হোম অনুষ্ঠান মাটিগন্ধি আয়োজন : মুরলীর নবম গুরু-শিষ্য-সুহৃদ মিলনমেলা

মাটিগন্ধি আয়োজন : মুরলীর নবম গুরু-শিষ্য-সুহৃদ মিলনমেলা

মাটিগন্ধি আয়োজন : মুরলীর নবম গুরু-শিষ্য-সুহৃদ মিলনমেলা
213
0

বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট উপজেলার নির্জন একটি গ্রাম হোচলা। ফকিরহাটের হোচলা গ্রামে আমার কখনও যাওয়া হয় নি। সংগীতগুরু নিখিলকৃষ্ণ মজুমদার গতবছর বলে রেখেছিলেন যে, মুরলী আয়োজিত এবারের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে হবে। ওভাবে কথাও দিয়েছিলাম তাকে—অবশ্যই থাকব। গতবছরে একদিন খুলনাস্থ সংগীত ও বাদ্যযন্ত্রের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাংলার বাউল-এ বসে তার সাথে কথা বলেছিলাম নানা কর্ম ও উদ্যোগ নিয়ে। তিনি একে একে বললেন বাংলার বাউল-এ পরিচালিত কর্মযজ্ঞের বিবরণ। আলাপ হয়েছিল, কীভাবে তিনি তা পরিচালনা করেন, কারা তার শিক্ষার্থী এসব বিষয়ে। এ ছাড়াও সংগীত ও বাদ্যযন্ত্র ভালোবেসে সব ছেড়ে কেমন করে তিনি এসবে লীন হয়ে গেলেন। কেমন করে হয়ে ওঠেন নিখিল কৃষ্ণ মজুমদার থেকে গুরুজি বা নিখিল স্যার। এখন বলতে হয় সংগীত ও বাদ্যযন্ত্রই তার জীবনের মৌল প্রেরণা। বিশেষত, বাঁশি বাজাতে বাজাতে এখন নিখিল মজুমদার আর বাঁশি সমার্থক হয়ে গেছে। খুলনা অঞ্চলের কারও কাছে তাঁর কথা জানতে চাইলে লোকে বলে—ওই বাঁশি বাজানো নিখিল বাবু! নিখিল স্যারের বাঁশিতে মুগ্ধ সবাই। রাধারমণের গানের মতোই—‘আর মুখে হাসি হাতে বাঁশি, বাঁশি বাজায় শ্যামরায়/ এগো চাঁদবদনে বাজায় বাঁশি মধুর মধুর শোনা যায়।’


নিখিল মজুমদার সংগীতের মধ্যে দিয়ে হোচলা গ্রাম আন্দোলিত করেছেন, তা স্বীকার করতেই হবে।


ওই পরিচয় ধরে নিখিল স্যার বা গুরু নিখিল মজুমদারের কাছে সহজে খুলনার বাংলার বাউল কেন্দ্রে পৌঁছা যায়। বাঁশি দিয়ে তিনি শুরু করেছেন আর এখন শেখাচ্ছেন দোতারা, একতারা, ব্যাঞ্জ, ম্যান্ডোলিন, খমক, ঢোল, মৃদঙ্গ, তবলা, হারমোনি আর কোনটা যে নয়। এই তালিম দিতে দিতে তিনি তৈরি করেছেন মুরলী। মুরলী বাঁশির অন্য এক নাম। একার্থে বলা যায়—তিনি বাঁশি নিয়ে রীতিমতো গবেষণা করেন সব সময়। কথায় কথায় বললেন—এখনও তার স্বপ্নের বাঁশি তৈরি করতে পারেন নি—অবশ্য এটা তার বিনয়াবত কথা। এ মুরলী শব্দকে কেন্দ্র ও চেতনায় রেখে জন্মমাটি হোচলা গ্রামে তিনি গড়ে তোলেন ‘মুরলী লোকসংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র’। বলা কি আর প্রয়োজন, মুরলী সংগঠন হোচলা গ্রামের আলাদা এক পরিচিতি এনে দিয়েছে। হোচলা গ্রামে মুরলী মানে বিশেষ কিছু। হোচলা গ্রামে মুরলী বলতে—এই যে আমাদের বাঁশিওয়ালা নিখিল দা বা নিখিল কাকা বা নিখিল গুরুজি এবং কারও কাছে নিখিল স্যার।

83230427_601449060431371_7294383665943937024_n
দোতারা বাজাতে নিমগ্ন নিখিলকৃষ্ণ মজুমদার

