হোম অনুবাদ বই থেকে : আকাশের ওপারে আকাশ

বই থেকে : আকাশের ওপারে আকাশ

বই থেকে : আকাশের ওপারে আকাশ
650
0

চারটি মহাদেশের ৬০ জন কবির কবিতা নিয়ে আজ পয়লা ফাল্গুন, অগ্রদূত প্রকাশনা থেকে দ্বিতীয় সংস্করণে মুদ্রিত হলো কবি ও প্রাবন্ধিক রাজু আলাউদ্দিনের অনুবাদগ্রন্থ আকাশের ওপারে আকাশ। এতে যাদের কবিতা থাকছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য: এডোনিস, স্যামুয়েল হানাজিদ, সমিহ্ আল কাসিম, নিজার কাব্বানি, হর্হে লুইস বোর্হেস, তামুরা রিয়ুচি, ডব্লু বি ইয়েট্স, ইউজেনিও মন্তালে, আলি সরদার জাফরি, ভর্তৃহরি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, হুয়ান রামোন হিমেনেছ, পেদ্রো সালিনাস, ফ্রান্সিস্কো দে কেবেদো, গুস্তাবো আদোল্ফো বেকের, আন্তোনিও মাচাদো, জাঁ ককতো, রেনে শার, আঁরি মিশো, ইভ বনফয়, জাক প্রেভের, পল ফ্লেমিং, গেয়র্গ ট্রাকল, মার্টিন হাইডেগার, ইভান গল, জন অ্যাশবেরি, অ্যান সেক্সটন, নিকোলাস গিয়েন, পাবলো নেরুদা, নিকানোর পাররা, গাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল, অক্তাবিও পাস, ফ্রিদা কালো প্রমুখ।

সম্পাদক

কবিতার অনুবাদে অবশ্যম্ভাবীরূপে হারিয়ে যায় তার ধ্বনিদ্যোতনা ও বাগভঙ্গি। এমনকি কিছু রূপকল্প, প্রতীক—যা কেবল নির্দিষ্ট প্রতিবেশ ও স্থানিকতার মধ্যেই তাৎপর্যময়। অন্য ভাষা-সংস্কৃতির মধ্যে স্থানচ্যুত হওয়া মাত্রই তার অর্থগৌরব খর্ব হতে শুরু করে। পাহাড়ের গা ছুঁয়ে যে-টুকু স্বর প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে, তার চেয়ে তীব্র আর্তনাদও তাই বিস্তীর্ণ মরুভূমির বালুরাশি থেকে উঠে আসতে পারে না।

কিন্তু ভরসা হলো অনুবাদকের ‘কবি-চিত্ত’। আমাদের আশ্রয় তার অনুধাবন। সেই অনুধাবনেরই স্বচ্ছ প্রকাশ যদি ঘটে অনুবাদে, সেটিই সবচেয়ে বড় পাওয়া। একটি কবিতা আমাদের সামনে উপস্থিত হয় কেবল তার ভাবগত সারবত্তা নিয়েই নয়, বরং সুনির্দিষ্ট একটি আকার বা অবয়ব বা ভঙ্গি নিয়ে। যাকে আমরা বলি ‘ফর্ম’। কবিতাপাঠের মাধ্যমে পাঠক কবিতার সেই ফর্ম বা কাঠামোকেও উপলব্ধি করতে চান। ঠাকুর-দর্শনের আকাঙ্ক্ষা যেমন।

সেসবের প্রতি সতর্ক থেকে, কবিতার হাত ধরে অনেকটাই বিশ্বভ্রমণ করে এসেছেন কবি রাজু আলাউদ্দিন তার আকাশের ওপারে আকাশ বইটিতে। তিনি হেঁটেছেন প্রায় দু’হাজার বছরের পথ। আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের কূলে এবং ভূমধ্যসাগরেরর কিনারায়। ইংরেজি ও স্প্যানিওল—দুইটি ভাষাসমুদ্রে তার আত্মমগ্ন অভিপ্রয়াণ। এই অনুবাদ, কবি-চিত্তের সংরক্ত দূতিয়ালি—এর মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার সঞ্চয় বাড়ল নিঃসন্দেহে। প্রসারিত হলো আমাদের পাঠ-অভিজ্ঞতার সীমা-সরহদ্দ। অনুবাদকের সাফল্য সেখানেই, যেখানে পাঠক জনান্তিকে বলে ওঠে—‘লাল ঠোঁটে এক চুমু খেতে গিয়ে/ আমার নিজের ঠোঁটও/ লাল হয়ে যায় তাতে…’

