হোম অনুবাদ সিলভিয়া প্ল্যাথ ও তার কবিতা

সিলভিয়া প্ল্যাথ ও তার কবিতা

সিলভিয়া প্ল্যাথ ও তার কবিতা
914
0

“I am too pure for you or anyone
Your body
Hurts me as the world hurts God. I am a lantern.”
                                                                 – Fever 103

শিখা…. এক চিরতরুণ শিখা….তেজদীপ্ত আলোক ফোঁটা। Sylvia plath তার একেকটি সৃষ্টি জুড়ে হয়ে উঠেছেন গ্রিক নাটকের সমান। Passion should be the key word for describing her creations and their creator. জগতের পুঙ্খানুপুঙ্খ নখদর্পণে থাকা সত্ত্বেও তিনি অস্বীকার করেছেন তার জীবনে বাহ্যিক জগতের হানাদারি।

”I am nobody, I have nothing to do with explosions.”—Tulips

ঘৃণা, ভালোবাসা, সৃষ্টি Plath-এর সবকিছুতেই রয়েছে প্রবল আবেগের দোলাচল। বাঁধাগত, সমাজ নির্দেশিত পথ Plath-এর জন্য নয়, তা বারবার ঘুরে ফিরে আসে তার লেখায়। তীব্র প্রেম এবং একই সঙ্গে জীবনের প্রতি, সামাজিক সম্পর্কের প্রতি ঘৃণা তার জীবন ও সৃষ্টিকে বিশেষিত করে। লেখনীতে চির তারুণ্য ও মৌলিকত্ব আকর্ষণ করে চিন্তাশীল মনকে। প্রতিটি ইন্দ্রিয়ের সজাগ উপস্থিতি কামনা করে Plath-এর সৃষ্টি। তিনি বহুবার চেয়েছেন অস্তিত্বের সকল তার ছিঁড়ে যাক; সুতো যেগুলো সমাজের সাথে তাকে যুক্ত করে সেগুলো বিনষ্ট হোক। তার উচ্চারণে কবিতায় রক্তফোঁটা ফুটে ওঠে। Milton-এর অসম্ভব উচ্চাকাঙ্ক্ষী, বিদ্রোহী Lucifer জেগে ওঠে পরতে পরতে। চির অস্থিরতার চোরা স্রোত বয়ে চলে প্রতিটি শব্দ আঁকিবুঁকিতে। শ্লেষ্মা ছিটানো গলায় Plath বলেন :

And I wear the wry-faced pucker
The sour lemon moon.

কবিতাগুলির জীবন্ত ধুকপুক হাতের মুঠোয় ধরা যায়। টিউলিপের চোখ ফোটে লেখনীর ছোঁয়ায়। ভেসে ওঠে হাসপাতাল ঘর, শীতলতা, ওষুধের গন্ধ—কেবলমাত্র শব্দের গঠনে। খুব সহজেই শরীরের দখল ছেড়ে দেওয়ার মধ্যে এক গভীর প্রতিবাদ লুকিয়ে থাকে। অভিমান কিভাবে বিশ্বজনীনতা ছুঁতে পারে Plath না পড়লে বোঝা যায় না। নিজেকে জগৎ স্রষ্টার সাথে তুলনা করার দাপট তিনি দেখিয়েছেন—

I shut my eyes and the world drops dead.

গতানুগতিকতার বেড়ি মনে ও পায়ে তিনি কখনোই পরতে চান নি। অসম্ভব তেজিয়াল এক প্রেমিক সত্তা সমাজের মুখোশ, কৃত্রিম মানব সম্পর্কের জাল ছিঁড়তে চায় বারংবার। তার যন্ত্রণা তৎকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক পটভূমির সাথে হাত মিলিয়ে জন্মায়—

“The Times are Tidy :
Unlucky the hero-born
In this province of the stuck record
Where the most watchful cooks go jobless”

