হোম অনুবাদ বই থেকে : উত্তুরে হাওয়া

বই থেকে : উত্তুরে হাওয়া

বই থেকে : উত্তুরে হাওয়া
811
0

মর্মান্তিক মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে, ওকে একবার মাত্র দেখেছি বার্সেলোনার জনপ্রিয় ক্লাব বোক্কাসিওতে। তখন রাত দুটো এবং সুইডিশ যুবকদের একটা দল ওকে কাদাকেস-এ একটা অনুষ্ঠান শেষ করার জন্য তাড়া করে নিয়ে যাচ্ছিল। এগারো জন সুইডিশ ছিল এবং এদের একজন থেকে আরেক জনকে আলাদা করা কঠিন, কারণ ওরা নারী-পুরুষ সবাই একই রকম দেখতে : সুন্দর, সরু নিতম্ব এবং লম্বা সোনালি চুল। ছেলেটির বয়স কুড়ি বছরের বেশি হবে না। ওর মাথা ভর্তি নীলচে-কালো কোঁকড়ানো চুল আর ত্বক অন্যান্য কারিবিয়ানদের মতো মসৃণ পাণ্ডুবর্ণের। কারণ ওদের মা ছোটবেলা থেকেই ছায়ায় হাঁটতে শেখায়, যাতে গায়ের রং তামাটে না হয়ে যায়। ওর আরবদের মতো চোখজোড়া সুইডিশ মেয়েদের এবং সম্ভবত কিছু ছেলেদেরও পাগল করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। ওরা ছেলেটিকে মায়াস্বরের ডামির মতো পানশালায় বসিয়ে রেখে জনপ্রিয় গানের সাথে তালি দিয়ে আনন্দ দেয়ার চেষ্টা করছিল, যাতে সে ওদের সাথে কাদাকেস’-এর সেই অনুষ্ঠানে যেতে রাজি হয়।

আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে ছেলেটি ওই অনুষ্ঠানে না যাওয়ার কারণগুলো ওদের ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। কেউ একজন ঘটনায় নাক গলিয়ে চিৎকার করে বলে, ওদের ছেলেটিকে একা ফেলে যেতে হবে, আর সুইডিশদের মধ্যে একজন, মুচকি হেসে তার মুখোমুখি হয়।

‘ও আমাদের,’ সে গর্জে ওঠে বলে। ‘আমরা ওকে ময়লার ড্রামে পেয়েছি।’

আমি এ ঘটনার কিছুক্ষণ আগে পালউ দে লা মুসিকায় ডেভিড ওইসট্রাখের শেষ কনসার্ট দেখে, এক দঙ্গল বন্ধুদের সাথে ওখানে আসি। আমার গায়ের ত্বক সুইডিশদের সন্দেহ বাতিক মনকে উসকে দেয়। কেননা ছেলেটির আপত্তির কারণটা যথার্থ। ও কাদাকেস-এ থাকত, সেখানে গত গ্রীষ্মে ওকে একটা কেতাদুরস্ত পানশালায় আন্তিইয়ান গান গাওয়ার জন্য ভাড়া করা হয়। সেখানে গান গাওয়ার সময় ছেলেটি উত্তুরে হাওয়ার দাপটে ভীষণ ঘাবড়ে যায়। ও দ্বিতীয় দিন সেই পানশালা থেকে কোনোমতে মুক্ত হয়ে সিদ্ধান্ত নেয় উত্তুরে হাওয়া থাকুক বা না থাকুক, ও কখনো ফিরে আসবে না, এবং ওর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, যদি কখনো কাদাকেস-এ ফেরে, মৃত্যু ওর জন্য সেখানে নির্ঘাত ওত পেতে থাকবে। এটা ছিল কারিবিয়ান বিশ্বাস, যেটা গ্রীষ্মের উত্তাপে দীপ্তিমান স্ক্যান্ডেনেভিয়ান যুক্তিবাদী যুবক-যুবতীদের কাছে বোধগম্য নয় এবং কাতালানের কড়া মদ, মানুষের হৃদয়ে বুনো ধারণার বীজ বপন করে।


দিনটা আমার জীবনের দীর্ঘতম দিন। তবে, ভোরের আগে অবশ্যই অন্ধকারের মতো কিছু একটা ঘটল। 


