হোম অনুবাদ বিদায় নিচ্ছি বন্ধু

বিদায় নিচ্ছি বন্ধু

বিদায় নিচ্ছি বন্ধু
647
0

পাঞ্জাবের বিপ্লবী কবি অবতার সিং সন্ধু (৯ সেপ্টেম্বর ১৯৫০- ২৩ মার্চ ১৯৮৮), যিনি পাষ নামেই সকলের কাছে পরিচিত। ১৯৭০’র নকশাল আন্দোলনে পাঞ্জাবি সাহিত্যের অন্যতম বিপ্লবী কবি ছিলেন পাষ। মাত্র আঠারো বছর বয়সে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ লৌহকথা প্রকাশিত হয়। তিনি ভারতের একমাত্র কবি যিনি অল্প বয়সে বিপ্লবী কবিতার মাধ্যমে সমগ্র ভারতে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ভারতবর্ষে বিপ্লবীদের মধ্যে ভগৎ সিং যেমন স্মরণীয় ঠিক তেমনি বিপ্লবী লেখকদের মধ্যে পাষও স্মরণীয়। বিপ্লবী চেতনা এবং চলমান আন্দোলনের জন্য তিনি দুই বছর কারাদণ্ড ভোগ করেন। জেল থেকে পুরোপুরি অব্যাহতি পাওয়ার পর পর ১৯৭২-এর দিকে পাঞ্জাবের মাওবাদী ফ্রন্টের সঙ্গে যুক্ত হন এবং একটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ১৯৮৫ সালে ‘পাঞ্জাব একাডেমি অব লেটারস’ পাষকে ফেলোশিপ পুরস্কৃত করে। ১৯৮৫’র পর পাষ যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের সময় ‘অ্যান্টি-৪৭’ ফ্রন্ট এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন এবং শিখ চরমপন্থিদের বিরোধিতা শুরু করেন। ১৯৮৮’র ২৩ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র পৌঁছানোর একদিন আগে খালিস্তানি চরমপন্থিদের হাতে নিহত হন তিনি। কবিতা মূল হিন্দি থেকে বাঙলায়ন করেছেন অজিত দাশ


