হোম সাক্ষাৎকার রাজু আলাউদ্দিন-এর সাক্ষাৎকার

রাজু আলাউদ্দিন-এর সাক্ষাৎকার

রাজু আলাউদ্দিন-এর সাক্ষাৎকার
974
0

[বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে হুমায়ুন আজাদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি রচনা করেছেন ভাষাতত্ত্ব, কিশোর-সাহিত্য, প্রবন্ধ, কবিতা ও উপন্যাস। তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তার ক্ষুরধার চিন্তা আলোড়িত করেছে বিশেষভাবে তরুণদের। ২০০৪ সালে তিনি অকালে মৃত্যুবরণ করেন। তার সাহিত্যের ওপর তেমন একটা গবেষণা হয় নি। তার জীবন, কর্ম ও সাহিত্য নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।

সেই অনুসর্গ থেকেই সংশ্লিষ্ট বিশিষ্টজনদের সাক্ষাৎকার নেওয়া। রাজু আলাউদ্দিন তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এবং তার সঙ্গে আড্ডা দিয়েছেন। আমরা তার কাছ থেকে বুঝে নিতে চেয়েছি হুমায়ুন আজাদের বিচিত্র রূপ—লেখক, সমালোচক ও সাংবাদিকের দৃষ্টিতে।

তার সাহিত্যের শিল্পগুণ, নারীবাদ, উপন্যাসে সামাজিক, রাজনৈতিক গুরুত্ব ও প্রগতিশীলতা, কিশোর-সাহিত্যে শৈল্পিকতা ও কবিতায় আধুনিকতা—এ সব বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনা প্রয়োজন। সমালোচনা সাহিত্যের প্রাণ। হুমায়ুন আজাদের চিন্তাধারা, তার সাহিত্যের মূল্যায়ন, চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ আমাদের প্রধান লক্ষ্য। এ সাক্ষাৎকারে অজানা এক হুমায়ুন আজাদ আবিষ্কৃত হবে বলে আমরা মনে করি।]


সা ক্ষা  কা 


মোহাম্মদ আলী

হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে আপনার পরিচয় হলো কিভাবে?

রাজু আলাউদ্দিন

পরিচয় কিভাবে হয়েছে আজ আর মনে নেই। হয়তো একুশের বইমেলায়।

মোহাম্মদ আলী

কোন সূত্র ধরে তার সাক্ষাৎকার নিলেন? প্রথম সাক্ষাৎকারের বিষয়টি কী ছিল?

রাজু আলাউদ্দিন

তার নারী বইটি নিষিদ্ধ হয়েছিল। আমি আর কবি ব্রাত্য রাইসু তখন বাংলাবাজার পত্রিকায় সাক্ষাৎকার বিভাগটি দেখতাম। ওই বিভাগের জন্য এ বিষয়ে তার সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা ভাবি। সূত্র এবং বিষয় হিসেবে এটাই মনে পড়ছে।


আপনি তো ছফাপন্থি, হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে কিভাবে আপনার মতার্দশের মিল হয়?


মোহাম্মদ আলী

কী কারণে হুমায়ুন আজাদের সাক্ষাৎকার নিলেন?

রাজু আলাউদ্দিন

তার নিষিদ্ধ হওয়া বইটি সম্পর্কে তার প্রতিক্রিয়া জানার জন্যে।

মোহাম্মদ আলী

সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে কোনো সমস্যা হয়েছিল? কোনো প্রশ্নের বা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন?

রাজু আলাউদ্দিন

সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে কোনো সমস্যা হয় নি। বরং আমরা যাদের সাক্ষাৎকার নিতাম তারাই আমাদের প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে সমস্যায় পড়তেন।

000
হুমায়ুন আজাদ

মোহাম্মদ আলী

0
হুমায়ুন আজাদের গুরুত্বপূর্ণ একটি বই ‘নারী’

আপনি সাক্ষাৎকার নিতে গেলে হুমায়ুন আজাদ কি সমস্যায় পড়েছিলেন?

রাজু আলাউদ্দিন

সমস্যা বলতে বুঝাচ্ছি তার স্ববিরোধাত্মক বিষয়ে দু-একটি প্রশ্ন করায় তিনি অস্বস্তিবোধ করেছেন। তিনি সে-সবের সদুত্তর না দিয়ে এমন কিছু বলেছেন যা প্রশ্নের যথাযথ উত্তর বলে মনে হয় নি। যেমন আমি বলেছিলাম, আপনি বোধহয় ভাই বলার সুযোগও দেন না। তিনি উত্তরে বললেন, আমি ভাই না হয়েই ভালো আছি। যারা ভাই বলে ডাকে, ওরা আমার ছাত্র হওয়ারও যোগ্য নয়। তখন আমি বললাম, স্যার, আপনার স্ত্রী কি আপনাকে স্যার বলে ডাকেন? কিংবা আপনার ছেলে-মেয়েরা আপনাকে বাবা বলেন নাকি স্যার বলে ডাকেন? তিনি এর উত্তরে বললেন, সেটা এখানে আলোচ্য বিষয় নয়। এরপর তিনি প্রসঙ্গ পাল্টে অন্যদিকে চলে গেলেন। এরকম আরও কিছু বিষয় ছিল।

মোহাম্মদ আলী

আপনি এবং ব্রাত্য রাইসু তার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি খুব রেগে গিয়েছিলেন। কেন? কী ঘটেছিল?

রাজু আলাউদ্দিন

প্রশ্নটা ছিল শোনা যায়, আপনিই নাকি নারী বইটি নিষিদ্ধ করিয়েছেন? এই প্রশ্নে তিনি বেশ রেগে গিয়েছিলেন। কী আর ঘটবে? তিনি রেগে গিয়ে ভর্ৎসনা করেছেন, কটুকথা বলেছেন। তবে, কথাবার্তা অব্যাহতই ছিল।

মোহাম্মদ আলী

সুনির্দিষ্ট করে বললে হুমায়ুন আজাদ কী সমস্যায় পড়েছিলেন, বলবেন? তিনি প্রশ্নের উত্তর জানতেন না?

