হোম অনুবাদ ঢেউগুলো যমজ বোন

ঢেউগুলো যমজ বোন

ঢেউগুলো যমজ বোন
1.15K
0

ডেভিড ওয়াইট


তার কবিতা সম্পর্কে বলা হয় যে, এখানে বোবা মানুষটি, নির্বাক প্রকৃতি কথা বলে; ডেভিড ওয়াইটের লেখা গন্ধ আর স্মৃতি খননকারী। লেখেন যে কথাটি তা সহজ, যদিও বলেন হস্তরেখাবিদের ভাষায়, ফলে তিনি হাতের বর্ণনা করেন, কিন্তু কররেখা পাঠের ভিতর দিয়ে জারি করেন আসলে আমাদের আশা-নিরাশা আর স্বপ্নের কথা; ফলে তার কবিতা একধরনের মনস্তাত্ত্বিক খোয়াবনামা—সমুদ্রের বড়বড় ঢেউয়ের অনর্গলতায় তার কল্পনার স্থাপত্য অনিঃশেষ আর বাঁধভাঙা।

বোঝার সুবিধার জন্য কথাটি এভাবে বলি : ডেভিড ওয়াইট ইংরেজি কবিতার এক কমলকুমার মজুমদার। ওয়াইট ১৯৫৫ সালের ২ নভেম্বর যুক্তরাজ্যের মিরফিল্ডে জন্মেছিলেন; যদিও সারা দুনিয়া চষে বেড়ানো তার স্বভাব—কিন্তু মোটের উপর বসতি গেড়েছেন নর্থওয়েস্ট প্যাসিফিক, যুক্তরাষ্ট্রে।


সময়ের নির্বিকার

পাথর নীরব, মাটি নির্বাক, আধ-খাওয়া চাঁদ নিকষ আকাশে উঁকি দেয়, তারা নিজেদের ছায়ার স্তব্ধতায় রুজু করে। কতবার উদ্ভাবনী মানুষেরা সময়ের কানাগলির ভিতর নির্নিমেষ তাকিয়ে থেকেছে তারা ছিটানো রজনীর কেন্দ্রে, অথবা প্রত্যাশা গড়িয়ে যাচ্ছে প্রত্যুষের দিকে—সে-সময় আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠবে উঠবে করে ফেনারাশির  নিষ্ফলা মুখ দেখে তারা কী সহসা আরো দূরে সরে যায়?

আমাদের জনকেরা আর কথা বলে না, তারা তাদের বাবাদের মতো ফ্যাকাশে পাণ্ডুর দেয়ালের দিকে তাকিয়ে তাদের বাবা, বাবার বাবাদের চোখে আধা স্বপ্ন ও আধেক জাগরণে নিষ্প্রাণ দেয়ালের কাছে বেহাত স্বপ্নের মরীচিকার পানে তাকিয়ে রয়; তারা ও তাদের ভাগ্য সময়ের সঙ্গে লেপ্টে যায়, তারা কেবল বেঁচেবর্তে থাকে—তাদের জীবন উদ্‌যাপিত হয় না, মৃত্যু সময়ের পিঠে কিঞ্চিৎকর রেখাপাত করে মাত্র।

কোনো একপর্যায়ে মাটির সঙ্গে আমাদের জীবিকা অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে, বরং এ-বেলায় চোখ ফেলি সমুদ্রের বিশালতার দিকে, সময়ের কাছে অপরিচ্ছন্ন ন্যুব্জ আমাদের হালখাতা, যা-কিছু নিয়েছিলাম যাপিত দীর্ঘকাল—তাদের সবই সময়ের হাতে ফিরিয়ে দিই, নিজের কাছে নিজেকেই ক্লান্ত শ্রান্ত ভঙ্গুর ঠেকে, চকিতে ভাবনা আসে—হেথা নয় হোথা নয় অন্যখানে অন্য কোনখানে, হয়তোবা প্রাণের বাতি আছে সমুদ্রর অতলান্ত গহিনতার সিন্দুকে, কেননা সাগরই কেবল ফিরে ফিরে আসে—নিজেকে ঢেউয়ের আগায় বেঁধে দেয় তীর অভিমুখে; মনে হয়, কোথাও তার সমাপ্তি নেই—যবনিকার পর্দা পড়ে না—আছে, আছে সমুখে শান্তি ডিঙিয়ে অন্য এক জীবনের হাতছানি আছে!