সোহেল হাসান গালিব

জেরুজালেমের গোলাপ-কাঁটা এবং শস্যের কান

[সমিহ্ আল কাসিম]

(দৃশ্য : মেডিটেরিয়ানের পশ্চিম উপকূলের এক মাঠ)

শস্যের কান : হত্যা করো না আমাদের তুমি আয়ু ফুরাবার আগে
জেরুজালেমের গোলাপ-কাঁটা : কারণবিহীন হত্যা করা, এই তো আমার কাজ
শ. কা : কিন্তু তোমার সুন্দর ফুল মিষ্টি…
জে. গো. কা : বাঁধনহারা ইচ্ছে আমার সড়ক যেন…
শেষ হয়েছে তোমার মৃত্যুতে
শ. কা : কিন্তু তোমার বিষণ্ন ফুল আর
তোমার অভিশপ্ত বিষাদ আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ে
ইচ্ছেমতো বাঁচো এবং মরো
বাঁচো-মরো যাই করো… কিন্তু আমায় ছাড়ো
জে. গো. কা : পরস্পরের ভাগ্যলিখন এই…
আমি মরছি বলেই তুমি বাঁচো
কিংবা তুমি মরো বলেই বাঁচি
শ. কা : পরস্পরের জন্যে মাঠে প্রচুর জায়গা আছে
জে. গো. কা : কিন্তু এটাই তোমার আমার ভাগ্যলিখন ভাই
এটাই নিয়তি
[আগুনের প্রবেশ]
শ. কা এবং জে. গো. কা : আমাদেরকে খুন করো না আগুন
আমরা দু’জন তরুণ কান্তি বাড়ছি একই সাথে
খুন করো না
খুন …


শিরোনামহীন

[ভর্তৃহরি]

অতীতে আমরা দুজনেই ভাবতাম
তুমি ছিলে ‘আমি’ আর আমি ‘তোমার’ই
এখন যা হলো আমাদের দু’জনার—
এখন তো তুমি কেবলই তোমার
আর আমি আমারই।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি

[আন্তোনিও মাচাদো]

ভাঙা হাড়গোড় নিয়ে রক্তে ফাটল-তোলা
পৃথিবীতে রণগ্রস্ত য়ুরোপ পেরিয়ে
রাজপুত্র, কবিকুল, পদ্ম আর
পবিত্র নদীর দেশ থেকে
প্রাচ্যের পুরোহিত, প্রাচ্যের মরমী পুরুষ
স্পন্দিত রূপে তোমার সংগীত আসে
আমাদের মাঝে;

ও রবীন্দ্রনাথ, পশ্চিমের এই পাড়ে
তোমার হৃদস্পন্দন শোনা যায়।
শরতের সন্ধ্যাবেলা যখন বৃষ্টির রিমিঝিমি
সুর তোলে বাঁশবনে, আর তোমার বাংলার
সাত আসমান ভেঙে নামে ঝুম বরিষণ
তখন য়ুরোপে বাজে যুদ্ধের দামামা, তার
জীবন নদীতে ওঠে ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ তরঙ্গ বিপুল।

রক্তক্ষরা য়ুরোপ যখন
যুদ্ধ আর সৈন্য-সমাবেশ নিয়ে মগ্ন হট্টরোলে
তখন তোমার গ্রন্থ দুয়ারে দাঁড়ায় এসে তার
যেমন একদা এসে ঢুকেছিল এ য়ুরোপে গৌতম-কাহিনি।
আজ দ্যাখ, শ্বেত বৃষপৃষ্ঠে চড়ে এসেছে স্বয়ং শিব
সমরখেতাব, শিরস্ত্রাণ সবই বর্বর অসভ্য মনে হয়, হায়
সাতসমুদ্দুর জুড়ে যুদ্ধ, শুধু যুদ্ধই ছড়ায়।


