হোম অনুবাদ ব্রেনে ব্রাউন এবং আমরা

ব্রেনে ব্রাউন এবং আমরা

ব্রেনে ব্রাউন এবং আমরা
543
0

ব্রেনে ব্রাউনের লেখা পড়ছি গত এক বছর ধরে বা আরও বেশি। প্রাণিত আর অবাক হতে হয়েছে বারবার। তিনি হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সমাজবিজ্ঞানী ও গবেষক। তার টেড টক আমাদের সমাজের গহিনে এমনভাবে টর্চ জ্বেলেছে যে তা সম্প্রতিকালে রেকর্ড সৃষ্টি করে। কৌতূহলবশত তার টেড টক শুনেই ফেললাম সেদিন। টিভি হোস্ট বিশ্ববিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ওপরা উইনফ্রির সাক্ষাৎকারে ব্রেনে ব্রাউনের সাক্ষাৎকার ও বক্তৃতা দেখেছিল এর আগে। জেনেছি বিখ্যাত কবি, লেখক, শিল্পী, এক্টিভিস্ট মায়া এঞ্জেলু অনুপ্রাণিত এই ব্যক্তি মায়া এঞ্জেলুর সাক্ষাতেও এসেছিলেন। এঞ্জেলু তাকে তার জরুরি কাজের জন্য অভিবাদন জানিয়েছিলেন। যত শুনেছি, ততই তার কাজকে জানতে আগ্রহী হয়েছি। আমাদের জানতে ইচ্ছে করেছে, হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝবয়সী অধ্যাপক ও চেয়ার পার্সন ব্রেনে ব্রাউন এমন কী সামাজিক গবেষণা করলেন যে টেড টকের বক্তৃতার মঞ্চে তাকে আহ্বান করা হলো, আর আজ পর্যন্ত সেই টেড টক শুনতে তেত্রিশ মিলিয়নের বেশি দর্শক ইউটিউবে ভিড় করল? এমন সামাজিক সংযোগ নাকি টেড টকের ইতিহাসে দৃষ্টান্ত। এমন কী বললেন যে দেশবিদেশের টিভি হোস্ট ডাকতে লাগল তাকে? এমন কী কাজ তাকে করতে হয় লেখালেখি আর গবেষণা ছাড়াও যে তিনি এখন এক সমাজসেবক কোম্পানির সিইও? সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন পেশাদারী সংস্থার ব্যবস্থাপনার উন্নতির জন্য, উপদেষ্টা হিসেবে যার ডাক আসে? হাসি হাসি মুখে সহজ ভাষায় কী পরিবেশন করেন এমন? কেন তার বই, রাইজিং স্ট্রং আর ব্রেইভিং দ্য উইল্ডারনেস নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর বেস্ট সেলিং তালিকায় উঠে যায়? কেন তিনি সমাজ, সংসার, ব্যক্তি আর বিশ্বের সীমানায়, রাজনীতি আর পেশাদারী জগতে এক অপরিহার্যতা নিয়ে হাজির হচ্ছেন বারবার? অথচ এই বাংলায় এখনো পর্যন্ত আমরা তার কাজের কথা তেমন শুনতে পাই নি। নিজের মতো পাঠ আর অনুসন্ধানের দিকে এগিয়ে যেতে প্রেরণা পাই।

একটু খোঁজ নিয়ে জানা যায় নাকি এমন এক সমাজ-গবেষক তিনি যিনি ‘শেইম’ (লজ্জা), ‘হেইট’ (ঘৃণা), ‘কারেজ’ (সাহসিকতা), ‘ভালনারেবিলিটি’ (সত্যের স্বচ্ছতায় দাঁড়িয়ে পড়া), ‘ডি-হিউম্যানাইজেশন’ (মানুষকে মানবেতর ভাবে তুলে ধরা), ‘এম্প্যাথি’ (সমবেদনা) ইত্যাদি ব্যক্তিগত আর সম্মিলিত মানুষের নানারকম গহিন জায়গাগুলো নিয়ে বছরের পর বছর অপ্রচলিত ‘অদ্ভুত’ সমস্ত অনুসন্ধানের কাজ করে তা সহজ সাদাসিধে ভাষায় আর অনেক রসবোধের সঙ্গে তুলে ধরেন জনতার সামনে—লেখেনও বটে। বলতে বাধা নেই কথাগুলো প্রথমে শুনেই যে বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে, সে-কথা সত্যি। ব্রেনে এই নিয়ে ঠাট্টা করতে ছাড়েন না। কিন্তু ইউটিউবে তার বিবিধ সাক্ষাৎকার আর টেড টকে তার বক্তব্য শুনে, আর হাসিখুশি অমায়িক লোকটাকে দেখে বুঝতে পারি, তিনি বেজায় ভদ্রলোক হলেও বেজায় ডানপিটে সাহসীও বটে।

ব্রেনেব্রাউন ডট কম বলে একটা ওয়েবসাইট আছে। সেখানে কিছু কথা লেখা। আমি একটু সচেষ্ট ছিলাম সংশয় নিয়ে পড়ার। তবু সংশয় বৃষ্টির জলে ধুয়ে যেতে থাকে একটু যখন পড়ি, ‘Courage is contagious. Every time we choose courage, we make everyone around us a little better and the world a little braver.’ এ কথা গুলি একজন সমাজ বিজ্ঞানীর ব’লেই বিস্মিত হতে হলো।

এই লেখার নাতিদীর্ঘ পরিসরে আমি তার ব্রেভিং দ্য উইল্ডারনেস—দ্য কুয়েস্ট ফর ট্রু বিলঙ্গিং অ্যান্ড দ্য কারেজ টু স্ট্যান্ড এলোন নামের ২০১৭ সালে প্রকাশিত, বিপুলখ্যাত তার সর্বশেষ বই থেকে বাছাই করা ভাব-নির্যাস তুলে দিচ্ছি।

*

আমি লিখতে শুরু করেছি কিন্তু ভয় আমাকে অজগরের মতো গিলছে। তার কারণ বিশেষ করে এই যে আমি আমার গবেষণা থেকে যা পেলাম আর যা বলতে যাচ্ছি তা বহু দিনের বিশ্বাস আর ধারণাকে অসমর্থন করবে। এমন যখন হয় আমি তখন ভাবতে থাকি—এ সমস্ত বলার আমি কে? অথবা আমার কথা শুনে কি মানুষ খুব খেপে যাবে? বিরক্ত হবে?

এই ব্যথা-পেতে-সক্ষম এক অবস্থানে, আমি সেই সব অগ্রগামী সাহসী মানুষের কাছে প্রেরণা খুঁজি যারা সমাজকে গুরুতর নাড়িয়ে দিয়ে গেছে। যাদের সাহসিকতা ছোঁয়াচে। আমি তাদের সম্পর্কে যা হাতের কাছে পাই তাই-ই দেখি বা পড়ি—

বই, সাক্ষাৎকার, প্রবন্ধ। এমনটা করি কারণ আমি যখন ভয়ের মধ্যে বসবাস করি তখন ওরাই তো এসে আমাকে উৎসাহ দেয়, এগিয়ে যেতে বলে। আর তার চেয়েও বড়ো কথা, আমার ঘাড়ের ওপর আমার নজর রাখতে গিয়ে ওরা আমার লেখায় এক আখর বাজে কথা সহ্য করে না।


ভেবো না তোমার কাজ, তোমার জীবন সাহসী হবে এবং কাউকে তা হতাশ করবে না। এমন হয় না কখনো।


এমন হয়ে উঠতে সময় লাগে। আমার জীবনের প্রথম দিকে, আমি উল্টো পথে ছিলাম। আমার মন সমালোচক আর নেতিবাচকদের কথায় ভারাক্রান্ত ছিল। আমি লিখতে বসে আমার সবচেয়ে অপছন্দের অধ্যাপক, সবচেয়ে নাক-সিটকানো কলিগ, সবচেয়ে ক্ষমাহীন অন-লাইন সমালোকদের মুখ কল্পনা করে নিতাম। আমি যদি এদের খুশি করতে পারি বা চুপ রাখতে পারি, আমি ভাবতাম, তাহলেই চলবে। এর পরিণতি একজন গবেষক বা সমাজ-বিজ্ঞানীর জন্য ভয়াবহ: এমন কিছুই তাকে আবিষ্কার করতে হবে যা বর্তমান ধারণার সঙ্গে ভাঁজে ভাঁজে মিলে আছে, কাউকে যা আলোড়িত করে না; যা নিরাপদ, পরিশ্রুত, স্বস্তিকর। তবে এগুলো সত্যি কথা নয়। খুশি করার ভেট মাত্র।

সুতরাং আমি ঠিক করি এই নেতিবাচক লোকদের, এই ভয় দেখানো জুজুদের আমার দরকার নেই। তাদের বদলে আমি ডাকতে শুরু করি সেই সব পুরুষ, নারী, যারা সাহসের মধ্যে দিয়ে দুনিয়াটাকে গড়েছে। আর কখনো কখনো তা করতে গিয়ে লোকজনকে খেপিয়ে তুলেছে। তারা এক বিচিত্র দল। জে কে রাউলিং, আমার ভীষণ প্রিয় হ্যারি পটার বইয়ের লেখককে আমার প্রায়শ দরকার হয়—যখন আমার গবেষণায় নতুন, অদ্ভুত ধারণার ভুবনকে তুলে ধরতে হবে। আমি কল্পনা করি তিনি বলছেন : নতুন ভুবন খুব জরুরি, কিন্তু বর্ণনা করলেই হলো না। সেই ভুবনে যে গল্প আছে, তাই দাও আমাদের। সেই ভুবন যতই উদ্ভট আর আশ্চর্য হোক না কেন, সেই সব গল্পে আমরা নিজেদের দেখতে পাব।