মাছের মতো আমরাও জীবনের চৌহদ্দির বাইরে যাই—মাছ পিছনে ফেলে যায় তাদের চেনা জলের গন্ধ ও আয়তন, আমরাও আমাদের পরিচিত ঘের ও অভ্যস্ততা ছাড়িয়ে গৃহান্তর গ্রহণ করি, এক অদৃশ্য অভিব্যক্তির মহিমার সাথে অঙ্গীভূত হই, আমাদের মনে হতে থাকে: এখানে কত রকমারি নক্ষত্রের শিহরন—আমাদেরও এমনই হবার কথা ছিল!

আমাদের প্রাণে এক অন্তর্গত বোধ কাজ করে, সারাবছর দিঘলে চাঁদ শস্য কুড়িয়ে এক আবর্তনের মায়ায় বাঁধে, আমরাও বাড়ি ফেরার ত্বরায় নদীর দোরগোড়ায় উপনীত হই, সমুদ্রকে বলি, এবার মুখ ফেরাও বসতির দিকে—নৈঃশব্দ্যকে এবার প্রণতি বলো যেমন সেলমন মাছ অবশেষে লোনা জল পিছনে  ফেলে মুখ বাড়িয়ে হাত পাতে মিঠাপানির বাঁকের পানে।

নদীর বয়ান থেকে আমরা ফিরে আসি আমাদের বাস্তুভিটার কাছে—যে জিন্দেগির কথা আমরা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম, আলাজিলা স্মৃতির মূলধন আমাদের মনে করিয়ে দেয় হিম রাত্রির অধীনে আমাদের হেঁটে যাবার কথা, হালকা বাতাসের মৃদু মন্ত্রের অনুপ্রেরণায় সাগর সামান্যে পাশ ফেরে, এই পল্লবগ্রাহী উচ্ছ্বাস আরো জানতে চায়—জগতে আর কারা নিজের অন্তর্লোক এমন অধিকারে আনতে এমন তৎপর হয়, তারকারাশির সুবিশাল নৈঃশব্দ্যের ধুলা রাত্রির তীরে জমে ওঠে ভোরের উদ্ভাসে, আর আমাদের গহিনে  নীরবতা সতত দিকচিহ্নহীন। যদি সম্ভব হতো, আমরা অনায়াসে ওইসব কিছুর মাহাত্ম্য ভুলে যেতাম যেমন আমাদের পূর্বপুরুষেরা সবকিছু ছেড়ে দিয়েছিলেন পরিপ্রেক্ষিতের কাছে, আর আমরা এখন সময় ও প্রয়োজন দুটোই গুণে দেখি, আর নিজের মতো বড় হই।

সময় স্বয়ম্ভু,  তাকে নিজের স্বতঃস্ফূর্ত চলনের উপর ছেড়ে দেয়া উত্তম। আমরা প্রয়োজন সাপেক্ষে সময়ের পিঠে সওয়ার হই, পূর্ব নির্ধারণী গুটি চালানের অবসান হোক, টাটকা বিস্ময় আর আকস্মিকতায় জীবন কানায় কানায় উদ্বিগ্ন হয়ে উঠুক—এভাবে গৃহীত হোক—আমরা সাগরের ভাই!

English version : Time left alone.


নদীর আখড়া

আমার পায়ের নিচে যে জলের ধারা তা উপর থেকে আসে।

পাহাড়ের মাথায় বিহার করে মেঘমণ্ডল
তারা নিজেকে নিঃশেষে সঁপে দেয় নদীর পৈথানে।
তটিনী সবটুকু অঞ্জলি দরিয়ার পায়ে সমর্পণ করে
উদ্‌যাপন করে ইচ্ছামৃত্যুর সুষমা।

আমি সঞ্চরণ করি মেঘেদের দলে—মিশে হারাই জলের সনে,
সাগরের চারপাশে সাদা সাদা পাহাড়ের গ্রাম—
লোনা জল—সহসা আবার স্বচ্ছ মিঠা পানি
মেঘের ঘনগাছ বৃষ্টি হয়ে ঝরে—খরস্রোতা জল
বৃক্ষের শিকড়ে রিজিক, উছলে নামে পানির তীব্র তোড়
ভরা নদী খরপরশা—গান গায় সাগর সঙ্গমের আকুল বন্দিশ।

