হোম অনুবাদ ভাস্কো পোপার কবিতা

ভাস্কো পোপার কবিতা

ভাস্কো পোপার কবিতা
340
0

১৯২২ সাল, যুগোশ্লাভিয়ার গ্রেবেনাকে জন্মগ্রহণ করেন যুগান্তকারী সার্ব কবি ভাস্কো পোপা। তার লেখা ফ্রেঞ্চ, জার্মান, হাঙ্গেরিয়ান প্রভৃতি বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়। খ্যাতনামা ইংরেজ কবি টেড হিউজ তার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, পোপার কবিতা; ‘এমন এক পৃথিবীতে জীবনের জন্য সাজানো যেখানে সত্যি সত্যিই মানুষেরা মরে।’

তার সৃষ্ট কাব্যজগৎ বেকেটের বিশ্বযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত জগতের মতো মনে হলেও পোপা কখনোই পলায়নবাদী নন। তিনি কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থেকেছেন। কবিতাগুলো কখনো কখনো ধাঁধার মতো, সার্ব সংস্কৃতি, লোক কথা তাদের পরতে পরতে। কখনো তিনি ডার্ক হিউমার বা ক্রূর মজাও করেছেন। জাদুকরের শক্তিতে হাসি কান্না মিশিয়ে দিয়েছেন একই কবিতার বুকে। শিশু সারল্যে মাখা লেখাগুলো ভীষণ মনস্তাত্ত্বিক। কষ্ট হচ্ছে, ভুল করছে তার কবিতার চরিত্ররা, কিন্তু বিশ্বযুদ্ধের ভয়ানক সত্য থেকে লেজ গুটিয়ে পালানোর পক্ষপাতী তারা নয়।

তার কবিতার মধ্যে একধরনের সুর বেজে ওঠে। নিজস্ব চলে তারা কোনো রাজনীতি বা ধাঁচের কাছে মাথা নোয়ায় না। তার লেখাগুলো তাদের হাত, পা, চুল, কান বেচতে নারাজ। কবির সাথে একযোগে যন্ত্রণা সহ্য করে। একজন জেল বন্দির মতোই তারা বন্দিত্ব মাথা পেতে নেয়। এর প্রামাণ্য হিসেবে বলা যায় পোপা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুগোশ্লাভ পার্টিসান [ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি] হিসেবে লড়াই করেন এবং ধরা পড়ে নাৎসি জার্মানির কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বন্দি হন।


আমার ছেঁড়া জামাটা ফেরত দাও
Give me back my rags
❑❑

সাহস থাকলে আমার মনের উঠোনে পা বাড়াও,
চিন্তারা তোমার মুখ আঁচড়ে দেবে!
সাহস থাকলে আমার নজরসীমায় পা রাখো,
দৃষ্টি গর্জে উঠবে তোমাকে দেখে!
সাহস থাকলে তোমার মুখ খোলো,
আমার নীরবতা গুঁড়িয়ে দেবে তোমার মাড়ি!
সাহস থাকলে তুমি কে, পরিচয় দাও,
স্মৃতি তোমার পা থেকে মাটি কেড়ে নেবে!
তোমার আমার মাঝে এটাই হবার।


আমাদের অনেক গভীরে ১
Far within us 1
❑❑

আমরা হাত তুলে ধরলেই
রাস্তা আকাশে চড়ে
চোখ নামালেই আবার
ছাদ মেশে মাটির গহ্বরে
মুখ চেপে থাকে যন্ত্রণা
আশালতা বাড়ে চুপিসারে
মনের গহিন অন্ধকারে
প্রতিটি আশায়
তারার জন্ম দিই
অথচ সে তারা ধরতে পারি নি
তুমি শুনছ বুলেট শব্দ করছে
মাথা ঘিরে উড়ছে স্রোত
আমাদের ছোড়া চুমু ধরে নিতে
পাতছে ওত
চার মাথা ড্রাগন আকাশে
ওহে চাষি ওহে শ্রমিক
দাগো বর্শা দাগো তির
চিরে ফেলো আগুন হৃদয়
নইলে আমাদের ঘর জ্বলবে
নিশ্চয়!


