হোম অনুবাদ ক্রিস্তো রেদেন্তর ও ৪টি পামগাছ

ক্রিস্তো রেদেন্তর ও ৪টি পামগাছ

ক্রিস্তো রেদেন্তর ও ৪টি পামগাছ
1.29K
0

প্রাক কথন :

ক্রিস্তো রেদেন্তর ও ৪টি পামগাছ কবি মাজুল হাসানের অনুবাদকৃত ব্রাজিলীয় চার কবির কবিতা-সংকলন। বইটি প্রকাশিত হয়েছে ২০১৮’র অমর একুশে গ্রন্থমেলায়। প্রকাশক : অগ্রদূত অ্যান্ড কোম্পানি। বইয়ের ভূমিকা-অংশটি পরস্পরের পাঠকদের জন্য প্রকাশিত হলো।

সম্পাদক


ভূমিকা
❑❑

ব্রাজিলের পরিচিতি ফুটবলের জন্য, জাদুকর কালো মানিক পেলের জন্য, রিও কার্নিভাল ও উদ্দাম সাম্বা নাচের জন্য। এর বাইরে ভৌগোলিকভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বনভূমি আমাজানের জঙ্গল ও রেড ইন্ডিয়ানদের বর্ণিল জীবনধারাও ব্রাজিল নিয়ে মানুষের আগ্রহকে উস্কে দেয়। ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যের কারণে দক্ষিণ আমেরিকার বিশাল এই দেশের বেশির ভাগ মানুষ কথা বলে পর্তুগিজ ভাষায়। সুদূর ইউরোপের লিসবন থেকে পর্তুগালি জাহাজে চেপে ভাষার সাথে গেছে খ্রিস্টধর্ম। ১৫০০ সালে প্রথম যে পর্তুগিজ জাহাজ নোঙর করেছিল তার ক্যাপ্টেন পেদ্রো আলভারেজ কারবাল এই ভূখণ্ডের নাম দিয়েছিলেন আইল্যান্ড অফ ট্রু ক্রস। কিন্তু অভিযাত্রী দলটি লিসবনে পৌঁছানোর পর এর নামকরণ করা হয় ল্যান্ড অফ হলিক্রস। বুনো আদিবাসীদের দেশ ব্রাজিলে সেই থেকে খ্রিস্টধর্মের সাথে নিবিড় সম্পর্ক। যার বহিঃপ্রকাশ দেখি রিও ডি জেনিরো’তে ক্রিস্তো রেদেন্তো নামের বিশাল আকৃতির যিশুমূর্তির মাঝে। এর বাইরে ব্রাজিলকে বলা হয় ‘পিনডোরমা’ বা পামগাছের দেশ। আমাজনসহ দেশটির বিস্তীর্ণ প্রান্তরে ছড়িয়ে আছে রসালো পামের উদ্যান। এসব ইতিহাসলগ্নতা ও বৈশিষ্ট্যে অধিকারী ব্রাজিলের কবিতা অনুবাদ করতে গিয়ে আমার কাছে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ রূপক হয়ে ধরা দেয় দুটো প্রতীক, প্রথমটি ক্রিস্তো রেদেন্তর, অন্যটি পামগাছ। রেদেন্তর যার অন্য নাম যিশু। আমার কাছে মনে হয়, এই যিশু শুধু ধর্ম নয় বরং খোদ পর্তুগিজ ভাষা; তবে তাতে জুড়েছে ব্রাজিলীয়করণের প্রচেষ্টা, যা বহু সংস্কৃতির মেলবন্ধনে উৎসুক। পর্তুগিজ ভাষা যেটির উৎপত্তি রানি ইসাবেলা ও জগৎ বিখ্যাত নাবিক ভাস্কো দা গামার দেশ পর্তুগালে, উৎসমুখ বিবেচনায় পর্তুগালি জবানির কেন্দ্র পর্তুগাল আর ব্রাজিল তার প্রান্ত। কিন্তু এই সরল সমীকরণ কি এখন খাটে? যখন প্রান্ত-ব্রাজিলে পর্তুগালি-জবানি বদলে নিয়েছে লিসবনি-ছাঁচ, হয়তো এখন পর্তুগিজ ভাষার ভবিষ্যৎ বিরাজ করছে ব্রাজিলে, যেমন স্প্যানিশ সাহিত্যের কেবলা এখন আর স্পেন নয়—লাতিন অ্যামেরিকার জাদুবাস্তবতা। ঠিক তেমনি পর্তুগালের যিশু বদলে যায় ব্রাজিলে। ক্রিস্তো রেদেন্তো ভাস্কর্যের নির্মাণশৈলী ও উপকরণ ব্রাজিলের নিজস্বতার ছাপ তারই চিহ্নায়ক। ফরাসি ভাস্কর পল ল্যান্ডোস্কি ডিজাইজনে এই মূর্তিটি তৈরি করেছিলেন ব্রাজিলের প্রকৌশলী আলবার্তো কাকুয়তো, আর যিশুর মুখটি তৈরি করেছিলেন রোমানিয়ান-পার্সিয়ান ভাস্কর জর্জি লিওনেদা। এই যে বহু দেশের সংস্কৃতি ও প্রজ্ঞা যা ঠাঁই করে নিয়েছে যিশুর ভাস্কর্যে, অনুরূপ ভাবে ব্রাজিলীয় পর্তুগিজ ভাষায় খেলা করেছে বহুত্ববাদ। ইউরোপের সাথে আমাজান জঙ্গলের মিশ্রণে যার বিকাশ। আমাজান জঙ্গলের বুনো আদিমতার আরেক প্রতীক পাম গাছ, যার সাথে মিলেছে ইউরোপের কৃষিবিজ্ঞান। এই পাম ব্রাজিলের কবিদের গুণাগুণ প্রতিনিধিত্ব করে। একারণেই এই সংকলনের নাম দেয়া হলো ক্রিস্তো রেদেন্তর ও ৪টি পামগাছ। সন্দেহ নেই কার্লোস দ্রুমেন ডি আন্দ্রাদে, ম্যানুয়েল ডি বারোস, জ্যুয়ো কাবরাল ডি মেলো নেতো কিংবা ভিনিসিয়াস ডি মোরায়েস সকলেই একেকটি পামগাছ— তারা স্বতন্ত্র হয়েও এক, ইউরোপীয় উৎস জারিত হলেও তাদের ভাষাশরীরে ব্রাজিল-ব্রাজিল গন্ধ, যেন উদ্যান তবুও সঘন আমাজানময়।