বাবার কথা, বাবার ছবি Plath-এর লেখায় হেঁটে বেড়ায় অবাধ এবং তা কখনো কখনো স্বৈরাচারীত্বের দ্যোতক। চরম এক ঘৃণার প্রকাশ ঘটলেও সে প্রকাশ Plath-এর বাবার প্রতি আকর্ষণ, ভালোবাসার অনুভূতিকে আড়াল করতে পারে না। তার অনুভূতির প্রতিটি তার জীবনবীণা থেকে বেজে ওঠে। সৃষ্টিশীল এক আত্মা পার্থিব খাঁচার ভিতর দিনের পর দিন ছটফটিয়ে মরেছে কবিতাগুলি চিৎকার করে তা জানান দেয়। এমন এক মানুষের কেটে যাওয়া দাবিগুলি মুছে দিয়ে নতুনভাবে নিজের মতো কিছু আঁকার ধৃষ্টতা দেখান তার স্বামী Ted Hughes, আরেক খ্যাতনামা কবি। তার এ কাজ দুঃখ দেয়।

Plath-এর মধ্যে এক তীব্র ইচ্ছার প্রকাশ ঘটে তার প্রেমিক ও প্রেমকে নিজের আদলে ভেঙেচুরে গড়ে নেবার। তার বেছে নেওয়া প্রতিটি শব্দ মূর্ত ছবি হয়ে ওঠে। অদ্ভুত অনুভব ও কল্পনার জাদুতে নার্সেরা হয়ে ওঠে সফেদ গাঙচিল। একাধিকবার আত্মহননের চেষ্টা তাকে হাসপাতালের বিছানায় শুইয়েছে, তা সত্ত্বেও বিদ্রোহী Plath অদম্য তার সকল সৃষ্টি ও উপলব্ধিতে। নিজেকে কখনো অসহায়, জলের হাতে নুড়ি বলে, কখনো-বা ব্যঙ্গ ছুঁড়ে দেওয়া প্রচণ্ড টক মাঘীকুল, পাতিলেবু চাঁদের সাথে তুলনা করেছেন।

”টিউলিপ”-এ শব্দের ক্ষমতায় কবিতা সত্যিই যেন দেওয়াল বেয়ে চলা সরীসৃপ। ফুলগুলোর জীবন্ত শ্বাসপ্রশ্বাস তার রোগী মনকে আরো অস্থির করে তোলে। Plath-এর মধ্যে এক অদ্ভুত প্রকৃতিপ্রেম খুঁজে পাওয়া যায়, যা ঠিক রোমান্টিক কবিদের মতো না হলেও কবির বুকের অসহায়ত্ব ও আশ্রয় পাবার গভীর আকুতি ধ্বনিত করে। ‘The Moon and the Yew tree’ এই সত্য তুলে ধরেছে।

অনির্বচনীয় সন্তান স্নেহ মেলে ধরেছে Plath-এর মধ্যেকার এক মাকে :

“I want to fill it with color ducks,”

আয়নার আলোতে এগিয়ে আসে আরেক মায়ের প্রতিবিম্ব যার প্রতি একাধারে নির্ভরতা আরেক দিকে বিদ্বেষ, ঘৃণা লক্ষণীয়। Mirror—”I am important to her. She comes and goes,/ Each morning it is her face that replaces the darkness,/ In me she has drowned a young girl and in me old woman”.

Plath-এর মৃত্যু চেতনা ঠিক জীবনানন্দ দাশের মৃত্যু চেতনার মতো নয়। মৃত্যুকে জীবনানন্দ প্রেয়সী হিশাবে দেখতে চেয়েছেন Plath-এর ক্ষেত্রে মৃত্যু সর্বরোগহরা ওষুধমাত্র।

”Brilliant college girl disappears.”