যখনই জাত, লিঙ্গ বা শ্রেণি নিয়ে কোনো বেদনাদায়ক আলোচনা এসে যায় তখন লেখক এবং এক্টিভিস্ট বেল হুক্সকে আমার দরকার হয়। তিনি আমাকে শিখিয়েছেন শিক্ষকতা এক পবিত্র কাজ এবং শিক্ষা গ্রহণের সময় যে অস্বস্তি, সেটাও জরুরি। এছাড়া এড ক্যাট্মুল, কেন বার্নস আমার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকেন। আমি গল্প বলার সময় কানে ফিসফিস করেন। আমি যখন ধৈর্য হারিয়ে সংলাপ থেকে ডিটেল বাদ দিতে থাকি তারা আমাকে একটু ঠেলা দেন। ‘আমাদের তোমার গল্পের ভিতর নিয়ে যাও,’ বলেন তারা। অনেক সংগীত-ওস্তাদ আর শিল্পীরা এসে যান, আসেন ওপ্রা উইনফ্রি। তার কথা আমি আমার পড়ার ঘরের দেয়ালে সেঁটে রেখেছি। ‘ভেবো না তোমার কাজ, তোমার জীবন সাহসী হবে এবং কাউকে তা হতাশ করবে না। এমন হয় না কখনো।’

কিন্তু আমার সবচেয়ে একনিষ্ঠ মন্ত্রণাদাত্রী হলেন কবি, লেখক, এক্টিভিস্ট মায়া এঞ্জেলু। কলেজে কবিতা পড়তে গিয়ে তার সঙ্গে প্রথম পরিচয়। তার কবিতা ‘স্টিল আই রাইজ’ (তবু আমি জাগি) আমার জীবনের সবকিছু ওলটপালট করে দিয়েছিল। এর মধ্যে এমন এক শক্তি আর সৌন্দর্য ছিল যে আমাকে তার প্রতিটি বই সংগ্রহ করতে হয়। তার সব কাব্য, সব সাক্ষাৎকার আমি পড়েছি। তার লেখা আমাকে সামনের দিক ঠেলে দেয়, নিরাময় আনে। তার কাজ আনন্দে ভরা কিন্তু এক তিল রেহাই দেয় না।

কিন্তু তার একটি উদ্ধৃতির সঙ্গে আমি গভীরভাবে ভিন্নমত ছিলাম। হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ণ এবং শ্রেণি নিয়ে একটি কোর্স পড়ানোর সময় উদ্ধৃতিটি আমার সামনে আসে। ১৯৭৩ সালে বিল ময়ারের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে টেলিভিশনে মায়া বলেন :

‘আমরা কেবল তখন মুক্ত যখন আমরা অনুধাবন করি, কোনো জায়গা আমাদের আপন নয়—অথচ সব জায়গা আমাদের আপন। এই উপলব্ধির জন্য চড়া দাম দিতে হয়। পুরস্কারও অনবদ্য।’১

লেখাটা পড়ে আমার কী মনে হয়েছিল হুবহু মনে আছে : ‘দারুণ একটা ভুল হচ্ছে এখানে। আপন ভুবন যদি না থাকে—

তেমন দুনিয়া কেমন হবে? কতগুলো নিঃসঙ্গ মানুষের জটলা শুধু! আমার মনে হয় মায়া একাত্ম হওয়া, আপন হবার শক্তিকে বুঝতে পারছেন না।’

পরবর্তী বিশ বছর ধরে সেই উদ্ধৃতি যখনই উঠে এসেছে আমার জীবনে, আমি এক রাশ ক্রোধ অনুভব করেছি। ‘কেন এমন কথা বললেন তিনি? এটা ঠিক হতেই পারে না। আপন হওয়া, একাত্ম হওয়া খুব জরুরি। আমাদের কিছুর সঙ্গে, কারুর না কারুর সঙ্গে, কোথাও না কোথাও আপন হতেই হবে।’ বুঝতে পারি দুই কারণে আমার এমন রাগ হচ্ছে। প্রথমত, ডক্টর মায়া এঞ্জেলু আমার কাছে এমন এক কাছের মানুষ হয়ে উঠেছেন, যে তার সঙ্গে এমন এক মৌলিক জায়গায় আমাদের দ্বিমত থাকবে, এ আমি মেনে নিতে পারছি না। দুই, আমরা কোনো জায়গায় খাপে খাপে এঁটে যাব না, আপন হব না, এই অভিজ্ঞতা আমার জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনার অন্যতম। আমার ব্যক্তিগত পরিণত জীবনের বড়ো কষ্টের জায়গা।

তাই মায়ার এই উদ্ধৃতি কখনোই আমাকে মুক্তি দিতে পারে না।

কোথাও আপন হতে না পারা আমার জীবনকে দাগ দিয়ে গেছে। আমি নিউ অরলিন্সে কিন্ডারগার্টেন ইস্কুলে গেছি। সালটা ১৯৬৯। শহরটা যত সুন্দর হোক (এখনো খুব সুন্দর) বর্ণবাদ এখানে বাতাসকে ভারি করে তুলেছে। বর্ণভিত্তিক ইস্কুলগুলি মিলিয়ে মিশিয়ে এক করে ফেলা হয়েছে সে বছর। ঠিক কী যে হচ্ছে আমার পক্ষে তা আদৌ বোঝা সম্ভব না—আমি বড্ড ছোট। কিন্তু আমি জানি আমার মা খুব সোচ্চার আর বলিষ্ঠ লোক। তার আশেপাশে দাঁড়িয়ে সেই তেজ আমি অনুভব করি। কিন্তু আমার কাছে আমার মা আমাদের পাড়ায় নামের-তালিকা-তৈরি-করা একজন সেচ্ছাসেবী। তিনি আমার আর আমার পুতুলের জন্য হলুদ ফ্রক সেলাই করেন।

আমরা আদি বাড়ি টেক্সাস ছেড়ে যাই এবং এই দেশ ছাড়া আমার জন্য খুব কঠিন ছিল। আমার দিদিমার জন্য আমার মন কেমন করে। কিন্তু একই সঙ্গে আমি আমার বাড়ির চারপাশে বন্ধুত্ব পাতাবার জন্য ব্যস্ত। আমাদের পাড়ায় আবার নামের তালিকা দেখেই আদ্যোপান্ত সব কিছু ঠিক করা হতো। কোনো অনুষ্ঠানে কে কে হাজির, থেকে শুরু করে কোন জন্মদিনে কাকে কাকে ডাকা হবে অব্দি। এক দিন আমার মা’র এক বন্ধু তার চোখের সামনে তালিকাটা হাওয়ায় নাড়িয়ে বললেন, ‘এই পাড়ার কালো মেয়েদের নাম দেখেছ? সবার নাম ক্যাসান্দ্রা দিয়ে শুরু!’

বেশ! আমার মা ভাবেন। এই কারণেই হয়তো আমি আমার সমস্ত শাদা বন্ধুদের জন্মদিনের নেমন্তন্ন থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছি! আমার মায়ের প্রথম নাম ক্যাসান্দ্রা। আমারও প্রথম নাম ক্যাসান্দ্রা। পাড়ার তালিকায় আমার নাম? ক্যাসান্দ্রা ব্রেনে ব্রাউন। যদি কোনো আফ্রিকান আমেরিকান এই লেখা পড়েন, তিনি জানবেন ঠিক কেন আমাকে শ্বেতাঙ্গ বন্ধুদের জন্মদিনে ডাকা হয় নি। একই কারণে আফ্রিকান আমেরিকান একটি দল আমাকে অধ্যাপক-বেলায়, বছর শেষে একটা কার্ড দেয়। তাতে লেখা : ‘বুঝলাম। তুমি আসলে ব্রেনে ব্রাউন।’ নারী ইস্যুর ওপরে আমার একটা কোর্সে তারা নাম লিখিয়েছিল। আমি যখন ক্লাসে পড়াতে ঢুকি তারা আশ্চর্য হয়ে প্রায় চেয়ার থেকে পড়ে যায় আর কি! ‘আপনি ক্যাসান্দ্রা ব্রেনে ব্রাউন নন?’ হ্যাঁ, বটেই তো। একই কারণে আমি যখন ছোট একটা আধবেলার কাজের ইন্টারভিউতে যাই, আমাকে দেখে সেখানে এক মহিলা বলে ওঠেন, ‘তুমিই ব্রেনে ব্রাউন! কী অবাক কাণ্ড! খুশি হলাম!’ বসার আগেই সেই ইন্টারভিউ থেকে আমি বেরিয়ে আসি।

কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারগুলি আমাকে অভ্যর্থনা জানায়, কিন্তু তাদের দরজা দিয়ে ঢোকার সময় তাদের চোখ যে কপালে উঠছে তা টের পাওয়া যায়। আমার এক বন্ধু জানায় আমি তাদের বাড়িতে বেড়াতে আসা প্রথম শাদা রঙের মানুষ। চার বছর বয়েসে এই কথার মর্ম বোঝা কঠিন, বিশেষ করে বন্ধুর বাড়িতে জন্মদিনের কেক খেতে এসে। কিন্ডারগার্টেনে সবার সঙ্গে একাত্ম হওয়া খুব সহজ হবার কথা, অথচ আমার সবসময় মনে হতো আমি বাইরের লোক।

