হোম অনুবাদ বই থেকে : ফিলিস্তিনি ক্ষতের দিনপঞ্জি

বই থেকে : ফিলিস্তিনি ক্ষতের দিনপঞ্জি

বই থেকে : ফিলিস্তিনি ক্ষতের দিনপঞ্জি
1.17K
0

মাহমুদ দারবিশ। ফিলিস্তিনের জাতীয় কবি। ১৯৪১ সালের ১৩ মার্চ ফিলিস্তিনের গালিলি প্রদেশের আল-বিরওয়াহ গ্রামে জন্ম। আরবি কবিদের মধ্যে যারা সংগ্রাম, স্বাধীনতা ও দেশের কবিতার জন্য খ্যাত ছিলেন তিনি তাদেরই অন্যতম। শুধু ফিলিস্তিন নয়, গোটা আরবজুড়েই তার সুখ্যাতি। সাহিত্য জগতে তাকে আরব বিশ্বের কণ্ঠস্বর বলা হয়। ১৯৪৮ সালে ইসরাইলিদের আক্রমণের ফলে মাত্র ছয় বছর বয়সে গভীর রাতে সপরিবারে লেবাননের পথে রওনা করেন। এরপর থেকে আমৃত্যু কোথাও স্থির থাকতে পারেন নি। কখনও মিসর, কখনও বৈরুত, কখনও প্যারিস, কখনও কায়রো, কখনও তিউনিস, আবার কখনও খোদ প্যালেস্টাইনে নিজভূমে পরবাসী হয়ে। সর্বশেষে ২০০৮ সালের ৯ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে মৃত্যুবরণ করেন।

শৈশব থেকে কবিতা চর্চা শুরু করেন মাহমুদ দারবিশ। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ আসাফির বিলা আজনিহা প্রকাশ হয় ১৯৬০ সালে ১৯ বছর বয়সে। এই গ্রন্থে প্রেমের কবিতা প্রাধান্য পেলেও ১৯৬৪ তে প্রকাশিত তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ আওরাক আল-যায়তুন ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের কবি খ্যাতি এনে দেয়। প্রতিরোধের কাব্য নামে আরবি কাব্যে যে নতুন ধারার সূচনা হয়েছিল তার অন্যতম প্রতিনিধিত্বকারী কবি তিনি। মাহমুদ দারবিশের প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ৩০টির বেশি এবং প্রবন্ধগ্রন্থ সংখ্যা ৮। পরস্পর-এর পাঠকের জন্য দারবিশের পাঁচটি কবিতার অনুবাদ করেছেন আদিল মাহমুদ।


চাই না শেষ হোক এই কবিতা
◘◘

আমি চাই না শেষ হোক এই কবিতা। এই কবিতার কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ থাকুক চাই না। এই কবিতা নির্বাসনের বা কোনো এক রাষ্ট্রের মানচিত্র হয়ে উঠুক এটাও চাই না। মিলনাত্মক পরিণতিতে কিংবা মৃত্যুর মধ্য দিয়ে—যে ভাবেই হোক না কেন এই কবিতার সমাপ্তি আমি চাই না।

কবিতা যেমন প্রত্যাশা করে—আমি চাই ঠিক তেমনই হয়ে উঠুক এই কবিতা। হয়ে উঠুক অন্য কারও কবিতা। আমার প্রতিপক্ষের কবিতা। আমার সহযোদ্ধাদের কবিতা। আমি চাই এই কবিতা হয়ে উঠুক আমার বন্ধু ও শত্রুর কাছে প্রার্থনার এক ভাষা। যেন এর ভেতর থেকে যে আহ্বান জানাচ্ছে—সে আমি উপস্থিতিহীন এক বক্তা।

ঠিক যেন এই কবিতার উচ্চারণে সৃজিত প্রতিধ্বনিই আমার দেহকাঠামো। আর এরকম যে, আমিই আসলে তুমি ও তোমরা কিংবা আমরা নই অন্যরা। যেন আমি মানেই আমার ভেতরের অন্য আরেক আমি।

[‘লা উরিদু লিহাযিল কাসিদাতি আন তানতাহি’ অবলম্বনে]


অবরোধ কালে
◘◘

এখানকার পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায়
অস্তমিত সূর্য ও সময়ের কামানগুলোর দিকে মুখ করে
চূর্ণবিচূর্ণ ছায়াগুলোর বাগিচা ঘেঁষে
আমরা সেটাই করছি—
বন্দিরা যা করে, কর্মচ্যুত মানুষেরা যা যা করে
—আমরা স্বপ্নের চাষাবাদ করছি

শুভ্র সকালের প্রস্তুতি নিচ্ছে একটি দেশ
নির্মেধা হয়ে ওঠেছি আমরা
খুব কাছে থেকে লক্ষ করছি—
বিজয়ের মুহূর্ত আসছে আমাদের
আর কোনো রাত্রি গোলা-বারুদে আলোকিত হবে না
শত্রুরা সতর্ক পাহারা বসিয়েছে
আবার তারাই জেলখানার অন্ধকার খুপরিগুলোতে—
আলো জ্বেলে দিচ্ছে।

