হোম কবিতা ঈদসংখ্যার কবিতা
ঈদসংখ্যার কবিতা

ঈদসংখ্যার কবিতা

1.18K
0

মৃদুল দাশগুপ্ত
একটি কবিতা

.
জল, সে প্রবাহ ছেড়ে উঠে পড়ে, চলে অগ্নি
                                         খড়কুটো ফেলে
বাতাস ক্লান্তিতে বসে নতমুখে পাথরের কোলে
যে চাকা গড়িয়ে ছিল, কেবল ঘর্ঘর শব্দে
                                 অন্ধকার ঠেলে
অতিশূন্যে উঠে গেল, যে আগুন নিভে গেছে জ্বলে
একেলা যে ঢেউ গেল পৃথিবীর এপিঠ ওপিঠ

সে সবের টোকা লেগে সরু এই গলির ভিতর
প্রাচীর ভেঙেছে যেন, জলকাদা… স্তূপাকার ইট…
                                          আধপোড়া খড়

 

 

গৌতম বসু
সুকুমারীকে না-বলা কথা

.
আমি কী-কী দেখছিলাম, তোমায় জানাতে চাই, পারি না—
যদি বলি, সরু গলিতে পথ গুলিয়ে-ফেলা দমকল
দেখছি, তুমি বসন্তের হাওয়ার মতো হেসে উঠবে,
পথে ছড়িয়ে-পড়া হাসির দানা ঘিরে, পায়রা নামবে ৷

যদি বলি, ফেরা যায় না, সরু গলি থেকে ফেরা যায় না,
অরণ্য থেকেও নয়, যেমন তোমার ওই কলহাস্য,
সে কি পারল ফিরে যেতে বসন্তের কাতর হাওয়ায়,
আমার দমকলের ঘণ্টাধ্বনিরা থামতে শিখল কি?

কারা যেন উচ্চস্বরে তোমার নাম ধ’রে ডেকে চলেছে—
আমি জিজ্ঞাসা করি তাদের, কবেকার, কোন শতাব্দীর
মানুষ তোমরা, আমি, সেই  মাৎস্যন্যায় থেকে আসছি !
মুখের কাপড় সরিয়ে তারা আমার পানে চেয়ে আছে ৷৷

 

 

মাসুদ খান
অপ্রাকৃত

.
ছোট্ট একটি ট্রেন—কিশোরী-বয়স। অসুস্থ, অর্ধবিকল।
পরিত্যক্ত লোকোশেড ছেড়ে
নিশীথে বেরিয়ে পড়ে একা, নিশ্চালক।
সারারাত কোথায়-কোথায় কোন পথে ও বিপথে ঘুরে বেড়ায়…
কিছুটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে, গ্রাম-গঞ্জ-শহর পেরিয়ে…

রেললাইন ছেড়ে ট্রেন নেমে যায় মাঠে। চলতে থাকে মাঠের ভেতর—
পৌষের শূন্য শীতার্ত মাঠ…
সুখী মানুষেরা ঘুমে। অসুখীরা নির্ঘুম, উনপ্রাকৃতিক—
দীর্ঘনিশ্বাসের আতসবাতাসে একাকার তাদের ঐহিক-পারত্রিক।

ঘুমে-ঢুলুঢুলু স্টেশনের বিধ্বস্ত কোণে
কয়েকজন নির্দন্ত নুলা ভিখারি সোল্লাসে মেতেছে সম্মিলিত স্বমেহনে।
পথ থেকে এক পথকিশোরকে গাড়িতে উঠিয়ে নিচ্ছে দুই সমকামী
সদ্যমৃত শিশুর লাশ তুলে নিয়ে পালাচ্ছে এক শবাহারী।
কাঁপতে কাঁপতে এগুচ্ছে চোখবাঁধা এক হতভাগা, ক্রমে ক্রসফায়ারের দিকে।
তা দেখতে পিছু নিয়েছে দুই রোঁয়া-ওঠা ঘেয়ো ক্ষুধার্ত কুকুর
এবং রাজানুগ্রহে সদ্য-ছাড়া-পাওয়া এক মৃত্যুসাজাপ্রাপ্ত খুনী।
বাসায় বাসায় বন্দি, নির্যাতিতা শিশু পরিচারিকাদের স্ফুট-অস্ফুট কান্না…

