রীস্তধর্ম্মে দীক্ষা প্রদানিয়া উহারদিগের স্বজাতি করিয়া তুলিবে। তথাপি আমারদিগের করিবার কিছু থাকিবে না। কিন্তু যাহা শ্বেতাঙ্গীগণ ভাবিয়া দেখে নাই তাহা এই হইল যে চাষা কদাপি জমিদারের স্বজাতি হইবার নহে। অতএব আলস্যই হয় একমাত্র সত্য। সময় অনন্ত জানিয়াও সময়ের অন্ত দেখিবার জন্য ইন্তেজার করিতে ২ অর্ধনিমীলিত নেত্রে আমরা দেখিব শ্বেতাঙ্গীগণ হাত পাতিয়া নকু ধরের নিকট কর্জ্জ করিয়া নকুরে ঋণী করিতেছে। গোবিন্দরাম মিত্রাদি কালা জমিদারগণ এককালে নিজভূমে পূর্ণ রাজত্ব ও অর্ধেক রাজকন্যা পাইল দেখিয়া আমরা যেরূপে হাই তুলিয়া তুড়ি মাড়িয়া মাথা রাখিবার জন্য নিকটে দোস্তের স্কন্ধ খুঁজিয়া দোস্তরে না দেখিয়া আপনারে নিঃসঙ্গ জানিয়া অতঃপর নিজস্কন্ধে নিজ শির স্থাপনিয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছিলাম তেমনটাই পুনর্ব্বার ঘটিবে। শুধু সোনা গাজীর মাজারের সম্মুখে যে বঙ্গদেশীয় অন্ধ ভিক্ষুক দিগন্তব্যাপী হস্ত বিস্তারিয়া মধ্য দুপুরে গান গাহিয়া ভিক্ষা চাহে তাহার সঙ্গীতায়ুধে মধ্যে ২ আমারদিগের সুখনিদ্রার ব্যাঘাত ঘটিবে। আল্লাহ চাহিলে তাহাকে দৃষ্টি প্রদানিতে পারিতেন কিন্তু তিনি জানেন ভিখারির অন্ধত্ব ঘুচিলে সে বেরোজগার হইয়া পড়ে। আর আমরা নিদ্রাবিজড়িত দেহে সে গান শুনিতে ২ বুঝিব যে সে গানে সুর নাই ভক্তি আছে।

 

জুমাদা-আল-আখিরা

অযাচিত পরম কৃপাপূর্ণ আল্লাহর নাম স্মরণপূর্ব্বক আরম্ভ করিতেছি। এক্ষণে বুজুর্গ পাঠকের অবশ্য নজরবন্দ হইবেক যে পরদেশী তাজিরগণের সংখ্যা এদেশে নিত্য বর্ধিত হইতেছে ও তাহারদিগের মুখ্য উদ্দেশ্য যদিচ ব্যবসায় তথাপি তাহারা দুর্গ দেবালয় ও শিক্ষালয় নির্ম্মাণে সমানাধিক আগ্রহ দেখাইতেছে। তাহারা ঠ্যাঙ্গাড়ে বাহিনীকে যৎপরোনাস্তি ঠ্যাঙ্গাইয়া জলাভূমির রাত্রিকালীন অগ্নিনির্ব্বাপণ করিয়া রাজধানী স্থাপন করিয়া পুস্তক প্রচারিয়া আপনার ধর্ম্মকর্ত্তব্য পালনিয়া আপনাকে ধর্ম্মিষ্ঠ প্রতিপন্ন করিতে চাহে। একথা অতীব শরমনাক যে আমারদিগের নফস এখনো শুদ্ধ হয় নাই বলিয়া মোরগের লড়াই ও বিড়ালের বিবাহ ও বেলোয়ারি ঝাড় আমারদিগকে আকর্ষণ করিতেছে। শরীফ পাঠক দেখিয়া তাজ্জব বনিবেন যে পরদেশীগণ বাঙ্গালীকে আপনারদিগের ভাষা শিক্ষা করাইতেছে ও আপনারা এতদ্দেশীয় অসাধু নারীর অশ্রুতপূর্ব্ব সঙ্গীতসুধা শ্রবণ করিয়া উচ্চৈঃস্বরে সাধু গদ্য বকিতেছে। সিরাজের প্রাণ ও কাল গত হইল অতএব কালক্ষেপ না করিয়া পরদেশীগণ আলিনগরকে কলিকাতা বানাইল তথাপি চিন্তিয়া না দেখিল যে আলি বলিলে কেবল আলিবর্দ্দি বুঝায় না। ইতোমধ্যে আমরা আবিয়াজ আখজার ও আসওয়াদ ইত্যাকার ত্রিমৃত্যুর মধ্য দিয়া নফসকে শুদ্ধ করিয়া লইতেছি ও সূফী মহিমা কীর্ত্তণ করিতেছি। বুজুর্গ পাঠক অবশ্য স্মরণ রাখিবেন যে তাসাওফগণ মসজিদের খিলাফে দাঁড়াইয়াও ইসলামী আকিদামধ্যে নিজ পদযুগ নিমজ্জিত রাখেন ও শরীয়তকে শিরোপরি স্থান দিয়া থাকেন। শোনা যাইতেছে পরদেশীগণ কলিকাতায় বিবিধাঞ্চল মধ্যে এক লৌহতে নির্ম্মিত মুসলমানপাড়া তৈয়ার করিয়াছে ও নিকট ভবিষ্যতে আমরা সূফীনগরী নির্ম্মাণ সম্ভাবনা দেখিতেছি না। অতএব সূফীগণ কাঁসাড়িপাড়া হইতে আহিরীটোলা সর্বত্র আপনারে বিস্তারিয়াছেন। ইতোমধ্যে আলি সাহেবের তরবারি তস্করে লইয়া গেছে ও ডোমপাড়ায় খাদ্যপ্রস্তুতকারী উনান বিস্ফারিত হইয়া নিত্য অগ্নি জ্বলিতেছে। নগর পুড়িতেছে তথাপি ওলি আল্লাহর মাজার ও দরগায় জিয়ারতকালে কোনো দীপাগ্নি পর্যন্ত নজরবন্দ হইতেছে না। আল্লাহর নিয়ামতে তাসাওফগণ হাল অবস্থা প্রাপ্ত হইতেছেন। ইলাহিয়াতের প্রশান্তি তাহানদিগকে বাকার নিকট লইয়া যাইতেছে। একমাত্র পরম করুণাময় ও বুজুর্গ পাঠক জানিতেছেন যে ডোমপাড়ায় তস্কর তরবারি হস্তে অগ্নি পাহারা দিতেছে আলি সাহেব বন্ধ মক্তবের সামনে দাঁড়াইয়া কাঁদিয়া প্লাবন আনিতেছেন আর প্রাচীরবেষ্টিত চৌরঙ্গীর গর্ভে য়িশুর সন্তানগণ নির্দেব প্রস্তরমূর্ত্তিকে ঈশ্বরজ্ঞানে চুম্বন করিতেছে। শ্বেতাঙ্গীদিগের ন্যায় ভক্ত আর কই।