পরের বছর বাবার চাকরি-সূত্রে আমরা অন্য শহরে চলে যাই। আমাকে হোলি নেম অভ জিজাস নামের এক ক্যাথোলিক ইস্কুলে ভর্তি করা হয়। দেখা যায় সেই ইস্কুলে একমাত্র আমিই ক্যাথোলিক নই। আরও দেখা যায়, সেই ইস্কুলের পক্ষে আমার ধর্মটা সঠিক হয় নি। আবার আপন হওয়ার স্বপ্নে বাদ সাধে। এক দুই বছর বাইরে ব’সে কাটানো, আলাদা করে ডেকে নেওয়া এবং মাঝেমধ্যে একা পড়ে যাবার পর একদিন দেখি ঈশ্বর আমাকে অফিসে ডেকে পাঠাচ্ছেন। অন্তত তাকে দেখে আমার তেমনটা মনে হয়েছিল। আসলে তিনি বিশপ। তিনি এক ধর্মগ্রন্থ আমার হাতে তুলে দিয়ে প্রতিটা লাইন পড়ে আমাকে শোনান। পরে তিনি আমাকে একটা চিরকুট দিলেন বাড়িতে নিয়ে যাবার জন্য। সেই চিরকুটে লেখা, ‘ব্রেনে এখন থেকে ক্যাথোলিক।’

সে যাই হোক, পরের দুটো বছর মোটেও মন্দ কাটল না কারণ আমার সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবী এলেনোর তেমন তেমন মেয়ে ছিল। কিন্তু এরপর শুরু হলো বাসস্থান পরিবর্তন। তখন আমি চতুর্থ শ্রেণি। হিউস্টন থেকে ওয়াশিংটন ডিসি যখন যাওয়া হয় তখন আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে। আমি যখন অষ্টম শ্রেণিতে তখন আমরা আবার হিউস্টন ফিরে আসি। বয়ঃসন্ধির জবুথবু ভাবের সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন-মেয়ে হিসেবে নতুন জায়গায় মেলার চেষ্টা। এইসবের মধ্যে বাঁচোয়া—আমার বাবা-মার সম্পর্ক ভালো ছিল। আমার আশেপাশের নানা ঝড়ঝঞ্ঝা, ইস্কুল পালটানো, নতুন বন্ধু, নতুন মানুষের ভিড়ে আমার বাড়ি এক নিরাপদ আশ্রয়। কোথাও আপন না হবার ফলে সেটাই ছিল আমার ভরসার জায়গা। সব যখন ব্যর্থ, তখন আমি মা-বাবার আপন ছিলাম।

কিন্তু সে শান্তি টিকল না। হিউস্টনে ফিরে আসার পরে আমার মা-বাবার ভিতরে অনেক দিনের এক বেদনাদায়ক দ্বন্দ্ব শুরু হলো—শেষ পর্যন্ত যা তাদের বিবাহবিচ্ছেদের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। সেই চরম বিশৃঙ্খলার ঠিক মাথায় ছিল আমার ইস্কুলের ড্রিলের টিমের স্বপ্ন।

অষ্টম শ্রেণির শেষে ফিরে হিউস্টনে এসে যেটুকু সময় মেলে, তার মধ্যে আমি হাইস্কুলের ড্রিল টিমে যোগ দেবার জন্য নাম লিখিয়েছিলাম। সেই ছিল আমার ধ্যানজ্ঞান। বাড়িতে আমার ঘরের দেয়ালের ওপার থেকে যখন আমার মা-বাবার তর্কের চাপা শব্দ শুনছি তখন এই ড্রিল টিমের স্বপ্ন আমার সুরক্ষা হয়ে উঠছে। তার আগে আট বছর ধরে আমি ব্যালে শিখেছি—সে শিক্ষা বৃথা গেল না। এই ড্রিল টিমে ঢুকতে চেয়ে আমাকে তরল খাদ্যে যেতে হলো—বাধাকপির স্যুপ আর জল। না-হলে নাকি ওজন বাগে আসবে না। বারো বছর বয়েসে কাউকে ওজন ঠিক করতে এই খাদ্য খেতে হয়েছে, শুনতে অদ্ভুত লাগে। কিন্তু আমার কাছে একে স্বাভাবিক মনে হয়।

আমার এখনো মনে হয়, এই ড্রিল টিমে ভর্তি হতে চাওয়াই আমার জীবনের সেরা স্বপ্ন ছিল। এতটাই চেয়েছিলাম। এই ড্রিল নাচ আমার কাছে যেন নিখুঁত, নির্ভুল, সুন্দর একটা কিছু। আমার পরিবারের ডামাডোল থেকে যোজন দূর। এখানে থাকা যেন আপন হবার পবিত্র সোপান। এখানে একজন ‘বড়ো বোন’ আমার লকার সাজিয়ে রাখত। আমরা একে অপরের বাসায় সখির মতো রাত কাটিয়েছি। ফুটবল প্লেয়ারদের সঙ্গে প্রেম করেছি।

এবং আক্ষরিক ভাবে, এই ড্রিলের মধ্যে দিয়ে আমরা একমন একপ্রাণ হয়ে একটা কাজে অংশ নিতাম—সেটা নাচ। তাই এই জীবন আমার আপন হবার পূর্ণাঙ্গ ছবি ব’লে মনে হলো।

আমার তখনো কোনো বন্ধু হয় নি। রুটিন শেখা সহজ ছিল। আমি এতটাই চর্চা করেছি যে ঘুমের মধ্যেও নাচতে পারি।

পরীক্ষার দিন আমার ভয়ে কাঁপুনি এল। জানি না সেই দুর্ভিক্ষের খাদ্য না স্নায়ুর গড়বড়। আমার মাথা হালকা লাগছিল। মা আমাকে ইস্কুলে দিয়ে এলেন। এখন নিজে মায়ের ভূমিকায় এসে পড়েছি; তাই বুঝতে অসুবিধে হয় আমার সে দিন কেমন লাগছিল, যখন সকলে হাত ধরাধরি করে দৌড়ে ঢুকছিল, আর আমাকে কেমন একা একা ঢুকতে হয়। তবে আমি চটজলদি বুঝতে পারি একা ঢোকার চেয়ে ঢের কঠিন সমস্যা আমার জন্য অপেক্ষা করছে।

সব মেয়ে—সত্যি বলছি প্রত্যেকেই—পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত সেজেগুজে এসেছে। মাথায় নীল সোনালি ফুল-কাটা ফিতের ছড়াছড়ি। তাদের মুখে রঙ, পাউডার, কাজল, ইত্যাদি। আমার মুখে কোনো প্রসাধন নেই। আমার জামার রঙ ছাই। ওদের গায়ে নীল আর সোনালি জামা। কেউ আমাকে বলে নি আজ ইস্কুলের রঙে সেজে আসতে হবে। সবাই কেমন উজ্জ্বল আর চকচকে। তার মধ্যে আমি যেন সেই দুঃখী মেয়ে যার বাবা-মা কেবল লড়াই করে।

নির্ধারিত ওজনের চেয়ে আমার ওজন ৬ পাউন্ড কম দেখা যায়। তারপরও অনেক মেয়ে ওজন মাপার যন্ত্রে দাঁড়িয়ে হঠাৎ কাঁদতে কাঁদতে লকার ঘরে গিয়ে ঢুকে পড়ার দৃশ্য আমাকে আতঙ্কে ফেলছিল।

আমাদের জামায় সেফটিপিন দিয়ে নম্বর আঁটা আছে। পাঁচ অথবা ছয়ের দল হয়ে আমরা নাচ করলাম। মাথা হালকা লাগছিল তো কী, রুটিনে আমার কোনো ভুল হলো না। মা যখন তুলে নিতে এলেন, আমি খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে গেলাম। অপেক্ষার সময়টা অহেতুক কাটতে চাইল না।

শেষে, বিকেল ছয়টা বেজে পাঁচে, আমরা সকলে মিলে আসি। মা, বাবা, ভাই, বোন। আমি নম্বর দেখে নেব। তারপর আমরা সকলে আমার দিদিমার কাছে বেড়াতে যাব। পোস্টার বোর্ডে টাঙানো পাশ করা মেয়েদের নম্বরের তালিকা ঝুলছে। আমার দলের একজন আছে। সবচেয়ে উজ্জ্বল আর চকচকেদের মধ্যে একজন। নাম ক্রিস। এমন নাম আমাদের সকলেরই অভীষ্ট। ছেলে না মেয়ে বোঝা যায় না।

নম্বরগুলি ছোট থেকে বড়ো করে সাজানো। আমার নম্বর ৬২। ষাটের ঘরে আমার নজর দৌড়ায়। ৫৯, ৬১, ৬৪, ৬৫। আমি আবার তাকালাম। কেন জানি বিশ্বাস হচ্ছিল না। যেন ওইদিকে আরও ভালোভাবে তাকিয়ে থাকলে ৬২ নম্বরটা দেখা যাবে। এমন সময় ক্রিসের চিৎকারে আমার ঘোর কেটে গেল। সে ওপর-নিচ লাফাচ্ছে। আমি কিছু বোঝার আগে তার বাবা গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে এসে তাকে উঁচুতে তুলে এক ঘুর দিয়ে দিল, ছবিতে যেমন হয়। আমি পরে শুনতে পেলাম ভিতরকার খবর; আমার নাচ ঠিক হলে কী হবে। আমার মাথায় ফিতে নেই। চকচকে উজ্জ্বল জামা কাপড় নেই, প্রসাধন নেই। দল নেই। আপন বলতে কেউ নেই আমার। আমি তাই এই দলের অযোগ্য।

