হোম চিত্রকলা সত্যি কথা নিয়ে ছবি আঁকতে চাইলে ব্যান করে দেবে

সত্যি কথা নিয়ে ছবি আঁকতে চাইলে ব্যান করে দেবে

সত্যি কথা নিয়ে ছবি আঁকতে চাইলে ব্যান করে দেবে
94
0

শাকুর শাহ্, স্বনামধন্য এই চিত্রশিল্পীর সুকৃতি দেশের গণ্ডি ছাড়িয়েছে বহুআগে। ফ্রান্সসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তার চিত্র প্রদর্শনী হয়েছে, ছবি জায়গা পেয়েছে বিভিন্ন জাদুঘরে। ১৯৪৬ সালে বগুড়ায় জন্ম নেয়া শাকুরের পুরো নাম আব্দুস শাকুর শাহ্‌। শিল্পী শাকুর শাহ্‌ নামেই তিনি সমধিক পরিচিত। ছেলেবেলা থেকেই প্রকৃতি তাকে খুব কাছে টানত। সেই ছেলেবেলা থেকেই তিনি প্রকৃতির অপার রহস্য আর রূপ মুগ্ধ হয়ে দেখতেন। তখন প্রতি বছর তাদের গ্রামে মেলা বসত। সেই মেলাতে দূর দূরান্ত থেকে কুমার সম্প্রদায়ের লোকজন নিয়ে আসত নানা রঙের মাটির বাহারি জিনিস। এসব খুব আগ্রহ সহকারে দেখতেন শাকুর শাহ্‌। মূলত সেই রঙের মোহে পড়েই শিল্পী হবার বাসনা জাগে তার মনে। পরস্পরের হয়ে গুণী এই শিল্পীর সাথে কথা বলেছেন কবি বাদল ধারা। সেই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো পাঠকদের জন্য।


বাদল ধারা

আপনি দীর্ঘদিন ধরে ছবি আঁকেন। এই পথচলায় আপনি নিজেকে ক্রমাগত পরিবর্তন করে নিয়েছেন। এখন আপনি থিতু হয়েছেন বাংলার লোকজ ফর্মে। বিশেষত ময়মনসিংহ গীতিকার বিভিন্ন আখ্যান আপনি ক্যানভাসে তুলে আনছেন। কী ভেবে এই পরিবর্তন?

শাকুর শাহ্‌

আমার পরিবর্তনের মূল কথা স্বাধীনতা। বাংলাদেশ স্বাধীন না হলে আশি ভাগ শিল্পী আজ শিল্পী হতে পারত না। এরা হয়তো কোনো কোনো অফিসে যে কোনো ছোটমতো কাজ করত। কবি, সাহিত্যিক, আর্টিস্ট, গায়ক সবার ওপর স্বাধীনতার প্রভাব পড়েছে। নতুন দেশে প্রত্যেকে নতুন কিছু করার চেষ্টা করেছে। স্বাধীনতা ও প্রচেষ্টা পরিবর্তনের মূল কথা।


আমি বুঝতে থাকি দেশ ও দেশের ঐতিহ্যকে ধারণ করে একজন মানুষকে বৈশ্বিক হতে হয়।


বাদল ধারা

১৯৭০ থেকে ১৯৭৪ আপনার বাঁক বদলের প্রথম পর্যায়…

শাকুর শাহ্‌

যুদ্ধ শেষে আমি সিলেট রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজে শিক্ষকতায় ফিরে যাই এবং আবারও ছবি আঁকা শুরু করি। তখনকার আমার ছবিগুলো ছিল সিলেটের ল্যান্ডস্কেপ, চাবাগানের শ্রমিক ও কিছু বিমূর্তধারার ছবি। চুয়াত্তর সালে চট্টগ্রাম চারুকলায় আমার উচ্চতর ডিগ্রির প্রথম পর্বের বিষয় ছিল মুক্তিযুদ্ধ ও প্রতিরোধ। আমার ভেতর একধরনের প্রতিশোধ স্পৃহা কাজ করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টা দুর্ধর্ষ ব্যাপার, মুক্তিযোদ্ধারা সাধারণ ছিল না, তারা অন্যরকম ছিল। তাই আমার অনেক ফিগারের মাথায় শিং হাতে বর্শা ও তলোয়ার। সেই সময়ের পেইন্টার রশীদ চৌধুরী সেই সব ছবি দেখে বলেছিল :

তোমার ছবিগুলো আনকমন টাইপের, তুমি যদি কন্টিনিউ করতে পারো তাহলে আনকমন ধারার কিছু হবে।