পাহাড় শীর্ষে যা-কিছু ছিল অমৃত রেণু গীতি ঘোর
লহো লহো অঞ্জলি লহো মোর।

সাগর তলে আবার জন্ম নেয় কথা ও কোমল, রাঙা লেনদেন
আর স্মৃতির কাজল—যে প্রতিবার জলে ধুয়ে যায়।

English version : Where many rivers meet


অবগুণ্ঠনে মৃত্যুর চাহনি

মৃত্যু ডালের পিছনে ওপাশে
আড়াল মেরে বসা
তার মুখমণ্ডল অর্ধেক অবগুণ্ঠনে ঢাকা।

শিশু তার চোখ মেলে
দেখে বৃক্ষের হরিৎ পত্রালি কাঁপে
মৃদুমন্দ বাতাসে পাতার দুলুনি
মুখে তার স্নেহের পরশখানি আঁকে।

জীবন হামেশায় আমাদের পিছনে ফেলে এগোয়
আমদের সাধ্যের সীমা প্রতিবার রাশ টেনে ধরে
সে তার পূর্ণতা দেখায় চন্দ্রালোকের ধূসরে, ধাঁধায়।

না নিরেট, না অধিবাস্তব
চিত্রটি পিছুটানে জাগর
খানিক স্পর্শে, কিঞ্চিৎ বুঝি গন্ধে মাতাল
মাঠের ‘পর সোনালি  কী সবুজ বার্লির নৃত্যবতী ফল
আর অচিন শব্দের মেহন আমার আয়ু বাড়িয়ে দেয়!

শেষকথা তার শেষ নাহি যে
ট্রাউট মাছ প্রাণান্ত কানকো ছড়িয়ে নদীর জলের পিঠে
মুখ বাড়িয়ে শ্বাস নেয় টেনে।

স্থির, চিন্তিত হ্রদের পাটাতনে বৃষ্টির ফোঁটা ঝরে
নাচের নামতায় ফোঁটারা জলের চৌহদ্দি জুড়ে বাড়ে

আমি যেমন ফিরেফিরে অপার নৈঃশব্দ্যের শিয়রে
পাতাদের দেউরির আড়ালে
ক্ষণিক ফিরে দেখি তার অর্ধেক অবগুণ্ঠিত মুখ!

আর শুনি নীরব ধ্বনির স্মরণ—গির্জার মিনারের মাথায়
ধীরে বহে ঘণ্টাধ্বনি—

কেমন এক ছাইয়াভা সাদার কুহক
কোন রাজার পেয়াদা সিলমোহর সাঁটে আমার আদি দলিলের
পিঠের উপর!

English version : Death waits


গাব্রিয়েল ওকারা


গাব্রিয়েল ওকারা তার প্রথম উপন্যাস দ্য ভয়েস লিখেই খ্যাত হয়ে ওঠেন, তারপর তিনি কবিতা ও শিশুসাহিত্যও রচনা করেন। ওকারা রাজনৈতিকতার বাইরে কেবল কবি হতে চান নি, তার রাজনৈতিক পাটাতনটিও ছিল স্পষ্ট—তিনি কালোদের সামগ্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে জড়িত ছিলেন, ফলে নাইজেরীয় নিগ্রুচুডিস্ট হিসাবেই তার পরিচিতি বেশি। কবিতায় গাব্রিয়েল ওকারার অভীষ্ট ছিল কালোদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক অভিব্যক্তির চিত্র ও চিত্রকল্প নির্মাণ করা। তাকে নাইজেরীয় কবিতার প্রথম আধুনিক কবি হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ১৯২১ সনের ২৪শে এপ্রিল গাব্রিয়েল ওকারা নাইজেরিয়ার নাইগার ডেল্টায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০১৯ সনের ২৫শে মার্চ ইয়েনাগোয়া, নাইজেরিয়ায় মারা যান।