হোচলা আর খুলনার নিখিল স্যার যে অনন্য কিছু, তা এবারে মুরলীর নবম বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে বুঝে নিয়েছিলাম। প্রতিবছরের মতো ২০১৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর নির্ধারিত দিন এ আয়োজনের। ওইদিন সকালে শুরু হয়ে রাতে শেষ হয় অনুষ্ঠান। ২৫ ডিসেম্বর খুব সকালে রওয়ানা দিয়েছিলাম, ভাবছিলাম দুপুরের আগেই অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে যাব। কিন্তু হোচলায় পৌঁছাতে বিকাল হয়ে যায়। ফলে, নিজে অনেক কিছু উপভোগ করতে পারি নি। খুলনায় পৌঁছে মুরলীর বাদ্যযন্ত্রী বিকাশকে ফোন করি, সেও অধীর অপেক্ষায় থেকে জানতে চেয়েছে কখন আমি পৌঁছাব? ইত্যাদি। আবহাওয়া ছিল বিষম বিরূপ। ফলে, খুলনা থেকে হোচলা রওয়ানা দিতে কিছুটা দেরি হয়। অবশেষে হোচলা রওয়ানা দিলাম এক অচেনার উদ্দেশে। হোচলা গ্রামে কীভাবে যেতে হয় তা জেনে নেই কয়েকজনের কাছে। রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি, সকাল থেকেই কুয়াশায় অন্ধকার। প্রচণ্ড শীত। মেঘাচ্ছন্ন গুমোট ভাব ছিল সারাদিন। ভাবছিলাম আজ বৃষ্টি আসে কি না। আবহাওয়ার অগ্রিম আভাসে বলা হয়েছে—বৃষ্টি হতে পারে। আবার কয়েকদিন থেকে সূর্যও দেখি নি। পথে যেতে যেতে শীতের তীব্রতা অনুভব করছিলাম। ভাবছি—ওখানে আমি এক আনাড়ি লোক মানাতে পারব কি না, বা হোচলায় যেতে সমস্যা হবে কি না। না, একেবারেই তা হয় নি। খুলনা থেকে ফকিরহাট যেতে কাঁটাখালি পার হয়ে ফকিরহাট উপজেলার পথে যাবার সময় পথের পাশেই গড়ে ওঠা কয়েকটি দোকান পেলাম। ওখানে একজনের কাছে বলি—আমি হোচলা গ্রাম ও নিখিল বাবুর বাড়িতে কীভাবে যাব। ওই লোকটি জানান সামনে তৈয়ব মিয়ার বটেরতল গেলেই পেয়ে যাবেন বামে রাস্তা। বটগাছের পথ পেয়ে গেলাম। বটেরতল নামের স্থানে তোরণ নির্মাণ করা হয়েছে, ঝুলানো ব্যানারে লেখা পেলাম—‘গুরু-শিষ্য-সুহৃদ মিলনমেলা’।

এবারে আমার লক্ষ ছিল মুরলীর অনুষ্ঠান দেখা। মনে মনে ভাবছিলাম আসলে কী অনুষ্ঠান ধরতে পারব কি না। তবে সকাল থেকে অনেক কিছুই মিস করেছি মনে হয়। গিয়ে পেলাম বাদ্যযন্ত্রীদের সমবেত পরিবেশনা। মঞ্চে অনেক যন্ত্রশিল্পী, যন্ত্রের কোরাস চলমান। অসম্ভব সুন্দর লাগল দেখে ও উপভোগ করে। সত্যি অসাধারণ ও উপভোগ্য তাদের পরিবেশনা। প্রতিবছরেই বাদ্যযন্ত্রীদের একসাথে বিভিন্ন যন্ত্রের সুর ও বাদন, মুরলীর এক বিশেষ আকর্ষণ, তা বলাই বাহুল্য।

পরিবেশনার মাঝেই যারা অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত এবং আসা যাওয়া করছেন, তাদের সবাইকে মঞ্চে একে একে ডাকা হচ্ছে ও সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। তাদের অনুভূতিও প্রকাশের সুযোগ ছিল। আমি গিয়ে একেবারে পেছনে বসেছিলাম, যাতে কেউ না দেখে আমাকে। কিন্তু কতক্ষণ আর নীরব থাকা যায়। আমাকে খুঁজে বের করে নিল বিকাশ। এরপর দেখা হলো ফরিদ ও মনির-এর সাথে। কিছুক্ষণ আড্ডা দিলাম এ ক-জন মিলে। তারপর একসময় নিখিল স্যার আমাকে মঞ্চে ডাক দিলেন। ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও মঞ্চে যেতে হলো। আমাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নিলেন। যদিও এ বিষয়টি আমার ক্ষেত্রে একেবারে বেমানান। প্রায় ১০ বছর থেকে মঞ্চ, বক্তৃতা, সমাবেশ, আড্ডা ইত্যাদি কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়া এবং অতিথি হওয়া একেবারে বর্জন করেছি বলা যায়। মঞ্চে ঘুরতে ঘুরতে এত ছদ্মবেশ দেখেছি এখন আর মোটেও ভালো লাগে না এসব হৈচৈ। এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে লুকিয়ে থাকা, এতে ভীষণ আনন্দও হচ্ছে। বড় মানুষ, নামি দামি মানুষ দেখলে দূরে সরে যাই। এত ভাঁড়ামো ও পোশাকি আচরণ দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে গেছি। ফলে, এখন আমাকে কেউ চিনে না, আমি কাউকে চিনি না। আর পরিচিত হতে চাই না, পরিচয় দিতেও চাই না। নিজের সরিয়ে রাখাকে সবাই কিছু বাঁকা দৃষ্টিতে দেখে। যাক আর কী করা, নিখিল স্যার ডেকেছেন, না গিয়ে উপায় ছিল না। বরণের পর জানতে চাইলেন আমার অনুভূতি কেমন। আমি মাইক্রোফোনে সাধারণ কিছু বলার চেষ্টা করেছি। একটি গ্রামে এমন আয়োজন দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম, সে-কারণেই আমি আসলে কিছুই বলতে পারিনি। সাধারণ দু-চার কথা বলে মঞ্চ থেকে নেমে আসি। এককথায় আমি, আমরা অভিভূত এ আয়োজনে।