যাই হোক, মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষের যে কষ্ট, চোখে যে দৃষ্টি, চেহারায় যে মৃত্যুভয়—এই সব আমি নিয়েছিলাম আমার ছবির উপকরণ হিশেবে। তাই তখন আমার ছবির রং অ্যাশ ও কালো হয়ে উঠল।

বাদল ধারা

১৯৭৬-এ আপনি ভারতের বারোদায় বৃত্তি নিয়ে পোস্ট ডিপ্লোমা করতে চলে গেলেন। সেখানে আপনি শিক্ষক হিশেবে পেলেন কে জি সুব্রামনিয়ামকে। তার সান্নিধ্য কেমন ছিল? ছবি আঁকার নতুন কোনো দিশা পেলেন কিনা সে-সময়?

শাকুর শাহ্‌

বারোদায় আমি ওখানকার চারুকলার বিষয়গুলো রপ্ত করার চেষ্টা করি। তখন আমার শিক্ষক কে জি সুব্রমনিয়াম আমাকে বললেন, ‘তুমি যেহেতু বাংলাদেশি, বাংলাদেশ সম্পর্কিত বিষয়গুলো তুমি আগে ঠিক করো। তুমি কী আঁকবে আগে সেটা নির্ণয় করো। আর সব সময় সহজ করে আঁকবে, ছবিতে অল্প রং ব্যবহার করবে, সব রং ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই।’

বাংলাদেশে ফিরে এসে আমার মাঝে কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করতে থাকে। আমি কি বাংলাদেশের দুঃখ কষ্ট নিয়ে ছবি আঁকব নাকি অ্যাবস্ট্রাক্ট? পরে আস্তে আস্তে আমি অ্যাবস্ট্রাক্ট আঁকা বন্ধ করে দেই। বাকশাল ও পরে এরশাদের স্বৈরশাসন আমাকে কষ্ট দিতে থাকে। দেশ থেকে কলেরা-ম্যালেরিয়া গেল কিন্তু মানুষের দুঃখ গেল না। আমি আবার দেশ নিয়ে ভাবতে লাগলাম। তখন আমার ছবির রং হয়ে উঠল শাদা-কালো-অ্যাশ।

বাদল ধারা

অ্যাবস্ট্রাক্ট বন্ধ করলেন কেন? এটা কি বাংলাদেশের ফর্ম নয়, নাকি আপনার চিন্তাধারায় কোনো বদল এল? আপনার সমসাময়িক অনেক শিল্পী অ্যাবস্ট্রাক্ট এঁকেই কিন্তু এখন জগদ্বিখ্যাত…

শাকুর শাহ্‌

তোমার প্রশ্নটা খুবই সেনসেটিভ। জয়নুল আবেদীন স্যারের কথা মনে পড়ে গেল। একদিন তার বন্ধুরা পানাহার করছে। সে-সময় তাকে বিমূর্ত ছবি নিয়ে কিছু বলতে বলা হলো। আবেদীন স্যার বললেন, বাঁশ চিনো? বাঁশ কত রকমের? তারা বলল বাঁশ অনেক রকমের। আবেদীন স্যার বলল, না বাঁশ দুই রকমের। এক ধরনের বাঁশ মাটি থেকে সোজা হয়ে উপরে ওঠে যায়। আর আরেক ধরনের বাঁশ গোড়া থেকে অনেক ডালপালা নিয়ে বের হয়, আউলা-ঝাউলা ধরনের। এই আউলা-ঝাউলা বাঁশই বিমূর্ত। কে জি সুব্রামনিয়াম বলতেন, দুই ভাবে ছবি আঁকতে পারো। একটা জেনে বুঝে কষ্ট করে আর একটা আন্দাজে ক্যানভাসে রং ছিটিয়ে। আন্দাজে রং ছিপানোর বিষয়টা বিমূর্ত। আমি বুঝতে থাকি দেশ ও দেশের ঐতিহ্যকে ধারণ করে একজন মানুষকে বৈশ্বিক হতে হয়।


সারা বিশ্বের ট্রাডিশনাল আর্টের মধ্যে কিছু না কিছু মিল থাকে।


বাদল ধারা

১৯৯০-এর দিকে আপনার ছবির আমূল পাল্টে যেতে দেখি। বিশেষত আপনার জাপানে পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবি ‘ট্রাডিশন’ যেটি জলরঙে একটা ময়ূরের ছবি, সেটি পুরস্কৃত হওয়ার পর। ঐ ছবিতে পুঁথির হরফে লেখা, একতারা, অচিন পাখি ইত্যাদি ছিল, সেখান থেকে আপনি ধীরে ধীরে ময়মনসিংহ গীতিকার চরিত্রের দিকে ধাবিত হলেন। শেষ পর্যন্ত কী ভেবে আপনি এই ফর্মে থিতু হলেন?