 

রজব

অযাচিত পরম কৃপাপূর্ণ আল্লাহর নাম স্মরণপূর্ব্বক আরম্ভ করিতেছি। এক্ষণে বুজুর্গ পাঠক অবহিত আছেন যে মিশনারিগণ খ্রীস্তর নাম কীরূপে প্রচার করিতেছে ও য়িশুর মহিমা জানাইবার কোশিশ করিতেছে মঙ্গল সমাচার আমারদিগের লোকের হাতে ২ বিনামূল্যে তুলিয়া দিতেছে যাহা দেখিয়া আমরা তাহরাদিগের কৌশল বিষয়ে বিলক্ষণ চিন্তাযুক্ত হইয়াছি। অথচ বুজুর্গ পাঠক জানিবেন হজরত মুহম্মদ মোস্তফার (দঃ) সাহাবা তামিমুদ্দারি খ্রীস্তর চরণে শান্তি পান নাই ও নিজ পূর্ব্বতন পাপ স্মরণপূর্ব্বক অশান্তিতে দিনযাপন করিয়া শান্তি সন্ধান করিতেন। অধিকন্তু অফজল পাঠক শ্রদ্ধাপূর্ণ চিত্তে স্মরণ করিবেন দরবেশ ফুজায়েল বিন আয়াজের দাস্তান যিনি ধার্ম্মিক কণ্ঠে কোরাণ তেলাওয়াতের আয়াত শ্রুতি করিয়া দস্যুতা ত্যাগপূর্ব্বক সাধক হয়েন ও উচ্চ কামালিয়াত হাসিল করেন। এবাদতে নিজেরে ডুবাইয়া দিতে হইবেক ও ফানা ও বাকা যাচনা করিতে হইবেক ইহা আমারদিগের অজানা না হইলেও সজদা হইতে আমারদিগের ক্ষুদ্র মস্তকোত্থিত করিয়া যাহা দেখিতেছি তাহারদিগের কীর্ত্তি তাহাতে বৃক্ষও পত্রমোচন করিয়া হাসিয়া উঠিতেছে কেননা সাহাবা আবি দারাকে রসুলুল্লাহ একদা কহেন সৃষ্টির আগে আল্লাহ আছিলেন কুয়াশাপ্রতিম আল আমা অবস্থায়। বিনামূল্যে খ্রীস্তর নাম প্রচারিয়া য়িশুরে তাহারা কুয়াশার মধ্যে পুনর্বার জর্মাইতে চান তথাপি চিন্তিয়া না দেখেন কাদিরিয়া চিশতিয়া সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকায় আমরা নিত্য কুয়াশা সৃষ্টি করিয়া জিকর কালে হু ধ্বনি উচ্চারণপূর্ব্বক পরম সত্তার অন্তর্মুখী রূপটিকে নিত্য প্রতিভাত করিতেছি তাহান পরম করুণায় যাহা কুয়াশা কিম্বা আলোকপ্লাবন বিষয়ে সমানাধিক নির্বিকার তাহা মঙ্গল ও অমঙ্গল সমাচার উভয়ে সমানাধিক বধির রহিয়া যায়। খ্রীস্ত ২ করিয়া আপনারদিগের পূর্ব্বকালীন পাপ বিস্মৃত হইবার চেষ্টায় তাহারা য়িশুকে পাপাহত করিবেক পাপকে বিস্মরণাহত করিবেক ও বিস্মরণকে য়িশুআহত করিবেক। তথাপি মুবক্কর পাঠক উত্তমরূপে চক্ষুরুন্মীলন করিলে নজরবন্দ করিবেন যে পরদেশী ভাষা হইতে অনুবাদকর্ম্ম দিবারাত্র চলিতেছে ও শিশুরদিগের হাতে ২ মঙ্গল সমাচার ঘুরিতেছে।

 