❑❑

আমি এখন বিদায় নিচ্ছি বন্ধু,
আমি এখন বিদায় নিচ্ছি
আমার একটি কবিতা লেখার কথা ছিল—
যে কবিতা তুমি সারা জীবন ধরে পড়বে
সেই কবিতায়—
হাওয়ায় দুলে পড়া ধনিয়ার কথা থাকবে
আখের পাতার সরসর শব্দ,
গাছের পাতা থেকে ঝরে পড়া শিশির আর
বালতিতে দুইয়ে রাখা দুধের ফেনার গান থাকবে
আর যা কিছু আমি তোমার শরীরে দেখেছি
সেগুলোর গল্প থাকবে—
আমার শক্ত মুঠো হাতের হাসি থাকবে
আমার জঙ্ঘায় সাঁতরানো মাছের কথা
আর আমার বুকে ছেয়ে যাওয়া নরম পশমের চাদরে
লেপ্টে থাকা স্নিগ্ধতার কথা থাকবে
সেই কবিতায়—
তোমার জন্য
আমার জন্য
আমাদের জীবনের সকল সম্পর্কগুলোর জন্য আরো অনেক কিছু
বলে যাওয়ার কথা ছিল বন্ধু—কিন্তু পৃথিবীর সেই
নারকীয় দৃশ্যগুলোর সঙ্গে বোঝাপড়া এতটাই ভাষাহীন!
আর যদি আমি লিখেই ফেলতাম
শুভ মুহূর্তে পূর্ণ সেই কবিতা
তাহলে তৎক্ষণাৎ সেই কবিতারও মৃত্যু হতো
তোমাকে আর আমাকে বুকের উপর বিলাপ করতে ছেড়ে দিয়ে
কবিতা যতটা নিস্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে বন্ধু, বিপরীতে
ঘাতকদের নখ বেড়ে চলছে আরো দ্রুত
আর এখন যে কোনো কবিতা লেখার আগে ঘাতকদের
সঙ্গে যুদ্ধ করা জরুরি হয়ে পড়েছে
আর যুদ্ধে সবকিছুই যেন সহজে স্পষ্ট হয়ে যায়
নিজের কিংবা শত্রুর নাম লিখে ফেলা যায় অনায়াসে
আর ঠিক সেই মুহূর্তে—
আমাকে চুম্বনের জন্য বাড়িয়ে দেওয়া
তোমার গোলাকার ঠোঁটের বর্ণনা
পৃথিবীর কোনো উপমার সঙ্গে মিলিয়ে নিও
অথবা তোমার কোমরের দোলনীকে
সমুদ্রের নিশ্বাসের সঙ্গে তুলনা করো
খুব হাস্যকর মনে হয়
আমি এমন কিছুই করি নি
আমার আঙিনায় আমার শিশুকে খেলতে দেয়ার,
তোমার যে বাসনা, আর যুদ্ধের যৌক্তিকতাকে
একই সারিতে দাঁড় করানো আমার পক্ষে সম্ভব হলো না
আর আমি এখন বিদায় নিচ্ছি বন্ধু—আমরা মনে রাখব
সারাদিন কামারের চুল্লির মতো জ্বলতে থাকা
আমাদের গাঁয়ের টিলা, রাতের বেলা
ফুলের মতোই সুবাস ছড়াতে থাকে
আর জ্যোৎস্না রাতে গলে পড়া চাঁদের আলোয়,
আখের পাতার গাদায় শুয়ে স্বর্গকে গালি দেওয়া
অনেক আনন্দের যদিও, তবে আমাদের মনে রাখতে হবে—
হৃদয়ের পকেট যখন শূন্য তখন স্মৃতিচারণই একমাত্র আনন্দের
আর আমি এই বিদায়ের মুহূর্তে ধন্যবাদ দিতে চাই
আমাদের মিলনের মুহূর্তে
যারা তাবুর মতো মাথার উপরে ছায়া দিয়েছিল,
সেই জায়গাগুলোকে যারা আমাদের
মিলনে নতুন করে সেজেছিল
আমি ধন্যবাদ দিতে চাই আমার মাথার ওপরে বয়ে যাওয়া
তোমার মতো হালকা সেই হাওয়াকে
যে তোমার অপেক্ষায় আমার মন যোগিয়ে রাখত
আমি ধন্যবাদ দিতে চাই পথে বিছানো কোমল রেশমি ঘাসগুলোকে
যারা তোমার পায়ের দুলনিতে মাদুরের মতো বিছিয়ে থাকত
শুষ্কফলের খোল থেকে উড়ে আসা তুলাগুলোকে
যারা কখনোই কোনো অনুযোগ না করে, হাসি দিয়ে
আমাদের জন্য বিছানা হয়ে গিয়েছিল
আখের পাতায় ভনভন করা একদল পোকাদের
যারা আশপাশ থেকে আসা শুব্দগুলো আটকে রাখত
যুবতী হয়ে ওঠা গমের বালিগুলোকে
যারা বসে থাকা অবস্থায় না হলেও,
অন্তত শুয়ে থাকলে আমাদের ঢেকে রাখত
আমি ধন্যবাদ দিতে চাই সরিষার নাজুক ফুলগুলোকে
যারা কয়েকবার আমাকে সুযোগ করে দিয়েছে
তোমার চুল থেকে হলুদ রেণু ছাড়িয়ে দেওয়ার জন্য
আমি পুরুষ, অনেক ছোট-ছোট জিনিস
জোড়া দিয়ে নিজেকে গড়েছি
আর সেইসব জিনিসগুলোর জন্য
যারা আমাকে এলোমেলো হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছে
আমি কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই
ভালোবাসা অনেক সহজ
অপরদিকে নির্যাতিত হয়ে নিজেকে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করা
অথবা গুপ্তবাসে, কোনো পাহাড়ের গুহায় পড়ে থেকে
শরীরে লেগে যাওয়া কোনো গুলির ক্ষত
শুকিয়ে যাওয়ার দিন কল্পনা করা
ভালোবাসা অথবা লড়াই করা
জীবনের প্রতি ইমান নিয়ে আসা-বন্ধু
এটাই হলো আলোর মতো করে পৃথিবীতে খেলে যাওয়া
আর পুনরায় আলিঙ্গনে ডুবে যাওয়া
বারুদের মতো জ্বলে ওঠা
আর চারদিকে ছড়িয়ে পড়া—
বেঁচে থাকার এই তো মূলমন্ত্র
ভালোবাসা এবং বেঁচে থাকা তাদের পক্ষে কোনোদিন সম্ভব নয়
জীবন যাদেরকে বেনিয়া করে দিয়েছে
রক্ত-মাংসের সম্পর্ক বোঝা
খুশি এবং ঘৃণার মধ্যে কখনো কোনো দাগ না টানা
জীবনের প্রতিটি রূপে মুগ্ধ হয়ে থাকা
ভয়কে জয় করে মুখোমুখি হওয়া এবং বিদায় নেওয়া
অনেক বড় সুরভিরের কাজ বন্ধু
আমি এখন বিদায় নিচ্ছি

তুমি ভুলে যেও
আমি তোমাকে কিভাবে আমার
দৃষ্টিতে পেলে বড় করেছি
আমার দৃষ্টি এমন কী করে নি তোমার
নঁকশার আকার বেঁধে দিতে
আমার চুম্বনগুলো কেমন সুন্দর করে
দিয়েছে তোমার মুখের লাবণ্যকে
আমার আলিঙ্গনগুলো তোমার মোমের মতো
শরীরকে কিভাবে সাজিয়েছিল
তুমি এই সব কিছু ভুলে যেও বন্ধু
শুধু এইটুকু ছাড়া—আমার বেঁচে থাকার ভীষণ ইচ্ছে ছিল
আমি গলা পর্যন্ত ডুবে জীবনকে উপভোগ করতে চেয়েছিলাম
আমার যেটুকুজীবন, সেটুকুও তুমি বেঁচে নিও বন্ধু
সেটুকুও তুমি বেঁচে নিও।


ঈদসংখ্যা ২০১৯

অজিত দাশ

কবি ও অনুবাদক।

জন্ম ১৯৮৯, কুমিল্লা।কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে চাকরি করছেন।

প্রকাশিত বই—

ওশোর গল্প [অনুবাদ, বেহুলাবাংলা, ২০১৮]
প্রজ্ঞাবীজ [অনুবাদ, মাওলাব্রাদার্স, ২০১৯]

ই-মেইল : ajitmitradas@gmail.com

Latest posts by অজিত দাশ (see all)