হোম অনুবাদ ওক্তাভিও পাজের কবিতা

ওক্তাভিও পাজের কবিতা

ওক্তাভিও পাজের কবিতা
401
0

কবি ওক্তাভিও পাজ মনে করেন কবিতার কোনো তত্ত্ব নেই। কবিতা সম্পূর্ণ কবির মনোজগতের বিষয়। শব্দের প্রবহমানতা কবিতায় নেই। কবিতায় শব্দেরা স্থির অমোঘ একেকটি চিত্রকল্প।

ওক্তাভিও পাজের লাতিন আমেরিকায় জন্মানোর জন্য আক্ষেপ ছিল। তার ধারণায় যা কিছু উৎকৃষ্ট অর্জন তার সবক্ষেত্রেই লাতিন আমেরিকানরা দেরিতে পৌঁছেছে।

পাজ মার্কসবাদে বিশ্বাসী হলেও সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে এসেছিলেন। বামপন্থি বুদ্ধিজীবী এবং রাজনীতিবিদদের আত্মম্ভরিতা, আদর্শভ্রষ্টতায় তিনি যারপরনাই বিরক্ত হয়েছিলেন। যদিও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানবতার পক্ষে ছিল তার অবস্থান।

মেক্সিকান কবি, লেখক, কূটনীতিবিদ ওক্তাভিও পাজের জন্ম ১৯১৪ সালের ৩১ মার্চ। পাজের জন্মের সময় মেক্সিকোতে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলছিল। তাকে যুদ্ধের বাস্তবতা থেকে রক্ষা করে বড় করে তুলেছিলেন তার মা জোসেফিনা লোজানা, ঠাকুরদাদা ও পিসেমশাই। তার মা ছিলেন স্পেনীয় ইমিগ্রান্ট, যিনি জীবনে ধর্মকে সব কিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছিলেন। আর তারই একজন অবিবাহিত বোন পাজকে সর্বক্ষণ সঙ্গ দিয়ে, স্নেহ দিয়ে বড় করেছিলেন। তার ছিল সাহিত্যের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। একেবারে শিশু বয়সে পাজ বোনের মাধ্যমে ভিক্টর হুগো ও রুশোর লেখা পড়ে ফেলেন।

পাজের বাবা ছিলেন একজন আইনজীবী ও সাংবাদিক। ঠাকুরদাদা ছিলেন একজন সৎ বিপ্লবী, যিনি ফরাসিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।

পাজ শৈশবে তার ঠাকুরদাদার লেখার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে স্পেনের গৃহযুদ্ধ যুবক পাজকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে। তিনি ঝুঁকে পড়েন বামপন্থি ভাবধারার দিকে।

১৯৩৭ সালে পাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। কবিতায় ভেতরেই জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন তিনি। ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত হয় তার বিখ্যাত কবিতা ‘পিয়েরদা দ্য সান’ (বাংলা অনুবাদ ‘সূর্যপাথর’)। একই বছর কবিতা সংকলন প্রকাশিত হয়।

১৯৮১ সালে ওক্তাভিও পাজ মিগুয়েল ডি সার্ভেন্তেস পুরস্কার, ১৯৮২ সালে নিওয়েসড্যাট ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ ফর লিটারেচার ও ১৯৯০ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

১৯৬২ সালে মেক্সিকোর রাষ্ট্রদূত হয়ে তিনি ভারতে আসেন। হিন্দু শাস্ত্র, বৌদ্ধ দর্শন, ভারতীয় শিল্পকলার প্রতি এইসময়ে তিনি প্রবল আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ভারতবাসের ছয় বছরের অভিজ্ঞতা থেকে যে কবিতাগুলি তিনি লিখেছিলেন সেগুলি স্থান পায় তার ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ Ladere este-তে।

১৯৬৮ সালে মেক্সিকোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ওপর সরকারি বাহিনীর গুলি চালানোর প্রতিবাদে ভারতে রাষ্ট্রদূতের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর হার্ভার্ডসহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন এবং শিল্পকলা ও ইতিহাস বিষয়ে কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন। ১৯৯৮ সালের ১৯ এপ্রিল ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তিনি প্রয়াত হন।

ওক্তাভিও পাজ লাতিন আমেরিকার শুধু নয়, সমগ্র বিশ্ব সাহিত্যের একজন মহৎ কবি।


স্পর্শ 

আমার হাত
তোমার অস্তিত্বের ওড়না সরিয়ে দিয়েছে
যা তুমি নতুন করে নগ্নতায় ঢেকেছিলে।
তোমার অন্তরতম তোমাকে অনাবৃত করেছে
আমার হাত
আবিষ্কার করেছে তোমার দেহের জন্য অপর একটি শরীর।


হাওয়া জল পাথর

খুঁড়ে তুলছে স্রোত পাথর
হাওয়া ছিটিয়ে দিচ্ছে জল
পাথর রুখছে হাওয়ার পথ
পাথর বাতাস এবং জল

বাতাস মেজে দেয় পাথর
পাথর যেন জলের কাপ
জলও গলছে, হাওয়াও তাই
বাতাস জল আর পাথর

ঘূর্ণি গাইছে হাওয়ার মুখ
ছলাৎ স্বরে বইছে জল
পাথর কেবল রয়েছে স্থির
হাওয়া পাথর এবং জল

একাই তারা নেই তো দল
মুখোমুখি যায় মিলিয়ে নাম
তাদের ফাঁকা উপাধি সব :
বাতাস পাথর আর সে জল


কোডা

এই পৃথিবীতে চলার জন্য
হয়তো ভালোবাসা শিখে নিতে হয়
শিখতে হয় নীরবতা
ওক গাছ বা সেই লোককথার বাতাবি গাছের মতো
দেখা আর শেখা
তোমার এই দেখে নেওয়া ছড়িয়ে দেয় বীজ
বড় করে তোলে গাছ
আমি কথা বলি
কারণ তুমি সে গাছের পাতা নাড়িয়ে দাও।

মৃন্ময় চক্রবর্তী

জন্ম ১৯৭৬। কবি, গদ্যকার, অনুবাদক এবং চিত্রশিল্পী।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ :

বেঁচে থাকার স্বপ্নগুলি [২০০৪]
এই মৃগয়া এই মানচিত্র [ ২০০৮]
পাঁচালি কাব্য : ভুখা মানুষের পাঁচালি [২০০৯]

সম্পাদিত গ্রন্থপুস্তিকা :

রাত্রির কঠোর বৃন্ত থেকে, মানিক শতবর্ষপূর্তি (শমীবৃক্ষ)
নির্মোহ রবীন্দ্রনাথ (শমীবৃক্ষ)

সম্পাদিত পত্রিকা : মাটির প্রদীপ

ই-মেইল : mrinmoyc201@gmail.com