রাজু আলাউদ্দিন

ওই যে বললাম, তারাই সমস্যায় পড়তেন। তার জন্য অস্বস্তিকর এক প্রশ্নের কারণে তিনি খানিকটা রেগে গিয়েছিলেন। প্রশ্নটা ছিল, শোনা যায়, আপনিই নাকি বইটি নিষিদ্ধ করার ব্যবস্থা করেছিলেন।

মোহাম্মদ আলী

হুমায়ুন আজাদ নিজেই নারী বইটি নিষিদ্ধ করার ব্যবস্থা করেছিলেন, এমন উদ্ভট গুজব কোত্থেকে শুনেছিলেন? সেটা কি আপনার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছিল?

রাজু আলাউদ্দিন

এটি সত্যি না গুজব ছিল তা আমার জানা নেই। প্রশ্নটা কবি ব্রাত্য রাইসু করেছিলেন। সুতরাং তিনিই বলতে পারবেন এটা গুজব কিনা। আমার কাছে গুজব বলেই মনে হয়েছিল। তবে গুজব নিয়েও তো প্রশ্ন করা যায়, অসুবিধা কী?

মোহাম্মদ আলী

আবার এরপরও দুজন সাক্ষাৎকার চালিয়ে গেছেন এবং তিনিও সাক্ষাৎকার দিয়েছেন ব্যাপারটা একটু বলবেন?

রাজু আলাউদ্দিন

এই প্রশ্নের পরেও উনি সাক্ষাৎকার চালিয়ে গেছেন কারণ তিনি সহিষ্ণু ছিলেন। এবং তিনি কথা বলতে ভালোবাসতেন।

মোহাম্মদ আলী

হুমায়ুন আজাদ আছেন এমন কোনো আড্ডায় আপনি গিয়েছেন?

রাজু আলাউদ্দিন

বহুবার বহু জায়গায়। তিনি কোনো আড্ডায় আছেন, এটাই ছিল এক বড় আকর্ষণ। তার আড্ডায় থাকা মানে এক বিরল অভিজ্ঞতা। বলতে পারতেন, প্রায় সব বিষয়ে আর তা বলতেনও চমৎকার সাবলীলতার সঙ্গে, তার বাচনভঙ্গি [কিছুটা কৃত্রিমতা সত্ত্বেও, এই কৃত্রিমতা তার এমনই এক বৈশিষ্ট্য ছিল যা তার ক্ষেত্রে আলাদা আকর্ষণ হয়ে উঠেছিল। আমি তার এই কৃত্রিমতাকে উপভোগ করতাম।] ও রসবোধ ছিল অনন্য।

মোহাম্মদ আলী

হুমায়ুন আজাদের বাচনভঙ্গি কৃত্রিম হলেও উপভোগ করতেন, কথাটা স্ববিরোধী হয়ে গেল না?

রাজু আলাউদ্দিন

কথাটা স্ববিরোধী হলেও তা উপভোগ্য হতে অসুবিধা কোথায়? অলংকার শাস্ত্রে বিরোধাভাস, কূটাভাস—এধরনের পরিভাষার জন্মই তো হয়েছে উপভোগের বিবেচনা থেকে।

images
আহমদ ছফা

মোহাম্মদ আলী

007
আহমদ ছফার গুরুত্বপূর্ণ একটি বই ‘যদ্যপি আমার গুরু’

আড্ডার কোনো ঘটনা আপনার মনে পড়ে?

রাজু আলাউদ্দিন

একবার আজিজ মার্কেটে এক আড্ডায় তাকে বলেছিলাম আপনি বেশ নাকউঁচু স্বভাবের। নিচে তো কিছু দেখতে পান না। তিনি এর জবাবে বললেন, তুমিও তো বোর্হেস থেকে নামতে জানো না। আমি তাকে বললাম, কেন আমি তো হুমায়ুন আজাদ পর্যন্ত নামতে পারি। হুমায়ুন আজাদও কম ঘাগু নন। তিনি আমাকে জব্দ করার জন্য বললেন, শোন, হুমায়ুন আজাদ-এ নামা নয়, ওঠা। আমার মাথায় সেদিন দুষ্টু বুদ্ধি বেশ খলবলিয়ে উঠেছিল। আমি তাকে পাল্টা জবাবে বললাম, সেক্ষেত্রে সিঁড়িটা হবে আপসাইডডাউন। এর পরে আর বেশি দূর আগান নি তিনি।ওই যাত্রায় এবং ওই একবারই তিনি হার মেনেছিলেন কোনো অনুজের কাছে। কিন্তু আমরা দুজনই বেশ উপভোগ করেছিলাম ওই রসিকতা। সবাই জানেন তাকে কথায় পরাস্ত করা এক অসম্ভব ব্যাপার। তার মতো অসামান্য তীক্ষ্ণতা ও রসবোধ নিয়ে সদাপ্রস্তুত লেখক আমি আর দ্বিতীয়জন দেখি নি। লেখক হিসেবে তাকে হারানো যেমন এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে তেমনি রসালাপী এক মানুষকে হারানো কম বেদনার নয়।

মোহাম্মদ আলী

একবারই তিনি হার মেনেছিলেন, আপনার কাছে? আর কখনো হুমায়ুন আজাদকে হারাতে পারেন নি? আপনিই বারবার পরাস্ত হয়েছেন?

রাজু আলাউদ্দিন

হ্যাঁ, ওই একবারই। তাকে যারা চেনেন তারা ভালো করেই জানেন যে তার সঙ্গে দ্বিমত বা তর্ক করতে সাহসই পেতেন না কেউ। তিনি ছিলেন ভীষণ রকম শানিত তরবারির মতো। দ্বিমত বা তর্কপ্রবণ হয়ে তার ধারে কাছে যাওয়া ছিল রীতিমত বিপজ্জনক ব্যাপার। কী নবীন কী প্রবীণ কেউ-ই তার ধারালো, প্রখর ও বিধ্বংসী উত্তর থেকে রেহাই পান নি। সুতরাং আমি পরাস্তই হয়েছি বেশির ভাগ সময়।

মোহাম্মদ আলী

রাজনীতি সম্পর্কে কোনো আলাপ হতো?