একা! ভিতরে ভিতরে আমি ধ্বস্ত হতে থাকি।

আমি গাড়িতে গিয়ে উঠি আর বাবা চালাতে শুরু করেন। আমার মা-বাবা একটা কথাও কইলেন না। সেই নৈঃশব্দ্য আমার বুকে ছুরির মতো বিঁধল। তারা আমাকে নিয়ে লজ্জা পাচ্ছেন। আমি তাদের মুখ রাখতে পারি নি। তাই লজ্জা পেয়েছেন। আমার বাবা ফুটবলের ক্যাপ্তেন ছিলেন। আমার মা তার ড্রিল টিমের নেত্রী ছিলেন। আমি কিছুই না। আমার বাবা বিশেষ করে চাইতেন সকলে দেখুক, চাইতেন সামাজিক অবস্থানে আমরা খাপ খাইয়ে নেব, নেতৃত্ব দেবো। আমার দেখানোর মতো কিছু নেই। আমি খাপ খাওয়াতে পারছি না।

প্রথমবারের মতো আমি আমার পরিবারের কাছে আপন হতে পারলাম না।

আমার ড্রিল টিমের গল্প পৃথিবী জোড়া অনেক বড়ো বড়ো সমস্যার মধ্যে উন্নত বিশ্বের এক ছোট সমস্যা হিসেবে খারিজ করা যায় নিশ্চয়ই। কিন্তু এই সমস্যা আমার কাছে কেমনতর ছিল একটু বলি। জানি না গল্পটা সত্যি কিনা, নাকি আমি বানিয়ে তুলেছিলাম সে গল্প, কিন্তু সেই নৈঃশব্দ্যের মধ্যে আমি নিজেকে বলছিলাম, আমি আর আমার পরিবারের কেউ না, আমাদের সামাজিক সবচেয়ে মৌলিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমি অন্তরে বহিরাগত হয়ে গেছিলাম। আমার বাবা-মা যদি আমাকে সেই মুহূর্তে জানাতেন, আমি চেষ্টা করে যথেষ্ট সাহসিকতা দেখিয়েছি, অথবা সত্যি তখন আমি যেমনটা চাইছিলাম, পাশে ডেকে যদি বলতেন—আমার এই অভিজ্ঞতা কত বেদনাদায়ক; বলতেন, সত্যি ওই দলে থাকার যোগ্যতা আমার আছে—তবে আমার জীবনের গতিপথ এমনটা হতো না। কিন্তু তাই তো হলো।

এই গল্প সকলের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া এতটা কঠিন হবে ভাবি নি। আমাকে আইটিউনসে গিয়ে নাচের দলের সেই গানটা আবার শুনতে হয়েছে। শুনতে গিয়ে আমি কান্নায় ভেঙে পড়ি। ড্রিল টিমে জায়গা পাই নি ব’লে নয়, আমি কাঁদছিলাম সেই মেয়েটির জন্য যে কেন কী হচ্ছে তার কিছুই ঠাহর করতে পারে নি। আমার অরক্ষিত অবস্থায় আমাকে সুরক্ষা দেবার ব্যাপারে খুব অদক্ষ যে বাবা-মা, তাদের জন্য কাঁদছিলাম আমি। যাদের জানা ছিল না কী ভাবে ওই নৈঃশব্দ্য ভেঙে কথা কইতে হয়, সান্ত্বনা দিতে হয়, অথবা নিদেনপক্ষে আমার বহিরাগত হয়ে যাবার গল্পে বাধা দিতে হয়। এ কারণে আমরা পরিণত জীবনে এসেও নিজের আপন আস্তানা খুঁজে বেড়াই, খাপ খাওয়াতে চেষ্টা করতে থাকি। সৌভাগ্যের কথা, আমার বাবা-মা কখনো মনে করেন নি সন্তান বাড়ি ছেড়ে যাবার পর তাদের বাবা-মা হবার দায়িত্ব ফুরিয়ে যাবে। সাহসিকতা কী, অরক্ষিত থাকা কাকে বলে, আপন হওয়া মানে কী, এ সব আমরা পরে একসঙ্গে শিখেছি। সে সব ছোটখাট অলৌকিক ঘটনা বলা যায়।

এমনকি কষ্টের চালচিত্রে—দারিদ্র্য, সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার মধ্যেও—পরিবারের কাছে আপন হতে না পারার ব্যথা সবচেয়ে বেশি। তার কারণ এই একাত্মতার অভাব আমাদের বুক ভেঙে দেয়, আমাদের আত্মাকে চুরমার করে দেয়, আমাদের আত্মমর্যাদাকে ধ্বংস করে। আমার ক্ষেত্রে এর সবকিছুই হয়েছিল। এই রকম হলে কেবলমাত্র তিনটি ফলাফল আছে, আমি আমার জীবনে আর কাজে এর সাক্ষ্য দিতে পারি :

১) ব্যথা হয় চিরন্তন। সেই ব্যথাকে অবশ করে অথবা অন্য মানুষের মধ্যে সঞ্চালিত করে আপনি উপশম খোঁজেন।

২) ব্যথা আছে এ কথা আপনি অস্বীকার করেন। এই অস্বীকৃতির ফল, সেই ব্যথা আপনার শিশুর মধ্যে সঞ্চালিত হয়।

৩) আপনি এই ব্যথাকে স্বীকার করে নেন, একে আপন করে নেন সাহসিকতার ভিতর দিয়ে। নিজের জন্য সমবেদনা আর করুণা অনুভব করেন, নিজের ভেতরে, অন্যের ভেতরে। এর ফলে দুনিয়ায় ব্যথাকে চিনে নেবার এক অসামান্য ক্ষমতা তৈরি হয় আপনার মধ্যে।


সময়ের সঙ্গে আমি অন্য মানুষকে যতটা ভালো চিনতে শিখি, ততটা ভালো তারা নিজেরাই নিজেদের চেনে না।


আমি এ তালিকার প্রথম দুই দফা নিশ্চয়ই চেষ্টা করেছি। এক পরম কৃপার ফলে আমি তৃতীয় দফায় এসে পৌঁছই।

এই ঘটনার পরে আমার বাড়ির বিবাদ আরো তীব্র হয়ে উঠল। সেই সব বিবাদে কোনো কিছুই উহ্য থাকত না। আমার বাবা-মার অন্য ভাবে বিবা্দের দক্ষতা জানা ছিল না। আমি নিজেকে বোঝালাম দুনিয়ায় শুধু আমার মা-বাবাই তাদের বিবাহিত সম্পর্ক ধরে রাখার জন্য সংগ্রাম করছেন। আমার খুব লজ্জা হলো। আমার ভাই আর বোনের বন্ধুরা আমার বাবা-মাকে বলতেন, ‘মিস্টার এবং মিসেস বি। শুনতে লাগত বেশ—মনে হতো কত দারুণ মানুষ তারা। কিন্তু আমি তো জানি তারা ঝগড়া করেন, আর এও জানি এইসব বন্ধুদের বাবা-মা টিভিতে দেখা বাবা-মার মতো অসম্ভব সুখী মানুষ। সুতরাং গোপনীয়তার লজ্জা আমার মধ্যে স্তূপ হতে শুরু করে।

দৃষ্টিকোণ আসলেই অভিজ্ঞতা দিয়ে তৈরি। আমার আশেপাশে যা হচ্ছে তাকে স্বাভাবিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে রেখে দেখার মতো অভিজ্ঞতা আমার তখন নেই। আমার মা-বাবা তখন কোনোরকম বিধ্বংসী কিছু না ঘটিয়ে কেবল টিকে থাকার চেষ্টা করছেন, তাই আমাদের কিছু বুঝিয়ে বলতে হবে এমন কথা তাদের মাথায় আসে নি। আমার হাইস্কুল তখন বিশ্বরেকর্ড তৈরি করে খবরের কাগজে এসেছে। ছাত্রদের সব চেয়ে বেশি আত্মহত্যার রেকর্ড নিয়ে। কিন্তু সে খবর ছাপিয়ে আমার ধারণা, সেই শহরে, এমনকি সারা পৃথিবীতে আমার মতো গাড্ডায় কেউ পড়ে নি। অনেক পরে, দুনিয়ার মানুষ যখন নিজ নিজ সংগ্রামের কথা বলতে শুরু করে, তখন আমি যে সব বাবা-মাকে খুব সুখী বলে জানতাম, তাদের অনেকে বিবাহবিচ্ছেদে আলাদা হয়ে গেছেন, কেউ কেউ মানসিক চাপে অসুস্থ, আর কেউ কেউ, সৌভাগ্যক্রমে সেরে উঠছেন।

কখনো কখনো নৈঃশব্দ্য নিজের মতো ফিসফিস করে এক গল্প বলতে থাকে শিশুদের কানে। শিশুমনে তৈরি সে গল্প। সে-ই সব থেকে বিপদের কথা। সে গল্পে তারা নিজেদের ভালোবাসার অযোগ্য ব’লে ভাবে। নিজেদের মূল্যহীন হিসেবে তুলে ধরে। আমার কাছে আমার নিজের কথকতা এমনটাই ছিল। তাই ছুটির সময় আমি হাই কিক অনুশীলন না করে আমার চেয়ারের তলায় নেশার বস্তু লুকিয়ে রাখি, বুনো প্রকৃতির ছেলেমেয়েদের সঙ্গে দৌড়ই। আমার ধরনের মানুষ খুঁজি। আমি আর কখনো কোনো দলের অন্তর্ভুক্ত হবার চেষ্টাও করি নি। বরং খাপ খাওয়াবার অনুশীলনে আমি চোস্ত হয়ে উঠি। এমন কিছু করতে থাকি যেন কিছুর অংশ ব’লে আমি নিজেকে চিহ্নিত করতে পারি।

