হোম সাক্ষাৎকার বস্তুবাদী আবৃত্তিতত্ত্ব

বস্তুবাদী আবৃত্তিতত্ত্ব

বস্তুবাদী আবৃত্তিতত্ত্ব
1.25K
0

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদের জন্ম ১৯৪১ সালের ১৪ অক্টোবর। জন্মস্থান টাঙ্গাইল। ময়মনসিংহের মৃত্যুঞ্জয় স্কুল থেকে তিনি ১৯৬২ সালে ম্যাট্রিক ও আনন্দমোহন কলেজ থেকে ১৯৬৪ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। আনন্দমোহন কলেজ থেকেই বি.এ পাশ করেন ১৯৬৭ সালে। এরপর ১৯৬৯ সালে বাংলায় এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

কর্মজীবন কেটেছে শিক্ষকতায়।  ময়মনসিংহের মুকুল নিকেতন স্কুল, মিন্টু কলেজ ও গৌরীপুর ডিগ্রি কলেজ ছিল তার কর্মক্ষেত্র। তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ আবৃত্তি চর্চা শুরু করেন ১৯৫৭ সালে ১৬ বছর বয়স থেকে। তাঁর আবৃত্তি-শিক্ষক ছিলেন শৈলেশ্বর সান্যাল।

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ এ পর্যন্ত বহু সংগঠন থেকে সংবর্ধনা ও সম্মাননা পেয়েছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে শব্দ আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র, ময়মনসিংহ-১৯৯২, শ্রুতি আবৃত্তি সংসদ, নারায়ণগঞ্জ-১৯৯৩, স্বনন আবৃত্তি উৎসব, ঢাকা-১৯৯৫, স্বরকল্পন আবৃত্তি সম্মাননা পদক, ঢাকা-২০০৫, কবিতা বাংলা সম্মাননা পদক, ময়মনসিংহ-২০১১, নরেণ বিশ্বাস পদক, কণ্ঠশীলন, ঢাকা-২০১১, জেলা শিল্পকলা একাডেমী সম্মাননা, ময়মনসিংহ-২০১৩, সাহিত্য বাজার সম্মাননা-২০১৪।

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদের দুটি বই বের হয়েছে আবৃত্তির ওপর। আবৃত্তিলোক (ভাষাচিত্র, ২০০৯) এবং বস্তুবাদী আবৃত্তিতত্ত্ব (শিলালিপি, ২০১১)।

১৯৬৮ সালে ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদের আবৃত্তি শুনে স্বয়ং বঙ্গবন্ধু মুগ্ধ হয়েছিলেন। ১৯৬৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান টেলিভিশনে আবৃত্তি প্রোগ্রাম করেন। ঐ প্রোগ্রামের প্রযোজক ছিলেন প্রয়াত কবি শহীদ কাদরী। তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সকল প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করেন। ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬টি হলে ৬টি প্রথম পুরস্কার অর্জন করেন। আজ অব্দি সে রেকর্ড কেউ ভাঙতে পারে নি।

২০১০ সালের ডিসেম্বরে তার এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন কামরুল হাসান মঞ্জু ও জাহিদুল ইসলাম…


প্রশ্ন

আবৃত্তি কি স্বয়ম্ভু শিল্প? কেন?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

অবশ্যই স্বয়ম্ভু। এর পৃথক ভাষাব্যবস্থা আছে। প্রকাশ-প্রকরণে অন্যান্য শিল্প থেকে এর সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। নিজস্ব চলার রীতি আছে আবৃত্তির।

প্রশ্ন

আবৃত্তির ভিন্ন ভাষা বলতে কী বোঝায়? এ ভাষাটি কেমন?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

প্রত্যেক শিল্পের নিজ নিজ ভাষা থাকা অপরিহার্য। কিন্তু ‘আধুনিক’ বা ‘প্রথাগত’ আবৃত্তির নিজস্ব কোনো ভাষা প্রক্রিয়া নেই। তা কবিতার ভাষার কথা বলে—কবিতায় বিধৃত ‘সাধারণ ভাষা’ ও তার ‘শব্দ-সুর’ এবং ‘কবিতার ছন্দে’ তা পরিবেশিত হয়। তাই প্রথাগত আবৃত্তি স্বয়ম্ভু শিল্প হিশেবে দাঁড়াতে পারে না। আবৃত্তিকে স্বাধীন স্বয়ম্ভু শিল্প হতে হলে তার নিজস্ব ভাষাব্যবস্থা থাকা চাই। কবিতা থেকে বেরিয়ে না এসে এ ভাষা নির্মাণ সম্ভব নয়। কবিতার শৃঙ্খলা ভেঙে আবৃত্তি সৃষ্টি করে তার নিজস্ব ভাষা। সেই ভাষাটি কী রকম? ‘সাধারণ ভাষার সচেতন উচ্চারণ’, ‘আবৃত্তির বিশেষ ছন্দকলা’ এবং ‘আবেগ’—এই তিনে মিলে সেই শিল্পভাষা সৃষ্টি হয়, যার সঙ্গে জগতের অন্য কোনো শিল্পভাষার মিল নেই। আবৃত্তির ভিন্ন ভাষা বলতে আমরা বুঝব, ‘সাধারণত ভাষার সচেতন উচ্চারণ’, ‘বিষয়ভিত্তিক আবেগ’ এবং ‘আবৃত্তির ছন্দকলা’—অন্ধক্রিয়াবাদী ভাষা ব্যবহার নয়, কবিতার ছন্দ নয়, বিষয়-সম্পর্কহীন শূন্যগর্ভ ভাব-আবেগ নয় যা ‘প্রথাগত আবৃত্তি’তে দেখা যায়। বরং চাই ‘সচেতন উচ্চারণ’, ‘আবৃত্তি ছন্দকলা’ এবং ‘বিষয় সম্পর্কিত আবেগপুঞ্জ’। এ নিয়ে হয় আবৃত্তির স্বতন্ত্র শিল্পভাষা।

প্রশ্ন

তাহলে আবৃত্তি বস্তুটি কী?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

যে কোনো বিষয়কে—কি গদ্যের, কি পদ্যের—সচেতনভাবে আবেগ দিয়ে ‘আবৃত্তির ছন্দে’ প্রকাশ করাটাই আবৃত্তি। ‘সাধারণত ভাষা’, ‘শব্দ’ এবং ‘ভাব’ আবৃত্তির গুরুত্ত্বপূর্ণ উপাদান। তবে আবেগটাই প্রধান কথা। আবৃত্তির বিশেষ ধরনের  ছন্দকলা অন্যান্য শিল্প থেকে আবৃত্তিকে পৃথক করে দেয়। বস্তুবাদী আবৃত্তির ব্যাখ্যায় বলে ‘বিষয়বস্তু’  শিল্পের ভিত্তি তবে ‘বিষয় ও রূপ-এর একত্ব’ মার্কসবাদী শিল্প বা বস্তুবাদী আবৃত্তির চূড়ান্ত কথা। ‘বিষয়-অর্থ’ এবং ‘বিষয়-ভাব’কে সচেতনভাবে ‘আবেগ’ দিয়ে আবৃত্তির ছন্দে প্রকাশ করাটাই বস্তুত আবৃত্তি। এতে ‘বিষয় ও রূপের একত্ব রূপ পায়’। আবৃত্তির ভাববাদী ব্যাখ্যাও আছে। বিস্তর কথা বলেছেন ভাববাদীকুল। তবে বস্তুবাদী ব্যাখ্যা ভাববাদী ব্যাখ্যাকে নাকচ করে।


আবৃত্তির ছন্দ মনকে মুক্তি দেয় এবং আবৃত্তির ছন্দ-দোলা থাকে মন ও কণ্ঠের অধীন।


প্রশ্ন

বস্তুবাদী ও ভাববাদী আবৃত্তির মধ্যে পার্থক্য কী?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

বস্তুবাদী আবৃত্তির ভিত্তি—দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী নন্দনতত্ত্ব। অপরদিকে ভাববাদী আবৃত্তির ভিত্তি কালকৈবল্যবাদ, যার সঙ্গে বাস্তবের যোগ নেই। ভাববাদ এবং বস্তুবাদ দুই ভিন্ন বিশ্ব—দৃষ্টিভঙ্গির ফসল। একটির ভিত্তি মন, অপরটির ভিত্তি বস্তুজগৎ। ভাববাদী আবৃত্তি ভাববাদীর ফসল  হওয়ায় বস্তুসত্তার  সঙ্গে  তার যোগাযোগ নেই। এ কারণে তা  অনিকেত, কৃত্রিম হয়ে যায়। অপরদিকে বস্তুবাদী আবৃত্তি বস্তু সম্পৃক্ততার কারণে প্রকৃতজাত হয়ে থাকে। ভাববাদী আবৃত্তি কম্যুনিকেশন-এর গুণ বহন করে না। অপরদিকে  বস্তুগত ভাব-আবেগের কারণে বস্তুবাদী আবৃত্তি আত্মিক সংযোগে সক্ষম।

প্রশ্ন

‘কবিতার ছন্দ’ ও ‘আবৃত্তির ছন্দ’র মধ্যে পার্থক্য কী?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

