হোম সাক্ষাৎকার শিমূল ইউসুফের সাথে আড্ডা

শিমূল ইউসুফের সাথে আড্ডা

শিমূল ইউসুফের সাথে আড্ডা
1.92K
0

এখনও তারা নাট্যকর্মী হয়ে ওঠেন নি। সবে নাটকের পাঠ নিতে এসেছেন কর্মশালায়—নাটক নিয়ে তাদের বুক-ভরা স্বপ্ন। মনে অনেক প্রশ্ন। তাদের সামনে চেয়ারে বসে আছেন শিমূল ইউসুফ। তিনি কথা বলবেন। নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন যাকে উপাধি দিয়ে বলেছিলেন ‘একালের মঞ্চকুসুম’। শিমূল ইউসুফ ঢাকা থিয়েটারের সাথে যুক্ত।

ভিশন থিয়েটার আয়োজিত নাট্য কর্মশালায় ২০১২ সালের ১০ জুলাই বিজয়নগরে ‘মূক ও বধির’ বিদ্যালয়ের একটি ভাড়া করা মহড়াকক্ষে নবীন নাট্যকর্মীরা সকলেই তখন তার সামনে কার্পেটে বসা, উত্তেজনায় অস্থির। ভয়-ভয় শ্রদ্ধা নিয়ে তাকিয়ে আছে। এই পরিবেশেই আলাপচারিতার শুরু। শিমূল আপা বললেন, আপনারা প্রশ্ন করুন, আমি প্রশ্ন ভালোবাসি—এভাবেই আমরা কথা বলব। শুরু হলো অভিজ্ঞতা বিনিময়। শিমূল আপাও মন খুলে কথা বলছিলেন।

অল্প সময়ের মধ্যে সবাই কী করে যেন তার কাছে ‘তুমি’ হয়ে গেল, শিমূল ইউসুফ নিজেও অবাক। সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টায় শুরু। দেড় ঘণ্টা বাদে টি-ব্রেক, সবাই ভুলে গেল তার কথা। কী করে যেন তিন ঘণ্টা পার। সরাসরি তাত্ত্বিক বুলি তিনি কপচান নি। কথার মধ্যে তত্ত্ব এবং অভিজ্ঞতাগুলো রঙ-বেরঙ-এর কুসুম হয়ে ফুটছিল। এই সান্ধ্য আড্ডা অবিস্মরণীয়।

– শেখ ফিরোজ আহমদ

প্রশ্নকর্তা

টিভি মিডিয়াতে আপনাকে দেখা যায় না কেন?

শিমূল ইউসুফ

টিভি মিডিয়ায় অভিনয় করতে ভালো লাগে না। আগে থেকে দৃশ্য ধারণ করা হয়, বারবার টেক করা হয়। তারপর দেখানো হয়। লাইভ পারফরমেন্সে একজন পারফরমার কতটুকু কন্ট্রিবিউট করতে পারবে এটাই থাকে লক্ষ্য। একে বলা যায় অন স্টেজ পারফরমেন্স। এটা একটা ডিসিপ্লিন—এখানে একাগ্রতা থাকতে হয়। তবে গান হলে আমি টিভিতে করি।

প্রশ্নকর্তা

নাটক শেখার জন্য দেশি-বিদেশি কিছু বইয়ের নাম বলুন।

শিমূল ইউসুফ

বই পড়ে আমি অভিনয় শিখি নি। আমার চর্চার ভেতর দিয়ে আমি নিজেকে বের করে নিয়ে আসি। অভিনয়ের ক্ষেত্রে স্তানিস্লাভস্কি বা পিটার ব্রুকের বই হয়তো সাহায্য করে। তোমরা জানার জন্য নাটকের বই পড়ো।

সেলিম আল দীনের নাট্য অভিধান পড়লে উচ্চারণ এবং অনেক শব্দ জানা যায়। দু’বাংলা মিলিয়ে নাট্যভাষার ওপর এটিই একমাত্র বই। আমি সব সময় অভিধান ঘাঁটি। নতুন নতুন শব্দার্থ জানা বোঝার জন্য, আমার অভিনয়ে প্রয়োগ করার জন্য—স্টেজে আমার অভিনয়কে মূর্ত করার জন্য। ভালো অভিনয়ের জন্য এটা করতেই হবে।

তোমরা কিছু মনে ক’রো না, আমার কথার মধ্যে সেলিম আল দীন অনেকবার এসে যাবে। আমরা তাকে অনেক প্রশ্ন করতাম এটা কী, ওটা কী। উনি বলতেন, ‘তোরা অভিধান দেখিস না কেন!’ অভিনয়ের ব্যাপারটাই শব্দের অর্থ বোঝার। আমার বাংলা সাহিত্য, উপন্যাস পড়া আছে ছোটবেলা থেকেই। আমার নিজের ভাষার ওপর যদি দক্ষতা না থাকে তাহলে অন্যের ভাষা আমি কী করে বুঝব!


তখন এরিয়ালের একটা ডায়ালগ ছিল ‘জাহাজ ডুবির ঘটনা কী বল?’ ওমা, সে ডায়ালগ ভুলে গেছে


প্রশ্নকর্তা

ভালো অভিনয়ের জন্য গ্রুপ ও পারফরমারের করণীয় কী?

