হোম অনুবাদ ঐতিহ্য ও ব্যক্তি-প্রতিভা

ঐতিহ্য ও ব্যক্তি-প্রতিভা

ঐতিহ্য ও ব্যক্তি-প্রতিভা
0

ভূমিকার বদলে

খলিল মজিদ

গত ২৯ জুন ২০২০ বিকেল সাড়ে পাঁচটায় কবি ও অনুবাদক দাউদ আল হাফিজের হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুবরণ অত্যন্ত আকস্মিক মনে হলেও দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক নানা সমস্যায় ভুগতে থাকা এবং যথাযথ চিকিৎসার সুযোগ না পাওয়ায় তাঁর অকালমৃত্যু একদম অস্বাভাবিক নয়। রাষ্ট্র, সমাজ, সংসার কোথাও তাল মেলাতে না-পারা একজন মানুষের করুণ পরিণতি হবে এটাই তো স্বাভাবিক। তাই আমি তাঁর একজন ঘনিষ্ঠজন হিসেবে, তাঁর জীবনসংগ্রামের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তাঁর অকাল প্রয়াণকে আকস্মিক বা অস্বাভাবিক ভাবি না। অত্যন্ত মেধাবী ও প্রতিভাবান হলেও দাউদ আল হাফিজ বাংলাদেশের বিবিধ তৎপরতামুখর এই সমাজে প্রায় অচলই ছিলেন। কোনো ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে চাইতেন না তিনি। আত্মাভিমানের এক শক্ত পিঞ্জরেই ছিল তাঁর বসবাস। ফলে, জীবনে স্থায়ী কোনো পেশা বা পদবি ধারণ করতে পারেন নি। জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কাজে যুক্ত হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু ধরে রাখতে পারেন নি কোনোটিই। তবে আমৃত্যু যে কাজটি তাকে ছেড়ে যায় নি, তা হলো অনুবাদ; বাংলা থেকে ইংরেজিই বেশি, ইংরেজি থেকে বাংলাও কম নয়। গত শতকের আশির দশকের গোড়ায় অত্যন্ত মেধাবী একজন ছাত্র হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পাওয়া দাউদ আল হাফিজ সময়ের পরিক্রমায় বাংলা কবিতায় নিজস্বতায় ভাস্বর একজন কবি হয়ে ওঠেন। কবিতা ও নন্দনভাবনার ছোটকাগজ ‘একবিংশ’-ই তাঁর লেখা প্রকাশের মূল ক্ষেত্র ছিল। এছাড়া তাঁর কিছু অনুবাদ ও প্রবন্ধ সাহিত্যের সাময়িকী ‘শৈলী’ ও ‘শব্দঘর’-এ প্রকাশিত হয়। বিপুল পঠন-পাঠনে ঋদ্ধ একজন প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক (বলা উচিত দীক্ষা দানকারী) হিসেবে, বাংলা-ইংরেজি ও ইংরেজি-বাংলা উভয় ক্ষেত্রে অনন্য-সাধারণ একজন অনুবাদক হিসেবে বাংলাদেশের সাহিত্যক্ষেত্রে তিনি একটি পরিচিত মুখ। ছিলেন তুমুল আড্ডাপ্রিয়ও। নব্বই দশকের অন্যতম কবি দাউদ আল হাফিজ ১৯৬৫ সালের ১৪ এপ্রিল ঝিনাইদহের শৈলকুপার কবিরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৮১ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় তিনি যশোর বোর্ডে মেধা তালকায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন, পরে মেডিক্যালে ভর্তির সুযোগ পেয়েও শুধুমাত্র সাহিত্যেও টানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। সাহিত্যের প্রতি অতি আকর্ষণ এবং ঐকান্তিকভাবে একজন কবি হতে চাওয়া দাউদ আল হাফিজ পেশাগতভাবে সফল না হলেও দীর্ঘদিন ধরে সাহিত্যে নিমগ্ন থেকে বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের দীক্ষাদানের মাধ্যমে এবং তাঁর বিপুল পঠন-পাঠনের আলোয় আলোকিত সাহিত্যআড্ডার মাধ্যমে বয়ঃকনিষ্ঠদের মধ্যে শিল্প-সাহিত্যের আলো ছড়িয়ে গেছেন। তাঁর একমাত্র কবিতার বই ‘আনাবাস অথবা দ্বিধার গন্ধম’ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কবিতায় অনন্য এক সংযোজন। বাংলাদেশে বাংলা-ইংরেজি অনুবাদে অতুলনীয় ছিলেন তিনি। গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সাহিত্যক্ষেত্রে তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি এবং সত্যনিষ্ঠতা ও মিষ্টি স্বভাবের কারণে তিনি সকলের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। খোন্দকার আশরাফ হোসেন সম্পাদিত কবিতার কাগজ ‘একবিংশ’র সাথে জড়িত ছিলেন প্রায় প্রথম থেকেই, ছিলেন এই কাগজটির সহকারী সম্পাদক। খোন্দকার আশরাফ হোসেনের প্রয়াণের পর ২০১৪ সালে নতুন পর্যায়ে ‘একবিংশ’ প্রকাশের উদ্যোগের সাথেও জড়িত ছিলেন তিনি; ছিলেন একবিংশ’র সহযোগী সম্পাদক। টি এস এলিয়টের বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘ট্র্যাডিশন এন্ড দ্য ইনডিভিজুয়াল ট্যালেন্ট’-এর দাউদ আল হাফিজকৃত অনুবাদটি (‘ঐতিহ্য ও ব্যক্তি-প্রতিভা’) ১৯৯৩ সালে একবিংশ’র ১১তম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। তখন বাংলাদেশের তরুণ কবি ও সাহিত্যকর্মীদের মধ্যে এই প্রবন্ধটি একটি মৃদু তরঙ্গ সৃষ্টি করে। ঐতিহ্যের বিনির্মাণের যে ধারা আশি-নব্বইয়ের কবিতায় কল্লোলিত ছিল এই অনুবাদটি তাতে কিছু বেগ বাড়িয়ে দিয়ে থাকতে পারে বৈ কি। এছাড়া অক্তাভিও পাজ-এর ‘কবিতা ও মুক্তবাজার’ শিরোনামের আরেকটি দিগদর্শী প্রবন্ধও অনুবাদ করেন তিনি, প্রকাশিত হয় ২০০১ সালে, একবিংশ’র ২০তম সংখ্যায়। মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী একদম কিছু না পেয়েও কারো প্রতি কোনো অভিযোগ ছিল না তাঁর। সমাজ ও রাষ্ট্রে চলমান দুর্নীতি ও অব্যাহত পচনে আহত বোধ করতেন, কিন্তু প্রতিবাদে উচ্চকণ্ঠ হন নি কখনো। অপ্রাপ্তির জ্বলন্ত চুল্লির মধ্যে থেকেও নিজের স্বভাবজ স্নিগ্ধতাটুকু ধরে রেখেছিলেন শেষাবধি। বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর যৎসামান্য সৃষ্টিসম্ভার বহুদিন টিকে থাকবে, এই প্রত্যাশা রেখে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।