হাসি

আমি পুরান কালের মানুষ—ঠাস করে গান ধরি।
তুমি আমার উপর হেসে কুটি কুটি হও।
তোমার মনে হয়, এইটা গান না—পুরান একটি গাড়ি
ইঞ্জিন স্টার্ট লইতে গিয়া মিসফায়ার মারে, আর মনে হয়
গলায় কেউ চিপা দিয়া ধরে।

আমার হাঁটাও তোমার কাছে হাসির বস্তু।
আমার হাঁটা—জন্মের আগে থেকেই শিখে আসা হাঁটা।
তুমি তো আবার সব বোঝনেওয়ালা—
আমার হাঁটার মধ্যেও সমস্যা দেখতে পাও।
তাই আমার মুখের উপর হাসো।

তোমার সাথে আমার কিছুই মিল পড়ে না—
আমার গান শুনে হাসো, হাঁটা দেখে হাসো। জংলি ড্রামের
আওয়াজের সাথে আমার উদ্দাম নাচ দেখে  তুমি চোখ বন্ধ করে ফেলো; তারপর হাসো। হাসো। হাসো।

আমি আমার ভিতরের আমি-কে আকাশের সমান মেলে ধরি—
কোথায় কী—তুমি চট করে গাড়িতে ঢুকে পড়ো।
আর হাসো। হাসো। হাসো।

কিন্তু তোমার হাসি শুকনা, মরা, ঠান্ডা।
তোমার মনের ঘরে স্পিরিঙের চাবি আঁটা;
তোমার গলা পাথর, চোখ বরফের মত ঠান্ডা, জিহ্বা নিরস।

এইবার আমার হাসির পালা।
আমি গাড়িঘোড়া চিনি না, বরফ কী তা-ও জানি না।

আমার হাসি আসমানে চমকানো বিদ্যুৎ, এই হাসি
বৈঠকের মাঝখানে আগুন, বাতাসের ছটফটানি,
সাগরের ঢেউ। আর নদীনালা, গাছগাছালি, পশুপাখি
সবই আমার হাসির ভিতর দিয়া জাহির হয়।

আমার কাছে আয় বাছা। বলি শোন :
আমার এই হাসির আগুন তোর ময়লা জংধরা ভিতরটা
পরিষ্কার করে দিবে, কণ্ঠ খোলাসা করে কানও সুন্দর করবে, চোখ, জিহ্বা সব ঝকমকে হবে—আমি বলে দিলাম।

জিজ্ঞেস করছো—কেন এমন হলো? তাহলে শোন,
কপটতা তোমার চোখে, কানে, গলায়, জিভে সব জায়গায়
আস্তরণ ফেলেছে।

আমরা পুরুষের পর পুরুষ খালি পায়ে হাঁটি—দুনিয়ার মূলে যে ওম তা-ই আমাদের খোলা প্রাণে উষ্ণতার পরশ বুলিয়ে যায়!

English version : You laughed and laughed and laughed.


পিয়ানো বনাম ড্রাম

নদীর কিনারে কান পেতে শুনি
চিরায়ত ড্রামের গমকে ফোটে মর্মের ফুৎকার,
এ-ধ্বনি চাক্ষুষ—কানকো বেয়ে নামে শোণিত ধামাকা,
আদিম, আদি সুর নড়ে ওঠে জঙ্গলে;
চিতাবাঘ অনড়, এখন থাবা মেলতে অগ্নি স্থির—চোখে বিদ্যুৎ;
শিকারিরও চোখ অপলক—হাতে বল্লম
শিকার আর শিকারির হাড্ডাহাড্ডি বোঝাপড়া
কালের আঙটায়!

আমার শরীরে রক্ত পাক খায়—ঘূর্ণি তোলে শোণিতের হৈহৈ।

লোপ পায় বুঝি চেতনাচেতন—আমি গঠিত হই
জীবনবিন্দুর মূলে—মায়ের কোলে দুধের শিশু লুটোপুটি
মাতৃক্রোড়ে নবজাতকের মুখে কাঁচা দুধের দাগ!