কবিতার ছন্দের তাড়নায় মন এবং কণ্ঠ তাড়িত, পরাধীন থাকে। ফলে স্বতঃস্ফূর্ত এবং স্বাভাবিক ভাব-আবেগ স্ফুট হতে পরে না। ফলে কৃত্রিম ভাব-আবেগ নিয়ে আবৃত্তিকারকে কাজ করতে হয়। অপরদিকে আবৃত্তির ছন্দ মনকে মুক্তি দেয় এবং আবৃত্তির ছন্দ-দোলা থাকে মন ও কণ্ঠের অধীন। এতে ভাব-আবেগ প্রকাশ স্ফূর্তি লাভ করে। একটা ন্যাচারাল ব্যাপার ঘটে এতে।

প্রশ্ন

আপনি বলে থাকেন ‘আবেগ আবৃত্তির প্রাণ। এক অর্থে আবেগ আবৃত্তির ভাষা নির্মাণ করে’। ব্যাখ্যা করুণ।

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

অনুভব, উপলব্ধি, ভাব, অনুভূতি ইত্যাদি নিস্ক্রিয়-ইন্ট্রোভার্ট। আবেগ হলো সক্রিয়-এক্সট্রোভার্ট। আামদের অনুভূতি, উপলব্ধির জগৎকে আবেগ দিয়ে প্রকাশ করতে হয়। আর প্রকাশ না পেলে আত্মগত ভাবোচ্ছ্বাসের কী মূল্য! তাই বলছি আবেগই আবৃত্তির প্রাণ। ভাব ও অনুভূতি প্রকাশের জন্যে আবেগ চাই। সে কারণেই বলা হয়েছে, আবেগই আবৃত্তির ভাষা।

প্রশ্ন 

‘বিষয় ও রূপ’-এর একত্ব কী? বিষয় ও রূপের একত্ব কিভাবে রূপ পায়?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

আমাদের সকল ভাবের উৎস বিষয় বা বস্তু। মার্কস বলেছেন, ‘চেতনা তার জন্মলগ্ন থেকেই বস্তুর ভারে অভিশাপগ্রস্ত।’ অর্থাৎ চেতনা বা ভাবের বস্তু-সম্পৃক্ততা থাকবেই। তবে ইয়েটস বলেছেন, আমাদের ভাবের কথা সকল সময়েই বস্তুর নির্ভুল প্রতিফলন ঘটায় না। কিন্তু বস্তুবাদী শিল্পে বিষয় বা বস্তুর সঙ্গে ভাবের যোগসূত্র থাকতে হবে। এই যে বিষয়ের সঙ্গে ভাবের ঐক্য বা যোগসূত্র—একেই বলে বিষয়ের সঙ্গে  রূপের একত্ব। যেমন ‘বল বীর, বল উন্নত মম শির’ ইত্যাদি প্রথাগত বা আধুনিক আবৃত্তির ক্ষেত্রে কবিতার ছন্দে বলা হয়। তাতে বিষয়ের সঙ্গে ভাবের ঐক্য বজায় থাকে না। কিন্তু যদি তা আবৃত্তির ছন্দে প্রকাশ করা যায় তবে বিষয়ের সঙ্গে ভাবের ঐক্য রক্ষা হয়। সংক্ষেপে এটাই ‘বিষয় ও রূপের’ একত্বের মর্মকথা। নতুন ধারার আবৃত্তিতে বিষয় ও রূপের একত্ব রূপ পায়। অবশ্য ‘ফর্ম অ্যান্ড কন্টেন্ট’ বলে কথা আছে, তা এখানে বিবেচ্য নয়।

প্রশ্ন

‘বিষয়-অর্থ’ এবং ‘বিষয়-ভাব’ কী? ব্যাখ্যা করে বলুন।

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

লেখায়, কবিতায় অনেক কথাই থাকে যা কাল্পনিক-বাস্তবসম্মত নয়। সুতরাং তা বিষয়গত বা বাস্তব অর্থকে প্রকাশ করে না। আবার যা বস্তুগত বা বাস্তবসম্মত তা বিষয়গত অর্থকে প্রকাশ করে। বস্তুজগৎ বা বাস্তব জগৎই হচ্ছে বিষয়। আর বিষয়-ভাব হচ্ছে বস্তু-সম্পৃক্ত নির্ভুল ভাব। যা বাস্তবে আছে তজ্জনিত ভাবই বিষয়-ভাব।

যেমন :

This is the dead land
This is the cactus land

অথবা :

কোথায় পালাবে তুমি
চারদিকে ধূধূ মরুভূমি
আজ দিগন্তে মরিচিকাও যে নেই
নির্বাক নীল নির্মম মহাকাশে

ধনবাদী বাস্তবতাকে এভাবে প্রকাশ করেছেন দুই কবি-তা বিষয়-অর্থ ও বিষয়-ভাবকে নির্ভুলভাবে প্রকাশ করে। আবার কীটসের Ode to the Nightingale কবিতায় বিষয়-অর্থ বিষয়-ভাবকে প্রতিনিধিত্ব করে না, যাতে আত্মগত ব্যাপারগুলো প্রকট হয়ে ওঠে। আলেফ লায়লা, গুলে বাকোয়ালি, গাজী কালু, চম্পাবতী, বেহুলা ইত্যাদি আত্মগত কবিতার উদহারণ।

প্রশ্ন

ভাব ও অনুভূতি প্রকাশের আবেগ ব্যবহার করতে আবৃত্তিকার নিজে কি আবেগাক্রান্ত হবেন? আবৃত্তিকার নিজে আবেগাক্রান্ত হলে পরিবেশনার জন্য প্রয়োজনীয় আত্মনিয়ন্ত্রণ নস্যাৎ হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে না? আবেগ ব্যবহারের কৌশল কী?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

হ্যাঁ, আবেগাক্রান্ত হবেন, তাতে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা ভারসাম্য নস্যাৎ হবার সম্ভাবনা নেই। নাটকে, গানে, যাত্রায়, চলচ্চিত্রে তো অকসার আমরা আবেগাক্রান্তের ঘটনা দেখছি। তাতে তো সমস্যা হয় না। যেখানে আবেগের কথা আছে, ভাব আছে—তা স্বাভাবিক প্রকৃতগতভাবে প্রকাশ করাটাই আবেগ প্রকাশের কৌশল। যেমন ‘আমি ছিনিয়া আনিব বিষ্ণুবক্ষ হইতে যুগল কন্যা’—আবেগের তোড়ে আমরা পঙ্‌ক্তিটি উচ্চারণ করব। অর্থ বুঝে উচ্চারণ করলে আপনা থেকেই ভাব-আবেগ সৃষ্টি হবে। বস্তুত অর্থানুগ আবৃত্তি করাটাই আবেগ ব্যবহারের কৌশল।

প্রশ্ন

কবিতার শৃঙ্খল ভেঙে আবৃত্তি কিভাবে তার নিজেস্ব ভাষা সৃষ্টি করে?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

আবৃত্তিকার প্রথমত একটি কবিতার তল পর্যন্ত পরীক্ষা, পর্যালোচনা করে দেখবেন। দেখবেন, তাতে কতটা সত্য আছে বা নেই। সেই পর্যালোচনা এবং সমালোচনার আলোকে একটি কবিতার বিষয়কে আবৃত্তিকার তার নিজেস্ব বোধের ভিত্তিতে গ্রহণ করবেন, তাহলে আমরা দেখছি কবির অভিজ্ঞতার বিষয় আবৃত্তিকারের সমালোচনার ভেতর দিয়ে আসছে। এরপর সমালোচনায় কবি-কথা যদি নির্ভুল প্রমাণিত হয় তবে কোনো কথা নেই—সারসরি কবির বক্তব্য গ্রহণ করা হবে। যদি কোথাও ভুল থাকে তবে আবৃত্তিকার সত্যের নিরিখে তা ঠিক করে নিবেন। ঠিক করে নিবেন আবৃত্তির ভাষা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এ হলো বিষয় বা ভিত্তি সম্পর্কে কথা। অর্থাৎ বিষয়কে অন্ধ ভাবে নয়, পর্যালোচনার ভেতর দিয়ে গ্রহণ-বর্জন করতে হয়। এরপর  কবিতার ফর্ম বা রূপরীতির কথা। কবিতার রূপরীতি, যথা—‘সাধারণ ভাষা’, ‘কবিতার ছন্দ’ ও ‘শব্দ-সংগীত’-কে সম্পূর্ন ঝেড়ে ফেলতে হবে। অর্থাৎ সাধারণ ভাষা অন্ধোচ্চারণ ত্যাগ করতে হবে। কবিতার ছন্দ বিলোপ করতে হবে এবং শব্দ-সুরকে ত্যাগ করতে হবে। কেননা এগুলো আবৃত্তিকারকে বাস্তব জগতে যেতে দেয় না।