গোলকধাঁধা

[হর্হে লুইস বোর্হেস]

আমার চতুর্দিকে পাথরের এইসব জাল
পারবে না ভেঙে দিতে জিউস নিজেও।
পথে যেতে যেতে দেখা লোকদের ভুলে গেছে
আমার হৃদয়। একঘেয়ে দেয়ালের
ঘৃণিত সড়ক হলো নিয়তি আমার।
মনে হয় সোজা সব গ্যালারিসমূহ
কিন্তু অলক্ষিতে বাঁকা। বছরের শেষ দিকে
গড়ে তোলে যতসব বৃত্ত গোপন।
এবং প্রাচীরগুলো মসৃণ হয়ে গেছে কালের প্রবাহে।
উষ্ণ স্ফটিক ধূসর পথচিহ্নগুলো আমাকে ত্রস্ত করে।
মাঝে মধ্যে সন্ধ্যার অসার বাতাস
বয়ে আনে ধ্বনি, কিংবা প্রতিধ্বনি;
আনন্দবিহীন। ছায়ার ভেতরে থাকা আমি ওই
গোপনেরে জানি, সেখানে আরেকজন উঁকি দেয়
ব্রত যার শ্রান্ত করা একাকিত্বকে
যে-আমার রক্তে আর মৃত্যুতে পুষ্ট হতে
গড়ে তোলে, বোনে এই নরকের জাল।
আমরা দু’জনে খুঁজি একে অন্যকে।
হায়, এই তবে ছিল আমাদের
বিরোধের শেষ দিনখানি!


ইঁদুর

[গেয়র্গ ট্রাকল]

হেমন্তের রুপালি চাঁদ উঠোনে ঝলকায়।
চমৎকার ছায়ারা সব ছাদের কিনার থেকে
পড়ছে ঝরে। নীরবতা শূন্য জানালায়;
হঠাৎ করে আলতো পায়ে ইঁদুররা বের হয়

সচিৎকারে এদিক সেদিক ছোটাছুটি করে
তাদের পিছে শৌচাগারের ধূসর কুয়াশা।
তার উপরে ঝিলিক দেয় ভুতুড়ে জোছনা।

পাগল-প্রায় ইঁদুরেরা মত্ত কোলাহলে
ঘরখানা আর গোলাঘর উপচে পড়ে যায়
অপর্যাপ্ত শস্য এবং ফলে
হিমেল ক্ষেত অন্ধকারে জানায় ফরিয়াদ।


চিরন্তন

[সি পি কাভাফি]

সদাশয় কোমলহৃদয় ভারতীয় রাজা অর্জুন
নরহত্যা ঘৃণা করতেন। যুদ্ধে তিনি যান নি কখনো।
কিন্তু ভয়ংকর যুদ্ধদেবতা তাতে বিরক্ত ভীষণ
[যেহেতু গৌরব তার লুপ্ত হতে থাকে, মন্দিরগুলো তার শূন্য হয়ে গেছে]
সীমাহীন ক্রোধ নিয়ে অর্জুনের প্রাসাদে গেলেন।
ভয় পেয়ে রাজা বললেন, “মহান দেবতা,
মার্জনা করবেন যদি আমি অপারগ নরহত্যায়।”
ঘৃণাভরে উত্তরে দেবতা বলেন, “তুমি কি নিজেকে ভাব
আমার চেয়েও বেশি ন্যায়পরায়ণ? দোহাই, হয়ো না প্রতারিত।
এ অবধি কোনো প্রাণ হয়নি হরণ। জেনে রাখ তবে
জন্মে না যারা, তারা মরে না কখনো।”


আমার বিশ্বস্ত মাতৃভাষা

[চেসোয়াভ মিউশ]

বিশ্বস্ত মাতৃভাষা
আমি তোমারই সেবা করে যাচ্ছি।
প্রতিরাতে, তোমার সামনে বসি বিভিন্ন রং-এর পাত্র নিয়ে
তাই তুমি পেয়ে যাও আমার বার্চ আর ঝিঁঝিঁ পোকা
পাখি ও পাখির কলতান
যা আমার স্মৃতিকোষে সযত্নে আগলে রেখেছি।