রাজু আলাউদ্দিন

এসব নিয়ে তার সাথে আলাপ তো হতোই। সাহিত্য সম্পর্কে তার সাথে কোনো কোনো মতের সাথে মিলতো না। তবে রাজনীতি ও সমাজ সম্পর্কে তার পর্যবেক্ষণ ও মন্তব্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ছিল অভ্রান্ত।

মোহাম্মদ আলী

আজাদের সঙ্গে সাহিত্য-সম্পর্কিত ব্যাপারে কোনো কোনো জায়গায় আপনার মত মিলত না? সুনির্দিষ্ট করে বলবেন?

রাজু আলাউদ্দিন

নজরুল বিচারে, এমনকি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য বিচারের ক্ষেত্রেও অনেক জায়গায় আমার মতের সঙ্গে মেলে নি। কিংবা ধরুন, তার সম্পাদিত আধুনিক বাংলা কবিতার সংকলনে আল মাহমুদ ও আরও কয়েকজনের কবিতা অন্তর্ভুক্ত না করার পেছনে যে-যুক্তি সেটাও আমার মতের সঙ্গে মেলে না। সাহিত্যকে রাজনৈতিক মানদণ্ড থেকে বিচার করাটাকে আমার কাছে সঠিক মনে হয় নি, এখনও হয় না। নজরুল সম্পর্কে তিনি ইসলামী সংগীত রচনার যে-অভিযোগ তুলেছেন তা একপেশে। তারই প্রিয় কবি এলিয়ট তো ক্যাথলিক ধর্মে বিশ্বাস করতেন। আমরা কি এ জন্য এলিয়টকে বর্জন করব, করাটা কি ঠিক হবে?


হুমায়ুন আজাদকে সফল বা ভালো ঔপন্যাসিক বলে মনে করি না। 


মোহাম্মদ আলী

তার সঙ্গে রাজনীতি ও সমাজ সম্পর্কে কোন কোন পর্যবেক্ষণ ও মন্তব্য মিলত?

রাজু আলাউদ্দিন

রাজনৈতিক বিষয়ে তার সাথে আমার অমিল তেমন একটা ছিল না। সমাজ সম্পর্কিত কোনো পর্যবেক্ষণেও না।

মোহাম্মদ আলী

আপনি তো ছফাপন্থি, হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে কিভাবে আপনার মতার্দশের মিল হয়? এটা তো রীতিমত বিস্ময়কর ব্যাপার, নাকি? আহমদ ছফা জানলে কী ঘটত কে জানে? একটু ব্যাখ্যা করবেন?

রাজু আলাউদ্দিন

আমি ছফাপন্থি? এ ধারণা আপনার কেন হলো? আমি নিজে তো এরকম কোনো ঘোষণাও দেই নি। এমনকি আপনি ছাড়া আর কারও মুখে আমি একথা শুনিও নি। ছফা ভাইকে পছন্দ করতাম, তার লেখার আমি অনুরাগী, কিন্তু এসবের কারণে পন্থি বলে অভিহিত করাটা কি ঠিক হবে? আমি তো হুমায়ুন আজাদেরও খুব অনুরাগী। আমি পন্থায় বা পন্থি হওয়ায় বিশ্বাস করি না। মিল হবে না কেন? বদ্ধ মনের মানুষ হলে মিল হবে না, আমি তো মুক্ত মনের মানুষ। আর আহমদ ছফাকে পছন্দ করতাম বলে তার মতের সঙ্গে মেলে না, এমন কাউকে পছন্দ করা যাবে না—আমি এই রক্ষণশীলতায়ও বিশ্বাসী নই। আমি হুমায়ুন আজাদকে পছন্দ করতাম জানলে ছফা ভাই কী করতেন বা কী ভাবতেন ওতে বিচলিতই-বা হব কেন? আর তিনিও যে এতে ক্ষিপ্ত বা বিচলিত হতে পারতেন—এটাও আমার মনে হয় না। আমার মনে হয় না তারা এসব বিষয় নিয়ে খুব চিন্তিত হতেন।

Onu-Hossain-02
আবদুল মান্নান সৈয়দ

মোহাম্মদ আলী

download
আবদুল মা্ন্নান সৈয়দ-এর গুরুত্বপূর্ণ একটি বই ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’

আপনি তার উপন্যাস সম্পর্কে একটু বলুন?

রাজু আলাউদ্দিন

আমি হুমায়ুন আজাদকে সফল বা ভালো ঔপন্যাসিক বলে মনে করি না। ওসব তিনি জনপ্রিয়তার মোহে আবিষ্ট হয়ে লিখেছেন বলে মনে হয়। এমনকি যে উপন্যাসটির জন্য প্রাণ হারিয়েছেন ওটিও একটি চরমভাবে ব্যর্থ উপন্যাস। ওটা কোনো উপন্যাসই হয় নি। তবু তাকে প্রাণ হারাতে হলো অশিল্পোত্তীর্ণ বক্তব্যের তীব্রতার জন্যে। এটা একটা দুঃখজনক ঘটনা।

মোহাম্মদ আলী

পাক সার জমিন সাদ বাদ—উপন্যাসকে কী কী কারণে ব্যর্থ বলে মনে করেন? তাহলে বাংলাদেশে সফল উপন্যাস কোনগুলো একটু বলুন?

রাজু আলাউদ্দিন

এই উপন্যাসটিকে ব্যর্থ মনে করার কারণ হলো এটি পড়লেই বুঝা যায় এটি প্রগাঢ় কোনো শৈল্পিক প্রণোদনা থেকে রচিত হয় নি, আর সেটা হয় নি বলেই এর মধ্যে উপন্যাসের গুণ ও বৈশিষ্ট্যের নিখিল অনটন রয়ে গেছে। বাংলাদেশের সফল উপন্যাস লালসালু, চাঁদের অমাবস্যা, পদ্মার পলিদ্বীপ, জীবন আমার বোন, চিলেকোঠার সেপাই, খোয়াবনামা ইত্যাদি।

মোহাম্মদ আলী

পাক সার জমিন সাদ বাদ উপন্যাসকে আপনি ‘অশ্লীল মনে করেন? উপন্যাসটির শিল্পগুণ বা সামাজিক মূল্য কতটুকু?

