হোম অনুবাদ গদ্য আমরা একলা পথের সাথি : ৮

আমরা একলা পথের সাথি : ৮

আমরা একলা পথের সাথি : ৮
41
0

পর্ব-৭


পর্ব- ৮

‘জনকণ্ঠ’ কবিতা প্রকাশের কিছুদিন বাদেই সাহিত্য পত্রিকা ‘শৈলী’তেও আমার একটা কবিতা ছাপা হলো। ‘শৈলী’ আমার কবিতা-গল্প দুই-ই বড় যত্ন করেই ছাপল। এইবার মনে আমার ঢের সাহস! সেই সাহসে ভর করেই আমি গিয়াসের লালকালিতে কাটাকুটি করে দেয়া [সম্পাদনা] গল্প ‘মেঘহীন রাত ছিল, পূর্ণগ্রাস চাঁদ ছিল’ ফ্রেশ করে লিখে পাঠিয়ে দিলাম ‘শৈলীর’ ঠিকানায়। কিন্তু কুয়াত-উল-ইসলাম সেটা কিছুতেই ছাপলেন না। ফের আমার নাকের জল, চোখের জল একাকার হতে লাগল। পুনরায় আমি অভিশপ্ত সিসিফাসের মতো প্রকাণ্ড এক পাথর ঠেলে ঠেলে পাহাড়-চূড়ায় নিয়ে গেলাম। এবং কুয়াত-উল-ইসলাম আমার ঘাম-শ্রমের কিছুমাত্র তোয়াক্কা না করে সে-পাথর ফের গড়িয়ে একেবারে পাহাড়ের তলদেশে পাঠিয়ে দিলেন! গল্পের ড্রাফট ছিঁড়তে ছিঁড়তে আমিও মনে মনে প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে উঠলাম। কিন্তু কুয়াত ভাইয়ের সঙ্গে ফোনালাপে বুঝলাম, আরও দুই-একটা ড্রাফট আমাকে করতে হবে।

এই কুয়াত ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল ‘শৈলী’ অফিসেই। আমি গিয়েছিলাম কবি ও সম্পাদক কায়সুল হকের সঙ্গে দেখা করতে। আমার সঙ্গে ছিল যথারীতি আমার পার্টনার। কায়সুল হক আমাদের দেখে যথেষ্ট আন্তরিক আচরণ করলেন। চা-টা খাইয়ে আমায় বললেন—

আপনি লেখা দিলে কুয়াতের কাছে দিয়ে যান।

আমি ভয়ে ও সঙ্কোচ নিয়ে একটা বাদামি-খাম কুয়াত ভাইয়ের হাতে তুলে দিয়ে চলে এলাম।


আমি এই লেখকের নাম ইহজীবনেও শুনি নাই। কে এই আফলাতুন বা কী এই আফলাতুন কিছুই আমি জানি না।


কুয়াত-উল-ইসলাম যথেষ্ট সুদর্শন, রাশভারী, কৌতূহলী ও পণ্ডিত মানুষ। কথা বলেন আস্তে-ধীরে এবং অনেক ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে—তাঁর কথার সাথে তাল মিলিয়ে কথা বলা আমার মতো বাচালের জন্য বেশ সমস্যাই হয়ে উঠল বটে! কিন্তু আমি বরাবরই অত্যন্ত ভালো শ্রোতা ছিলাম। ফলত আমি শুনতামই বেশি বা শুনতেই চাইতাম বেশি।

কুয়াত ভাই আমাকে বললেন—

আপনি ‘আফলাতুন’ পড়েছেন?

শুনে আমি যেন একেবারে আকাশ থেকে পড়লাম! আমি এই লেখকের নাম ইহজীবনেও শুনি নাই। কে এই আফলাতুন বা কী এই আফলাতুন কিছুই আমি জানি না। সে কি পুরুষ নাকি নারী?

আমি সত্যি তার সম্পর্কে কিচ্ছু জানি না।

এই নাম আমি প্রথম শুনলাম! অথচ আমি বাংলাসাহিত্যে অত্যন্ত ভালো রেজাল্ট নিয়ে মাস্টার্স করে বেরিয়েছি! সেই আমি কিনা এই ‘আফলাতুনের’ নামই শুনি নাই!

