হোম অনুবাদ প্যারিসের এক তরুণীকে লেখা চিঠি

প্যারিসের এক তরুণীকে লেখা চিঠি

প্যারিসের এক তরুণীকে লেখা চিঠি
317
0

আন্দ্রেয়া, আমি কিন্তু তোমার কাইয়ে সুইপাশার অ্যাপার্টমেন্টে থাকতে আসতে চাই নি। সেটা যে কেবল ওই খরগোশগুলোর জন্য, তা নয়। বরং তোমার সাজানো রাজ্যে অতর্কিতে ঢুকে পড়ে নানারকম ঝামেলা বাঁধাব ভাবলে আমার খারাপ লাগত। বাসাটায় বাতাস যেন চারদিকে সূক্ষ্ম জাল বিছিয়ে রেখেছে, ল্যাভেন্ডারের সুবাসের ঘোরের যে জালে সুমধুর কোনো সংগীত আজীবনের জন্য কয়েদ হয়ে আছে। তুলোয় ওড়ানো ট্যালকম পাউডারের ভারি গুঁড়ো যত্রতত্র ঘুরছে আর উড়ছে, র‌্যাভেলের কোয়ার্টার থেকে ভেসে আসা বেহালা আর বেহালা জাতীয় যন্ত্রের বাজনা তারই ফাঁকে ফাঁকে ঢুকে পড়ছে। কারো সুচারুভাবে সাজানো জগতে, যেখানে মানুষটা প্রতিটি জিনিসে নিজের আত্মার প্রতিচ্ছবি সাজিয়ে রেখেছে সেখানে অতর্কিতে ঢুকে পড়তে আমার বাধে। ওই বইগুলোর কথাই ধরো [একদিকে সারি করে রাখা স্প্যানিশ, আরেকদিকে ফ্রেঞ্চ আর ইংরেজি], আর সেখানে পড়ে থাকা বিশাল সবুজ কুশনটা, মাথার উপরে নির্দিষ্ট জায়গায় গর্ত করা সাবানের ফেনার মতো দেখতে ক্রিস্টালের ছাইদানিটা, যেটা টেবিলের উপরে থাকে, আর বরাবরই সে জায়গাটায় কোনো না কোনো সুগন্ধ দুলে দুলে ভাসে, মৃদু কোনো শব্দ সেখানে, যেন কুঁড়ি থেকে ফুলের ফোটার শব্দ, পাশেই ফ্রেমে ঝোলানো মৃত কোনো আপনজনের ছবি, তার পাশে নিজের জায়গায় নিয়মানুযায়ী স্থির বসে থাকা চায়ের ট্রে, উপরে বর্গাকৃতি চিনির টুকরো ওঠানোর চামচ… ওহ্, প্রিয় আন্দ্রেয়া, তুমি জানো না এইসমস্ত সৌন্দর্যের মোকাবেলা করা কত কঠিন! কত কঠিন একজনের স্বকীয়তার নির্ভুল প্রতিকৃতিতে ভাগ বসানো, কত নির্মম এক তরুণীর মনের মাধুরী মিশিয়ে রচনা করা উদ্যানে উড়ে এসে জুড়ে বসা! এখন ওই ধাতব ট্রে যদি প্রয়োজনে কেউ টেবিলের আরেক প্রান্তে ঠেলে দেয় তবে তার কতটা খারাপ লাগতে পারে তোমার ধারণা নেই। ঠেলে আরেক মাথায় পাঠাতে হয় কারণ তার হাতে থাকে কয়েকটা ইংরেজি অভিধান যা তার হাতের নাগালে থাকতে হলে টেবিলের এই প্রান্তেই রাখতে হবে। ট্রে-টাকে তার নিজস্ব জায়গা থেকে সরানো বলতে গেলে এমন যেন আমিদি উজফঁর ছন্দময় চিত্রের উপরে অপ্রত্যাশিত ভয়ানক কড়া লাল রং ঢেলে দেয়া, যেন ম্যোৎজার্টের মোহনীয় সংগীতের মাঝপথে বেদনাবিধুর কোনো নীরবতায় আকস্মিক বেইস গিটারের প্রত্যেকটা তারে একযোগে তুমুল আঘাত করা। ওই সামান্য ট্রে-টা সরালেও আস্ত বাসাটার প্রত্যেকটা জিনিসের সঙ্গে প্রত্যেকটা জিনিসের, প্রতিটা মুহূর্তের মধ্যে লুকানো প্রাণের সঙ্গে ওই বাসার এবং সেখানকার অনুপস্থিত অধিবাসীর আত্মার সম্পর্কের সাবলীলতা নষ্ট হয়ে যায়। আর তাই আমি সেখানকার কোনো বই স্পর্শ করতে পারি না, কোনো বাতির উপরের গম্বুজাকৃতি ঢাকনাটা ধরে কালেভদ্রে সামান্য একটু নাড়াই, কখনো পিয়ানোর বেঞ্চের উপরটা তুলে দেখি, প্রতিহিংসার কোনো মনোভাব আসে না, বিপদগ্রস্ত হয়ে আত্মরক্ষারও প্রয়োজন পড়ে না, সমস্তকিছু কেন যেন আমার চোখের সামনে দিয়ে দুরন্ত এক ঝাঁক চড়ুইয়ের মতো ফুড়ুত করে সরে যায়।


আমি শুধু স্পষ্টভাবে এটা বুঝতে পারছিলাম যে, আমি তাকে মেরে ফেলতে পারি নি।


তুমি জানো কেন আমি তোমার বাড়িতে এসেছিলাম। আলো ঝলমলে দুপুরের বর্ণছটা থেকে এক চামচ ঝলকানি তুলে নিয়ে তোমার যে বসার ঘরটা সাজানো, তুমি ভালো করেই জানো কেন এসেছিলাম সেখানে। এখন সমস্তকিছু এতটাই স্বাভাবিক আর সাবলীল মনে হয়, ঠিক যেমনটা মনে হয় সত্যের মুখোমুখি হবার আগপর্যন্ত। তুমি প্যারিসে চলে গেলে, আমি তোমার কাইয়ে সুইপাশার অ্যাপার্টমেন্টে রয়ে গেলাম। তার আগেই আমরা সহজ আর সুবিধাজনক একটা পরিকল্পনা করে ফেলেছিলাম যেটা আমাদের দুজনের জন্যই মেনে নেয়া ছিল ঝামেলাবিহীন। সেপ্টেম্বর নাগাদ তুমি বুয়েনস আয়ারসে ফিরে আসা পর্যন্ত আমি ওখানেই থাকছি, তুমি ফিরে এলে না-হয় অন্য কোনো বাসায় কোনো একটা ব্যবস্থা… কিন্তু আমি আসলে সেটা মনে করিয়ে দিতে তোমাকে চিঠি লিখছি না। আমি তোমাকে লিখতে চেয়েছিলাম ওই খরগোশগুলোর কারণে, আমার মনে হলো, তাদের কথা তোমাকে জানানো দরকার। আরেকটা কারণ হলো আমি চিঠি লিখতে ভালোবাসি, আর তার সঙ্গে হয়তো আরো একটা কারণ আছে, তা হলো, এখন বৃষ্টি হচ্ছে।