শিমূল ইউসুফ

পুরোটাই ডিসিপ্লিনের ব্যাপার। রিহার্সাল পারফরমারের জন্য বড় জায়গা। সময়ানুবর্তী হতে হবে। অন্যের সাথে ডায়ালগ থাকলে আগে থেকেই পারস্পরিক সম্পর্কগুলোকে খুব মজবুত করতে হবে। যেদিন আমার পারফরমেন্স থাকে সেদিন আমি কথা কম বলি—ফোন করি না। সরে গিয়ে অন্য কাজ করলে মনঃসংযোগ নষ্ট হয়। রিহার্সাল রুমে প্রবেশমাত্রই আমি নাটকে ঢুকে যাই—এজন্য কনসেন্ট্রেশন খুব দরকার। মঞ্চে ঢোকার মুহূর্তে অবশ্যই শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। মানসিক, দৈহিক একাগ্রতা থেকে শুরু করে সব কিছুতেই মেডিটেশনের মাধ্যমে গভীর মনোযোগ তৈরি করতে হবে।

কারো কারো পারফরমেন্সের সময় এমনও হয় যে, সে শব্দ বা সংলাপ ভুলে যায়। যেটা অন্যের জন্য ‘কিউ’ ছিল। ‘কিউ’ হারিয়ে যায়, লাইভ পারফরমেন্সে এটা হবেই। মঞ্চেই এটা রিকভার করতে হবে। একটা গল্প বলি টেম্পেস্ট নিয়ে। আমরা টেম্পেস্ট রোমে নিয়ে যাই, এই তো কিছু দিন আগে। একজন ‘প্রসপারো করছিল, আমি করছিলাম ‘এরিয়াল’-এর চরিত্র। সব রকমের আধুনিক সুবিধা সম্বলিত বড় হল দর্শকে পরিপূর্ণ। প্রসপারো খানিকটা নার্ভাস হয়ে পড়ল। আমি এরিয়াল, ঘূর্ণি নাচন নিয়ে যখন মঞ্চে ঢুকলাম তখন এরিয়ালের একটা ডায়ালগ ছিল ‘জাহাজ ডুবির ঘটনা কী বল?’ ওমা, সে ডায়ালগ ভুলে গেছে, ওটা ছিল আমার ‘কিউ’। ‘কিউ’ না পেয়ে আমি তো জাহাজ ডুবি বর্ণনা করতে পারছিলাম না। আমি কিউ-র আশায় নেচেই চলছিলাম আর ইম্প্রোভাইজ করছিলাম ‘প্রভু, কি জানতে চান, বলুন’। সে ‘কিউ’ দিচ্ছে না। এক সময় পিছন থেকে সে হঠাৎ বলে ফেলল ‘শাবাশ এরিয়াল’। মুখ ফসকে বেরিয়ে এসেছে কথাটা। আমি পরম আকাঙ্ক্ষিত কিউটা ধরে নিলাম, রিপ্লাই করলাম। ওর চোখ দিয়ে পানি পড়তে শুরু করল—বুঝল কত বড় মিসটেক করেছে। মঞ্চের অভিজ্ঞতা আমার এরকমই। পরের দিনও টেম্পেস্টের শো। রাতে তার সাথে বারবার রিহার্সাল করতে হয়েছে। পরদিনের শো-ও খুবই ভালো হয়েছে।

আমার অভিজ্ঞতা থেকে তোমাদের জন্য বলছি—মঞ্চে ঢোকার আগে কোআর্টিস্টের সাথে সম্পর্ক গড়ে নিতে হয়। বেইলি রোডে মহিলা সমিতির মঞ্চে আমাদের ঢাকা থিয়েটারের শো-র আগে গ্রিন রুমে যার সাথে যার ডায়ালগ ছিল আমরা দুজন দুজন করে রিহার্সাল করতাম, আস্তে আস্তে সংলাপ আওড়াতাম। আমি এটা বেশি করেছি আসাদের সাথে (রাইসুল ইসলাম আসাদ)। তোমরা যার সাথে যার ডায়ালগ আছে আওড়াবে। দেখবে পুরো গ্রিন রুমে গুঞ্জন ওঠবে—সবাই নাটকের মধ্যে ঢুকে থাকবে। শো ভালো হবে। অনেক কিছু অন স্টেজ রিকভার করতে হয়। মজা আছে। দর্শকের উষ্ণতা, নিশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ পাওয়া যায়, তাদের হাসি কান্নার শব্দ শুনতে পাই। টেলিভিশন নাটকে এটা পাই নি। মঞ্চের এই জিনিসটাই আমাকে টানে।

প্রশ্নকর্তা

নাটকে নৃত্যের ব্যবহার সম্পর্কে বলুন।

শিমূল ইউসুফ

এটা আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য। ধর্মীয় অনুষ্ঠান, পূজা-পার্বণ সব কিছুতেই নাচ আছে। মহররম, গাজীর গান, পদ্মার নাচন সব কিছুতেই এটা আছে। যেহেতু ঢাকা থিয়েটার অন্য আঙ্গিকে কাজ করে। আমরা জাতীয় নাট্য আঙ্গিকের সন্ধানে আছি। তিরিশ বছরের বেশি সময় থেকে আমরা আমাদের দেশের প্রচলিত ফর্মগুলো কালেকশন করতে শুরু করেছি। ফর্মগুলি যদি আধুনিকায়ন করে মঞ্চে আনি তাতে অসুবিধা কী। এজন্য গ্রাম থিয়েটার থেকে আমরা শিখছি। সেলিম আল দীন, নাসির উদ্দিন ইউসুফ আমাদের সঙ্গে নিয়ে যেতেন। ওরা যখন পদ্মার নাচন, গাজীর নাচ নাচতেন তখন নাসির উদ্দিন ইউসুফ বলতেন—‘তোরা ওঠ, কর।’ আমরা এভাবে করতে করতে শিখেছি।

প্রশ্নকর্তা

অভিনয়-দক্ষতা তৈরির পদ্ধতি সম্পর্কে কিছু বলুন?

