হোম নির্বাচিত প্রেমের কবিতাগুলি নিয়ে আমার কোনো দ্বিধা নাই—রফিক আজাদ

প্রেমের কবিতাগুলি নিয়ে আমার কোনো দ্বিধা নাই—রফিক আজাদ

প্রেমের কবিতাগুলি নিয়ে আমার কোনো দ্বিধা নাই—রফিক আজাদ
1.68K
0
আজ তার জন্মদিন, অথচ গুরুতর অসুস্থ কবি রফিক আজাদ শুয়ে আছেন বারডেমের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কক্ষে। দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস, কিডনি ও ফুসফুস সংক্রান্ত জটিলতায় ভুগছেন কবি। রফিক আজাদ ১৯৪১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল থানার গুণী গ্রামের এক অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়ই ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বাবামা’র কঠিন শাসন উপেক্ষা করে তিনি ভাষা-শহিদদের স্মরণে খালি পায়ে মিছিল করেন। চিরদিনই প্রতিবাদী এই কবি তার দ্রোহকে শুধু কবিতার লেখনীতে আবদ্ধ না রেখে লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন জাতির চরম ক্রান্তিকালে, ১৯৭১ এ হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে, পরাক্রমশালী কাদেরিয়া বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় রণাঙ্গনের সৈনিক হিসেবে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখসমরে অংশ নেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। কর্মজীবনে রফিক আজাদ বাংলা একাডেমির মাসিক সাহিত্যপত্রিকা ‘উত্তরাধিকার’-এর সম্পাদক ছিলেন। ‘রোববার’ পত্রিকাতেও রফিক আজাদ নিজের নাম উহ্য রেখে সম্পাদনার কাজ করেছেন। এছাড়া টাঙ্গাইলের মওলানা মুহম্মদ আলী কলেজের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনাও করেন তিনি। রফিক আজাদের প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে অসম্ভবের পায়ে, সীমাবদ্ধ জলে সীমিত সবুজে, চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া, সশস্ত্র সুন্দর প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। সাহিত্যে অবদানের জন্য হুমায়ুন কবির স্মৃতি (লেখক শিবির) পুরস্কারসহ আরও বেশ কয়েকটি পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। রফিক আজাদ ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও ২০১৩ সালে একুশে পদক পেয়েছেন। একুশে পদক গ্রহণ করার পরের দিন বিকেলে এই সাক্ষাৎকারটি নেয়া।

– শি. সা.


শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, তাইলে কথা শুরু করি। ১৯৪১-এ জন্ম, আপনার প্রথম বই বের হইলো ১৯৭৩-এ—অসম্ভবের পায়ে। ষাটের দশকের যে বিশাল সফল কবিঝাঁক আমরা পাই তার মধ্যে সামনের দিকেই আপনার নাম আসে। আর খুব একটা সুখবর সামনে নিয়া আমরা কথা শুরু করতেছি যে, জানলাম আপনি একুশে পদক গ্রহণ করছেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য। অভিনন্দন। তার আগে বলেন, প্রথম কবিতা কবে লিখলেন, যেইটা মনে হইলো আপনের কাছেই যে, হ্যাঁ, এইটা একটা কবিতা হইছে?

রফিক আজাদ  

লিখি তো একদম শৈশব থেকে, কিন্তু, তবু শুরুর কথা বললে সেইভাবে ঐ বইটার কথাই বলব, অনেক কবিতা থেকে কাটাছেঁড়া করে, বাছাই করে, অনেক কবিতা বাদ দিয়ে বইটা হয়েছিল। একটু ম্যাচিউর সময়েই বাইর হইলো বইটা—অসম্ভবের পায়ে। আমার প্রথম বই। বেশির ভাগ কবিতা লেখা ইন্টারমিডিয়েটের শেষ দিকে আর অনার্স লেবেলের সময়কার। তো ম্যাচিউর বলেই ইন্টারমিডিয়েটের আগের লেখা প্রায় সবই বাদ পড়ল বইটা করার সময়। অসম্ভবের পায়ে, প্রথম বইটা। কিন্তু দ্বিতীয় বইটা এক বছরেরই লেখা। ১৯৭৪ সালে বের হইলো সীমাবদ্ধ জলে, সীমিত সবুজে। এরপর থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয় নাই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, ঐ বইয়েরই (সীমাবদ্ধ জলে, সীমিত সবুজে) তো কবিতা ‘ভাত দে হারামজাদা’, তাই না?