এইসব বহুকাল ধরে টিকে আছে।
তুমি ছিলে আমার জন্মভূমি; আমার অভাব ছিল অন্য কিছুর।
ভেবেছিলাম আমার আর ভালো কিছু মানুষের মাঝে
তুমি হয়ে উঠবে এক বার্তাবাহক
যদিও তারা ছিল সংখ্যায় খুবই নগণ্য
বিশ, দশ কিংবা এখনও হয়তো জন্মই হয় নি।
এখন, স্বীকার করি আমার সন্দেহটুকু
কোনো কোনো মুহূর্তে মনে হয় ফালতু অপচয়ে
জীবনের দিনগুলো কেটেছে আমার।
তোমার জন্য আছে অপদস্থকারী এক তুখোড় রসনা
অযৌক্তিকভাবে তারা ঘৃণা করে নিজেদের
যতটা-না অন্যান্য জাতিদের ঘৃণা করে তারা
জিহ্বা এক বার্তাবাহকের
জিহ্বা এক সন্দিহানের
তারা তাদের নিজস্ব অজ্ঞতার জন্য পীড়িত।

কিন্তু তুমি ছাড়া এই আমার কিবা পরিচয়?
দূরবর্তী কোনো দেশে প্রবাসী প-িত এক
শঙ্কাহীন সম্ভ্রমপূর্ণ এক সাফল্য কেবল।
হ্যাঁ, তুমি ছাড়া এই আমার কিবা পরিচয়?
অন্য সবার মতোই একজন ভাবুক কেবল।
আমি জানি, এইসব অর্থবহ আমার শিক্ষার কারণে
অপসৃত হয়ে গেছে স্বাতন্ত্র্যের গৌরব
নৈতিক নাটকের পাপিষ্ঠের সম্মুখে
সৌভাগ্য বিছিয়ে দিল লাল গালিচা
তখন এক জাদুকরি বাতি
লিনেন—যবনিকায় প্রতিবিম্বিত করে
মানুষ আর অপার্থিব যাতনার ছবি

বিশ্বস্ত মাতৃভাষা
সবশেষে, সম্ভবত আমিই তোমাকে রক্ষার চেষ্টা করে যাব
আর তাই তোমার সামনে আমি রং-এর ছোট্ট পাত্র নিয়ে বসব
যদি, সম্ভব হয় তবে তা উজ্জ্বল ও বিশুদ্ধ
দুর্ভাগ্যক্রমে আমার দরকার শুধু সামান্য পরিপাটি আর সৌন্দর্য।


শিরোনামহীন

[অক্তাবিও পাস]

শিলার ভাষায় বলবো তোমায় কথা
[সবুজ স্বরে জবাব দিও তুমি]
তুষার-ভাষায় বলবো তোমায় কথা
[জবাব দিও মৌমাছিদের ডানার সঞ্চালনে]
জলের ভাষায় বলবো তোমায় কথা
[জবাব দিও ডোঙার দ্রুততায়]
লহুর ভাষায় বলবো তোমায় কথা
[পাখির অট্টালিকার রূপে জবাব দিও তুমি]


আমরা দু’জন

[অ্যান সেক্সটন]

সাদা আর কালো রং পশমি কাপড়
আমার পরনে ছিলো আর তুমি তাই
আমার শরীর থেকে খুলে নিয়ে শেষে
আমাকে রাখলে তুমি সোনালি আলোয়
আমাকে পরলে তুমি মুকুটের মতো
দরজার বাইরেই ঝরছে তখন
তির্যক ভঙ্গিতে সূচালো তুষার
ক্যালসিয়ামের ছোট দানার আকারে
তারার মতন ঝরে তুষার যখন
হয়ে গেছে পুরু ঠিক ইঞ্চি দশেক
তখন ছিলাম দেহে পরস্পরের
[ও ঘরেই আমাদের কবর হবে]

আর তুমি ছিলে এই শরীরে আমার
[ও ঘরই আমাদের বাঁচিয়ে দেবে]
এবং প্রথমে আমি টাওয়েল দিয়ে
তোমার পায়ের পাতা দিয়েছি মুছে
কারণ ছিলাম আমি তোমার দাসী
আমাকে বললে তুমি রাজকুমারী।
রাজকুমারী!