গত বৃহষ্পতিবার বিকেল পাঁচটার দিকে যখন ক্লান্ত কুয়াশা চারপাশে ভারি হয়ে আসন পেতেছে, ঠিক তখন আমি তোমার বাড়িতে এসে উপস্থিত হয়েছি। তার আগপর্যন্ত এত এত স্যুটকেস আমি গুছিয়েছি, এত বেশি মালপত্র বেঁধে নিয়েছি যে এর আগে কখনোই জায়গা বদলের সময়ে এমনটা করি নি। ওই বৃহষ্পতিবারটা ছিল ছায়ায় ছায়ায় আবৃত। সবখানে থেকে থেকে ছায়া আর হালকা রোদের লুকোচুরি। আমি যখন আমার ছোট ব্যাগের লম্বা ফিতেটা ঘাড়ে তুলতে যাব, মনে হলো যেন আলো-আঁধারের একটা ডোরা হাতে নিচ্ছি। আবার মনে হলো, সেই ডোরাগুলো যেন একটা লম্বা চাবুকের টুকরো টুকরো অংশ যা সবার অগোচরে সূক্ষ্ম অথচ ভয়ংকরভাবে আমাকে আঘাত করছে। কিন্তু সে যন্ত্রণা ভুলে আমি আমার জিনিসপত্র গোছগাছ করে নিলাম। তোমার কাজের লোকটিকে আগেই জানিয়ে দিলাম যে আমি আসছি। তারপর তোমার বাড়ির লিফটে চড়ে উপরে যাবার সময়ে দোতলা আর তিন তলার মাঝামাঝি জায়গায় আমার মনে হলো আমি এখনই একটা ছোট্ট খরগোশ উগরে দেবো। আমি এর আগে কখনো তোমাকে এই কথাটা বলি নি, মানে, আমার মনে হয় সেভাবে বলি নি আর কী, হয়তো সত্য স্বীকার করার ভয়ে। তবে স্বাভাবিকভাবেই একজন মানুষ অনেককে বুঝিয়ে বলতে পারে যে মানুষ আসলে ধীরে ধীরে একটা করে ক্ষুদে খরগোশ উগরে দিতে শুরু করে। এর আগে যতবার এটা হয়েছে আমি চেষ্টা করেছি সবার থেকে দূরে একা থাকতে। বিষয়টাকে আর সবার চোখের আড়ালে রাখতে চেয়েছি, ঠিক যেমন মানুষ ব্যক্তিগত অনেক কিছুকেই অন্যের নজর থেকে লুকিয়ে রাখে, যেমন, একাকিত্বে আমাদের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অবস্থান সম্পর্কে আমরা কাউকে জানাই না। এই কারণে আমাকে গালি দিও না, আন্দ্রেয়া, দোষ দিও না আমাকে। হঠাৎ কখনো এমনটা হয়েছে বটে যে আমি একটা খরগোশ গলা থেকে উগরে দিয়েছি। এর বিশেষ কোনো কারণ নেই, যেমনটা তুমি হয়তো ভাবছ, মানে, আমি কোথায় আছি না আছি, কোনো কারণে অতিরিক্ত আনন্দিত হয়েছি কিংবা একাকিত্বে ভুগছি, অথবা দিনের পর দিন আমাকে মুখ বন্ধ করে চলতে হচ্ছে।

যখনই টের পাই যে এখন একটা খরগোশ উগরে দেবো, আমি আমার দুটো আঙুলকে সাঁড়াশির মতো করে মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে দেই। তারপর স্যাল হেপাটিকা খনিজের মধ্যে বুদ্বুদ ওঠার মতো গলার শেষ মাথায় কুসুম গরম ফোলা ফোলা আকৃতিটা অনুভব করার চেষ্টা করি। আকৃতিটা স্পষ্ট আর ফুঁড়ে ওঠে খুব দ্রুত, বলতে গেলে তখনই। ছোট্ট সাদা একটা খরগোশের দুটো ছোট ছোট কানের অবস্থান বুঝে নেবার পরে আমি আমার আঙুল দুটো মুখ থেকে বের করি। তার খানিক পরে খরগোশটা আস্ত তৈরি হয়ে আমার সামনে আসে, একেবারে স্বাভাবিক একটা খরগোশ, কেবলমাত্র আকৃতিতে অস্বাভাবিক ছোট, অনেকটা চকোলেটের খরগোশের মতো, তবে সাদা ফুটফুটে, বাকি সবকিছু হুবহু খরগোশের মতোই। আমি খরগোশটাকে আমার হাতের তালুতে রাখি। তার ফোলা ফোলা শরীরে হাত বুলাই। আঙুল দিয়ে তাকে আদর করি। খরগোশটার নড়াচড়া দেখলে মনে হয় জন্মাতে পেরে সে যারপরনাই খুশি। সে তার ছোট্ট নাক আমার আঙুলে ঘষে, ধীরে ধীরে আমার হাতের চামড়ায় নাক-মুখ দিয়ে সুড়সুড়ি দেয়, মনে হয় সে যেন খাওয়ার জন্য কিছু খুঁজছে। তাই তখন আমি যা করি, তা হলো [আমার বাড়ি বা কাছেধারে ঘটনাটা ঘটলে যা করি তাই বলছি], তাকে ঝোলানো বারান্দাটায় নিয়ে যাই। তারপর ফুলগাছের বড়ো টবটাতে আলতো করে ছেড়ে দিই, যেখানে ওর কথা ভেবে তিন পাতাওলা ক্লোভার গাছ আমি আগে থেকেই লাগিয়ে বড়ো করেছি। খরগোশটা তার কানদুটো যতটা পারে টানটান করে তুলে ধরে, কচি একটা পাতার চারদিকে তার সরু মুখ বৃত্তাকারে বারকয়েক ঘুরিয়ে নেয়, আর তখন আমি বুঝতে পারি যে এখন আমি তাকে সেখানে ছেড়ে কিছুক্ষণের জন্য নিজের কাজে যেতে পারি। আমি তাকে ছেড়ে চলে যাই অন্য সব মানুষদের মতো জীবন যাপন করতে যারা তাদের পোশা খরগোশ খামার থেকে সংগ্রহ করে।

