হোম সাক্ষাৎকার সৈয়দ শামসুল হকের সাথে আড্ডা

সৈয়দ শামসুল হকের সাথে আড্ডা

সৈয়দ শামসুল হকের সাথে আড্ডা
856
0

২০১১ সালের ২৫ ডিসেম্বর সৈয়দ শামসুল হকের জন্মদিনকে সামনে রেখে, তাঁর গুলশানের বাড়িতে গিয়েছিলাম একটি সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য। ওই সময় আমি একটি অনলাইনে কাজ করতাম। গিয়ে দেখি, হক ভাই সোফায় হেলান দিয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছেন। তাঁকে ঘিরে আছেন একদল তরুণ কবি। কবিরা হলেন কবি রহমান হেনরী, অনন্ত সুজন ও জুননু রাইন।

শুরুতেই আমাকে ফেইস করতে হলো হক ভাইয়ের বলা কিছু কথা আর প্রশ্নের—‘অনলাইন আসলে কী? এখানে লেখা কিভাবে পাওয়া যায়? অন লাইনে লেখা দিয়ে কী লাভ? বই পড়ার স্বাদ তো ই-বুকে পাওয়া সম্ভব না।…’

আমি জানতাম, হক ভাই প্রযুক্তি ব্যবহারে বহু আগে থেকে পারদর্শী। তবু তাঁর কথার উত্তর দিতে দিতেই আলাদাভাবে সাক্ষাৎকার নেওয়া বাদ দিয়ে আমি অংশ নিয়ে ফেললাম তাদের আড্ডাতে। আমার কাছে মনে হয়েছিলো ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার নেওয়ার চেয়ে আড্ডাই হতে পারে অনেক বেশি প্রাণবন্ত। আমাদের কথার ফাঁকে ফাঁকে আড্ডায় এসে যোগ দিয়েছিলেন আনোয়ারা আপা (কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক)।

আড্ডাটি প্রকাশিত হয়েছিল একটি অনলাইন ও জাতীয় দৈনিকে। সৈয়দ শামসুল হকের প্রয়াণ উপলক্ষ সেই আড্ডারই উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরা হলো।

– ফে. মা.

রহমান হেনরী

স্যার, আমাদের বাংলাদেশের সাহিত্য কতদূর কী দাঁড়াল বলে মনে হয়। আমাদের সাহিত্য আসলে কতখানি এগোলো?

সৈয়দ শামসুল হক

কিচ্ছু বলা যাবে না। বাংলাদেশের সাহিত্য নিয়ে এখনো সামগ্রিক মূল্যায়ন কিছু করা যাবে না। যতটুকু হয়েছে ইনডিভিজুয়ালি। বাংলাদেশের সাহিত্য, আমার নিজের ধারণা এখনো এর মুখ তৈরি হচ্ছে। এটা শেষ হয় নি। তারপর তো তার স্বাস্থ্য, তার চেতনা, তার জীবন-যাপন, সাহিত্যের ব্যক্তিত্ব এগুলো নিয়ে কথা…

জুননু রাইন

আপনি কি এটা একাত্তরের পর থেকে ধরতেছেন…

রহমান হেনরী

’৪৭ সাল থেকেই ধরা যাক, তখন থেকেই তো পূর্ববঙ্গ-সাহিত্য আলাদা হতে থাকে। পূর্ববঙ্গের ভিন্ন একটা চেতনা এল।

সৈয়দ শামসুল হক

বাঙালি মুসলিম সমাজের ভেতরে এটা এসেছে ৪০-এর দশক থেকে। তুমি আবু রুশদকে বাদ দেবে কী করে! তুমি আবুল হোসেন, আহসান হাবীবকে বাদ দেবে কী করে! তারা তো আর ’৪৭-এর পরের লোক না। যদি ’৪৭ নাও হতো তবু থাকত লার্জ নাম্বার অব বেঙ্গলি মুসলিম রাইটারস। তিন তিনজন উল্লেখযোগ্য কবি আবুল হোসেন, আহসান হাবীব, ফররুখ আহমদ। আবু রুশদ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ এরা প্রত্যেকেই কিন্তু ’৪৭-এর আগের।

