হোম অনুবাদ ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের দু’টি কবিতা

ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের দু’টি কবিতা

ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের দু’টি কবিতা
773
0

[পাকিস্তানের কমিউনিস্ট কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, তার কবিতা ও কবিতায় সুর সংযোজনের পরে তৈরি হওয়া গজল উপমহাদেশের সাহিত্যে এবং সংগীতে বিশেষ প্রভাব রেখেছে। ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ কেবলমাত্র কবি বা পাকিস্তানের প্রগতিশীল একটি কণ্ঠস্বর হিশাবেই যে গুরুত্বপূর্ণ, কেবলমাত্র তা নয়। ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ বাঙালির মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন জানিয়েছিলেন করাচিতে বসেই। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তান শাসকের জুলুম ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তিনি গর্জে উঠেছিলেন। সমর্থন জানিয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের—আসলে যা পূর্ব বাংলা—বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের সংগ্রামকে। বাঙালির জয় হয়েছিল জনযুদ্ধে, স্বাধীন হয়েছিল পূর্ব বাংলা, গড়ে উঠেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু আজ বাংলাদেশে বাঙালি পরিচিতিসত্তা আত্মনিয়ন্ত্রণের রাজনীতি প্রাসঙ্গিক নয়, কারণ সেখানকার বাঙালি আত্মনিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছে প্রায় ৪৮ বছর আগে, এখন বাংলাদেশের মানুষকে লড়াই করতে হচ্ছে গণতন্ত্র, সমানাধিকার, সমাজবাদের লড়াই। মজলুম তথা সমস্ত নিপীড়িত মানুষের অধিকার অর্জনে লড়তে হচ্ছে বাংলাদেশের গণমানুষকে। আর তাই মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের এমন দুটি জনপ্রিয় কবিতার অনুবাদ পেশ করছি, যে কবিতা দুটি উর্দু কবি ফয়েজের অন্য সমস্ত কবিতা ও কাব্যরাজনীতির চিন্তার প্রতিনিধি। ফয়েজের কবিতায় থাকে উপমহাদেশের লোকপরিসর এবং সেই লোকপরিসরে অবস্থান নিয়েই রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও ভূ-গোলকের বিভিন্ন আগ্রাসনবাদী ও আধিপত্যবাদী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে দ্রোহ। দ্রোহ কিন্তু তা প্রেমের মাধ্যমে, তা নিজের মাটি, নিজের ইতিহাস ও চৈতন্যে নিজেকে সমর্পণ করেই। প্রথম কবিতায় শরিয়তি সালাফি চিন্তার বিরুদ্ধে তথা প্রেম ও সমন্বয়ের যাপন ও বিশ্বাসকে যারা একমাত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক রিলিজিয়নের আধিপত্যে কোতল করতে চায় তাদের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন কবি, কিন্তু তা পশ্চিমা আধুনিকতা ও আলোকায়নের লজিকে নয়। আশিকানায়, ফানায় বুঁদ হয়েই আধিপত্যবাদকে ও রাষ্ট্রীয় আধিপত্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বহির্বিশ্বের পুঁজিতন্ত্র বা বিত্তবানদের বিরুদ্ধেও কথা বলেছেন তিনি, তিনি আল্লাহর জিকিরেই ধর্মীয়, রাষ্ট্রীয় ও পুঁজির আধিপত্যকে খারিজ করতে চেয়েছেন। আর দ্বিতীয় কবিতাটি পাকিস্তানের অতিদক্ষিণপন্থি শাসক জিয়া উল হকের শাসনকালের আবহে লেখা। এই শাসকের আমলে পাকিস্তানে সুফি বিশ্বাসীদের ওপর নেমে এসেছিল রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন। পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক মতামতের ওপর নেমে এসেছিল প্রবল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। সাম্প্রদায়িকতা, রাষ্ট্রীয় আধিপত্য ও পুরুষতন্ত্র হাত ধরাধরি করে যে-সকল সময়ে পাকিস্তানকে পরিচালনা করেছে, সেইসব সময়কে ধারণ করেই ফয়েজের দ্বিতীয় কবিতাটি। দুটি কবিতাই সুর সংযোজনে গজল সংগীত হয়ে উঠেছিল। দুটি কবিতার অনুবাদের ক্ষেত্রে কিছু জায়গা্য উর্দু আবহকে বাংলার আবহে বদল করা হয়েছে। এইটুকু বিনির্মাণ ভাবানুবাদে জায়েজ। তা ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ জানলেও রাগ করতেন না, হা হা! চলেন পড়া যাক।]


বি তা


আমরা দেখব

তোমাদের বুঝে নেব আমরা একদিন
আমরা দেখব সেই আলোকপ্রহর
যে দিনের শপথ আমরা
লিখে গেছি শেল্ট-পাথরে
প্রহর গুনে গুনে লিখেছি ভোরের দেওয়াল
…আমরা দেখে নেব একদিন