আমার বাবা-মার চলমান ক্রমশ আরো বিষণ্ণ-হতে-থাকা বিবাদের মধ্যে আমার দুই বোন আর এক ভাই ত্রাণের জন্য আমার ঘরে এসে জুটলে আমি তাদের জন্য সব কিছু কী ভাবে ‘আরেকটু ভালো’ হতে পারে, সে চেষ্টা করতে থাকি। বীরবিক্রমের সঙ্গে বিবাদ কেন হয়েছে বোঝার চেষ্টা করি। আমার পরিবার আর আমার ভাইবোনের জন্য আমি ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হই। যখন তা কাজে দিত আমার নিজেকে হিরো বলে মনে হতো। এখন লিখতে গিয়ে বুঝতে পারছি এই অবস্থায় আমি গবেষণা আর উপাত্তকে অরক্ষিত অবস্থার থাকার চেয়ে বেশি মূল্য দিতে শিখছিলাম।

পিছনে ফিরে বুঝতে পারি আপন হতে না পারাই আমাকে মূলত এই জীবিকা দিয়েছে। প্রথম শিশু হিসেবে, তারপর উঠতি জোয়ান হিসেবে, আপন হতে না পারাকে সামাল দিতে আমি মানুষকে পর্যবেক্ষণ করতাম, শিখতাম তাদের কাছ থেকে। মিলের নক্সা খুঁজতাম। খুঁজতাম সংযোগ। আমি জানতাম মানুষের আচরণের ধরন চিনে সেইসব তাদের কাজ আর অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে, পথ খুঁজে পাব। নক্সা অনুধাবনের দক্ষতাকে ব্যবহার করে বুঝতে চাইতাম, মানুষ কী চায়, কী চিন্তা করে, অথবা তারা কী করছে। আমি সঠিক কথাটা বলতে, সঠিকভাবে নিজেকে হাজির করতে শিখলাম। একজন বর্ণচোরার মতো নিজেকে মিলিয়ে নিতে শিখলাম পরিবেশের সঙ্গে। ফলে নিজের কাছে অজ্ঞাত আর নিঃসঙ্গ থেকে গেলাম আমি।

সময়ের সঙ্গে আমি অন্য মানুষকে যতটা ভালো চিনতে শিখি, ততটা ভালো তারা নিজেরাই নিজেদের চেনে না। সেই প্রক্রিয়ায় আমি নিজেকে হারাই। আমার বয়েস যখন একুশ, আমি কলেজে ভর্তি হয়েছি, বেরিয়েও এসেছি, আমার বাবা-মার বিচ্ছেদ ঘটে গেছে, হিচ হাইক করে ছয় মাস ইউরোপে ঘুরে এসেছি আমি। হালকা ধরনের সব নেশা করা থেকে শুরু করে আত্মবিধ্বংসী সব ধরনের বোকা বোকা কাজ করেছি । কিন্তু ক্লান্তি আসছিল। আমি ধোঁয়ার ওপর বেঁচে আছি। এই ধরনের পলায়নকে একজন খুব মোক্ষমভাবে ধরেছেন : ‘জীবনের মানের চেয়ে দ্রুত ক্ষয়ে আসা শরীর।’

১৯৮৭ সালে আমার স্টিভের সঙ্গে দেখা। কেন জানি তার সঙ্গে আমি নিজেকে আপন করে পাই। এমনটা আমার সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবী এলেনরের সঙ্গে কেবলমাত্র হয়েছে। স্টিভ আমাকে দেখতে পেত। আমার আত্ম-বিধ্বংসী দিনগুলির শেষ ডগা সে ধরতে পেয়েছিল। তারপরও সে আমাকে দেখতে পেত। আমাকে পছন্দ করত। তার পরিবারেও এমন এক বেদনাময় কাহিনি ছিল। তাই সে আমার ব্যথা চিনতে পেরেছিল। জীবনে প্রথমবারের মতো আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বললাম। কুঁড়ির মতো যেন ফেটে পড়লাম আমরা। কখনো দশ ঘণ্টা ধরে ফোনে কথা বলতাম। আমরা আমাদের দেখা প্রত্যেকটি বিবাদ, কলহ নিয়ে কথা বলেছি। যে নিঃসঙ্গতার সঙ্গে আমাদের নিয়ত লড়াই, সেই নিঃসঙ্গতা নিয়ে এবং কোথাও আপন হতে না পারার অসহনীয় বেদনা নিয়ে।

যা বন্ধুতা হিসবে দেখা দেয়, তা-ই উত্তাল প্রেম এবং ক্রমশ পূর্ণ ভালোবাসা হলো। দেখতে পাবার ঘটনা যে কত শক্তিশালী—তা যেন কখনো কেউ ছোট না করে। কেউ যখন সত্যি আমাদের দেখে আর ভালোবাসে তখন নিজের বিরুদ্ধে পথ চলা ক্লান্তিকর। কখনো তার ভালোবাসা উপহার বলে মনে হতো। কখনো তার এই সাহসিকতাই ক্রুদ্ধ করত আমাকে। কিন্তু যখন আমি আসল আমি-র টুকরো টুকরো ছবি দেখতে শুরু করলাম, আমার মন শোকে আর গভীর আকাঙ্ক্ষায় ভ’রে উঠল। যে মেয়েটি কোথাও আপন হতে পারে নি, তার জন্য শোক, তাকে জানবার গভীর আকাঙ্ক্ষা আমাকে আকুল করে তোলে। তার কী ভালো লাগে, কী সে বিশ্বাস করে, কোথায় সে যেতে চায়, সে সব জানার ব্যাকুলতা। স্টিভ আমার এই আত্মজিজ্ঞাসা ভয় পায় নি। ভালোবেসেছিল। সমর্থন করেছিল।

সুতরাং ডক্টর মায়া এঞ্জেলু, কোথাও আপন না হতে পারা কোনোভাবেই ভালো কিছু হতে পারে না। তখনো আমি বুঝতে পারছি না, তার সেই উদ্ধৃতির মর্ম।

পরিচয়ের সাত বছর পরে স্টিভ আর আমি বিয়ে করি। সে মেডিকেল স্কুল থেকে রেসিডেন্সি করতে যায়। আমি স্নাতক থেকে স্নাতোকোত্তরে উত্তীর্ণ হই। ১৯৯৬ সালে মাস্টার্স শেষ করে আমি ঠিক করি আমি সিগারেট আর মদ জন্মের মতো ছেড়ে দেবো।

আমাদের বিয়ের প্রথম বছরগুলি সংগ্রামের ছিল। রেসিডেন্সি আর গ্র্যাজুয়েট স্কুলের চাপ, নুন আনতে পান্তা ফুরানো অবস্থা। আমার মনে আছে একজন কলেজ থেরাপিস্টকে বলেছিলাম, এই বিয়ে হয়তো টিকবে না। তিনি কী উত্তর দিলেন জানেন? ‘মনে হয় না। তুমি নিজেকে যতটা পছন্দ করো তার চেয়ে বেশি পছন্দ করে সে।’

আমার নিপুণভাবে খাপ খেয়ে যাওয়া একজন মানুষ থেকে নিজের আপন হয়ে ওঠা—শুরু হয় বিশের কোঠায় আর শেষ হয় চল্লিশের কোঠায়। ত্রিশের কোঠায় আমি এক আত্মবিধ্বংসী কাজ আরেক বিধ্বংসী কাজের বিনিময়ে পাল্টাপাল্টি করে নিই। নেশা গেল, এল নিখুঁত হবার শুচিবাই। আমি তখনো একজন বহিরাগত, কিন্তু তালিকায় নিজের নম্বর না দেখলে আমি আর আগের মতো মৌন লজ্জায় ছোট হয়ে যাই না। বরং নিজের ভয় আর বেদনা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলি। আমার কাছে কী, কেন গুরুত্বপূর্ণ সে সব প্রশ্ন করি নিজেকে। তালাবন্ধ ধারণায় বন্দি থাকা কী আমার পোষাবে মনে হয়? না। আমাকে যখন বলা হলো কোয়ালিটেটিভ গবেষণা করা হবে না, তখনো আমি সেটাই করি। আমাকে বলা হয় ‘লজ্জা’ আমার গবেষণার বিষয় হতে পারে না, আমি তা-ই বেছে নিই। যখন লোকে জানায় আমি একজন অধ্যাপক হয়ে জনগণের কাছে পৌঁছনোর মতো বই লিখতে পারব না, আমি সেই বই লেখাতেই হাত দিই।

এমন যেন মনে করা না হয়, আমি খাপে খাপে মিলে যাবার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে—স্বতন্ত্র, প্রতিবাদী, অবাধ্য হওয়ার পথে চলে গেছি। ওই রকম বিপরীতগামিতা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। আমি তখনো গভীরভাবে আপন হতে চাই এবং জীবিকার দিক থেকে মূলস্রোতের বাইরে থাকা আমাকে চিরন্তন দুশ্চিন্তা আর অভাববোধে পীড়িত করে। একে এক আদর্শ অবস্থা বলা যাবে না, কিন্তু আমি তখন অনেকটা পথ হেঁটে জেনে গেছি যে স্রোতের টানে হুবহু মিলে গেলে, আমার কাছে ঠিক যা চাওয়া হয়, সেটুকুর বাইরে কিছু না করতে পারলে, আমার অনেক ক্ষতি হবে—হয়তো আমার স্বাস্থ্য, বিয়ে, অথবা আমার নেশা-থেকে-দূরে-থাকার-প্রতিজ্ঞা টিকবে না। এই তিনটে জিনিস না টিকলে আমার চলবে না ব’লে আমি মূলস্রোতের বাইরেই থেকে যাই। অথচ সহযাত্রী চাইছিলাম আমি।

তারপর, ২০১৩ সালে, কয়েকটি অলৌকিক ঘটনা ঘটে। ওপ্রা উইনফ্রি তার ‘সুপার সোউল সানডে’ ব’লে অতি প্রিয় এবং বিপুলখ্যাত টিভি অনুষ্ঠানে আমাকে সাক্ষাৎকার নিতে ডাকেন।

শো-এর আগে শো-এর একজন প্রযোজক এবং আমার ম্যানেজার মারডকের সঙ্গে আমি বাইরে খেতে গেছি। খাবার পর মারডক শুধায়, ‘ব্রেনে, তুমি এখন কোথায়?’