বুঝলাম আমার এই ‘নিঃসাড় অন্ধকারে’ ঝাঁপ দিয়ে পড়া মাঠে মারা যেতে বসেছে।

আমার এখন হাত-পা ভাঙা অবস্থায় ঘরে বসে বসে বিলাপ করা ছাড়া আর কোনো গতান্তর নাই!

আজিজ মার্কেটে গিয়ে শুরু হলো আমার ‘আফলাতুনকে’ খোঁজা! তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোনো বইয়ের দোকানেই এই ‘আফলাতুনকে’ আমি পেলাম না! তখন ‘বিদিত’ নাকি ‘তক্ষশীলা’ কারা জানি বলল—

আমরা আনিয়ে রাখব। আপনি অন্যদিন এসে নিয়ে যাবেন।

এ তথ্য কুয়াত ভাইকে ফোনে জানাতেই তিনি তাঁর চিরাচরিত ধীর-শান্ত , নিরুত্তাপ-ঢেউহীন গলায় বললেন—

বইটা পড়ার পর আমাকে জানিয়েন।

আমি বুঝে গেলাম, আমি ‘আফলাতুন’ যতদিন না-পড়ব ততদিন কুয়াত ভাই আমাকে অভিশপ্ত সিসিফাস করেই রাখবেন। শৈলীতে গল্প পাঠালেই তা হাজারবার কারেকশনের জন্য বলবেন। আর গল্পের কঠিন-পাথর ঠেলতে ঠেলতে আমিও ক্রমান্বয়ে হাঁপিয়ে উঠব!

আজ এসব লিখতে গিয়ে ভারি অবাক লাগছে—কুয়াত ভাই শৈলীর তেমন একজন সহযোগী সম্পাদক ছিলেন—যিনি প্রতিটা গল্পের প্রতিটা লাইন অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তেন। এবং যিনি চাইতেন একজন সত্যিকার ভালো লেখক তৈরি হোক।

অবশেষে আমি ‘আফলাতুনকে’ হাতে পেলাম! ঠিক সমগ্র আফলাতুনকে নয়, তাঁর একটি মাত্র গল্পগ্রন্থ আমার হাতে এল—‘অলৌকিক এক পাখি’!

১১টি গল্প নিয়ে এই গ্রন্থের প্রথম প্রকাশকাল—ফাল্গুন, তেরো’শ চুরানব্বই, ফেব্রুয়ারি, উনিশ শ’ আটাশি। প্রকাশক—সুবর্ণ।

বইতে দেখলাম ‘আফলাতুনের’ জন্ম ১৯৩৪ সালের ১লা আগস্ট। পেশায় তিনি সাংবাদিক। বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে। যিনি ‘মানিক চৌধুরী’ এই ছদ্মনামেও লিখে থাকেন।

‘অলৌকিক এক পাখি’ গল্পগ্রন্থের নাম শুরু হওয়া পাতার উল্টা পৃষ্ঠায় লেখা—

‘এই গন্থের সব ক’টি গল্পই কোলকাতার সাপ্তাহিক দেশ, মাসিক মুখপত্র এবং ঢাকার মাসিক সমকাল, সাপ্তাহিক বিচিত্রা ও কয়েকটি দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকীতে ইতঃপূর্বে প্রকাশিত হয়েছিল।

অলৌকিক এক পাখি উনিশ শ’ সত্তুর সালের সর্বনেশে জলোচ্ছ্বাসের পরে লেখা। গল্পটি তখন ঢাকার একটি প্রখ্যাত দৈনিক পত্রিকায় মানুষ মাটি সমুদ্র নামে ছাপা হয়েছিল।

‘আফলাতুন’

আমি অত্যন্ত মুগ্ধপাঠে ‘অলৌকিক এক পাখি’ গ্রন্থটি শেষ করেছিলাম।

আমি হাল ছেড়ে দিতে চাইলেও কুয়াত ভাই সহজে হাল ছাড়ার পাত্র ছিলেন না। আমার প্রায় প্রতিটা গল্প নিয়ে তিনি কথা বলতেন, কিন্তু কোনোরকম উচ্চকিত প্রশংসার ধার তিনি ধারতেন না। কোনো প্রশংসা ভুল করেও উনার মুখে আসত না। আর আমিও কোনোদিন আগ বাড়িয়ে জানতে চাইতাম না, আমার লেখার অগ্রগতি কী বা কতটুকু? কিংবা আমি পারব কিনা?