নিখিল মজুমদার সংগীতের মধ্যে দিয়ে হোচলা গ্রাম আন্দোলিত করেছেন, তা স্বীকার করতেই হবে। সত্যি অসাধারণ আয়োজন। গুরুজি নিখিল মজুমদারের প্রশংসা করতেই হয়। তিনি দুঃসাধ্যকে সাধন করেছেন। গ্রামের ছেলেমেয়েদের গান, যন্ত্রে, উৎসবে নান্দনিক মানুষ হওয়ার দীক্ষা দিয়ে চলেছেন। কেউ না দেখলে তা বুঝতে পারবেন না। সারা গ্রামব্যাপী এর একটি প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে। তা-ই হোচলা গ্রামকে আমার মনে হয়েছে অনন্য এক আদর্শ গ্রাম। এসব শিক্ষার্থীদের নিয়েই বছরে একবার তার এ আয়োজন। খুলনা, বাগেরহাটসহ সারাদেশ থেকে শিল্পীরা সমবেত হন মুরলীর অনুষ্ঠানে। আগেই বলেছি গ্রামে এধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন খুবই সাহসের বিষয়। সাধারণ মানুষের সমর্থন অর্জন করে বিশাল অনুষ্ঠান, এর গ্রহণযোগ্যতা না থাকলে তা করা সম্ভব নয়। হোচলা প্রবেশ করেই বুঝলাম নিখিলের মতো নিখিল স্যারের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। যেখানে তিনি, তার মেধা ও শ্রম দিয়ে স্থান করে নিয়েছেন। তা-ই সবাই নিখিল স্যারকে শ্রদ্ধা করে ও ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখে। নিখিল মজুমদার এ হোচলা গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেছেন মুরলী, এবং লোকঐতিহ্য সংগ্রহশালা। আমরা আশা করতেই পারি এভাবে যে, হয়তো এক সময় এ সংগ্রহশালা লোকবাদ্যযন্ত্রের জাদুঘরে রূপ নিতে পারে। মনে হলো সেভাবেই তিনি এগিয়ে চলেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, খুলনা বেতারেও তিনি বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ করে গড়ে তুলেছেন চমৎকার একটি সংগ্রহশালা ও প্রদর্শনী কেন্দ্র। এরকম দেশের অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না।


আমরা যে গুরু-শিষ্য পরম্পরার কথা বলি, এর সাক্ষাৎ উদাহরণ হলেন ওস্তাদ ওসমান শেখ ও নিখিল মজুমদার।


83738766_1161969484172425_969048637495574528_n
সংগ্রহ ১
83275938_208740296954916_383216283732148224_n
সংগ্রহ ২
83084533_896589497410615_4260694436230463488_n
সংগ্রহ ৩
83405666_827959690987619_3027604704164052992_n
সংগ্রহ ৪

খুলনা শহরে তারই এক সুহৃদ ও লোকগানের প্রেমিক ডা. সৈয়দ মো. আল আমিন তাকে উৎসাহ দিয়েছেন এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়তে। তাঁকে আরও সহযোগিতা করেছেন এম এ কাইয়ুম। মূলত সৈয়দ আল আমিন খুলনা শহরে বাংলার বাউল প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসেন। সেখানেও বছরে অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। নিখিল স্যার বাংলা বাউল-এ শিক্ষার্থীদের গান ও যন্ত্র বাজনা শেখাচ্ছেন আর এখান থেকেই অনলাইনে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান দূরশিক্ষণের রীতিতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চলেছেন। প্রতি বৃহ্স্পতিবার তিনি গ্রামের বাড়ি চলে যান, সেখানে মুরলী লোকসংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রে সংগীত শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন।