ঐতিহ্য ও ব্যক্তি-প্রতিভা

অনুবাদ : দাউদ আল হাফিজ


ইংরেজি সমালোচনা-সাহিত্যে খুব অল্পই আমরা ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা করে থাকি, যদিও ক্ষেত্রবিশেষে এর অনুপস্থিতির জন্যে বিলাপ করতে গিয়ে আমরা ঐতিহ্যের নাম নিই। উল্লেখের দাবি রাখে এমন ‘কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহ্য’ কিম্বা ‘কোনো একটি ঐতিহ্য’ আমাদের সামনে নেই। বড় জোর আমরা বিশেষণটি এভাবে ব্যবহার করি যে, অমুকের কিম্বা তমুকের কাব্য হলো ‘ঐতিহ্যিক’ কিম্বা ‘অতি-ঐতিহ্যিক’। বিরুদ্ধ মত প্রকাশের ক্ষেত্রটি ছাড়া শব্দটির ব্যবহার বড় একটা চোখে পড়ে না। এর অন্যথা হলে বুঝতে হবে, সেটিও অনুমোদিত রচনা-সংশ্লিষ্ট কোনো সন্তোষজনক প্রত্নতাত্ত্বিক পুনর্গঠনের অনুমোদন-সাপেক্ষে। দৃঢ় প্রত্যয়দানকারী প্রত্নতত্ত্বের এই সান্ত্বনামূলক উল্লেখ ব্যতিরেকে শব্দটি ইংরেজ-শ্রবণেন্দ্রিয়ে বড় একটা প্রীতিকর ঠেকবে না।

প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায়, জীবিত কিম্বা মৃত কোনো লেখক সম্বন্ধে আমাদের মূল্যায়নে শব্দটির চোখে পড়বার উপায় নেই। প্রতিটি দেশ, প্রতিটি জাতির সৃজনী মনোভঙ্গিই শুধু নেই, আছে সমালোচনার মনোভঙ্গিও। এমনকি প্রত্যেক দেশ ও জাতি তার সৃজনী-প্রতিভার তুলনায় সমালোচনা-প্রবৃত্তির ন্যূনতা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে অধিকতর বিস্মৃতিতে ডুবে আছে। ফরাসি ভাষায় প্রকাশিত বিপুলাকার সমালোচনা-সাহিত্য থেকে গোটা ফরাসি জাতির সমালোচনার ধারা কিম্বা প্রবৃত্তি সম্বন্ধে জানি, বা জানার ভান করে থাকি। আর আমরা (যারা এমনই অসচেতন জাতি) এর থেকে উপসংহার টেনে বসি এই বলে যে, ফরাসিরা আমাদের তুলনায় ‘অধিকতর সমালোচনা-মানসিকতার’, এবং কখনো কখনো এমনকি ময়ূরপুচ্ছ ধারণ করে আমরা ভাবতে থাকি, যেনবা ফরাসিরা আমাদের তুলনায় কত কম স্বতঃস্ফূর্ত। হয়তোবা তারা তাই, কিন্তু আমাদের স্মরণে রাখতে হবে, সমালোচনা শ্বাস-প্রশ্বাসের মতোই অপরিহার্য। এও খেয়াল রাখতে হবে, কোনো পুস্তক পাঠকালে আমাদের আবেগতাড়িত মনে সঞ্চরমাণ বাকস্ফূর্তি থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে হবে, রক্ষা করতে হবে তাদের সমালোচনামূলক রচনায় আমাদের মানস-সমালোচনা থেকে। কোনো কবির প্রশস্তি গাওয়ার সময়ে কোথায় কোথায় প্রতিপাদ্য রচয়িতার সঙ্গে অন্যদের অমিল বেশি তার উপর আমাদের জেদ ধরার প্রবণতাই এই পদ্ধতিতে উন্মোচিত অন্যতম সত্য। তাঁর রচনার সেই সমস্ত বৈশিষ্ট্য বা অংশকে আমরা স্বকীয়তা তথা রচয়িতার অদ্ভুত সারাৎসার বলে চিহ্নিত করার ভান করি। আমরা সন্তুষ্ট চিত্তে সেই কবির সঙ্গে তাঁর পূর্বসূরিদের—বিশেষ করে তাঁর নিকটতর পূর্বসূরিদের ভিন্নতা নিয়ে বাগাড়ম্বরে প্রবৃত্ত হই, আমরা সেই সব অংশ চিহ্নিত করার প্রয়াস পাই যা কিনা উপভোগের নিমিত্তে বিচ্ছিন্ন করা যেতে পারে। কাজেই এই সংস্কার থেকে মুক্ত হয়ে আমরা যদি কোনো কবির মুখোমুখি হই, তবে প্রায়শই দেখতে পাব—কবিকর্মের সর্বোৎকৃষ্ট অংশই কেবল নয়, বরং তাঁর অধিকতর স্বকীয় অংশেও প্রয়াত কবিগণ, তার পূর্বসূরিগণ, বলিষ্ঠভাবে অমরত্ব নিশ্চিত করে গেছেন। এ প্রসঙ্গে আমি কৈশোরক গভীরাবেগদীপ্ত কালের কথা তুলছি না, বরং বোঝাতে চাই পূর্ণতাপ্রাপ্তির কালকেই।