রাজু আলাউদ্দিন

না, এই উপন্যাসটিকে তথাকথিত অর্থে অশ্লীল মনে করি না। উপন্যাস হিসেবে এর কোনো শিল্পমূল্য আছে বলেও আমার মনে হয় না। তবে এর সামাজিক মূল্য ও গুরুত্ব আছে। সেটাই এই লেখাটিতে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। একজন রাগী মানুষ তার ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশের জন্য এই মাধ্যমটিকে বেছে নিয়েছেন কিন্তু তার যথাযথ প্রয়োগ সম্পর্কে কোনো সচেতনতা বা সতর্কতা ছাড়াই।

মোহাম্মদ আলী

পাক সার জমিন সাদ বাদ উপন্যাস হিসেবে ব্যর্থ, তার আবার ‘সামাজিক মূল্য ও গুরুত্ব আছে’ থাকে কিভাবে?

রাজু আলাউদ্দিন

এটিকে উপন্যাস হিসেবে ব্যর্থ বলার কারণ উপন্যাসের যে-প্রকরণ, চরিত্রের বিন্যাস ও বিকাশ তার মধ্যে কোনো সুসঙ্গতি ও নান্দনিক সাফল্য আমি খুঁজে পাই নি। কিন্তু এতে যে বিষয়বস্তু অবলম্বন করা হয়েছে তার সামাজিক মূল্য ও গুরুত্ব আছে। সামাজিক মূল্যটা এই অর্থে যে স্বাধীনতার পর পরাজিত শক্তির উত্থান ও তৎপরতার একটা চিত্র আঁকা হয়েছে এই বইটিতে, সেই অর্থেই এর সামাজিক মূল্য।

মোহাম্মদ আলী

তার নারী গ্রন্থ কী মৌলিক কোনো গ্রন্থ? তার নারীবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে আপনি কোন কোন জায়গায় দ্বিমত পোষণ করেন?

রাজু আলাউদ্দিন

মৌলিকতার প্রশ্ন আসছে কেন? উনি নিজে কি একে মৌলিক বলে দাবি করেছেন? উনি তো ভূমিকাতে বলেছেনই যে বহু বিদেশি গ্রন্থের সাহায্য নিয়েছেন এ গ্রন্থ রচনায়। তারপরেও এটি গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে তার আগে এত সুশৃঙ্খল ও তথ্য উপাত্তসহ কেউ এ বিষয়টি ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেন নি। নারীবাদ বিষয়ে তার সঙ্গে আমার দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য আছে কিনা তা ভেবে দেখি নি।

মোহাম্মদ আলী

‘নারীবাদ বিষয়ে তার সঙ্গে আমার দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য আছে কিনা তা ভেবে দেখি নি।’ বলেছেন, একটু ভাবুন এবং বলুন, তার সঙ্গে আপনার দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য কোথায় কোথায়?

6-30
ফরহাদ মজহার

রাজু আলাউদ্দিন

000000
ফরহাদ মজহারের গুরুত্বপূর্ণ একটি বই ‘মোকাবিলা’

না, পার্থক্য প্রায় নেই বললেই চলে।

মোহাম্মদ আলী

‘পশ্চিমের নারীরা শোষিত, তবে মানুষ-পুরুষ দ্বারা শোষিত; আমাদের অঞ্চলে নারীরা শোষিত পশু-পুরুষ দ্বারা।’ আপনি কী তার এ ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত? এখানে সব পুরুষই কি এই পর্যায়ে পড়ে?

রাজু আলাউদ্দিন

আমাদের দেশে নারীরা তো ‘পশু-পুরুষ’ দ্বারাই শোষিত হচ্ছে। পশ্চিমের পুরুষরা পশু থেকে মানুষ-এ রূপান্তরিত হয়েছে, আমাদের পুরুষরা এখনও মানুষ হয়ে ওঠতে পারে নি, পশু পর্যায়ে রয়ে গেছে। এত খুবই সত্যি। আমাদের সমাজের সাথে পশ্চিমের সমাজের এই তুলনামূলক মূল্যায়নের সাথে আমার কোনোই দ্বিমত নেই। সব পুরুষ হয়তো এক পর্যায়ে পড়ে না, কিন্তু আমাদের দেশে, আমাদের সমাজে বেশির ভাগ পুরুষই নারীর প্রতি সহিংস, নির্দয় ও শোষক-স্বভাবের, নারীকে তার প্রাপ্য মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করে।

মোহাম্মদ আলী

‘বাঙলাদেশে কোনো প্রকৃত বুদ্ধিজীবী নেই।’ আজাদের এ কথার সঙ্গে আপনি একমত?

রাজু আলাউদ্দিন

পুরোপুরি। বাংলাদেশে প্রচুর লেখক আছেন, কিন্তু প্রকৃত বুদ্ধিজীবী নেই একজনও। হুমায়ুন আজাদ এবং আহমদ ছফা ছিলেন প্রকৃত বুদ্ধিজীবীর উদাহরণ। তারা জাতির ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে সততা ও সাহসের সঙ্গে সাড়া দিয়েছেন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গভীর জানাশোনা ছিল তাদের। তারা সংকট ও সমস্যাগুলো বুঝতে পারতেন।

মোহাম্মদ আলী

কেন? বদরুদ্দীন ওমর, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আনিসুজ্জামান, আবুল কাশেম ফজলুল হক, আনু মুহাম্মদ-কে বাঙলাদেশের বুদ্ধিজীবী মনে করেন না? কেন করেন না?