শিমূল ইউসুফ

নির্ভর করছে রিহার্সালের ওপর। রিহার্সাল রুম হচ্ছে নিজেকে তৈরি করার জায়গা। এখানে নিজেকে ভেঙে গড়ে ঠিক করা হয়। অন্যকে জিজ্ঞেস করা যায়, বল তো ঠিক হচ্ছে কিনা? জেনারেশন বাই জেনারেশন টেস্ট চেঞ্জ হয়—তাদের মতামত নেয়া যায়। আমি আমাদের দলের ছোট-বড় যারাই কাজ করছে তাদের কাছেও জিজ্ঞেস করি। এতে তারা ভাবে শিমূল আপা যখন বলছে, দেখি তাহলে। এটা হয়তো তাদেরও কাজে লাগবে।

আমি দলীয় প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠেছি। সবার সাহায্য সহযোগিতায় এসেছি। নাটকে যতগুলো চরিত্র আছে অভিনয়ের আগে প্রত্যেকটা চরিত্র অ্যানালিসিস করি, ভালো অভিনয়ের জন্যে এটা করা দরকার। পরবর্তীতে ডিরেক্টর যখন আমার চরিত্র বিশ্লেষণ করে দেন তখন আমার কাজটা করতে খুব সুবিধা হয়।

রিহার্সাল রুমে আমি আমার পারফরমেন্স পালিশ করব, ডেভেলপ করব—নির্ভর করছে কতগুলো পারফরমেন্স করেছি তার ওপর। প্রতিটি পারফরমেন্সেই আলাদা হয় ইম্প্রোভাইজেশনের মাধ্যমে। বিনোদিনী-র একশ তিনটা একক অভিনয় করেছি—প্রথম দিকে সংলাপ মুখস্থ করেছিলাম। ওই ভাষা আমার পরিচিত ছিল না। সেটা ছিল এক জনের ডায়েরির ভাষা। এগুলো প্রাত্যহিক জীবনে আমরা বলি না। প্রথম দিকে অভিনয়ের সময় একটা শব্দ মিস করলেই পরে কী বলব তা হাতড়াতাম। এখন আমি বিনোদিনীকে বুঝতে শিখেছি—জানি তার সুখ, দুঃখ। তিনি কিভাবে লাঞ্ছিত হয়েছেন, ওগুলো আমার ব্যক্তিগত জীবনের অংশ হয়ে গেছে, আমি ক্যারি করি। এখন আমিই বিনোদিনী।


মঞ্চে অভিনয়ের জন্য এক ধরনের শৃঙ্খলা লাগে—নিজের জীবনে, অভ্যাসে, সময় মতো আসা, বদভ্যাস ত্যাগ করা—এ ধরনের।


প্রশ্নকর্তা

ভালো অভিনয়ের স্বার্থে একজন অভিনেতার জন্য কোনটা বেশি জরুরি?

শিমূল ইউসুফ

স্টেজের জন্য ফিজিক্যাল ফিটনেস সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। আর জীবনে আমি যেটা বেশি চেষ্টা করি শাদামাটা জীবন যাপন করতে। যেটা গোছালো জীবন। মঞ্চে অভিনয়ের জন্য এক ধরনের শৃঙ্খলা লাগে—নিজের জীবনে, অভ্যাসে, সময় মতো আসা, বদভ্যাস ত্যাগ করা—এ ধরনের। আমার বয়স এখন পঞ্চান্ন প্লাস। আমি এখনও অভিনয় করছি, হয়তো কিছু দিন পরে ছাড়ব। তখন কী করব জানি না। হয়তো পাগল হয়ে যাব। নিজের মধ্যে শৃঙ্খলা তৈরি করা একজন পারফরমারের দায়িত্ব। স্বাধীনতার অন্যতম ফসল মঞ্চনাটক। আমরা মঞ্চকে সমৃদ্ধ করব। বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে নিয়ে যাব।

প্রশ্নকর্তা

আপনি কিভাবে ‘মঞ্চকুসুম’ হলেন?

শিমূল ইউসুফ

‘মঞ্চ কুসুম’! এটি  আসলে আমাকে স্বয়ং সেলিম আল দীন দিয়েছেন। তিনি আমাকে ‘চাকা’ নাটকটি—‘একালের মঞ্চকুসুম’—এই বলে উৎসর্গ করেছিলেন। সেই থেকে আমার নামের আগে ‘মঞ্চকুসুম’ জুড়ে গেছে। এগুলো নিয়ে আমার মধ্যে তেমন প্রতিক্রিয়া হয় না। আমি কাজের মধ্যে আছি, থাকি। কাজের মধ্যে আছি বলেই আমরা নাটকের লোক।

প্রশ্নকর্তা

স্ট্যামিনা বাড়ানোর উপায় কী?