পেছনে তাকাই, এগুই সামনে
❑❑

ব্রাজিলের কবিতায় আধুনিকতার সূত্রপাত ১৯২২ সালের দিকে। এবছর ১১ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি সাওপাওলোতে বসে সেমানা ডি আর্তে মোদার্না বা মডার্ন আর্ট উইক ফেস্টিভেল, যাতে যোগ দিয়েছিলেন তখনকার খ্যাতনামা শিল্পী-সাহিত্যিকরা। মিউনিসিপাল থিয়েটারের সেই ঐতিহাসিক আয়োজনে ছিল প্লাস্টিক আর্ট এক্সিবিশন, লেকচার, কনসার্ট, কবিতাপাঠ। মূলত সেই আয়োজনে চেষ্টা হয় আধুনিক ব্রাজিলের শিল্প-সাহিত্যের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণের। তবে এনিয়ে স্পষ্টতই দুটি বলয়ের সৃষ্টি হয়। একটি অংশে নেতৃত্ব দেন কবি ওসওয়ার্ড ডি আন্দ্রাদে। এই পক্ষটির অভিমত ছিল—ইউরোপ-অামেরিকা সবখান থেকে উপকরণ গ্রহণ করো, হজম করো, কিন্তু তৈরি করো নতুন শিল্প। আর অপরপক্ষটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পিলিনো সালগাদো, যিনি পরবর্তীতে ফেসিস্ট নেতায় পরিণত হয়েছিলেন, ব্যর্থ অভ্যুত্থানের দায়ে তাকে গ্রেফতার করেছিলেন ব্রাজিলের স্বৈরশাসক গুতুলিও ভার্গাস। সালগাদো গ্রুপটি ছিল কট্টর জাতীয়তাবাদী। তাই তাদের মোটিফ ছিল ‘পিওর ব্রাজিলিয়ান’। এরা বাইরের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে ঐতিহ্যমুখিতার চর্চার পক্ষপাতী ছিল। কালক্রমে ওসওয়ার্ড ডি আন্দ্রাদে গ্রুপের মতবাদই গৃহীত হয় ব্রাজিলে। সেই থেকে ব্রাজিলের কবিতার দুটি প্রবণতা লক্ষ করা যায়। একটি ভাষায় পরীক্ষা-নীরিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, অথবা এই দুটির মিশ্রণ—যেমনটা চেষ্টা করেছিলে ওসওয়ার্ড ডি আন্দ্রাদে। তাদের ভাবধারায় প্রভাবিত ছিলেন ব্রাজিলের শ্রেষ্ঠ আধুনিক কবি কার্লোস দ্রুমেন ডি আন্দ্রাদে। আধুনিক এই ঘরানার বাইরে ব্রাজিলের কবিতাকে নিয়ে যান জ্যুয়ো কাবরাল ডি মেলো নেতো, যার লক্ষ্য ছিল চূড়ান্ত ফিজিক্যাল কবিতা লেখা। মেলো নেতো মডার্নিজমকে খারিজ করার পাশাপাশি কঠোর সমালোচক ছিলেন ভিনিসিয়াস ডি মোরায়েসের প্রথম দিককার ইতালি ও মার্কিন প্যাটার্নে সনেট চর্চার। বলতে গেলে মেলো নেতো থেকে উত্তরাধুনিক যুগে পদার্পণ করে ব্রাজিলের কবিতা। এসব তাত্ত্বিক বিভাজনের ভেতরেই নিজের মতো সাহিত্য চর্চা করে গেছে আরেক মহান কবি ম্যানুয়েল ডি বারোস। মূলত তিনি আইডিয়া নির্ভর কবিতা লিখেছেন, খেলা করেছেন ইমেজ নিয়ে, নব নব উপমা নির্মাণে।