তারপর, আন্দ্রেয়া, তখন লিফটের ভিতরে দ্বিতীয় আর তৃতীয় তলার মাঝামাঝি জায়গায় গিয়ে আমি আমার জীবনের রূঢ় সত্যটা উপলব্ধি করতে থাকি, তোমার বাড়িতে থাকার সময়টা আমার জন্য কেমন হতে পারে, কারণ, ততক্ষণে আমি জেনে গেছি যে খানিক পরেই একটা খরগোশ উগরে ফেলব। আমি আতঙ্কিত বোধ করি [কিংবা বিস্মিত হই কি? নাহ্, সম্ভবত আবারো একই বিস্ময়ের মোকাবেলা করার ভয়ে কুঁকড়ে থাকি] কারণ, নিজের বাড়ি ছাড়ার আগে, মানে, তার ঠিক দুদিন আগে আমি একটা খরগোশের জন্ম দিয়েছিলাম। আর তাই আমার মাথায় ছিল যে অন্তত মাসখানেক কিংবা ভাগ্য ভালো থাকলে পাঁচ কি ছয় সপ্তাহের জন্য আমি ঝামেলামুক্ত। আর বিশ্বাস করো, নিয়মিত সমস্যাটা বলতে গেলে ভালোভাবেই সামলে নিয়েছিলাপম। আমার বাড়ির ঝোলানো বারান্দার টবে ক্লোভারের গাছ লাগিয়েছিলাম, তারপর মুখ থেকে খরগোশ বেরোনোমাত্র তাকে টবে রাখতাম। সেবারে মাসের শেষদিকে আরেকটা খরগোশ যখন বেরিয়ে আসবে আসবে বলে সন্দেহ করছিলাম… আগেরটা ততদিনে বেশ নাদুস-নুদুস হয়ে উঠেছিল, তখন মোহ্লিনাকে সেটা উপহার দিয়ে এলাম। সে ভেবেছিল খরগোশ পালন আমার শখ আর শখটা নিয়ে কখনো আমি কারোর সঙ্গে আলাপ করি নি। বারান্দায় আরো একটা টবে ক্লোভার লাগিয়েছিলাম, কচি পাতাগুলো সেটাতে লকলক করে উঠছিল। তেমন মনোযোগ না দিলেও, সেদিন সকালে গলার কাছে চিনচিন করে কিছু একটা ফুলে উঠে গলাটা আটকে দিচ্ছে বলে মনে হলো, তারপর আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে আরেকটা নতুন ছোট্ট খরগোশ তার পূর্বপুরুষদের মতো একই পথে আবির্ভূত হলো। অভ্যাস, আন্দ্রেয়া, একেই বলে অভ্যাস। অভ্যাস হলো একই ছন্দে বাঁধা কাজের সমষ্টি, আর অভ্যাসের ছন্দই আমাদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করে। নির্দিষ্ট নিয়মে সেই অভ্যাসটার মধ্যে একবার ভালোমতো অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারলে দেখবে খরগোশ উগরে ফেলা তেমন কোনো সমস্যা নয়। তোমার হয়তো জানতে ইচ্ছে করছে যে এতসবকিছু করার কী দরকার, এইসমস্ত ক্লোভারের গাছেরই-বা কী প্রয়োজন আর কেন শুধু শুধু গিয়ে মোহ্লিনাকে খরগোশ উপহার দিয়ে আসা। এর চেয়ে তো অনেক সহজ ছিল ওই ছোট্ট খরগোশগুলোকে মুখ থেকে বেরোনো মাত্র মেরে ফেলা… আহা, এটা বুঝতে হলে তোমার নিজেকেও একটা খরগোশ উগরাতে হবে। তারপর তুমি তোমার দুটো আঙুল দিয়ে ধরে তাকে তোমার আরেক হাতের তালুর উপরে রাখবে, নিজের অজান্তে ওই খেলায় নিমগ্ন হবে, অবর্ণনীয় এক আভায় তোমার দৃষ্টি মজে যাবে, সত্যি বলতে কী, সেই ঘোর কাটা প্রায় অসম্ভব। এক মাস আসলে অনেক লম্বা সময়, এক মাসে বহু অতীত মিলিয়ে যায়। এক মাসে খরগোশটা আকারে বড়ো হয়, তার লোমগুলো ফুলে ফেঁপে ওঠে, ঠোঁটগুলো বড়োসড়ো হয়, চোখে একরকমের ধূর্ততা খেলা করে, এক মাস আসলে এতটাই লম্বা সময়, আন্দ্রেয়া, যে এক মাসে অনেক কিছু আমূল বদলে যায়।

আন্দ্রেয়া, খরগোশের ক্ষেত্রে আস্ত একটা মাস এতটা সময় যে তার মধ্যে সে আস্ত একটা খরগোশ হয়ে ওঠে; আর তারই মাঝখানে তার শরীরটা তুলতুলে লোমে অদ্ভুতভাবে ঢেকে যায়. . .একটা কবিতার যেমন প্রথম কয়েকটা কলি, ধরো, ‘আদমের রাতের ফলাহার’ এমন যে এতে কেবল একজনের কথাই লেখা… কিন্তু পরে আর সেই একজনের কথা নিয়েই পড়ে থাকে না। পরে তা এতটাই ছড়িয়ে যায় যেন সমতল সাদামাটা দুনিয়ায় একটা চিঠির মতো জায়গায় জায়গায় পৌঁছে যায়।

তবে এতকিছুর পরেও, আমি কিন্তু প্রথম খরগোশটা জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গে তাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলাম। আমি তোমার ওখানে টানা চার মাস থাকার জন্য তখন তৈরি, ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে হয়তো তিন—তখন আমি প্রথমেই খরগোশটার গলা দিয়ে এক টেবিল চামচ অ্যালকোহল ঢেলে দিতে চেয়েছিলাম। [এই দুঃসহ ব্যাপারটা তুমি জানো তো, খরগোশকে মারতে হলে তার মুখ খুলে এক টেবিল চামচ অ্যালকোহল ঢেলে দাও, ব্যস। মানুষে বলে ওভাবে মারলে নাকি পরে ওটার মাংস খেতে বেশি মজা। যদিও, আমি ভেবেছিলাম, তিন থেকে চার টেবিল চামচমতো অ্যালকোহল ওর মুখে ঢেলে দিয়ে একটা প্যাকেটে ভরে ময়লার বাকসে ফেলে দেবো।]