আনোয়ারা সৈয়দ হক

আমার মনে হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই কিন্তু বাঙালি মুসলমানরা সচেতন হলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা আমরা ভুলে যাচ্ছি। ’৪৭-এর আগে কী হয়েছিল? ’৪৭-এর আগে হয়েছিল কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। তার একটা এফেক্ট দেশজুড়ে, উপমহাদেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং সেটাতে মুসলমানের যে মানসিক প্যাটার্ন সেখানে এফেক্ট করেছে। মূলত আধুনিক উপন্যাস বলতে যা বোঝায় ওইখান থেকে আবু রুশদ, রশীদ করিম এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এতে আমরা একটুখানি সচেতন হলাম… এটা আগের মতো না। আনোয়ারা উপন্যাসের মতো যে এটা না, আমরা বুঝতে পারলাম।

ফেরদৌস মাহমুদ

হক ভাই, আপনি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে একসময় বলেছেন, আমাদের কথাসাহিত্য হচ্ছে নাবালকের সাহিত্য। আমাদের সাহিত্যের নাবালকত্ব ঘোচানোর ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর থেকে আপনার লেখালেখি কতখানি ভূমিকা রেখেছে?

সৈয়দ শামসুল হক

সেটা আমি কেন বলব, সেটা তোমরা বলবে। নাবালকত্ব ঘোচাতে পেরেছি কিনা এটা তোমরা বলবে। আমি বলেছি যে বাই অ্যান্ড লার্জ সাবালক হয় নি বাংলাদেশের সাহিত্য। শুধু এটুকু বলা যায় আমি সচেতন। কবিতা যেখানে গেছে সামগ্রিকভাবে, উপন্যাস সেখানে যায় নি।

রহমান হেনরী

ছোটগল্পের ক্ষেত্রে কী বলবেন—

সৈয়দ শামসুল হক

উপন্যাসের চেয়ে বেটার।

ফেরদৌস মাহমুদ

আমাদের উপন্যাসের ক্ষেত্রে এটা না হওয়ার কারণটা আসলে কী, ব্যর্থতাটার কারণই-বা কী ছিল?

সৈয়দ শামসুল হক

কারণ একাধিক। গল্প বলাটা তো মানুষের জন্য নতুন নয়। কিন্তু আমরা উপন্যাসের ভঙ্গিটা নিয়েছি ইউরোপ থেকে। কিন্তু তার আগেও তো আমাদের এখানে গল্প বলা হতো। আমরা কিন্তু সেদিকটায় তাকাই নি। কিন্তু কবিতায় আমরা সরে এসেছি। এমনকি শামসুর রাহমান যে টেলেমেকাস, ভেনাস, আগামেমনন করেছেন তোমরা কেউ করছ না। তোমাদের কথা কী বলব, আমিই করি নি তার সমসাময়িক হয়েও। উপন্যাস সে জায়গা থেকে সরে আসে নি। তাও বলতে গেলে ঊনবিংশ শতাব্দীর ইংরেজি উপন্যাস, ফরাসি উপন্যাসের আদলে বাংলা উপন্যাস লেখা হয়েছে।

রহমান হেনরী

ওদের উপন্যাসও তো অনেকখানি সরে অন্যদিকে যাচ্ছে। ওদের ট্র্যাডিশনাল উপন্যাস যেটা সেটার মতোই আমাদের এখানে হচ্ছে।

সৈয়দ শামসুল হক

সেদিক থেকে নাবালক বলেছি। আঙ্গিক উপস্থাপনার দিক থেকে নাবালক বলেছি। আঙ্গিক উপস্থাপনা নাবালক হয়েছে, প্রথম কথা হচ্ছে আমরা বিগত শতাব্দীর ইউরোপীয় উপন্যাসের মডেলটাকে এখনো ধরে রেখেছি। আর হচ্ছে উপন্যাস সম্পর্কে একটা ধারণা আমাদের মধ্যে এখনো কার্যকর রয়েছে, যেটা হওয়া উচিত নয়—গল্প বলাটাই উপন্যাসের মূল কাজ। অথচ উপন্যাসের মূল কাজ কি কেবল গল্প বলাই শুধু?