শাবন

অযাচিত পরম কৃপাপূর্ণ আল্লাহর নাম স্মরণপূর্ব্বক আরম্ভ করিতেছি। দিনদার সূফীগণ জানিবেন মহানবীজী (আলাই সালাম) বলিয়া গিয়াছেন মোমান মনুষ্যের দিল হয় আল্লাহর আরশ। তাহানরা আরও জানিবেন মশহুর সূফী মনসুর হাল্লাজ বলিয়া গিয়াছেন আনাল হক অর্থে আমিই সত্য অর্থে আমিই হই আল্লাহ অর্থে তিনি আল্লাহ ব্যতীত অন্যান্য না জানিলেন। অতএব সিদ্ধান্ত এই হইল যে সূফীগণের দিল ও রূহ আল্লাহয় সমর্প্পিত হইল। তথাপি অমৃত মধ্যে যেইরূপ মৃত রহিয়া যায় সেইরূপ অতীন্দ্রিয় মধ্যে ইন্দ্রিয় রহিল। সূফীগণের সকলেই বুজুর্গ নহেন অনেকানেক রহিয়াছেন নিত্য নবীন তাহানরা তরুণ কুমার তাহানরা উত্তম কুমার। তাহানদিগের রিপুকুলকে তাহানদিগের খিলাফ বিদ্রোহ করিবার মন্ত্রণা দিতে বর্ত্তমান ব্যবসায়ী শাসকগণ বোধ করি সদা উৎসুক। বাকিবহাল পাঠককুল জানিবেন সম্প্রতি এক মেনিলা নামক বিদেশে জাত ব্যক্তিকে লালবাজার চৌমাথায় প্রকাশ্য দিবালোকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলাইয়া হত্যা করা হইয়াছে। তাহার বিরুদ্ধে অভিযোগ এই আছিল যে সে এক ততধিক প্রকাশ্য নিশান্ধকারে দেশীয় স্ত্রীলোককে হত্যা করিয়াছিল। নবীন সূফীগণ যেক্ষণে তসবি তওহিদ তাহমিদ ও তকবির পাঠসহযোগে কবর যিয়ারতের জন্য প্রস্তুত হইতেছেন সেইক্ষণে এইরূপ শরমনাক ও মকরূহ হত্যা প্রতিহত্যা দেখিয়া কাহার না হৃদয় প্রকম্পিত হয় দৃষ্টি ঘূর্ণিত হয় রূহ কবর হইতে বিচ্যুত হইয়া পুনরায় কবর মধ্যে প্রবিষ্ট হইতে চাহে। লড়াইয়ে প্রস্তুত মনুষ্য যদ্যপি দেখে প্রতিপক্ষ অধিকতর বলশালী সেমতাবস্থায় আত্মসমর্পণ অথবা আত্মত্যাগ কোনখানি শ্রেয়তর ভাবিতে ২ সে শহীদ হইয়া যায়। সালিক সূফীগণের মুখালীফাৎ এক্ষণে যে রিপুকুল তাহা বড় কম শক্তিশালী নহেন। কেননা চালাক শাসকগণ গুণাগারকে চৌমাথায় ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলাইয়া ভীতিপ্রদর্শন করেন ও রাত্রিকালে লালসার ফাঁসিকাষ্ঠে আপনাকে ঝুলাইবার ঘটনাসকল নিশান্ধকারে লুক্কায়িত রাখিয়া তরুণ হৃদয়সকলকে অধিকতর কৌতূহলী করিয়া তোলেন। প্রত্যেকেই তাপসী রাবেয়া বাসরীতুল্য মহামহিম নহেন যে শরীরকে বিলীন করিয়া পরিণয়েচ্ছা জলাঞ্জলি দিতে সক্ষম রহিবেন। অনেকানেক নবীন সূফী লোকের শরীর বর্ত্তমান ও রূহ বলিতে তাহানরা ভূত বুঝিবেন। নারী সংসর্গ প্রকৃত অর্থে স্বর্গ অথবা জীবৎকালীন দোজখের পথপ্রদর্শক তাহা তরুণ তথা উত্তম সূফীগণের উপলব্ধির অতীত বিষয়। এমনকী আলিম সূফীগণও এই রহস্যের মীমাংসা করিতে অক্ষম রহিলেন ফলে প্রায় ২ দেখিয়াছি কটিদেশে বেদনার অজুহাতে ভূতলে ক্রীড়ারত শিশুরে নিচু হইয়া ক্রোড়ে করিবার হৃদয়ক্রিয়া যঈফ সূফীলোক এড়াইলেন। যাহারা ফল না ভালবাসে সেই ২ লোক বৃক্ষকে না ভালবাসিবে এই নিয়ম এই দেশে চলিত আছে। তবে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাইবার জন্য এক্ষণে পরদেশীগণ সমাগত তাহানরা সকাম ও নিষ্ফল বৃক্ষকে অধিক ভালবাসিয়া বাঈরমণীর সহিত নিত্য নৃত্য করিয়া নিজ ২ শ্বেতাঙ্গী পুংশরীরের নুৎফা ও শ্যামাঙ্গী নারীদেহের রেহম নিষ্পন্ন এমন এক প্রকার মনুষ্য উৎপাদন করিতেছেন যাহারা স্বদেশে পরবাসী অথবা পরদেশে স্ববাসী তাহা নিজেরাও না জানিল। অবশ্য ইত্যাকার অজীব অভ্যাসে সিরাজও নিমজ্জিত আছিল তাহার প্রাণ ও কাল গত হইল। অদূর ভবিষ্যতে হয়ত দেখিব স্বদেশীয় কোন আশরফ ব্যক্তি শ্বেতাঙ্গী প্রভুদের সহিত আনন্দোন্মত্ত হইয়া সিরাজ কর্ত্তৃক নির্ম্মিত নিজামত ইমামবাড়াটিকে ভস্মীভূত করিয়া ফেলিয়াছে। তবে দেবালয় পুড়িলে নগর যে এড়ায় না তাহার লক্ষণ এই সময় হইতেই মালুম হইতেছে। তা হৌক দন্ত থাকিতে দন্তের মর্যাদা আমরা বুঝি নাই অতঃপর দন্তহীন হইয়া বুঝিয়াছি যে বিনা দন্তে খাদ্যগ্রহণ অসম্ভব নহে অতএব আপাতত যিয়ারতের জন্য আমারদিগের একখানি কবর মিলিলেই আমারদিগের খুশি। এক্ষণে ফিকর কেবল তরুণ ও উত্তম সূফীকুলকে লইয়া। পরদেশী প্রভুগণ এই বিকাশমান দেশে তাহানদিগের দক্ষিণ হস্ত প্রসারিয়াছেন। সেই হস্ত যে দিক নির্দেশক অথবা ভিক্ষা প্রদায়ক অথবা এদেশীয়দের সর্বস্বাপহারক অথবা একাধারে ত্রয়ী তাহার মীমাংসা নাদান সূফীগণ যত দ্রুত করেন তত মঙ্গল।

