হোম অনুবাদ পাণ্ডুলিপি থেকে : স্যাঁ-ঝন প্যার্সের ‘আনাবাজ’

পাণ্ডুলিপি থেকে : স্যাঁ-ঝন প্যার্সের ‘আনাবাজ’

পাণ্ডুলিপি থেকে : স্যাঁ-ঝন প্যার্সের ‘আনাবাজ’
949
0

২০২০-এর বইমেলায় মাসরুর আরেফিনের অনুবাদে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে স্যাঁ-ঝন প্যার্সের বিখ্যাত কাব্য আনাবাজ। বইটির প্রকাশক ‘পাঠক সমাবেশ’। পরস্পরের পাঠকদের জন্য পাণ্ডুলিপি থেকে কিছু অংশ উপস্থাপন করা হলো।


আনাবাজ


            মানুষ বাইরে গেছে যবশস্য কাটবার দিনে। জানি না আমার ছাদে শোনা গেল কার প্রবল কণ্ঠস্বর। আর এই আমার দরজায় রাজারা রয়েছেন বসে। এবং রাজদূত খাচ্ছেন রাজাদের টেবিলটিতে বসে। (আমার ফসলে এদের পেটপূর্তি হোক!) ওজন ও মাপের পরীক্ষক নেমে আসছেন জোরালো নদীস্রোত বেয়ে, তার দাড়িতে মরা পোকামাকড়ের
            যত অবশেষ ও খড়কুটো লেগে আছে।

            আহা! সূর্য, তোমাকে দেখে আমরা বিস্মিত! এতসব মিথ্যা তুমি বলেছ আমাদের! …বিপদ ও বিরোধের প্ররোচনাদাতা! অপমান ও কুৎসা ভক্ষণে বাঁচো, ও মারমুখো! তো, ফেটে ফেলো আমার চোখের বাদাম! কলিচুনের জেল্লার মাঝে খুশিতে কিচির-কিচির করে আমার হৃদয়, পাখি গান গায়: “ও বৃদ্ধ বয়স! ..”, নদীগুলি তাদের বিছানায় শুয়ে আছে নারীদের কান্নার মতো আর এই পৃথিবী অনেক বেশি সুন্দর
            লাল রং করা কোনো মেষ চামড়ার থেকে!

            হা! আমাদের দেয়াল জুড়ে পাতার ছায়ার গল্প আরও কত বেশি, আর এই পানি যে কোনো স্বপ্নে দেখা পানি থেকে বিশুদ্ধ বটে। ধন্যবাদ, একে ধন্যবাদ দেওয়া হোক, কারণ এটা কোনো স্বপ্ন নয়! আমার আত্মাভরা ছলনাতে, যেমন বাগ্মিতা-বৃত্তিতে ভরা থাকে ক্ষিপ্রগতি প্রবল সাগর! তীব্র গন্ধ আমাকে ঘিরে আছে। আর বস্তুর বাস্তবতার ’পরে সন্দেহের তীর ছোঁড়া হলো। তবে কোনো লোক যদি নিজের দুঃখকে বেশি পছন্দ করে থাকে—তাকে দিনের আলোতে নিয়ে আসা হোক! এবং আমার মতামত, তাকে হত্যা করা হোক, অন্যথায়
            বিদ্রোহ মাথাচাড়া দেবে।

            বরং বলা ভালো: হে বাক্যবিশারদ! তোমাকে জানানো হলো ধারণার অতীত সব মুনাফার কথা। প্রণালীতে পথ ভুল করা সাগরেরা কখনও দেখেনি এর চাইতে কোনো সূক্ষ্ম বিচারক! আর মদে উদ্দীপিত লোক, যার হৃদয় পাশবিক, সে ভনভন করছে দেখো এক দল কালো মাছির মতন, এবং বলা শুরু করেছে এ জাতীয় কথা: “…গোলাপ, রক্তবর্ণ খুশি; আমার বাসনা মোতাবেক পৃথিবী ছড়ানো, টানটান—আর এই সন্ধ্যায় কে তাকে বাঁধবে সীমানায়? …জ্ঞানী ও প্রাজ্ঞ যে, তার মনে সহিংসতা জাগে, আর এই সন্ধ্যায় কে সীমা বেঁধে দেবে ঐসবে?…” এবং অমন কারো ’পরে, অমন কারো সন্তানের ’পরে, দরিদ্র সে,
            সংকেত ও স্বপ্নের ক্ষমতা দেখো অর্পিত হলো!