খবরের কাগজে বেরনো এই হেডলাইন ছিল Sylvia plath-কে নিয়ে যিনি জীবনের প্রতি বহুবার মায়া ত্যাগ করে চলে যেতে চেয়েছেন। অসম্ভব প্রতিভাবান তারুণ্যে ভরপুর এই কবি ও ছোটগল্পকারের জন্ম হয় 27 October, 1932 সালে Boston, Massachusetts-এ। তার লেখাগুলো থেকে অনিবার্যভাবেই মৃত্যুচেতনা ঝরে পড়ে। বাবা ছিলেন অধ্যাপক Otto Plath. আটবছর বয়সে Sylvia plath বাবাকে হারান এবং এই গভীর মানসিক আঘাত তার লেখায় ফুটে ওঠে; ‘Daddy’ কবিতায়। তিনি বাবার মতোই মানুষ খুঁজতে চেষ্টা করেন। Ted Hughes আসেন তার জীবনে। মনোবিজ্ঞানীরা তার কবিতা বিশ্লেষণ করে দেখান যে Plath Electra complex-এ ভুগছিলেন। বাবার প্রতি অদ্ভুত এক ভালোবাসা ও ঘৃণা মিশ্রিত অনুভূতি ফুটে উঠেছে ‘Daddy’ কবিতায়। Otto Plath এবং Ted Hughes দুজনেই স্বৈরাচারী তার চোখে। একজন তাকে অকালে ছেড়ে চলে গেছেন; আরেকজন অন্য নারীর আকর্ষণে দুই শিশু পুত্র কন্যা-সহ পরিত্যাগ করেছেন। বাঁচতে না পারা জীবন তিনি বাঁচাতে চেয়েছেন কাগজের পাতায়। আবার বাঁচা জীবনের কষ্ট বেরিয়ে এসেছে লেখনীতে। মার উপর অত্যন্ত নির্ভরশীলতা সত্ত্বেও বাবার প্রতি তার সম্পর্কের জটিলতা কখনো কখনো তাকে মায়ের প্রতি বিদ্বেষী করে তুলেছে, যা ফুটে উঠেছে তার লেখায়। জীবন তাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে মৃত্যুর মুখে। সন্তানদের জন্য দুধের গ্লাস রেখে মমতাময়ী মা শেষ করে দিয়েছেন প্রতিভাধর মানুষটিকে। Ted Hughes নির্লজ্জভাবে Plath-এর কবিতা নিয়ে কাটা ছেঁড়া করেছেন বলে সমালোচকরা বলে থাকেন। Plath তার লেখনীতে হয়ে উঠেছেন Confessional poem-এর জনক যার অকাল ঘুম সাহিত্য জগৎকে আরো সমৃদ্ধ হওয়া থেকে অনেকখানি বঞ্চিত করেছে।


কয়েকটি কবিতা


Child/ শিশু


জীবন ও পৃথিবীর সেরা দেখা সুন্দর
তোমার কাজল চোখ
ওতে আমি যা কিছু রঙিন গুলে দেবো
চিড়িয়াখানায় আসা নতুন আকর্ষণ
কার নাম জপো জানা নেই
তুষারের কল্পনা—পেলব, কচি বাঁশের ডগা
তোমার জন্য মনের মোচড় নয়
ঘন আঁধার ছাদে তারা এঁকে দেবো রোজ।


Sheep in Fog/ কুয়াশা পশম


সফেদ গভীরে পাহাড় নেমেছে ঘাটে
মানুষ হোক বা তারার দল
দুঃখ ছাপতে চায় আমার শরীরে
আমি কিন্তু হারিয়ে দিলাম ওদের
না আমি কোনো অসহায় কেউ নই
রেলগাড়িগুলি রসিক তালে ফোঁসে
ঐ যে বাদামি রং ঘোড়ার গায়ে দৌড়ায়
টকটক টুংটাং ঘণ্টা
সকালটা অকাল বুড়িয়ে যায়
ঐ টুপটাপ ফুল ঝরে গেল
হাড় জুড়ে মরণের শান্তি
অদূরে মাঠগুলো প্রেমিক
ওরা বলে স্বর্গের ঠিকানা দেবে
তারাহীন অনাথ কালো জল দেবে এঁকে।


