হোম অনুবাদ মেরিলিন মনরোর জন্য মোনাজাত

মেরিলিন মনরোর জন্য মোনাজাত

মেরিলিন মনরোর জন্য মোনাজাত
354
0

অনুবাদকের নোট :

১ মার্চ ২০২০-এ চলে গেলেন এর্নেস্তো কার্দেনাল [১৯২৬-২০২০], শেষবারের মতো জাগুয়ারের হাসি হেসে, ৯৪ বছর বয়সী এক কবি-বিপ্লবী-যাজক। হাজার বছর ধরে চার্চ ছিল শাসকদের হাতিয়ার, হাইপেশিয়া থেকে ব্রুনো, অসংখ্য মানুষের রক্তে রঞ্জিত ছিল পুরোহিতদের হাত। কার্দেনালরা শেষ পর্যন্ত সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করেছেন, ঈশ্বরকে টেনে এনেছেন শাসিতের ঘরে, ধর্মকে যুক্ত করেছেন মজলুমের মুক্তিসংগ্রামে। এই বিখ্যাত কবিতাটি কার্দেনাল লিখেছিলেন ১৯৬৫তে, টাইমস পত্রিকা থেকে মেরিলিনের মৃত্যু সংবাদ জেনে, এটা মেরিলিনের জন্য তার মোনাজাত। মূল কবিতাটি স্প্যানিশে। আন্দ্রেস রোজাস স্প্যানিশ থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। আর আমি ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করলাম, তবে অনুবাদের ক্ষেত্রে, মূল ভাব অক্ষুণ্ণ রেখে স্বাধীনতা নেয়া হয়েছে।


খোদা
তুমি এই অল্পবয়সী মেয়েটিকে গ্রহণ করো
দুনিয়াতে সবাই যাকে মেরিলিন মনরো হিসেবে জানত
[কিন্তু তুমি তার আসল নাম জানো : নবছর বয়সে ধর্ষিত হওয়া অনাথ বালিকা,
ষোল বছর বয়সে যেই দোকানিমেয়েটা আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল]
যে এখন তোমার সামনে নিজেকে উপস্থাপন করছে
কোনো মেকআপ ছাড়া, কোনো প্রেস এজেন্ট ছাড়া
কোনো আলোকচিত্রী বা অটোগ্রাফ সাক্ষর করা ছাড়া,
একা, যেন শূন্যতার সম্মুখীন হচ্ছে এক মহাকাশচারী।
বালিকা হিসেবে, সে নিজেকে নগ্ন দেখতে পেয়েছিল
চার্চে [এমনটাই জানিয়েছে টাইমস পত্রিকা]
যেখানে বহু মানুষ মেঝেতে মাথা ঠেকিয়ে ছিল,
আর সে পা টিপে টিপে হাঁটছিল,
যেন তাদের মাথায়
তার পা লেগে না যায়।
এসব খোয়াবের মানে
তুমি অই মনোচিকিৎসকদের চেয়ে ভালো জানো।
চার্চ, গৃহ, গুহায় মায়ের আদর পাওয়া যায়
কিন্তু আরও অনেককিছুই…

মাথাগুলো তার অনুরাগীদের, এটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে
[আলোর ফোয়ারার নিচের অন্ধকারে অনেকগুলো মাথা]।
কিন্তু প্রার্থনালয়টা টুয়েনটিথ সেঞ্চুরি-ফক্স স্টুডিও ছিল না।
প্রার্থনালয়টা—মার্বেলপাথর ও সোনায় গড়া—তার শরীরের প্রার্থনালয়
যেখানে ঈশ্বরের ছেলে, একটা চাবুক হাতে নিয়ে,
টুয়েনটিথ সেঞ্চুরি-ফক্সের বণিকদের বিতাড়িত করে
যারা তোমার প্রার্থনালয়কে পরিণত করেছে চোরদের গুহায়।