বুকে দ্রিমদ্রিম পা উচাটন, অন্তরাত্মা শুকিয়ে কাঠ
শঙ্কিত বিহ্বল আমি—চারপাশে সবুজ পাতারা কাঁপে
বুনো ফুলের সঙ্গীনে তিরতির।

তার মাঝে শুনি পিয়ানোর বিলাপ—
বোধি ও কালের গূঢ়ৈষা, সংহত রূপকার।
ঘন বনের বাইরে দূর দিগন্তের ডাকে হেলে পড়ে
সুরের বালুকাবেলা।

পিয়ানোর মিহি সুর, দুর্বোধ্য ক্রন্দসী লহরী নহর
আমার আঁখি পল্লবে স্থাপন করে এক অচেনা নগর।

ড্রামের আদিবাসী গমক
আর পিয়ানোর এলানো সুরের ঢেউ মাঝে
আমি হারিয়ে ফেলি আমার স্থিতির নোঙর।

আবার বেজান খুঁজতে থাকি
গাঙ্গের পাড়ে জংলা বনের ধারে আদি সকালের
মিঠামিঠা ঘোরলাগা মায়া!

English version : Piano and Drums.


হাই জি


আধুনিক চীনের শুদ্ধতম কবি, ইচ্ছামৃত্যুর গ্রাহক, মেধাবীতম পদ্যকার—এমন নানা অভিধায় হাই জি-কে চিহ্নিত করা হয়। যাদের আমরা তুমুল কবি বলি হাই জি তেমনই এক তুমুল কবি। তার কবিতা লোককাব্যের সারল্যে গরীয়ান, আবার ব্যক্তির নিঃসঙ্গতা শীতল কাঁটাতারের তীব্রতায় ক্ষরণমুখর। এমনই এক দক্ষতায় হাই জি লোকচৈতন্য ব্যবহার করতে জানেন যে, কেউ কেউ তার কবিতাকে বাতাসে হেলানোদোলানো গমের দানা বলে ডাকেন। শস্যের কাছ থেকে, ফ্রেডরিক নীটশের বোঝাপড়ার মধ্যে, প্লাম ব্লোসোম থেকে নিঃসঙ্গতার লাল রঙ অনুধ্যান করেছিলেন কবি; আধুনিক চীনা কবিতার বসন্তবিলাপ হাই জি জন্মেছিলেন ১৯৬৪ সনের ২৪শে মার্চ আনহুই প্রদেশে, আর মাত্র ২৫ বছর বয়সে ১৯৮৯ সনের ২৬শে মার্চ শেনহেইগোয়েন প্রদেশে চলন্ত ট্রেনের নিচে মাথা গলিয়ে দেন।


চাঁদ

চিমনির ধুঁয়া ওড়ে উপরে ও নিচে
চাঁদ—আদি লোকবুড়ি খোঁড়ে কুয়া
চাঁদ—আদিম সুরত—পাণ্ডুর হাসে
নদীর জলের উপর হিয়া ভাসে!

আকাশের বারামখানা থেকে
কতবার রক্ত চুঁইয়ে পড়ে
আদিম মানুষ উড়েউড়ে পেরোয়
ঘণ্টাওয়ালা গির্জার মিম্বর।

চাঁদ অনাদিকালের সাদা রূপকথা
ফ্যাকাশে হাসে উড়াল পাখায়
চাঁদ নিজেরই হৃদয় নিজে খুঁড়ে
হাওয়ার ঘরে বেদনা ঝরায়!

English version : Moon
ইংরেজি তরজমা : ইয়ে চ্যুন


রাত্রির চাঁদ

এক ধাক্কায় বনের বুক খুলে
চেরাগ বাতির অন্তরে
সূর্য রক্ত ঢালে।

আমি বসে থাকি
সহজ মানুষের উরে
ঠাসাঠাসি গৈগেরামের বাড়ি।

যা আমদানি নয়া বাজারে
এখানে তা-ও পুরাতন
পুরান চাল ভাতে যে বাড়ে
সাবেকি মুখে সবাই ভরসা করে।

আমি পূর্বপুরুষের মান্ধাতা কুয়া
নাতিপুতির খাওন পরন সানগোসলের পানি
স্থির, কিছুটা বা তিরতিরে কাঁপুনি
যেমন সুখে-দুঃখে আমার ভিতরে আমি।।

English version : Night Moon.
ইংরেজি তরজমা :  ইয়ে চ্যুন


জুলাই দূরে নয়

এই তো জুলাই এল বলে
আশেপাশেই রগরগে কাম,
হাত বাড়ালেই মন দেয়া-নেয়া
ঘোড়ার নাকের ডগায় এই যে জল
পানি, লোনা জল!