ফেরদৌস মাহমুদ

না…

সৈয়দ শামসুল হক

তাহলে…

রহমান হেনরী

আমাদের এখানে হয়তো সেভাবে উপন্যাস-লেখক তেমন আবির্ভূতও হন নি।

সৈয়দ শামসুল হক

আবির্ভূত হন নি তা না। তবে খুব কম। কম বলেই সেটা ব্যতিক্রম। সেটা সাধারণ নিয়মে পড়ে নি।


দেশ ত্যাগ করেছে বলে যদি শহীদ বলে এটা আত্মহত্যার শামিল, তাহলে নিজের না লেখাটার একটা রিজন সে নিজের মতো করে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে।


রহমান হেনরী

আমাদের উপন্যাসের রূপ আসলে কী হতে পারত?

সৈয়দ শামসুল হক

এটা বলার চেয়ে, কারো কারো কাজ আমাদের পড়ে দেখতে হবে। ওয়ালীউল্লাহর চাঁদের অমাবস্যা পড়ো, কাঁদো নদী কাঁদো পড়ো।

ফেরদৌস মাহমুদ

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তো এগুলো বেশির ভাগই লিখেছেন দেশের বাইরে থেকে। তিনি তো দীর্ঘদিন মালয়েশিয়ায় ছিলেন, ছিলেন ফ্রান্সে। ওয়ালীউল্লাহকে সামনে রেখেই আমি অন্য একটা কথা বলতে চাই। শহীদ কাদরী একটি সাক্ষাৎকার বলেছেন, ‘লেখকের মাতৃভূমি ত্যাগ করা আত্মহত্যার শামিল।’ আপনিও তো দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলেন সেখানে বসে অনেক কিছুই লিখেছেন…

সৈয়দ শামসুল হক

শহীদ বলেছে তার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে। সেটা তার উপলব্ধি। আমার উপলব্ধি এক নাও হতে পারে। খুব নিষ্ঠুর একটা কথা বলি, মানুষ যখন নিজে উপলব্ধি করে যে ‘আমি ব্যর্থ হয়েছি’ তখন নিজের বাইরে কিছু কারণ শনাক্ত করতে চায়। শহীদের যত কিছু দেওয়ার তা দেশে থাকতেই দিয়েছে। দেশে থাকলেও এর বেশি কী দিত সেটা অনুমান করে কিছু বিচার করা চলে না। রবীন্দ্রনাথ আর পাঁচ বছর বেশি বেঁচে থাকলে কী লিখতেন সেটা নিয়ে গাঁজার আসরে বসা যেতে পারে, সাহিত্য আড্ডায় নয়। তার যতটুকু দেওয়ার দিয়েছেন। সুকান্ত যতটুকু দেওয়ার দিয়েছেন। র‌্যাবো যতটুকু দেওয়ার দিয়েছেন। দেশ ত্যাগ করেছে বলে যদি শহীদ বলে এটা আত্মহত্যার শামিল, তাহলে নিজের না লেখাটার একটা রিজন সে নিজের মতো করে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। দ্যাটস মে বি রাইট অর রং। আমার বলার অধিকার নেই। এটা সে-ই বলবে।

রহমান হেনরী

সেটা ডিফেন্স মেকানিজমও হতে পারে তার…

সৈয়দ শামসুল হক

দেশ ত্যাগ করেন নি এ রকম খারাপ লেখক নেই?

ফেরদৌস মাহমুদ

তা নিশ্চয় আছে। তবে দেশ ত্যাগ করেছেন এমন অনেক বিখ্যাত লেখকও আছেন।

রহমান হেনরী

সৃজনশীল রচনার এমন কোন জায়গাটায় আপনি হাত রাখেন নি, আমরা খুঁজে পেলাম না… এটা নিয়ে আমরা আলাপ করছিলাম কিছুক্ষণ আগে।

জুননু রাইন

আপনার সিনেমার স্ক্রিপ্ট নিয়েও কথা হচ্ছিল …

ফেরদৌস মাহমুদ

জুননু যেহেতু সিনেমার প্রসঙ্গ তুললই, এ কথার সূত্র ধরেই বলি, আপনি তো প্রচুর সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখেছেন, ৩০টির বেশি হবে। আমার প্রশ্ন হলো… যদি লাতিন ফিল্মের কথা বলি, ইতালিয়ান ফিল্মের কথা বলি কিংবা ইরানের ফিল্মের কথা বলি, ওগুলোর বিচারে আমাদের ফিল্মের নিজস্ব ল্যাঙ্গুয়েজটা দাঁড়িয়েছিল কিনা।