আমি ছেলেটাকে যে কারও চেয়ে বেশি বুঝতাম। কোস্তা ব্রাভা উপকূলের সবচেয়ে সুন্দর শহর কাদাকেস এবং শহরটা অত্যন্ত চমৎকারভাবে সংরক্ষিত। কারণ এতে প্রবেশের সংকীর্ণ মহাসড়কটা গভীর খাদের পাশে এঁকেবেঁকে গিয়েছে, আর খুব ধৈর্য থাকলেই কেবল কেউ সেখানে ঘণ্টায় পঞ্চাশ মাইল বেগে গাড়ি চালাতে পারবে। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের জেলেদের ঐতিহ্যবাহী গ্রামগুলোর মতো, শহরের পুরনো বাড়িগুলো সাদা রং করা এবং ছাদটা নিচু। গ্রীষ্মকালে, মনে হবে গরমটা রাস্তার ওপারে আফ্রিকার মরুভূমি থেকে আসছে, আর কাদাকেস একটা নরকতুল্য বাজারে পরিণত হয়। সেই তিন মাসে, স্থানীয় এবং বিদেশিদের সাথে পাল্লা দিয়ে, ইউরোপের প্রতিটি কোণ থেকে আসা পর্যটকদের সস্তায় বাড়ি কিনে স্বর্গকে জয় করার উৎসব পড়ে যায়, যেটা তখনও সম্ভব ছিল। তবে বসন্ত এবং হেমন্ত ঋতুতে কাদাকেস্কে সবচেয়ে আকর্ষণীয় লাগে। আর কেউই উত্তুরে হাওয়ার দাপটের দুর্ভাবনা থেকে মুক্ত হতে পারত না। স্থানীয়দের এবং বিশেষ করে লেখকদের অভিজ্ঞতা বলে এই রুক্ষ, কঠিন স্থলভূমির ঝড়ো হাওয়া, ভয়ানক পাগলামির বীজ বয়ে নিয়ে আসে।

পনেরো বছর আগে, বাস্তবে উত্তুরে হাওয়া দেখার আগ পর্যন্ত আমি এই শহরের সবচেয়ে বিশ্বাসী পর্যটক ছিলাম। এক রবিবার দিবানিদ্রা দেয়ার সময়ে আমার এক অবর্ণনীয় অনুভূতি হয়। মনে হচ্ছিল কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। ঝড়ো হাওয়া এসে পৌঁছানোর আগেই টের পেয়ে যাই। আমার উদ্দীপনায় চরম ভাটা পড়ে, কোনো কারণ ছাড়াই বিষণ্ন বোধ করতে থাকি এবং কেন যেন মনে হচ্ছিল, আমার দশ বছরের কম বয়সী বাচ্চা দুটো, বিদ্রোহীর স্থির দৃষ্টিতে আমাকে বাড়িময় অনুসরণ করছে। আমি বাড়িতে আসার পরপরই দারোয়ান একটা যন্ত্রপাতির বাক্স এবং কিছু সাগরের ব্যবহারের কয়েক গোছা দড়ি নিয়ে এল। এগুলো দিয়ে সে উত্তুরে হাওয়ার দাপট থেকে দরজা ও জানালা রক্ষা করবে।

‘উত্তুরে হাওয়া আসছে,’ সে বলল। ‘এখানে এক ঘণ্টার বেশি সময় তাণ্ডব চালাবে।’

বয়সের ভারে ন্যুব্জ লোকটি এক সময় নাবিক ছিল। এখানে তার কাছে সে সময়ে ব্যবহার করা পানি নিরোধক জ্যাকেট, টুপি এবং পাইপ আছে। তার গায়ের ত্বক সাগরের নোনাজলে পুড়ে গেছে। অবসর সময়ে সে গত যুদ্ধের সৈনিকদের সাথে চত্বরে বউল খেলত। কখনো বা সৈকতের সরাইখানায় পর্যটকদের সাথে ক্ষুধা উদ্রেককারী মদ খেত, কারণ কাতালান সৈনিকের ভাষায় কথা বলার কারণে সব দেশের পর্যটকই তার কথা বুঝতে পারত। পৃথিবী নামের এই গ্রহের প্রতিটি বন্দরকে সে চিনে, এ নিয়ে বেশ গর্বভাব ছিল। যদিও তার জ্ঞান কেবল বন্দর পর্যন্তই, স্থলভাগ সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণা ছিল না। ‘এমনকি প্যারিস, ফ্রান্স শহর পর্যন্ত সমুদ্র বন্দরের মতো বিখ্যাত নয়,’ সে কথায় কথায় বলত। কারণটা হলো, যে যানবাহনে পাল নেই, তাতে তার কোনো ভরসা নেই।