 

শাকুর শাহ্‌

জাপানিরা লোকজ ঐতিহ্যের প্রতি সচেতন। লোকজ ঐতিহ্যকে ওরা খুব গুরুত্ব দেয়। বিমূর্ত খুব চূড়ান্ত জায়গা যা জার্মানির স্টাইল। আমি ট্রেডিশন ছবির থিম নেই আমাদের শীতলপাটি থেকে। একটা ময়ূরের ওপর আরেকটি বাচ্চা ময়ূর। ট্রাডিশন ছবিটার আকৃতি ছিল ৬ X ৮ ইঞ্চি। ২২ হাজার ছবি থেকে আমার এই ছবিটা নির্বাচিত হয়। আমি পরে আয়োজক কমিটির একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম—কী কারণে তারা আমার ছবিটা নির্বাচন করল? উনি আমাকে বললেন : এই ছবিটাতে তোমার দেশকে খুঁজে পাওয়া যায়। এরপর থেকে আমি ঐতিহ্যের দিকে ফিরতে থাকি। ময়মনসিংহ গীতিকার দিকে ধাবিত হতে থাকি।

বাদল ধারা

আমরা আফ্রিকার পপুলার আর্ট বিশেষত কঙ্গোর শ্যারি সাম্বা ও শ্যারি সেরেইনের ছবিতে এমন ছবির সাথে টেক্সেটের মিশেল দেখি, সেই টেক্সট ফ্রেঞ্চ-এ লেখা। ফরাসি ভাষার তবু একটা বিশ্বব্যাপী জানাশোনা আছে, অনেকে সেটা জানেন, বোঝার চেষ্টা করেন, কিন্তু আপনি যখন বাংলা হরফ সেটা আবার পুঁতিতে লেখার ফন্টে বাংলা, সেটা যখন ক্যানভাসে তুলে দেন বিদেশিদের কাছে একটা দূরত্ব তৈরি করে কিনা?

শাকুর শাহ্‌

সারা বিশ্বের ট্রাডিশনাল আর্টের মধ্যে কিছু না কিছু মিল থাকে। বিশেষত ভারতীয় ট্রাডিশনাল ছবিগুলোতে ডট বা বিন্দুর প্রয়োগ প্রাচীনকাল থেকে দেখা যায়। এই ডটের ব্যবহার আফ্রিকাতেও দেখা যায় এবং অস্ট্রেলিয়াতেও। সত্যিকার লোকজ ছবিগুলোতে ধর্মীয় বিষয়টি, বিশ্বাস ও মিথের প্রয়োগ দেখা যায়। এসব ছবি সহজ সরলভাবে আঁকা। তাই একটা মিল দেখা যায়।


বিদেশি ক্রিটিকদের সমালোচনাও ছবি বিক্রি করতে সহায়তা করে।


বাদল ধারা

আমরা আফ্রিকান আর্টিস্টদের দেখি, তারা অনেক বেশি রাজনৈতিক। শ্যারি সাম্বা যেমন নিজস্ব ফর্মে কোয়ালিটিকে তুলে ধরছে, হাড়জিরজির পেটমোটা মানুষ, গুরু, নিতম্বিনী নারীর ছবি আঁকছেন—সেই একই হাতে কনটেম্পরারি ওয়ার্ল্ড পলেটিক্সকেও ক্যানভাসে তুলে ধরছেন, যেখানে ওবামা, পুতিন, নাইন ইলেভেন, সন্ত্রাসবাদ সবকিছুই থাকছে—ফিগারগুলো শুধু তার মতো করে আঁকা, দেখার চোখটা শুধু একজন আফ্রিকানের। আপনার সে-রকম কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য আমরা ছবিতে দেখি না—এটা কেন?

শাকুর শাহ্‌

ঐ ধরনের পেইন্টাররা সমাজ সচেতন। আর আমাদের দেশের সমাজ সচেতনরা কিছু কার্টুন করে। ওদের যারা কনটেম্পরারি পলিটিক্স নিয়ে কাজ করছে তারা কিন্তু দেশের বাইরের অনুসঙ্গকে আঁকছে। যেমন ওবামা ওর দেশের কিছু না, তাই ও আঁকতে পারছে। আমাদের দেশে পলিটিক্যাল ছবিতে কেউ আগ্রহী নয়। কিংবা আমার দেশে সত্যি কথা নিয়ে ছবি আঁকতে চাইলে আঁকতে পারবে না; ব্যান করে দেবে।

বাদল ধারা

সে-কারণেই কি আপনার রাজনৈতিক কোনো ছবি নাই?