সৈয়দ শামসুল হক

আমাদের সময়ে চেষ্টা ছিল, সেই চেষ্টা অফ হয়ে গেছে সত্তর-একাত্তর সালে। আর সে সময় তো আমি ছেড়ে দিয়েছি। চিত্রনাট্য লেখাটা ছিল আমার কাছে কলম থেকে উপার্জনের পথ। একজন পেশাদার লেখক হিসেবে, যেমন ধরো সাহিত্যিক সাংবাদিকতাও করে, সাহিত্যিক অধ্যাপনাও করে, ওটা আমার একটা প্রফেশন ছিল। আমি মনে করি, লেখাটা হচ্ছে সার্বক্ষণিক কাজ। খণ্ডকালীন লেখক, কবি হয় না।

ফেরদৌস মাহমুদ

আপনার একটা গান…  ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস/দম ফুরাইলেই ঠুস/তবু তো ভাই কারুরই নাই/ একটুখানি হুঁশ।’ ঠুসের সাথে হুঁশের মিল দিয়ে যে এমন একটা গান লেখা যেতে পারে, বিষয়টা আমার কাছে খুব অবাক লাগে…

জুননু রাইন

এটা আমার আব্বা গাইত… এখন আমিও গাই…

সৈয়দ শামসুল হক

চিন্তা করো…

রহমান হেনরী

এ গানটি গেয়ে আমি পুরস্কার পেয়েছিলাম…

অনন্ত সুজন

কে গায় নি এই গানটা…

ফেরদৌস মাহমুদ

এই গানটা লেখার প্রেক্ষাপটটা জানতে চাচ্ছিলাম।

সৈয়দ শামসুল হক

এটা একটা সিনেমার গান… সিনেমার নাম ‘বড় ভালো লোক ছিল’।

জুননু রাইন

তখন কি গান লেখা হতো এভাবে, যে কাহিনি এই… এখানে গানটা কী রকম হবে…

সৈয়দ শামসুল হক

গান তো আমি নিজে ওইভাবে লিখতে চাই নি। চিত্রনাট্য লেখার পর গানের জায়গাটায় এখন কে গান লিখবেন তাকে বুঝিয়ে বলা… মহাঝামেলার ব্যাপার। তখন আমি বললাম আচ্ছা আমিই লিখব…

জুননু রাইন

হক ভাই, আর তো কেউ গান লিখল না, পরে কেউ। অবশ্য ফজল শাহাবুদ্দীনও দু-একটা ভালো গান লিখেছেন…

অনন্ত সুজন

পরে অবশ্য ফজল শাহাবুদ্দীন খুব বেশি গান লেখেন নি।

ফেরদৌস মাহমুদ

সিনেমার জন্য গান আবু হেনা মোস্তফা কামাল, মনিরুজ্জমান বা নাসির আহমেদও লিখেছেন। এ সময় এসে মারজুক রাসেল, কামরুজ্জামান কামুরাও গান লিখেছে।

সৈয়দ শামসুল হক

শামসুর রাহমানও লিখেছেন গান। আমারই ছবিতে। ১৯৫৮ সালে যখন আমি ‘মাটির পাহাড়’ সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখি তার সবকটি গানই শামসুর রাহমান লিখেছেন।

ফেরদৌস মাহমুদ

হক ভাই, এবার আপনার স্মৃতিকথা প্রণীত জীবন নিয়ে একটু কথা বলতে চাই। এ বইটি নিয়ে আমি লিখেছিলামও। আপনি ওই বইতে ভূমিকায় লিখেছিলেন… ‘কোনো আত্মজীবনীকেই আমি উপন্যাসের অধিক সত্য বলে মনে করি না।’ আত্মজীবনীকে আপনি উপন্যাস বলছেন, এ বিষয়টা সম্পর্কে যদি বলতেন…

