হোম কবিতা কামিনী ফুল ও কাঁটা মান্দারের রাত

কামিনী ফুল ও কাঁটা মান্দারের রাত

কামিনী ফুল ও কাঁটা মান্দারের রাত
197
0

কামিনী ফুল ও কাঁটা মান্দারের রাত
❑❑

পাহাড়ে এক ঝাঁক মিছিল উঠেছে, মিছিলের পথ ডুবতে থাকে পাহাড়ের গর্তে
আর হারাতে থাকে বিকেল, দুপুর আরেকটি মিছিল। রাত শেষে পাহাড়ের উচ্চতা
মরুভূমি হয়েছে, জমেছে এখন বালির জল। মান্দারি গাছের কাঁটায় আলকাতরার
মুখগুলো চিকচিক, বালির ভেতর নাভির ছিদ্র। তা থেকে গড়ায়ে গড়ায়ে বয়ে
যায় দুধের সর এরকম সারা রাত মিছিলের শব্দে কামিনী ফুল দুধের উপর
স্তনের বাঁট চাটতে থাকে। আলকাতরার গন্ধে মরুতে আর কোনো পথচারী নেই
সবাই বুকে কাঁটা গেঁথে উচ্চ স্বরে রেওয়াজ তুলেছে, দুধ বয়ে যায় কাঁটার শরীরে
বালিতে বালিতে। বছরের পর বছর পাহাড় বদলাতে থাকলেও মান্দারি গাছের কাঁটা
একই রকম থাকে, কামিনী ফুল থেকে একই বালক বেরিয়ে এসে আরেকটি
মিছিল শুরু করে


চকলেট
❑❑

ঘড়ির সেকেন্ড কাঁটাটি ঘরের কোণে সবচেয়ে একা যেভাবে পৃথিবীর শীত পাখি সব এক একজন অতিথি;
কুয়াশার বনে পরীক্ষা শুরু হয় তাদের বসবাসের।
আমিও বাস করতে লাগলাম, সাথে আছে এক
বাক্স চকলেট। সেদিন থেকে অতিথি পাখিরা চকলেট খেতে শুরু করেছে আর কেবল বমি করে, বমির গন্ধে কুয়াশা পালিয়ে যায়। বন আকাশ
জলাশয় ভিড় জমে, চকলেট ফুরিয়ে যায়। ঘড়ির কাঁটা বন্ধ হয়ে গেলে পাখিরা একসাথে হয় আর একে অপরের ঠোঁট কামড়াতে থাকে, কামড়ে কামড়ে ছিঁড়ে ফেলে।

আমি হাঁটছি একটি রক্তাক্ত ঠোঁট হাতে নিয়ে….


ঝুলন্ত তার এবং বৃষ্টি
❑❑

ল্যাম্পপোস্ট দলে দলে ডুবে গেলে গাছেদের শরীর শীতল হতে থাকে, দুপুরে জিরোতে থাকে মা
পাখিটি। বৃষ্টি কাঁদা জল বাড়ায়, দেয়ালে দেয়ালে
কাঁদা উঠতে থাকে আর সাথে বাচ্চা পাখিরা।
ফুটবল খেলাটি এখন পুরোপুরি জলের উপর, পা
থেকে পায়ে। শহর যখন জলাশয়, ঝুলন্ত মোটা তারটি অপেক্ষায় আছে পাখির বাচ্চাগুলো গিলে
খাবে। ডুবে ডুবে সাঁতরিয়ে ফুটবল হাত থেকে হাতে খেলা থেমে নেই, পানির ট্যাংকের উপর
গতকালের শিশি বোতলটি ভাসছে। দূরবীনের
কাঁচে চোখ রেখে দেখেছে কাঁদা জল ল্যাম্পপোস্টের মাথায়, ভাঙা বোতলে ফুটবল
নিক্ষেপে ঢেউ এর সাথে জলাশয় কাঁপায়। বৃষ্টি
অবিরত, পাখির মা কাদা জলের ভেতর থেকে
ঝুলন্ত তারের দিকে অস্থিরভাবে চেয়ে আছে।


ইনফিরিয়র প্রতিচ্ছবি
❑❑

আমরা ইনফিনিটি সুপারস্ট্রিং সাইকেলে প্রস্থানরত

আমরা অপদস্থ, কাগজের কোণায় কোণায় বহু রকমের ইনফিরিয়র প্রতিচ্ছবি। ফিরে আসে এসব হারাতে হারাতে, আমরা এভাবে কতগুলো ইনফিরিয়রের ব্যবচ্ছেদ করতে থাকি