তোমার বাড়ির লিফট যখন তৃতীয় তলায় উঠল, খরগোশটা তখন আমার হাতের তালুতে নড়াচড়া করছে। ওদিকে সারা সেখানে আমার ব্যাগগুলো টেনে বাড়িতে ঢোকানোর জন্য অপেক্ষা করছিল… তাকে আমার কী বলা উচিত, এটা আমার অদ্ভুত একটা খেয়াল? কিংবা ধরো, বলে দিলাম যে আমি একটা পোষা প্রাণী কেনার দোকানের পাশ দিয়ে আসছিলাম, তখন হঠাৎ ইচ্ছে হলো? ওই ছোট্ট প্রাণীটাকে তখন আমি রুমালে মুড়ে নিলাম। তারপর তাকে আমার ওভারকোটের পকেটে চালান করে দিলাম। পকেটের বোতামটা খোলাই রাখলাম যেন খরগোশটা সেখানে আবার চিড়ে চ্যাপটা হয়ে না-যায়। ওটা বলতে গেলে পকেটের ভিতরে কোনো নড়াচড়াই করল না। নামমাত্র চেতনা তার কাছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে নিশ্চয় স্পষ্ট করছিল, যেমন, উপরে উঠতে উঠতে পরিণত সময়ের মোক্ষম এক ধাক্কায় জীবন সামনের দিকে এগোয়, সেখানে থাকে নিচু ছাদ, সাদা ছোট একটা ঘর যেটা ল্যাভেন্ডারের গন্ধে পরিপূর্ণ, আর তারপর কেউ তোমাকে গরম কাপড়ে মুড়িয়ে খামের মতো ছোট জায়গায় পুরে রাখে।

সারা কিছুই ধরতে পারল না। আমার বাকসোপেটরা, কাগজপত্রের স্তূপ, কোনটা আগে নেবে আর কোনটা কিভাবে নেবে, সেই দুঃসহ কাজের সমাধান নিয়ে সে ব্যস্ত ছিল। তার মাঝখানে আমার খুঁতখুঁতে স্বভাব আর প্রতিটা কাজের জন্য ঘন ঘন ক্লান্তিভরা, ‘ধরো’ বা ‘মনে করো’ শুনতে শুনতে সে হয়তো বেশ চিন্তিতও হয়ে পড়েছিল। ব্যস্ততায় আমি বাথরুমে গিয়ে খরগোশটাকে মেরে ফেলার মতো সময়ও পেলাম না। পকেটের মতো নিরাপদ জায়গায় আর রুমালের ওমের মধ্যে এবারের খরগোশটাকে উঁকি দিয়ে দেখলাম অদ্ভুত সাদা আর আগেরগুলোর চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর। খরগোশটা আমার দিকে তাকায় নি। সে তার মতো লাফালাফিতে ব্যস্ত ছিল। তার ভাবগতি আমার কাছে তাই আরো বেশি আশঙ্কাজনক বলে মনে হলো। আমি তাকে একটা খালি ওষুধের বাকসোর মধ্যে বন্ধ করে ফেললাম। তারপর জিনিসপত্র গোছগাছ শুরু করলাম। আমার খারাপ লাগছিল না, তাকে বন্ধ করে রাখার জন্য মনে কোনো অপরাধবোধও কাজ করছিল না, এমনকি আমি ওটার নড়াচড়া শেষবারের মতো স্পর্শ করার অনুভূতি সরিয়ে ফেলার জন্য সাবান দিয়ে হাতও ধুই নি।

আমি শুধু স্পষ্টভাবে এটা বুঝতে পারছিলাম যে, আমি তাকে মেরে ফেলতে পারি নি। কিন্তু সেই রাতেই আমি আরেকটা কালো কুচকুচে খরগোশ উগরে ফেললাম। তার দুদিন পরে উগরে দিলাম আরেকটা ধবধবে সাদা। আর তারপর চতুর্থ রাতে খুবই ছোট ধূসর একটা খরগোশ আমার গলা দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল।

 *

শোবার ঘরের অপূর্ব আলমারিটাকে তুমি নিশ্চয় অনেক ভালোবাসো। ওটার বিশাল দরজাটা ধীরে ধীরে খোলে আর শূন্য তাকগুলো হয়তো আমার কাপড়চোপড়ের অপেক্ষায় ছিল। এখন আমি খরগোশগুলোকে সেখানে রেখেছি, ওই আলমারির ফাঁকা তাকগুলোয়। সত্যি বলছি, শুনতে হয়তো অসম্ভব শোনাচ্ছে; এমনকি সারাও হয়তো কথাটা বিশ্বাস করবে না। সে হয়তো তেমন কিছু সন্দেহও করে নি। আর তাই আমি আমার অভ্যাসের তন্ময়তায়, যে আকর্ষণ আমাকে দিনের পর দিন আর রাতের পর রাত ব্যাপী আচ্ছন্ন করে রেখেছে, সমস্ত বাধা অতিক্রম করে সেই একমুখী মগ্নতায় নিজেকে নিযুক্ত রাখতে পারি। এভাবে ভিতরে ভিতরে আমি আরো শক্ত হই, পুড়ে পুড়ে হই ঝামা, ঠিক বাথটাবের উপরে রাখা তোমার ওই কালচে তারা মাছটার মতো, প্রতিবার গোসলের সময় যাকে দেখলে আমার মনে হয়, এই বুঝি লবণের তলায় ডুবে ফুলে উঠল, পরমুহূর্তে তীব্র সূর্যের ভয়ানক আলোকরশ্মির জোরালো কষাঘাতে কড়কড়ে হয়ে গেল।

তারা দিনের বেলায় ঘুমায়। মোটমাট দশটা খরগোশ এখন সেখানে। দিনের পুরোটা সময় তারা ঘুমিয়ে কাটায়। আলমারির বন্ধ দরজার পিছনে একের পর এক তাদের রাতগুলো হয়তো একইরকম, যে সময়টায় তারা শান্ত আর লক্ষ্মী হয়ে ঘুমাতে পারে। আমি যখন কাজে যাই, সঙ্গে করে শোবার ঘরের দরজার চাবিটা নিয়ে যাই। সারা হয়তো ভাবে আমি তার সততাকে আমলে নিই না আর সে কারণে আমার দিকে খানিক সন্দেহের চোখে তাকায়। প্রত্যেক সকালে সে এমনভাবে আমার দিকে চেয়ে থাকে যেন কিছু বলতে চায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সারা চুপই থাকে আর সে কারণে আমি বেশ ঝামেলাবিহীন আছি। [তবে সারা যখন সকাল নয়টা থেকে দশটার মাঝখানে শোবার ঘরের বিছানার চাদর ঠিকঠাক করতে আসে, আমি তখন বসার ঘরে জোরে জোরে শব্দ করতে থাকি। হয়তো বেনি কার্টারের একটা রেকর্ড বাজাতে শুরু করলাম যার শব্দ পুরো অ্যাপার্টমেন্টে গমগম করতে থাকে। আর সারা যেহেতু সিডিস আর পাসোডবলের ভক্ত, তাই আলমারির ওদিক থেকে ভেসে আসা কোনো উটকো শব্দের দিকে মনোযোগ দিতে পারে না। আর তা ছাড়া, সুখের কথা হলো খরগোশগুলোর রাত তখনো শেষ হয় না তাই নিয়ম অনুযায়ী তারা তখন শান্ত হয়ে বিশ্রাম নেয়।]


শব্দবিহীন ধূসর আলোর আরেকটা ভোরে উপস্থিত হয়েছি। এটা কি সত্যিই পরের দিন, আন্দ্রেয়া? 