প্রথাগত আবৃত্তিতে আমরা দেখি ‘কবি-কথা’ অর্থাৎ কবিতার বিষয়কে অন্ধভাবে অনুসরণ করতে-কবিতার সুর, ছন্দ এবং সাধারণ ভাষা ব্যবহার করতে। সাধারণ ভাষা ব্যবহার করা হয় অসচেতনভাবে। ফলে প্রথাগত আবৃত্তিকার বাস্তব জগতের স্পর্শ পান না। এ কারণে বাস্তবজনিত ভাব ও আবেগ প্রথাগত আবৃত্তিতে দেখা যায় না। যে ভাব-আবেগ দেখা যায় তা কৃত্রিম। এ কারণে আমরা জিগির তুললাম, কবিতার শৃঙ্খল ভেঙে দেওয়াই আবৃত্তির মুক্তির মৌল শর্ত। কবিতাকে প্রথমে ভেঙে দিয়ে সমালোচনার ভিত্তিতে কবি-কথা গ্রহণ করা হবে। বিষয়ভিত্তিক আবৃত্তির নতুন ফর্ম গড়ে তোলা হবে।

প্রশ্ন

সমালোচনায় ‘কবি-কথা’র ভুল চিহ্নিত হলে আবৃত্তিকার তার উপজীব্য হিশেবে কবিতাটিকেই নাকচ করবেন না কেন? আবার অন্যের সৃষ্টিকর্মের পরিবর্তিত ব্যাখ্যা উপস্থাপন অর্থাৎ যেমনটা বললেন ‘আবৃত্তির ভাষা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঠিক করে নেবেন’—বিষয়টি কি নীতিবিরুদ্ধ নয়?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

না, নীতিবিরুদ্ধ হবে না। স্রষ্টা সৃষ্টি করবেন বটে কিন্তু সত্যের আলোকে তার সমালোচনার দায়-দায়িত্ব ও অধিকার সমালোচকের কাছে। একথা বলেছেন রবীন্দ্রনাথ। সুতরাং কবিতার কোথাও সত্যের ব্যত্যয় প্রমাণিত হলে আবৃত্তিকারের অধিকার আছে তাকে শুধরে দেবার। যেমন জীবনানন্দের ‘ক্যাম্পে’ কবিতার কথাই ধরুন। কবিতার শেষে কবি যে ভাব, অর্থে, মেজাজে কথাগুলো বলেছেন, তা চূড়ান্ত নিষ্ক্রিয়তা। বাস্তবে তা নয়। বিচার বিশ্লেষণে দেখা যায়, তা হবে বিক্ষুব্ধ মেজাজে-সক্রিয় ভাবে, আবেগে। আমরা এভাবেই কবি-কথার মর্ম বদলে দিয়ে থাকি যেন তা বাস্তবের সঙ্গে খাপ খায়।

প্রশ্ন

আবৃত্তিকারের সত্যবোধ কী বোঝায়?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

কবির মনোভূমিকেই সত্য বলেছেন রবীন্দ্রনাথ। সুতরাং আবৃত্তিকারের মনোভূমিই সত্য। তবে এই  মনোভূমি নির্মাণে কে কতটা সফল, সেটাই প্রশ্ন। জীবননানন্দ দাশের ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতাকে সকল সমালোচক বলেছেন নেগেটিভ বা নাস্তিধর্মী কবিতা। কিন্তু বিজ্ঞানসম্মতভাবে বা বস্তুবাদের আলোকে কবিতাটিকে বিচার করলে দেখা যায়, কবিতাটি একান্তই পজেটিভ। সত্যের এই যে বিরোধ, তা দুই ভিন্ন বিশ্ব-দৃষ্টিকোণ থেকে সৃষ্টি হয়। কোনটিকে গ্রহণ করবেন—ভাবের সত্য, নাকি বস্তুজগতের সত্য? যিনি যেটা গ্রহণ করবেন, তার কাছে সেটাই সত্য। তবে বস্তুবাদ ভাববাদী আবিলতা নাকচ করে। যেমন ধরুন ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার সত্যের কথা। ভাববাদ দিয়ে কিছুতেই প্রকৃত সত্যটি বের করে আনতে পারেন নি সমালোচককুল। বুদ্ধদেব, ড. ত্রিপাঠিসহ বহু ভাববাদী সমালোচক একে নেতিধর্মী কবিতা বলেছেন। কিন্তু বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি একটি ইতিবাচক বিপ্লবী কবিতা। বস্তুবাদ কবিতার প্রকৃত মানে বের করে আনতে অধিকতর সহায়ক। তাই বস্তুবাদের আলোকের মন তৈরি করাটাই প্রকৃত সত্যের চর্চা। তা কবিতার অর্থকে বাস্তব ভিত্তি দেবে। এ নিয়েই আবৃত্তিকারের সত্যবোধ। বস্তু ছাড়া আর কী আছে বলুন প্রকৃতি জগতে? মনটাও যে বস্তুর ক্রিয়া। মাথা আছে বলেই মনও আছে। বস্তুকে সত্য জানাই আবৃত্তিকারের সত্যবোধ।

প্রশ্ন

মার্কসীয় শিল্প-দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাধারণ শিল্প-দৃষ্টির আলোকে আবৃত্তির বিভাজনরেখাটি কেমন?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি বিষয়কে প্রাধান্য দেয়। এই দৃষ্টিকোণ শিল্পকে প্রাকৃতিক বলে জ্ঞান করে। বিপরীতে সাধারণ নান্দনিক বা কলাকৈবল্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি শিল্পের বা আবৃত্তির ফর্মকে প্রাধান্য দেয়, তাতে স্বভাবতই আবৃত্তি হযে যায় কৃত্রিম। এই কৃত্রিমতাই বিশ্বজোড়া আধুনিক আবৃত্তির ওপর জেঁকে বসেছে।

প্রশ্ন

আবৃত্তি থেকে কৃত্রিমতা পরিহার করার উপায় কী?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

এর একটিমাত্র উপায় আছে। তা হলো, আবৃত্তিকে ভাববাদী জোয়াল থেকে মুক্ত করে বস্তুবাদী আবৃত্তি প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসা। এর কোনো বিকল্প নেই। অর্থাৎ আমাদের ‘আধুনিক’ বা ‘বিকল্প’ ধারার আবৃত্তি থেকে বের হয়ে এসে ‘নতুন’ ধারার আবৃত্তি প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করতে হবে। নতুনধারা সম্পূর্ণ প্রকৃতিগত বা বস্তুবাদী এক আবৃত্তি প্রক্রিয়া।

প্রশ্ন

প্রকৃতি-ঘনিষ্ঠ আবৃত্তিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

বস্তুগত ভাবপুঞ্জ যার মাধ্যমে প্রকাশ করা যায় তাকেই আমরা প্রকৃত-ঘনিষ্ঠ আবৃত্তি বলব।


আবৃত্তিকারেরও সামাজিক দায়বোধ থাকা উচিত।


প্রশ্ন

‘বস্তুগত ভাবপুঞ্জ’ বলতে কী বোঝায়?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

জগতের সকল ভাবই বস্তুগত। তবে কখনো কখনো কবিতায় বস্তুর নির্ভুল ভাব প্রকাশ পায় না। যে ভাবের সঙ্গে বিষয় বাস্তবতা বা বস্তুগত ভাবের ঐক্য থাকে তাই বস্তুগত ভাবপুঞ্জ।

যেমন :

Birth copulation and death/ Thats all thats all and thats all.

ধনতান্ত্রিক বিশ্বের এই বাস্তবতা জগতের সর্বত্র চোখে পড়ে। সামাজিক বাস্তবতার নিখুঁত চিত্র এতে প্রতিফলিত হয়েছে। এটাই বস্তুগত ভাবপুঞ্জ।

প্রশ্ন

আধুনিক কবিতার গদ্যভাষা আমাদের আবৃত্তির ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে কি?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

না। কারণ আমাদের মূল ভাষাটি ভাবাবেগের। এর ওপরই জোর দেবেন প্রত্যেক আবৃত্তিকার। সাধারণ ভাষা গৌণ। এর তেমন শক্তি নেই প্রভাব ফেলার।

প্রশ্ন

‘সাধারণ ভাষা’ বলতে কী বোঝায়? সাধারণ ভাষা কেন ‘গৌণ’? এর ‘প্রভাব ফেলার শক্তি নেই’ কেন? বুঝিয়ে বলুন। ‘সাধারণ ভাষা’য় কি ভাবাবেগ নেই? ‘সাধারণ ভাষা’ ও ‘আবৃত্তির ভাষা’র দূরত্ব কেন? কতটা? ব্যাখ্যা করুণ। মূলধারার আবৃত্তির প্রভাবসম্পন্ন প্রচলন কি সাধারণ ভাষাকে পরিবর্তন করে ফেলবে না?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