দ্রুমেনের বোধবিশ্ব ও বিশ্ববোধ
❑❑

কার্লোস দ্রুমেন ডি আন্রান্দে ব্রাজিলের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। জীবদ্দশাতেই তিনি পরিণত হয়েছিলেন ব্রাজিলের সাংস্কৃতিক আইকনে। জন্ম ১৯০২ সালের ৩১ অক্টোবর ব্রাজিলের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় মাইনাস গেরাইস-এর ইটাবিরা গ্রামে, যেটি খনির জন্য প্রসিদ্ধ। পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত বাবা-মা’র সন্তান কার্লোস দ্রুমেনের পড়াশোনা ফার্মেসিতে। কিন্তু কখনোই সেই পেশা ভালো লাগে নি তার। ফলে সরকারি চাকরি করেই কাটিয়েছেন বাকি জীবন। ছিলেন ন্যাশনাল হিস্টোরিকাল অ্যান্ড আর্টিস্টিক হেরিটেজ সার্ভিস অফ ব্রাজিলের চেয়ারম্যান।

১৯৩০ সালে প্রকাশ পায় প্রথম কবিতার বই আলগুমা পোয়েসিয়া। সবশেষ কবিতার বই হিস্তোরিয়া দি দোয়েস আমোরেস প্রকাশ পায় ১৯৮৫ সালে। ১৯৮৭’র ১৭ আগস্ট মারা যান তিনি। এর পরেও ১৯৮৮তে ও পিনতিনহো এবং ২০০৯ সালে বের হয় ক্যারোল ই জিনা। কবিতার পাশাপাশি লিখেছিলেন দেড় ডজনেরও বেশি গদ্যের বই, যেগুলো শিল্প-সাহিত্য-রাজনীতি বিবিধ বিষয়ে লেখা।

মারিও ডি আন্দ্রাদে ও ওসওয়াল্ড ডি আন্দ্রাদে’র কাব্যধারা বাহিত দ্রুমেন ছিলেন মনেপ্রাণে আধুনিক। তাই আধুনিক কাব্যকৌশল যেমন : ফ্রি-ভার্সের প্রতি পক্ষপাত, বিষয়বস্তু হিসেবে কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ না থাকা ইত্যাদি বিষয়গুলো তার লেখায় প্রতীয়মান হয়। ধীরে ধীরে অন্যের প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে নিজের কাব্যভাষা ও ধারা প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। আলফ্রেদো বোসি বলছেন, লজিস্টিক ফ্রিডম ও ফ্রি-ভার্সের মধ্যে থেকেও তার কবিতা পাঠককে অন্য এক ভুবনে নিয়ে যায়। রোমানো ডি সেইন্ট আন্না তার কাব্যচর্চাকে মোটা দাগে ৩টি পর্ব চিহ্নিত করেছেন।