দিন যায়, মাস গড়ায় আমার ওই গল্প আর ছাপা হয় না। আর লেখা কেউ না ছাপলে কী করে বলা যায় যে, আমার লেখা ছাপছেন না কেন?


কুয়াত ভাই সাহিত্যের নানান বিষয় নিয়েই আমার সাথে আলাপ করতেন। তখন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও শহীদুল জহির পড়ার জন্য আমি উদ্‌গ্রীব হয়ে থাকি। বিশেষ করে শহীদুল জহিরের ক্রেজের মাঝে দিবারাত্র মশগুল থাকি। যেখানে যে পত্রিকায় বা ছোটকাগজে তাঁর লেখা ছাপা হয়, তা আমার তৎক্ষণাৎ পড়া চাই-ই-চাই। শিল্পতরু প্রকাশনী থেকে তখন শহীদুল জহিরের ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’, তারও কিছু পরে ‘সে রাতে পূর্ণিমা ছিল’  উপন্যাস দুটি প্রকাশিত হয়েছে মাত্র। তখনও তাঁর কোনো গল্পগ্রন্থ বাজারে আসে নাই।

এরকম দিনগুলোর মাঝে কুয়াত ভাই আমাকে একদিন বললেন—

আমি চাই আপনি বালজাকের মতো লেখক হোন। সারাদিন কফি খাবেন আর লিখবেন। লিখবেন আর কফি খাবেন। এট লিস্ট দিনে ৫০ কাপ কফি।

দিনে ৫০ কাপ? শুনে আমি সামান্য চমকে যাই। যে আমি সকাল-বিকাল দুইকাপের বেশি কফি খেতেই পারি না সেইখানে ৫০ কাপ? মরেছি!

কুয়াত ভাই যে কী বোঝেন কে জানে?

পরমুহূর্তেই বলেন—

না না, তার মানে এই নয় যে  আপনি অতি অল্প বয়সেই মারা যান আমি তা চাইছি। আমি বলছি যে, আপনি বালজাকের মতন কাজপাগল হয়ে উঠুন। কাজ করতে করতে ক্লান্তি এলে কফি খাওয়া যেতেই পারে, না কি বলেন?

শুনে আমি চুপ করে থাকি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে  অত্যন্ত মনখারাপ চলতে থাকে—

‘মেঘহীন রাত ছিল, পূর্ণগ্রাস চাঁদ ছিল’ গল্পটি উনি ‘শৈলীতে’ ছাপেন নাই।

‘শৈলী’ তখন স্পেশাল কিছু গল্পসংখ্যাও করত। যেমন—

আষাঢ়ে গল্পসংখ্যা, দশ তরুণের গল্পসংখ্যা ইত্যাদি।

আমি খুব খেঁটেখুটে লিখলাম একটা গল্প—শ্যাওলা রেখেছে জমা রৌদ্র ও শিশির।

এই গল্পটা ছিল একজন নারী লাইগেশন করানোর পরও পুনরায় তার সন্তান ধারণ নিয়ে। এবং প্রেগনেন্সি টের পাওয়ার পর নারীটির বিস্ময় ও বিপাকের গল্প।

এই গল্পটারও একটা লাইন কুয়াত ভাইয়ের আপত্তির কারণে অদলবদল করে দিতে হয়েছিল।

আমি প্রচণ্ড মনঃক্ষুণ্ন হলেও বদলে দিয়েছিলাম।

দিন যায়, মাস গড়ায় আমার ওই গল্প আর ছাপা হয় না। আর লেখা কেউ না ছাপলে কী করে বলা যায় যে, আমার লেখা ছাপছেন না কেন? [যদিও এটা আমি গিয়াসের ক্ষেত্রে করেছি, পাঠক ফোরামের পাতা বলে হয়তো অধিকার ফলিয়েই করেছি।]

আর কুয়াত ভাইয়ের মতো অমন গুরুগম্ভীর রাশভারী মানুষকে একথা জিজ্ঞেস করার প্রশ্নই ওঠে না।

আমাকে অবাক করে একদিন শৈলীর ‘বিশেষ গল্পসংখ্যা’ প্রকাশিত হলো! মাত্র ছয়জন গল্পকারের গল্প নিয়ে স্পেশাল ইস্যু করেছে ‘শৈলী’! সেখানে রয়েছে আমার গল্প—শ্যাওলা রেখেছে জমা রৌদ্র ও শিশির!

