হোম অনুবাদ রাহাত ইন্দোরির কবিতা

রাহাত ইন্দোরির কবিতা

রাহাত ইন্দোরির কবিতা
0

ভারতের মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে ১৯৫০ সালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার নাম রাখা হয় রাহাত কোরেশি। তবে তিনি এখন রাহাত ইন্দোরি নামেই পরিচিত। তার পিতা রাহাতুল্লাহ কোরেশি বস্ত্র কারখানার শ্রমিক ছিলেন। উর্দু সাহিত্যে এমএ পাশ করার পর একই বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। তার থিসিসের বিষয় ছিল উর্দু মুশায়েরা তথা কবিতাপাঠ সভা। কবিতা আদিতে মৌখিকভাবে উপস্থাপনেরই বিষয় ছিল। মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের পর হতে ক্রমে কবিতা শোনার বিষয় হতে পড়বার বিষয়ে রূপান্তরিত হয়। যদিও সব ভাষাতেই এখনও মাঝে মাঝে কবিদের কবিতাপাঠের আয়োজন হয় এবং আবৃত্তি শিল্প নামে কবিতাভিত্তিক একপ্রকার উপস্থাপনাও আছে তবু উর্দু ভাষাতেই এখনও মুশায়েরা নামে একরকম কবিতাপাঠের জলজ্যান্ত ধারা বিদ্যমান রয়েছে। এতে কবির পাঠের সাথে শ্রোতাদের সাড়া দেবার যে রেওয়াজ তাতে কবিতা অত্যন্ত জীবন্ত ও পারস্পরিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

মুশায়েরা রাহাত ইন্দোরের শুধু প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার বিষয় নয়, বরং এটি তার একটি প্রধান কর্মক্ষেত্র। বিগত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন মুশায়েরা ও কবি সম্মেলনে তিনি কবিতা পড়ে আসছেন। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় যেমন তিনি গেছেন তেমনি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, সিঙ্গাপুর, পাকিস্তান, নেপাল, বাহরাইন ইত্যাদি বহু দেশে কবিতা পড়তে গেছেন তিনি। সম্ভবত বাংলাদেশেও কোনো অনুষ্ঠানে এসেছেন তিনি কবিতা পড়তে।

সাম্প্রতিক কালে তার একটি কবিতা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ‘বুলাতি হ্যায় মাগার জানে কা নাহি’ [সে তোমাকে ডাকছে, কিন্তু যাওয়ার দরকার নাই] এই পঙ্‌ক্তিটি টিকটক, ফেসবুক, টুইটার ও ইনস্টাগ্রামে এ বছর [২০২০] ভ্যালেন্টাইন সপ্তাহে বিপুলভাবে ছড়িয়ে পড়ে। লোকজন এই পঙ্‌ক্তিটিকে মিম [meme] হিসাবে ব্যবহার করতে থাকে। ফেসবুক বা ইউটিউবে Bulati Hai Magar Jaane Ka Nahi লিখে সার্চ দিলে বিস্তর জিনিসপত্র দেখা যাবে। এবং ইউটিউবে রাহাত ইন্দোরের মুশায়েরার বেশ কিছু ভিডিও আছে। উপভোগ্য সেই ভিডিওগুলো দেখা যেতে পারে।

রাহাত ইন্দোরের কবিতা আমি আগে পড়ি নাই এমনকি তার নামও শুনি নাই। অতি সম্প্রতি তার কিছু কবিতা সন্ধান করে পেয়ে পড়ে ভারি অবাক লাগল। বেশ ভিন্ন রকম স্বাদ তার কবিতার বিষয়ে ও উপস্থাপনায়। কবি এখনও জীবিত আছেন। তাকে সালাম জানাই।


১.
যদি তারা বিরুদ্ধে থাকে—থাকুক, জীবনের তো এখানেই শেষ নয়;
এগুলো সব ধোঁয়া, আকাশ নয়—এই রাতে।

যদি আগুন জ্বলে তবে অন্য বাড়িঘরও পুড়বে,
এই গৃহগুলো সব আমার নয়।

আমি জানি যে শত্রুরা কম নয়, কিন্তু
তারা আমার মতো সহজভাবে জীবনকে ধারণ করে না।

আমাদের মুখ থেকে যা বের হয় তাদের সত্যের শক্তি রয়েছে,
আমার মুখের জিহ্বা তো তোমার নয়।