গত কয়েক বছরে তার বয়সটা হু হু করে বাড়ছিল, আর সে তখন রাস্তায় যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। সে বেশিরভাগ সময় দারোয়ানের কামরায় কাটাত, একাকী মদের নেশায় চুর হয়ে পড়ে থাকত। সবসময় এভাবেই থেকে সে অভ্যস্ত। সে অ্যালকোহলের বাতির ওপর কৌটায় করে নিজের খাবার রাঁধত। তবে আমাদের উপাদেয় খাবার খাইয়ে পরিতৃপ্ত করার জন্য এ ছিল এক অনন্য রন্ধনকৌশল। ভোর হতেই বাড়ির প্রতিটি তলার ভাড়াটেদের খোঁজখবর নিত, আর আমার দেখা এ পর্যন্ত সবচেয়ে খাপখাইয়ে চলা লোক। কাতালোনিয়ানদের মতো অকৃত্রিম উদার আর কঠিনে কোমলতা মেশানো তার মন। খুব কম কথা বলত, তবে যা বলবে সরাসরি বলবে। যখন হাতে কোনো কাজ থাকত না, ফুটবল খেলার ফল সম্পর্কে অগ্রিম মতামত জানিয়ে ফরম পূরণ করত, তবে প্রায়ই ওগুলো আর ডাকে পাঠানো হয়ে উঠত না তার।

সেদিন, সম্ভাব্য দুর্যোগের হাত থেকে দরজা এবং জানালা রক্ষা করতে এসে উত্তুরে হাওয়া সম্পর্কে এমন ভাবে বলল, যেন ঝড়ো হাওয়াটা সেই ঘৃণিত নারী, যাকে ছাড়া তার জীবনও চলে না। আমি অবাক হয়ে ভাবতাম, একজন নাবিক হয়ে স্থলভূমির ঝড়ো হাওয়াকে সে গুরুত্ব দেয় কী করে।

‘এই উত্তুরে হাওয়াটা পুরনোগুলোর মধ্যে একটি’, সে বলল।

তার কথা শুনে মনে হয় তার কাছে বছর মানে দিন আর মাসের হিসেব নয়, বরং উত্তুরে হাওয়া কতবার আঘাত হানে সে সংখ্যা। ‘গতবছর দ্বিতীয় উত্তুরে হাওয়ার আঘাত হানার তিন দিন পর, আমার মলাশয়ে প্রদাহ শুরু হয়,’ সে বলল একবার। এতে বোঝা যায়, তার বিশ্বাস প্রতিটি উত্তুরে হাওয়ার তাণ্ডবের পর মানুষের এক ধাক্কায় অনেকখানি বয়স বেড়ে যায়। তার বদ্ধমূল ধারণাটা এত প্রকট ছিল যে, উত্তুরে হাওয়া সম্পর্কে আমাদের কৌতূহল বেড়ে যায়, মনে হলো এটা যেন মারাত্মক, মোহিনী শক্তির এক আগন্তুক।

আমাদের বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় নি। দারোয়ান চলে যাওয়ার পরপরই শুনলাম, দূরে কোথাও বাতাস শিস দিচ্ছে, একটু একটু করে তীক্ষ্ণ এবং নিবিড় হয়ে ভূমিকম্পের বজ্রপাতের মতো প্রচণ্ড গর্জন করে থেমে গেল। এরপর ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করে। প্রথমে প্রচণ্ড হাওয়ার দাপট বিরতিহীনভাবে ঝাপটা মারতে লাগল, এরপর একটু থেমে ঘনঘন আঘাত হানতে লাগল, যতক্ষণ না পর্যন্ত নৃশংস এক অতিপ্রাকৃত দুর্যোগের রূপ নেয়। কারিবিয়ান প্রথা অনুযায়ী বাড়িগুলো সাগরমুখী হয়, অথচ আমাদের অ্যাপার্টমেন্টটা পর্বতের দিকে মুখ ফেরানো। কারণটা সম্ভবত, সেকেলে কাতালোনিয়ানরা সাগর ভালোবাসলেও, সমুদ্র দর্শনে উদ্‌গ্রীব ছিল না। আর তাই স্থলভাগ থেকে বয়ে আসা ঝড়ো হাওয়া আমাদের মুখোমুখি আঘাত করে এবং রশিতে বাঁধা, ঘরের জানালাগুলো উড়িয়ে নিতে চায়।