এসব কোন অ্যাবসার্ড নাটকের নিষ্ঠুর নাট্যায়ন, ঘূর্ণ্যমান নাটমঞ্চে!
শেষ অঙ্ক থেকে পিচকারির বেগে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসছে সমাপনী সংগীত—
পরাজিত মানুষের শোচনা ও খুনীর নৈশ নিভৃত অনুশোচনা
এ-দুয়ের মিশ্ররাগে জেগে-ওঠা নিষ্করুণ গান।

প্রাকৃত-অপ্রাকৃতের ভেদ ভুলিয়ে-দেওয়া সব দৃশ্যনাট্য ঠেলে
এগিয়ে চলেছে সেই পালিয়ে-বেড়ানো ট্রেনটি।

কেউ কি দেখেছে ট্রেনটিকে?
—কেউ না।
শুধু পরান মল্লিকের চির-রোগা রাতজাগা ছেলেটি বারবার বলে যাচ্ছে—
“গভীর রাতে জানালা খুলে দেখি-কি,
আগাগোড়া ফিনফিনে কুয়াশা-কালারের হিজাবে মোড়া, নূপুর-পরা
এক ঘরপালানো গৃহবধূ ত্রস্তপায়ে ঝুমঝুম শব্দে চলে যাচ্ছে দূরে
আরো অধিক কুয়াশার ভেতর।”

কিন্তু কেউ বিশ্বাস করছে না তার কথা।

 

 

কুমার চক্রবর্তী
আকেরন

.
সারি সারি বইয়ের দোকান, প্রতিটি দোকানেই অক্ষরসমুদ্র
প্রতিটি সমুদ্রই অজস্র মৃত নদীর স্মৃতি
আর তাতে কেবল রহস্যবিন্দুর উদ্‌গতি
যেন তারা বলছে—
‘এসো, অশ্রু দিয়েই আমাদের হাসিগুলো সারাই।’

সকল মানুষ নির্জনতার কারিগর
তারা তো রয়েছে আশ্রয়সত্যে,
আমরা এসব না-বুঝেই আকাশকে বানাই স্বর্গ
আর পাতালকে নরক।

আকেরন, সময়হীন, হে নদী অধোলোকের,
আমরা এসে দাঁড়াই তোমার তীরভূমিতে, দেখি, আগুনের স্রোত :
মানুষ ভাসছে কিন্তু পুড়ছে না দেহ তার :
যেন আচানক সালামান্ডার
আর তাদের আত্মা উড়ুক্কু মাছের মতো ভেসে চলছে এখন আবার,
আমরাও উড়ি তাই আন্তরীক্ষবোধে।

মানুষ চলে বাইনারি পদ্ধতিতে,
সে নিজেদের জন্য নিজেদের মতো করে
ভাগ করে নিয়েছে ভালো-মন্দ
সে বৈতরণির দুপারে জমা রেখেছে সুখ আর দুঃখ
কিন্তু জানে না সে, আমাদের  টুটাফুটা জীবনভাস্কর্য থেকে
যে সুর বের হয়
তা ঠিক মানুষের মতো মানবিক
ঠিক মানুষের মতো অমানবিক।

 

 

জুয়েল মাজহার
সংহারের প্রভু


আমাকে চেনো? আমার নামে
বাতাসও ভয়ে কাঁপে

পাখিরা গান থামায়; যায়
পাতার আশ্রয়ে!