 

রমাদন

অযাচিত পরম কৃপাপূর্ণ আল্লাহর নাম স্মরণপূর্বক আরম্ভ করিতেছি। যদিচ সূফী সাধক হইয়া আলমে মালাকুত পানে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখিলে শ্রেষ্ঠ হইত তথাপি আল্লাহ চক্ষু দিবেন কেন যদি তাহা বহির্পানেও ধাবিত না হইবেক। ফরজান পাঠককুল চক্ষু মেলিয়া অবশ্য দেখিতেছেন কীরূপে কিছুকাল পূর্ব্বে আম্রিকা নাম্নী ভূখণ্ড আমারদিগের বর্ত্তমান শাসকদিগের অধীনতা অস্বীকার করিয়াছে এবং কীরূপে আমারদিগের ভূখণ্ড তাহার ফলস্বরূপ অধিকতর অধীনতা প্রাপ্ত হইতেছে কীরূপে এদেশাগত বিদেশী বস্ত্রের পরিমাণ নিত্য বাড়িতেছে কীরূপে এক প্রভাতের চাষী পরপ্রভাতে মজুর হইতেছে। চতুর্দিকে নফসে আম্মারার বিবিধ পথ নিত্যদিন প্রশস্ত হইতেছে ফলত আমন এমত দুর্লভ হইল যে জাহীন সূফী বুঝিতে না পারিতেছেন যে চক্ষু মুদিলে অধিক অন্ধকার অথবা চক্ষু খুলিলে। কালে ২ পুরাতন নাজিব লোক এন্তেকাল প্রাপ্ত হইলেন ও নব শাসকের গর্ভে জর্ম্মাইল নবতর দৌলতমন্দ লোক যাহারদিগের কর্ম্মদোষ দেখিলে কর্ণ মুদিয়া চক্ষে অঙ্গুলি দিবার মন চাহে। পাঠকবর্গ বিস্মৃত হন নাই সদ্যপ্রয়াত হরি ঘোষের দাওয়াতখানায় ধর্ম্মিষ্ঠ ও নেশাখোরের সহাবস্থান। প্রয়াতের নিন্দাকীর্ত্তন এদেশীয় রীতি নহে তথাপি নিন্দনীয় লোক মৃত্যুর পরেও বহুবার মরে। ইতোমধ্যে এশীয়টিক সোশেইটী নাম্নী এক মহাইমারত গড়িয়া পরদেশীগণ প্রমাণের কোশিশ পাইল যে এদেশীয় হিঁদুলোক হইল শ্বেতাঙ্গীদিগের আর্যভাই মাত্র। অতএব মোসলমানেরা হইল বিমাতার গর্ভজাত। যদিচ খ্রীস্তানদিগের বিরুদ্ধে জেহাদে নেতৃত্বদানকারী খোশনাম সালাদিন কুর্দ হইল তথাপি আর্য না হইবেক কেন ইত্যাকার প্রশ্নের সদুত্তর না মিলিতেছে। কবর যিয়ারত কালে মধ্যে ২ অনুভূত হইতেছে যাহারা শয়ন করিল ঐ ভূম্যভ্যন্তরে তাহারদিগকেও ঐ ভূমি নিজ সন্তান বলিয়া ভাবিল কী না অথবা তাহারা ঐ জমিনকে নিজ জমিন বলিয়া জানিল কী না। এবাদতে বসিয়া কামেল সাধকেরও সমস্ত শরীর আনন্দে পানি ২ হইয়া উঠিতেছে এমত ভাবিয়া যে ভাবীকালের কোনো কবি হয়ত হেথায় আর্য হেথা অনার্য এক দেহে লীন হইল বলিয়া বিলাপ করিবেন যদিচ সূফী সাধক এক্ষণে দেখিতেছেন কেবল গীর্যা ও কবরস্থান এক দেহে লীন হইয়া যেতেছে। মাহোল অতীব গমগীন হইয়া উঠিতেছে এবং মধ্যরাত্রে নিদ্রাভাবে শয্যোপরি বসিয়া সূফীগণ শুনিতে পাইতেছেন কোর্ট হৌস হইতে আগত খানাপিনার উল্লাস ধ্বনি। কালরাত্রি প্রভাত হইলে পর আমরা দেখিতেছি মনিব তাহান নব্য পোষ্যের কণ্ঠে রজ্জুর একপ্রান্ত বান্ধিয়া অন্যপ্রান্ত নিজ হস্তে রাখিয়াছেন। এইবার মনিবের আকর্ষণে পোষ্য চলিবে অথবা পোষ্যের আকর্ষণে মনিব চলিবেন তাহা কেবল রজ্জু জানিতেছে। আশরফ লোকগণ অবশ্য এমতাবস্থাতেও কুর্বানির গোস্ত লইয়া ফেলাছড়া করিয়া কাল কাটাইতে পারে। তাহারদিগের হস্তে নিসাব রহিবার কারণে তাহারদিগের ওয়াজিব ও ফর্দ এক দেহে লীন হইয়া গেল। তাহানদিগের প্রতি এই গরীব সম্পাদকের নিবেদন এই রহিল যে কোনোদিন যদি এক কেরামতের প্রভাবে কুর্বানির পর মৃত পশুটির ছিন্ন ধড় চার পা তুলিয়া মুণ্ডটিরে আলিঙ্গন করিতে ধায় ও মুণ্ডটিও খতরনাক হাম্বা রবে বেহেস্ত দোজখ প্রকম্পিত করিয়া তোলে তবে আপনাপন খড়্গগুলি তাহানরা কোথায় লুক্কায়িত করিবেন তাহা যেন পূর্ব্বাবধি ভাবিয়া রাখেন।