শিমূল ইউসুফ

আমি সুইমিং করি। কেউ সাঁতার না জানলে শিখতে ৭ দিন লাগে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুইমিংপুলে খুব সহজে সাঁতার শেখা যায়। স্টেডিয়ামে মোশাররফ ভাইয়ের ওখানে ন্যূনতম খরচে সুইমিং করা যায়। আর না হলে যাদের সুযোগ আছে তারা পুকুরে সাঁতার শিখবে। প্রথম কয় দিন মাথা ব্যথা, ঠান্ডা লাগা, বুক ব্যথা থাকবে। এক মাস পর দেখবে শরীর কত হালকা লাগবে। সুইমিং-এ পা থেকে হাতের নখ পর্যন্ত মুভ করে। আমি প্রতি দিন দুই ঘণ্টা সুইমিং করি।

প্রশ্নকর্তা

মঞ্চে এলেন কিভাবে?

শিমূল ইউসুফ

আমি মঞ্চে আসতে চাই নি। আমি সিংগার—ছোটবেলা থেকেই ক্লাসিক্যাল গান শিখেছি। আামার মঞ্চে আসাটা হঠাৎ করে। আমার দুই ভাই এবং মিনু হক (নৃত্যশিল্পী) তখন ঢাকা থিয়েটারের সাথে যুক্ত হয়েছে। ’৭৪-এ ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামে প্রথম বিদায় মোনালিসা-র মঞ্চায়ন হবে। নাটকের জন্য নির্ধারিত প্রধান চরিত্রটি আগের দিন জানিয়ে দিলেন যে, ফ্যামিলি তাকে চট্টগ্রাম যেতে দেবে না। ঢাকা থিয়েটারের তখন বেকায়দা অবস্থা। কাকতালীয়ভাবে আমি তখন ছুটিতে এসেছি। পড়তাম ভারতের বরোদা চারুকলায়। এর আগে ঢাকায় আর্ট কলেজের ছেলেমেয়েরা বিদায় মোনালিসা-র অভিনয় করে, আমিও ছিলাম। আফজাল (আফজাল হোসেন) আমার দু’বছরের সিনিয়র। আমাকে ধরল—তুমি শো-টা করেছ, চট্টগ্রামে চলো। ওখানে ওরা টিকিট বিক্রি করেছে। মাত্র দুইটা শো। প্লিজ, উদ্ধার করো। সেই থেকে আমি ঢাকা থিয়েটারের সাথে যুক্ত হলাম।

এদিকে আমার ছুটি শেষ। আমি ভারতে ফিরব। আমি কচিকাঁচা করে বড় হয়েছি। মা আমাকে যেতে দিলেন না। নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু  দু’দিন পর স্ক্রিপ্ট দিল মুনতাসীর ফ্যান্টাসি-র। বলল, একটু পড়ে দেখ তো কী সুর করা যায়। আমি ফাঁসলাম। দেখলাম এটাই আমার জায়গা। সেই থেকে আমি ঢাকা থিয়েটারে। ঢাকা থিয়েটারের প্রত্যেকটা সদস্য মুক্তিযোদ্ধা। তাই এখানে আমি অসম্ভব স্বস্তি পাই।

প্রশ্নকর্তা

আপা, ব্যক্তিগত বিষয়ে একটা প্রশ্ন—আপনাদের বিয়ে হলো কিভাবে?

শিমূল ইউসুফ

এগুলো আগে কাউকে বলি নি। তোমাদেরকে মজা করে বলছি কিন্তু। আমরা তখন তুই-তোকারি করতাম। একদিন বললাম, আমি তোকেই বিয়ে করব, আর কাউকে করব না। বাচ্চু ৩/৪ মাস ভাবার জন্য সময় নেয়। ও আসলে ঢাকা থিয়েটারের প্রতি আমার ডেডিকেশন দেখতে চেয়েছে, দেখতে চেয়েছে আমি কতটুকু কমিটেড। এদিকে আমি কিন্তু ৩ মাস মনপ্রাণ দিয়ে দলের জন্য কাজ করেছি। ব্যাপারটা খুবই ব্যক্তিগত এবং মজার। নাসির উদ্দিন ইউসুফকে বিয়ে করার জন্য এই আমার ত্যাগ স্বীকার। আমি ছোট্ট মানুষ, ২১ বছর বয়স তখন—কতটুকুই-বা বুঝি। তবে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে বুঝেছিলাম এই লোকটাই আমার জন্য। মানুষ তো কখনো কখনো ভুল করে, আমি এই ব্যাপারে ভুল করি নি।


বাবা নামাজ পড়ে সকালে শুতেন। বাবা মাথার কাছে মোনাজাত ধরতেন। প্রার্থনাসঙ্গীত গাইতেন—‘তুমি নির্মল করো’


প্রশ্নকর্তা

শোনা যায়, আপনি, সেলিম আল দীন এবং নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু নাটকের জন্য শিল্পসঙ্গী ছিলেন।

শিমূল ইউসুফ

আমাদের একটা ট্রায়াঙ্গল ছিল—আমি, সেলিম আল দীন আর বাচ্চু। সেলিম আল দীন না থাকলে আমার সৃষ্টি হতো না। বাচ্চু না থাকলে আজকের সেলিম আল দীন, সেলিম আল দীন হতেন না।