আহা! তারপর
সোনালি বরণ দেহে আমি দাঁড়ালাম
আর আমি কমালাম বন্দনা-গান
এবং কমিয়ে ফেলি দেহের পোশাক
আর তুমি করে দিলে বল্গাবিহীন
এবং করলে তুমি লাগামরহিত
এবং খুলেছি আমি বোতাম, দেহের
ভাঁজ সংশয় নিউ ইংল্যান্ডের
পোস্টকার্ড, জানুয়ারি রাত দশটা
একর একর জুড়ে সোনালি মাঠের
গমের শীষের মতো জেগে উঠলাম
আমরা দুজনে মিলে তুলেছি ফসল,
তুলেছি ফসল।


এখানে নাজিম হিকমত

[বাংলা তর্জমাটি বন্ধু প্রাবন্ধিক ফিরোজ আহমেদকে উৎসর্গ করা হলো]

সদ্য মুক্তি পাওয়া
বন্দিদের একজন নাজিম হিকমত
তার কবিতার মতো
লাল রঙ সোনার সুতোয়
বোনা জামা উপহার দিয়েছে আমায়।

তুর্কি লহুর সুতাগুলো
তার পদাবলী।
প্রাচীন প্রত্যয়ে গড়া,
—বাঁকা বা সরল—
সত্যিকার গল্পগুলো
ভোজালি বা অসি’র মতন।
গোপন কবিতাগুলো তার
আলোকিত দুপুরের
মুখোমুখি হবে বলে তৈরি হয়েছিল;
আজ তারা লুকায়িত আয়ুধের মতো,
জ্বল জ্বল করছে তারা মেঝের নিচে,
কুয়োর ভিতরে তারা অপেক্ষমাণ,
তার জনতার কালো চক্ষুযুগলের
দুর্গম আঁধারের নিচে।
বন্দিশিবির থেকে সে এল আমার
ভাই হতে আর
আমরা হেঁটেছি একসাথে
বরফে মোড়ানো স্তেপে;
রাত ছিলো প্রজ্বলিত
আমাদের নিজস্ব আলোয়।

দেহের গড়ন তার ভুলবো না বলে
আমি তার প্রতিকৃতি আঁকছি এখানে :

শষ্পময় ভূখণ্ডের শান্তিতে উত্থিত
টাওয়ারের মতো
লম্বা সে
এবং উপরে
তুর্কি আলোয় ভরা চক্ষু যুগল
দুটি বাতায়ন।

আমরা দুই ভবঘুরে
পেয়েছি শক্তভূমি আমাদের
পায়ের তলায়
বীর আর কবিদের
বিজিত ভুবন,
মস্কোর রাস্তায়, দেয়ালে দেয়ালে
পুষ্পিত হতে থাকে
পূর্ণিমার চাঁদ,
রমণীর প্রতি প্রেম
আনন্দ আর
প্রণয়ের প্রতি অনুরাগ
আমাদের একমাত্র গোত্র-পরিচয়।
সমগ্র বাসনাকে ভাগ করে নেয়া,
সর্বোপরি, জনতার সংগ্রামের এক একটি ফোঁটা,
জন-দরিয়ার ফোঁটাগুলো
তার আর আমার কবিতা।

কিন্তু
হিকমতের আমোদের অন্তরালে
অন্য এক নির্মাণ,
নির্মাণ সুতোরের মতো
কিংবা দরদালানের ভিত্তির মতো।

বহু বছরের নীরবতা
আর কারাবাস।
এসব বছরগুলো
বসাতে পারে নি দাঁত,
কিংবা পারে নি খেতে, গিলে ফেলতে
বীরোচিত যৌবনেরে তার।