সৈয়দ শামসুল হক

উপন্যাস মানে ওই অর্থে উপন্যাস না। উপন্যাস কী? উপন্যাস হচ্ছে গিয়ে এটা ঘটে নি কিন্তু ঘটতে পারত। যে উপন্যাসটি আমার কাছে ভালো লেগেছে ওটা আমার কাছে বাস্তবের চেয়েও বাস্তব। সম্ভবপর ওটা। মনে করো পদ্মা নদীর মাঝি। মানিক বাবুর পদ্মা নদীর মাঝি যদি পড়ো, তোমার একবারো মনে হবে না যে বানানো কথা। ইট কুড হ্যাভ হ্যাপেনড… তার চেয়েও বড় কথা, এ ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়ে তুমি একটা জীবনের প্রতি একটা দৃষ্টিপাত করার অবকাশ পাচ্ছ। এভাবেও জীবন চলতে পারে, এ ধরনেরও অভিজ্ঞতা হতে পারে। আত্মজীবনীও লোকে সেভাবেই পড়ে, সবটাই যে ধারাবাহিকভাবে এভাবে ঘটেছে আমি সেভাবে নিজের কোনো গল্পও বলি নি।


শুনেছি, অনেক আগে আনন্দবাজারে সাগরময় ঘোষ ‘দেশ’ পত্রিকায় আপনার লেখা ছাপতে চেয়েছিলেন; কিন্তু পরে আর ছাপেন নি।


ফেরদৌস মাহমুদ

আত্মজীবনীতেও কি কল্পনার আশ্রয় থাকতে পারে…

সৈয়দ শামসুল হক

আত্মজীবনীতে কল্পনার আশ্রয়? আত্মজীবনীকে উপন্যাসের অধিক সত্য বলে মনে করি না, উপন্যাস যে রকমের সত্য… দিস ইজ ট্রু, ইট কুড হ্যাভ হ্যাপেনড… কারণ আমরা যখন পেছনে নিজেদের দিকে তাকাই… সব সময় একই রকমের মাপে একই রঙে দেখি না। আমারই এক বন্ধু ছেলেবেলায় একজনকে ভালোবাসতেন, তার সঙ্গে বিয়ে হয় নি। তাকে আমিও চিনতাম। সে তাকে এখন চিন্তা করে যে, কী ফরসা ছিল! আমরা জানি সে মেয়েটি মোটেই ফরসা ছিল না। এটা তার কল্পনা। তার ভাবতে ভালো লাগে মেয়েটি বেশ ছিল, টুকটুকে ফরসা।

সেটাই তার কাছে সত্য। এটা তাকে বলে বোঝানো যাবে না। দ্যাটস হাউ ইটস চেঞ্জেস, দ্য ট্রুথ ইজ নট ইন কালার। বাট দ্যাট হি ওয়াজ ইন লাভ। এটা শুধু তোমাকে একটু ঘনিয়ে তোলার জন্য। তোমাকে একটা সংকেত পাঠানোর জন্য। বেশ ফুটফুটে, টুকটুকে ফরসা, তোমার মনে একটা ছবি তুলল। মেয়েটাকে আমার খুব পছন্দ।

যদি বলত একটা মেয়েকে আমার খুব পছন্দ। চিন্তা করে দ্যাখো, তোমার মনে কিন্তু কোনো কিছুই আসত না। যদি বলি, বেশ টুকটুকে… ফরসা, ফুটফুট করে কথা বলত, দুটো বেণি… আসত… মেয়েটার সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, তাহলে বেশ তথ্যটা পেয়ে যেতে। যদি বলতাম একটা মেয়ে, তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক হয়েছে…

ফেরদৌস মাহমুদ

নাহ্ তাতে কোনো ছবি ভেসে উঠত না।

রহমান হেনরী

জীবনের কোনো এক পর্যায়ে এ রকম, হয়তো খুবই ভালো লাগত। একটা প্রণয় ছিল কিন্তু কোনো কারণে তাকে পাওয়া হলো না—এ রকম কোনো ঘটনা আপনার ব্যক্তিগত জীবনে কখনো ঘটেছে?

