হোম কবিতা ক্ষতের দোয়াত

ক্ষতের দোয়াত

ক্ষতের দোয়াত
611
0

১.
বিছানাভর্তি কাদায় শুয়ে আছি। তাকে বলি ‘ঘুমাও’। নির্ঘুম কাঁথা সেলাই করে যাচ্ছে এক নারী, সে পারে তার সূচের চোখ দিয়ে নদী চালান করে দিতে। সে পারে সিরিঞ্জ ঢুকিয়ে আত্মার জল শুষে নিতে।

নীল—ঘোলানো রাত রক্তকে করছে মখমল। উত্তরের সিথানে শুরু হওয়া এ দেহ বাংলাসাগর অবধি প্রসারিত। বাদাবনের সম্মোহনী খাল টেনে নিচ্ছে আমার হাত।

কুয়াশা! কুয়াশা!

রহস্যের কুমির জড়িয়ে আমি শুয়ে আছি। জলের ভেতর তার কান্না আর দেখতে পাচ্ছি না।

২.
গ্রামকুকুরেরা একসঙ্গে বাতাসের সুড়ঙ্গে বইয়ে দেয় ডাক। ঝমঝম রাত নামে এই দেশে। এখন কেউ বুজে দিচ্ছে মুখবন্ধ মাটির ডানা। এখন ভালোবাসার সময়।

ত্রিশিরা তারার চোখ ওই উঁচু থেকে আর দেখছে না আমাদের পৃথিবীকে। অন্ধ যেমন অন্ধত্বকেই শুধু দেখে, মাথার ভেতর  তেমনি ঘুরেই চলেছে একটা লাটিম।

নিচে সীসা সীসা জল। ঢেউ ঘষটে ‘শপ’ ‘শপ’ শব্দে যাদের আসবার কথা; তারা আসছে না।

অস্থির অপেক্ষায় মাড়ির কর্কর শোনা যায়, ‘সাড়া দাও, সাড়া দাও নুহের জাহাজ’। এই দ্বীপে, তটরেখায়, একটি জীবন বালি-বালি হয়ে আছে।

ঘাটশিলা নিয়ে আসো, পাখি নিয়ে আসো, পরিবার নিয়ে আসো, রেশম পোকা আর মৌমাছি নিয়ে আসো তার কাছে।

আর কত ঢেউ আঁকবে তোমাকে-আমাকে!

৩.
ব্যথা তো অনেক হলো, অ্যানাসথেশিয়ার বাটি উপুড় করবার সময় কি হয় নি এখনো? ধারালো জিভের নিব ডোবাও এ ক্ষতে। আয়ুলিখনের অভিশাপে যে জীবন রক্তহীন শাদা—সে কাগজে লিখো। এই-ই তোমার অবশিষ্ট ভূমি—তোমার বিছানা। ঘুমশিয়রের পাশে স্টেশনের ঠিকানাটা লিখে রেখো দয়া করে, যাতে আবার আমি নিজেকে চিনতে পারি। সহস্র ক্রন্দনরজনীর দেনমোহর শুধে যাকে আমি বিবাহ করেছি, তাকেই বলো সব। রটনা করো না তাকে।

তারই পাশে শুয়ে আছি ইঞ্জিনবিহীন মালগাড়ির মতো—সত্য নিয়ে, বিস্মৃতির ভর নিয়ে, ভাগ্যের তারাপঞ্জিকা নিয়ে—প্রসারণশীল ধাতুদেহ নিয়ে।

আর, মনস্তাপের মধ্যরাতে উপচে পড়ে ক্ষতের দোয়াত।

৪.
ঘুমাবার আগে আমি পরের দিনে জেগে ওঠার গল্প, গুঞ্জন আর জোনাকির ভেজা আগুন চাই। দোকানে দোকানে বিক্রি করে ফেলা দেহের পুনঃসমাবেশ চাই। ক্রসফায়ারে মরা মানুষের ফিরে আসা চাই। আদমসুরত নিয়ে যে পুরুষাকার জেগে ওঠে শেষ রাতে, সেই নগ্নশয়ানের মুখে ফুঁ দিয়ে জাগাবার ঈশ্বরীকে চাই। বারবার আমাদের মিলন থেকে জন্ম নিক শিশু। তাদের নাম দেবো কার্নিশে কবুতর অথবা বাবলা গাছ। সীমান্ত-হারানো মানুষগুলির জন্য আমরা স্থানের, ভূমির আর কৃষির আশ্বাস হতে চাই।

সন্ধ্যাতারা বলতে তারা ঘরে ফেরার সংকেতই শুধু খোঁজে আকাশে।

৫.
ঘরের দিকে যাবার দীর্ঘতম দূরত্বকে বলে পথ। যে কোনো পথেই ঘরমুখী যাত্রীরাই বেশি। আমি ও জোনাকি সেই অন্ধকারের টানেলে একসঙ্গে জেগে থাকি। একরাশ মানুষের ঘরে ফেরার ট্রেন আমাদের নিঘর-নিঃসঙ্গতার সুড়ঙ্গ দিয়ে যখন যায়, আমি তাকে বলি, ‘স্টেশনের পাশে আমাদের ঘর, একদিন কত কত মানুষ আমাদের ভেতর দিয়ে যাবে, তখন আমরা আর ঘুমাতে পারব না, আমাদের ওপরে চলবে পথ, নিচে বইবে নদী।’

‘আসো তোমার চুলে আমি ঘুম বহায়ে দিই।’

৬.
আত্মরক্ষাহীন ধরা পড়ে যাই ক্ষুদে চোরের মতো। ভোটহীন মানুষের মতো, মতামতহীন লিফলেটের মতো উহ্য হয়ে থাকি। যেদিন আমার চোখে ডানা মুড়ে থাকা পাখি দুটি উড়ে গিয়ে বসবে তোমার চোখে, সেদিন তুমি কী করবে রত্নপিপাসু কবিতা?

উঁচানো গলুই, মাস্তুল, লুকাবার ছই; মানুষের তীররেখায় সব থাকে। আসো, উন্মুক্ত হও, রোদ তাপাও বুকে-পিঠে। যে ভাষা সুন্দরকে সমাহিত করে জাগিয়ে তোলে ইতিহাসের পাপ, আদমের প্রতারিত হবার গল্প থেকে যার শুরু, সেই ভাষা ধ্বনিত করো না তোমার সন্তানদের কানে।

৭.
খুঁটিতে খুঁটিতে দিকচিহ্নের আত্মহত্যা দেখে বুঝি, এখানেই শুরু এখানেই শেষ।

ফারুক ওয়াসিফ

ফারুক ওয়াসিফ

জন্ম ২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫, বগুড়া। পেশায় সাংবাদিক।
বুদ্ধিবৃত্তিক নানা তৎপরতার সাথে যুক্ত।

প্রকাশিত বই :

কবিতা—
জল জবা জয়তুন [আগামী, ২০১৫]
বিস্মরণের চাবুক [আগামী, ২০১৮]

প্রবন্ধ—
জরুরি অবস্থার আমলনামা [শুদ্ধস্বর, ২০০৯]
ইতিহাসের করুণ কঠিন ছায়াপাতের দিনে [শুদ্ধস্বর, ২০১০]
বাসনার রাজনীতি, কল্পনার সীমা [আগামী, ২০১৬]
জীবনানন্দের মায়াবাস্তব [আগামী, ২০১৮]

অনুবাদ—
সাদ্দামের জবানবন্দি [প্রথমা, ২০১৩]

ই-মেইল : rotnopahar@gmail.com
ফারুক ওয়াসিফ

Latest posts by ফারুক ওয়াসিফ (see all)