আমি তাকে বেশ চোস্ত এবং চালাক শুনতে একটা উত্তর দিই, ‘মিশিগান আর শিকাগোর কোনা কেটে অবস্থান করছি।’ কিন্তু বলতে গিয়ে মনে হয়, আমি কিছু একটা ভুল করছি। নিজেকে অরক্ষিত লাগছে আমার। মারডক আমাকে বোঝায় কী ভাবে আমি খাওয়ার সময় ‘হাজির’ ছিলাম না। ভদ্র ছিলাম যদিও। আমি মারডকের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘আমি ভয় পেলে যা করি, তাই করছি। আমি আমার জীবনের ওপরে হাওয়ায় ভেসে উঠছি, নিজেকে বাইরে থেকে দেখছি পর্যবেক্ষকের ভূমিকায়, অবিকল বাঁচতে পারছি না।’

মারডক মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। ‘জানি। কিন্তু তোমার সেটা বন্ধ করে জীবনেই ফের ফিরে আসতে হবে। যা ঘটতে চলেছে তা বারবার হবার নয়। একে হেলায় হারানো যাবে না যে। পর্যবেক্ষণ নয়। বর্তমানে উপস্থিত থাকো, ব্রেনে।’

পরের দিন সকালে আমি যখন শো-তে যাবার জন্য প্রস্তুত হই, আমার কন্যা আমাকে এসএমএস করে। ওর ইস্কুলের এক ভ্রমণের ব্যাপারে অনুমোদন জানিয়ে একটা স্লিপে আমার সই দেওয়া হয়েছে কিনা, জানতে চায়। তার এসএমএস-এর জবাব দিয়ে আমি বিছানার এক প্রান্তে বসে বহু কষ্টে কান্না চাপার চেষ্টা করতে থাকি। আমার নিজের একটা অনুমোদনের স্লিপ লাগবে—যেন এতটা গম্ভীর আর আর্ত না হই। সেই মুহূর্তে মাথায় এক খেয়াল চাপে। আমি চারিদিকে তাকিয়ে দেখে নিই কেউ আমাকে লক্ষ করছে কিনা। করছে না জেনে একটা স্লিপে লিখি, ‘তোমাকে উল্লসিত, মজাদার আর অদ্ভুত হবার অনুমোদন দেওয়া হলো।’

এমন এক শ খানা স্লিপ এরপর আমি নিজের জন্য লিখেছি। এখনো লিখি। আমাকে যে তার পাঁচটা মিনিট দিতে রাজি, তাকে আমি এই অভিপ্রায়-ঠিক-করার পদ্ধতি শিখাই। খাসা কাজ করে। শিশুদের চিড়িয়াখানায় যাবার অনুমোদন দিলে তাদের অবশ্য ঠিকই বাসে উঠতে হয়। সেদিন, আমিও বাসে উঠেছিলাম।

তখন আমি বুঝতে না পারলেও এখন জানি ওই অনুমোদন-স্লিপগুলির ভিতর দিয়ে আমি আর কারুর নয়, নিজের আপন হবার চেষ্টা করছিলাম।

ওপ্রা এবং আমার ক্যামেরার সামনে প্রথম আবেগঘন সাক্ষাতের কিছু মিনিটের মধ্যেই আমরা হাসছি, ঠাট্টা করছি। তাকে যেমনটা ভেবেছিলাম দেখা গেল তিনি ঠিক তেমন। তীব্র, সহৃদয়। অমায়িক, সহিষ্ণু। এক ঘণ্টা চোখের পলকে কেটে গেল। আমাদের সময় যখন শেষ, ওপ্রা আমার দিকে ফিরে বললেন, ‘আমাদের আরেক ঘণ্টা করা দরকার—আরেক এপিসোড’। আমি চারদিকে তাকাই অস্বস্তি নিয়ে।

‘সত্যি?’

ওপ্রা মিটমিট করে হাসছেন। ‘সত্যি। অনেক কথা বলা বাকি থেকে গেল যে।’

আমি অন্ধকারে কন্ট্রোল রুম ব’লে যা মনে হচ্ছিল সেদিক দেখিয়ে বললাম, ‘ওদের কি জিজ্ঞেস ক’রে নিতে হবে?’

ওপ্রা আবার মিটমিট হাসছেন। ‘কাকে জিজ্ঞেস করে নিতে হবে ব’লে মনে হয়?’

তার কথায় অহংকার ছিল না, আমার প্রশ্ন তার অদ্ভুত শোনাল।

‘ও, তাই তো বটে। দুঃখিত। তাহলে, হ্যাঁ! অবশ্যই! আমার ভীষণ ভালো লাগবে। কিন্তু পোশাক যে পাল্টাতে হবে! ইশ! আমি মোটে এক সেট জামা নিয়ে এসেছি।’

‘বুট আর জিন্স ঠিক আছে। তোমাকে একটা টপ দিচ্ছি, দাঁড়াও।’

তিনি ভিতরে পোশাক পাল্টাতে যাবার সময় দুই কদম হেঁটে আবার ফিরে তাকিয়ে বলেন, ‘মায়া এঞ্জেলু এসেছেন। কথা বলবে?’

হঠাৎ সব কিছু অন্ধকার হয়ে আসছে। আমি যেন এক সুড়ঙ্গের মুখে দাঁড়ানো। সময় গড়িয়ে মন্থর হচ্ছে। এত কিছু এক দিনে! আমি নিশ্চয়ই মরে গেছি।

‘ব্রেনে? আছো? ডক্টর মায়ার সঙ্গে দেখা করতে চাও কি?’ আমি ভাবছি হয়তো খাড়া পাহাড় দিয়ে এবার আমাকে ঠেলে ফেলা হচ্ছে, এমন সময় ওপ্রা আবার বলেন, ‘চাও?’

আমি চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে বলি, ‘হ্যাঁ! নিশ্চয়ই! অবশ্যই চাই!’

ওপ্রা আমার হাত ধরে আরেকটা গ্রিন রুমে আমাকে নিয়ে আসেন যেখানে আমি পরের এপিসোডের জন্য তৈরি হই। আমরা ভিতরে যাই; দেখি এক টিভি স্ক্রিনের সামনে মায়া বসে আছেন। সেই স্ক্রিনে দুটো শূন্য চেয়ার দেখা যাচ্ছে। ওই চেয়ারে আমি আর ওপ্রা এতক্ষণ বসে কথা বলেছি।

মায়া এঞ্জেলু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কেমন আছেন ডক্টর ব্রাউন? আমি এতক্ষণ আপনাদের কথা শুনছিলাম।’

আমি তার দিকে এগিয়ে তার বাড়িয়ে দেওয়া হাত ধরে বলি, ‘আপনার সঙ্গে দেখা হওয়া কী যে সৌভাগ্যের ঘটনা! আপনি আমার কাছে অনেক কিছু। আমার জীবনের একটা বড়ো অংশ আপনি।’

তিনি আমার হাত ধরে ছিলেন; এবার আরেক হাত আমার সেই হাতের ওপর রাখলেন। ‘আপনি খুব জরুরি কাজ করছেন। থামবেন না। কাউকে থামাতে দেবেন না।’

আমি তখন তাকে বলি, কখনো কখনো পড়ানোর সময় ক্লাসে সব আলো বন্ধ করে দিয়ে আমি তার রেকর্ড করা ‘আমাদের মাতামহ’ কবিতাটা ছাত্রদের শোনাই। কখনো সেই লাইন দুইবার করে বাজাই, ’… আমাকে কিছু নাড়াতে পারবে না ‘

তিনি আমার হাত আরো শক্ত ক’রে ধরেন, আমার চোখের দিকে তাকিয়ে গভীর, ধীর কণ্ঠে বলতে থাকেন, ‘নদীর ধারে বেড়ে ওঠা এক গাছের মতো, আমাকে কিছু নাড়াতে পারবে না।’ তারপর আমার হাতে উষ্ণ চাপ দিয়ে বলেন, ‘নাড়াতে দেবেন না, ব্রেনে।’