            “সেই রাস্তাগুলি খুঁজে বের করো যা ধরে সকল জাতির লোক হেঁটে চলে গেছে, তাদের গোঁড়ালির হলুদ রং দেখিয়ে দেখিয়ে: যুবরাজগণ, মন্ত্রীসকল, হেঁড়ে-কণ্ঠ অধিনায়কেরা; তারা, যারা করেছে বিশাল সব কাজ, এবং তারা, যারা স্বপ্নে দেখে এটা ওটা। .. যাজক তার বিধান জারি করেছেন পশুগামী নারীদের লাম্পট্য নিয়ে। ব্যাকরণবিদ তার তর্ক-কলহের জায়গা বেছে নিয়েছেন খোলা মাঠে। প্রাচীন এক গাছে দরজি ঝুলিয়েছে কী দারুণ মখমলের নতুন পোশাক। আর গনোরিয়ায় দূষিত যে লোক, সে তার অন্তর্বাস ধোয় পরিষ্কার জলে। পোড়ানো হলো ক্ষীণবল অশ্বের জিন এবং সেই গন্ধ পৌঁছাল পাটাতনে বসা নৌকার মাঝিটির কাছে,
            তার নাকে সে গন্ধ লাগছে মধুর।”

            মানুষ বাইরে গেছে যবশস্য কাটবার দিনে। তীব্র গন্ধ দিয়ে আমি ঘেরা, আর জবলের পানির চে’ও পবিত্র-পূত পানি ধ্বনি তোলে অন্য কালের। ..শুষ্ক বছরের দীর্ঘতম দিনে, ঘাসের নিচের মাটির বন্দনা ক’রে, আমি বুঝতে পারি না কোন শক্তিমান কে এল আমার পিছু পিছু। আর বালুর নিচে মৃতেরা, পেশাব ও পৃথিবীর নুন, এদের মাধ্যমে সবকিছুর ইতি, যেভাবে পাখিদের শস্য খেতে দেবার পরে তুষের সাথে ঘটে থাকে। এবং আমার আত্মা, আমার আত্মা মৃত্যুর সিংহদ্বারে সশব্দ পাহারা দিয়ে যায়—কিন্তু যুবরাজকে বলো থাকতে স্থির: এক বর্শার আগায়, আমাদের মাঝে,
            এই ঘোড়ার করোটি!

            এমনই ধরন পৃথিবীর, আর একে নিয়ে খারাপ কিছুই আমার বলবার নেই।—নগরীর পত্তন। পাথর আর ব্রোঞ্জ। ভোরে কাঁটাঝোপের আগুন
            নিরাবরণ করেছে বড় এই
            সবুজ পাথরখণ্ডগুলো, মন্দিরের ভিত ও পায়খানার মেঝের মতো চিটচিটে,
            এবং সমুদ্র-নাবিক যার কাছে পৌঁছেছে আমাদের ধোঁয়া, দেখল যে শীর্ষদেশ অবধি পৃথিবীর ঘটে গেছে রূপের বদল (দূরে দেখা যাচ্ছে চাষকাজে পোড়ানো জমিনের বিশাল অঞ্চল আর পাহাড়ের উপরদেশে সপ্রাণ জলরাশি ঠিক পথে নেবার কর্মসূচি)।

            এভাবেই সম্পন্ন হলো নগর পত্তন এবং ভোরবেলা এক পবিত্র নাম ঠোঁটে নিয়ে স্থাপন করা হলো তাকে। পাহাড়গুলি থেকে উঠিয়ে দেয়া হলো শিবির ছিল যত! আর আমরা যারা ওইখানে কাঠের গ্যালারিতে,
            পৃথিবীর সজীবতার মাঝে মাথা খালি, পা-ও খালি,
            উপহাস করার মতো কী আছে আমাদের, বলো উপহাস করার মতো আছে কী আমাদের, যখন আমরা বসে জাহাজ থেকে বালিকা ও খচ্চর খালাস হতে দেখি?
            আর বলো কী আছে বলার, ভোরবেলা থেকে, পালের নিচে বসে থাকা এ জনতাকে নিয়ে?—বন্দরে ময়দা পৌঁছাল। …আর আকাশের শ্বেত-ময়ূরের নিচে ইলিয়নের চাইতে উঁচু জাহাজগুলি যত, মগ্নচড়া পার হবার পরে, থামল
            এই বদ্ধজলে যেইখানে ভেসে চলে মৃত এক গাধা। (আমরা অবশ্যই সিদ্ধান্ত নেবো এই বিষণ্ন অর্থহীন নদীর নিয়তিকে নিয়ে, রং যার আপন প্রাণরসে চূর্ণ ও মজে থাকা ঘাসফড়িংয়ের মতো।)