আমাদের রাতের খাবার শেষ হবার অন্তত এক ঘণ্টা পরে খরগোশগুলোর দিন শুরু হয়, যখন সারা আমার জন্য ট্রে-তে করে চা নিয়ে আসে, চিনির বর্গাকার টুকরো ওঠানোর চমৎকার চামচটা যেখানে টুংটাং শব্দে বাজে। সারা আমাকে শুভরাত্রি বলতে আসে। হ্যাঁ, আন্দ্রেয়া, সারা আমাকে শুভরাত্রি বলে যায়। কী আর বলব, এটাই সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার যে উলটো অর্থেই সারা আমাকে শুভরাত্রি বলে যায়। আর তারপর নিজেকে নিজের ঘরের মধ্যে আটকে ফেলে। আর তখন আমি একদম নিজের মতো, যা খুশি তাই করার স্বাধীনতা পেয়ে যাই। আমি তখন ওই বন্ধ আলমারির সামনে একা। আমি তখন আমার দায়িত্ব আর একাকিত্বের সামনে নতজানু।

আমি তখন খরগোশগুলোকে আলমারি থেকে বেরোতে দিই। তারা চঞ্চল পায়ে বসার ঘরের এদিক-ওদিক দল বেঁধে লাফালাফি করে। আমার পকেটে লুকানো ক্লোভারের পাতাগুলো তারা শুঁকতে থাকে, যেগুলো খানিক পরে আমি পড়ে পেঁচিয়ে থাকা ফিতার মতো করে কার্পেটের উপরে ছড়িয়ে দিই। তারা খাওয়া শুরু করলে ফিতার আকৃতি বদলে যায়। পাতাগুলো মুচমুচ করে খেয়ে ফেলতে তাদের এতটুকু সময় লাগে না। তারা ঠিক মতো খায়, সাধারণত কোথাও কোনো চিহ্ন রাখে না। তাদের খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমার কিছু করার থাকে না। আমি কেবল হাতে যে কোনো একটা বই নিয়ে সোফার উপরে গা এলিয়ে তাদের দেখতে থাকি। আমিই, আন্দ্রেয়া, যে মানুষটা কিনা জিরাডুয়ের সমস্ত রচনা পড়ে ফেলতে চায় আর লোপেজ আর্জেন্টাইনের ইতিহাস বইয়ের প্রতি প্রচণ্ড কৌতূহল বোধ করে, যে বইগুলো তুমি তার সুবিধার জন্য বুকশেলফের নিচের তাকে রেখে গেছ, সেসব ফেলে সে খরগোশদের ক্লোভার পাতা সাবাড় করা দেখে দেখে সময় কাটায়।

তারা সব মিলিয়ে দশটা, প্রায় সবাই বলতে গেলে সাদা। তারা তাদের ছোট্ট নরম মাথাগুলো বসার ঘরের বাতিগুলোর দিকে তুলে ধরে। ওই বাতিগুলো তাদের দিনের স্থির তিনটা সূর্য। তারা ওই আলোগুলোকে ভালোবাসে কারণ তাদের রাত নিশ্চিদ্র অন্ধকারের, যেখানে না থাকে চাঁদ, না সূর্য, না তারা, এমনকি রাস্তার বৈদ্যুতিক বাতিও থাকে না। তারা পর্যায়ক্রমে তাদের তিনটি সূর্যের দিকে তৃপ্ত চোখে তাকায়। তারপর তারা কার্পেট থেকে চেয়ারে, এখানে-ওখানে লাফাতে আরম্ভ করে যেন দশটি রঙের গোলা বহমান নক্ষত্রপুঞ্জের মতো ঘরের এমাথা থেকে ওমাথায় যাতায়াত করে। অথচ তখন আমি মনে মনে তাদেরকে শান্ত দেখতে চাই, দেখতে চাই তারা সারি বেঁধে চুপটি করে আমার পায়ের কাছে বসে থাকুক—যে কোনো সৃষ্টিকর্তা যেমনটা স্বপ্ন দেখে, আন্দ্রেয়া, সৃষ্টিকর্তা হয়তো কখনোই তার স্বপ্ন সত্য হতে দেখে না। এখানেও তেমনই, স্বপ্নের থেকে অনেক দূরবর্তী কিছু ঘটতে থাকে, মিগেল দে উনামুনোর ছবির পিছনের দিকে তারা এলোমেলো ঘুরতে থাকে, তারপর মৃতদেহের ভস্ম রাখার ফ্যাকাশে সবুজ পাত্রটার উপর দিয়ে লাফিয়ে লেখার টেবিলের শেষ মাথার সামান্য অন্ধকার গুহার মতো অংশে তাদের পদচারণা চলতে থাকে। বরাবর তাদেরকে এক সঙ্গে দশের চেয়ে কম সংখ্যায় দেখি, এই যেমন ধরো, ছয় কি আট। আর তখন আমি নিজেকে প্রশ্ন করতে থাকি, বাকি দুটো কোথায় গেল, কিংবা এখন যদি হঠাৎ সারা ঘুম থেকে জেগে ওঠে তবে কী হবে, কিংবা ধরো ভাবতে থাকি, লোপেজের ইতিহাসে আমি যে দ্রিভাদাভিয়ার প্রেসিডেন্ট থাকার সময়কার ঘটনাগুলো যে পড়তে চাচ্ছিলাম, তার কী হবে।

আন্দ্রেয়া, আমি জানি না এইসবের মধ্যে আমি কী করে ভালো থাকব। তোমার নিশ্চয় মনে আছে যে আমি তোমার বাড়িতে এসেছিলাম খানিক বিশ্রাম নেব বলে। এখন আমি যদি কয়েকদিন পরপর একটা করে খরগোশ উগরাতে থাকি, সেটা তো আমার দোষ না। এই বিষয়টা ভিতরে ভিতরে আমার মন মানসিকতাও বদলে দিচ্ছে। না না, এটা কোনো সাধারণ ব্যাপার নয়, আবার আকস্মিক ঘটা কোনো জাদুও নয়, এটা এমন একটা জিনিস যা চট করে আমি বদলে ফেলতে পারি না, কখনো এমন হয় যে কারো সাজানো জীবনটা হুট করে তছনছ হয়ে যায়, আর সে তখন তার ডান গালে একটা চড় খাওয়ার অবাঞ্ছিত ঘটনা মেনে নেয়—সত্যি কথা বলতে কী, তেমনই একটা ব্যাপার, আন্দ্রেয়া, ঠিক তেমনই।