১. greater than the world—marked by ironic poetry
২. lower than the world—marked by social poetry
৩. equal to the world—covers the metaphysical poetry

১৯৮০’র শেষ দিকে কার্লোস দ্রুমেনের কবিতা খানিক ইরোটিক হয়ে ওঠে। মার্কিন কবিমহলেও সমান পরিচিত ছিলেন তিনি। মার্ক স্ট্রান্ড ও লয়েড স্কোয়ার্দজ তার কবিতা ইংরেজিতে ভাষান্তর করেছেন। এলিজাবেথ বিশপের সাথে পত্রালাপও ছিল তার, যিনি তার প্রথম ইংরেজি অনুবাদকও।


বারোসের ক্রাফ্ট ও গুপ্ত সংরাগ
❑❑

ব্রাজিলের কবি ম্যানুয়েল ডি বারোস। পুরো নাম ম্যানুয়েল ওয়েসেসলাও লেইতে ডি বারোস। বিশ্বসাহিত্যে সেই অর্থে বহুল পরিচিত ও পঠিত না হলেও ব্রাজিলিয়ানদের কাছে তিনি এক অলঙ্ঘনীয় কবিচরিত্র। জন্ম ১৯১৬’র ১৯ ডিসেম্বর কিউবায়। মৃত্যু ১৩ নভেম্বর ২০১৪, ব্রাজিলের কাম্পো গ্রান্ডে। প্রায় ৯৭ বছরের দীর্ঘ জীবনে তিনি লিখেছেন অজস্র কবিতা। লাভ করেছেন বহু পুরস্কার। ব্রাজিলের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার প্রেমিও জাবুতি বা টরটোয়েস অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন দুই বার। সামগ্রিক কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৮ সালে পেয়েছেন ‘National prize of Literature of the Ministry of the Culture from Brazil’ পুরস্কার। ব্রাজিলের আরেক কিংবদন্তিতুল্য কবি কার্লোস দ্রুমন্ড ডি অ্যান্ড্রেড বারোস’কে বলেছিলেন কবিশ্রেষ্ঠ। পর্তুগিজ ভাষার এত বড় একজন কবি, কিন্তু দুঃখজনক হলো তার সৃষ্টি দেশের গণ্ডি পেরুতে পারে নি। বারোসের কবিতার প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র ইংরেজি সংস্করণ Birds for a Demolition। কার্নেগি মিরান ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে বের হয় ২০১০ সালে। অনুবাদ করেন ইদ্রা নোভি, যিনি নিজেও একজন উদীয়মান মার্কিন কবি, ঔপন্যাসিক ও ফিকশন লেখক। মূলত তার অনুবাদের পর বারোসকে চেনে বিশ্ব। Birds for a Demolition-এর রিভিউ-এ এক লেখক আক্ষেপ করে বলেছিলেন—এটা দুঃখজনক যে এমন একজন শক্তিশালী কবির কবিতা এতদিন ইংরেজিতে অনুবাদই হয় নি। পর্তুগিজের বাইরে বারোসের কবিতা প্রথম অনুবাদ হয় জার্মান ভাষায়, ১৯৯৬ সালে। এরপর ২০০৩-এ ফরাসি ও ২০০৫-এ স্প্যানিশ ভাষায় বের হয় বারোসের কবিতা সংকলন। বাংলায় মেনুয়্যাল ডি বারোসের কবিতার অনুবাদ এই প্রথম। ইড্রা নোভি’র ইংরেজি সংস্করণ থেকে বারোসের কবিতাগুলো ভাষান্তর করা হয়েছে।