শুরু হবার পর
After the beginning
❑❑

এবার আমরা কী করব?
সত্যিই ত!
এখন রাত; মজ্জা খাব
দুপুরেও তাই খেয়েছি।
এখন একটা ঘ্যানঘ্যানে
অসার চিন্তা জ্বালাচ্ছে!
তারপর গান গাইব,
গান তো আমরা ভালোবাসি।
কিন্তু কুকুরেরা ধেয়ে এলে?
কী করব;
ওরা তো হাড় ভালোবাসে।
ওদের গলা জড়িয়ে ধরব;
আমরাও তালে তালে
ফুর্তি করব!


লুকোচুরি
Hide and Seek
❑❑

সকলেই সকলের থেকে লুকোচ্ছে!
লুকোচ্ছে জিভের তলায়,
তখন খোঁজ চলছে
মাটির নিচে।
কেউ অন্যের চিন্তায় লুকোচ্ছে,
অন্যে তখন তাকে আকাশে খুঁজছে।
কেউ অন্যের বিস্মৃতির মাঝে
লুকোচ্ছে,
অন্যে তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে
ঘাসের বুকে।
খোঁজ চলছেই অক্লান্ত—
এভাবে খুঁজতে খুঁজতে,
নিজেকেই হারিয়ে ফেলছে তিলেতিলে!


সে
He
❑❑

যে যা পাচ্ছে
অন্যের হাত, পা, যা হোক কিছু
খাবলে নিচ্ছে।
দাঁতে চেপে দৌড়ে পালাচ্ছে
যত দূরে সম্ভব, যত জোরে সম্ভব।
বাকিরা ছড়িয়ে যাচ্ছে দিগ্‌বিদিক,
খুঁজে চলেছে, শুঁকে চলেছে,
মাটি খুঁড়ে ফেলছে এফোঁড়-ওফোঁড়।
ভাগ্যে থাকলে পেয়েও যাচ্ছে;
একখানা হাত, বা পা।
এবার বাকিদের পালা খাবলানোর,
এভাবেই চলছে আখের গোছানো।
এভাবেই চলবে।
যদ্দিন খাবলে খাবার
হাত আছে,
পা আছে,
কিছু না কিছু আছে!


শুরুতে
At the beginning
❑❑

এবার ঠিক আছে,
মাংস খাঁচা থেকে মুক্ত আমরা।
এখন যা ইচ্ছে তাই করব।
কিছু বলো!
তুমি কি বজ্রের শিরদাঁড়া
হতে চাও?
আরো বেশি কিছু বলো
তোমাকে কী বলব?
ঝড়ের কোমর?
স্বর্গের পাঁজর?
এছাড়া তো আর কিছু জানা নেই
আমরা অন্য কারো হাড় নই
অন্যরকম কিছু বলো!


ছোট্ট ঘরের ভাড়াটেরা
The Tenants of the Little Box
❑❑

একটা পাথর পুরে দাও
ছোট্ট বাক্সটায়
এবার হাত গুঁজে দাও
দেখো একটা পাখি!
তোমার ছায়া ছুড়ে দাও
ছোট্ট বাক্সটায়
বিশ্ব জগতের অক্ষ পাবে
ছোট্ট বাক্সটি তোমার হয়ে সব করে দেবে
বাক্সের পেটে একটা
ইঁদুর পুরে দেখো
তুমি পাবে থরথর পাহাড়
ছোট্ট বাক্সটায় একটা মাথা গুঁজে দাও
দু দুটো ফেরত পাবে
ছোট্ট বাক্স তোমার হয়ে সব করে দেবে।

পিয়ালী জানা

জন্ম ৭ জুন, ১৯৮৮; হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। পেশায় শিক্ষক এই কবি ভালোবেসে অনুবাদের কাজ করেন।

প্রকাশিত গ্রন্থ—
অর্ধেক আকাশ আমি : নারী কবিতার অন্যভুবন [কবিতা, অনুবাদ, ২০১৮]

ই-মেইল : femalepoets2@gmail.com

Latest posts by পিয়ালী জানা (see all)