শাকুর শাহ্‌

একদম তাই। এটা শুরু হয়েছে পাকিস্তান আমল থেকে। স্টিল এখন পর্যন্ত। কেউ যদি আঁকেও সেটা প্রদর্শন করে না। ইন্ডিয়াতে ফিদা হোসেইন কিছু করেছিল, সেটা নিয়ে অনেক কিছু হয়েছে। একেক দেশের মানুষ বিষয়টাকে একেকভাবে নেয়। আমাদের দেশের ছবি আঁকতে আসা লোকেরা অল্প জানা। সেই দিক দিয়ে একটা লিমিটেশন আছে কিংবা নিজেদের অনুসন্ধান করার প্রবণতাও কম দেখা যায়।

বাদল ধারা

আমাদের ছবির বিশ্ব বাজার নিয়ে একটা কথা বলতে চাই। আমরা একজন আফ্রিকান বা লাতিন বা ভারতীয় আর্টিস্টের ছবির কদর বিশ্ববাজারে দেখি, সেখানে আমরা অনেক উপেক্ষিত। এটা কেন?

শাকুর শাহ্‌

বর্তমান বিশ্বে সব জায়গায় এখন ছবির বাজার মন্দা। শিল্পীরা বেশির ভাগ তাদের মনের তাগিদে ছবি আঁকেন। বিক্রি যেটা আমাদের এখানে হয়, ৮৬তে যখন গার্মেন্টস শিল্পটা গড়ে ওঠে তখন থেকে ২০০২ পর্যন্ত তখন বিদেশ থেকে কিছু বায়ার আসত, তারা কিনত। বাংলাদেশে আর লোকাল বায়ার কত হবে? ১%-ও না। তাছাড়া আমাদের ছবির বাজারজাতের তেমন কোনো ভালো ব্যবস্থা নাই। ভারতীয় আর্টিস্টদের ছবি চলার কারণ হলো ওদের কিছু ধনী লোক আছে যারা ইউরোপ আমেরিকাতে থাকে, সুতরাং বাইরে তাদের ছবি বিক্রি হওয়ায় ওদের প্রচার-প্রসার ভালো। যতদিন পর্যন্ত তুমি বাইরে ছবি বিক্রি করতে পারবা না ততদিন তোমার ছবির মূল্যায়ন হবে না। বিদেশি ক্রিটিকদের সমালোচনাও ছবি বিক্রি করতে সহায়তা করে। আর আমাদের লোকাল ক্রেতারা ফেক। তারা ছবি সম্বন্ধে তেমন কিছু বোঝে না। কিনতে হলে কিনল এবং বাথরুমে নয়ে ঝুলিয়ে রাখল। হয়তো কিছুদিন পর দেখা গেল স্টোররুমে রেখে আসলো। তাই ইন্টারন্যাশনাল বাজার ধরাটা জরুরি। আমেরিকার এক ছেলে ড্রাগ অ্যাডিক্টেড, মাত্র ২৫ বছর বেঁচেছে, ২০ বছর বয়স থেকে মাত্র ৫ বছর ছবি এঁকেছে। ওর যা মনে চেয়েছে তাই এঁকেছে। এখন বর্তমানে পিকাসোর পর ওর ছবির দাম বেশি। ওকে দ্বিতীয় পিকাসো বলা হচ্ছে। এর পেছনে কারণ কী? ঐ বাজারজাতকরণ। আমেরিকা এখন ওকে নিয়ে বিজনেস করছে। তুমি দেখ, আমাদের দেশের সৈয়দ শামসুল হকের মতো বড় একজন ক্রিয়েটিভ লোক সেও ইন্টারন্যাশনালভাবে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে নাই। কিংবা কবি শামসুর রাহমানের কথা ধরো।

বাদল ধারা

তাহলে আপনি বলতে চাইছেন আর্ট মার্কেট কালচারাল মাফিয়াদের হাতে চলে গেছে?

শাকুর শাহ্‌

ঠিক তাই।

বাদল ধারা

সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

শাকুর শাহ্‌

আপনাদেরও ধন্যবাদ।


বাদল ধারা

জন্ম ১৮ মে, ১৯৮৫।

শিক্ষা মাধ্যম : বিজ্ঞান ও সাহিত্য, ফটোগ্রাফি।

প্রকাশিতব্য বই :
‘শূন্যতার সার্কেল’ [একুশে বইমেলা ২০১৭, প্রকাশনী জেব্রাক্রসিং।]

ই-মেইল : poeticdhara@gmail.com