যে ভাষায় আমরা কথা বলি, লিখি—সে ভাষাই সাধারণ ভাষা বা ফর্মাল ল্যাঙ্গুয়েজ এ ভাষার শক্তি আছে, আবেগ আছে। কিন্তু কবিতা আবৃত্তির সময় ঘটনা বদলে যায়। সে সময় সাধারণ ভাষার যান্ত্রিক উচ্চারণ হয় অর্থাৎ তাতে অর্থ না বুঝে উচ্চারণ করা হয়। এতে সাধারণ ভাষার কার্যকারিতা অনেকাংশে লোপ পায়। কিন্তু আমাদের কথা সেটা নয়। আমাদের ভাষ্য হচ্ছে, সাধারণ ভাষা যখন শিল্পভাষার অন্তর্গত হয় তখন তার মুখ্য ভূমিকা লোপ পায়। সামনে আসে ভাব-আবেগের ভাষা, ছন্দকলা ইত্যাদি। সে কারণেই আবৃত্তিকলায় সাধারণ ভাষা গৌণ-মুখ্য হচ্ছে ভাবাবেগ ও ছন্দ। অবশ্যই সাধারণ ভাষার ভাবাবেগ আছে। কিন্তু কবিতার আবৃত্তির সময় তা কৃত্রিম হয়ে যায়। প্রাকৃতিক ভাবাবেগ তাতে থাকে না। সাধারণ ভাষা ও আবৃত্তির ভাষার দূরত্ব এ কারণে যে সাধারণ ভাষা সাধারণ ভাষাই শুধু। কিন্তু আবৃত্তি ভাষা হচ্ছে শিল্প ভাষা। এ দুয়ের  দূরত্ব অনেক। সাধারণ ভাষার ছন্দ থাকে না, আবেগ থাকে না, ভাব থাকে না, সর্বোপরি আধুনিক আবৃত্তির সময় চেতনা থাকে না। সাধারণ ভাষা তার আপন নিয়মে চলে। আবৃত্তির ভাষা একে পরিবর্তন করবে না।

প্রশ্ন

আমরা যে ‘নতুন’ ধারার আবৃত্তির কথা বলছি সেটি কি ছন্দশাসিত আবৃত্তির ধারাকে সম্পূর্নভাবে বর্জন করবে?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

না, তা করবে না। এই অর্থে করবে না—সকল ধরনের আবৃত্তিই সমাজে থাকবে, প্রতিযোগিতা করবে। মাও যাকে বলেছেন, ‘শতফুল ফুটতে দাও’। যিনি নতুন ধারায় আবৃত্তি করবেন তিনি কবিতার ছন্দশাসিত আবৃত্তিও করতে পারেন। আবার কবিতার ছন্দের আবৃত্তিকে পুরোপুরি বর্জনও করতে পারেন। ব্যাপারটা যার যার ইচ্ছে-অভিরুচির ওপর নির্ভর করে। যেমন ধরুন, যারা ‘বিকল্প’ ধারার আবৃত্তি করেন তাদের কেউ কেউ পাশাপাশি ‘আধুনিক’ আবৃত্তিও চর্চা করে থাকেন। কেউ কেউ আবার কেবলই ‘বিকল্প’ ধারার আবৃত্তি করেন। ব্যাপারটা সেরকম।

প্রশ্ন

অতীত দিনের আবৃত্তিকে কি আমরা বাতিল করব নাকি ঐতিহ্য হিশেবে সংরক্ষণ করব?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

সংরক্ষণ করব। কোনো কিছুই বাতিল নয়, নেতির নেতিকরণ-এর আলোকে বেঁচে থাকবে।

প্রশ্ন

‘নতুন’ ধারার আবৃত্তির প্রশ্ন উঠে এল কেন?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

এর কারণ সমাজ। আমাদের সমাজ-অন্ত ও আন্তঃসমাজ হলো পুঁজিবাদী সমাজ যা এখন অবক্ষয়ে নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে। শোষণে-শাসনে জর্জরিত। এ অবস্থা চলতে দেওয়া যায় না। তার জন্যে শিল্পীরও ভূমিকা রয়েছে, দায়-দায়িত্ব আছে। সুতরাং আবৃত্তিকারেরও সামাজিক দায়বোধ থাকা উচিত। কিন্তু প্রচলিত বা প্রথাগত আবৃত্তি জনমনে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না, এর নান্দনিক বিভ্রমের কারণে। সমাজকে নাড়া দেওয়ার জন্যে, জনমনে সচেতনতা সৃষ্টি লক্ষে আবশ্যক হয়েছে ‘ধ্রুপদী আবৃত্তির একটি স্পাইরাল রূপের’, যা সমাজ ভাঙতে ও নতুন সমাজ গড়তে সাহায্য করবে। নতুন ধারার আবৃত্তি জনমনে সহজেই চেতনা সৃষ্টি করতে পারবে যা ‘প্রথাগত’ আবৃত্তি দিয়ে সম্ভব হয় না। এ কারণেই নতুন ধারার আবৃত্তির চলনের প্রশ্ন এল। জনমনে চেতনা এলেই সমাজ ভাঙা-গড়ার কাজ হবে।

প্রশ্ন

আবৃত্তি কি সমাজ বদলে কোনো ভূমিকা রাখতে সক্ষম?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

আবৃত্তি বরাবর ইতিহাসে সমাজ বদলে ভূমিকা নিয়েছে। আজও নেবে। অবশ্য প্রথাগত আবৃত্তি এক্ষেত্রে ব্যর্থ। বস্তুবাদী আবৃত্তিকে এর দায়-দায়িত্ব নিতে হবে।

প্রশ্ন

আবৃত্তির আদৌ কোনো সামাজিক উপযোগিতা আছে কি?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

আবৃত্তি চিরকালই সামাজিক প্রয়োজনীয়তা পূরণ করেছে। আদিমকালে যখন ভাষা ও হাতের ব্যবহারের সাহায্যে মানুষের গুরুমস্তিষ্ক আকারে-প্রকারে বড় হচ্ছিল তখন আবৃত্তির ভূমিকা ছিল সীমাহীন। পরবর্তীতে জাদু সমাজে আবৃত্তির বিশেষ উপযোগিতা ছিল। ধর্মীয় যুগে আবৃত্তি ছাড়া কি ধর্মচর্চা চলেছে? ষড়-বেদাঙ্গ, কেরাত শাস্ত্র, হোমারের কবিতা আবৃত্তি বিশেষ সামাজিক ভূমিকা নিয়েছে। কিন্তু দুঃখের কথা এই, রেনেসাঁর পর থেকে আবৃত্তি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। রেনেসাঁর আবৃত্তির জেরই আজকের দিনের প্রথাগত আবৃত্তি, যা সমাজ ভাঙতে ও নতুন সমাজ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মোটেই উপযোগী নয়। এ অবস্থা দূর করে ইতিহাসের সঙ্গে সংগতি রেখে আবৃত্তিকে আবার সামাজিক ভূমিকা নিতে হবে, এই হলো ইতিহাসের ভবিতব্য। তা করতে হলে আবৃত্তিকে একটি স্পাইরাল রূপ নিতে হবে।

প্রশ্ন

‘ধ্রুপদী’ আবৃত্তি কী?  ধ্রুপদী আবৃত্তির স্পাইরাল রূপ’ই বা কী?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

চিরায়ত ভাবসম্পন্ন আবৃত্তিই ধ্রুপদী আবৃত্তি। আমাদের দুঃখ, বেদনা, হাসি, কান্না ইত্যাদি প্রকাশক আবৃত্তিই ধ্রুপদী আবৃত্তির অর্ন্তগত। যেমন : প্রাচীন গ্রিসের আবৃত্তি, মধ্য এশিয়ার আবৃত্তি, হোমারের কবিতা আবৃত্তি ইত্যদি। সে আবৃত্তি আর ফিরে আসবে না। কিন্তু তার জীবন্ত অংশ নিয়ে বর্তমানের চেতনার আলোকে যে বিকশিত আবৃত্তি সৃষ্টি হবে তাকেই আমরা বলব আবৃত্তির স্পাইরাল রূপ বা সর্পিল বিকাশ—যা অতীতকে কতকটা ধারণ করবে, কতকটা বর্জন করবে। সমাজের বিকাশ ঠিক এভাবে হয়। এই নিয়মে হয়।

প্রশ্ন

মানুষের গুরুমস্তিষ্কের বিকাশে আবৃত্তির বিশেষ ভূমিকার বিষয়টি ব্যাখ্যা করুন।

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

ভাষা, স্বরের দোলা এবং হাতের ব্যবহার-এর সমন্বিত ক্রিয়া মস্তিষ্কের দ্রুত বিকাশ এনে দেয়। ভাষা এবং স্বরের দোলা আবৃত্তিরই অনুষঙ্গ। এই অর্থে আমরা বলি, আবৃত্তি মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশে বিশেষ ভূমিকা নেয়।

প্রশ্ন

জাদু সমাজে আবৃত্তির প্রভাবময়তা ও ভূমিকা সম্পর্কে কিছু বলবেন?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

জাদু সমাজে সকল কাজ জাদুমন্ত্রের সাহায্যে হতো। শিকার, চিকিৎসা, যুদ্ধ ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে জাদুর প্রভাব ছিল। জাদুবিদ্যায় আবৃত্তি তথা ছন্দোবদ্ধ মন্ত্র প্রায় সকল কাজে ব্যবহৃত হতো। জাদু ছিল সকল কাজের প্রেরণা। গোটা সমাজ সে কালে জাদুমন্ত্রের অধীন ছিল।

প্রশ্ন

ষড়-বেদাঙ্গ, কেরাত শাস্ত্র বা হোমারের কবিতা আবৃত্তি কিভাবে ও কী বিশেষ সামাজিক ভূমিকা নিয়েছিল?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