রাজু আলাউদ্দিন

বদরুদ্দীন ওমর কোনো কোনো বিষয়ে সাহসী কথা বলেন বটে, তবে কোনো ক্ষেত্রে তার অসততাও আছে। অসততার একটা নমুনা হচ্ছে তার ভাষা-আন্দোলন বিষয়ক বইটিতে সৈয়দ মুজতবা আলীর কোনো উল্লেখ নেই, অথচ মুজতবা আলীর বউয়ের উল্লেখ আছে। মুজতবা আলী নিজেই এই অসততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সৎ মানুষ, কিন্তু বহু বিষয়ে তার ভীরুতাও আমি দেখেছি। আনিসুজ্জামান ভীরু নন, অসৎ নন, কিন্তু বুদ্ধিজীবীর সচল সক্রিয় ও প্রখর চরিত্র তার মধ্যে কতটা আছে সে ব্যাপারে আমার সন্দেহ আছে। আবুল কাশেম ফজলুল হক ভালো মানুষ কিন্তু বুদ্ধিজীবী তাকে বলা যায় না। আনু মুহাম্মদ কোনো কোনো বিষয়ে প্রতিবাদী, সাহসী ও এক্টিভিস্ট, কিন্তু জাতির সব ধরনের সংকট ও সমস্যাগুলোতে তাকে সরব হতে দেখা যায় না। তাছাড়া তিনি একটি দলের সক্রিয় কর্মী। বুদ্ধিজীবী কোনো দলের হতে পারেন না, হলে তিনি পক্ষপাতদুষ্ট হতে বাধ্য। সত্যিকারের বুদ্ধিজীবীর সামগ্রিক বৈশিষ্ট্য এদের কারোর মধ্যেই নেই, প্রত্যেকের মধ্যে অংশবিশেষ আছে।

মোহাম্মদ আলী

‘বাঙলা সাহিত্য হচ্ছে কপট সাহিত্য যেন শ্বশুরের হাতে লেখা সাহিত্য, পশ্চিমে সাহিত্য জীবনের ছবি তুলে ধরে।’ আজাদের এ মূল্যায়নের সঙ্গে আপনি ভিন্নমত পোষণ করেন? আমাদের সাহিত্য পশ্চিম থেকে ধার করা বুঝিয়েছেন? বাঙালির মৌলিকত্ব নেই—সেটা ইঙ্গিত করেছেন।

রাজু আলাউদ্দিন

অর্থাৎ বলা হচ্ছে আমাদের সাহিত্যে সিরিয়াসনেস নাই, আন্তরিকতা নাই, নিষ্ঠা নাই। সেটা তো অনেকটাই সত্যি। তার এই মূল্যায়নের সাথে দ্বিমত খুব একটা নেই। তবে ব্যতিক্রমও আছে। কিন্তু পশ্চিমেরও সব ‘সাহিত্য জীবনের ছবি তুলে ধরে’—তাও কিন্তু পুরোপুরি ঠিক নয়। ওদের ওখানেই বহু আবর্জনা তৈরি হয়। আমাদের সাহিত্যে পশ্চিমের প্রভাবের কথা যদি তিনি বুঝিয়ে থাকেন তাহলে তিনি ভুল বলেন নি। তবে এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের এটাও মনে রাখা দরকার যে, যে-কোনো দেশের সাহিত্যই অন্য কোনো দেশের সাহিত্য দ্বারা প্রভাবিত। শুধু পশ্চিমই আমাদেরকে ধার দিয়ে যাচ্ছে, তারা আমাদের কাছ থেকে কোনো ধারকর্জ করে না—এটাও কিন্তু পুরোপুরি সত্য নয়। প্রাচ্যের সাহিত্যের প্রভাবও আছে পশ্চিমের উপর। বাঙালির মৌলিকত্ব নেই এটা ঠিক নয়। প্রভাবিত হয়ে যেকোনো প্রতিভাবান মৌলিক হতে পারেন। মৌলিক হলেই যে তার উপর অন্যের প্রভাব নেই তা ঠিক নয়।

মোহাম্মদ আলী

আহমদ ছফা ও হুমায়ুন আজাদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কোথায়? দুজনের দৃষ্টিভঙ্গি মন-মানসিকতা সম্পর্কে যদি বলতেন?

রাজু আলাউদ্দিন

হুমায়ুন আজাদ তীব্র, তীক্ষ্ণ অকপট, অকুতোভয়, একদেশদর্শী, গবেষক, অধ্যাপক, দুর্বিনীতি এক জলন্ত তরবারি। তার মধ্যে ছিল পাণ্ডিত্য ও সৃজনশীলতার সঙ্গম। পাঠের বৈচিত্র্য ও ব্যাপকতা আছে দুজনেরই, কিন্তু আহমদ ছফার পাঠ ও পর্যবেক্ষণে থাকে গভীর অন্তর্দৃষ্টি, অভিনব ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ। হুমায়ুন আজাদ এই অর্থে অনেকটা উপরিতলের বিশদ ও বিশ্বস্ত ভাষ্যকার। দুজনই রাজনীতি ও সংস্কৃতির গভীর পর্যবেক্ষক। হুমায়ুন আজাদ ধর্মকে আফিম ছাড়া কিছুই মনে করেন না, আহমদ ছফার কাছেও তাই কিন্তু তিনি এটা জানেন যে মানুষকে ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন করা অসম্ভব তাই তিনি কিছুটা সহানুভূতির সাথেই মানুষকে দেখেন। মোটাদাগে এগুলোই তাদের মৌলিক পার্থক্য।


হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে ফরহাদ মজহারের সব সময় তর্ক-বিতর্ক হতো।


মোহাম্মদ আলী

এ দুজনের মূল বিরোধটা ছিল কোন জায়গায়?

রাজু আলাউদ্দিন

আমার মতে, মূল পার্থক্য সমাজ ও সংস্কৃতিকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে।

মোহাম্মদ আলী

দুজনের চিন্তা-চেতনারও তো ভিন্নতা ছিল? একটু বলবেন?