তোমাকে লিখতে লিখতে রাত হয়ে গেল। এমনিতে এখন বিকেল তিনটা, কিন্তু আমি আসলে তোমাকে চিঠি লিখছি খরগোশগুলোর রাতের বেলায়। ভাগ্যিস তারা দিনে ঘুমায়। সে কারণেই অফিসে আসাটা আমার জন্য এত সহজ। অফিসে আমার চারপাশে কত কত টাইপ রাইটারের শব্দ, চেঁচামেচি, কত আদেশ-নির্দেশের আওয়াজ, ভাইস প্রেসিডেন্টের চিৎকার আর মিমিওগ্রাফ যন্ত্রের ক্রমাগত খটর খটর! অথচ তার মধ্যে কী যে শান্তি, কী যে আরাম, আবার কী যে আতঙ্কও, আন্দ্রেয়া! আমার বন্ধুবান্ধবেরা এখন ফোন করে চলেছে, রাতের পর রাত আমার একাকী ধ্যানমগ্ন অবস্থা দেখতে দেখতে তারা আমার উপরে দারুণ বিরক্ত। লুই আমাকে রাতের খাবার পরে তার সঙ্গে হাঁটার জন্য ডাকে, আর জর্জ কদিন পরের একটা গানের অনুষ্ঠানের টিকেট জোগাড় করেছে, আমাকে তার সঙ্গে যাবার জন্য ভীষণ জোরাজুরি করছে। তাদেরকে সরাসরি মানা করার সাহস আসলে আমার নেই। আমি তাই আমার কাল্পনিক অসুস্থতার লম্বা-চওড়া আর তাদের চোখে কিঞ্চিত অবাস্তব গল্প ফাঁদি। তবে সেসব তাদের বিশ্বাস করানোর চেষ্টা আমি করি না। বরং নানান ছলে তাদের বিস্মিত চোখগুলো এড়িয়ে চলে আসি। আর তারপর আমি যখন বাড়ি ফিরে আসি, লিফটে উঠি—সেই দোতলা আর তিন তলার মাঝামাঝি জায়গায়—রাতের পর রাত সেই একইরকমের হতাশা আমাকে চেপে ধরে, আমি প্রাণপণে ভাবতে চেষ্টা করি যে আমার সঙ্গে যা হচ্ছে তা সত্য নয়।

আমি খরগোশগুলোকে আমার সাধ্যমতো পাহারা দিচ্ছি যেন তারা তোমার কোনো শখের জিনিস ভেঙে না-ফেলে। তবে বুকশেলফের নিচের তাকের বইগুলোতে তারা কয়েকটা কামড় বসিয়েছে। তুমি খেয়াল করলে দেখবে শেলফে দাঁড় করানো বইগুলোর পিছনের দিকটা খোবড়ানো। আমিই বইগুলোকে উলটোদিকে ঘুরিয়ে রেখেছি যেন আঁচড় আর কামড়গুলো সারার নজরে না পড়ে। পোর্সেলিনের বড়োসড়ো পেটওলা যে বাতিটা আছে, যার উপরে শত প্রজাপতি আর কয়েকজন বয়স্ক রাখাল বসে থাকার ছবি, ওটা কি তোমার খুব প্রিয়? ভাঙা টুকরোগুলো দিয়ে যে ওটা আমি আবারো সুন্দর করে বানিয়ে রেখেছি, সেই জোড়াগুলো তুমি খুব ভালো করে লক্ষ না করলে দেখতে পাবে না। এক ইংরেজের দোকান থেকে সবচেয়ে ভালো জাতের সিমেন্ট কিনে এনে পুরো একটা রাত খরচ করে আমি ওই বাতিটাকে মেরামত করেছি। আর তুমি তো জানোই যে ইংরেজরাই সবচেয়ে মিহি সিমেন্ট বিক্রি করে। তবে এখন ওরা যতক্ষণ খেলে আমি ততক্ষণ ওটারই পাশে বসে থাকি যেন তাদের মধ্যে কেউ আবার উঠে এসে বাতিটার উপরে দুষ্টু থাবা বসাতে না-পারে। [খরগোশগুলো যখন শুধু পিছনের দুটো পায়ের উপরে দাঁড়িয়ে থাকে, অনেক সুন্দর দেখায়। মনে হয় দূরবর্তী কোনো অতীতে মানুষ থাকার স্মৃতিময়তা তাদের পেয়ে বসেছে, কিংবা তাদের সৃষ্টিকর্তা যে তাদের চারপাশে ঠিক ওভাবে হাঁটে আর আড়চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে, তাকে দেখে অনুপ্রাণিত। তা ছাড়া, তুমি নিশ্চয় আগে দেখেছ, বিশেষ করে তুমি যখন বাচ্চা ছিলে, তোমার নিশ্চয় মনে আছে দোয়ালের কোণের দিকে একটা খরগোশের পুতুল দাঁড় করিয়ে রাখলে সেটা কেমন হাত উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকত, যেন তাকে কোনো কারণে শাস্তি দেয়া হয়েছে, আর সে সেখানটায় দেয়ালে ভর দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়েই থাকত, ঘণ্টার পর ঘণ্টা।]