যখন শাসকের ধূম্রপাহাড়
উড়ে যাবে শিমুল তুলোর মতো
আমাদের পায়ের তলায়
থতমত মানুষের পায়ের তলায়
পৃথিবী কাঁপবে থরথর যখন
আর বড়-লোকেদের মাথার ওপর
যখন ভীষণ চমকাবে বাজ

সাঁইয়ের ভাবঘর দখল করে
কারা স্থাপন করেছে ঝুটাস্থাপনা
নিরঞ্জনের বাসা থেকে
মিথ্যার মূর্তি সরে যাবে একদিন!
আর এই চরাচরে প্রেমের বান্দা আমরা যারা
পবিত্র এবাদতগৃহের দিকে যাদের
চলাচল রক্তচক্ষু আর বুলেটে-বুলেটে রুখে দেওয়া হতো
তারাই মসনদে বসবে
সেদিন সব মুকুট খসে পড়বে
সেদিন রাজার-আসন গড়াবে, ধুলায় গড়াবে

কেবল নাম থাকবে স্রষ্টার
কেবল নাম থাকবে আল্লাহ’র
যিনি অদৃশ্যে, যিনি সম্মুখেই তবু
যিনি দৃষ্টিতে আছেন যিনি দর্শনে
জিকির উঠবে ‘আন-অল-হক’
‘আমিই সত্য আমিই সত্য’
আমিই সত্য ওগো আমাদের সকলই সত্য

আর শাসন করবে সৃষ্টির পথ, সমতার…
আমাদের যতটুকু হক ততটুকুই সকলের

তোমাদের বুঝে নেব আমরা একদিন
আমরা নিশ্চয়ই দেখব
আমরা দেখব কুয়াশা সরিয়ে
আমাদের উঠোনে এসেছেন আশেকের আলো
আমাদের উঠোনে, চরাচরে নরম আলোর সুদিন
আমরা দেখব


চলো আজ সমাগমে চলো

অশ্রুভরা এই চোখ, ঝঞ্ঝাপূর্ণ এ-জীবন যথেষ্ট নয়
কাতর প্রেমের ভিতরে জমাট আহা যতেক অভিযোগও
যথেষ্ট নয় তো আর, তাই
এসো আজ সমাগমে এসো
পা মেলাও, চলো হাটে ও বাজারে চলো,
চলো বেড়ি-বাঁধা মানুষের সাথে
তাদের অলংকারে, নৃত্যের শোভায় চলো
চলো ধুলো মেখে মেখে,  রক্তধারার পোশাক প’রে চলো
এসো আজ, চলো যাই প্রিয় শহরের কাছে,
সকলে প্রতীক্ষারত;
সেই নগর-শাসক, সেই বোবাদর্শক
সেই তির, অভিযোগের
পাথর বোঝাই সেই মনখারাপের সকাল
আর সকল ব্যর্থতার যেসকল দিন…
আমরা ছাড়া কে আর বন্ধু হবে তাদের,
এই প্রিয় শহরে কে আর নির্মল আছে বলো?
কেউ নাই,
জহ্লাদের হাতে আর অবশিষ্ট নাই কেউ!
বাঁধো হৃৎস্পন্দন বাঁধো, ভাঙা ওই হৃদয়টাও বেঁধে নিয়ে চলো
বন্ধুরা, চলো যাই মৃত্যুর কাছে,
চলো হৃদয় সাজাই
চলো আজ সমাগমে, চলো খুন হতে যাই
চলো নিজেরে সাজাই, দেশকাল
চলো আজ সমাগমে মুখরিত চলো

অতনু সিংহ

জন্ম ২২ আগস্ট; ১৯৮২, সালকিয়া, হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র।

শিক্ষাগত যোগ্যতা : এম.এ, গণজ্ঞাপন, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : সাংবাদিকতা।

কাব্যগ্রন্থ—

নেভানো অডিটোরিয়াম [লালন প্রকাশনা, পশ্চিমবঙ্গ, ২০০৯]
ঈশ্বর ও ভিডিও গেম [হুডিনির তাঁবু প্রকাশনা, পশ্চিমবঙ্গ, ২০১৪]
বনপাহাড় থেকে সে কেনই-বা ফিরবে এ-কারখানায় [কবীরা প্রকশনা, ২০১৭]
ঘুমের চেয়ে প্রার্থনা শ্রেয় [খসড়া সংস্করণ, অক্ষরবৃত্ত প্রকাশন, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ, ২০১৮]
ঘুমের চেয়ে প্রার্থনা শ্রেয়'র পূর্ণ সংস্করণ [ঢাকা থেকে প্রকাশিতব্য]

গদ্যগ্রন্থ—

ছোটগল্প সংকলন 'অপর লিখিত মোনোলগ ও কয়েকটি প্যারালাল কাট' [হুডিনির তাঁবু প্রকাশনা, পশ্চিমবঙ্গ, ২০১০]

চলচ্চিত্র—
'প্রিয় মরফিন' স্বাধীন উদ্যোগে নির্মিত।

ই-মেইল : blackwido5@gmail.com