কোটর থেকে পালিয়ে সাপ
নিজের পেটে ঢোকে

এমনকি এ-মরণ, সেও
আমাকে ভয় পায়

জান বাঁচাতে পালায় সেও
বিমূঢ় অসহায়


ডাইনিদের জঘন ঘিরে
কামের মতো জ্বর

লক্ষকোটি শিশ্ন নিয়ে
প্রেতেরা  উড়ে আসে

তখুনি সাড়া চতুর্দিকে
ঈশানে নৈর্ঋতে

ঈর্ষাতুর পরির দল
রতির লোভে ওড়ে


আমায় চিনিস? আমি ফায়ার
আমি ক্রসের বাপ!

সুরুয়া ভেবে হাপিশ করি
আস্ত মহাকাশ

যেখানে পাব ধরব এবং
যখন খুশি যাকে

রাত-দুপুরে তোকেও খাব
ঘিয়ের সাথে ভেজে

লুটিয়ে পায়ে যতই কাঁদিস:
‘করো না সংহার’

বিষুবরেখা পেরিয়ে যাবে
মাভৈঃ চিৎকার!

শুনতে পেলি ঠাডাশ্ ঠাডাশ্
আমার ক্রসফায়ার?

হৃৎপিণ্ড ছিন্ন খুলি
ছিটকেপড়া চোখ

গরম লোহু মগজ-ঘিলু
আরো আমার চাই

গান হবে না, বলছি আমি সংহারের প্রভু
মানুষ ধরে গেলাসে ভরে রক্ত পান করি!!

 

 

সৈয়দ তারিক
অনুজ্ঞা

.
ঘাতকদের ধারালো অস্ত্রগুলো যখন ঝলসে উঠবে,
চেনা লোকজন দূরে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকবে হত্যাদৃশ্য,
রক্তাক্ত শরীর পড়ে রইবে পথের উপর,
কেউ-বা মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলবে,
কেউ-কেউ ভাববে : উচিত পরিণতিই হয়েছে, বিভ্রান্ত ছিল সে,
কেউ মন খারাপ করবে : আহা!
কে আর মজারু দেবে ফেসবুকে?
পুষ্পেরা ভাববে :  লোকটা গেল কোথায়?
বালিকারা বিষণ্ন হয়ে যাবে।
তখন তোমার প্রেম আমার স্মৃতিতে মেখে ভেব
লোকটি ভালোবাসাময় জীবনের কথা বলেছিল,
লোকটি প্রত্যেকের অন্তরে থাকা গভীর সত্যের কথা বলেছিল…

 

 

টোকন ঠাকুর
ছোট কবিতা

.
নাকের ওপর জ্বলে কী?
জোনাকি।

 

 

কৌশিক বাজারী
অতিপ্রাকৃতের দিকে

.
তার দুপায়ে উঠে দাঁড়ানো থেকে অশ্বারূঢ়, এবং অশ্বারূঢ় থেকে কোটি কোটি মানবের নগরী, সে দেখে—প্রেম সংসার মহাজগৎ পরমসত্য ও ব্রহ্মার চতুস্তল মুখ ইত্যাদি করায়ত্ত হওয়ার পর অবশেষে একদিন মধ্যরাতে তার ভেতর সেই আদি ও অকৃত্রিম বীজ নড়ে ওঠে! সে শ্মশানের স্তূপীকৃত কয়লার উপর পদ্মাসনে বসে, যেখানে তার মৃতা, এ-জন্মের নারীর দেহ মিশে আছে,  তার ভস্মাবশেষ থেকে তাকে চক্রে বসায়! আর মৃতা নারী যেহেতু এই পৃথিবীর এই সভ্যতার কেউ নয়, তাই দোল দিতে দিতে সে কানে কানে শিস দেয়, যেন মহাজাগতিক হাওয়া—হ্যাঁ গো, এ জন্মের মানে কী গো? এ তোমার কত জন্ম! আগের আগের সব নারীদের মনে আছে? মনে করতে পারো? আমার সকল পুরুষ আমি মনে রেখে দিই, বলে আর দোল দেয়, তার চক্র দুলে ওঠে! আদি ও প্রাকৃত বীজ কয়লার স্তূপের উপর ঝরে পড়তে পড়তে ফের ফিরে যায়! চক্র থেমে গেছে! সে অশ্বারূঢ় থেকে ফের মাটিতে দাঁড়ায়। অল্প ঝুঁকে কপালের উঁচু হাড় থেকে বিগত ঘাম মুছে ফেলে প্রাকৃত ও ভোঁতা অস্ত্রের দিকে চলে যায়…।