রাজু আলাউদ্দিন

দুজনের চিন্তা চেতনার ভিন্নতা সম্পর্কে আপনার আগের এক প্রশ্নের উত্তরে দেয়া আছে বলে মনে হয়। পুনরুক্তি করে শুধু এইটুকু বলা যায়, আহমদ ছফার যেকোনো বক্তব্যে ও বিশ্লেষণে প্রতিফলিত হতো একটি জাতির সমগ্র ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে পরিচ্ছন্ন অভিজ্ঞতার নির্যাস। অন্যদিকে হুমায়ুন আজাদেরও সেটা ছিল। কিন্তু তিনি এসবকে বাঙালির নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য ও অভ্যাসগুলোর পক্ষে কেবল প্রয়োজনীয় ও প্রাসঙ্গিক অংশগুলো ব্যবহার করতেন। এর ফলে তার দৃষ্টিভঙ্গি অংশত খণ্ডিত রূপ ধারণ করত, তবে এই খণ্ডিত রূপটিকে তিনি ভাষার লালিত্য ও যুক্তির প্রখরতায় এমন সুগঠিত রূপে হাজির করতে পারতেন যে তা আমাদের কাছে অলঙ্ঘ্য বলে মনে হতো।

মোহাম্মদ আলী

বঙ্কিমচন্দ্র, নিরোদ সি চৌধুরী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আহমদ শরীফ বাঙালি সম্পর্কে যে রকম ধারণা, ভিন্নমত পোষণ করতেন, হুমায়ুন আজাদও তেমনটি করতেন, তাই না? এ ব্যাপরে আপনি কোন কোন জায়গায় ভিন্নমত পোষণ করেন?

রাজু আলাউদ্দিন

তারা প্রত্যেকে বাঙালির এক একটি দিক নিয়ে কথা বলেছেন এবং তাদের পর্যবেক্ষণ ঠিকই ছিল। হুমায়ুন আজাদও বাঙালির কপট স্বভাবের কথা বলেছেন—এটা তো মিথ্যে নয়। আমার কোনো ভিন্নমত নেই।

23658672_1704049659640507_2021162314706983214_n
রাজু আলাউদ্দিন ও ব্রাত্য রাইসু

মোহাম্মদ আলী

হুমায়ুন আজাদ ও আহমদ ছফার বিরোধের মূল কারণ কি? সাহিত্যিক না রাজনৈতিক বিরোধ?

রাজু আলাউদ্দিন

আমার মনে হয় রাজনৈতিক বা সাহিত্যিক এর কোনোটাই নয়। এটা ছিল ব্যক্তিত্বের সংঘাত যার সূত্রপাত হয়েছে পরস্পর সম্পর্কে পরস্পরের অসহিঞ্চু মন্তব্যের মাধ্যমে।

মোহাম্মদ আলী

আপনি কি হুমায়ুন আজাদ ও আহমদ ছফার এ বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগ নেন নি?

রাজু আলাউদ্দিন

না, কখনোই না। তারা দুজনই প্রতিভাবান। তাছাড়া দুজনের দৃষ্টিভঙ্গির স্বাতন্ত্র্য গড়ে উঠেছে পাণ্ডিত্য ও গভীর বিশ্বাসের ভিত্তির ওপর। সুতরাং আমি উদ্যোগ নিলেই যে এই বিরোধ মিটে যেত আমার তা মনে হয় নি। তাছাড়া এটা মেটাবারই বা দরকার কী? এই বিরোধ তো আমাদেরকে সমৃদ্ধ করছে।

মোহাম্মদ আলী

আচ্ছা, হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে ফরহাদ মজহারের সব সময় তর্ক-বিতর্ক হতো। দুজনের মত পার্থক্য কোন জায়গায়?

রাজু আলাউদ্দিন

হ্যাঁ, তারা দুজনই দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে ভিন্ন দুই মেরুর বাসিন্দা, ফলে তর্কবিতর্ক হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। হুমায়ুন আজাদ ঘোরতরভাবে ধর্মভিত্তিক বিশ্বাস ও সংস্কৃতির বিরোধী, অন্যদিকে ফরহাদ মজহার ধর্মভিত্তিক সংস্কৃতির পক্ষে। এই যে কয়েক বছর আগে ফরহাদ মজহার হেফাজতে ইসলামের পক্ষে গিয়ে দাঁড়ালেন, এটা থেকেই তো আমরা বুঝতে পারি তাদের তর্কের মূল কারণ কী হতে পারে। হুমায়ুন আজাদ ছিলেন পশ্চিমি সভ্যতার গুণে মুগ্ধ, যদিও পশ্চিমের রাজনীতির নিন্দাও তিনি কখনো কখনো করেছেন তবে মোটাদাগে তিনি পশ্চিমি সভ্যতাকে মানুষের জন্য কল্যাণকর বলেই মনে করতেন। কিন্তু ফরহাদ মজহার তা নন। ফরহাদ মজহার পশ্চিমি সভ্যতার মধ্যে মুনাফালোভী, সম্পদলিপ্সু ও যুদ্ধংদেহি রূপটি লক্ষ্য করে এর নিন্দায় মুখর। তিনি আশ্রয় খোঁজেন প্রাচ্যের ধর্মভিত্তিক উদার মানবিক সংস্কৃতির মধ্যে। কিন্তু ধর্মনিষ্ঠ সংস্কৃতি ও সমাজের অন্ধত্বকে তিনি এড়িয়ে যান, এর বিপদগুলো সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল হলেও নীরব। হুমায়ুন আজাদ এই অন্ধত্ব ও বিপদগুলো সম্পর্কে আমাদেরকে সচেতন করে তুলতে চেয়েছেন তীব্র ভাষায়।

মোহাম্মদ আলী

সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় আজাদের কোন দিকটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে? কোন বিষয়টি স্থূল মনে হয়েছে?