এবারও আমি চোখের জল আর নাকের জল এক করে ফেলি। তবে তা রাগে-দুঃখে বা নিজের কাঁচা-লেখনীর জন্য নয়—আমি কাঁদি—এতদিনে সিসিফাস পাথর ঠেলার অভিশাপ থেকে মুক্ত হলো বলে! আমার চোখ থেকে টপটপ করে জল ঝরতেই থাকে। ঝাপসা চোখে আমি পত্রিকার অক্ষর কিছুই দেখতে পাই না।

ওই স্পেশাল ইস্যুতে ছয়জন গল্পকারের একজন ছিলেন শহীদুল জহির! এই একটা নাম দেখেই আমি কাঁদতে শুরু করেছি। তখনও বুঝি নি—চোখে মুছে আর যাঁদের নাম দেখব সেজন্যও আমার আরও কিছু কান্না বাকি রয়ে গেছে।

ওই গল্পসংখ্যায় ছিলেন শাহাদুজ্জামান, ওয়াসি আহমেদ আর খুব সম্ভবত মঞ্জু সরকার। আরেকজন কে ছিলেন আজ আর কিছুতেই মনে করতে পারছি নে।

আমার সব পুরাতন পত্রিকা কার্টুন বন্দি করে স্টোরের ঘন-আঁধারে ফেলে রেখেছি বহুকাল। ফলে ‘শৈলীর’ সংখ্যাটি খুলে দেখে ওই ছয়জনের নাম হলপ করে বলা গেল না।

শাহবাগে তখন দুই-একটা পশ-ফ্লাওয়ারশপ উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। আমি একদিন আজিজ মার্কেটে বই কেনা শেষ করে ওইসব শপের একটির দোতালায় উঠে পড়ি।


কুয়াত ভাই বেঁচে আছেন, তিনি যদি এই লেখাটি কখনও পড়েন, জানবেন আপনার শিষ্যা অকৃতজ্ঞ নয় কিছুতেই!


‘শৈলীর’ কুয়াত-উল-ইসলামের নামে একটা ‘ব্ল্যাকরোজের বুকে’ অর্ডার করে আসি। তখন কিন্তু খাদ্যের চাইতে পুষ্পের মূল্য অধিক ছিল। আর ব্ল্যাকরোজ বলতে গাঢ়-খয়েরি-রঙা-লালগোলাপ। কিন্তু ক্যাশমেমোতে কিছুতেই আমার নাম ঠিকানা দেই না। যিনি অর্ডার নেন তিনি পইপই করে বলার পরও দেই না। বলি যে—

আপনি শুধু কুয়াত-উল-ইসলাম নামের একটা স্টিকার লাগিয়ে উনার টেবিলে রেখে আসবেন। আর ফুলগুলো যেন অবশ্যই তাজা হয়।

উনি জিজ্ঞেস করলে বলবেন যে, যিনি পাঠিয়েছেন তিনি তার নাম গোপন রাখতে বলেছেন।

দোকানদার হতবিহ্বল হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন। এমন আজব কাস্টমার তিনি যেন জীবনে প্রথম দেখলেন!

আমি কোনোভাবেই চাইনি পুষ্পগ্রহীতার কাছে পুষ্পদাতার নাম প্রকাশিত হোক। আজ এত বছর বাদে আমি আমার এই লেখাতে সেই গোপন প্রকাশিয়া গেলাম।

কুয়াত ভাই বেঁচে আছেন, তিনি যদি এই লেখাটি কখনও পড়েন, জানবেন আপনার শিষ্যা অকৃতজ্ঞ নয় কিছুতেই! আপনি আমার প্রণতি গ্রহণ করুন।

Work is love made visible.

And if you cannot work with love but only with distaste, it is better that you should leave your work and sit at the gate of the temple and take alms of those who work with joy. [Kahlil Gibran]


পর্ব- ৯ 

(41)