এখানে কোনো আমি নেই—
এখানে আছে আদমের শরীরের কাঁদা থেকে আগত ধূলিকণা
মৃত্যুর কাছে ঝুঁকে পড়ে সে বলছে—
পরাভূত হওয়ার জন্য আমার কোনো নিশানাও রইল না
মুক্ত আমি—স্বাধীনতা খুব সন্নিকটে
ভবিষ্যৎ রইল নিজের হাতে
খুব দ্রুত ঢুকে পড়ব জীবনের কেন্দ্রজুড়ে
জন্মাব পিতৃমাতৃহীন মুক্ত-স্বাধীন হয়ে
আমার নাম রাখব নীলসিয়া আকাশের চিঠি।

দরজার ওপাশে যে তুমি দাঁড়িয়ে আছ
ভেতরে আসো
আরবীয় কফি পান করো আমাদের সাথে
বোধোদয় হবে তোমার—
তুমিও মানুষ আমাদের মতো।
যে তুমি দাঁড়িয়ে আছ
ফিলিস্তিনের গৃহগুলোর দোরগোড়ায়
সকালের চা-পানের সময় বেরিয়ে এসো
আমরা পুনর্নিশ্চিত করব—
আমরাও তোমাদের মতোই মানুষ।

বোমারু বিমানগুলো যখন ফিরে যায়
শ্বেতপায়রার ঝাঁক উড়ে ওঠে—
ধুয়ে-মুছে চকচকে করে তোলে গালদুটি
তাদের অবারিত ডানায় ফিরিয়ে আনে দীপ্তিময়তা
দখলে নিয়ে নেয় নির্মল আকাশ—
ডিগবাজিময় খেলায়।
উঁচু থেকে আরও উঁচুতে—
আনন্দে শ্বেতপায়রার ঝাঁক উড়ে ওঠে

আমার বন্ধুরা
সর্বদাই আমার শেষতম ভোজসভা
আয়োজনে ব্যতিব্যস্ত
তারা আমাকে ওক গাছের ছায়ায়
মনোলোভা এক কবর দিতে চায়
মার্বেল পাথরে খোদাই করে—
দিতে চায় সময়ের সমাধিলিপি।
প্রতিটি শবযাত্রায় আমি তাদের পূর্বাভাস দিয়ে যাচ্ছি
তা হলে কে মরছে এরপর… কে?

লেখালেখি কুকুরছানার মলত্যাগের মতো—
একটা যাচ্ছেতাই ব্যাপার
লেখালেখি মানেই রক্তের নিশানাহীন
নিজেকে কেটে ফালি ফালি করা।

[‘হালাতু হিছারিন’ অবলম্বনে]


জেরুজালেম
◘◘

একটা প্রাচীন দেয়ালের আড়ালে
জেরুজালেমে হেঁটে যাই যুগ যুগ ধরে
পথ দেখিয়ে নেবে এমন কোনো স্মৃতি ছাড়াই
যে সব মহাপুরুষেরা ওখানে আছেন
তারা তো পুণ্যাত্মাদের ইতিহাসের অংশ
স্বর্গধামে উন্নীত—
আসেন কম হতাশা ও বিষণ্নতা নিয়ে
কারণ, প্রেম ও শান্তি যে পূতপবিত্র
নগরীর পানে তা ধেয়ে আসছে

আমি নিচু জায়গা দিয়ে
নামতে নামতে ভাবতে থাকি
সেই মানুষগুলো কিভাবে বলেছিলেন—
সরল কিন্তু পাথরের মতো ভারী কথাগুলো?
এটি কি সেরকম এক পাথর
যাতে যুদ্ধের দামাম বেজে ওঠে?

আমি ঘুমের ভেতর হাঁটি
ঘুমের মধ্যে তাকিয়ে থাকি
দেখি পারাপার জুড়ে কোথাও কেউ নেই
আমি হাঁটতে থাকি
হালকা লাগে নিজেকে
আমি ভেসে বেড়াই বাতাসে
প্রকাশিত হই বহুরূপে
দেবদূতের মুখের কথা যেন
গজিয়ে ওঠে দুর্বাদলের মতো—
‘যদি তোমাদের বিশ্বাস না হয়
তো বিশ্বাস করো না’

হেঁটে চলি অন্য কেউ হয়ে
একটা ঐশ্বরিক সাদা গোলাপের ক্ষত—
আছে আমার নিভৃতে
হাত দু’টো একজোড়া কবুতর হয়ে
ক্রুশের উপর ঝুলে থাকে
অনাদিকাল এই পৃথিবীর ভার বয়ে—
আমি তখন হাঁটি না, ভাসি অন্য কেউ হয়ে
বহুরূপে আমার প্রকাশ ঘটে
দেশ নেই, কাল নেই, কে আমি!?