হোচলা গ্রামে বাইরের জটিল শব্দ, টানাপোড়েন তেমন প্রবেশ করে না। যান্ত্রিক ডামাডোলের বাইরে নিভৃত এক পল্লিতে জন্ম নিখিল কৃষ্ণ মজুমদারের। আগেই জেনেছিলাম, বাল্যকৈশোরে প্রথাগত লেখাপড়ায় মন বসত না তার। তাহলে কী করা। এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ানো, খেলাধুলা, বা পাখি শিকার যার নেশা ছিল একসময়। এর বাইরে কখনও তিনি নদী খাল বিলে, বা নালা জলায় মাছ শিকার করতেন। আর ঘুরে বেড়াতেন ইচ্ছেমতো। ডানপিঠে স্বভাব ছিল তার। গ্রামের সবুজ প্রকৃতি আর লতাপাতার ফাঁকে কী যেন খুঁজে বেড়াতেন। আর কিছুটা রাখালি ধর্ম। যদিও তার বাবা ছিলেন একজন শিল্পী ও শিক্ষক। বাবা শিক্ষক আর ছেলে কিছুই হবে না, হচ্ছে না, তা তো হয় না। কী আর করা। ছেলে নিখিলের স্বভাব অবলোকনে কিছুটা হতাশই হয়েছিলেন শিক্ষক পিতা।

হোচলা গ্রামের সেই ডানপিঠে ছেলে এখন মহান শিল্পীতে রূপান্তরিত হয়েছেন। কীভাবে হলেন তিনি শিল্পী। নিছক খেয়ালের বশে নিখিল, এ নিখিলের একজন হয়ে উঠেছেন। এখন তার নাম ডাক সর্বত্র। এক নামে তাকে সবাই চিনে ও জানে। এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ানো আর সারাদিন চাঞ্চল্যে থাকা এ নিখিলের মধ্যে কী এক জাদু দেখেছিলেন গ্রামেরই এক স্বশিক্ষিত লোক ওসমান শেখ। এ ওসমানই তার দুরন্ত স্বভাবের ইতি টানলেন। তার চিত্তের শিল্পকে তিনি আবিষ্কার করেন। ওসমান শেখ বাঁশির সুর ধরিয়ে দিলেন নিখিলের আঙুলে। আমরা যে গুরু-শিষ্য পরম্পরার কথা বলি, এর সাক্ষাৎ উদাহরণ হলেন ওস্তাদ ওসমান শেখ ও নিখিল মজুমদার।

84521157_734831807040864_4393535464003338240_n
মুরলী মঞ্চে ওস্তাদ ওসমান শেখ ও গুরুজি নিখিলকৃষ্ণ মজুমদার

প্রসঙ্গত, সংগীত জীবনের শুরু হয়েছিল তার বাবার কাছে জাতীয় সংগীত তালিমের মধ্য দিয়ে। বর্তমানে বলা যায় তিনি সংগীতে ও বাদ্যযন্ত্রে স্বশিক্ষিত এক অনন্য ব্যক্তি। ১৯৯০ সাল থেকে তিনি বাংলাদেশ বেতার খুলনা কেন্দ্রে যন্ত্রসংগীত শিল্পী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। এ জমানার বৈদ্যুতিক যন্ত্রের চাপে দেশীয় বাদ্যযন্ত্র যাতে হারিয়ে না যায় এমন উদ্যোগই নিয়েছেন নিখিল মজুমদার। দেশীয় এসব উপাদান যাতে হারিয়ে না যায়, এজন্য তার এ প্রয়াস। যন্ত্রের অভাবে কারও শিক্ষা যাতে বন্ধ না হয়, সে জন্য তিনি নিজে বাদ্যযন্ত্র তৈরি ও বিতরণ করেন। হানিফ সংকেত পরিচালিত ‘ইত্যাদি’তে তার ওপর একটি প্রতিবেদন প্রচারিত হয় ২০১১ সালের ২৯ এপ্রিল। সে অনুষ্ঠানে তার এ কথাগুলো তিনি উচ্চারণ করেছিলেন।


বাঁশি যেন তাঁর জীবনের প্রেমের সখা। তিনি মনে করেন, প্রতিটি যন্ত্রেরই আলাদা সুর ও স্বর রয়েছে। 


এখন খুলনা শহরে গুরুজি বা স্যার বললে এক নামে তাকে চিনে ও জানে, তিনি নিখিলকৃষ্ণ মজুমদার। কেন এই গণ-স্যার? একটাই উত্তর—তিনি এ নতুন প্রজন্মকে শিল্প সংস্কৃতিতে বিনির্মাণ করছেন। তাদেরকে সুন্দর মনের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে তার অবিরাম প্রয়াস। খুলনা শহরে যারা অন্তত শিল্প সাহিত্য চর্চা করেন বা এ নতুন প্রজন্মকে শিল্পচর্চায় উৎসাহিত করতে চান, তারা তাদের সন্তানদের নিখিল স্যারের কাছে পাঠান গান বা যন্ত্র বাজানো শেখার জন্য। এ জন্য নিখিলকৃষ্ণ মজুমদার পরিচালনা করছেন বাংলার বাউল প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান। সেখানে অনেক শিক্ষার্থী লোকগান ও যন্ত্রসংগীতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে। সবাই শুধু গানের শিল্পী হচ্ছে না, নান্দনিক, ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টাও এখানে আছে। যেখানে নানা শ্রেণি, বয়স, পেশার শিক্ষার্থী রয়েছেন। তিনি জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত শুধুই চিন্তা করেন সংগীত। আমরা বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী নিখিল মজুমদারের কাছেই জানতে পারি—তিনি তানভীর মোকাম্মেল পরিচালিত চিত্রানদীর পারে, লালসালু, রাবেয়া, জীবনঢুলি চলচ্চিত্রের আবহসংগীতে বিশেষ ভূমিকা ও অবদান রেখেছেন।