Contusion/ কালশিটে


রঙের বন্যা একচেটিয়া পৌঁছে গেছে ঠিকানায়
শরীরের বাকি অংশ ধুয়ে সাফ
এখন শুভ্র মুক্ত পড়ে আছে
পাথুরে খনির ছিদ্র বেয়ে সমুদ্র পান মত্ত
বিন্দুর মতো মাছি যেন ধ্বংস দ্যোতক
দেওয়াল বেয়ে নেমে আসছে
গোটা সভ্যতার দিকে
ভীতু মন দরজা ঘরে দিচ্ছে
সমুদ্র পিছু হটছে আবারও
আয়নাগুলো লুকাচ্ছে মুখ।


The Times are Tidy/ গোছানো পরিপাটি সময়


সময়টা পচা ডোবার মতো
এ সময়টা নায়কোচিত নয়
যেখানে ভালো রাধুনিরাই কাজ ছাড়া
তাবড় নেতার চামচেরা বেকার
গিরগিটির সাথে টক্কর দেওয়া বৃথা
বর্ণচোরা নিজেই শুকিয়ে গেছে
কাজ না থাকলে যা হয়
ইতিহাসের হাতে বিপদও বিপন্ন
ডাইনি পোড়ানো শেষ
তাও বহু বছর হলো
সহমরণে প্রেম, ওষধি, প্রিয় বেড়াল
তবে শিশু বলি দিলে
সম্পদ উপচে পড়ত আরো।


Jilted/ হতাশ প্রেম


হলদে হয়ে গেছে ঝগড়ুটে চিন্তারা
চোখ জুড়ে অম্ল জল
তিতকুটে চাহনির টোকো তারা এক
আজ রাত ছুঁচ বেঁধা বাতাস, প্রেম, পরনিন্দার মিশেল
সুযোগ ছাড়ি নি আমিও
পরনে ব্যঙ্গের ছড়াছড়ি
পাতিলেবু চাঁদ আমি এক
মাঘীকুলের মতো রসালো,
স্ফীত, ছোট, টাটকা
কিন্তু মুখে দিলে বড্ড
ইন্দ্রিয় জেগে যায়
এ সকলই বাইরের খেলা
ভিতরের গাছটা শুকনো, ক্ষীণ
আজন্ম কাঁচা।


Monologue at 3 am/ রাতপ্রহরে আত্মগান


বরং অস্তিত্বের সব তার ছিঁড়ে যাক
আহ, মাথার ভেতর কী কষ্ট
রক্ত রক্ত শুধু রক্ত
ছিটকে পড়েছে
এ কী মেঝে, বিছানা সব জেগে উঠছে
বেয়ে আসছে সাপের মতো
কে বাঁচাবে বলো, কে?
তুমি ত নেই;
বহু যোজন মাঝখানে শুয়ে
কুণ্ডলী পাকানো অস্তিত্বের একদিকে আমি অন্যদিকে তুমি
তুমি বেশ আছো সতেজতায়
আর আমি এখানে নীরব
অথচ তারার টান বুকে চেপে
মূর্তি, শোক, কালো সময়ের অভিশাপ, বিদায় সম্ভাষণ, বিদায়ী রেলগাড়ির স্মৃতি জড়িয়ে ধরে
আমার জগৎ মুখের উপর
দরজা বন্ধ করেছে
আমি তোমাকে ক্ষমা করেছি
আবারও।

পিয়ালী জানা

জন্ম ৭ জুন, ১৯৮৮; হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। পেশায় শিক্ষক এই কবি ভালোবেসে অনুবাদের কাজ করেন।

প্রকাশিত গ্রন্থ—
অর্ধেক আকাশ আমি : নারী কবিতার অন্যভুবন [কবিতা, অনুবাদ, ২০১৮]

ই-মেইল : femalepoets2@gmail.com

Latest posts by পিয়ালী জানা (see all)