কিঙাই হ্রদ মোটে দূরে নয়,
তার কিনার ধরে
শত মৌমাছি গুনগুনানির হাট
আমাকে মনউদাসী আকুল করে তোলে
আমারই সামনে সবুজ ঘাসে ফোটে
ফুলের নাকফুল!

কিঙাই হ্রদের ধারে আমার একাকিত্ব
স্বর্গের কাঙাল ঘোড়া,
এই তো আমি একা দুলদুল।

আমি প্রেমের নাভিমূল
ফুটে থাকা বনালা কুসুম
নিশুতি পুঁথির ধূসর অক্ষরে বয়ান,
বেহেস্তি ঘোড়ার পেটের ভাগে
ফলবতী ফুল;

এভাবেই কিঙাই আমার ভালোবাসা
বুকে আগলে রাখে।

ফুলের সবুজ ডাঁশাটি আর দূরবর্তী নয়,
দূরে নয় ওষুধের ডিব্বার ভিতর দাওয়াইয়ের
পুরনো আদ্দিকালের নাম।

চালচুলোহীন লোকটাও সেরে উঠেছে
ফিরে এসেছে বাড়ি,
আমি তোমাকে দেখতে যেতে চাই—এক্ষুনি।

জানি পাহাড় ডিঙানো মাত্র, জল পেরুলেই
মৃত্যুর কল,
এই যে কাছেই নীল জলে বিম্বিত ডালপালার ছায়া
যেমন আমার দেহপিঞ্জরে হাড়ের ঘরখানি বিরাজ করে।

ও আমার কিঙাই হ্রদ, তোমার জল মুখ লুকিয়েছে
ধুলার আস্তরণে।

মে মাসের পাখিরা উড়ে চলে গ্যাছে দূর
ঠোঁটে  নিয়ে গ্যাছে তাহার মাথার টিকলিখানি!

আমার ধুলা মলিন জলের কিঙাই নড়ে না,
সে যে একা বসে রয়—ধূসর, নিঃস্ব, ধনবান
জলের মোরাকাবা!

English version : July is not far.
ইংরেজি তরজমা : ইয়ে চ্যুন


ইয়েহুদা আমিচাই


যুদ্ধের ঘাতকতা তৈরি করে ক্ষত, আর সেই ক্ষত বুকে আগলে নির্ঘুম জেগে থাকবার জন্য জন্ম নেয় কবি—তেমনই এক কবি ইয়েহুদা আমিচাই। আমিচাই ১৯২৪ সালের ৩ মে জার্মানির উর্জবার্গে জন্মগ্রহণ করেন, পরে ১২ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে স্থায়ীভাবে থিতু হতে আসেন তৎকালীন প্যালেস্টাইন।

নানা দেনদরবার, মোকাবেলা, যুক্তি-প্রযুক্তি আর ১৯৪৮ সালের আরব-ইজরায়েল যুদ্ধের সাক্ষাৎ বুদ্ধিবৃত্তিক কাব্যবীজানু ইয়েহুদা আমিচাই; তিনি এক মরমী কবি, কিন্তু তার মরমিয়া রক্তপাতময় ভাঙা স্মৃতির গন্ধে নিত্য উন্মাতাল। ফলে আমিচাই-এর কবিতা রাজনৈতিক প্রকল্প আর জ্যামিতির বাইরে যায় না, যেতে পারে না। ইয়েহুদা আমিচাই ২০০০ সালের ২২শ সেপ্টেম্বর ইজরায়েলে মারা যান। আমাদের সময়ে হিব্রু ভাষার সবচেয়ে চৌকস এবং মেধাবী এই কবি নিজের সময় ও দুরাশাকে এভাবেই ব্যাখ্যা করেন: আপনি যদি একটি কাচের ঘরে একা একা বসে এক কাপ চা খান——সেটিও একটি রাজনৈতিক ঘটনা।


আমিন পাথর

আমার টেবিলের উপর একটি পাথর রাখা আছে
পাথরের উপর লেখা—আমিন।

এ পাথর একটি ইহুদি কবরখানা থেকে আনা;
বহুদিন আগে কবরটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়,
পাথর ফলক ছোট ছোট শত টুকরোয় ছিটকে পড়ে।