পৃথক পৃথকভাবে সর্বজনীন চেতনা ও ঐহিক চেতনা এবং একইসাথে সর্বজনীন ও ঐহিক চেতনার সমন্বয় যে ইতিহাস-চেতনা, তাই একজন লেখককে ঐতিহ্যিক করে তোলে।


তথাপি যদি ঐতিহ্য বলতে হস্তান্তরযোগ্য উত্তরাধিকার অর্থাৎ আমাদের পূর্ব-প্রজন্মের ধারার নিছক অনুসরণ এবং তার সাফল্যের অন্ধ ও ভীরু আনুগত্যই বোঝায়, তবে তেমন ‘ঐতিহ্য’ নিশ্চিতরূপে নিরুৎসাহিত করা উচিত। আমরা এমন অনেক সাদামাটা স্রোতধারাকে বালিয়াড়িতে অচিরেই বিলীন হতে দেখেছি; আর অভিনবত্ব তো পুনরাবৃত্তি অপেক্ষা অধিকতর শ্রেয়। ব্যাপকতর তাৎপর্যমণ্ডিত ব্যাপার এই ঐতিহ্য। ঐতিহ্য উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করা যায় না, এবং কঠোর শ্রমের মাধ্যমেই তা লাভ করতে হবে। ঐতিহ্য-অর্জনে প্রথমেই প্রয়োজন ইতিহাসচেতনার, যাকে আমরা প্রায় অত্যাবশ্যক বলে মনে করতে পারি, অন্তত তাঁর জন্য যিনি তাঁর বয়সের পঞ্চবিংশতি বছর পেরিয়েও কবি নামধেয় থাকতে ইচ্ছুক। আর সেই ইতিহাস-চেতনার জন্য দরকার একধরনের বোধের—যে বোধ হবে যুগপৎ অতীতের অতীত-চেতনার এবং অতীতের সমকালীন-চেতনার। সেই ইতিহাস-চেতনা, যা কেবল একজন লেখকের মজ্জাগত প্রজন্মচেতনা থেকেই নয়, বরং হোমার থেকে শুরু করে সমগ্র ইউরোপীয় সাহিত্যের বোধ থেকেও তাকে লিখতে বাধ্য করে—যে বোধের অভ্যন্তরে ইউরোপীয় সাহিত্যের পাশাপাশি তাঁর সমগ্র স্বদেশীয় সাহিত্যের অস্তিত্ব আছে এবং যুগপৎ শৃঙ্খলাও রচনা করে। পৃথক পৃথকভাবে সর্বজনীন চেতনা ও ঐহিক চেতনা এবং একইসাথে সর্বজনীন ও ঐহিক চেতনার সমন্বয় যে ইতিহাস-চেতনা, তাই একজন লেখককে ঐতিহ্যিক করে তোলে। ইতিহাস-চেতনা আরো সেই বোধ, যা একই সাথে একজন লেখককে কালপ্রবাহে তাঁর অবস্থান এবং তাঁর সমসাময়িকতা সম্বন্ধে সূক্ষ্মভাবে সচেতন করে তোলে।