তবে আমি এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার চক্রান্তে পড়ে যাই। এর সোনালি সূর্য এবং নির্ভীক আকাশের অসৎ সৌন্দর্যে এতটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি যে বাতাসের এই তাণ্ডবের মধ্যে, সাগর দেখার জন্য বাচ্চাদের নিয়ে রাস্তায় বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। ভাবলাম আর যাই হোক, ওরা তো মেহিকোর ভূমিকম্প আর কারিবিয়ান হারিকেন দেখে বড় হয়েছে, তা ছাড়া ঝড়ো বাতাস কী এমন ক্ষতি করবে। আমরা দারোয়ানের ঘরের সামনে দিয়ে পা টিপে টিপে যাওয়ার সময় খেয়াল করলাম, সে শিমের বিচি আর মাংসের কোপ্তা ভর্তি থালা হাতে সহসা অসাড়ের মতো জানালা দিয়ে ঝড়ো হাওয়া দেখছে। তবে আমরা যে বাইরে বের হয়েছি, সেটা দেখে নি।

আমরা আমাদের আড়াল দিয়ে যতটুকু পারলাম হেঁটে গেলাম, তবে বাড়ির কোনে খোলা জায়গায় পৌঁছানো মাত্রই, দমকা বাতাসে যেন সাগরে উড়ে না যায় যেজন্য প্রাণপণে ল্যাম্পপোস্টটাকে আঁকড়ে ধরে থাকতে হলো। এবং সেখানে আমরা হতবাক হয়ে মরার মতো ঘাপটি মেরে থেকে দুর্যোগের ভিতরে স্বচ্ছ সাগর দেখতে লাগলাম, যতক্ষণ না দারোয়ান প্রতিবেশীদের সাহায্যে আমাদের উদ্ধার করে। অবশেষে, আমরা মেনে নিলাম, এই দুর্যোগে একমাত্র যৌক্তিক কাজ হবে বাসায় বসে থাকা, যতক্ষণ না পর্যন্ত ঈশ্বর অন্য কোনো ইচ্ছা পোষণ করেন। এবং কারও ন্যূনতম ধারণা নেই, কখন সেটা হবে।

দুই দিন শেষে, আমাদের মালুম হলো, ভয়াল ঝড়ো হাওয়া কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা ছিল না, বরং ওটার দৃঢ়সংকল্প ছিল ব্যক্তিগতভাবে কেবল আমাদেরই অপমান করা। আমাদের এই দুর্দিনে দারোয়ান দিনে কয়েকবার এসে আমাদের দেখে গেছে। আমাদের মানসিক অবস্থা নিয়ে সে বেশ উদ্বিগ্ন। আমাদের দেখতে আসার সময় সাথে করে কিছু মৌসুমি ফল আর বাচ্চাদের জন্য মোরব্বা নিয়ে এল। মঙ্গলবারে আমাদের মধ্যাহ্নভোজের জন্য, কাতালোনিয়ানদের এক সেরা পদ রান্নার আয়োজন করতে লেগে গেল। তার রান্নাঘরে টিনের কৌটায় খরগোশ এবং শামুকের এক রাজসিক খানা পাকাল। এ যেন আতঙ্কের মাঝে ভোজ উৎসব।

বুধবার ঝড়ো হাওয়া ছাড়া তেমন কিছুই ঘটল না। দিনটা আমার জীবনের দীর্ঘতম দিন। তবে, ভোরের আগে অবশ্যই অন্ধকারের মতো কিছু একটা ঘটল। কারণ মধ্যরাতের পর আমরা একসাথে জেগে ওঠে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। চারপাশে যেন মৃত্যুর নীরবতা। পর্বতমুখী গাছের একটি পাতাও নড়ছে না। আর তাই আমরা রাস্তায় নেমে গেলাম। দারোয়ানের ঘরের আলো নিভে যাওয়ার আগ পর্যন্ত, ভোরের পূর্ববর্তী তারা খচিত আকাশ আর ফসফরাসের আলোয় উদ্ভাসিত সাগরের সৌন্দর্য তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করলাম।


আফ্রিকান কুসংস্কার থেকে মুক্ত করার জন্য ইউরোপীয় মহৎ উদ্দেশ্যে ছেলেটিকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেছে।


যদিও পাঁচটা বাজে নি, তবে অনেক পর্যটকই পাথুরে সৈকতে বিপদ কেটে যাওয়ায় ফুর্তিতে মশগুল। পালতোলা নৌকাগুলো তিন দিনের শাস্তিভোগের পর পাল তুলে দিল।