 

শাওয়াল

অযাচিত পরম কৃপাপূর্ণ আল্লাহর নাম স্মরণপূর্ব্বক আরম্ভ করিতেছি। যদিচ আল্লাহর নাম যাহাতে প্রশান্ত চিত্তে স্মরণ করিতে পারি তাহার মুনাসীব মাহোল সালেহ সূফীগণকেই অর্জ্জিয়া লইতে হইবে। ইতোমধ্যে কর্ণোয়ালিসের পুনরাগমন দেখিয়া দশদিগন্তের অবস্থা যে বেহদ মুফীদ হইবে এমত বোধ হইতেছে না। মতিন পাঠককুলও লক্ষ্য করিয়াছেন কীরূপে পলাশীর জঙ্গে এদেশের পরাজয় অবধি শ্বেতাঙ্গীগণের স্বদেশে যন্ত্রের আস্ফালন বিপ্লবের রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে আমরা স্বগৃহে বসিয়া সেই কলের যাত্রার ধ্বনি শ্রুতিগোচর করিতেছি। যদিচ হজরত ওয়ারেস কারণী (রহঃ) তুল্য ফকিহ ব্যক্তি বলিয়া গিয়াছেন জন্নত পাইতে হইলে অঙ্গের এবাদৎ না করিয়ো মনের এবাদৎ করিয়ো তথাপি আমরা শুষ্কপ্রায় তালপুকুরে ঘটি ডুবাইয়া পানি তুলিয়া নিত্য গাত্রমার্জ্জনা করিয়া থাকি। কথিত আছে কুল্লু মিন আল্লাহ ওয়াশায়ে মিন আবদাল্লাহ অর্থে সকলই আল্লাহ কর্ত্তৃক হইল আবদাল্লাহ তাহাতে কিঞ্চিন্মাত্র অবদান রাখিল। এক্ষণে শ্বেতাঙ্গীগণ আবদাল্লাহ হইয়াছে ও বুঝিয়াছে সকলই এদেশ হইতে হইল। আমারদিগের অঙ্গ যেহেতু মরে নাই সেহেতু অঙ্গী লইয়া ব্যবসায় মহালাভ বুঝিয়া চালাক শ্বেতাঙ্গীলোক বিবিধ বাণিজ্যমধ্যে এক বস্ত্রব্যবসায় মজিয়াছে। এদেশের তন্তু হইতে নির্ম্মিত বস্ত্র বিদেশী হইয়া এদেশীয়দিগের অঙ্গে শোভা পাইতেছে যেন পদী গোয়ালিনী সাহেবের শয্যাগতা হইয়া এদেশী গোরা গর্ভে ধরিয়াছে। মূর্শিদাবাদী তন্তুশিল্পী আজিকাল চিত্রবিচিত্র করা লালশালু বুনিয়া দিন গুজরান করিতেছে। আমারদিগের চক্ষু এই সকল দেখিয়া অশ্রু বিসর্জ্জন করিবে অথবা লহু বিসর্জ্জন করিবে তাহা স্থির করিতে অক্ষম রহিয়া শুষ্ক রহিল। তবে শাহনাওয়াজ লোক সকল কালেই রহিয়াছে। পাঠকদিগের স্মরণে আছে ফানুস কলন্দর ঈষ্ট ইণ্ডিয়া কম্পনীর সহিত যুক্ত হইয়াছিল ও সে খোজা হইলেও ব্যবসায় তাহার বহুৎ উত্থান হইল। তাহার স্বজাতি আর্ম্মেনীয়দিগের বংশ অবশ্য কালে ২ লোপ হইল। আরও কত কী লোপ হইতে দেখিব তাহা সর্ব্বজ্ঞ আল্লাহই জানিবেন। আপাতত আমারদিগকে অনুধাবন করিতে হইবে নগরবাবু জমিদারগণ যদি তাহারদিগের কলিকাতাস্থ কমলাসনে বসিয়া গ্রাম্যদেশের শষ্যশোভা নিরীক্ষণ করিতে পারেন তাহলে তাহানরা কীরূপ দূরদর্শী। আমারদিগের ন্যায় হীন মনুষ্যকুলের সেইরূপ দৃষ্টি কই। আমার তো কেবল দেখিতেছি গঙ্গাবক্ষে স্রোতের উপর দিয়া নিত্য একটি দুইটি মনুষ্যদেহ ভাসিয়া যাইতেছে। ওই ভাসমান মনুষ্যসকল নিতান্ত সন্তরণপটু এমত ভাবিয়া শিহরিত হইতে গিয়া পরক্ষণে যেমনি মনে পড়িতেছে মৃতদেহও কদাপি পানিতে নিমজ্জিত হয় না অমনি আমারদিগের আপাদমস্তক কণ্টকিত হইয়া উঠিতেছে।

 