কোনো কবি, কোনো শিল্পীরই এককভাবে কোনো তাৎপর্য নেই। প্রয়াত কবি ও শিল্পীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের মূল্যয়নই হচ্ছে তাঁর তাৎপর্য, তাঁর মূল্যায়ন। কাউকে আলাদা করে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়; তুলনা প্রতিতুলনার জন্য তাকে অবশ্যই প্রয়াত কবি-শিল্পীদের সাপেক্ষে স্থাপন করতে হবে। নিছক ঐতিহাসিকই নয়, বরং একে আমি নন্দনতাত্ত্বিক সমালোচনার সূত্র বলেও মনে করি। অবশ্যি তার নিয়মানুগামী হওয়ার আর সঙ্গতিপূর্ণ হওয়ার বাধ্যবাধকতা একপেশে নয়। অভিনব কোনো শিল্পকর্মের সৃষ্টি হলে যে প্রভাব পড়ে, তা এর পূর্বগামী সমস্ত শিল্পকর্মের ক্ষেত্রেও যুগপৎ পড়ে। বিদ্যমান কীর্তিস্তম্ভসমূহ নিজেদের অভ্যন্তরে একটি আদর্শ শৃঙ্খলা বজায় রাখে, যা অভিনব (সত্যিকার অভিনব) কোনো শিল্পকর্মের সংযোজনে ঈষৎ রূপান্তরিত হয়। নতুনের আগমনের পূর্বেই বিদ্যমান শৃঙ্খলা সম্পন্ন থাকে; কারণ অভিনবত্বের বাধাস্বরূপ উপস্থিতির পরে সেই অটল শৃঙ্খলা, পূর্বেই বিদ্যমান সমগ্র শৃঙ্খলা, তুচ্ছমাত্রায় হলেও, অবশ্যই বদলে যাবে। সুতরাং সমগ্রের সাপেক্ষে প্রতিটি শিল্পকর্মের সম্পর্ক, সুষমতা ও মূল্যবোধ পুনরাভিযোজিত হয়, এবং এটিই হলো নতুন ও পুরনোর পরস্পর নিয়মানুগামিতা। এই শৃঙ্খলার ধারণা, ইউরোপীয় সাহিত্যের তথা ইংরেজি সাহিত্যের আঙ্গিকগত ধারণা যিনিই অনুমোদন করে থাকুন না কেন, তার কাছে এটি অস্বাভাবিক ঠেকবে না যে, সমকাল কর্তৃক অতীতের ততখানিই রূপান্তরিত হওয়া উচিত যতখানি অতীত কর্তৃক সমকাল পরিচালিত হয়। এবং এ বিষয়ে সচেতন কবিমাত্রেই বিস্তর বাধাবিপত্তি ও তাঁর সমূহ দায়িত্বভার সম্বন্ধে সচেতন হবেন। বিশেষ করে এ প্রসঙ্গে তিনি সচেতন হবেন যে, তাঁর মূল্যায়ন হবে অনিবার্যভাবে অতীতের মানদণ্ডে। ব্যবচ্ছেদ নয়, আমি অতীত-মানদণ্ডের মূল্যায়নের কথা বলছি। পূর্বসূরিদের তুলনায় তিনি অধিক ভালো না মন্দ, কিম্বা তাঁদের সমতুল্য কিনা আমি এরূপ মূল্যায়নের কথা, এমনকি প্রয়াত সমালোচকের মানদণ্ডে মূল্যায়নের কথা বলছি না। এটি এমন এক মূল্যায়ন, এমন এক তুলনা, যেখানে পরস্পরের সাপেক্ষে দুটি জিনিসই পরিমাপ করা হয়। কেবল অভিনব শিল্পকর্মটির বেলাতেই যদি নিয়মানুগামিতার প্রশ্ন ওঠে, তবে হয় সেটি সত্যিকার অর্থে কোনো নিয়মানুগামিতা নয়, নয়তো এমনকি শিল্পকর্মটিই আদৌ অভিনব কিছু নয়, এবং সেই সূত্রে সেটি শিল্পকর্ম পদবাচ্যও নয়। সহজেই সুসমঞ্জস হওয়ার কারণে নতুনটি যে মূল্যবান—এমনও আমরা বলতে পারি না। কিন্তু সেটির এই সুসমঞ্জস হওয়ার প্রক্রিয়াটি সেটিরই মূল্যের একটি অভীক্ষা—এমন একটি অভীক্ষা, সত্যি বলতে কি, যা ধীরে ও সতর্কতার সাথে প্রয়োগ করা যেতে পারে। কারণ নিয়মানুগামিতার মীমাংসায় আমরা কেউই অভ্রান্ত মূল্যায়নকারী নই। আমরা বলে থাকি : এটি সুসমঞ্জস বলে মনে হয় এবং সম্ভবত স্বকীয়, কিম্বা এটি স্বকীয় বলে মনে হয় এবং সুসমঞ্জস হতে পারে। কিন্তু একটি বস্তু সেটি ছাড়া অন্যটি যে নয়, সম্ভবত আমরা খুবই কমই তা নির্ণয় করতে পারব।

অতীতের সঙ্গে কবির সম্পর্কের অধিকতর বোধগম্য ব্যাখ্যার প্রতি অগ্রসর হলে দেখব : অতীতকে নির্দিষ্ট কোনো পিণ্ড—বাছবিচারহীন পিণ্ড হিসেবে যেমন তিনি ধরতে পারেন না, তেমনি একটি কি দুটি ব্যক্তিগত প্রশস্তির, এমনকি পছন্দসই নির্দিষ্ট কালের উপর তিনি সামগ্রিকভাবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারেন না। প্রথম ধারাটি অস্বীকার্য, দ্বিতীয়টি যৌবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা, এবং তৃতীয় ধারাটি সন্তোষবিধায়ক ও বহুকাঙ্ক্ষিত সম্পূরক। কবিকে অবশ্যই মূল স্রোতধারা সম্বন্ধে সচেতন হতে হবে, যা মোটেও নিয়ত একইরূপে বিশিষ্ট খ্যাতিমানদের মধ্য দিয়ে বয় না। তাঁকে অবশ্যই সেই সুস্পষ্ট সত্য সম্পর্কে সচেতন হতে হবে যে, শিল্প কখনোই উৎকৃষ্টতর হয় না, যদিও শিল্পের মালমশলা কখনোই নির্দিষ্ট থাকে না। তাঁকে অবশ্যই সচেতন হতে হবে যে, ইউরোপীয় মানস—তাঁর স্বদেশমানস—যে মানস, তিনি যথাসময়ে অবহিত হন, তাঁর ব্যক্তিমানস অপেক্ষা অধিকতর গুরুত্ববহ—নিয়ত পরিবর্তিত হয়। এবং এই পরিবর্তন এমনই এক বিকশিত রূপ, যা তাঁর চলার পথে কিছুই ফেলে আসে না, এবং বুড়িয়ে গেছে বলে শেক্সপিয়র কিম্বা হোমার কি মাগদালেনীয় নক্সাকারীদের আঁকিবুকি কোনো কিছুকেই বিদায় দেয় না। এই যে বিকাশ, সম্ভবত পরিশীলন, তথা নিশ্চিত দুর্বোধ্যতা, তা শিল্পীর দৃষ্টিকোণ থেকে আদৌ কোনো উৎকর্ষ নয়। মনস্তাত্ত্বিকের দৃষ্টিকোণ থেকে কি আমাদের দূর-কল্পনার জগৎ থেকেও একে সম্ভবত উৎকর্ষ বলা যায় না; আর যদি বলাও যায় তবে তাও হবে যন্ত্রবিদ্যা এবং অর্থশাস্ত্রের দুর্বোধ্যতানির্ভর কোনো লক্ষ্য থেকে। কিন্তু অতীত ও সমাকালের ভেদরেখা এই যে, সচেতন সমকাল হচ্ছে অতীতের এক সচেতনতা এমন এক অর্থে ও মাত্রায় যে অতীতের আত্মচেতনাও যা প্রদর্শনে অপারগ।