রফিক আজাদ

(হাসি) হা হা হা, তুমি তো দেখি আমারে ভাজাভাজা কইরা ফালাইছো…হ্যাঁ এই কবিতা নিয়া তো বঙ্গবীর আর বঙ্গবন্ধু পর্যন্ত গড়াইলো আমার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ। তবে বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারছিলেন যে কবি এইটা লিখতেই পারে। আসলে কি, কেউ কেউ এই কবিতাটার ভুল ব্যাখ্যা করেছিল।
.

কবির কণ্ঠে ‘ভাত দে হারামজাদা’

.

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

ওই বইয়ে আপনার একটা অসাধারণ কবিতা ছিল। রবীন্দ্রনাথের একটা বিখ্যাত কবিতার নামে কবিতাটা। রাহুর প্রেম। একই নামে কেন কবিতা লিখলেন? ঐ যে—“ভাবছো তোমায় ভুলে যাচ্ছি, ভুলতে পারা সহজ নাকি? যদিও তোমার ইচ্ছাটা কি তাও তো জানি, নিষ্কৃতি চাও…’’ ঝরঝরা মাত্রাবৃত্তে [হবে স্বরবৃত্তে] লেখা কবিতা।

রফিক আজাদ

হ্যাঁ, আমি তো প্রেমের কবি। প্রেম থেকেই আসা সেই কবিতাগুলি। বিবিধ রকম প্রেম। আর রবীন্দ্রনাথকে বয়স আবেগের কারণে খারিজ করতে চাইলেও এইভাবে কবিতার ভেতরে উনি ঢুকে পড়েছেন। সেটা আমরা রবীন্দ্রনাথ আত্মীকৃত করেছি বলেই। তো প্রেমই আসল বিষয় ওই কবিতার। আর মধ্যবিত্ত রুচিকে আঘাত করার বিষয়টাও ছিল।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, আপনি অন্যদিকে চলে যাচ্ছেন। প্রথম বইটা বেরুনোর পর প্রতিক্রিয়া কেমন পেলেন?

রফিক আজাদ

খুবই, খুবই মূল্যায়ন। ‘সমকাল’, শওকত ওসমান ‘সমকাল’-এ প্রশংসা করেছিলেন। শামসুর রাহমান খুবই প্রশংসা করেছিলেন। এবং সমসাময়িক সকলেই অন্তত বলেছিলেন যে একটা ভালো কবিতার বই হয়েছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

বইটা বের করেছিল কারা, রফিক ভাই?

রফিক আজাদ

বের করেছিল খান ব্রাদার্স। খান ব্রাদার্স তো এখনো বই করে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

ওদের সাথে আপনার যোগাযোগটা হলো কিভাবে? তরুণ কবি তো আপনি তখন!

রফিক আজাদ

ওইটা হইলো… ওরা নিজেরাই করছে। বাংলাবাজারে ওরা প্রথম নির্মলের বই করে। তারপরে আমাদের বই করে। ওরাই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আমাদের মানে কী? আপনাদের মধ্যেও গ্রুপিং ছিল নাকি? গুণদা আর আপনি কি দুই গ্রুপে ছিলেন নাকি?

রফিক আজাদ

না না। তোমাদের এখনকার মতো অত গ্রুপ ছিল না তখন। তবে পছন্দ-অপছন্দ তো সবসময়ই থাকে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

বলবেন না তাইলে! আচ্ছা। প্রথম বইয়ের প্রসঙ্গে ছিলাম। প্রশংসা আর কে কে করলেন?