বাইরে বের হওয়ার সময় দারোয়ানের ঘরটা যে অন্ধকার, সে দিকে ভ্রুক্ষেপ করি নি। তবে, যখন বাড়িতে ফিরে এলাম, বাতাসটাও সাগরের মতো জ্বলজ্বল করছে। বিষয়টা খটোমটো লাগল এবং দুবার তার দরজায় টোকা দিলাম, কোনো সাড়া না পেয়ে দরজাটা ধাক্কা দিলাম। আমার বিশ্বাস বাচ্চারা তাকে আমার আগে দেখেছে, আর ওরা আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল। বৃদ্ধ দারোয়ান, নাবিকের পরিচয় চিহ্ন পিন দিয়ে আটকানো জ্যাকেটখানা পরে ঘরের কড়িবর্গায় গলায় দড়ি দিয়ে, উত্তুরে হাওয়ার শেষ ঝাপটায় এখনও দোল খাচ্ছে।

ছুটির মাঝামাঝি সময়ে, একধরনের স্মৃতিকাতরতায়, দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করলাম আর কখনো এখানে ফিরে আসছি না। আমরা যা পরিকল্পনা করেছিলাম, তার চেয়ে অনেক আগে ফিরলাম। পর্যটকরা সমুদ্র ছেড়ে রাস্তায় ফিরে এল, এবং নগরচত্বরে গান বাজতে লাগল। অভিজ্ঞ খেলোয়াড়েরা বউল খেলায় নিরুৎসাহিত হলো। যদিও মারিতিম পানশালার ধুলোয় ধূসরিত জানালার মধ্য দিয়ে, এক ঝলক কিছু বন্ধুকে দেখতে পেলাম। ওরা এখনো টিকে আছে এবং ঝলমলে উত্তুরে হাওয়ার বসন্তে আবার নতুন করে জীবনটা শুরু করে দিয়েছে। তবে, সবকিছুই এখন অতীত।

এই কারণে, বোক্কাসিও ক্লাবে সেদিন ভোরের আগে বিষাদময় ঘণ্টাগুলোতে, আমি বা কেউই সেই ছেলেটির আতঙ্ক বুঝলাম না। ও কাদাকেস’-এ ফিরে আসার আপত্তি জানিয়েছে, কারণ ও নিশ্চিত ছিল, সেখানে ফিরে গেলে ঠিক মরবে। তবে, সুইডিশদের ফেরানোর কোনো উপায় ছিল না। ওরা আফ্রিকান কুসংস্কার থেকে মুক্ত করার জন্য ইউরোপীয় মহৎ উদ্দেশ্যে ছেলেটিকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেছে। ক্লাবে উপস্থিত লোকজনের উৎসাহ এবং টিটকারির মধ্যে, ওরা ওকে লাথি মেরে ভ্যানগাড়িতে তোলে। ভ্যানগাড়িতে গাদাগাদি হয়ে বসা নেশাখোররা, শেষ পর্যন্ত কাদাকেস’-এর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়।

পরের দিন সকালে, টেলিফোনের আওয়াজে ঘুম ভাঙে। রাতের বেলায় অনুষ্ঠান থেকে ফিরে পর্দা টেনে দিতে ভুলে গিয়েছিলাম, এবং এখন ক’টা বাজে তা বুঝতে পারছি না, তবে শোবার ঘরটা গ্রীষ্মের উজ্জ্বল আলোয় ভরে গেছে। ফোনে অচেনা এক ভয়ার্ত গলা, আমাকে ঘুম থেকে টেনে তোলে।

‘আপনি কি সেই ছেলেটাকে মনে করতে পারছেন, যাকে কাল কাদাকেস থেকে সুইডিশরা টেনে নিয়ে গিয়েছিল?’

আমার আর কিছু শুনতে হয় নি। কল্পনার চেয়েও নাটকীয় ছিল ঘটনাটা। ছেলেটি কাদাকেস’-এ ফেরার দণ্ডাজ্ঞায়, আসন্ন অপরিহার্য মৃত্যুর হাত থেকে মুক্তি পেতে, বিকৃত মস্তিষ্ক সুইডিশ যুবকদের অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে দ্রুতগতিতে চলা ভ্যান থেকে গভীর খাদে লাফিয়ে পড়েছে।


[গাব্‌রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস : নির্বাসিত জীবনের গল্প—ভাষান্তর : ড. সুরাইয়া ফারজানা হাসান—সময় প্রকাশন, প্যাভিলিয়ন : ২৭, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ।]

(811)

Latest posts by সুরাইয়া ফারজানা হাসান (see all)