মেলো নেতো : করডেলের নবপ্রাণ
❑❑

জুয়্যো কাবরাল ডি মেলো নেতো ব্রাজিলের উত্তরাধুনিক কবিতার অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সম্ভাব্য নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের জন্য বারবার উচ্চারিত হয়েছে তার নাম। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন পুরস্কার পেলেও শেষ পর্যন্ত নোবেল থেকে গেছে অধরা। জন্ম ১৯২০ সালের ৯ জানুয়ারি ব্রাজিলের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় পুর্নামবুকো’র রেসিফি শহরে। কৈশোর যৌবনের বড় অংশই কেটেছে সেখানে। ছিল পৈতৃক আখ খামার আর চিনির কল। ১৯৪০ সালে স্বপরিবারে চলে আসেন রিও ডি জেনিরোতে। দু’বছর পর বের হয় প্রথম কবিতার বই পেদ্রা ডি সনো [ঘুমন্ত পাথর], সর্বসাকুল্যে বিকেছিল ৩শ’ ৪০ কপি। ১৯৪৫ সালে কূটনৈতিক হিসেবে কর্মজীবনের সূত্রপাত; নানা দেশ ভ্রমণ ও পেশাগত দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা। বেশ লম্বা সময় কাটিয়েছেন স্পেনে। ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত হয় তার সবচেয়ে বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ মোর্তে ই ভিদা সেভেরিনা [একজন সেভেরিনার জীবন-মৃত্যু]। সব মিলিয়ে ১৮টি কবিতার বই আর ২টি নাটক। যার একটি মোর্তে ই ভিদা সেভেরিনা’র নাট্যরূপ। অন্যটি অটো দো ফ্রাদে।

স্যুরিয়েল ধাঁচের লেখা হলেও মেলো নেয়েতো’র কবিতার বিশেষ বৈশিষ্ট্য আধ্যাত্মিক ন্যায়নিষ্ঠতা, যা তাকে আলাদা করেছে ব্রাজিলের অন্য কবিদের থেকে। ব্রাজিলের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় এলাকার আদিম কবিতা ফর্ম করডেলের সংমিশ্রণে গড়ে ওঠে তার কাব্যভাষা। যেখানে ঘুরেফিরে উঠে এসেছে পুর্নামবুকো’র পরিবেশ-প্রতিবেশ, রূঢ় জীবনধারা।

১৯৬৮ সালে ব্রাজিলিয়ান একাডেমি অফ লেটার্স-এর চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন মেলো নেয়েতো। ১৯৯৯ সালের ৯ অক্টোবর রিও ডি জেনিরোতে মৃত্য হয় ব্রাজিলের আধুনিক কবিতার অন্যতম এই পুরোধা ব্যক্তির। তার লেখা ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশসহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।


ভিনিসিয়াস, হুইস্কি, ভবঘুরে ও সুর-লহরি
❑❑

পুরো নাম মারকিউস ভিনিসিয়াস দ্য ক্রুজ ই মেলো মোরায়েস। সংক্ষেপে ভিনিয়াস ডি মোরায়েস। যদিও ব্রাজিলিয়ান এই কবিকে সবাই চেনে ‘ও পোয়েটিনহা’ বা ‘দ্য লিটল পোয়েট’ হিসেবে। জীবদ্দশায় তিনি পরিণত হয়েছিলের ব্রাজিলের আধুনিক কবিতা ও গানের কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বে। একাধারে ছিলেন কবি, প্রাবন্ধিক, গীতিকার, নাট্যকার, শিল্পবোদ্ধা ও সমালোচক। কবিতায় গীতিময়তা, গানে কবিতাবোধ আর নাটকে এই দুয়ের সংমিশ্রণ—এই হলো ভিনিসিয়াসের মূল বৈশিষ্ট্য।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মানুষটির জন্ম ১৯১৩ সালের ১৯ অক্টোবর রিও ডি জেনিরিও’র শহরতলি গাভেয়ায়। সরকারি কর্মকর্তা বাবা আর শখের পিয়ানোবাদক গৃহিণী মায়ের সন্তান ভিনিয়াসকের শৈশব-কৈশোর কেটেছে বিভিন্ন জায়গায়। বাবার চাকরি বদলের কারণে এই ঘোরাঘুরির জীবন অক্ষুণ্ন ছিল পরবর্তীতেও। ভিনিসিয়াস নিজেও ছিলেন একজন কূটনীতিক।