আমরা বাইরে গেলাম—৩ জন এক রুমে থাকতাম। শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে অবিরাম আলোচনা হতো। বারো মিশালি আজেবাজে বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় নি। আমার তখন ২১ বছর বয়স, সবকিছু বুঝতে পারতাম না। কিন্তু পরবর্তীতে এগুলো আমাকে সাহায্য করেছে। ছেলেটিকে বুঝতে শিখেছি। আমি যখন বুঝতে পারলাম এটাই আমার জায়গা, শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে আমারও পথচলা শুরু হলো। গ্রাম থিয়েটার নতুন নতুন জায়গায় হয়েছে। দিনের পর দিন থেকেছি। সেলিম ভাই লিখতেন, তার প্রথম রিডিং হতো আমার বাসায়। লেখক তার লেখা চরিত্রগুলোকে পড়তেন—আমি সেলিম ভাইকে রিড করতাম। প্রতিটি নাটক সেলিম ভাই আমাকে আর বাচ্চুকে পড়ে শোনাতেন, ক্যারেক্টার অ্যানালিসিস করতেন।

প্রশ্নকর্তা

আপনার গান গাইবার পেছনে পারিবারিক প্রভাবটা কিভাবে দেখছেন?

শিমূল ইউসুফ

গান তো আমার রক্তের সাথে। গান ছাড়া আমি বাঁচব না। আমি কী পরিমাণ রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনি তোমরা কেউ কল্পনা করতে পারবে না। আমার যখন ৪ বছর বয়স, বাবা মারা যান। আমি কিন্তু কথা বলার আগেই গান শুরু করি। ২/৩ বছরের মধ্যেই আমার মা জেনে গিয়েছিলেন আমার গলায় সুর আছে। মুসলিম পরিবারের মেয়ে আমি, আমরা ৮ ভাই-বোন। আমাদেরকে মানুষ করতে করতে মার সময় পেরিয়ে গেছে। বাবা ছিলেন ধর্মপরায়ণ, সুফি টাইপের মানুষ। তিনি কোরান পড়তেন অন্য রকম সুরে। না শুনলে বিশ্বাস করা যাবে না। আমাদের বাড়িতে একটা বড় খাট ছিল। আমাদের মাথার দিকটায় বাবা থাকতেন। বাবা নামাজ পড়ে সকালে শুতেন। বাবা মাথার কাছে মোনাজাত ধরতেন। প্রার্থনাসঙ্গীত গাইতেন—‘তুমি নির্মল করো’, ‘আমার মাথা নত করে দাও হে’, ‘ঐ আসন তলে’। এগুলো সব রবীন্দ্রনাথ, রজনীকান্তের গান বাবা আমাদের কানের কাছে গাইতেন। আমরা সুরকে চিনতে শিখেছি এভাবেই—আমরা ৮ ভাই-বোনই গাইতে পারতাম। আমাদের বাইরে যেতে হতো না। ঘরেই যখন তখন অনুষ্ঠান হতো—তবলা বাজত, গান-নাচ-আবৃত্তি হতো। বাড়িতে এই সাংস্কৃতিক পরিবেশ আমি পেয়েছি। ৬০-এর দশকে বাঙালি মুসলিম পরিবারে যা ভাবাই যায় না।

আমার মা ধর্ম বুঝতেন না। বলতেন, ‘মানুষ হও’। আমাদের বোনদেরকে বলেছিলেন—আমার ৩ মেয়েকেই ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ দেখতে চাই। ছেলেরা কামলা খেটেও চলতে পারবে। কাজেই তোমরা শিক্ষিত হও। আমি পাশ করেছি। হ্যাঁ, মা তখন বেঁচেছিলেন। আমরা ৩ বোন মায়ের ইচ্ছে পূরণ করতে পেরেছি। এই পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা বিরাট ভাগ্যের ব্যাপার। বাবা সুফি টাইপের, সর্ব ধর্মের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ছিল। ধর্ম তো মানুষ তৈরি করেছে। বলতেন, তুমি আগে ভালো মানুষ হও। ভালো মানুষ হলে ভালো কাজ করতে পারবে।

প্রশ্নকর্তা

নাটকে আবহসঙ্গীত কতটুকু দরকার?

শিমূল ইউসুফ

নাটকের আবহসঙ্গীত সিকোয়েন্সের ওপর নির্ভর করে। নির্ভর করে নাটকের মুডের ওপর এবং নাটকের প্রয়োজনের ওপর। আমার মনে হয় যারা অভিনয় করে তাদেরকে মিউজিক ব্যাপক সাহায্য করে। মডিউলেশন তৈরি করে। আমি বিনোদিনীতে টুংটাং-এর জন্য অপেক্ষা করি, না পেলে আটকে যাই। মন্দিরার একটা কিউ-এ আমি প্রাণ ফিরে পাই, ফ্রেশনেস আসে। আমি যখন বিবেকানন্দের জায়গায় করি মেডিটেশন হয়—সজীবতা পাই, প্রশান্তি আসে। পারফরমেন্সে মনে হয় না ক্লান্তি লাগছে। এটাই মিউজিকের ভূমিকা। লাইট যতটা না সাপোর্ট দিবে একটা মিউজিক বা বাঁশির ফুঁ তোমাকে দৃশ্যের জায়গায় নিয়ে যাবে, কবিতা পড়ে তোমার ভিজ্যুয়ালাইজ হবে।