সূর্য়ের আদি চেহারার মতো উত্তপ্ত বাষ্পে পৌঁছালে
ইনফিনিটি জ্বলে ওঠে। আমরা বার বার তাকানোর আগেই প্রস্থান করতে থাকি

শীতল জলে শুয়ে আছে ঘড়িটি। ঘড়ির বুকে ব্যবচ্ছেদের মুখ আর ছায়ারা……


হায় হনুমান হায় মানুষ
❑❑

ধুতুরার ঘ্রাণে ঘাসেরাও মজা পায় না
মাটি খুড়ে কেঁচোটি এসে ইটের দেয়ালে শুয়ে পড়লে,
ঘুম আসে। বাতাসে চুলেরা জড়িয়ে…

ঘুম ভেঙে বার বার মায়ের কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে; বলেছিল
আমি জেগে উঠলেই তারা নিয়ে যাবে।
কিন্তু কেউ আসে না
দেয়ালে ঘাসেদের উপর ইট জমতে থাকে, আমি সেদিকে দেখতে
দেখতে হাঁপিয়ে উঠি, তখন গায়ে জ্বর আসে খুব
ইচ্ছে করে আঁজলা ভরে জল খেতে
বুক শুকিয়ে যায়, ওরা মায়ের কাছে নিয়ে যায় না

একটি ভ্রমর এসেছে আমার গায়ে, মাথার চারপাশ
ঘুরে এসে বুকের উপর বসে বসে, বুকের গন্ধ শুঁকে
সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে
উড়ে যায় বহুদূর
ঘুম চলে আসে সরিষার খেতে
কে যেন বাঁশি বাজায়, আমি দেখি
লাল টকটকে একটা শাড়ি উড়ে যাচ্ছে
পেছনে ছুটছে পুরো সরিষার খেত
গাছেদের মিছিল, শালবন-সমুদ্র ছুটছে
জলের কচ্ছপেরা সাঁতরাচ্ছে নদীর জলে
মাঠে মেষের দল তীব্র বেগে ছুটছে
একদল হনুমানের পাহাড় বেয়ে এগোচ্ছে
শুনেছি এরা স্বেচ্ছায় মানুষ থেকে হনুমান হয়েছে
মানুষের শরীর তারা ত্যাগ করেছে তাই তারা মানুষকে
দুচোখে দেখতে পারে না কিন্তু তারা কারো ক্ষতি করে না

এই তো প্রেম…
কোথাও হারানো নদীর কাদায় প্রেম লুকিয়ে ছিল
সেই নদীর জলের নিচে কোনো কাদা নেই, আছে
অনেক অনেক আগুনের প্রস্তর তাই জল কাঁদে
নদী এখান থেকে বেরোতে চায়
আরেকবার প্রেমের কাছে ফিরতে চায়
আরেকবার বাঁচতে চায়

কিন্তু এই বাসযোগ্য পৃথিবীতে কোথাও কেউ বেঁচে নেই
বেঁচে থাকার প্রতিনিয়ত শিল্প চর্চা করে গবেষণা করে
ঝরনার গায়ে বসে তানপুরায় সুর তোলে
পাতার উপর বহুলিপির কারুকাজ করে
প্রতিরাতে শরীরকে ক্ষতবিক্ষত করে দ্রাক্ষারস খায়
এইভাবে বনমানুষেরা মানুষ হওয়ার ভাব করে
প্রেমস্পর্শ পত্রছায়ায় জল ভরাতে চায়
হায়রে মানুষ হায় হনুমান
হায় লাল শাড়ি

প্রতিবার হনুমান এই ভূমিসর্বস্ব ত্যাগ করতে করতে আহা আর মানুষ হতে পারে না

দেবাশীষ ধর

কবি, গল্পকার, গদ্যকার ও অনুবাদক। জন্ম ৫ জানুয়ারি, ১৯৮৯; চট্টগ্রাম।

শিক্ষা : গণিতে স্নাতকোত্তর, চট্টগ্রাম কলেজ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : গণিতের শিক্ষক, মীপস পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট, চট্টগ্রাম।

সম্পাদক :
বাঙাল, ঘুণপোকা [ছোট কাগজ]

প্রকাশিত বই :
ফসিলের কারুকাজ [কবিতা, অনুপ্রাণন প্রকাশন, ২০১৬]
দ্বিতীয় আয়না [কবিতা, খড়িমাটি, ২০১৮]

ই-মেইল : debdhar121@gmail.com