রাজু আলাউদ্দিন

আমার কাছে যেটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, তা হলো যে কোনো বিষয়ে উত্তর দেবার মননশীল সামর্থ্য। কোনো বিষয়ই স্থূল মনে হয় নি। এমনকি স্থূল বিষয়কেও তিনি উপভোগ্য করে তুলতে পারতেন।

মোহাম্মদ আলী

আজাদ কি কেবল নিজের মতামতের গুরুত্ব দিতেন? অন্যের মতামতের মোটেও দাম দিতেন না?

রাজু আলাউদ্দিন

এটা ঠিক যে, তিনি নিজের মতামতকেই গুরুত্ব দিতেন। অন্যের সেই মতামতকেই কেবল গুরুত্ব দিতেন যেটা তার পক্ষে যায়।

মোহাম্মদ আলী

তাহলে পশ্চিমা সাহিত্যকে কেন গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন?

রাজু আলাউদ্দিন

পশ্চিমা সাহিত্যকে গুরুত্ব দেয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। হুমায়ুন আজাদের মনের গঠনে পশ্চিমি শিল্প সাহিত্য ও বিজ্ঞানের বড় একটা ভূমিকা আছে। এবং এটাতো সত্যি যে পশ্চিম অনেক গুরুত্বপূর্ণ লেখকের জন্ম দিয়েছে। তিনি সেসব লেখকদের দ্বারা প্রভাবিতও। পশ্চিমা সাহিত্যে, তা সে কবিতায়ই হোক আর কথাসাহিত্যই হোক, কিংবা প্রবন্ধেও যে বড় বড় ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটেছে তা আমাদের সাহিত্যে খুব কম।

মোহাম্মদ আলী

তার কবিতা সম্পর্কে একটু বলবেন? শিল্প গুণ-টুন আছে কিনা?

রাজু আলাউদ্দিন

আমি তার প্রবন্ধ যেমন পছন্দ করি, তেমনি তার কবিতাও পছন্দ করি। তিনি প্রচুর প্রবন্ধ, কলাম এবং উপন্যাস ও শিশুসাহিত্য লিখেছেন বলে তার কবি পরিচয়টি অপেক্ষাকৃত কম আলোকিত। অথচ তিনি কবি হিসেবেও খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং আলাদা বৈশিষ্ট্যের। মনে রাখতে হবে তিনি মূলত কবি বলেই ওইরকম কাব্যিক মাধুর্য্যপূর্ণ গদ্য লিখতে পেরেছেন।

মোহাম্মদ আলী

আজাদের অনুবাদকর্ম সম্পর্কে মূল্যায়ন কী? তিনি এ ব্যাপারে কতটুকু সফল বা ব্যর্থ?

রাজু আলাউদ্দিন

হুমায়ুন আজাদের অনুবাদের গুণ সম্পর্কে প্রায় কেউই কিছু বলেন না। না বলার কারণ তিনি অনুবাদ খুব বেশি করেন নি। কিন্তু যেটুকু করেছেন তা এক কথায় অপূর্ব। অনুবাদের ক্ষেত্রে আমি যে বৈশিষ্ট্যকে আদর্শ বলে মনে করি অর্থাৎ মূলানুগতা তার সফল প্রয়োগ ঘটেছে অনুবাদগুলোয়।

মোহাম্মদ আলী

আপনাদের মধ্যে সাক্ষাৎকারের বাইরে আর কী কী বিষয়ে আলাপ-আলোচনা হতো? প্রেম, নারী, নারীর সৌন্দর্য—এগুলো নিয়ে আলাপ-টালাপ হতো?

রাজু আলাউদ্দিন

সাক্ষাৎকার গ্রহণের বাইরে অনেক বিষয়েই আলাপ হয়েছে তার সাথে। সাধারণত সমকালীন প্রসঙ্গই ছিল আলাপের বিষয়। সাহিত্য ও সংস্কৃতির যে সব বিষয় বিতর্কিত হয়েছিল সে সম্পর্কে তার অভিমত ও প্রতিক্রিয়া জানতে চাইতাম। অনিবার্যভাবেই লেখকদের প্রসঙ্গ তো ছিলই। প্রেম, নারী, নারীর সৌন্দর্যও ছিল আলাপের বিষয়। তবে নিজের প্রেম নিয়ে জানতে চাইলে তিনি তা কৌশলে এড়িয়ে যেতেন।

মোহাম্মদ আলী

হুমায়ুন আজাদের রোমান্টিকতা ও সৌন্দর্যবোধ সম্পর্কে কিছু বলুন?

রাজু আলাউদ্দিন

তার রোমান্টিকতা ও সৌন্দর্যবোধের পরিচয় উৎকীর্ণ তার কবিতা ও কথাসাহিত্যে। নিশ্চয়ই তিনি রোমান্টিক ধারার লেখক; বিদ্রোহ, কল্পনা ও প্রথাবিরোধিতা তার রক্ত মাংসে একাকার হয়েছিল। সৌন্দর্যবোধ দ্বারা তিনি কতটা উদ্দীপিত ছিলেন তার প্রমাণ মিলবে তার কবিতা ও কথাসাহিত্যে, এমনকি যেখানে পাণ্ডিত্য ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা থাকলেই যথেষ্ট, সেই প্রবন্ধ সাহিত্যেও রয়েছে তার সৌন্দর্য্যবোধের প্রখর প্রভাব। তার সমকালের আর একজন মাত্র লেখকের সাথেই কেবল তিনি তুলনীয় হতে পারেন যার নাম আবদুল মান্নান সৈয়দ, যদিও দুজনের মধ্যে পার্থক্যও আছে প্রচুর। কিন্তু সৌন্দর্যবোধের সর্বপ্লাবিতায় তারা অভিন্ন মেজাজের অধিকারী।

11751750_10153003361116824_4032055678183934397_n
রাজু আলাউদ্দিন

মোহাম্মদ আলী

‘সমকালের আর একজন মাত্র লেখকের সাথেই কেবল তিনি তুলনীয় হতে পারেন যার নাম আবদুল মান্নান সৈয়দ’ তার সঙ্গে হুমায়ুন আজাদের কি ধরনের তুলনা করবেন? মিল-অমিলের জায়গাগুলো কি?