ধু-আল-কাদা

অযাচিত পরম কৃপাপূর্ণ আল্লাহর নাম স্মরণপূর্ব্বক আরম্ভ করিতেছি। অবশ্য কোথা হইতে আরম্ভ করিব ও কোথায় পঁহুছিব তাহা আল্লাহই জানিবেন। আরম্ভ না করিলেই বা কী হইবেক তাহা ভাবিয়া বিস্মিত হইতে গিয়া মনে হয় বিস্মিত না হইলেই বা কী। বুজুর্গ পাঠকদিগকে সালাম করি অতঃপর ভাবিতে বসি বুজুর্গ না বলিয়া অভিজ্ঞ বলিলে কী বুজুর্গগণ খাফা হইতেন। ইতোমধ্যে সরকার বাহাদুর দাসপ্রথার অবলোপন ঘটাইলেন। আহা এই বন্দা নফসকেও যদি খোদা জিনসি খোয়াহিশের দাসত্ব হইতে মুক্তি প্রদানিতেন তবে এই তপ্ত কলিজায় বোধ করি জমজমের পানি ঝরিত। কিন্তু তাহা হইবার নহে। অতএব আপনারদিগের এই বৃদ্ধ সম্পাদক এক হস্তে তসবি হস্তান্তরে তসবির লইয়া বর্ত্তমানে স্থানুবৎ অকর্ম্মণ্য হইয়াছেন। অকর্ম্মণ্য লোকদিগের সর্বনাশা দোস্ত জোটে। কাজেই সম্পাদকের দুই নব্য দোস্ত জুটিয়াছেন এক চাঁড়াল তো অন্যে মাতাল। এক তাঁহারে শুঁড়িখানায় লইয়া যাইতে চাহে তো অন্যে শ্মশানে টানিয়া লয়। আপোসছলে তিনি শ্মশানক্ষেত্রে সুরাপাত্র সাক্ষী করিয়া সন্ধি প্রস্তাব পেশ করেন। তিন ইয়ার আসরে বসিলে রঙ্গ জমিয়া উঠে। নেশার ঘোরে প্রত্যেকে নিজ নিজ পাপকীর্ত্তন করিতে থাকেন। সম্পাদক ইতোমধ্যে মাতাল ও পাত্রে ২ মদ্য পরিবেশনকারী চাঁড়াল ইতোমধ্যে শুঁড়ি অতএব তিনিই ইতোমধ্যে সাক্ষী। তাহান চক্ষু দিয়া দৃষ্ট হই যে জ্বলন্ত চিতোপরি নাবালিকা সতী তাহার অশীতিপর স্বামীরে কামদান করিতেছে কর্ণ দিয়া শ্রুত হই স্বামীর খুলিটি ফট করিয়া ফাটিয়া গেল। নিজ ও পরজীবনের অতীত পাপাচারের কথা স্মরণিয়া ও শ্রবণ করিয়া কী করিব কী করিব বোধ হয় তথাপি তরোয়াল হস্তে খোজা হারেমরক্ষী সাজিয়া বসিয়া থাকি। চতুর্দিকে কঙ্কালদিগের নর্ত্তন দেখিয়া ক্যাবাৎ বলিয়া শাবাসি দিবার ইচ্ছা জাগ্রত হয়। এক্ষণে মিশনের ঘণ্টাধ্বনি শুনিয়া বুঝিতে পারি প্রভাতকাল আসন্ন। এদিকে বাহিরে ততক্ষণে কর্ম্মহীন দাসগণ সমবেত হইয়া শহর বন্ধ করিবার মতলব করিতেছে। তাহারদিগকে ঘিরিয়া ধরিতেছে চাবুকধারী শ্বেতাঙ্গী অশ্বারোহীদল। চণ্ডাল ও মদ্যপের সাহচর্যে চৈতন্যলোপ হইবার পূর্ব্বে উপলব্ধি হয় যাহারদিগের শৃঙ্খল ছাড়া হারাইবার কিছুই নাই শৃঙ্খল হারাইলে তাহারা নিঃস্ব হইয়া পড়ে। চিতাভস্মে নিমজ্জিত হইতে হইতে কোনোক্রমে বলিয়া উঠি হে আল্লাহ উহারদিগকে হিদায়েৎ প্রদান কর। অতঃপর হমদর্দ আল্লাহ উহারদিগের নিঃস্বতা পর্যন্ত হরণ করিলেন।

 

ধু-আল-হিজ্জা

মধ্যে ২ এইরূপ অনুভব হয় যে জিন্দেগিতে চাহিবার আর কিছু না রহিল। তাহার এই অর্থ না হয় যে পাইবার সকল খোয়াহিশই মরিল বরঞ্চ তাহার এই অর্থ হয় যে সকলই পাইয়াছি। দিগন্তধৌত মেঘরাশি হইতে মুষলধার বারিশ ঝরিতে থাকিলে বলিতে শরম বোধ করি গীত গাহিবার মন চাহে। তৎক্ষণাৎ দেখি মনমধ্যে সুরসহযুক্ত অজস্র কথা ঢেউ তুলিতেছে কণ্ঠে কিন্নর জাগিয়া বসিয়া আছে। পরক্ষণে মহামানবোক্ত সতর্কবার্ত্তাও মনে পড়ে যে একাকী গায়কের নহে তো গীত। নিজকর্ণমধ্যে অমনি বুজুর্গ শ্রোতা তালি বাজাইতে থাকেন। এইরূপে সকল পাইয়া চাহিবার ইচ্ছামুখে বিলক্ষণ মাটি পড়ে। সেইক্ষণে মনে হয় জিন্দেগি যদি এইরূপ খোয়াহিশ ব্যতিরিক্ত হইবেক তবে ইঙ্গরাজ নির্ম্মিত এই বঙ্গদেশীয় শহর ত্যাগপূর্ব্বক অরণ্যবাসী হইলেই বা ক্ষতি কী। তৎক্ষণাৎ চতুর্দিকে বিপুল জঙ্গল তৈয়ার হইয়া উঠে। দেখি মহামতি শাহ আবদুল লতিফ বালকাবস্থায় আলিফ ২ উচ্চারণ করতঃ সেই অরণ্যমধ্যে পরিভ্রমণ করিতেছেন। তাজিমের বারিশে মন আর্দ্র হইয়া উঠে। বেড়াইতে বেড়াইতে দেখি রঙ্গ খেলা সমাপনান্তে নিজ অঞ্চল নিঙ্গাড়িয়া নীল রঙ্গের ধারা বহাইতেছেন রাধারাণী। মন প্রফুল্ল হইয়া উঠে। ভ্রমিতে ২ গভীরতর অরণ্যে প্রবেশ করি। অচানক মনমধ্যে ব্যাঘ্রভীতি জন্মে। লোকমতকে অগ্রাহ্য করিবার সাহস কাহারও নাই। অতএব ব্যাঘ্রভীতির পিছন ২ সন্ধ্যাও আসিয়া পড়ে। আশঙ্কার ভিতরে আশঙ্কার সম্মুখস্থ হওনের আশাও আলবাৎ নিহিত থাকে। অতএব অবিলম্বে নাকে এক কটু গন্ধ টের পাই। আশৈশব শুনিয়া আসিয়াছি ব্যাঘ্রদেহে বোঁটকা গন্ধ থাকে। কিন্তু বোঁটকা গন্ধ যে কীরূপ তাহা আর জানিতে পারি নাই। ফলত বুঝিতে পারি না এই গন্ধ ব্যাঘ্রের নিকটস্থ হওনের লক্ষণ কী না। পিছন ফিরিয়া দেখিতে পাই পিছনও পিছন ফিরিয়াছে অর্থাৎ ফিরিবার পথ লুপ্ত। এহেন ন যযৌ ন তস্থৌ অবস্থায় নিজেরে কীটবৎ জ্ঞান করিয়া বলি হে আল্লাহ আমারে মৃত্যু দাও। তৎক্ষণাৎ পার্শ্ববর্তী ঝোপ হইতে এক ডোরাকাটা লোকমতে হালুম শব্দপূর্ব্বক আমার সম্মুখে লাফাইয়া পড়িয়া আমার চক্ষুতে চক্ষু রাখিয়া আমারে জরিপ করিতে থাকে। কটু গন্ধ তীব্রতর হয়। এই গন্ধরে বোঁটকা গন্ধ কেন বলিব এই প্রশ্ন মনোমধ্যে উত্থিত হওয়ামাত্র অপর ঝোপ হইতে লোকমত ঝাঁপাইয়া পড়িয়া আমার টুঁটি ধরিয়া আমারে টানিয়া লয় গভীরতর অলোক অরণ্যপানে। সেই মুহূর্তাবধি আমার মরণাকাঙ্ক্ষার মরণ হয়।