সৈয়দ শামসুল হক

আমি চেয়েছি পাই নি, এ রকম ঘটনা হয় নি।

রহমান হেনরী

প্রণয়ে কোনো ব্যর্থতা হয় নি…

সৈয়দ শামসুল হক

প্রণয় বলে কথা না, সবকিছুতেই। আমি যা চেয়েছি তা-ই পেয়েছি, হয়েছি। আমি লেখক হতে চেয়েছি, লেখক হয়েছি। আমি ইতিহাসে এমএ পাস করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চাকরি করি নি।

জুননু রাইন

আবেগটা বেশি হয়ে গেলে সাহিত্যের মেসেজটা স্ট্রং থাকে না। আমাদের সাহিত্যেও এ প্রবণতা আছে। বাংলা সাহিত্যের কৈশোর বলতে কি আপনি এটাকেই বুঝিয়েছেন?

সৈয়দ শামসুল হক

খানিকটা অনুমান তুমি ঠিকই করেছ। আমরা যুক্তির চেয়ে আবেগকে বেশি জায়গা দিয়েছি। আমি একাধিকবার বলেছি, কবিতায় যুক্তির সিঁড়ি হচ্ছে সবচেয়ে স্ট্রং। কবিতার স্ট্রাকচার ইজ ভেরি লজিক্যাল। সেখানেই আমরা, সেটাকে বাদ দিয়ে আবেগ। যার জন্য এখন আমি যেসব কবিতা চারদিকে পড়ি, অধিকাংশ কবিতাই অসম্পূর্ণ কিংবা অতিকথন। এমনকি ইমেজ ক্ল্যাশ করে, তুমি নুন দিয়ে শুরু করেছ গোলাপ দিয়ে শেষ করেছ।

তুমি ‘বনলতা সেন’ দ্যাখো, বনলতা সেনের ইমেজের পারম্পর্য… দ্যাখো… তুমি দেখবে যে একটা কমন ফিল্ম থেকে এসেছে। তুমি রবীন্দ্রনাথের মনে করো , ‘তুমি কি কেবলই ছবি, শুধু পটে লিখা?/ ওই যে সুদূর নিহারিকা…’, নজরুলের ‘বল বীর/ চির উন্নত মম শির’—তার ভেতর দেখবে ইমেজের একটা কনসিসট্যান্সি আছে। এটাই হচ্ছে লজিক, ওয়ান অব দ্য বেসিক লজিক কবিতা হচ্ছে এই। তুমি চুন বলে গোলাপ ফুলে যেতে পারবে না। তুমি চুন বললে পানে যেতে হবে, খয়েরে যেতে হবে…

ফেরদৌস মাহমুদ

শুনেছি, অনেক আগে আনন্দবাজারে সাগরময় ঘোষ ‘দেশ’ পত্রিকায় আপনার লেখা ছাপতে চেয়েছিলেন; কিন্তু পরে আর ছাপেন নি। অথচ দেখা গেছে পরবর্তীকালে ‘দেশ’ আমাদের এখানকার দু-একটা ব্যতিক্রম বাদ দিলে কিছুটা জনপ্রিয় ইমেজের লেখকদের লেখা ছেপেছে। আপনি বিষয়টাকে কিভাবে দেখেন?

সৈয়দ শামসুল হক

এ সমস্যা তো আমার না। এটা ওদের সমস্যা। আমি আমার দেশের সব মানুষের কাছে পৌঁছতে পারি নি। আমার কাজ লেখা। একজন লেখক তার ভাষাভাষী মানুষের জন্য লেখে এবং তার রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে যারা, তাদের জন্য বেসিক্যালি লেখে। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস কলম্বিয়ার মতো একটি ছোট দেশে বসে লিখেছেন। তিনি কি আমার জন্য লিখছেন, যেখানে আজিজ মার্কেটের ছেলেরা পড়বে? তিনি লিখছেন কলম্বিয়ার জন্য। তার লেখার আমরা হচ্ছি উপরি পাওনা।