রিও ডি জেনিরো বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনশাস্ত্রে পাঠ চুকে গেলে ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত হয় দুই দুটি কবিতার বই—ক্যামিনহো পাথ ডিসটেন্সিয়া’ এবং ফোর্মা এক্সেজেস। ১৯৩৬ সালে চাকরি পান ব্রাজিলের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ফিল্ম সেনশরশিপ বিভাগে। দু’বছর পর ব্রিটিশ কাউন্সিলের ফেলোশিপ নিয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য পড়তে চলে যান। সেখানেই পুরনো খোলস ভেঙে ‘ফ্রিভার্স’ ও ‘ব্ল্যাঙ্ক ভার্স’ ফর্মে কবিতা লেখা শুরু করেন। নোভেস পোয়েমাস’ বা ‘নিউ পোয়েট্রি’ অভিধায় লেখা কবিতাগুলো সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করে। মূলত এর মাধ্যমেই জেনারেশন অফ ফোর্টিফাইভ’ ভমেন্টের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিতে পরিণত হন তিনি।

১৯৪৩ সালে ব্রাজিলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চাকরি পান ভিনিসিয়াস। ভাইস কাউন্সিলর হিসেবে যোগ দেন যুক্তরাষ্ট্রের লস এঞ্জেলস-এর ব্রাজিলিয়ান দূতাবাসে। সেখানে প্রকাশিত হয় চিনচো এলিজিস [ফাইভ এলিজিস] এবং পোয়েমাস, সনেটোস, বেলাডেস [পোয়েমস, সনেটস অ্যান্ড বেলাডস) শিরোনামের দু’টি বই। দীর্ঘ কূটনীতিক জীবনে কাজ করেছেন শিল্প সাহিত্যের রাজধানী প্যারিস ও ইতালির রোমসহ বিভিন্ন দেশে। রোমে থাকাকালীন ইতিহাসবিদ সার্জিও হোলান্দার বাড়িতে নিয়মিত গানের বৈঠকিতে যোগ দিতেন। তবে গানের সাথে তার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক স্থাপিত ১৯৫৮ সালে। ভিনিসিয়াসের কথায় গানের অ্যালবাম বের হয় ‘এলিজেত কারদোস’ নামের এক গায়িকার। এরপর বিভিন্ন সময়ে বহু জনপ্রিয় গান রচিত হয় তার হাত দিয়ে, বের হয় জনপ্রিয় সব অ্যালবাম।

নাট্যকার ভিনিসিয়াসও কম বিখ্যাত নন। অরফিউস ও ইউরিডিস গল্প অবলম্বে লেখা তার ‘অরফিউস ডা কোনসিকাও’ নাটকটি প্রদর্শিত হয় রিও কার্নিভালে। পরে এটি নিয়ে ‘ব্ল্যাক অরফিউস’ নামে সিনেমা বানান ফরাসি পরিচালক মার্সেল কামু। ১৯৫৯ সালে, বিদেশি ভাষা ক্যাটাগরিতে সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে একাডেমি অ্যাওয়ার্ড লাভ করে। এখানেই শেষ নয় চলচ্চিত্রটি কান ফেস্টিভেলে পাম ডি’ওর ও ১৯৬০ সালে ভূষিত হয় ব্রিটিশ একাডেমি অ্যাওয়ার্ডে। ব্রাজিল-ফ্রান্স-ইতালি যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত এই চলচ্চিত্রে একটি গানও ছিল ভিনিসিয়াসের লেখা। গানটির সহগীতিকার আন্তোনিও কার্লোস জোবিম। ‘এ ফেলিসিদাদে’ শিরোনামের এই গানটি ইন্টারন্যাশনাল হিটে পরিণত হয়। তবে ভিনিসিয়াস-জোবিম জুটির সেরা গান ‘এ গারোতা ডি ইপানেমা’ [দ্য গার্ল ফ্রম ইপানেমা]। এই গানটির জন্য ঐতিহাসিক ও পর্যটক আকর্ষণে পরিণত হয়েছে রিও ডি জেনিরিও’র উপকণ্ঠের ইপানেমা সৈকতটি। প্রতিবছর দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটক ভিড় করে সেখানে।