 

‍‍মুহররম

অযাচিত পরম কৃপাপূর্ণ আল্লাহর নাম স্মরণপূর্ব্বক আরম্ভ করিতেছি। যদ্যপি আপনার জমিনে কবর ব্যতীত অন্যপ্রকার অধিকার আমারদিগের ক্রমাবলুপ্ত হইতেছে সেইকালে একমাত্র খোশখবর হইল আপনারদিগের এই অধম সম্পাদকের দিলে ঈশক জর্ম্মিয়াছে। জাহীন সূফীগণ ভাবিবেন ইহাতে নূতন কী হইল। ঈশক-ই-মজাজী হইতে আরম্ভিয়া ঈশক-ই-হাকীকীতে উপনীত হইল এ তো সূফীগণের মধ্যে নিত্য দেখা যায়। তদুপরি চতুর্দিকে মাহোল-ই-ঈশক বিরাজিছে। ভবানী পাঠকের মজনু হইয়াছে মজনু শাহ। সন্ন্যাসী ও ফকিরগণ গলায় ২ মিলিয়া বিদেশী ঠ্যাঙ্গা খাইয়াছে ও বুঝিয়াছে দেশী ঠ্যাঙ্গা হইতে উহাতে বেদনা অধিক। তবে শ্বেতাঙ্গীগণ অদ্যাপি যাহা বুঝে নাই তাহা এই হইল যে এদেশীয়দিগের জখমের সহিত খাশ ঈশক আছে ফলত তাহারা মচকায়ও ও ভাঙ্গেও ও অতঃপর ক্ষতবিখ্যাত হইয়া বাঁচিয়া থাকে। তবে আপনারদিগের বর্ত্তমান সম্পাদক মহাশয়ের ঈশক অন্য কারণে মাহীর হইবে। কেননা তিনি প্রেমে পড়িয়াছেন সফেদ গাত্রবর্ণের আশমানী নয়নের ঈষৎ ক্ষুদ্র ও আঁট বক্ষের কাঁচুলীবদ্ধ কটিদেশের। এবং তাহান প্রেমের পাত্রী আর কেহ নহেন খোদ লার্ড কর্ণোয়ালিসের পত্নী দেবী জেমাইমা। বুজুর্গ পাঠকগণ তাজ্জব হইয়া ভাবিতেছেন জেমাইমার তো কবে এন্তেকাল হইয়াছে আর এই আদিব তবে নিশ্চয় বেগানা হইল। তাহলে তাহানদিগকে পুনর্ব্বার স্মরণ করাইয়া দিব মহামতি ঈবন আরাবীর সহিত আল্লাহর সেই কথোপকথন যেখানে আল্লাহর নিকটস্থ কীরূপে হইব আরাবীর এহেন সওয়ালের জবাবে আল্লাহ জানাইলেন উবুদিয়াৎ অর্থে আনুগত্যই হইল তাহান নিকটস্থ হওনের শ্রেষ্ঠ তরিকা এবং মনুষ্যের প্রতি আনুগত্যের ভিতর দিয়া আল্লাহর প্রতি আনুগত্য আপনারে প্রকাশিবে। এক্ষণে পাঠকগণ বলুন দেখি দেবী জেমাইমার অনুগত হইব না তো কী প্রতিবেশী কন্যা হানিফার পদতলে লুটাইব। দেবীর সঙ্গে আমার নিত্য স্বপ্নাভিসার হইতেছে। তাহানকে জীয়ন্তে তো দূরস্থান তাহান তসবীর পর্যন্ত কদাপি দেখি নাই তথাপি খোয়াবের দুনিয়ায় তিনি কী আনন্দ অশরীর স্বশরীরে আসিতেছেন। দেখিতেছি তিনি চামর কেশ দুলাইয়া খিড়কী হইয়া আপনারে খুলিয়া দিয়াছেন পরপারে আশমান। কভু তিনি খিড়কী দুয়ার আর অভ্যন্তরে গহীন অন্ধকার। ভাবিয়া দেখুন তিনি শ্বেত আমি কৃষ্ণ তিনি ধনবতী আমি নির্ধন তিনি পশ্চিমা মহিয়সী আমি পূর্বী কুষ্ঠরোগী তবু তো মিলিতেছি নিত্য। মহামতি দিবানী শামসী তাব্রিজ যে বলিয়াছিলেন ঈশকের শ্রেষ্ঠতা আসিল আর আমি চিরশ্রেষ্ঠ হইলাম তাহা যে কতদূর সত্য তাহা এক্ষণে বুঝিয়াছি। আমার গুলবদন নিগার বর্ত্তমানে অশরীরী হইয়াছেন আর আমি শরীর ত্যাগের সাধনা করিতেছি। এই আমারদিগের ঈশক হইল। পাঠকবর্গও রাত্রিকালে চক্ষু মুদিলে বোধ করি প্রত্যক্ষ করিবেন শ্বেত শাসিত কৃষ্ণাধ্যুষিত এই ভূমিখণ্ড হইতে বহু ঊর্ধ্বলোকে এক অমূল তরুর শাখায় পরস্পর বসিয়া এক নাবিলা প্রভুপত্নী ও এক কুষ্ঠরোগগ্রস্ত গোলাম মহানন্দে পা দুলাইতেছে এবং পরদেশে স্ববাসী ও স্বদেশে পরবাসী ব্যক্তিবর্গের খেদোক্তি ব্যঙ্গোক্তি ইত্যাদি তাহারদিগের কেশাগ্রও স্পর্শ করিতে পারিতেছে না।