            অন্য তীরের বিশাল তাজা কোলাহলের মাঝে, কামারেরা তাদের আগুনের প্রভু! নতুন রাস্তাগুলি জুড়ে চাবুকের বাড়ি খালাস করে উন্মেষিত-না-হওয়া দুর্ভাগ্য দিয়ে ভরা ঠেলাগাড়িগুলি। ও খচ্চরেরা, তামার তরবারির নিচে আমাদের ছায়া! মুঠিতে বেঁধে রাখা চারখানা ছটফটে মাথা নীলিমার পটভূমিতে গড়ে জীবন্ত এক থোকা। আশ্রয় শিবিরের প্রতিষ্ঠাতাগণ জড়ো হন এক বৃক্ষের নিচে এবং জমি নির্বাচন করা নিয়ে শোনেন কার কী মতামত। তারা আমাকে দালানগুলির অর্থ ও উদ্দেশ্য বোঝান:
            সজ্জিত সম্মুখ, সম্মুখ বোবা; লাল মাটির গ্যালারি, কালো পাথরের বৈঠকখানা আর লাইব্রেরির জন্য আছে স্পষ্ট প্রতিবিম্ব দেখা যায় মতো জলাধার; কোবরেজের গুদামের জন্য শীতল স্থান। এবং তারপর সুদের কারবারিরা আসে তাদের চাবিতে ফুঁ দিতে দিতে। এরই মধ্যে রাস্তায় গান গেয়েছে এক একা লোক, তাদেরই একজন যারা ভুরুর ওপর এঁকে রাখে নিজ খোদার গুপ্তনাম। (খালি ও আবর্জনাভরা জায়গার এই পাশটাতে পোকাদের কী নিরন্তর কটকট ডাক!) .. আর অন্য তীরের মানুষের সাথে আমাদের মৈত্রীর কথা তোমাদের জানানোর জায়গা এটি নয়; মশকে ভরে পানি খেতে দেওয়া হলো, বন্দরের কাজে নিয়োজিত করা হলো অশ্ববাহিনীকে, আর মাছের মুদ্রায় যুবরাজকে দেওয়া হলো দাম। (বানরের মৃত্যুর মতো দুঃখী এক শিশু—যার ছিল দারুণ রূপসী এক বড় বোন—গোলাপ-রং রেশমের জুতোয় ভরে একটি তিতির পাখি আমাদের দিলো উপহার।)

            …নিঃসঙ্গতা! বিশাল সমুদ্র-পাখির পেড়ে যাওয়া নীল ডিম, আর সকালে উপকূলভাগ জুড়ে কিভাবে সোনালি লেবু পড়ে আছে!—গতকালের কথা! পাখিটি উড়ে গেছে!
            আগামীকাল অনেক উৎসব ও কোলাহল, প্রশস্ত রাস্তাজুড়ে লাগানো হয়ে গেছে খোসাঅলা গাছ, আর ভোরের ঝাড়ুদার বয়ে নিয়ে যাচ্ছে মরা পামগাছের বিরাট সব দেহ, প্রকাণ্ড ডানার টুকরো-টাকরা যত…আগামীকাল অনেক উৎসব,
            বন্দর-অধ্যক্ষদের নির্বাচন, শহরতলীতে চলে তাই গলার প্রস্তুতি, আর ঝড়বজ্রের ভেজাভেজা তা-এর নিচে
            হলুদ শহর, ছায়া দিয়ে ছায়াময় রাখা, বালিকাদের পাওয়ালা অন্তর্বাস ঝোলে তার জানালাগুলোয়।

*
* *

            … তৃতীয় চান্দ্রমাসে, পাহাড়চূড়ায় যারা চোখ রাখছিল তারা গুটিয়ে নিল তাঁবু। বালিতে পোড়ানো হলো এক মহিলার লাশ। এবং এক লোক এগিয়ে এল মরুভূমিতে ঢোকার মুখটায়—তার জনকের পেশা: বোতল ফেরি করা।

মাসরুর আরেফিন

জন্ম ৯ অক্টোবর, ১৯৬৯; বরিশাল। এমএ (ইংরেজি), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; এমবিএ (মার্কেটিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স), অস্ট্রেলিয়া। পেশায় ব্যাংকার।

প্রকাশিত বই :
১. ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্প (কাব্যগ্রন্থ; ২০০১; দ প্রকাশনী)
২. ফ্রানৎস কাফকা গল্পসমগ্র (অনুবাদ; ২০১৩; পাঠক সমাবেশ)
৩. হোমারের ইলিয়াড (অনুবাদ; ২০১৫; পাঠক সমাবেশ)
৪. আগস্ট আবছায়া (উপন্যাস; ২০১৯; প্রথমা প্রকাশন)
৫. আলথুসার (উপন্যাস; ২০২০; প্রথমা প্রকাশন)
৬. পৃথিবী এলোমেলো সকালবেলায় (কাব্যগ্রন্থ; ২০২০; পাঠক সমাবেশ)
৭. স্যাঁ-ঝন প্যার্সের আনাবাজ (অনুবাদ; ২০২০; পাঠক সমাবেশ)

ই-মেইল : arefinmashrur@yahoo.com