মিউজিক কম্পোজিশনের আগে ভাবতে হবে সমাজটা কী রকম, সমাজে কোনটা বাজাতে পারবে। সমাজটা কি ধার্মিক না সর্বপ্রাণবাদী! এগুলো বুঝলে মিউজিক ইনস্ট্রুমেন্ট ব্যবহার করা যাবে। মিউজিক অসম্ভব জটিল একটা ব্যাপার। ভারতীয় রাগ বা শাস্ত্রীয় সংগীতের কাছে বারবার ফিরে ফিরে আসতে হবে। জানা থাকলে প্রতিটি সিকোয়েন্সের জন্য রাগ ইম্প্রোভাইজ হতে পারবে। আমি করি, বিনোদিনীতে প্রচুর আবহসঙ্গীত আছে। তানপুরাটা আমাদের কোথায় নিয়ে যেতে পারে জানতে হবে। আমি মঞ্চে ঢুকছি মিউজিক জানি না, তাহলে অভিনয় হবে কী করে! রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনলে ভালো লাগে—প্রশান্তি আসে, মেডিটেশন হয়। আসলে ঈশ্বর তার ওপর ভর করতেন বলেই আশি বছর বয়সে তিনি এত লিখেছেন। এটা করা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

আমার  ইনসমনিয়া আছে, খারাপ অসুখ। ঘুম হয় না। আমি রাত জেগে থাকি। আস্তে আস্তে গান শুনি, গীতবিতান দেখি। জোরে শব্দ করি না, যাতে অন্যদের ডিস্টার্ব হয়। অন্যরা ঘুমিয়ে থাকে। সুরের সাথে গানের কথা মানুষকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে—না শুনলে বোঝা যাবে না। আমি অনেকের গান শুনি। তাই বলে ভেবো না, আমি বলছি না তোমাদের ইনসমোনিয়া, অনিদ্রারোগ হোক।

প্রশ্নকর্তা

দলের উন্নয়নের জন্য কর্মীর ভূমিকা কী রকম হতে পারে?

শিমূল ইউসুফ

আমাদের দলে (ঢাকা থিয়েটার) সাংগঠনিক পদ নাই। নেতা একজনই—নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু। তিনি যদি বলেন—বসে থাকো, থাকি। শুরু থেকেই সবাই করে আসছি, ছোট-বড় সবাই। আমি কাকে মান্য করব—যে একদিনের জন্য হলেও সিনিয়র। পরে যে আসছে সে জুনিয়র। আমি কী করব—বড়দের সম্মান করব, ছোটদের ভালোবাসব। তা না হলে ওরা আসবে কেন? এই চেইন অব কমান্ড আমরা মেনে চলি। চা-পানি আনতে বললে আনি। এটা নিয়ে কিন্তু সংঘাত হয় না। আমাদের দলে বেশি সুবিধা কিন্তু মেয়েদের। নাসির উদ্দিন ইউসুফের নির্দেশ রিহার্সালের সময় মেয়েরা এসব করবে না। তারা বাসায় ঘর ঝাড়ু দেয়, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে, চা বানায়—অনেক কিছু ম্যানেজ করে রিহার্সালে আসে। এখানে এসে আবার সেসব করবে, তা হবে না। আমাদের দলে ছেলেরা সব কাজ করে—বাথরুম ঘর পরিষ্কার করা, চা খাওয়ানোসহ সব কাজ।


‘গেরিলা’ ছবিতে সাড়ে ৪ হাজার পারফরমার কাজ করেছে। প্রতিদিন ৪/৫শ লোক ইউনিটে খেয়েছে। ৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।


প্রশ্নকর্তা

মুক্তিযুদ্ধের ছবি ‘গেরিলা’ তৈরির সময় আপনি সম্পৃক্ত ছিলেন। আপনার অভিজ্ঞতা কী রকম?

শিমূল ইউসুফ

‘গেরিলা’ ছবিতে সাড়ে ৪ হাজার পারফরমার কাজ করেছে। প্রতিদিন ৪/৫শ লোক ইউনিটে খেয়েছে। ৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ছবিটি ব্যবসাসফল বলতে পারি, তবে টাকা ওঠে নি। স্টার সিনেপ্লেক্স ৭ মাস গেরিলা দেখিয়েছে। ‘গেরিলা’ নাসিরউদ্দিন ইউসুফের মানসিক শান্তির জন্য করা। মূলত বাংলাদেশের মেয়েরা নিগৃহীত ছিল, তাদের জন্য এটা করা। এটা ওর প্রশান্তির জন্য। কোনো না কোনো দিন দেনা শোধ হবে। স্টার সিনেপ্লেক্সে যদি বছরের পর বছর ছবিটা চলত তাহলে অন্য রকম হতো। থার্টি ফাইভ এমএম ফিল্ম আসলে হলে বসেই দেখতে হয়। তখন ফিল্ম বোঝা যায়।

একটা কমন সিনে ৪শ লোক আছে। ২৬ মার্চ গণহত্যার পর যে লাশগুলো পড়ে থাকে। বলো তো কত? সাড়ে ৪শ লোক শোয়া! তাদের কস্টিউম আমার করা। এগুলো ব্যক্তিকে ধরে ধরে করা। চেহারা, পেশা, ধর্মীয় ভিন্নতা অনুযায়ী প্রতিটি কস্টিউমই আলাদা। কস্টিউমগুলো এখনো সংরক্ষিত আছে—কতদিন থাকবে জানি না। পুরনো দেখানোর জন্য কেমিক্যাল প্রসেস করা হয়েছে। যেমন ধরো একটা উদাহরণ—দৈনন্দিন জীবনের কাপড়গুলো পুরনো হবে, এটা ডিরেক্টর বলে দিয়েছেন। ৩/৪ দিন চায়ের মধ্যে চুবিয়ে রাখা হয়েছে। তখন বর্ষাকাল ছিল, সারারাত শুকাতে হয়েছে।