রাজু আলাউদ্দিন

তুলনা এই অর্থে যে দুজনই ছিলেন সাহিত্যে আপাদমস্তক নিমগ্ন এবং বলতে গেলে এই নিমগ্নতা ছিল সার্বক্ষণিক। দুজনই সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় ছিলেন বিচরণশীল এবং দুজনেরই গদ্যে, বিশেষ করে প্রবন্ধের গদ্যশৈলী ছিল কল্পনা ও প্রাণোচ্ছল আবেগের নান্দনিকতায় সুমিষ্ট—এ হচ্ছে মিলের জায়গা। আর অমিল হচ্ছে এই যে, সাহিত্যবিচারের ক্ষেত্রে দুজনের মধ্যে পার্থক্য ছিল প্রচুর। হুমায়ুন আজাদ কোনো লেখকের রাজনৈতিক ও সামাজিক ভূমিকার মানদণ্ডে তার সাহিত্যিক-কর্মকে বিচার করতে আগ্রহী ছিলেন। যে-কারণে তিনি আল মাহমুদ, ফজল শাহাবুদ্দীন প্রমুখের কবিতা অন্তর্ভুক্ত করেন নি তার আধুনিক কবিতার সংকলনটিতে। আবদুল মান্নান সৈয়দ ওই মানদণ্ডে সাহিত্যকে বিচারের পক্ষপাতী ছিলেন না।


হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড ছাড়া আমি অন্য কিছু বলব না।


 মোহাম্মদ আলী

হুমায়ুন আজাদের মৃত্যু সম্পর্কে আপনার ধারণা কী? এটা কী স্বাভাবিক মৃত্যু?

রাজু আলাউদ্দিন

হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড ছাড়া আমি অন্য কিছু বলব না। যদিও তিনি আক্রমণ থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন চিকিৎসার ফলে, কিন্তু পরে জার্মানিতে আপাতদৃষ্টে তিনি স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছেন বলে আমাদের যে ধারণা আমি তা মেনে নেব না। না নেবার কারণ এই ভয়ংকর ও বর্বর আক্রমণ যে তাকে মানসিকভাবে সন্ত্রন্ত করে রাখে নি বা মৃত্যুভয় তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় নি আমরা কী করে বলি? সেটাই কি চূড়ান্ত মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠতে পারে না? এই ঘটনার প্রভাব তার সংবেদনশীল মনকে কিভাবে ছিন্নভিন্ন ও রক্তাক্ত করে দিচ্ছিল তার হদিস কি আমরা জানি? সেটাই যে তাকে হনন করে নি—এই দাবি করার জোরালো নথিপ্রমাণ কি আছে আমাদের কাছে?

মোহাম্মদ আলী

হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর পরে আপনার কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল?

রাজু আলাউদ্দিন

হুমায়ুন আজাদের উপর যখন আক্রমণটি হয়েছিল আমি তখন বিদেশে ছিলাম। এই দুঃসংবাদটি শুনে আমি মুষড়ে পড়েছিলাম। ভীষণ মন খারাপ হয়েছিল আমার। তার সাথে এত স্মৃতি এত দিনের চেনা জানা সব কিছু আমার মনের মধ্যে সরব হয়ে আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। আমি সেদিনই সঙ্গে সঙ্গে একটি প্রতিক্রিয়া লিখে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানকে পাঠিয়ে দিলাম ই-মেইল মারফত। তিনি সেই প্রতিক্রিয়াটি দ্রুতই প্রকাশ করেছিলেন। সেই প্রতিক্রিয়ার মধ্যে ছিল হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ ও হত্যা চেষ্টাকারীদের প্রতি ঘৃণা।

মোহাম্মদ আলী

তার জীবন দেওয়াটা কিভাবে মূল্যায়ন করেন?

রাজু আলাউদ্দিন

জীবন তিনি ‘দেন নি’, তাকে হত্যা করা হয়েছে। আমি এই হত্যাকে তুলনা করব এক আপসহীন অকুতোভয় বীরের মৃত্যুর সাথে যিনি নিজের লাভক্ষতির কথা বিবেচনা করে নয়, বরং নিজের জাতির কল্যাণে মৃত্যুবরণ করেছেন। এক অর্থে এই মৃত্যু শহিদের।

মোহাম্মদ আলী

তার সম্পর্কে আপনার সর্বশেষ মূল্যায়ন কী?

রাজু আলাউদ্দিন

সাহিত্যের চিরস্থায়ী মূল্যের বিচারে যেগুলোকে আমরা মহৎ বলে বিশ্বাস করি তিনি হয়তো তেমন কিছু লেখেন নি কিন্তু তিনি এককভাবে মানুষের কল্যাণে যে সাহস ও সততা নিয়ে লড়াই করেছেন এবং অবশেষে শহিদ হয়েছেন এ কারণে তিনি আমার কাছে অবশ্যই মহৎ এক ব্যক্তিত্ব। তিনি নিজের জীবনকে সাহিত্যকর্ম হিসেবে সৃষ্টি করে প্রথাবিরোধী মহৎ লেখকের দায়িত্ব পালন করেছেন। এই অর্থে তিনি শুধু মহৎ-ই নন, তিনি তার চেয়েও বেশি কিছু যা অনেক মহৎ লেখকরাও সাহসের অভাবে করতে পারেন না। নিজের শরীর ও জীবনটাকেই তিনি লেখার কাগজ করে তুলেছিলেন যেখানে তিনি রক্ত দিয়ে শৃঙ্খলিত মানুষের মুক্তির কথা লিখে গেছেন। তিনি ছিলেন ব্রুনো ও যিশুর সন্তান। তিনি পুরানের সেই ফিনিক্স পাখির মতো যিনি তার দেহভস্ম থেকে বার বার জন্ম নিতে থাকবেন।

মোহাম্মদ আলী

আপনাকে ধন্যবাদ।

রাজু আলাউদ্দিন

আপনাকেও ধন্যবাদ।

1
হুমায়ুন আজাদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বই।