 

সফর

কাল নিরবধি কিন্তু আজিকার অন্ত আসন্ন। অতএব আজ শেষ হইলে কাল আসিবে কিন্তু কালান্তর কেমনে আসিবে তাহাই ভাবি। বুজুর্গ পাঠকগণ উপলব্ধি করিয়াছেন যে কিছুকাল আগে আঘা মুহম্মদ রেজার ন্যায় নসীবদার আদমি জগতে আনন্দযজ্ঞে নিজের দাওয়াতনামা না পাইয়া চাষাদের সঙ্গে চাষা সাজিয়া শ্বেতাঙ্গীগণের বিরুদ্ধে জঙ্গ এলান করিল ঠিকই কিন্তু তাহার এই অর্থ না হইল যে সকল চাষার নামে এইবার দাওয়াতনামা আসিবে। অতএব ভুখা পেটের চাঞ্চল্য উপায়ান্তর না দেখিয়া নিম্নতর পেটে গমন করিতে থাকে। তৌহিদকে ইনকার করি না তথাপি মধ্যরাত্রে শিসা ভাঙ্গিবার শব্দে ঘুম ভাঙ্গিয়া যায়। শ্বেতশ্মশ্রুগুম্ফে হাত বুলাইতে বুলাইতে পদচারণা করতঃ ভাবিতে থাকি এক হইতে যদিবা তিনি বহু হইলেন বহু হইতে এক হওন কীরূপে সম্ভব। সকাল আসিয়া পড়ে। জানালা দিয়া বাহিরে দৃষ্টিক্ষেপ করিয়া দেখিতে পাই শ্বেতাশ্বপৃষ্ঠে শ্বেতাঙ্গিনীর সহিত শ্যামবর্ণ কাল চলিয়া যাইতেছে। পরম কৃপাপূর্ণ আল্লাহর নাম স্মরণপূর্ব্বক উচ্চারণ করি হে আল্লাহ শূলোপরি উত্তোলিত হইয়াও মহামতি মনসুর হাল্লাজের ন্যায় যেন নিজের কাতিলবর্গকে ক্ষমা করিয়া যাইতে পারি। পরক্ষণে হুঁচট খাইয়া উক্ত শ্বেতাশ্বের পতন ও মৃত্যু ঘটে। পথপার্শ্বে কদম্ববৃক্ষমূলে শ্বেতাঙ্গিনীর হাত ধরিয়া কৃষ্ণবর্ণ কাল দাঁড়াইয়া থাকে।
থাকিবে। মানুষ একদিন জানিবে বিবেকের হত্যা ব্যতীত আনন্দলাভ সম্ভবে না। জগতে আনন্দযজ্ঞের নিমন্ত্রণপত্র ছিঁড়িয়া ফেলিয়া নিঃসঙ্গতাশোকে খুদকুশি করিয়া কবিকুল মশহুর হইবেক। বুজুর্গ পাঠকগণ তখনও প্রশ্ন তুলিবেন অমৃতমধ্যে কী মৃত নাই। এইসকল একদিন ঘটিবে এতদূর বলিয়া অযাচিত পরম কৃপাপূর্ণ আল্লাহর নাম স্মরণপূর্ব্বক শেষ করিতেছি।


মূল পাতার লিংক : পরস্পর ঈদ আয়োজন ২০২০

অভীক ভট্টাচার্য

জন্ম ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৮৪; সিউড়ি, বীরভূম, ভারত। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে স্নাতকোত্তর, তারপর পিএইচ. ডি। পেশা অধ্যাপনা।
‘অগ্নিরে প্রাণ দিয়া করিলুঁ আলিঙ্গন : মহাকবি কৃত্তিবাস-হত্যা রহস্য’ নামে উপন্যাসের পাণ্ডুলিপির জন্য তিনি ২০১৯ সালে ‘আবুল হাসান সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেন।

প্রকাশিত বই :
তামসধৈবত [কবিতা, ২০১১, ভাষাবন্ধন]
খবর-ই-আমিন [কবিতা, ২০১৭, রাবণ]

ই-মেইল : aviktantrik@gmail.com