কিছু পোশাক বাংলাদেশ আর্মির, পুরনোগুলো পাঞ্জাব রেজিমেন্ট থেকে নেয়া হয়েছে। ব্যাজ, স্টার, এগুলো আমরা সংগ্রহ করেছি। আমরা ওদের কমিটমেন্টে মুগ্ধ। গোলাগুলির পর ঝোপঝাড়, কাদা, জঙ্গল থেকে প্রত্যেকটা খোসা খুঁজে বের করা হয়েছে। গুলি আমরা বাংলাদেশ আর্মির কাছ থেকে কিনেছি। খোসা ফেরত দিতে হয়েছে, না হলে যে ওদের চাকরি চলে যাবে। আমরাও খুঁজে দিয়েছি।

বাচ্চু আরেকটা ছবি বানাবে। মানসিকভাবে প্রস্তুত—মুক্তিযুদ্ধের ওপর ৩টা ছবি বানাবে। ধার-দেনা শোধ করার পর। সব ওর মাথায় আছে। এশা ইউসুফ একটা ছবি করবে—ওর জন্যও টাকা লাগবে। তবে অত বড় বাজেট লাগবে না।

প্রশ্নকর্তা

মুক্তিযুদ্ধের ছবি নিয়ে তারেক মাসুদ, নাসির উদ্দিন ইউসুফ কাজ করেছেন…

শিমূল ইউসুফ

তোমরা তারেক মাসুদ, বাচ্চুর কথা বললে জহির রায়হানের কথা কেন বললে না! তার ‘স্টপ জেনোসাইড’ পৃথিবীটাকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা ও পৈশাচিকতায় স্তম্ভিত বিশ্ববিবেক এটা দেখে কেঁপে উঠেছিল। মানুষ যখন প্রাণ বাঁচাতে ব্যস্ত, তখন জহির রায়হান যেতে যেতে ছবি তুলছিলেন।

উনি বাংলাদেশ পার হওয়ার সময় রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে শ্যুটিং করেছেন! কত দূরদর্শী ছিলেন—এগুলো আর পাওয়া যাবে না। এগুলোই ছিল সম্বল। জার্নি করতে করতে তুলেছেন। জহির রায়হান ছিলেন উনাদের গুরু। জহির রায়হানের পর আলমগীর কবীর। অনেক কাজ করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ওপর। ’৭২-৭৪-এ ‘ধীরে বহে মেঘনা’ । তার হঠাৎ মৃত্যু না হলে আরো করতেন। তার সাথে মোরশেদ ছিলেন। মোরশেদ (মোরশেদুল ইসলাম) ফেরির টিকেট কাটতে যাওয়ায় বেঁচে গেছেন।

প্রশ্নকর্তা

বাচ্চু ভাই কোথায় জন্মেছেন?

শিমূল ইউসুফ

বাচ্চু নবাবগঞ্জে জন্মেছে। নবকুমার ইনস্টিটিউট ও কলেজিয়েট স্কুলে পড়েছে। আদিবাড়ি চট্টগ্রামের ফৌজদার হাটে। শ্বশুরের আদিবাড়ি পুরান ঢাকার নবাবগঞ্জে। শ্বশুর কোলকাতার রাইটার্স বিল্ডিং-এ অর্থবিভাগে ছিলেন। পরে পল্টনে বাড়ি করেন—এটাই বাচ্চুদের আদিবাড়ি।

প্রশ্নকর্তা

থিয়েটারে গানের ব্যবহার নিয়ে কিছু বলুন।

শিমূল ইউসুফ

গান কিন্তু থিয়েটারে যুগ যুগ ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে। থিয়েটারের ইতিহাস পড়ি—সিরাজ-উদ্দৌলা, গিরীশ ঘোষ, বিনোদিনী যুগের। ঠুংরি, গজল, দেশাত্মবোধক, কীর্তন বেশি ব্যবহার হতো উনিশ শতকের থিয়েটারে। ভিন্নতাও বিভিন্ন যুগে এসেছে। কেউ ব্যাকগ্রাউন্ড, কেউ অন স্টেজ এবং কেউ রেকর্ডেড করে ব্যবহার করে।

গান যাত্রা থেকে থিয়েটারে আসে।  তখন তো সারারাত হতো। সিন ফেলা হতো।  সিন, ড্রেস পরিবর্তন হতো। সময় লাগত, ৫/৬ ঘণ্টা ধরে হয়েছে। আমি প্রথম দেখেছি ছোটবেলায়। রাত ১২টায় শুরু হতো।

বিনোদিনী রূপসী ছিলেন। গান নাচ জানতেন। তাকে লাস্যময়ী, হাস্যময়ী, ছলনাসহ যত ধরনের কায়দা আছে সবগুলো প্রকাশ করতে হতো বাবুদের জন্য। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবও তার অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। তিনি বিনোদিনীকে বলেন নি এসব ছাড়ো। তাকে আসলে পরিত্যাগ করেছে তার থিয়েটারের লোকজন। সেই যুগের পরম্পরা হিশেবে গান থিয়েটারে এসেছে। যাত্রা পিছিয়েছে, থিয়েটারও পিছোবে ডিসিপ্লিন না থাকলে।