ছিন্নভিন্ন প্রস্তরখণ্ডের চিলতা একত্রে মিলাতে
টুকরোগুলো তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়—
মৃত্যুর দিনক্ষণ মিলিয়ে মানুষটির হদিস পাবার চেষ্টা চলে;
সম্ভাব্য সব পথেই তালাশ করা হয়,
নাম, জন্মতারিখ, বাবার নাম, বাচ্চাকাচ্চা লতাসত্তর
ধরেও কোনো ঠিকানা পাওয়া যায় কি না
তার চেষ্টাও বাদ যায় নি;

তাদের আত্মা প্রশান্ত হোক! রুহু এক অন্তরে স্থির হতে চায়।

ছেঁড়াখোঁড়া পাথরের টুকরোগুলো নানা জায়গায় ছিটানো
আত্মাও উজাগর, অতৃপ্ত বাসনা ছটফট করে!

সবাই অশান্ত, কেবল আমার টেবিলের উপর একা পাথর
একহারা প্রশান্ত ঝিমোয়, তার উপর খোদাই করা—আমিন!
তাদের কাঠামোয় বাঁধে—আবার টুকরো বিটুকরোয়
এলোমেলো খুলে ছিটকে পড়ে!

ফের নুড়িগুলো জমায়, ঝাড়পোছ করে
এক অবুঝ সরলাঙ্ক মীমাংসায় মাতে—
নামে সরল কিন্তু কথা মানে না—

আবার উজাগরি শিশুমন পাথরগুলো মোছে!

English version : The Amen Stone.
ইংরেজি তরজমা : চানা ব্লক


বাবার সঙ্গে দেখা

দু’টি যুদ্ধ এবং দু’টি প্রণয়াখ্যানের মাঝখানে
বাবা আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে—
বাবা আর আমার মধ্যে ঠিক বৈঠক নয়,
কোনো নাটক অভিনীত হবার সময় একজন অভিনেতা
যেমন দুই দৃশ্যের মাঝখানে নিজেকে একটু গুছিয়ে আনে
সেরকম বাবাও বুঝি আমার সামনে আলো আঁধারিতে
সামান্য জিরিয়ে নেয়।

কারমেল পাহাড়ের উপর আতারাহ ক্যাফেতে
আমরা বাপ-বেটা সামনাসামনি বসি।
বাবা জিজ্ঞেস করে—আমি জানি তুমি
ছোট একটা খুপরি মতো ঘরে থাকো—সে ঠিক আছে,
কিন্তু এমন স্বল্প বেতনের শিক্ষকতার চাকরি করে তুমি
চলতে পারছ তো বাবা?

বাবা, জানি তুমি ভীষণ চেরিফল পছন্দ করো,
আমি দুনিয়ায় এসে নামার আগেই তুমি
মুঠো ভর্তি চেরিফল এনে রেখেছিলে—কালো কৃষ্ণ ফল
তার উপর লাল রঙের পোঁচ—আমার ভাইয়েরা চেরিফল!

বেলা গড়িয়ে এতক্ষণে সিদ্দুর বই থেকে প্রার্থনা করার
সময় হয়ে আসে।

বাবা জানে, আমি অত ইবাদত বন্দেগি নিয়ে
মাতামাতি করি না;
ফলে বাবা-ই প্রস্তাব করে, বরং চল দাবা খেলি,
তুমি যখন একদম ছোট ছিলে তখনকার মতোই
চাল শিখিয়ে দেবো, চল।

বাবার সঙ্গে আমার বিকেলটা মনে পড়ে—
১৯৪৭ সনের অক্টোবর মাস
যেদিন আমাদের নতুন জমানা শুরু হয়েছিল
ওইদিন তোপধ্বনির দিন।
সেভাবেই আমি মোটেও জানতাম না আমাকে ডাকা হবে
৪৮-এর জেনারেশন।

৪৮ সনেই আমি বাবার প্রতিপক্ষে দাবা খেলি—
এক যুগের সঙ্গে আরেকটি যুগের দণ্ডধারী খেলার গণিত।

English Version : A meeting with my father.

(1152)

Latest posts by বদরুজ্জামান আলমগীর (see all)