ধর্ম রক্ষা অর্থাৎ ধর্মীয় বাণী প্রচারে কেরাত শাস্ত্র ও ষড়বেদাঙ্গ সমাজে বিশেষ ভূমিকা নেয়। হোমারের কবিতা আবৃত্তি সেকালে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হতো রামায়ণ মহাভারতের মতো। হোমারের কবিতা আবৃত্তি বংশ পরম্পরায় ঘরনা-ব্যবস্থাও ছিল। এইসব আবৃত্তি ব্যাপক জনজীবনকে প্রভাবিত করত জীবনে চলার পথে। ষড়-বেদাঙ্গ, কেরাত শাস্ত্র, হোমারের কবিতা সমাজে ন্যায়নীতি শিক্ষা দিত। সুতরাং এতদ্বজনিত আবৃত্তি ছাড়া তৎকালীন সমাজকে ভাবাই যেত না।


‘নতুন’ ধারার আবৃত্তিতে প্রতিটি শব্দ জেনে-বুঝে সচেতনভাবে উচ্চারণ করা হয়।


প্রশ্ন

রেনেসাঁ-পরবর্তী সমাজবিচ্ছিন্ন ধারাকে আপনি আজকের দিনের ‘প্রথাগত’ বা ‘আধুনিক’ ধারা হিশেবে অভিহিত করছেন? কোন বিশেষ রাজনৈতিক প্রেক্ষপটে কী আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ায় এ ধারার উৎপত্তি ও বিকাশ?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

রেনেসাঁর আগে আবৃত্তির একটি শক্ত ধর্মীয় ভিত্তি ছিল। রেনেসাঁর কাল থেকে ধর্মীয় বন্ধন শিথিল হবার ফলে ধর্মীয় আবৃত্তি ম্লান হতে থাকে। তখন মানুষের কর্ম-উদ্যম, মানুষের সৃষ্টিশীলতা সমাজে বিশেষ ভূমিকা নেয়। এই সময় সামন্ত অর্থনীতি ভেঙে পড়তে থাকে এবং মানুষ ক্রমেই শিল্প-অর্থনীতির দিকে ঝুঁকতে থাকে। এই বাস্তবতায় আধুনিক আবৃত্তির সৃষ্টি ও বিকাশ, যার জের জগতের সকল আধুনিক আবৃত্তিতে চলছে। রেনেসাঁ আন্দোলনের ফলে সামন্ত শ্রেণির পরাজয় ঘটে এবং বুর্জোয়া শক্তির উত্থান হয়। আধুনিক আবৃত্তি বস্তুত বুর্জোয়া সংস্কৃতির ফল যা সামন্ত আবৃত্তিকে প্রতিস্থাপিত করে।

প্রশ্ন

‘নতুন’ ধারার আবৃত্তির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট কী?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

‘নতুন’ ধারার আবৃত্তি ‘আধুনিক’ বা ‘বিকল্প’ ধারার আবৃত্তির সঙ্গে কোনো দিক দিয়েই মেলে না। প্রথমত, ধরা যাক উচ্চারণের কথা। ‘আধুনিক’ বা ‘বিকল্প’ ধারায় উচ্চারণ হয় অসচেতনভাবে। আবৃত্তিকার কী বলছেন না বলছেন সেদিকে খেয়াল থাকে না। জেনে-বুঝে শব্দ উচ্চারণ হয় না উল্লেখিত ধারা দুটোতে। অন্যদিকে ‘নতুন’ ধারার আবৃত্তিতে প্রতিটি শব্দ জেনে-বুঝে সচেতনভাবে উচ্চারণ করা হয়। দ্বিতীয়ত, ‘আধুনিক’ বা ‘বিকল্প’ ধারার আবৃত্তিতে ভাব-আবেগ কৃত্রিম। কিন্তু ‘নতুন’ ধারার আবৃত্তির ভাব-আবেগ স্বতঃস্ফূর্ত এবং প্রকৃতিগত-ন্যাচারাল। তৃতীয়ত, ‘নতুন’ ধারার আবৃত্তিতে ব্যবহার করা হয় কবিতার ছন্দের বিপরীতে নতুন ধারার নিজস্ব ছন্দকরা।

প্রশ্ন

‘নতুন’ ধারার আওতায় বিভিন্ন সময়ে ‘চেতনাপ্রবাহ’ বা ‘স্ট্রিম অব কনশাসনেস’-এর কথা বলেছেন। বিষয়টি কী?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

মূল ধারা বা নতুন ফর্মের আবৃত্তিতে প্রতিটি শব্দ বা শব্দমালাকে সচেতন, জাগ্রতভাবে উচ্চারণ করতে হয় পূর্বাপর।

প্রশ্ন

আপনি বলে থাকেন, মূলধারায় যথার্থ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে চেতনাপ্রবাহ সঞ্চারিত হয় শ্রোতার মধ্যে। ধারণাটা কি বিজ্ঞানসিদ্ধ কিংবা মূলধারা, নতুন ধারা বা বস্তুবাদী ধারার সাথে সংগতিপূর্ণ? কিভাবে? ব্যাখ্যা করুন?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

কেচ্ছা-কাহিনি বা কবিয়ালদের আবৃত্তিই এর প্রমাণ। তা বিজ্ঞানসিদ্ধ হবে না কেন? বিষয়ের সঙ্গে যদি ভাবের সংযোগ ঘটে সে ভাবের কথা যদি সচেতনভাবে প্রকাশ করা যায় তবে শ্রোতার মনে তা আপনা থেকেই সঞ্চারিত হবে—যা কবিগান, কেচ্ছা-কাহিনিতে আমরা দেখে থাকি। হ্যাঁ, তা মূলধারা বা বস্তুবাদী ধারার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। বস্তুবাদী ধারা করডোয়েলের শিল্পতত্ত্ব অনুযায়ী বিষয়ের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ভাব প্রকাশ করে আর তা করে বলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শ্রোতার মনে তা সঞ্চারিত হয়, যা একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া।

প্রশ্ন

আজকের দিনে সর্বগ্রাসী বাণিজ্যিক ও নিপুণ দৃশ্যে-শব্দে নিমজ্জিত মোহাবিষ্ট কিংবা নাগরিক যন্ত্রণাক্লিষ্ট বা জীবিকা-সংকটাপন্ন শ্রোতাকে আকৃষ্ট করতে বা জাগিয়ে তুলতে আবৃত্তি কি আদৌ সক্ষম? বিশেষত যখন অন্ধত্বের রাজত্ব, বধিরতার সাম্রাজ্য। বাস্তব জগতের প্রতিনিধিত্বকারী শব্দরাশির কী ধরনের উচ্চারণ-প্রকৌশল কার্যকর চেতনাপ্রবাহ বা স্ট্রিম অব কনশাসনেস সৃষ্টিতে সক্ষম যা শ্রবণে অনুপস্থিত বাস্তব জগৎকে প্রত্যক্ষণের অভিজ্ঞান লাভ করবে মানুষ?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

আমাদের টেক্সট হচ্ছে সত্য এবং প্রকৃতি। যদি আবৃত্তি প্রকৃতির গুণসম্পন্ন হয় তবে কৃত্রিম সভ্যতায় মোহাবিষ্ট মানুষ অবশ্যই প্রকৃতিগত আবৃত্তিতে আকৃষ্ট হবেন এবং জেগে উঠবেন। যুগে যুগে এ রকমই দেখা গিয়েছে। বিষয় ও ভাবে একাত্ম হয়ে প্রকাশ প্রকরণ হলেই স্ট্রিম অব কনশাসনেস সৃষ্টি হবে।

প্রশ্ন

আবৃত্তি ভাষা-প্রকরণত্রয়ী ‘সাধারণ ভাষার সচেতন উচ্চারণ’, ‘আবৃত্তির বিশেষ ছন্দকলা’ এবং ‘বিষয় সম্পর্কিত আবেগপুঞ্জ’—এ বিষয়গুলোকে সহজ-সাধারণভাবে ব্যাখ্যা করুন।

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

আমরা সাধারণত কবিতায় ব্যবহৃত সাধারণ ভাষার উচ্চারণ করি অসচেতনভাবে—কথা সাম্যক না বুঝে। ফলে আবৃত্তিতে বিষয় ও ভাবের অনুপস্থিতি থেকে যায়—আবৃত্তির যে ভাব দেখি, তা শূন্যগর্ভ থেকে যায়। কিন্তু সচেতন উচ্চারণের ফলে বিষয় ও যথাযথ ভাব স্ফুট হয়, পরিষ্কার হয়—অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা যায়। সে কারণে যন্ত্রিক উচ্চারণ নয়, আবৃত্তিকলায় জেনে-বুঝে সচেতনভাবে উচ্চারণ কাম্য। অসচেতন উচ্চারণে ভাব থাকে বটে কিন্তু তা বিষয়ের সাথে যোগ রাখে না। আবৃত্তিতে কবিতার ছন্দ প্রয়োগের ফলে বিষয় ও ভাব আড়াল হয়। অন্যদিকে আবৃত্তির ছন্দ বিষয় ও ভাবকে পরিষ্কার করে। সাধারণত আমরা আবৃত্তিতে দেখি কৃত্রিম ভাব-আবেগ। কিন্তু আবৃত্তিতে থাকতে হবে বিষয়যুক্ত প্রকৃতিগত আবেগপুঞ্জ। তবেই কম্যুনিকেট করবে। সহজ ও সংক্ষেপে এই হলো ‘সাধারণ ভাষায় সচেতন উচ্চারণ’, ‘আবৃত্তির বিশেষ ছন্দকলা’ ও ‘বিষয়গত আবেগ পুঞ্জ’র কথা।