নিখিল মজুমদার লোক-বাংলার প্রকৃতির উপাদান দিয়ে যেমন : নারকেলের শুকনো মালা,  গোলাকার শুকনো লাউ, মহিষের শিং, বাঁশ ও নিমগাছের কাঠ দিয়ে তৈরি করছেন বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র। দোতারা, খোল, ঢোল, ঢাক, কঙ্গ, মন্দিরা, ম্যান্ডোলিন সবই তিনি বাজাতে পারেন। তার মনের মতো বাঁশি বানাতে তিনি বাঁশ সংগ্রহ করেছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামে থেকে। এক্ষেত্রে তিনি লক্ষ করেন যে, বিভিন্ন ধরনের বাঁশি তৈরির জন্য উপযোগী বাঁশ প্রয়োজন। ওই বাঁশ ছাড়া চাহিদা অনুযায়ী বাঁশি তৈরি সম্ভব নয়। তিনি সেই বাঁশের চারা সংগ্রহ করে নিজ বাড়িতে ওই জাতীয় বাঁশের বাগান তৈরি করেছেন। যা থেকে এখন পছন্দ মতো বাঁশ বাছাই করে বাঁশি তৈরি ও চর্চা করে চলেছেন। বাঁশি যেন তাঁর জীবনের প্রেমের সখা। তিনি মনে করেন, প্রতিটি যন্ত্রেরই আলাদা সুর ও স্বর রয়েছে। বাঁশি বাজানো এঅর্থে জটিল একটি বিষয়, তাতে মানুষের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়েরই সুর ধ্বনিত হয়। তিনি বলেন, ‘আমি শেখাই ঠিকই, তার চেয়ে বেশি আমি শিখি প্রতিদিন।’ তিনি মনে করেন যে, চমৎকার পরিবেশনের জন্য পূর্বশর্ত হলো ভালো ও সুরেলা বাদ্যযন্ত্র।

বাঁশি বাজাতে বাজাতে এক সময় নিখিল মজুমদার বাঁশি বাজানো, শেখানো ও বাননো তিনটি কাজই একসাথে শুরু করেন। তিনি দেখেন যে, বাজারে যেসব বাঁশি পাওয়া যায়, সেগুলোতে সঠিক সুর আসে না। শেখানোর সাথে সকলশিক্ষার্থীকে তিনি নিজে বাঁশি তৈরি করে দেন। আমরা কথা বলতে বলতে তাঁর কাছে নানাজাতের বাঁশির নাম ও তৈরির নমুনা সম্পর্কে একটি সাধারণ ধারণা লাভ করি। বাঁশি ছাড়াও তিনি নিজে রপ্ত করেছেন দোতারা, ঢোল, খোল, তবলা, ব্যাঞ্জ, ম্যান্ডোলিন, মৃদঙ্গ, সারিন্দা, খমকসহ অনেক যন্ত্র। তার নিজের মনোবাসনা সম্পর্কে তিনি দৈনিক জনকণ্ঠের এক প্রতিনিধির সাথে সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি ১৯৮৫ সাল থেকে বাংলাদেশ বেতার খুলনার মিউজিশিয়ান হিসেবে কাজ করছি। বাঁশি, দোতারা, ম্যান্ডোলিন, খোমক, একতারা, কাঠি ঢোলসহ লোক-আঙ্গিকের বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র প্রাকটিস করি। আমরা বাজারে যে দেশি বাদ্যযন্ত্র পেতাম সেটা আমার কাছে ভালোমানের মনে হতো না। আমার পছন্দ হয় নি বলেই আজ থেকে ২৩ বছর আগে নিজেই তৈরি করা শুরু করেছিলাম। যখন দেখলাম দোতরার বাদক পাওয়া যাচ্ছে না, বা যারা বাজাচ্ছে তাদের অনেকে খুব খাটো চোখে দেখা হচ্ছে তখন আমার মনে হলো দেশের যন্ত্রকে নতুন রূপ দিয়ে বিশেষ করে এর সাউন্ড কোয়ালিটি যদি ভালো করি তাহলে অনেকেই আগ্রহী হবে। আমি সব দেশি যন্ত্র তৈরি করে বাজাই। আমি প্রথম তৈরি করি বাঁশি। এরপর দোতরা। পরে একতারা, খমক, প্রেমজুড়ি, সারিন্দা মোটামুটি আমার যা দরকার পড়ে সবই আমি নিজে তৈরি করি। যারা এটা শিখতে আগ্রহী তাদের শেখানোর পাশাপাশি তৈরি করাও শেখাচ্ছি। সুরের ভালো লাগা যদি পেতে হয় তাহলে আমাদের দেশি যন্ত্রের বিকল্প নেই। যারা দেশি যন্ত্র বাদ দিয়ে বিদেশি যন্ত্র বাজিয়েছে তাদের অনেকেই আমেরিকা কানাডা থেকে আমার কাছে এসেছে দোতরা নিতে। দেশি যন্ত্র বাদ দিয়ে আমরা বিদেশি যন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়ব এটার পক্ষে আমি না বিধায় আমার কাজ করছি, ফলও পেয়েছি। আমি মনে করি আমাদের লোকযন্ত্র হারাবে না।’