জনৈক ব্যক্তি বলেছেন : ‘প্রয়াত লেখককুল আমাদের থেকে দূরস্থিত এই কারণে যে তাদের থেকে অনেকানেক বেশি জানি আমরা।’ যথার্থই বলেছেন তিনি, এবং আমরা যা জানি তাঁরা তাই-ই।


একজন শিল্পীর প্রগতি বলতে বোঝায় লাগাতার আত্মবিসর্জন—ব্যক্তিসত্তার এক বিরামহীন বিলোপ।


আমি পূর্ণমাত্রায় সচেতন সেই স্বাভাবিক আপত্তি সম্পর্কে যা স্পষ্টতই কাব্যের বৈশিষ্ট্যসংশ্লিষ্ট আমার কার্যক্রমের অঙ্গীভূত। এই আপত্তিটি এই যে, কাব্যকলার এই মতবাদ অনুযায়ী একজন কবির জন্য হাস্যকর রকমের সাহিত্যজ্ঞান (পণ্ডিতিপনা) প্রয়োজন—এমনি একটি দাবি, যা যে-কোনো কাব্যমন্দিরের কবিদের জীবনীর প্রতি সামান্য উত্তরবিচারের মাধ্যমেই খারিজ করা যায়। এতে করে সহজেই নিশ্চিত হওয়া যাবে যে, অধিক পাণ্ডিত্য কাব্যিক সংবেদনশীলতাকে প্রাণহীন করে ফেলে কিম্বা বিকৃত করে ফেলে। যাই হোক, আমরা এই বিশ্বাসে দৃঢ় থাকি যে, একজন কবির ততখানিই জানা প্রয়োজন যতখানি তাঁর আব্যশক ধারণ-প্রক্রিয়া আর কুঁড়েমির সীমা লঙ্ঘন করবে না। পরীক্ষা, বৈঠকখানা কিম্বা প্রচারণার অহমসর্বস্ব ধারায় যা লাগে তাতেই জ্ঞান সীমায়িত করা কখনোই অভিপ্রেত নয়। কেউ কেউ সহজেই জ্ঞানায়ত্ত করে, কিন্তু ধীরগতিসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ জ্ঞানার্জনে গলদঘর্ম হয়। অধিকাংশ ব্যক্তি সমগ্র ব্রিটিশ ম্যাজিয়ম থেকে যে জ্ঞান আয়ত্ত করতে না পারে, শেক্সপিয়র একমাত্র প্লুতার্ক থেকেই তারও অধিক অত্যাবশ্যক ইতিহাস আয়ত্ত করেছিলেন। মূলত যার উপর গুরুত্বারোপ করতে হবে তা হলো, কবিকে অবশ্যই অতীত-চেতনার বিকাশ ঘটাতে হবে কিম্বা অর্জন করতে হবে, এবং এই চেতনার বিরামহীন বিকাশ ঘটাতে হবে কবির সমগ্র কাব্য-জীবনে।

যা ঘটে তা হলো কবির ক্রমাগত আত্মসমর্পন—এ-মুহূর্তে যা আছেন তাকে অধিকতর মূল্যবান কোনো কিছুর হাতে তুলে দেয়া। একজন শিল্পীর প্রগতি বলতে বোঝায় লাগাতার আত্মবিসর্জন—ব্যক্তিসত্তার এক বিরামহীন বিলোপ।

ঐতিহ্য ও ব্যক্তি-প্রতিভা এই নৈর্ব্যক্তিক পদ্ধতির এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে তার সম্পর্কের সংজ্ঞার্থ নির্ণয় করতে হবে। এই নৈর্ব্যক্তিকতার মধ্য দিয়েই, বলা যেতে পারে, শিল্পকলা বিজ্ঞানের পর্যায়ে উঠে আসে। ধারণাসঞ্চায়ক তুলনা হিসেবে, আসুন, সেই বিক্রিয়াটি বিবেচনা করা যাক যখন অক্সিজেন ও সালফার-ডাই-অক্সাইডপূর্ণ জারে এক সুতা প্লাটিনাম সংযোজিত হয়।

