হোম কবিতা আর্টিফিসিয়াল

আর্টিফিসিয়াল

আর্টিফিসিয়াল
422
0

দেশ

আমার তো দেশ নেই, কোথায় আমার দেশ
টিপসই জানি না, অক্ষর ও লিপিমালা চিনি না
স্লোগান দিতে জানি না তোমাদের কণ্ঠস্বরে,
জড়তা ভাঙে না হাত ও পায়ের

কেউ জানে কি আমার জন্মের ভোর কেমন ছিল?
সূর্য দেখি নি, না-সবুজ, না-হলুদ, না-লাল
তোমরা তো ট্রাফিক আইনের কথা বলো
আমি আইনের রং চিনি না, আইন কী তাও জানি না

নুড়িপথে ফোটা ঘাসফুল নজরহীন বীজে যে জন্ম
এরপর এখন হাঁটছি বিভাজনের আল ধরে এপার-ওপার
বাবা-মা কী তাও জানি না, যুদ্ধের ডামাডোলে না কি
তারা মরে গেছে, কাদায় মিশেছে হাড়ের চিহ্ন;
কুড়িয়ে পাওয়া এক জীবন, কোন দেশের কথা বলি;

পা ছড়ানো নির্ভর মাটি, এই তো আমার দেশ ভাবি
দয়া করে লিখে দিন আমার কপালে, পা যেখানে রেখেছি
মাটিহীন এক ভূখণ্ডের নাম, আমার দেশের নাম।


তুবার নির্জনতা

ভোরের আলোয় ফোটা একটি শেফালিকা
কেমন ঝরে গেল, কুয়াশার চাদরে ঢেকে গেল ওই হাসিমুখ
পথের কিনারে রইল পড়ে খেলার পুতুল, ঈদের মেলা থেকে কেনা
কয়েকটি রঙিন বেলুন

এখন শুধু অপেক্ষায় কাটে কখন আসবে মা হাতে নিয়ে চিপস,
বাদাম আর মিমি, অপেক্ষা-প্রতীক্ষা যা-ই বলো, আসে না মা;
দরজার টক টক শব্দ বা কলিংবেলের আওয়াজ শুনলেই
সামনের দিকে দৌড়ে যায় তুবা, চিলতে রোদের ফাঁক দিয়ে দেখে
আদরমাখা আলো পড়েছে কচি ঘাসের ডগায়

সকলের হাতে সেদিন মোবাইলগুলো হেসেছে, চকচক করেছে
আহা!—মুভির মতো একটি ভিডিওগ্রাফি চমৎকার
সকলেই ভেবেছে—আপলোড করা যাবে, ভাইরাল হয়ে যাবে সহজে
কৃতিত্বের সীমানা পার হয়ে যাবে বহুদূর, আর লাইক হবে লাখ লাখ
যেখানে মা! মা! চিৎকার আর কান্নার শব্দ তলিয়ে যায়, যাচ্ছে …

ফড়িং-এর গল্প ভুলে যাচ্ছে তুবা, শুধু মনে আসে চিপস আর চকলেট,
ভুলে যাচ্ছে তেলাপোকার ভয়, এদিক ওদিক কত যে চ্যাঁচামেচি এখন
সে শুনতে পায় না, কখনও তুবার নিথর চোখ দুটো স্থির হয়ে থাকে
কখনও কান্নায় ডুবে যায়,—মা নিচে গেছে আসবে আবার হাতে তার
লজেন্স আর কিছু খেলনা;
ধানমন্ডি লেকের পাখিগুলোর গান থেমে গেছে,
হারানো সুরলহরি, তুবার খেলার সাথিরা কেউ নেই কাছে,

একবারও তার ভাবনায় আসে না লাঠি ও রডের শব্দ
হয়তো দেখতে পাবে একদিন বিষাক্ত কয়েকটি লাঠি ও রড
মায়ের পাশে শুয়ে আছে নির্বিকার, ঝড়ে উপড়ানো
বৃক্ষের মতো নির্বাক;
স্কুলে যাবার গলিপথে হেঁটে যেতে যেতে একদিন জেনে যাবে তুবা
তার মাকে পিঠিয়ে মারা হয়েছে, সে মায়ের একহাতে ছিল লজেন্সের প্যাকেট
আরেক হাতে ছিল স্কুলের খাতা-কলম-পেনসিল, আমরা খেয়ালই করি নি;

একাকী নির্জনে মা আসে না, কেন যে আর আসে না মা, আসবে না কোনোদিন!