আমাকে সে বলেছিল
দশ বছরেরও বেশি
বিজলিবাতির আলো
রাখতো জ্বালিয়ে ওরা সমস্ত রাত
আজ সে গিয়েছে ভুলে সেই সব রাত
ভ্রুক্ষেপ নেই তার বিদ্যুতালোকে।
ডোবার ফুলের মতো
তার আমোদের
কালো রঙ শেকড়-বাকড়
প্রোথিত স্বদেশে;
আর তাই
যখন সে হাসে,
মানে নাজিম,
মানে নাজিম হিকমত
তখন সে হাসি নয় তোমার মতন;
তার হাসি অনেক সফেদ,
তার সে হাসিতে হাসে চাঁদ
নক্ষত্র,
শরাব,
মৃত্যুহীন মৃত্তিকা,
তাবৎ সোনালি ধান জানায় সম্ভাষণ
তার হাসি দিয়ে।
তার কণ্ঠে গান গায় মাতৃভূমি তার।

রাজু আলাউদ্দিন

রাজু আলাউদ্দিন

জন্ম ১৯৬৫, শরিয়তপুরে। লেখাপড়া এবং বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরেই। কর্মজীবনের শুরু থেকেই সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে জড়িত। ভিন্ন পেশার সূত্রে মাঝখানে বছর দশেক কাটিয়েছেন প্রবাসে। এখন আবার ঢাকায়। ইংরেজি এবং স্পানঞল ভাষা থেকে অনুবাদের পাশাপাশি দেশি ও বিদেশি সাহিত্য নিয়ে নিয়মিত লিখে যাচ্ছেন। এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা বিশ।

প্রকাশিত বই :
অনূদিত কাব্যগ্রন্থ—
গেয়র্গ ট্রাকলের কবিতা (মঙ্গলসন্ধ্যা প্রকাশনী, ১৯৯২)
সি পি কাভাফির কবিতা (শিল্পতরু প্রকাশনী, ১৯৯৪)
টেড হিউজের নির্বাচিত কবিতা (বাংলা একাডেমী, ১৯৯৪)
আকাশের ওপারে আকাশ (দেশ প্রকাশন, ১৯৯৯)

অনূদিত সাক্ষাৎকার গ্রন্থ—
সাক্ষাৎকার (দিব্যপ্রকাশ, ১৯৯৭)
কথোপকথন (বাংলা একাডেমী, ১৯৯৭)
অনূদিত কথাসমগ্র ( কথাপ্রকাশ)

সংকলন, সম্পাদনা ও অনুবাদ—
মেহিকান মনীষা: মেহিকানো লেখকদের প্রবন্ধের সংকলন (সাক্ষাৎ প্রকাশনী, ১৯৯৭)
খ্যাতিমানদের মজার কাণ্ড (মাওলা ব্রাদার্স, ১৯৯৭)
হোর্হে লুইস বোর্হেস: নির্বাচিত গল্প ও প্যারাবল (ঐতিহ্য প্রকাশনী, ২০১০)
হোর্হে লুইস বোর্হেস: নির্বাচিত কবিতা (ঐতিহ্য প্রকাশনী, ২০১০)
হোর্হে লুইস বোর্হেস: নির্বাচিত সাক্ষাতকার (ঐতিহ্য প্রকাশনী, ২০১০)
হোর্হে লুইস বোর্হেস: নির্বাচিত প্রবন্ধ ও অভিভাষন (ঐতিহ্য প্রকাশনী, ২০১০)
প্রসঙ্গ বোর্হেস: বিদেশি লেখকদের নির্বাচিত প্রবন্ধ (ঐতিহ্য প্রকাশনী, ২০১০)
রবীন্দ্রনাথ: অন্য ভাষায় অন্য আলোয় (সংহতি প্রকাশনী, ২০১৪)
মারিও বার্গাস যোসার জীবন ও মিথ্যার সত্য (সাক্ষাৎ প্রকাশনী, ২০১৫)

গৃহীত সাক্ষাৎকার—
আলাপচারিতা ( পাঠক সমাবেশ, ২০১২)

কবিতা—
আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র গোপনে এঁকেছি (শ্রাবণ প্রকাশনী, ২০১৪)

জীবনী—
হোর্হে লুইস বোর্হেসের আত্মজীবনী (সহ-অনুবাদক, সংহতি প্রকাশনী, ২০১১)

প্রবন্ধ—
দক্ষিণে সূর্যোদয়: ইস্পানো-আমেরিকায় রবীন্দ্র-চর্চার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস( অবসর প্রকাশনী, ২০১৫)

ই-মেইল : razualauddin@gmail.com
রাজু আলাউদ্দিন