আজকে যারা তখতে রয়েছে কাল তারা এখানে থাকবে না,
তারা ভাড়াটে মাত্র, এটা তাদের ঐশী অধিকার নয়।

সবার রক্ত মিশেছে এখানে এই মৃত্তিকায়,
হিন্দুস্থান তোমার বা আমার বাপের নয়।

২.
ভিতরে চুমু খেয়েছে বিষ আর বের হয়ে এসেছে পরিচ্ছন্ন হয়ে,
ওইসব অভিজাত লোকেরা বেরিয়ে এল তাদের ডেরা হতে।

সূর্যের সাথে যুদ্ধ করে জিততে চেয়েছে ওই বোকার দল,
মোমের সৈনিকেরা বেরিয়ে এসেছে—গলে আর বেঁকে গিয়ে।

মসজিদে আজ অন্য কেউ ছিল না,
আমি ফিরে এসেছি নিজের সাথে একাই সম্মিলিত হয়ে।

জীবনভর ঘুমের সাথে যুদ্ধ করে যাব আমি,
আমার চোখের স্বপ্নগুলো যদি খাঁটি হয়ে যায়।

সূর্যও তার মুখখানা প্রথমবারের মতো দেখল,
আয়নাও প্রতিচ্ছবি উপভোগ করেছে।

অচেনা ছায়ারা আজকাল এখানে মস্করা
করে যায়,
কাবুলের আবহাওয়ায় এখন আমাদের বসবাস।

৩.
যদি মসীহ যন্ত্রণার সমর্থনে থাকেন, তবে কী ঘটবে?

যদি সহিষ্ণুতার ঐতিহ্য ঠান্ডায় জমে যায়, তবে কী ঘটবে?

এই যে লক্ষ-কোটি জনে দিনে পাঁচবার প্রার্থনা করে,
যদি তারা সত্যিই সন্ত্রাসের ফেরিওয়ালা হয়ে পড়ে, তবে কী ঘটবে?

৪.
জাঁকাল একটি নতুন বৃত্ত রচনার চেষ্টায়
প্রদীপেরা ব্যস্ত হয়ে বাতাসকে বিস্ময়ে ভরিয়ে তুলছে।

ব্যক্তিটি আমার দৃষ্টিতে এমনকি একজন মানুষও নয়,
পৃথিবী যাকে ঈশ্বর বানিয়ে তুলতে চাইছে—ওই শয়তানটা।

ওদের নিয়ে মাথা ঘামিও না, খোদার দোহাই;
রোগীরা ওষুধ তৈরিতে ব্যস্ত আছে।

যারা আমাকে জীবনভর ভবঘুরেমির জন্য পাঠিয়েছে,
তারাই আমার সমাধিসৌধ তৈরি করছে, তার নিচে আমাকে কবর দেবার জন্য।

আর তারা, যারা দাবি করেছে যে সূর্য তৈরি করে ফেলবে,
তারা আলাদা আলাদা প্রদীপ ধার করে এনে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।

এইসব নির্বাচিত লোকজন, যারা পালের সেরা,
তারা আমাকে শয়তান বানিয়েছে, আমিই তাদের নষ্টের মূল।

৫.
এটিকে তোমার মালপত্র ভাবো, এই জোনাকিগুলো নাও;
তোমার পথ হবে আঁধারে ছাওয়া, আমার অশ্রু ও কান্নাগুলো নাও।

সোনায় গড়া দাঁড়িপাল্লা তোমার দিকে রাখো,
এবং চাইলে এমনকি তোমার মিথ্যাগুলোকেও বেচতে পারো।

এটা শরীর নয় যাকে ছোঁয়া যায়, এর একটি নাম দাও,
একে খুশবু বলো, সুরভি বলো, ইথারিত কর।

অদেখা উচ্চতায় তোমাকে ভ্রমণ করতে হবে,
নিরাপদে থাকো; আমার হাত দুটোকে নাও তোমার কাজে লাগাতে।

আমি চাই না আমাদের আঙিনায় কোনো দেয়াল থাকুক,
ভাই আমার, আমার অংশটুকু রেখো, ভাগ করো না।

৬.
চোখে রেখো জল আর স্ফুলিঙ্গ ঠোঁটে,
জীবিত থাকতে হলে সতর্ক থেকো, নানা পদক্ষেপ নাও, নানা পরামর্শ।