যেন তিনি সে মুহূর্তে আমার জীবনে যত সাহস লাগবে সবটুকে সঁপে দিচ্ছিলেন। এক বিশেষ মুহূর্তে দাঁড়িয়ে কদাচিৎ জানা যায়, সে মুহূর্ত আমাদের নির্ধারণ করে দেবে। কিন্তু আমি জানতে পেরেছিলাম তখন। সারা জীবন যে খাপ খাওয়াতে চেয়েছে হঠাৎ মায়া এঞ্জেলু তাকেই গান শোনালে, ‘নাড়াতে দেবেন না’, বললে সে কী করে? কী আর করবে, তার পা দুটো শিকড় হয়ে মাটিতে দাঁড়িয়ে যায়। সে নুয়ে পড়ে, প্রসারিত হয়, বাড়ে, কিন্তু সত্তা থেকে এক চুল না সরার অঙ্গীকার নেয়। অথবা পারতপক্ষে চেষ্টা করে।


আমি তাদের ব্যবসায়ী সত্তার সঙ্গে আলাপ করতে আসি নি। এসেছি আমার হৃদয় ওদের হৃদয়ের সঙ্গে কথা বলুক এই আশায়।


সেই অসম্ভব অবিশ্বাস্য দিনটির ছয় মাস পর আমি দেখি আমি শিকাগোর আরেকটি গ্রিন রুমে বসে আছি। এবার আমি নেতৃত্বের ওপর পৃথিবীর একটি বৃহত্তম সম্মেলনে এসেছি। যারা অনুষ্ঠানের সংগঠক, তারা পইপই করে বলে দিয়েছেন ধোপদুরস্ত কালো পোশাকে হাজির হতে হবে। আমি আমার কালো স্ল্যাক্স আর পাম্প শু-এর দিকে তাকাই। নিজেকে ছদ্মবেশি বলে মনে হতে থাকে।

আমি আরেকজন বক্তার পাশে বসে আছি (তিনি আমার বন্ধু হয়ে যান), জিজ্ঞেস করেন আমার কেমন ঠেকছে। আমি স্বীকার করি আমার বেশ খাপছাড়া লাগছে, মনে হচ্ছে আমি অভিনয় করতে এসেছি। তিনি বলেন যে আমায় দেখতে ‘বেশ ভালো’ লাগছে, কিন্তু তার মুখে লেখা ছিল এক না-শোনা বার্তা ‘কিন্তু উপায় কী, বলুন?’

আমি হঠাৎ উঠে দাঁড়াই; যে দেয়ালে আমাদের সুটকেসগুলো পরিপাটি সাজানো, সেখান থেকে আমার সুটকেস ওঠাই, এবং ওয়াশরুমে গিয়ে পোশাক পাল্টে আসি। আমার পরনে নেভি শার্ট, কালো জিন্স, ক্লগ জুতো—আমার সহজাত পোশাক। মহিলা আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘অসাধারণ। সাহস আছে বটে আপনার!’

জানি না কথাটা তিনি সত্যি ভেবে বলেন কিনা, কিন্তু আমি হেসে জানাই, ‘আসলে তা নয়। এটার প্রয়োজন ছিল। ওই মঞ্চে আমি ‘সত্য হবার সাহস’ নিয়ে কিছুতেই কথা বলতে পারব না, যদি না নিজে চর্চা করি। শারীরিকভাবেই পারব না। এখানে আমি তাদের ব্যবসায়ী সত্তার সঙ্গে আলাপ করতে আসি নি। এসেছি আমার হৃদয় ওদের হৃদয়ের সঙ্গে কথা বলুক এই আশায়।’ এ ঘটনা ছিল নিজের কাছে আপন হবার আরেক ধাপ।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আবার ব্যবসা-বাণিজ্যের জগতের সঙ্গে টক্কর খাই। একটা নোট পড়তে পড়তে দেখি এক সংগঠক লিখেছেন, ‘আমরা শুনলাম আপনি গত বছর এক সম্মেলনে কথা বলেছেন। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় আছি আপনি আমাদের পরিচালকদের সঙ্গেও কথা বলবেন! আমরা আপনাকে বলতে শুনেছি, মানুষের গভীর মূল্যবোধগুলি জানা দরকার—সে কথা আমাদের ভালো লেগেছে। আপনি অবশ্য বলছিলেন আপনার চালিকা-মূল্যবোধের দুটোর একটা নাকি বিশ্বাস। কিন্তু যেহেতু আমরা এই মুহূর্তে ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে কথা বলছি, সুতরাং আপনাকে অনুরোধ করি বিশ্বাস নিয়ে কিছু না বলতে। আপনার প্রধান মূল্যবোধের আরেকটি, আপনি জানিয়েছেন—সাহসিকতা। আপনি সেটাতেই আপনার বক্তব্য সীমাবদ্ধ রাখুন, দয়া করে।’

আমি বুঝতে পারছি আমার বুকের খাঁচায় টান পড়ছে, আমার চোখমুখ লাল হয়ে উঠছে। গত বছর ঠিক এমন এক ঘটনা ঘটে। যদিও ঠিক এর উলটো মেরুর ঘটনা বলা চলে তাকে। একটি অনুষ্ঠানের সংগঠক আমাকে বলেছিলেন, ‘আমার সোজাসাপটা ঘরোয়া কথা বলার ধরন’ তার পছন্দ হয়, কিন্তু আমি যেন কথা বলার সময় মুখ খারাপ না করি, কারণ তা করলে বিশ্বাসী শ্রোতাদের আমি হারাব; তারা হয়তো আমাকে ক্ষমা করে দেবে—তবে চোট পাবে ঠিকই।

বাজে কথা। আমি এ পারব না। তার চেয়ে কিছু না বলাই ভালো। দৌড়ঝাঁপের এইখানেই ইতি।

সারা জীবন আমার মানুষের অভিজ্ঞতা শুনে কেটেছে। তাদের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তের কথা। সবচেয়ে বেদনাময় সময়ের কথা। পনের বছর ধরে এই কঠিন কাজ করার পর আমি আত্মবিশ্বাস নিয়েই বলতে পারি বেদনা আর সাহসের প্রতিটি গল্পেই দুটি সর্বজনীন বিষয় আছে—প্রার্থনা আর মুখখারাপ। দুটো কখনো এক সঙ্গে ঘটে।

আমি আমার স্নিকারস পরে আর ঘরের বাইরে বেরিয়ে যাই। বাড়ির সীমানা ছাড়িয়ে যেতেই আমি এই চিঠি এবং এই ধরনের সব চিঠির জবাব কী দেবো, বুঝে উঠতে পারি : আপনি যদি ভেবে থাকেন মানুষের সত্যিকার অভিজ্ঞতার পুঁজ আর পাঁক আমি পরিষ্কার করে উপস্থাপন করব, অথবা ঘষে মেজে নেব, আপনি ভুল করছেন। আমি খুব একটা মুখখারাপ নিশ্চয়ই করব না, কিন্তু দুএকটা আটপৌরে মুখখিস্তি যদি আপনারা সহ্য করতে না পারেন, এমন ভাব দেখান যে মুখখারাপ করার অর্থ আমার বিশ্বাস টিশ্বাস নেই, তাহলে এটা আমার জায়গা নয় । বক্তার যখন অভাব নেই, আপনারা তাদের নিয়ে আসুন যারা ধোপদুরস্ত, পরিপাটি, অথবা যারা স্রেফ মুখে কুলুপ এঁটে রাখে। আমি সে বান্দা নই । ব্যাস।

আমাকে নাড়ানো যাবে না!

স্টিভ বাড়ি ফিরলে আমার এই সর্বশেষ সিদ্ধান্ত জানিয়ে ওর পাশে বসে ওর কাঁধে মাথা রাখলাম। ‘বড্ড কঠিন মনে হয়,’ আমি বলি, ‘আমি কোথাও খাপ খাওয়াতে পারি না। কোথাও আপন হতে পারি না। কোথাও না। যেখানে যাই, আমি একজন বহিরাগত যে নিয়ম ভাঙে, যে এমন কথা বলে যা আর কেউ বলে না। আমার কোনো সহযাত্রী নেই। এমনভাবেই সারাটা জীবন কেটে গেল।’

স্টিভ আমাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করল না। বরং মাথা নাড়িয়ে জানাল, আমি আসলে কোনো বিশেষ দলে পড়ি না। এও বলল, আমি স্টিভ, এলেন আর চারলির আপনজন এবং ওদের সামনে আমি যত খুশি প্রার্থনা আর মুখখারাপ করতে পারি।

আমি একটু ম্লান হাসি, কিন্তু চোখ ভিজে যেতে থাকে। ‘সারা জীবন আমি বাইরেই থেকে গেলাম,’ বলি তাকে, ‘ব্যাপারটা এমন কঠিন। কখনো কখনো আমাদের বাড়ি সে একমাত্র জায়গা যেখানে আমার অসম্ভব একা লাগে না। আমি হয়তো যে পথে আছি সে পথটা ঠিক মতো বুঝে উঠতে পারি নি—এখানে তো আর কেউ নেই। কেউ বলছে না, ‘তোমার আগে এরকম একজন আছে—যিনি একাধারে অধ্যাপক, গবেষক, কথক, নেতৃত্বের সংগঠক, বিশ্বাসী, মুখখারাপ করা লোক।

স্টিভ আমার হাত ধরে বলে, ‘বুঝতে পারি এটা কতটা কঠিন। তোমার নিশ্চয়ই একা লাগে। তুমি কিছুটা অদ্ভুতও বটে—অনেক দিক থেকে খুব আলাদা। কিন্তু ব্যাপার হলো—ওই বিশাল নেতৃত্বের সম্মেলনে বিশ জন বক্তার মধ্যে তুমি ছিলে শ্রোতাদের বিচারে সেরা বক্তা। সাদামাঠা ঘরোয়া পোশাকেই এমন হয়েছিল। যদি তা-ই হয়, ওই মঞ্চ তো তোমারই। তুমি যেখানেই নিজের সত্তাকে মেলে ধরবে, নিজের কাজ নিয়ে প্রাণ খুলে কথা বলতে পারবে, সেটাই তোমার নিজের জায়গা।’