আর্টিফিসিয়াল

আগে জানতাম—তুমি, আমি, বা আমরা কোথায় কে আছি
এখন হাওয়া বদলে যাচ্ছে, জানি না কে কোথায়,
পরিচয় বড় জটিল বিষয়
এমনকি নিজের কাছেও,
আবেগ শব্দটির দাপট একেবারে আমড়া কাঠের মতো
চলেছে সোমিলে, গুঁড়ো গুঁড়ো দহনের ঝুড়ি নিয়ে
তুষের আগুন জ্বলছে, নিজের দেহে নিজেই আগুন জ্বালায়
এ গতরে স্পর্শ লাগে, শিহরনের লীলা বুঝি না
অসংখ্য চুমুর বাহার, রং বনফুল, ঘনীভূত চুম্বনের আড়ালে
রূপান্তরসভায় সকলেই একই পরিচর্যায় মজেছে বেশ
সকলেই মহাকালের পুতুল;

না-মা, না-বাবা, না-সমাজ, না-রাষ্ট্র, না-প্রেমিক, না-প্রেমিকা
সব শূন্যতায় ভাসে, স্থানহীনতার প্রবল চাপ…
যেখানে একদিন গরুর বাথান ছিল, ঘাসফুল গজাত সুন্দর
একি দুঃসাধ্য, দুর্বোধ্য কাল, নস্টালজিক হাওয়া
জলাশয়ে ডুবে না চোখ, ডুবে যাচ্ছে ঝলসানো গারদে
পারদ-গর্তের মতো কি এক নলাধারে

চিত্রগুপ্ত লিখে না ঠিকুজি, মাতৃজঠর নেই, মাটি হারানোর কুয়াশায়
সব হারানোর বাতাবি শোভা পাচ্ছে, লেখা হচ্ছে চকিত অন্তর্জালে
মাথার নিউরন, ক্লোন নয়, দৌড়াচ্ছে কাল, দখলে নিচ্ছে খামার, বাজার
অনবরত হ্যাকিংভ্রমণ।


বিচ্যুতি

দিনে দিনে মরছে অনুভবের বীজ, অনুভূতির সহায়
খুব শীতল লাগছে তোমার হাত, না কি আমি
নিজেই হিম হয়ে বসে আছি, হতে পারে; বুঝি না এখন
এবেলা-ওবেলা খুঁজে বেড়াই একটি শরীর, কার তবে
জ্বরের শরীর আকাশে দিগন্ত মেলেছে যেখানে তার পাখা
ওখানে বসে আছে যে নিরন্তর পাখির বিতানে, ডাকছে সুরে
আর যাওয়া হবে না আমার, আমি যে বিচ্যুত কাঙাল।


ম্যাকাথিনো পাখি

চিলেকোঠার চারপাশে পাখিমেলার চিহ্ন
মুনিয়া, টিয়া, শালিক বসে জানালার তারে
পালকের ঝাপটানো স্বরে
যেন একাতারা মাতানো বাউল
প্রতিভোরে ঘুম ভাঙা সেই কিচিরমিচিরে

পাখিদের গান শুনে বিরক্তি থাকে না
স্পর্শ করতে চাইলেই উড়াল নিরুদ্দেশ
কখনও আসে না, ফিরে আসে কোনো কুয়াশায়
আবার ফিরে গেলে পালকচিহ্ন খুঁজে বেড়াই
পাখি-বিরহ স্পর্শ করে ভিন্ন সকাল;

হঠাৎ পাখিদল আর আসে না, ঘুম ভাঙে না
তাড়া নেই, তাগাদা নেই, আসে তবে ঝাঁক নয়
নতুন এক পাখি এসে নীরব বসে থাকে জানালার দূরে
রঞ্জক চোখে আমাকেই দেখে, ময়না, টুনটুনির সাথে
মিলে না, স্পর্শ করে, ঘরময় বর্ণালির আবেশে
গানের বদলে ঝনঝন শব্দে নড়ে ওঠে আমার সকাল
জানালায় পালকের চিহ্ন পড়ে না;

আড়ালে জেনে নিতে হয় এসেছে নতুন পাখি
নাম তার ম্যাকাথিনো, আমি তার ছবি তুলি না
সে আমার মানচিত্র আঁকে, আমি তাকে স্পর্শ করি না
সে আমাকে স্পর্শ করে।

স্বপন নাথ

জন্ম ৪ মে ১৯৬৮; বড়লেখা, মৌলভীবাজার। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; এমফিল, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষকতা; উপপরিচালক (গবেষণা ও তথ্যায়ন), নায়েম, শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

প্রকাশিত বই :
প্রবন্ধ—
চিন্তা ও জগৎ : সাহিত্য সংস্কৃতি [প্রবাস প্রকাশনী, যুক্তরাজ্য ২০০৭]
কবিতার নন্দনবিশ্ব [অনিন্দ্য প্রকাশ, ঢাকা ২০১৭]
কথার বুনন [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]
ছিন্ন কথামালা [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

কবিতা—
রৌদ্র ও বৃষ্টিতে মায়াহরিণ [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০০৭]
জলৌকা চোখের চাতাল [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০১০]
নির্জন বিচালির ডানা [কবি প্রকাশনী, ঢাকা ২০১৩]
নখের আউঠা [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৪]
নানকার ধানবীজ [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৫]
একলব্যের ছিন্ন আঙুল [নাগরী, সিলেট ২০১৬]
সংশয়ের বসতি [নাগরী, সিলেট ২০১৭]
গ্রাম বজ্রযোগিনী [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

ই-মেইল : rudro71@gmail.com