নিখিল মজুমদারের স্বপ্নই হলো জীবনের বাকি সময় তিনি খুলনাতেই কাটাতে ইচ্ছুক এবং এদেশের গ্রামীণ লোকশিল্প, সংগীত ও বাদ্যযন্ত্রের বিকাশে কাজ করে যাওয়া। এর আলোকেই তিনি আয়োজন করেন প্রতিবছর মুরলীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এবারে মুরলী লোকসংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রের নবম অনুষ্ঠান। এ অনুষ্ঠানের নাম দেওয়া হয়েছে গুরু-শিষ্য সুহৃদ মিলনমেলা। সত্যিকার অর্থেই এটি মিলনমেলা। নিখিল মজুমদার প্রতিবছর তার গুরুবৃন্দের এখানে আমন্ত্রণ জানান। একইসাথে দেশ-বিদেশের গুণী শিল্পীরাও এ মিলনমেলায় সমবেত হয়ে আনন্দে মেতে উঠেন প্রতিবছর। গানে, শ্রদ্ধায় অনন্য এক উৎসবে মিলিত হন সকলে। এ আয়োজনের মূল পরিকল্পনাকারীও খুলনার বিশিষ্ট ডাক্তার ও বাংলার বাউল লোকসংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ডা. সৈয়দ মো. আল আমিন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এম এ কাইয়ূম। সারা দিনব্যাপী এমন বিশাল আয়োজনের উদ্দেশ্য এবং সাংগঠনিক বিষয়ে নিখিল স্যারের কাছে জানতে চেয়েছিলাম। তিনি এর উত্তরে বলেছেন—গুরু শিষ্য পরম্পরা ও সুহৃদদের বাৎসরিক মিলন মেলার মাধ্যমে (ক) পরস্পর আন্তঃসম্প্রীতি বাড়ানো; (খ) হাজার বছরের লোকসংস্কৃতি ও লোকযন্ত্রের সাথে সকলের পরিচয় করানো (গ) লোকসংস্কৃতি বিকাশের অব্যাহত ধারায় সকলকে সচেতন ও সংযুক্ত করা (ঘ) যারা লোকবাদ্যযন্ত্রের প্রতি আগ্রহী তাদের শিখতে ও বানাতে সাহায্য করা; (ঙ) সমকালীন বৈশিষ্ট্যের সাথে লোকবাদ্য ও লোকসংগীত-এর অভিযোজন প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা; (চ) সর্বোপরি বাংলাদেশের লোক সংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশে অবদান রাখা। সংক্ষেপে এ হলো তার ও মুরলী লোকসংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রের উদ্দেশ্য ও কর্ম।

এজন্য মুরলীর মূল বাণী হলো : হৃৎ কমলের টানে/ মন চলো যাই উৎসের সন্ধানে।  মুরলীর এ বাণীকে ভাবনায় রেখে এবারেও এ চমৎকার মিলনমেলার আয়োজন আমাদের মুগ্ধ করেছে। মুরলীর যে উদ্দেশ্য, সেক্ষেত্রে মুরলীর গুরু ও কর্মীরা সফল  বলা যেতে পারে । লক্ষ করি, গ্রামের মধ্যে এত সুন্দর অনুষ্ঠান আয়োজনে যে সাংগঠনিক দক্ষতা প্রয়োজন সবই তাদের রয়েছে। কারও কাছ থেকে এ অনুষ্ঠানের জন্য সাহায্য বা আর্থিক সমর্থন নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের কল্যাণ কামনাই এ আয়োজনের শক্তি ও প্রাণ। নিখিল মজুমদার তার বাড়ির উঠানে একটি স্থায়ী মঞ্চ নির্মাণ করেছেন। সামনে খোলা মাঠ বা উঠানে দর্শকদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একইসাথে তার প্রতিষ্ঠানে নির্মিত বাদ্যযন্ত্রের প্রদর্শনী রেখেছেন। হয়তো অন্যবার করেছেন। যেগুলো নিখিল স্যারের নিজের হাতে তৈরি। তার বাড়িতেই তিনি গড়ে তুলেছেন লোকঐতিহ্য সংগ্রহশালা।