 

 

তানভীর মাহমুদ
স্বর আকর

.
তমসাঘন রাতের স্মৃতিতে ধ্বনি গলে ঝরে মদ
তিলকের জন্মান্তর থেকে।
এক পশলা আঙুল সীমারেখার বিশ্রাম পায় বায়ুসড়কের মরমে।
মেলে দেয়া বাহুতে বসল স্মৃতি
জাগে দীপ্তি, স্বর আকর।
এই তো ঠাঁই।

 

 

দীপান্বিতা সরকার
দূরত্ব

.
তেমন কলিজাস্পৃহা
তেমন অনন্ত জরা
চন্দনচর্চিত রক্তরাগ

ওড়ে মধু ফাগ
অদেখা আকাশে,

সিঁথিতে লাবণ্যলতা
সন্দেহপ্রবণ

ঘন বন,
শীর্ণ যমুনার নাও
চন্দ্রমার পাশে

দূরে যত ঘ্রাণ
মনে হয় আঁধারে বিলীন

পাহাড় সমান।

 

 

শৌভ চট্টোপাধ্যায়
নিঃশব্দে অতিক্রম করি

.
কার বাড়ি মাঠের ওধারে, শাদা?
সারাদিন বন্ধ পড়ে থাকে, আর
রাত্রি হলে ঘরে-ঘরে জ্বলে ওঠে আলো
কারা আসে, কারা যায়, অস্পষ্ট গানের সুর
                           ভেসে আসে মাঠের এপাশে!
কখনও অনেক রাতে, যদি ঘুম ভেঙে যায়,
বারান্দায় সিগারেট খেতে এসে দেখি—
চাঁদের খুলির নিচে জ্বলে আছে,
                           অন্য এক প্রেতের করোটি

সারাদিন ভুলে থাকি, কাজেকর্মে, নানান ছুতোয়
কেবল দিনের শেষে, বাড়ি ফিরে
মনে পড়ে সেই অন্য বাড়িটির কথা—
মাঠের ওপাশে স্থির, যেন খুব
                           অপেক্ষায় ফাঁকা!

 

 

সমিধ বরণ জানা
জলপথ

.
তরঙ্গবিভঙ্গে আজ নৌকার মন খুব উদাসী হয়েছে
তার পোষা ময়ূরটি যে মাস্তুলের ওপরে বসে থেকে
দূরদৃষ্টি নাবিকের মতো মেঘের রকম-সকম লক্ষ্য রাখত আর কালো ছায়া দেখলেই
কেকাধ্বনি দিয়ে নৌকার হৃদয়খানি মাতিয়ে দিত
সেও আজ বড় চুপচাপ
তার পেখম থেকে ছলকে নামছে ওই বিষাদ-রোদ্দুর,
এই এত নির্জন জলের পথ
এই এত জটিল সীমারেখা,
এই পথে নির্লিপ্ত হাওয়া খুব কষ্ট দেয়,
পাগলিনীর রুক্ষ চুলের মতো ছেঁড়া পাল পুবদিকে ওড়ে আর
তার ছায়া পড়ে জলের গভীরে
তবুও হঠাৎ করে কেন যে তরঙ্গ আজ প্রহেলিকাময় বিভঙ্গে নেচে ওঠে
সঠিক কারণ তার কেউ জানতে পারে না,
রঙিন আঁচলে তার সমুদ্র তারার দল খেলা করে,
জলের অতল থেকে উঠে আসে ঝিকিমিকি ফসফরাসের আলো,
এখন সমুদ্র তারা আর ফসফরাসের আলোই নৌকাকে
দিগন্ত দ্বীপের দিকে নিয়ে যাবে


ঈদসংখ্যা ২০১৮