খোদা
এই দুনিয়াটা পাপ আর রেডিয়েশনে কলঙ্কিত হয়েছে,
তুমি শুধু দোকানিমেয়েটাকে দোষ দিতে পারো না
যে, আর সব দোকানিমেয়ের মতোই, তারকা হতে চেয়েছিল।
আর তার খোয়াবটা সত্যি ছিল [কিন্তু টেকনিকালারও তো সত্য]।
সে শুধু সেই স্ক্রিপ্ট ধরে অভিনয় করে গেছে,
যা খোদ আমাদের জীবনের, একটা অদ্ভুত স্ক্রিপ্ট।
ওকে ক্ষমা কোরো, খোদা, আর আমাদেরকেও
আমাদের বিশশতকের জন্য
সেইসব সুপারহিট সিনেমার জন্য
যার পেছনে ছিল আমাদের সকলের শ্রম।
মেয়েটা ভালোবাসা চেয়েছিল, আমরা ঘুমের অষুধ দিয়েছিলাম।
আমাদেরকে ক্ষমা করো সেই বিষণ্ণ সত্যটার জন্য—
যখন আমরা কেউই পবিত্র নই, তখন শুধু ওকেই দেয়া হয়েছিল
মনোবিশ্লেষকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ।
মনে রেখো খোদা,
ক্যামেরার ওর মধ্যে ক্রমেই বিতৃষ্ণা জাগাচ্ছিল
মেকআপকে ঘৃণা করতে শুরু করেছিল সে
ঘৃণা করতে শুরু করেছিল
প্রতিটি দৃশ্যের জন্য নতুন করে সাজতে
এবং সে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছিল
এবং সে স্টুডিওতে দেরি করে আসছিল।

অইসব দোকানিমেয়ের মতোই
সে তারকা হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল।
আর তার জীবনটা ছিল অবাস্তব, একটা স্বপ্ন
একজন মনোচিকিৎসক যা ব্যাখ্যা করে, সংরক্ষণ করে।

তার রোমান্স ছিল দুচোখ বুজে চুমু খাওয়া
তারপর চোখ খুলে আবিষ্কার করা
যে স্পটলাইট চালু আছে,
আর তারপরই সবকিছু অন্ধকার!
আর তারা ঘরের দেয়াল দুটো খুলে নিচ্ছে
[এটা একটা মুভি সেট ছিল]
যেহেতু নির্দেশক নোটবুক হাতে চলে গেছে
কারণ দৃশ্যটা ধারণ করা হয়ে গেছে।
অথবা একটা ইয়টযাত্রা
সিঙ্গাপুরে একটা চুম্বন দৃশ্য
রিওতে একটা নাচের দৃশ্য
উইন্ডসর ম্যানশনে ডিউক আর ডাচেসের অভ্যর্থনা
যা দেখা হচ্ছে একটা শোচনীয় অ্যাপার্টমেন্টের ছোট্ট একটি কক্ষে।
শেষ একটা চুমুর মাধ্যমে সিনেমাটা শেষ হলো।
তার মৃতদেহটা পড়ে ছিল বিছানায়, হাতটা পড়ে ছিল ফোনের ওপর।
আর গোয়েন্দারা জানত না সে কাকে কল করছিল।
ব্যাপারটা ছিল এরকম—
কেউ একজন তার জানা একমাত্র বন্ধুত্বপূর্ণ কণ্ঠটা শুনতে
ডায়াল ঘোরাল, আর শুনতে পেল একটা রেকর্ড করা কণ্ঠ :
রং নাম্বার। অথবা কেউ একজন, গ্যাংস্টাররা যাকে জখম করেছে,
একটা সংযোগবিচ্ছিন্ন ফোনের কাছে এসে পৌঁছেছে।

খোদা :
এতে কিচ্ছু যায় আসে না সে কাকে কল করতে চেয়েছিল
কিন্তু পারে নাই [আর হয়তো এটা ছিল এমন কেউ একজন
যার নাম্বারটা লস অ্যাঞ্জেলসের ফোনবুকে নেই]
তুমি ফোনটা ধরো!

ইরফানুর রহমান রাফিন

জন্ম ১০ এপ্রিল, ১৯৯২; লেখক, অনুবাদক, গবেষক।

প্রকাশিত গ্রন্থ—

চলে যাওয়া সময় [কবিতা, আনন্দম, ২০১৯]
এক অসাধারণ অন্ধ সময়ের স্মৃতি [উপন্যাস, কাউন্টার এরা, ২০২০]

ই-মেইল : irrafin2020@gmail.com

Latest posts by ইরফানুর রহমান রাফিন (see all)