আমি বিশেষ কেউ নই
অনিমন্ত্রিত উপস্থিতি মাত্র—
কিন্তু ভাবতে থাকি নিজে নিজেই
নবি মুহাম্মদ যে ভাষায় কথা বলতেন—
তা আমারই মাতৃভাষা
‘ঠিক আছে, এরপর কী?’
তারপর এক নারী সৈনিক চিৎকার করে বলে—
আবার তুই এখানে?
আমি না তোকে হত্যা করলাম?
আমি বললাম, হাঁ—
তুমি আমাকে খুন করেছিলে
তবে আমি ভুলে গেছি তোমার মতো—
আমি মৃত্যুকে মনে রাখি নি

[‘ফিল কুদসি’ অবলম্বনে]


কৃতকর্মের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করো না
◘◘

তোমার কৃতকর্মের জন্য—
কখনোই ক্ষমা প্রার্থনা করো না।

আমি মনে মনে নিজেকে বললাম
নিজের অন্য সত্তাকে বললাম
‘এসবই তো তোমার দৃশ্যমান স্মৃতিসমূহ—
বিড়ালের ঝিমুনিতে দুপুরের একঘেয়েমি
মোরগের ঝুঁটি
ক্ল্যারির সুগন্ধ
আম্মার বানানো কফি
বিছানা ও গদি
ঘরের লোহার দরজাখানা
সক্রেটিসের চারপাশে উড়ে বেড়ানো মাছি
প্লেটোর মাথার উপরে মেঘ
উদ্দীপনাময় কবিতার সংকলন
বাবার ছবি
মুয়জামুল বুলদান
শেক্সপিয়র
তোমার তিন ভাই ও তিন বোন
শৈশবের বন্ধুরা এবং অন্যান্যরা।’

‘এই কি সে?’
—উপস্থিত সবাই একমত হতে পারল না
হয়তো সে বা তার মতো অন্য একজন

আমি জিজ্ঞেস করলাম
‘তাহলে সে কে?’
কিন্তু তারা আমাকে উত্তর দিল না

আমি নিজেকে ফিসফিস করে বললাম
‘সে কি আসলেই ‘তুমি’ ছিলে? … আমি?’
দৃষ্টি অবনত হলো।
তারপর তারা আমার আম্মার দিকে ঘুরে তাকাল
যেন তিনি সাক্ষ্য দেন—
আমিই সে।

[‘লা তাযতাযির আম্মা ফাআলতা’ অবলম্বনে]


বৈরুত
◘◘

কুচকুচে কালো ধাতব পাতে বানানো প্রকাণ্ড এক গম্বুজ যেন বৈরুতের আকাশ। হাড়ে হাড়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে তার অবকাশ এক ভরদুপুর। বৈরুতের আকাশ হিরোশিমাময়—দিগন্ত যেন ঝকঝকে ধূসর এক স্লেট। যে রং-ই লাগাও খেলুড়ে জেটগুলো আড়াল পাবে না। যদি ইচ্ছা করি, তবে চক ঘষে যা খুশি লিখে ফেলতে পারি সেই স্লেটে। কী এক ঝোঁক চেপে বসে আমার মাথায়। যদি উঠে যেতে পারি খুব উঁচু কোনো দালানের ছাদে—কী লিখব আমি তখন আকাশে?

‘ওরা তোমাকে যেতে দেবে না’। হাঁ, এটা তো বলা হয়েছে। ‘হয়তো মৃত্যু এসে নিয়ে যাবে আমাদের, কিন্তু অমর হোক জন্মভূমি’? এটাও তো আগে বলা। ‘হিরোশিমা’? তাও তো পুরনো কথা। আমার স্মৃতি থেকে, আমার আঙুল থেকে ঝরে ঝরে পড়ছে শব্দগুলো। আমি ভুলে গেছি হরফ। কেবল স্মৃতিতে অক্ষয় হয়ে আছে ছয়টি অক্ষর— ‘ই ঊ ও জ ট ঞ’

[‘বৈরুত’ অবলম্বনে]


উল্লেখ্য, ২০২০ সালের বইমেলায় বাংলাদেশের নাম করা প্রথম সারির প্রকাশনা সংস্থা ‘চৈতন্য প্রকাশনী’ থেকে আসছে মাহমুদ দারবিশের বিখ্যাত ও জনপ্রিয় কবিতাগুলো নিয়ে আদিল মাহমুদের অনুবাদ কাব্যগ্রন্থ ফিলিস্তিনি ক্ষতের দিনপঞ্জি। অনুবাদ কবিতায় আদিলের আছে নিজস্ব দখল, আছে কারিগরি। অন্যভাষার আবেদন নিজ ভাষায় সুন্দর ও সাবলীলভাবে ফুটিয়ে তোলার এক বিদ্যা জানা আছে তার। ফলে তার এই অনুবাদ কাব্যগ্রন্থে আছে আলাদা এক ঘোর, আলাদা এক জগৎ। আদিল মাহমুদের অনুবাদ কাব্যগ্রন্থের জন্য ভালোবাসা ও শুভকামনা রইল।

[বইটি সংগ্রহ করতে পারবেন বইমেলায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, চৈতন্য প্রকাশনীর ২৫০, ২৫১ নম্বর স্টল থেকে।]

(1167)