প্রশ্ন

‘নতুন’ ধারার আবৃত্তির কোনো ব্যাকরণসূত্র আছে কি? থাকলে বর্ণনা করুন।

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

নতুন ধারার আবৃত্তির ব্যাকরণসূত্র নেই। তবে যেহেতু এতে সাধারণ ভাষা ব্যবহার করা হয় সে অর্থে এর ব্যাকরণসূত্র আছে। ধ্বনিবিজ্ঞানই সাধারণ ভাষার ব্যাকরণের সূত্র। এ ছাড়া এর ব্যাকরণ কোথায়? যেহেতু নতুন ধারার আবৃত্তি মূলত প্রাকৃতিক ছন্দ ও ভাব-আবেগ নির্ভর, ভাব-আবেগকে কি ব্যাকরণ সূত্র দিয়ে বাঁধা যায়? ছন্দও যার যার পরিমিতিবোধ-নির্ভর। একেও ব্যাকরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।

প্রশ্ন

এ ব্যাখ্যাটিতে পরস্পর-রিবোধী অবস্থান, উপাদান রয়েছে; আপাত স্ববিরোধীতাও রয়েছে বলে মনে হয়। আরেকটু বিস্তারিত বলুন?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

আবৃত্তির মূল ভাষা-ভাব ও আবেগ। সাধারণ ভাষা অনুষঙ্গ। এই অনুষঙ্গ বা সাধারণ ভাষার ব্যাকরণ আছে। ভাবাবেগের ব্যাকরণ নেই। যেহেতু আবৃত্তির মূল ভাষার ব্যাকরণ নেই, সেহেতু আমরা বলব আবৃত্তির ব্যাকরণ নেই। কিন্তু সাধারণ ভাষার ব্যাকরণ আছে। সেই কারণে আমরা বলি, আবৃত্তির এক অংশের সাধারণ ভাষার ব্যাকরণ আছে, অন্য অংশের ভাব-আবেগের ব্যাকরণ নেই।

প্রশ্ন

আবৃত্তির স্বরলিপি নির্মাণ সম্ভব কি?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

ভাববাদীরা তা পারেন। বস্তুবাদে সম্ভব নয়। কারণ প্রতিটি আবৃত্তিই পৃথক সৃষ্টি। সৃষ্টির তোড়ে পূর্ব নির্ধারিত স্বরলিপি ভেঙে যাবে। এজন্যে বস্তুবাদী আবৃত্তিতে স্বরলিপি নির্মাণ সম্ভব নয়। ড. হাজরা অবশ্য আধুনিক আবৃত্তিভিত্তিক স্বরলিপি নির্মাণ করেছেন। বিকল্প ধারাতেও হয়তো তা সম্ভব। কিন্তু বস্তুবাদী প্রক্রিয়ায় বা নতুন ধারায় তা সম্ভব নয়। কারণ সৃষ্টির তোড়ে প্রকাশ বৈচিত্র্যের বৈশিষ্ট্যের কারণে পূর্বনির্ধারিত লয়, মাত্রা ভেঙে যাবে, যার যার সৃষ্টিশীলতার জন্যে।

প্রশ্ন

‘নতুন’ ধারার আবৃত্তিতে কবিতার বিশ্লেষণ সম্পর্কে বলুন?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

নতুন ধারার আবৃত্তি প্রধানত বিশ্লেষণাত্মক আবৃত্তি। আবৃত্তিকার এতে প্রথমত কবিতার পূর্বাপর বুঝবেন, উপলব্ধি করবেন; তারপর শব্দের প্রতিটি গুণ বিচার করে বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রকাশ করবেন। সমালোচককুল যেভাবে কবিতাকে বিচার-বিশ্লেষণ করেন, আবৃত্তিকারও তাই করে থাকেন। প্রতিটি শব্দ আলাদা আলাদাভাবে ভাগ করে, বিশ্লেষণ করে, তবে আমরা আবৃত্তি করব। প্রতিটি শব্দের অর্থ বিশ্লেষণ করে তার আবৃত্তি করতে হয়। এ হচ্ছে অ্যারিস্টটলীয় মতবাদ-সত্তার গুণ-ধর্ম বিচার করে তবে উচ্চারণ করতে হয়।


বস্তুবাদী আবৃত্তিতে উচ্চারণের ভূমিকা গৌণ। উচ্চারণ আবৃত্তির সহায়ক মাত্র।


প্রশ্ন

কবিতার অন্তর্লীন ভাব-তাৎপর্য পরিস্ফুটনের জন্যে কী করব?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

কবিতার ভাব-তাৎপর্য পরিস্ফুট করতে চাইলে প্রথমত কবিতাটি ভালো করে বুঝতে হবে, উপলব্ধি করতে হবে। এরপর ‘আবৃত্তির ভাষা’ ব্যবহার করতে হবে। ভাষার মাধ্যমে আত্মীকৃত কবিতার ভাব-তাৎপর্য প্রকাশ পাবে। ‘সাধারণ ভাষা’, ‘আবেগ’ ও ‘আবৃত্তির ছন্দ’—এই নিয়ে সৃষ্টি হয় ‘আবৃত্তির ভাষা’। ভাষা ব্যবহার করলে ভাব-তাৎপর্যের জন্যে ‘আবৃত্তির ভাষা’ ব্যবহার করতে হবে।

প্রশ্ন

উচ্চারণ আগে না আবৃত্তি আগে?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

আগে আবৃত্তি, যথা : ভাব, আবেগ, ছন্দ। বস্তুবাদী আবৃত্তিতে উচ্চারণের ভূমিকা গৌণ। উচ্চারণ আবৃত্তির সহায়ক মাত্র।

প্রশ্ন

বস্তুবাদী আবৃত্তিতে উচ্চারণের ভূমিকা কেন ও কিভাবে গৌণ?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

বস্তুবাদী আবৃত্তিতে বিষয় ও ভাবই প্রধান। ভাব প্রকাশের জন্য রয়েছে আবেগ। আবেগ গ্রহণ করে কম্যুনিকেশন-এর মূল ভূমিকা। উচ্চারণের গুরুত্ব অবশ্যই আছে কিন্তু তা মুখ্য নয়। মুখ্য হচ্ছে অর্থগত বা বিষয়গত ভাব ও আবেগ।

প্রশ্ন

শুদ্ধ উচ্চারণ আবৃত্তির জন্যে কতটা অনিবার্য?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

শুদ্ধ উচ্চারণ দরকার। তবে আবৃত্তির প্রকৃত কথা নিছক যান্ত্রিক উচ্চারণ মাত্র নয়, যা প্রথাগত আবৃত্তিতে দেখা যায়। প্রয়োজন সচেতন উচ্চারণ। চেতনা ছাড়া ভাব-আবেগ, বস্তুগত প্রতিফলন কিছুই সম্ভব নয়। সুতরাং আমরা বলব নিছক শুদ্ধ উচ্চারণ নয়, শুদ্ধ-সচেতন উচ্চারণ আবৃত্তির ক্ষেত্রে প্রয়োজন ও অনিবার্য।

প্রশ্ন

‘নতুন’ ধারায় ছড়া ও গদ্য কবিতার আবৃত্তিতে পার্থক্য আছে কি?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

নেই। কারণ কবিতার ছন্দ ভেঙে বিষয়ভিত্তিক আবৃত্তি তার নিজস্ব জগতে প্রবেশ করে। এতে কবিতার ফর্মের অবশেষমাত্র থাকে না। সে কারণে এখানে ছড়া বা গদ্য ছন্দের কোনো প্রভাব থাকে না। আবৃত্তি তার নিজস্ব গতিতে চলে কবিতার ছন্দহীন প্রকরণে প্রবেশ করে।

প্রশ্ন

‘নতুন’ ধারার আবৃত্তিতে গদ্য আবৃত্তি ও কবিতা আবৃত্তির মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে কি?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

না নেই। দু’ক্ষেত্রেই অর্থ বা বিষয় প্রধান। এই আবৃত্তিতে কবিতার ফর্ম ঝরে পড়ে। কবিতার বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে আবৃত্তির ফর্ম নতুন করে গড়ে ওঠে নতুন ধারার আবৃত্তিতে। যেহেতু কবিতার ফর্ম বা কবিতার ছন্দের কোনো প্রভাবই থাকে না, সুতরাং ছড়ার ছন্দ ও গদ্যছন্দের পার্থক্যের কোনো প্রশ্নই আসে না নতুন ধারার আবৃত্তিতে।

প্রশ্ন

আবৃত্তিতে মিউজিকের ব্যবহারকে কিভাবে দেখেন?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

আবহ সংগীত আবৃত্তির জন্যে উত্তম কথা। তবে আবহ সংগীতকে মানসম্পন্ন হওয়া দরকার। আবৃত্তি একটি সূক্ষ্ম স্পর্শকাতর শিল্প। সে কারণে আবহ সংগীত তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হওয়া চাই। মানসম্পন্ন মিউজিক আবৃত্তিকে অধিকতর স্ফুট করবে। আবৃত্তিতে মিউজিকের ব্যবহার, এর চমৎকারিত্ব বাড়বে। কিন্তু কথা আছে। মনে রাখতে হবে, নতুন ধারার আবৃত্তি স্পর্শকাতর এবং ধ্রুপদী শিল্প। সে কারণে মিউজিক এর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়া দরকার।