কবিতাই সৎ-সমালোচনা ও সংবেদনশীল মূল্যায়নের মূল লক্ষ্য, কবি নয়। কাগজি সমালোচনার হট্টরব এবং পৌনঃপুনিক গুঞ্জনে কান পাতলে আমরা অনেকানেক কবির নাম শুনতে পাব। কেতাবি জ্ঞানের মুখাপেক্ষী না হয়ে আমরা যদি কবিতাস্বাদনের পক্ষপাতী হই এবং একটি কবিতা চাই, তেমন কবিতা কদাচিৎ মিলবে। একটি নির্দিষ্ট কবিতার সঙ্গে অন্যসব কবিদের কবিতাবলির সম্পর্কের উপর আমি গুরুত্বারোপ করতে চেয়েছি এবং বলতে চেয়েছি, কাব্য বলতে এ যাবৎ রচিত কবিতাবলির সপ্রাণ সমগ্রতাই বোঝায়। এই নৈর্ব্যক্তিক কাব্যতত্ত্বের অন্যদিকটি হচ্ছে—কবিতার সঙ্গে কবির সম্পর্ক। আমি ইতোমধ্যে একটি তুলনার মাধ্যমে ইঙ্গিত করেছি যে, পরিণত আর অপরিণত কবিমানসের পার্থক্য ঠিক ‘ব্যক্তিত্বে’র যথাযথ মূল্যায়ন নয়, এমনকি তা অধিক আকর্ষণীয় কিম্বা বক্তব্যপ্রধান হওয়ার কারণেও নয়। বরং পার্থক্যটি দাঁড়াচ্ছে মাধ্যমের অপেক্ষাকৃত অধিক দক্ষতার কারণে, যে মাধ্যমে বিশেষ কিম্বা অতিবিচিত্র অনুভূতিসমূহ নতুন নতুন বিন্যাসে স্থিত হওয়ার স্বাধীনতা রাখে।

পূর্বোক্ত তুলনাটি ছিল অনুঘটকের। যখন এক পাতা প্লাটিনামের উপস্থিতিতে পূর্বোল্লিখিত গ্যাস দুটি মিশানো হয় তখন সালফিউরাস অ্যাসিড উৎপন্ন হয়। এই বিন্যাসটি ঘটে কেবল তখনি, যখন প্লাটিনাম উপস্থিত থাকে। তথাপি নতুন উৎপন্ন অ্যাসিডে প্লাটিনামের রেশমাত্র চিহ্ন থাকে না, তথাপি পাতাটি নিজেও অপ্রভাবিত থাকে : একেবারে জড়, নিস্ক্রিয় ও অপরিবর্তিত। কবিমানস ঐ প্লাটিনাম-পাতের অনুরূপ, যা আংশিক কিম্বা সম্পূর্ণত ব্যক্তিসত্তার অভিজ্ঞতার উপর ক্রিয়াশীল হতে পারে। যিনি তার মধ্যকার যন্ত্রণাদীর্ণ ব্যক্তিকে ও সৃজনীমানসকে যতটা পরিপূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করতে পারবেন, যার মানস সৃষ্টির মালমশলা ভাবাবেগমসমূহকে যতটা নিখুঁতভাবে জীর্ণ ও রূপান্তর করতে পারবে তিনি ততটাই সার্থক শিল্পী।


মহৎ কাব্য, আবেগের প্রত্যক্ষ ব্যবহার ব্যতিরেকেই, কেবল অনুভূতি দিয়েই রচিত হতে পারে।


রূপান্তরকারী অনুঘটকের সংস্পর্শে আসে এমনসব উপাদান তথা অভিজ্ঞতা, চোখে পড়বে, দুই প্রকারের : আবেগ (emotions) ও অনুভূতি (feelings)। শিল্পোপভোগকারীর উপর কোনো শিল্পকর্মের প্রভাবটি এমন এক অভিজ্ঞতা, যা শৈল্পিক নয় এমন বিন্যাস থেকে এটি উৎপন্ন হতে পারে। বিচিত্র অনুভূতির, বিশেষত লেখকের সহজাত শব্দ, শব্দবন্ধ কিম্বা চিত্রকল্পের সংযােজনে চূড়ান্ত ফল আসতে পারে। কিম্বা মহৎ কাব্য, আবেগের প্রত্যক্ষ ব্যবহার ব্যতিরেকেই, কেবল অনুভূতি দিয়েই রচিত হতে পারে। ‘ইনফর্নো’র পঞ্চদশ কান্তো (ব্রুনেত্তো লাতিনি) ঘটনার ভেতরকার আবেগ দ্বারা গঠিত। অনুপুঙ্খ বর্ণনার জটিলতার মধ্য দিয়েই অর্জিত হয়েছে এখানকার প্রতিঘাত, যদিও তা যেকোনাে শিল্পকর্মের প্রতিঘাতের মতােই একক। শেষ চতুষ্পদীটি উপহার দেয় একটি চিত্রকল্প, তথা চিত্রকল্পসংশ্লিষ্ট একটি অনুভূতি, যা ‘আগত’, পূর্বগামী কোনাে অনুভূতির অনুগামী হিসেবে নয়, বরং যা কবি মনে স্থগিতাবস্থায় ছিল, যতক্ষণ না এমন একটি বিন্যাস এসে পৌছে যার সাথে সে যুক্ত হতে পারবে। কবিমানস, প্রকৃতপ্রস্তাবে, এমন একটি আধার, যেখানে নতুন নতুন যৌগ গঠনকারী কণিকাসমূহের আগমনের অপেক্ষায় সংগৃহীত ও পুঞ্জীভূত হয় রাশি রাশি অনুভুতি, শব্দবন্ধ আর চিত্রকল্প।