83868632_162255301743882_949493294914600960_n
প্রদর্শিত বাদ্যযন্ত্র

মুরলীর দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানের চারটি পর্ব ছিল : প্রথমত : শিশুকিশোরদের গানের আসর; দ্বিতীয়ত : গুরুবরণ; তৃতীয়ত : অতিথিদের অনুভূতি প্রকাশ; চতুর্থত : মূল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। এবারের আয়োজনে ভারত থেকে ৪ জন, চুয়াডাঙ্গা থেকে ৪ জন, চট্টগ্রাম থেকে ১ জন, ময়মনসিংহ থেকে ২ জন, নরসিংদী থেকে ২ জন, ঢাকা থেকে ৪ জন শিল্পী অংশগ্রহণ করেছেন। এ ছাড়া বাকি সবাই বাগেরহাট, খুলনা এবং মুরলী ও বাংলার বাউল-এর শিক্ষার্থী শিল্পী।

গুরুবরণ অংশটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। প্রতিবছরেই নিখিল মজুমদারের গুরুবৃন্দ, তার সতীর্থও শিষ্যরা পরস্পর প্রণাম জানিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এবারে উপস্থিত ছিলেন নিখিল মজুমদারের গুরু ওস্তাদ ওসমান শেখ ও শেখ আলী আহম্মেদ। উল্লেখ্য যে, হোচলা গ্রামের অধিবাসী সাধারণ এক কৃষক, ওস্তাদ ওসমান শেখের কাছেই বাল্যকালে নিখিল প্রথম বাঁশি শিখেছিলেন। গুরু-শিষ্যের উপস্থিতিতে প্রতিবছর অনুষ্ঠানের এ অংশটি খুবই আবেগময় হয়ে ওঠে। প্রত্যেকে প্রতি গুরুকে প্রণাম জানান ও আশীর্বাদ গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য যে, এবারে ৭৩ বছর বয়সী নিখিল মজুমদারের একশিষ্য এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে সবাইকে অবাক করে দেন। এ বয়সে তিনি নিখিল মজুমদারের কাছে নিয়মিত বাঁশির প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে চলেছেন।


আমার মাথা ও ভাবনার তন্ত্রীতে তা অনুরণিত হবে—সংগীতের জন্য এমন অনন্য পরিবেশ প্রাণ সঞ্চারে সচল থাকবে অনেকদিন।


মুরলীর এ আয়োজনে মূলত লোকসংগীত ও লোকবাদ্যযন্ত্রের প্রকাশ ও পরিবেশনা থাকে। কেউ কেউ ধ্রুপদী ও রাগসংগীতও পরিবেশন করে থাকেন। সবমিলিয়ে বিচিত্র পরিবেশনা সারাদিন ধরে রাখে দর্শক শ্রোতাকে। মাঝে মধ্যে কেউ ওঠে গেলেও আবার ফিরে আসেন প্রাণের টানে। এ যেন এক প্রাণের মেলা যা আমি আর কোথাও দেখি নি। এবারের আয়োজনে প্রতিষ্ঠিত শিল্পী গুরুপদ গুপ্ত, সঞ্জয় দাস, সুমন দাস, স্বপ্না দাস, নার্গিস নাসির, অজয় খান, তীর্থ ঘোষ, ফরিদ ও বিকাশ রায়সহ ৬০ জন কণ্ঠ ও যন্ত্রশিল্পী অংশগ্রহণ করেছেন। একটি গ্রামে এত শিল্পীর পরিবেশনা বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আয়োজনের বিস্তার নিয়ে আমরা ভাবতেই পারি। এছাড়া শিক্ষার্থীদের গান শুনে মনেই হয় নি তারা শিক্ষানবিশ। এর মধ্যে গণমানুষের শিল্পী গুরুপদ গুপ্ত, বাউল সুমন দাস ও স্বপ্না দাসের কথা উল্লেখ করতেই হয়।