প্রশ্ন

আবৃত্তিতে নাচের ব্যবহারকে কিভাবে দেখেন?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

খুব ভালো কথা। মানসম্পন্ন নাচ আবৃত্তির সঙ্গে দেওয়া যায়। নৃত্যকলা যোগ হলে আবৃত্তির চমৎকারিত্ব বাড়বে।

প্রশ্ন

স্থান-কাল-পাত্রভেদে স্বর প্রক্ষেপণে কি পার্থক্য আনা উচিত?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

দরকার নেই। আমরা মাইক্রোফোন ব্যবহার করি। তাতে করে স্বর প্রক্ষেপণে পার্থক্য আনার প্রয়োজন দেখি না। তবে বিষয় অনুসারে কণ্ঠের ওঠা-নামা, হ্রস্ব-দীর্ঘের মাত্রা সব সময় থাকবেই।

প্রশ্ন

মাইক্রোফোনের ব্যবহার কি আবৃত্তির প্রাকৃতিকতা নষ্ট করে যান্ত্রিকতা এনে দেয়?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

মনে হয় না। আর যান্ত্রিকতা সৃষ্টি করলেই বা উপায় কী বলুন? একে তো ত্যাগ করা যাচ্ছে না। রেডিও টিভিতে তো একই ব্যাপার—মাইক্রোফোনের ব্যবহার আছেই। ঘরোয়া পরিবেশে কি খুব একটা আবৃত্তির অনুষ্ঠান হয়? সেন্সেটিভ মাইক্রোফোন, আমার মনে হয়, কোনো যান্ত্রিকতা সৃষ্টি করে না।

প্রশ্ন

বেতার, টেলিভিশন ও মঞ্চের আবৃত্তির মধ্যে কোনটি বেশি হৃদয়গ্রাহী? কেন?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

আমার মনে হয় মঞ্চের আবৃত্তি অধিকতর হৃদয়গ্রাহী। তার কারণ এতে সরাসরি শিল্পীকে দেখা যায়, তাকে জানা যায়, বোঝা যায়। শিল্পীকে খোলা চোখে দেখা যায়। এর প্রথক একটি আনন্দ আছে।

প্রশ্ন

দ্বৈত বা বৃন্দ আবৃত্তি সম্পর্কে আপনার মতামত কী?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

ভালো। এতে বৈচিত্র্য আসে।

প্রশ্ন

কবিতার নাটকীয় প্রকাশ কি দূষণীয়?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

বিষয় অনুযায়ী প্রকাশটাই প্রকৃত কথা। বিষয়ে নাটকীয়তা থাকলে আবৃত্তিকার তা অনুসারে করবেন। যেমন ধরুন, ‘বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনোজলে ভেসে? চমৎকার ধরা যাক দু একটা ইঁদুর এবার’। এখানে নাটকীয়তা দূষণীয় নয়। কিন্তু আরোপিত নাটকীয়তা নতুন ধারায় গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রশ্ন

‘নতুন’ ধারার আবৃত্তি কি কবিতার তাৎপর্য ও রূপককে প্রশ্রয় দেয়?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

অবশ্যই।

প্রশ্ন

রবীন্দ্র কবিতার আবৃত্তিরীতির সাথে কি ‘নতুন’ ধারার আবৃত্তিরীতির পার্থক্য রয়েছে? থাকলে তার স্বরূপ কেমন?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

রবীন্দনাথের কবিতার আবৃত্তির কি স্বতন্ত্র রীতি আছে? আমি জানি না। আমি জানি ‘আধুনিক’ আবৃত্তির কথা। এর মধ্যে জগতের সকল কবিতাই অঙ্গীভূত। রবীন্দ কবিতার আবৃত্তিও এর বাইরে নয়। লোকধারার কথা পৃথক বস্তু।

প্রশ্ন

‘আধুনিক’ আবৃত্তির সঙ্গে ‘নতুন’ ধারার আবৃত্তির পার্থক্য কী?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

‘আধুনিক’ আবৃত্তির সঙ্গে নতুন ধারার আবৃত্তির পার্থক্য আকাশ-জমিন। আধুনিক আবৃত্তির রূপরীতি—‘শব্দসঙ্গীত’, ‘কবিতার ছন্দ’ এবং ‘চেতনাহীন ভাষা-শব্দের উচ্চারণ’ দিয়ে গড়া। কিন্তু নতুন ধারা ব্যবহার করে ‘শব্দের ভাবগত সুর’। নতুন ধারার উচ্চারণ হয় ‘সচেতন আবেগ’ দিয়ে। অন্যদিকে আধুনিক আবৃত্তি কৃত্রিম কলাকৈবল্যবাদজনিত। নতুন ধারার আবৃত্তি ন্যাচারাল-প্রাকৃতিক বস্তুবাদী নন্দনতত্ত্বের অভিব্যক্তি। আধুনিক আবৃত্তি কম্যুনিকেট করে না। অন্যদিকে নতুন ধারার আবৃত্তি কম্যুনিকেশন-এর গুণযুক্ত।


শম্ভু মিত্র, সব্যসাচী, প্রদীপ ঘোষ প্রমুখের আবৃত্তি তাই অনিকেত, কৃত্রিম।


প্রশ্ন

সব্যসাচী, শম্ভু মিত্র, প্রদীপ ঘোষ প্রমুখের আবৃত্তিকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

ওরা প্রথাগত আবৃত্তিকে অতিক্রম করতে পারেন নি। প্রথাগত আবৃত্তির বস্তুভিত্তি নেই। তা বিষয় জগৎকে সংস্পর্শ করতে পারে না বলে মনে বিষয়গত প্রাকৃতিক ভাব-আবেগ সৃষ্টি হয় না। ফলে গোটা ব্যাপারটা আত্মগত কৃত্রিম হয়ে যায়। শম্ভু মিত্র, সব্যসাচী, প্রদীপ ঘোষ প্রমুখের আবৃত্তি তাই অনিকেত, কৃত্রিম।

প্রশ্ন

পশ্চিমবঙ্গের আবৃত্তির ধারার সঙ্গে বাংলাদেশের আবৃত্তির কোনো সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য আছে কি?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

দু’দেশের আবৃত্তির ধারাই নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভেতর দিয়ে চলছে।

প্রশ্ন

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আবৃত্তির ধারাকে কি পশ্চিমবঙ্গের আবৃত্তির ধারা অনুসরণ করছে না?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

হ্যাঁ।, ‘বিকল্প’ ধারাকে ওরা অনুসরণ করছেন।

প্রশ্ন

‘প্রথাগত’ আবৃত্তি ও ‘বিকল্প’ ধারার আবৃত্তির মধ্যে পার্থক্য কী?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

‘বিকল্প’ ধারার আবৃত্তি ‘প্রথাগত’ আবৃত্তি থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছে। তার কারণ প্রথাগত আবৃত্তি কৃত্রিম এবং অকেজো। কিন্তু বেরিয়ে আসতে চাইলেও উল্লেখযোগ্যভাবে সফল হয় নি। এক ‘শব্দ-সুর’ ছাড়া আর কিছুই ত্যাগ করতে পারে নি বিকল্প ধারার আবৃত্তি। আর হ্যাঁ, বিকল্প ধারার আবৃত্তিতে কথা বলা হয় সম্ভাব্য গদ্যরীতিতে। এছাড়া আর পার্থক্য কোথায়?

প্রশ্ন

ছন্দশাসিত কবিতা কি ‘বিকল্প’ ধারার আবৃত্তির জন্য অন্তরায়?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

বিকল্প ধারার আবৃত্তিও কবিতার ছন্দ মেনে চলে। তাই ছন্দশাসিত কবিতা বাঁধা হবে কেন?