তোমার পথের পাথরের চেয়ে যোগ্য লক্ষ্য আর কিছু নাই,
পথ ডাকছে, যাত্রা চলমান রেখো, ভ্রমণে মন লাগিও।

দুইটি কূলই একই নদীর, ওগো বন্ধুরা,
জীবনকে বন্ধু বানাও, মৃত্যুকে রাখো পিছনে।

সময় যাচ্ছে চলে, আমাদের কানে ফিসফিস করছে সে,
সংঘাতের সময় আসছে, হাতের মুঠো ঠিকঠাক রাখো।

চোখ তার গোপনীয়তা রক্ষা করুক এটাই দরকার, প্রতারিত হও,
ঘুমাও কিংবা নিদ্রাহীনতায় থাকো, স্বপ্নই বড়।

এই বাতাসের তোড়ে আমার কাগজের ফ্রেম উড়ে যেতে পারে,
কমরেডগণ, তোমাদের ওজন রেখো আমার পাতলা জিনিসের উপর।

রাহাত বাজার থেকে কবিতার সাথে রিলিফ এনেছে,
শব্দশৈলী রাস্তার হতে হবে, পরিহাস করে আমি বলি।

৭.
সূর্য, তারা ও চাঁদকে একটু দূরত্বে ধরে রেখেছিলাম আমি,
যতক্ষণ না তোমার হাত আমাকে স্পর্শ করেছিল।
আমি তো একটা পালক নই যে সহজেই আলাদা হয়ে যাব,
হারিকেন ও টর্নেডোকে বলো তাদের সীমা বুঝে দেখুক।

৮.
অর্জনগুলো আবছা হয়ে যেতে পারে, কিন্তু নাম থাকতে পারে জোরাল;
দেয়ালগুলো বেঁকে যেতে পারে কিন্তু ছাদটা থেকে যায়;
মৃতদেহের স্তূপের উপর একটি শিশু একা দাঁড়িয়ে আছে
আর ঘোষণা করছে যে তার পরিবার এখনও বেঁচে আছে।

৯.
দ্বিপদীগুচ্ছ—

কারো প্রেমে পড়বার আগে
বরং সবার সাথে পরখ করে দেখ,
এমনকি শত্রুদেরও।


চোখে একরকম, মনে একরকম, ঠোঁটে অন্য আর একরকম
যদি এভাবেই কথা বলো তো অন্য কারো সাথে বলো।


তারাগুলো প্রতিদিন দেখানেপনা করে,
পাগল চাঁদ অন্ধকারে ঝলমল করে।


আমি সেই নদী যার প্রতিটি ফোঁটাই ঘূর্ণিময়,
আমার তীর হতে পালিয়ে গিয়ে তুমি ঠিকই করেছ।


তোমার ওয়াদা, তোমার ভালোবাসার দরকার নাই,
গল্পটির কোনো চরিত্র দরকার নাই।


সে আমার বন্ধু আর আমার মতো করেই কথা বলে,
লোকটা শুধু ভালোই না, খারাপও।


যার আমি উপাসনা করি তার থেকে আমি মুক্ত,
আমার দৃষ্টিতে সে পাথরও ভগবানও।


তোমাকে কি বলে দেবো কত গোপন বিষয় আছে আমার?
বহু যুগ গোপন রেখেছি, খুলে দেবো কি সব তোমার কাছে?


সমুদ্র এত বিশাল আর গভীর, (তবে)
আমার পিপাসা মেটাতে এলে বেশিক্ষণ টিকবে না সে।


লোকে কেন ভয় পায় প্রত্যেক পদে?
ভয়ই যদি পায় তো ঘর হতে বের হয় কেন?


প্রশ্নকর্তাদের এই বলে নিজের পরিচয় জানাই :
একমুঠো ধুলো তুলে নিন, তারপর ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিন…


তোমার শরীরের সংখ্যাগুলো টানা-হাতে-লেখা,
কিভাবে পড়ব? বইটা আমার হাতে দাও।


গুজব শুনলাম, আমার শরীর খারাপ; তবুও তখনও
যারা আমাকে অসুস্থ বানিয়েছিল তাদের স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নিচ্ছিলাম।


সে ডাকে তোমায়, থাক দরকার নাই;
দুনিয়া দেখছে : প্রেম দরকার নাই।