শিল্পকলা একাডেমির বর্তমান চেহারা তৈরির আগে গোল মাঠে ’৭৩-এ অমলেন্দু বিশ্বাস যাত্রা করতেন। দর্শক উপচে পড়ত। ’৭৮-এ প্রিন্সেসদের আগমনে যাত্রা পিছিয়ে পড়ল। যাত্রা প্রতিযোগিতা করা শুরু করল বোম্বে এবং ঢাকাই সিনেমার সঙ্গে। শর্টকার্ট পথে প্রিন্সেসদের অশ্লীল নৃত্য যাত্রাকে ধ্বংস করেছে। ইনডিসিপ্লিনের কারণে সব নষ্ট হয়ে যাবে। নাটকে এটা হলে মেয়েরা আসবে না, দল নষ্ট হয়ে যাবে।


সুবর্ণা মোস্তফা তখন খুবই জনপ্রিয় ছিল—পুলিশ আমাদেরকে ধরার সময় আমি তাকে টিএসসির ভেতর ঠেলে ঢুকিয়ে দিই।


প্রশ্নকর্তা

নাট্যকর্মী হিশেবে দেশপ্রেমের একটি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার ঘটনা আছে আপনার জীবনে। সেটি কী রকম?

শিমূল ইউসুফ

’৯৭-এ দেখেছি নাটকের লোকজনের পেছনের মুখোশ—যারা ডাবল ফেস মেইনটেইন করে। ঢাকায় একটি উৎসবে পাকিস্তানের একটি দল নাটক মঞ্চায়ন করবে আমরা খবর পেলাম এবং সিদ্ধান্ত নিলাম এটা করতে দেবো না। আমরা ক’জন রমনা পার্ক থেকে মুখে কাপড় বেঁধে মৌন মিছিল নিয়ে বের হলাম, উদ্দেশ্য পাকিস্তানি দলকে নাটক করতে দেবো না। আমরা যতক্ষণ ছিলাম পাকিস্তানিরা নাটক করতে পারে নি। পরে করেছে কিনা জানি না।

প্রশ্নকর্তা

নাটক করতে গিয়ে পুলিশের মার খান, সেই গল্পটা বলেন।

শিমূল ইউসুফ

’৭৮-এ ঢাকা থিয়েটারের ‘নাচাও, রাস্তা নাচাও’  নাট্য আয়োজন। বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে আমরা চর কাঁকড়ার ডকুমেন্টারি করছিলাম। টিএসসি, প্রেসক্লাব, শহিদ মিনার, বাংলা একাডেমির সামনে। ঢোল বাজিয়ে শুরু করতাম। সেদিন শো ছিল বর্তমানের ডাস-এর সামনে। পুলিশ অতর্কিতে হামলা করে পিটিয়ে ১৩/১৪ জনকে গাড়িতে তুলে নিয়ে আসে। তখনকার রমনা, এখনকার শাহবাগ থানায় আমাদেরকে ইন্টারোগেশন করে। সুবর্ণা মোস্তফা তখন খুবই জনপ্রিয় ছিল—পুলিশ আমাদেরকে ধরার সময় আমি তাকে টিএসসির ভেতর ঠেলে ঢুকিয়ে দিই। ওখান থেকে বাচ্চু কাকে যেন ফোন করে। পরে ওসি সাহেবের সাথেও তিনি কথা বললে আমাদেরকে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। আমরা ছাড়া পাই আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার তিন ঘণ্টা পর। পুলিশ খুব জোরে পেটায়। বাচ্চু আবার বেশি দুর্ভাগা—উনি ’৮৭ এবং ’৯১-এ দু’বার পুলিশের হাতে বেধড়ক মার খেয়েছেন।

প্রশ্নকর্তা

রবীন্দ্রসঙ্গীতে যে কোনো ইনস্ট্রুমেন্ট কি বাজানো যাবে?

শিমূল ইউসুফ

সুর অবিকৃত রেখে যে কোনো ইনস্ট্রুমেন্ট দিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া যাবে। বিশ্বভারতী এই ইনস্ট্রুমেন্ট ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে।

প্রশ্নকর্তা

কবিতা আবৃত্তির সময় কিসের ওপর বেশি জোর দিতে হয়?

শিমূল ইউসুফ

আবৃত্তির সময় ভিজ্যুয়ালাইজ করতে হয়। একটু আগে যখন তুমি পড়ছিলে তখন রাঙা পা, দুপুর—এসব মনের মধ্যে ভিজ্যুয়াল করেছ কি? জীবনানন্দ ছাড়া আর কে লিখতে পারে এমন কবিতা। ‘বোধ’  না পড়লে ভালো পারফরমার হওয়া যাবে না। পড়তে হবে ‘লাশ কাটা ঘর’, ‘পিপাসার গান ১৩১৩’ ইত্যাদি।

(শিমূল ইউসুফ নবীন নাট্যকর্মীদের আশীর্বাদ করেন। ইতোমধ্যে ৩ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। দূরে কাছের বাড়িগুলোতে ছেলেমেয়েরা ফিরবে)।

Firoz ahmad

শেখ ফিরোজ আহমদ

জন্ম ১ আগস্ট ১৯৬৩, চাঁদপুর।
অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : উন্নয়নকর্মী।

প্রকাশিত বই :
পাতকীর ছায়া [কবিতা, অন্তরীপ প্রকাশনী, বগুড়া, ১৯৮৭]
কালের পৃষ্ঠায় [প্রবন্ধ, যুক্ত, ঢাকা, ২০০৮]
মাতরিশ্বা [কবিতা, ভাষাচিত্র, ঢাকা, ২০১০]

ই-মেইল : firozbangla@yahoo.com
Firoz ahmad