‘আনন্দবাজার’ আমার লেখা ছাপল কি ছাপল না, ‘দেশ’ আমার লেখা চাইল কি চাইল না, ইট ইজ নট মাই ম্যাটার। আমি চাই আমার দেশের মানুষের কাছে পৌঁছতে, এই বাংলাদেশের মানুষের কাছে পৌঁছতে। আমি বাংলাদেশের লেখক, বাংলা ভাষার লেখক। এর বাইরে বাংলা ভাষাভাষী অন্য যারা আছেন সেটা হচ্ছে আমার উপরি পাওনা। কলকাতায় আমার দু-চারটে বইয়ের এডিশন হয়েছে, কিছু বিক্রি হয়েছে। এখন তারা ডাকে। যাই, বক্তৃতা দিই। কিন্তু এটা আমার মূল কাজ না, আমার মূল কাজ হচ্ছে আমার দেশে।

জুননু রাইন

হক ভাই গত জন্মদিনের অনুভূতিতে আপনি বলেছিলেন, প্রতিদিনই তো জন্ম হচ্ছে, প্রতি মুহূর্তে জন্ম হচ্ছে নিজের ভেতরে নিজের, নতুন জন্ম হচ্ছে নতুন স্বপ্নের মতো করে। এবার অনুভূতি কী হতে পারে?

সৈয়দ শামসুল হক

আমি জন্ম-মৃত্যুর কথা ভাবিই না। সত্যিই তোমাকে বলি… জন্ম এবং মৃত্যু আমার কাছে কোনো ব্যাপারই নয়। জীবন হচ্ছে আমার কাছে ব্যাপার। জীবনটা হচ্ছে : জন্ম আমি চাইও নি, আমার কোনো হাতও ছিল না। আই জাস্ট হ্যাপেনড টু বি আ বয়… আর মৃত্যুও আমার হাতে নেই। মৃত্যু যখন হওয়ার তখন হবে। কিন্তু এর মাঝখানের যে জীবন সেটা আছে। যদি এমনি জাগতিক অর্থে বলো আমি আরো কয়েক বছর সময় চাই। কিছু লেখা আছে সেগুলো লিখতে চাই। আর বেঁচে থাকার মতো আনন্দ আর কিছুতে নেই। আর এ জীবনের পর কী আছে তাও জানি না। কাজেই এ আনন্দটা আরেকটু স্থায়ী হোক।

বেসিক্যালি সকালবেলা, এভরি মর্নিং আই রিমেম্বার মাই মাদার। আমার মা, পৃথিবীতে আমার প্রথম ঠিকানা, তার গর্ভ। এটা হচ্ছে আমার প্রথম বাড়ি। ওইখানে ছিলাম। আমার জন্মদিনে মায়ের কথা খুব মনে করি। তারপর পিতা আছে। এই যে মরে যাওয়া… নিজে কী করেছি, কী অর্জন করলাম এইটা কিছু না।

তারপর খুব আশা করি আমার বন্ধুরা যারা জীবিত ছিলেন তাদের সঙ্গে ফোনে কথা হবে। শামসুর রাহমান ফোন করতেন, শওকত ওসমান ফোন করতেন। এরা নেই; কিন্তু এখন এদের কথা খুব ভাবি। বাবা-মায়ের পরই বন্ধুদের কথা খুব মনে হয়, যারা চলে গেছেন। লিস্ট করেছিলাম, প্রায় ২৬ জনের মতো বন্ধু আমার চলে গেছে। যাদের সঙ্গে একসঙ্গে, মনে করো, প্রায় ১৬ বছর বয়স থেকে থেকেছি।

রহমান হেনরী

সবশেষে আমরা সকলে আপনার দীর্ঘায়ু কামনা করছি।

ফেরদৌস মাহমুদ

ফেরদৌস মাহমুদ

জন্ম ২৩ অক্টোবর, ১৯৭৭, মুলাদী, বরিশাল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। পেশায় সাংবাদিক।

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ :
কবিতা: সাতশো ট্রেন এক যাত্রী[২০০৬], নীল পাগলীর শিস [২০০৯],
ছাতিম গাছের গান [২০১২], আগন্তুকের পাঠশালা [২০১৬]।

জীবনীগ্রন্থ: সত্যজিৎ রায় [২০০৯]।

ছোটদের বই: সন্ধ্যা তারার ঝি (ছড়া ও কবিতা) ২০১৬, রোদসীর পাখি উৎসব (গল্প) ২০১৬।

ইতিহাস: বিশ্বযুদ্ধ [২০১৬]।

ই-মেইল : ferdous.mahmud77@gmail.com
ফেরদৌস মাহমুদ