প্রশ্ন

ছন্দ কি ‘বিকল্প’ ধারার আবৃত্তির জন্যে শৃঙ্খল?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

ছন্দ শৃঙ্খল নয়। কিন্তু কবিতার ছন্দ বিকল্প ধারার আবৃত্তির জন্যে শৃঙ্খল। কবিতার ছন্দ কথা, ভাব ও আবেগকে স্ফুট হতে দেয় না। এই অবস্থা দূর করার জন্যে কবিতার শৃঙ্খল ভাঙতে হবে অর্থাৎ ‘কবিতার ছন্দ’র পরিবর্তে ‘আবৃত্তির ছন্দ’ প্রতিস্থাপিত করতে হবে।

প্রশ্ন

ছড়া, পুঁথি, পাঁচালি কি বিকল্প ধারার আবৃত্তিতে সম্ভব?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

হ্যাঁ। সম্ভব।

প্রশ্ন

বিকল্প ধারার আবৃত্তি কি আবৃত্তিকে ‘ভয়েস পেইন্টিং’ বলে স্বীকার করে?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

স্বীকার করলেও উপায় কী? বিকল্প ধারার আবৃত্তি দিয়ে ‘ভয়েস পেইন্টিং’ সম্ভব নয়।

প্রশ্ন

‘বিকল্প’ ধারার আবৃত্তি দিয়ে কেন ‘ভয়েস পেইন্টিং’ সম্ভব নয়? বিস্তারিত বলুন। নিশ্চয়ই ‘নতুন’ বা ‘বস্তুবাদী’ ধারায় তা সম্ভব?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

বিকল্প ধারার আবৃত্তি কবিতার ছন্দের দাসত্ব করে বলে বিষয় বা বস্তুজগতে যেতে পারে না। এর উচ্চারণও সচেতন নয়; যান্ত্রিক। এ কারণে বাস্তবের প্রতিফলন বিকল্প আবৃত্তিতে দেখা যায় না। বাস্তবের প্রতিফলন না থাকলে ভয়েস পেইন্টিং হবে কিভাবে? আমরা ইম্প্রেশনিস্টদের আন্দোলন দেখেছি। তারা যান্ত্রিকতা ভেঙে বিষয়ের উৎসে যেতেন সচেতনতাসহ। বস্তুবাদী আবৃত্তিশিল্পী ইম্প্রেশনিস্টদের আন্দোলন মনে রাখেন। তারা সচেতনভাবে বিষয় জগতের সঙ্গে সংযোগ রেখে তার প্রতিফলন ঘটাতে পারেন। এজন্যেই বস্তবাদী আবৃত্তিতে  ভয়েস পেইন্টিং সম্ভব। বস্তুবাদী আবৃত্তি প্রতিটি সত্তাকে শরীর-জীবন্ত করে তুলতে পারে যা বিকল্প ধারার আবৃত্তিতে দেখা যায় না।

প্রশ্ন

‘আধুনিক’ আবৃত্তির বাচিক ধারা ‘বিকল্প’ আবৃত্তিকে কতটা প্রভাবিত করে?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

করছে তো। ‘আধুনিক’ সঙ্গে ‘বিকল্প’ ধারার আবৃত্তির খুব একটা পার্থক্য নেই।

প্রশ্ন

‘বিকল্প’ ধারার আবৃত্তিকে আপনি শূন্যগর্ভ বলছেন কেন?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

বিকল্প ধারার আবৃত্তিও সাধারণ ভাষাকে অন্ধভাবে ব্যবহার করে, কবিতার ছন্দ মেনে চলে। এর ফলে সে বাস্তব জগতে যেতে পারে না। বাস্তব জগতে যেতে পারে না বলে বাস্তবজনিত ভাব-আবেগও বিকল্প ধারায় উৎপন্ন হয় না। অর্থাৎ বিকল্প ধারাও অনিকেত এবং কৃত্রিম। প্রাকৃতিক ভাব-আবেগ ওতে নেই। এ কারণে বিকল্প ধারাকে কৃত্রিম বা শূন্যগর্ভ বলা হয়েছে।

প্রশ্ন

আবৃত্তি ও পাঠের মধ্যে পার্থক্য কী?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

আকাশ-জমিন পার্থক্য এ দুয়ের মধ্যে। আবৃত্তিতে থাকে সচেতন উচ্চারণ, ভাব-আবেগ ও আবৃত্তির ছন্দ। পাঠে এসব থাকে না।

প্রশ্ন

কবির কবিতা পাঠ ও আবৃত্তিকারের পাঠের মধ্যে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য কোথায়?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

কবি কবিতার ছন্দ অটুট রেখে কবিতা পাঠ করেন। ফলে অর্থ তেমনভাবে পরিস্ফুট হয় না। ভাব-আবেগ ততটা পরিস্ফুট নয় কবির কাব্যপাঠে। কিন্তু নতুন ধারার আবৃত্তিকার আবৃত্তির স্বকীয় ছন্দকলা ব্যবহার করেন; এতে ভাব-আবেগ পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ পায়। সচেতন উচ্চারেণর কারণে আবৃত্তিকার পরিপূর্ণভাবে অর্থ প্রকাশ করতে পারেন। এ হলো বৈসাদৃশ্যের কথা। সাদৃশ্যের দিক হলো, দুজনেই অর্থাৎ কবি ও নতুন ধারার  আবৃত্তিকার সাধারণ ভাষা, শব্দ ও ছন্দ ব্যবহার করেন। দুজনেই কবিতার ভাব-অর্থ প্রকাশ করার উদ্যোগ নেন।

প্রশ্ন

আবৃত্তির শেকড় সন্ধানের জন্যে আমাদের কী কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

শ্রীযুক্ত যতীন সরকার আমাকে আবৃত্তির জন্যে অ্যাঙ্গেলস-এর রচনাবলি পাড়ার উপদেশ দিয়েছিলেন। অ্যাঙ্গেলস পড়ে আমি উপকৃত হয়েছি। বস্তুত মানবজাতির ইতিহাস, আবৃত্তির ইতিহাস জানা জরুরি; আর্যদের আবৃত্তি চর্চা, সেমেটিকদের আবৃত্তি চর্চা, গ্রিক আবৃত্তি ইত্যাদি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা আবশ্যক। ‘মূলধারার আবৃত্তির ধারাবাহিকতা’ সম্পর্কে জানাও বিশেষ প্রয়োজন।


আবৃত্তি একটি প্রাকৃতিক ব্যাপার। প্রকৃতি সম্পর্কে তারুণ্যের সাড়া খুব ভালো দিক।


প্রশ্ন

‘মূলধারার আবৃত্তির ধারাবাহিকতা’ সম্পর্কে কিছু বলুন?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

মূলধারার আবৃত্তি সৃষ্টি হয়েছে বনে-মানুষের মানুষে উত্তরণের সময়। ভাষা, স্বরের দোলা এবং আবেগ-অনুভূতি দিয়ে এর যাত্রা শুরু। তারপর জাদু যুগে এর বিকাশ ঘটে। এরপর প্রাচীন গ্রিসের আবৃত্তি, লোকায়ত ধারার আবৃত্তি, বেদেদের মন্ত্র উচ্চারণ, কেচ্ছা-কাহিনি, কবিয়ালদের আবৃত্তিতে মূল ধারার আবৃত্তির ধারাবাহিকতা রক্ষা হয়।

প্রশ্ন

সমকালে আবৃত্তি নিয়ে তারুণ্যের যে উচ্ছ্বাস, সে প্রসঙ্গে মতামত জানতে চাই?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

এটা খুবই স্বাভাবিক এবং আশার কথা। আবৃত্তি একটি প্রাকৃতিক ব্যাপার। প্রকৃতি সম্পর্কে তারুণ্যের সাড়া খুব ভালো দিক। এতে আবৃত্তির বিকাশ সম্ভব হবে।

প্রশ্ন

আবৃত্তি শিক্ষার জন্যে কি অন্যান্য শিল্পমাধ্যম সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

থাকলে খুব ভালো। কেননা আবৃত্তি চর্চায়, জ্ঞানের পরিধি যত বাড়বে, ততই এর ভাব-আবেগ জোরাল হবে। আবৃত্তি হয়ে উঠবে আরো স্বতঃস্ফূর্ত এবং ধারাল।

প্রশ্ন

সংগীত সাধনা কি আবৃত্তি চর্চায় সহায়তা করে?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

করতে পারে। স্বর-সপ্তকের সাধনা কণ্ঠের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কাজের সহায়ক হতে পারে।

প্রশ্ন

সাংগঠনিক আবৃত্তি চর্চা ও ব্যক্তিগত আবৃত্তি চর্চার মধ্যে কোনটি শিল্পের বিকাশে বেশি সহায়তা করে?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

মূল কথা হচ্ছে জনতার মধ্যে যাওয়া। জনতার চেতনার স্তর বুঝে আবৃত্তি করলে দু ক্ষেত্রেই বিকাশ লাভ সম্ভব, সমানভাবে।

প্রশ্ন

‘নতুন’ ধারার আবৃত্তির সারকথা বলুন?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

সাধারণ চোখে জগতের সকল আধুনিক আবৃত্তি কবিতার ফর্মভিত্তিক, যা একটা অস্বাভাবিক-আর্টিফিসিয়াল ব্যাপার। শিল্পকে হতে হবে বিষয়ভিত্তিক। নতুন ধারার আবৃত্তি তাই কবিতার বিষয়কে ভিত্তি হিশেবে গ্রহণ করে এবং তার ওপর সাধারণভাবে আবৃত্তির নিজস্ব ছন্দকলা এবং ভাব-আবেগের ফর্ম গড়ে তোলা ও এ দুয়ের একত্ব নিশ্চিত করে। ফলে নুতর ধারার আবৃত্তি হয়ে ওঠে প্রকৃতিধর্মী বা ন্যাচারাল। প্রতিটি শব্দের অর্থ জেনে-বুঝে সচেতনভাবে ছন্দে, ভাবাবেগে তা প্রকাশ করে। ফলে আবৃত্তি হয় কম্যুনিকেশন-সক্ষম। খুব সংক্ষেপে এই হলো নতুন ধারার আবৃত্তির কথা।

প্রশ্ন

‘বস্তুবাদী’ ধারাকে আপনি কোথাও ‘মূল’ ধারা আবার কোথাও ‘নতুন’ ধারা হিশেবে উল্লেখ করলেন। এটাকে সুনির্দিষ্ট একটি অভিধায় অভিহিত করতে চাইলে কোন শব্দ বা শব্দবন্ধকে আপনি বেছে নেবেন?

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

নতুন ধারা।