একজন ‘বোহেমিয়ান আমলা’ হিসেবে পরিচিত ভিনিসিয়াস ছিলেন অ্যালকোহলিক। অতিরিক্ত মদ্যপান ও নানাবিধ রোগশোকে আক্রান্ত হয়ে ১৯৮০ সালের ৯ জুলাই, ৬৬ বছর বয়সে, রিও ডি জেনিরিও’তে নিজ বাড়িতে মারা যান তিনি। রেখে যান তার অষ্টম ও সবশেষ স্ত্রী গিলডা মাত্তোসো, সদাবিশ্বস্ত গায়কবন্ধু আন্তোনিও পেসি টোকুইনহো, কবিতা-নাটকসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় শ’ খানেক বই, অসংখ্য গান আর তার সেই বিখ্যাত উক্তিকে :

Whisky is man’s best friend, it’s the dog in a bottle.

মহান এই কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে, ২০১৪ সালে ব্রাজিলের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের অফিসিয়াল মাস্কটের নাম রাখা হয় ভিনিসিয়াস।


আরো কিছু কথা কিংবা উপসংহার
❑❑

কবিতার অনুবাদ যে কঠিন, আর সবক্ষেত্রেই যে অনুবাদ এক কালপ্রিট তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অনুবাদক সেই ঘটকের মতো যাকে পান থেকে চুন খসলে বর ও কনে দুই পক্ষের রোষানলে পড়তে হয়। বলা হয়ে থাকে কবিতার অনুবাদ অসম্ভব, কবিতা সেটাই যা অনুবাদে মারা যায়। তারপরেও এই অপ্রিয় কাজের হেতু কেবলি আবিষ্কার ও নতুন আস্বাদের নিমিত্তে। ব্রাজিলের এক কবির কবিতা পড়ে ভালো লাগা, তার রেফারেন্স ধরে আরেকজনের সাক্ষাৎ, তার ভিন্ন স্বরের সন্ধান পেয়ে সেটাও খানিক অনুবাদ ওবং সেই মুগ্ধতাটুকু পাঠকের সাথে ভাগ করে নেয়ার লোভই এই অনুবাদ কর্মের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। এক্ষেত্রে একটা সমস্যা রয়ে গেছে তা হলো ভাষাগত সীমাবদ্ধতা। পর্তুগিজ জানি না, ইংরেজি থেকে বাঙলায়ন হয়েছে কবিতাগুলো, তাই মূল থেকে অনুবাদের একটা দূরত্ব যে রয়ে গেছে তা স্বীকার করে নিচ্ছি। আমি শুধু এই চার কবির কাব্যচিন্তার অনন্যতা, কবিতার টেকনিকের  ছাঁচ ও লুকানো গুপ্তধন অবমুক্তের চেষ্টা করেছি। অন্য কেউ সরাসরি পর্তুগিজ ভাষা থেকে  বাংলায় ভাষান্তর করবেন এইসব অনন্য কবির কবিতা, আলোকপাত করবেন নতুন নতুন দিগন্তে—সেই কামনা করি। সেই সাথে প্রকাশক ও বন্ধু-সহযোগী যারা বিভিন্নভাবে আমাকে ঋণী করেছেন তাদের প্রতি অনন্ত ভালোবাসা। কবি কোনো দেশের নয়, কবিতা অবশ্য সঞ্চারী।

মাজুল হাসান
মাজুল হাসান

মাজুল হাসান

কবি ও গল্পকার
জন্ম : ২৯ জুলাই ১৯৮০, দিনাজপুর।
পড়াশুনা করেছেন দিনাজপুর জিলা স্কুল, নটরডেম কলেজ
ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ:
বাতাসের বাইনোকুলার ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১০।
মালিনী মধুমক্ষিকাগণ ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১৪।
ইরাশা ভাষার জলমুক ● চৈতন্য, ২০১৬।

প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ:
টিয়ামন্ত্র ● ভাষাচিত্র প্রকাশনী, ২০০৯।
নাগর ও নাগলিঙ্গম ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১২।

অনুবাদগ্রন্থ:
টানাগদ্যের গডফাদার, রাসেল এডসনের কবিতা ● চৈতন্য, ২০১৬।

মাজুল হাসান পেশায় সাংবাদিক। বর্তমানে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে বার্তা বিভাগে কর্মরত।
মাজুল হাসান
মাজুল হাসান