ভোর পাঁচটার সময়ে [যখন সবুজ সোফার নরম ভেলভেটের পরতে পরতে গুঁজে থাকা আরামের রাজ্য থেকে জেগে উঠি, সামান্য আড়মোড়া ভেঙে ভেলভেটের ভাঁজগুলো সোজা করে ফেলি] আমি খরগোশগুলোকে আলমারির ভিতরে ঢুকিয়ে দিই। তারপর তারা যা কিছু লন্ডভন্ড করেছে সেসব ঠিকঠাক করি। যে কারণে সারা বরাবর সমস্তকিছু জায়গা মতো পায়। কিন্তু তবু আমার মনে হয় কোথাও যেন হঠাৎ মুখে কোনো প্রশ্ন নিয়ে থমকে দাঁড়ায়, খানিক অবাক হয়ে একটা কোনো কিছুর দিকে এক পলক তাকায়, কার্পেটের কোথাও যেন সুতোগুলো উলটে থাকায় রঙের তারতম্য, কিংবা কোথাও আমার কাছে কিছু একটা জানতে চাওয়ার স্পৃহা নিয়ে থামে, আর ওরকম সময়ে আমি এমন সুরে ফ্র্যাঙ্কের সিমফোনিক ভ্যারিয়েশন থেকে একটা কোনো সুর শিস দিয়ে গাইতে থাকি, যা শুনে সে তার প্রশ্ন ভুলে যায়। এই সমস্ত প্রতি মিনিটের উপদ্রব আর সবজিতে পরিপূর্ণ ভোরের কাহিনি আমি কী করে তোমাকে বোঝাই, আন্দ্রেয়া, ঘুমচোখে কোনোরকমে আমি উঠি, সারা ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ক্লোভারের পাতার আধাখাওয়া অংশ বা বোঁটা, আসবাবের কোণাকাঞ্চিতে পড়ে থাকা দলা দলা সাদা লোম, এই সমস্ত কুড়াতে থাকি। কম ঘুমের অতৃপ্তি আর যন্ত্রণায় পাগলপ্রায় আমি জিদা আর ট্রয়াটের বইগুলোর পিছনে লুকাই, যেগুলোর অনুবাদ আমার বেশ আগেই শেষ করে ফেলার কথা ছিল। আর দূরে থাকা তোমার মতো এক তরুণীকে চিঠি লিখি, যদি তোমার জানতে ইচ্ছে করে, কবে, কেন… আমি কেন এইসমস্ত ঝামেলা বয়ে বেড়াই, টেলিফোন আর ইন্টারভিউয়ের ফাঁকে ফাঁকে তাই তোমাকে এত্ত বড়ো চিঠি লিখছি।

আন্দ্রেয়া, প্রিয়, আন্দ্রেয়া, এতকিছুর পরেও একটাই সান্ত্বনা যে এখনো খরগোশ দশটাই আছে। প্রায় পনের দিন হয়ে গেল আমার মুখ থেকে আর কোনো খরগোশ জন্মায় নি। পনের দিন ধরে আমার হাতের তালুতে নতুন কোনো ছোট্ট খরগোশ নড়াচড়া করে নি, আমার সঙ্গে বরাবর ওই দশটাই আছে। তাদের দৈনন্দিন জীবন আর দিনে-রাতে সমানে বেড়ে ওঠাটা অবশ্য চলছে। তারা দেখতে অনেক খারাপ হয়ে গেছে, লোমগুলো লম্বা হতে হতে ঝুলে পড়েছে, উঠতি কিশোর-কিশোরীর মতো সবসময় যেন কিছু না কিছু চাই চাই লেগেই আছে, উন্মাদের মতো ছোটাছুটি, আঁদিনুসের [ওটার নাম আঁদিনুসই তো, নাকি? যে ছেলেটা উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে?] মূর্তির উপরে লাফালাফি, এই চলতে থাকে। কখনো মনে হয় বসার ঘরে তারা যেন উন্মত্ত হয়ে উঠছে, মনে হয় তাদের সামান্য নড়াচড়াও তখন বুড়ো আঙুল দিয়ে চুটকি বাজানোর মতো শব্দ করে, তখন বাধ্য হয়ে আমাকে বসার ঘর থেকে তাদেরকে তাড়া লাগাতে হয়। কে জানে তাদের শব্দ শুনে আবার ভয়ের চোটে মাঝরাতে সারা তার রাতের পোশাকে হাজির হয় নাকি—বিষয়টা হয়তো এমন হবে যে সারা তার রাতের পোশাকে হাজির হলো—আর তারপর… তাদের দশজনকে দেখল, ভেবে দেখ, তাদের মাঝখানে বসে যে সামান্য আনন্দ আমি উপভোগ করি, সেই সুযোগ আমি হঠাৎ হারিয়ে ফেলব, তারপর নিজের বাড়ি ফিরবার সময়ে দোতলা আর তিনতলার মাঝখানের অনঢ় ছাদগুলো অনায়াসে গলে আমি নেমে যাব।

চিঠি লেখার মাঝখানে কমিটির সভায় যাবার জন্য আমাকে থামতে হয়েছিল, আন্দ্রেয়া। এখন তাই চিঠির বাকি অংশ আমি তোমার বাড়িতে বসে লিখছি। শব্দবিহীন ধূসর আলোর আরেকটা ভোরে উপস্থিত হয়েছি। এটা কি সত্যিই পরের দিন, আন্দ্রেয়া? পাতার উপরে সামান্য সাদা অংশকে তুমি একটা সেতু হিসেবে ধরতে পারো, সেতুটা কালকের লেখা চিঠির সঙ্গে আজকের লেখার সংযোগ ঘটায়। কিন্তু কী করে তোমাকে বলি যে ওই বিরতিটুকুতেই সমস্তকিছু ধূলিসাৎ হয়ে গেছে? যে সাদা অংশটুকুর দিকে তাকিয়ে তুমি দেখতে পাবে সময়ের ব্যবধান, ঠিক সেইটুকুর দিকে তাকিয়ে আমি বাঁধ ভাঙা ভয়ংকর বেগের পানির তোড়কে পাক খেতে খেতে সরে যেতে শুনতে পাই। এখন চিঠির পরের অংশটুকু লেখার ব্যাপারে আমার কথা যদি বলো, আমি আর সেই আগের শান্ত মনোভাব নিয়ে লিখতে পারছি না, কমিটির সভায় যাবার আগে যেভাবে তোমাকে লিখছিলাম। এখন আবারো রাতের গভীরে নিজেদের মুড়ে নিলে পৃথিবীর কোনো দুশ্চিন্তা যাদের ছোঁয় না, সেই এগারটা খরগোশ ঘুমিয়ে আছে। হয়তো এখনই, না না, এখন নয়—হয়তো ওই লিফটে, কিংবা এই বিল্ডিঙের দিকে আসার রাস্তায়, এটা আসলে মোটেও গুরুত্বপূর্ণ নয় যে কখন কোথায় আরেকটা খরগোশের জন্ম হলো, সেই সময়টা হতে পারে এখনই, আমার নিজস্ব সময়ের যে কোনো মুহূর্তেই তা হতে পারে।


এখন এমন একটা সময়, ভোর আর শীতল এক সকাল, যখন একাকী নিস্তব্ধতা চারদিকের সমস্ত সুখের অবসান ঘটায়