84579481_155355255884911_4741601443327246336_n
বাউল সুমন দাস

শীতের তীব্রতায় রাতে একবার নিখিল মজুমদারকে চলে যাচ্ছি, বলতে চেয়েছি। কিন্তু তখনও বুঝি নি অনুষ্ঠানের মধুরতম অংশটি রয়েছে। তিনি বললেন আরও অল্প একটু সময় অপেক্ষা করুন শেষ হয়ে যাবে। শেষ পরিবেশনা ছিল শিল্পী গুরুপদ গুপ্তের। তার গান সরাসরি এই প্রথম কোনো মঞ্চে শুনলাম। যার কয়েকটি গান অনলাইনে, ইউটিউবে ভাইরাল হয় এবং কয়েক লাখ শ্রোতা সেগুলো শুনেছেন। গুরুপদ যখন গান শুরু করেন, তার নাম শুনেই সমগ্র সমাবেশ চিৎকার করে ওঠে। গুরুপদ গুপ্তের কণ্ঠস্বর শুনে দৌড়ে মঞ্চের কাছে আসতে থাকে মানুষ। মুহূর্তেই জমায়েত বিপুল আয়তনে রূপ নেয়। এসময় মনে হয়েছে চলে এলে এদৃশ্য না দেখাই রয়ে যেত। এ এক অভূতপূর্ব আনন্দময় পরিবেশ। চমৎকার এ আয়োজন সম্পন্ন হয় আবারও শিল্পী, গুরু শিষ্য প্রণামও আশীর্বাদ বিনিময়ের মধ্য দিয়ে। এ সমাপনী অন্য সমাপনীর মতো নয়। আমিও বিদায় নিতে যাই নিখিল স্যারের কাছে। ওই সময় সাক্ষাৎ হয় ওস্তাদ ওসমান শেখের সাথে। দুবছর আগে নিখিল স্যারের কাছে ওসমান শেখের গল্প শুনে তাকে দেখার ইচ্ছে হয়। আজ পেয়ে গেলাম তাকে। অসাধারণ এক স্বশিক্ষিত সাদামনের মানুষ। অনেক বয়স হয়েছে, কিন্তু সুঠাম তার দেহ, মনে জোর। এই রাতে তিনি একাই চলে এসেছেন। সকালেও ছিলেন, আবার সমাপনীতে এসেছেন। ওসমান শেখ মহোদয়কে আমি শ্রদ্ধা জানাই। অুনষ্ঠানের সমাপ্তিতে তার চোখজোড়া জলার্দ্র। আমি যখন বলি আমার সৌভাগ্য যে, আপনার মতো একজনকে এজীবনে দেখতে পেলাম। তখন তিনি আমাকে আশীর্বাদ করে বললেন—‘আমার বয়স ৮৪ বছর, আর তো আমি পারব না, আমি নিখিলকে রেখে যাচ্ছি, আপনারা তাকে দেখে রাখবেন।’ তার এ কথা শুনে আমিও আবেগাপ্লুত না হয়ে পারি না। শিষ্যের প্রতি কী ভালোবাসা এ গুরুর। আমি এমন দৃশ্য কোথাও দেখি নি। আমরা বেরিয়ে আসি প্যান্ডেল থেকে। আমি, ফরিদ, মনির ও বিকাশ ফিরছিলাম একসাথে। ফরিদ ও বিকাশ এ অনুষ্ঠানেরই শিল্পী। আসার সময় বাদ্যযন্ত্রী হিসেবে বিকাশ বলল—‘মাথার মধ্যে কয়েকদিন বাদ্যযন্ত্রের শব্দগুলো বাজতে থাকবে অনেকদিন। রাতে হয়তো ঘুমাতে পারব না।’ আমি বললাম—একেবারে ঠিক বলেছেন। তবে আমি বললাম—আমার মাথা ও ভাবনার তন্ত্রীতে তা অনুরণিত হবে—সংগীতের জন্য এমন অনন্য পরিবেশ প্রাণ সঞ্চারে সচল থাকবে অনেকদিন। প্রচণ্ড শীত ও কুয়াশার সুরে সংগীতের তীর্থ দর্শন করে ফিরে এলাম হোচলা গ্রাম থেকে। নিখিলের বন্ধন বিকশিত হচ্ছে মুক্ত নিখিলের সন্ধানে।

স্বপন নাথ

জন্ম ৪ মে ১৯৬৮; বড়লেখা, মৌলভীবাজার। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; এমফিল, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষকতা; উপপরিচালক (গবেষণা ও তথ্যায়ন), নায়েম, শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

প্রকাশিত বই :
প্রবন্ধ—
চিন্তা ও জগৎ : সাহিত্য সংস্কৃতি [প্রবাস প্রকাশনী, যুক্তরাজ্য ২০০৭]
কবিতার নন্দনবিশ্ব [অনিন্দ্য প্রকাশ, ঢাকা ২০১৭]
কথার বুনন [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]
ছিন্ন কথামালা [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

কবিতা—
রৌদ্র ও বৃষ্টিতে মায়াহরিণ [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০০৭]
জলৌকা চোখের চাতাল [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০১০]
নির্জন বিচালির ডানা [কবি প্রকাশনী, ঢাকা ২০১৩]
নখের আউঠা [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৪]
নানকার ধানবীজ [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৫]
একলব্যের ছিন্ন আঙুল [নাগরী, সিলেট ২০১৬]
সংশয়ের বসতি [নাগরী, সিলেট ২০১৭]
গ্রাম বজ্রযোগিনী [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

ই-মেইল : rudro71@gmail.com