মহত্তম কাব্যের প্রতিনিধিত্বকারী কতিপয় স্তবকের তুলনাত্মক বিবেচনা থেকে প্রতীয়মান হবে বিভিন্ন বিন্যাসের কী বিপুল বৈচিত্র্য, এবং শ্ৰেয়ােবােধের আধা-নীতিশাস্ত্রীয় মানদণ্ড কত বড় ব্যর্থ প্রয়াস। কারণ আবেগের তথা উপকরণসমূহের ‘মহত্ত্ব’ তথা গভীরতা এটি নয়, বরং শৈল্পিক পদ্ধতির, বলা যায়, চাপের প্রচণ্ডতা, যার ফলে একীভবন-বিক্রিয়া সংঘটিত হয়—সেটিই উল্লেখের দাবি রাখে। পাওলাে ও ফ্রানচেস্কার আখ্যানভাগ একটি নির্দিষ্ট আবেগ সঞ্চার করে। কিন্তু কাব্যের তীব্রতা উক্ত অভিজ্ঞতা-উদ্ভূত তীব্রতার ধারণা থেকে কিছুমাত্রায় ভিন্ন। অধিকন্তু, আবেগের উপর প্রত্যক্ষ নির্ভরতাবিহীন ষড়বিংশ কান্তোর ইউলিসিসের সমুদ্রযাত্রার থেকে এটি অধিক তীব্র নয়। আবেগের রূপান্তর-প্রক্রিয়ায় বিপুল বৈচিত্র্য লক্ষণীয় : আগামেমন-বধ কিম্বা ওথেলাের যন্ত্রণা এমন এক শৈল্পিক প্রতিঘাত ফেলে যা আপাতভাবে দান্তের দৃশ্যাবলির তুলনায় সম্ভাব্য মূল-যন্ত্রণার অধিকতর নিকটবর্তী। আগামেমননে যেমন প্রত্যক্ষদর্শীর আবেগের, ওথেলােয় তেমনি প্রধান চরিত্রের আবেগের সমীপবর্তী হয়ে পড়ে শৈল্পিক আবেগ। কিন্তু শিল্প ও ঘটনার মধ্যকার ফারাক সব সময়েই সন্দেহের ঊর্ধ্বে। আগামেমন-বধের বিন্যাস ইউলিসিসের সমুদ্রযাত্রার বিন্যাসের মতােই জটিল হয়তাে। উভয়ক্ষেত্রেই সৃজনী-উপকরণসমূহের একীভবন সংঘটিত হয়েছে। নাইটিঙ্গেলের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক নেই এমন কিছু অনুভূতির প্রয়ােগ আছে কিটসের গীতিকবিতাটিতে, কিন্তু কিছুটা তার আকর্ষণীয় নামের কারণে, এবং কিছুটা তার খ্যাতির কারণে নাইটিঙ্গেল ঐ অনুভূতিসমূহের সম্মিলন ঘটাতে পেরেছে।

যে দৃষ্টিভঙ্গিটিকে আমি আক্রমণ করার চেষ্টা চালাচ্ছি, সেটি সম্ভবত আত্মার অস্তিত্বময় ঐক্যসম্বন্ধীয় আধিবিদ্যক-তত্ত্বের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। কবি তার ব্যক্তিত্বের রূপায়ণ করতে পারেন না, এটিই আমার বক্তব্যের সারার্থ। কারণ কবি হলেন একটি মাধ্যম-বিশেষ, যা ব্যক্তিত্ব-রহিত মাধ্যমই শুধু, যার মধ্য দিয়ে গভীর ধারণা আর অভিজ্ঞতা অদ্ভুত ও অপ্রত্যাশিত উপায়ে বিন্যস্ত হয়। ব্যক্তির নিকট গুরুত্ববাহী স্থান নাও পেতে পারে, আবার কাব্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ও অভিজ্ঞতা ব্যক্তিমানুষটির নিকট তুচ্ছাতিতুচ্ছ মনে হতে পারে।

এই সমস্ত পর্যবেক্ষণের আলােকে—কিম্বা অনালােকে—সতেজ অভিনিবেশের সঙ্গে বিবেচনার জন্য বেশ অপরিচিত একটি স্তবক আমি এখানে চয়ন করছি :

And now methinks I could e’en chide myself
For doating on her beauty, though her death
Shall be revenged after no common action.
Does the silkworm expend her yellow labours
For thee? For thee does she undo herself?
Are lordships sold to maintain ladyships
For the poor benefit of a bewildering minute?
Why does yon fellow falsify highways,
And put his life between the judge’s lips,
To refine such a thing—keeps horse and men
To beat their valours for her?…

ইতি- ও নেতিবাচক আবেগ বিন্যস্ত রয়েছে এই স্তবকে (যথার্থ প্রেক্ষাপটে দেখলে এটিই প্রতীয়মান হয়) : একদিকে সুন্দরের অতিপ্রগাঢ় আকর্ষণ, অন্যদিকে কিম্ভূতের সমান গভীর মােহ, পূর্বগামীর প্রতিরূপ ও হন্তারক। সংলাপ-সঙ্গত নাটকীয় পরিস্থিতির বদলে, শুধুমাত্র উক্ত পরিস্থিতিও অপর্যাপ্ত হয় যেখানে, সেখানে আমরা দেখি বিষম আবেগের সুষমতা। বলতে গেলে, এটিই হচ্ছে নাট্যপ্রদত্ত সেই গাঠনিক আবেগ। কিন্তু সামগ্রিক প্রতিঘাত, তথা মৌল সুরটি সত্যেরই ফলস্বরূপ যে, এই আবেগের প্রতি অস্পষ্ট এক আসক্তিসম্পন্ন বেশ কিছু অনুভূতি এর সঙ্গে পরস্পর বিন্যস্ত হয়ে একটি নতুন ‘শিল্পাবেগ’ সৃষ্টি করে।


কাব্য আবেগের মুক্তবন্ধন নয়, বরং আবেগমুক্তি। কাব্য ব্যক্তিত্বের অভিব্যক্তি নয়, বরং ব্যক্তিত্ব থেকে নিষ্কৃতি।