যথেষ্ট হয়েছে, আমি তোমাকে এই চিঠি লিখছি কারণ আমার কাছে তোমাকে জানানো জরুরি যে তোমার অ্যাপার্টমেন্টের জিনিসপত্র ভাঙচুরের জন্য সরাসরি আমি দায়ী নই। আমি এখন তোমার উদ্দেশে চিঠিটা পোস্ট করে আসব। প্যারিসের কোনো ঝকঝকে সকালে হয়তো ডাকপিয়ন তোমার হাতে চিঠিটা পৌঁছে দেবে। গত রাতে আমি দ্বিতীয় তাকের বইগুলোকেও উলটোদিকে ঘুরিয়ে রেখেছি। খরগোশগুলো এখন বুকশেলফের ওই তাকটাও ছুঁতে পারে। পিছনের পাদুটোতে ভর দিয়ে কিংবা লাফিয়ে লাফিয়ে তারা অনায়াসে ওগুলো কামড়েছে। তারা দিনভর কামড়ে যায়, চিবিয়ে যায় তাদের দাঁতগুলোয় শান দেয়ার জন্য, যেন সেগুলো আরো ধারালো হয়—তারা আসলে ক্ষুধার্ত নয়, খাওয়ার জন্য আমি তাদের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ ক্লোভারের পাতা নিয়ে আসি। লেখার টেবিলের ড্রয়ারের মধ্যে ক্লোভারের পাতাগুলো রেখে দিই। খরগোশগুলো কিছু পর্দা কামড়ে ছিঁড়ে ফেলেছে, আরামকেদারার উপরের ঢাকনাটা জায়গায় জায়গায় ফুটো করেছে, আউগোস্তো তোরেসের নিজের হাতে আঁকা আত্ম-প্রতিকৃতির কোণের দিকটার খানিকটা খাবলে নিয়েছে, কার্পেটের বুননের ভিতরে ভিতরে তাদের শরীর থেকে ঝরা তুলোর মতো অজস্র লোম আটকে আছে, এসব করে করে তারা দিনরাত ফুর্তি করেছে। তবে আনন্দ-ফুর্তি করার জন্য তারা কোনো শব্দ করে না। বাতির নিচে কখনো বৃত্তাকারে দাঁড়ায়, এমন করে দাঁড়িয়ে থাকে যেন তারা আমাকে আদর করছে। আর তারপর হঠাৎ করে তারা আনন্দের মতো শব্দ করে, কখনো হুট করে কাঁদতে শুরু করে, তাদের দেখার আগে আমি মোটেও জানতাম না যে খরগোশও কাঁদতে পারে!

ফাঁকে ফাঁকে আটকে যে লোমগুলো কার্পেটটাকে নষ্ট করছে, আমি একটা একটা করে সেগুলো উঠানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেছি। কার্পেটের সুতোর যে মাথাগুলোয় তারা ছোট কামড় বসিয়ে গর্ত গর্ত করে ফেলেছে, হাত দিয়ে সে জায়গাগুলো মসৃণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। না পেরে রাগ করে আবারো তাদেরকে আলমারির মধ্যে চালান করেছি। লিখতে লিখতে প্রায় সকাল হয়ে এল। সারা তো আজ আগেআগেও ঘুম থেকে উঠে যেতে পারে। তবে এটা খুব আজব যে আমি খরগোশগুলোকে দিনের পর দিন খেলার জন্য নেচে-কুঁদে কিছু না কিছু খুঁজে বেড়াতে দেখতে দেখতে এতটুকু বিরক্ত হই না। আমাকে সত্যিই তুমি দোষ দিতে পার না। তুমি যখন এখানে আসবে, ভালো করে লক্ষ করলে দেখবে আমি অনেককিছু ওই ইংরেজদের দোকান থেকে আনা সিমেন্ট দিয়ে মেরামত করে রেখেছি, মানে, এর মধ্যে খরগোশগুলো যা যা ভেঙেছে। ভাঙচুরের মতো অসভ্যতা লুকানোর জন্য আমার কাছে যা জরুরি মনে হয়েছে আমি তাই করেছি… আমি আসলে যতটুকু বুঝি, তা হলো, সংখ্যায় খরগোশ দশ থেকে এগারোটা হয়ে যাওয়া অসহনীয় ক্ষতি। তুমি নিশ্চয় বুঝতে পারছ, দশটা খরগোশ কখনো নয়টা ছিল, ওই আলমারির মধ্যে তখন মোটামুটি সুখেই ছিল, তাদের অনেক ক্লোভারের পাতা ছিল আর নিশ্চয় অনেক প্রত্যাশাও ছিল যে পৃথিবীতে ভালো কত কিছুই-না হতে পারে। কিন্তু তারপর এগারোটা হয়ে গেল, এখন ধরো, এগারোটা থাকা মানেই হলো গিয়ে একদিন না একদিন তারা বারোটা হয়ে যাবে। আর আন্দ্রেয়া, এটাও ভেবে দেখ যে একদিন ওই বারোটাও কিন্তু তেরোটা হবে। সুতরাং বুঝতেই পারছ, এখন এমন একটা সময়, ভোর আর শীতল এক সকাল, যখন একাকী নিস্তব্ধতা চারদিকের সমস্ত সুখের অবসান ঘটায়, কত স্মৃতি জেগে ওঠে, তোমার কথা মনে পড়ে। ঝোলানো বারান্দা এখন ভোরের আলোকণায় আবৃত, শহরের জাগরণের প্রথম ধ্বনি সেখানে এসে আছড়ে পড়ছে। আমার মনে হয় না এগারোটা ছোট ছোট খরগোশকে এখন নিচের রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে এলে তেমন কোনো সমস্যা হবে। কেউ হয়তো তাদেরকে ঠিক মতো লক্ষও করবে না। মানুষ এখন তাদের কাজকর্ম বা কাছের-দূরের মানুষদের নিয়ে অনেক বেশি ব্যস্ত। ভোরে যে সমস্ত বাচ্চা স্কুলের উদ্দেশে যায়, তাদের আসার আগেই খরগোশগুলোকে বাড়ি থেকে সরিয়ে ওখানে ছেড়ে দিয়ে আসা ভালো।

আফসানা বেগম

আফসানা বেগম

জন্ম ২৯ অক্টোবর, ১৯৭২, ঢাকা। ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা: ব্যবসা।

প্রকাশিত বই:
অনুবাদ: ঝাঁপ ও অন্যান্য গল্প ( নাদিন গোর্ডিমার), রোমান সাম্রাজ্য (আইজ্যাক আসিমভ), লেখালেখি তাদের ভাবনা (এগারো লেখকের প্রবন্ধ), পলাতক (এলিস মানরো)
ফিকশন: দশটি প্রতিবিম্বের পাশে (গল্প ), জীবন যখন থমকে দাঁড়ায় (উপন্যাস), প্রতিচ্ছায়া (উপন্যাস)

ই মেইল : afsana_29@yahoo.com.au
আফসানা বেগম

Latest posts by আফসানা বেগম (see all)