ঠিক সে মুহূর্তে ব্যাপারটা ঘটে।

আমি মায়া এঞ্জেলুর কথাটার গভীর ও ব্যবহারিক তাৎপর্য বুঝতে পারি। আমি স্টিভকে চুমু খেয়ে, দৌড়ে আমার পড়ার ঘরে ঢুকি, ল্যাপটপে বসি আর গুগলে মায়ার সেই বিখ্যাত উদ্ধৃতি খুঁজি। ল্যাপটপটা স্টিভের কাছে নিয়ে গিয়ে ওকে পড়ে শোনাই :

আমরা কেবল তখন মুক্ত যখন আমরা অনুধাবন করি, কোনো জায়গা আমাদের আপন নয়—আবার সব জায়গা আমাদের আপন। এর জন্য চড়া দাম দিতে হয়। পুরস্কারও অনবদ্য।

আরে ঠিক সেই মুহূর্তে আমি নিজেকে আগাগোড়া যেভাবে দেখে এসেছি, ছোট একটা নিঃসঙ্গ, ম্লান মেয়ে যে ইস্কুলের তালিকায় নিজের নাম খোঁজে কোনো জায়গার সঙ্গে একাত্ম হবার জন্য, সেই ছবিটা আমূল পাল্টে যায়। আমার কাজে আমি সফল হয়েছি। আমার একজন দারুণ জীবনসঙ্গী আছে, অসাধারণ দুটো ছেলেমেয়ে আছে। কিন্তু সে মুহূর্তের আগে আমি আমার নিজের ভুবনের কাছে, আমার জন্মসূত্রে পাওয়া পরিবারের সঙ্গে যেন আপন হতে পারি নি।

স্টিভ টের পায় কিছু একটা পরিবর্তন ঘটছে। ‘এর জন্য চড়া দাম দিতে হয়, ঠিক। কিন্তু পুরস্কার হলো তোমার কাজ জগতর কাছে খোলামেলা পৌঁছতে পারছে। যারা তাদের কাহিনি খুলে বলেছে তোমায়, তাদের সঙ্গে সৎ থেকে।

আমি তাকে জিজ্ঞেস করি একা দাঁড়িয়েও সত্যিকার অর্থে সব জায়গাকে আপন করে পাওয়ার এই অদ্ভুত দ্বৈততা সে বুঝতে পারছে কিনা। সে বলে, ‘হ্যাঁ। কখনো কখনো আমারও এমন হয়। এর মধ্যে একটা আপাতবিরোধী ব্যাপার আছে। নিজেকে একা লাগে, আবার একই সঙ্গে শক্তি পাওয়া যায়। অনেক সময় শিশুডাক্তার হওয়া সত্ত্বেও আমি ছোটদের এন্টিবায়োটিক ওষুধ দিতে বারণ করি। এতে শিশুদের মা-বাবারা বিরূপ হন। আমাকে বলেন, ‘শিশুডাক্তার সকলে এন্টিবায়োটিক দিয়ে থাকেন। এ আবার কেমন চিকিৎসা! আমরা অন্য কারুর কাছে যাই।’ ডাক্তার হয়ে এ কথা শোনা সহজ নয়, কিন্তু আমি সবসময় মনে করি : ‘আমি শিশুর জন্য যা ভালো বলে বিশ্বাস করি সেটাই বলেছি। ব্যস।’

আমার চিন্তায় যেন আরো একজোড়া চাকা যোগ হয়। আমি বলি, আমি যদিও একা দাঁড়ানোকে এক অরক্ষিত, সাহসী অবস্থান হিসেবে চিনতে পারছি, তারপরও আমি জানি—একটা যোগসূত্র একটা একাত্মতাবোধের জন্য আমাদের মধ্যে আকুলতা থেকে যায়। আসলে আমি নিজস্ব এক ‘বাহিনী’ চাই। “সেই ‘বাহিনী’ তো তোমার আছে।” স্টিভ বলে, ‘যদিও সে এক ছোট বাহিনী। আর তোমার বাহিনীতে সকলেই একভাবে চিন্তা অথবা কাজ করবে এমন তো নয়। সত্যি বলতে কি, সেরকম বাহিনী আমাদের সকলের আছে।’ আমি টের পাই ওর কথা ঠিক, কিন্তু তারপরও ব্যাপারটা তলিয়ে দেখতে ইচ্ছে করে।

অবশেষে আমি উঠে দাঁড়াই। স্টিভকে জানাই আমাকে এই সবকিছুর মানে বের করতে হলে মায়া এঞ্জেলুর উদ্ধৃতি আর আমার সংগ্রহের সমস্ত উপাত্তের কাছে ফিরে যেতে হবে। ওর উত্তরে স্টিভ যা বলে তা মনে করলে এখনো হাসি পায়। ‘ও, হ্যাঁ। এবার কী হবে আমার জানতে বাকি নেই। তোমার গবেষণার ওই খরগোশের গর্তের মধ্যে খাবার পৌঁছে দিতে হবে তো? দেবো। গতবার সেই গর্ত থেকে বেরোতে তোমার দুই বছর লেগেছিল।’

আমি বিল ময়ার আর মায়া এঞ্জেলুর সেই সাক্ষাৎকার খুঁজে বের করে ফের খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ি। শেষের অংশ এত দিনে খেয়াল করে পড়লাম :

ময়ারস : আপনি কোথাও আপন বোধ করেন?

মায়া : এখনো করি নি।

ময়ারস : এমন কেউ আছে আপনি যার আপন?

মায়া : তা আছে বৈকি। রোজ একটু একটু করে সেই মানুষের সঙ্গে আমার আপন হওয়া কেবল বেড়েই চলেছে। সত্যি বলতে কী, আমি নিজেরই পরম আপন। এতে এক ধরনের গর্ব আছে, বুঝলেন? আমি মায়ার দিকে কেমন করে তাকাই সে ব্যাপারে আমার যথেষ্ট নজর দিতে হয়। ওর সাহস আর রসবোধ আমার দিব্যি লাগে। আমি যখন এমন কিছু করি যা আমাকে অখুশি করে, তখন… তখন সে ব্যাপারে আমাকে সচেতন হতে হয়।

আমি এই আলোচনা পড়া শেষ করে ভাবি, মায়া মায়ার আপন। আমি আমার আপন। এবার বুঝলাম। এখনো পুরোটা বুঝি নি, কিন্তু বুঝতে শুরু করেছি।

এবার গবেষণার গর্ত থেকে বেরোতে লাগে চার বছর। আমি পুরোনো উপাত্তে ফিরে যাই। নতুন উপাত্ত জমাই। আর ক্রমশ ‘আপন হবার তত্ত্ব’ জমাট বাঁধতে শুরু করে।

টের পাই আপন হওয়া কাকে বলে বুঝতে অনেক বাকি থেকে গেছে।

আনন্দময়ী মজুমদার

আনন্দময়ী মজুমদারের ছোটবেলা কেটেছে স্বদেশে ও আফ্রিকায়। উচ্চমাধ্যমিক পড়াশোনা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল ও কলেজে এবং স্নাতক ও স্নাতকোত্তর কলকাতার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউটে। পরিসংখ্যানে পিএইচডি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে। সতের বছর বয়সে তার প্রথম অনুবাদ পাবলো নেরুদার ‘স্মৃতিকথা’ হাসান আজিজুল হক সম্পাদিত ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘প্রাকৃত’-তে প্রকাশিত হয়। অধ্যাপনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে।

প্রকাশিত ও প্রকাশিতব্য বই—

সূর্যোদয়ের গান [অনুবাদ; জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, ১৯৯৯]
দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ [অনুবাদ, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, ২০০১]
পাবলো নেরুদার স্মৃতিকথা স্মৃতিকথা [অনুবাদ; সময়, ২০১৩]
ভালোবাসার শত সনেট [অনুবাদ; ইত্যাদি, ২০১৫]
ছোট্ট রাজপুত্র [অনুবাদ; প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৬]
[ঘরে ফেরার গান ও অন্যান্য কবিতা, অনুবাদ, বেঙ্গল, ২০১৮]
ছোট্ট মিঠি রোদ্দুর [অনুবাদ,দ্যু প্রকাশনী, ২০১৭]
ছোট্ট মেয়ে টিপটপ [অনুবাদ,দ্যু প্রকাশনী, ২০১৭]
ছোট্ট মেয়ে তম্বিতম্বা [অনুবাদ,দ্যু প্রকাশনী, ২০১৭]
তুমি কি আজ বালতি ভরেছ? [অনুবাদ, বাতিঘর, ২০১৭]

‘Gitabitan in English’ নামের একটি ব্লগে রুমেলা সেনগুপ্ত ও আনন্দময়ী মজুমদার রবীন্দ্রনাথের ‘গীতবিতান’-এর প্রায় এক হাজার গানের অনুবাদ করেছেন। আনন্দময়ী মজুমদার এক জন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ও প্রশিক্ষক। রবীন্দ্রগানের ইংলিশ অনুবাদগুলোও তিনি পরিবেশন করে থাকেন।

ই-মেইল : anandamayee.majumdar@gmail.com

Latest posts by আনন্দময়ী মজুমদার (see all)