ব্যক্তিজীবনের বিশেষ ঘটনাবলি থেকে উদ্ভূত ব্যক্তি-আবেগের কৃতিত্বে কোনোভাবেই কবি বিশিষ্ট কিম্বা চিত্তাকর্ষক হয়ে ওঠেন না। তাঁর সেই বিশেষ আবেগসমূহ হতে পারে সরল, স্থূল কিম্বা বৈচিত্র্যহীন। কিন্তু তাঁর কাব্যে ব্যবহৃত আবেগ হবে বেশ জটিল জিনিস। তাই বলে জীবনে জটিল কিম্বা অস্বাভাবিক আবেগে ভরা মানুষের আবেগের জটিলতায় তাঁর কাব্য রচিত হবে না। প্রকৃত প্রস্তাবে, কাব্যে খেয়ালিপনার অন্যতম ক্রটি হলাে, নতুন নতুন মনুষ্যাবেগের সন্ধানে বেরিয়ে পড়া। নতুন নতুন ভুল-জায়গায় অভিনবত্বের সন্ধান স্বেচ্ছাচারিতারই নামান্তর। নতুন নতুন আবেগ খুঁজে বেড়ানাে কবির কাজ নয়, বরং সাধারণ আবেগের ব্যবহার করা এবং সে সব কাব্যে উত্তীর্ণ করতে, আদৌ ঘটনা-আবেগ নয় এমনসব আবেগের বাণীরূপ দেওয়াই তাঁর কাজ। আটপৌরে আবেগের সাথে সাথে কবির অনুপলব্ধ বেশ কিছু আবেগও তাঁর কাজে লাগবে। ফলত এটি আমাদের মানতেই হবে যে, ‘প্রশান্ততায় অনুস্মৃত আবেগ’ (emotion recollected in tranquility) একটি অযথার্থ সূত্র। কারণ এটি ‘আবেগ’ নয়, ‘অনুস্মৃতি’ও নয়, এমনকি অর্থবিকৃতি ব্যতিরেকে ‘প্রশান্ততা’ও নয়। বিপুল পরিমাণ অভিজ্ঞতার, যদিও বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন সক্রিয় ব্যক্তির নিকট আদৌ অভিজ্ঞতা বলেই মনে হবে না, ঘনীভবন এবং তৎজাত এক নতুন জিনিস বলা যায় একে। এটি এমনি এক ঘনীভবন যা সচেতনভাবে কিম্বা সুচিন্তিত উপায়ে সংঘটিত হয় না। এইসব অভিজ্ঞতা ‘অনুস্মৃত’ নয়, এবং চূড়ান্তভাবে এমন এক আবহে বিন্যস্ত হয়, যাকে ‘প্রশান্ত’ বলা যেতে পারে কেবল কোনাে ঘটনায় নিষ্ক্রিয় তদারকির অর্থে। অবশ্যি নটেগাছটি এখানেই মুড়ােয় না। কাব্যরচনার ক্ষেত্রে, আরাে অনেক কিছুই আছে যা অবশ্যই সচেতন ও সুচিন্তিত হতে হবে। প্রকৃতপ্রস্তাবে, মন্দ কবি তিনিই, যিনি অভ্যাসবশে সচেতনতার জায়গায় হয়ে পড়েন অসচেতন, এবং যেখানে অসচেতন থাকাই সঙ্গত সেখানে হয়ে ওঠেন সচেতন। উভয় ক্রটিই ব্যক্তিক করে তুলতে সহায়ক হবে। কাব্য আবেগের মুক্তবন্ধন নয়, বরং আবেগমুক্তি। কাব্য ব্যক্তিত্বের অভিব্যক্তি নয়, বরং ব্যক্তিত্ব থেকে নিষ্কৃতি। অবশ্যি ব্যক্তিত্ব ও আবেগ দুই যাদের আছে, কেবল তাঁরাই জানেন এই জিনিসগুলি থেকে নিষ্কৃতির তাৎপর্য কী।

‘মন, নিঃসন্দেহে, অধিকতর স্বর্গীয় এবং আবেগানুভূতিশূন্য। অধিবিদ্যা কিম্বা অতীন্দ্রিয়বাদের সীমান্তে থেমে গিয়ে এই প্রবন্ধের অভিপ্রায় নিজেকে সসীম করা এমন কিছু ব্যবহারিক উপসংহারে, যা কাব্যপ্রেমী দায়িত্ববান ব্যক্তির প্রয়ােগোপযােগী হয়। কবি থেকে কাব্যের দিকে পাঠকাগ্রহ চালিত করা প্রশংনীয় উদ্যোগ : কারণ সেটিই, ভালাে হােক মন্দ হােক—সত্যিকারের কাব্যের যথার্থ মূল্যায়নে সহায়ক। এমন অনেক ব্যক্তি আছেন যারা পদ্যে আন্তরিক আবেগের অভিব্যক্তিকে মূল্যায়ন করে থাকেন, কিন্তু কাব্য-প্রকরণের মূল্যায়নকারীর সংখ্যা নিতান্ত হাতে-গােনা। আর তেমন ব্যক্তি নেই বললেই চলে যিনি জানেন কখন অভিব্যক্ত হয় একটি অর্থময় আবেগ, যে আবেগের জীবন কেবল কবিতাতেই, কবির জীবনেতিহাসে নয়। শিল্পাবেগ হচ্ছে নৈর্ব্যক্তিক। নির্মিতব্য শিল্পকর্মে পরিপূর্ণ আত্মবিসর্জন ব্যতিরেকে কবি এই নৈর্ব্যক্তিকতার নাগাল পান না। যদি না তিনি যুগপৎ বাস করেন শুধু সমকালের নয়, বরং অতীতের সমকালীন মুহূর্তে, যদি না তিনি যুগপৎ সচেতন থাকেন সেসব সম্পর্কে—যা বিগত নয়, বরং যা ইতােমধ্যেই জীবন্ত—হয়তাে তিনি জানতেও পারেন না কী তার করণীয়।