রফিক আজাদ

শওকত ওসমান প্রশংসা করেছিলেন। শামসুর রাহমান প্রশংসা করেছিলেন। সৈয়দ শামসুল হক প্রশংসা করেছিলেন। তবে শওকত ওসমান… বিশেষ করে তরুণরা, আমরা খুব মূল্য দিতাম উনার কথার। ইয়াংরাও খুব উচ্চকণ্ঠ ছিল বইটা নিয়ে। তখন তো একমাত্র পত্রিকা, যেই পত্রিকায় লিখলে খুব মূল্যায়িত হয়, সেটা হলো ‘সমকাল’। ঐ সময়ে একটা কবিতাসংখ্যা করেছিল সমকাল, তরুণদের নিয়ে। তারপর ‘দৈনিক পাকিস্তান’ একটা সংখ্যা করেছিল। সবমিলিয়ে আমার বইটা যখন বেরুল তখন কবিতার একটা বেশ ই, শোরগোল চলছিল।


ষাটের দশকেরও অনেকেরই, মোহাম্মদ রফিকের কথা বলা যায়, মোহাম্মদ রফিক আছে, আবদুল মান্নান সৈয়দ ছিলেন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসও কিন্তু তখন কবিতা লিখত—তো, তাদের তুলনায় আমার কবিতা বেশি নাগরিক ছিল।


শিমুল সালাহউদ্দিন

রফিক ভাই, এই যে এত প্রশংসা পেলেন, এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেলিত করেছে কোন প্রশংসা?

রফিক আজাদ

আমাকে উদ্বেলিত করেছে শামসুর রাহমানের প্রশংসা। তবে যাদের কথা আমার বলতেই হবে তারা হলেন সিকানদার আবু জাফর ও শওকত ওসমান। শামসুর রাহমানেরটা ভালো লেগেছে, কারণ তিনি কবি। তবে বেশি ভালো লেগেছে শওকত ওসমানের কথা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আপনার কবিতার প্রশংসা করেছেন উনারা? ছন্দের?

রফিক আজাদ

শুধু ছন্দের ব্যাপারেই বলেন নাই, সবকিছু মিলিয়ে প্রশংসা করেছেন। আধুনিকতার প্রশংসা করেছেন আমার কবিতায়। শামসুর রাহমানের পরে কবিতার বিভিন্ন বিষয়ের যে আধুনিক ব্যবহার, কাব্যে যে নাগরিক বিষয়টা তুলে আনা, সেইটার প্রশংসা করেছেন। আর ঐ সময় অধিকাংশ লেখাই তো ছিল গেঁয়ো, গ্রাম্যতাদোষে দুষ্ট। সেই গেঁয়ো ইয়ের তুলনায় আমার, মানে ষাটের দশকেরও অনেকেরই, মোহাম্মদ রফিকের কথা বলা যায়, মোহাম্মদ রফিক আছে, আবদুল মান্নান সৈয়দ ছিলেন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসও কিন্তু তখন কবিতা লিখত—তো, তাদের তুলনায় আমার কবিতা বেশি নাগরিক ছিল। অন্তত গেঁয়ো ছিল না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

কিন্তু রফিক ভাই সমকালের কবিতাসংখ্যায় তো মোহাম্মদ রফিক, আবদুল মান্নান সৈয়দের কবিতাও আপনার মতোই সমান গুরুত্বসহকারে প্রকাশিত হয়েছে!

রফিক আজাদ

না, উনারা যে নাগরিক না, সেইটা আমার বইটা নিয়া প্রশংসার সময় শওকত ওসমান বলেছিলেন। ওদের কবিতাও ভালো। উনারা গ্রামের কবিতা, গ্রাম, প্রকৃতিকে নিয়ে, এমনকি রফিক তো স্থানীয় বাগভঙ্গি ব্যবহার করে কবিতা লিখেছে। তো, তাদের তুলনায় আমি বেশি নাগরিক ছিলাম।  তো, ‘স্বাক্ষর’ নামেও আমরা একটা পত্রিকা করতাম। সিকদার আমিনুল হক আমাদের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

এত প্রশংসার পর তো আর আপনাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হলো না!

রফিক আজাদ

হ্যাঁ, আর পিছনে ফিরে তাকাতে হলো না। এবং প্রথম কবিতার বইয়ের পর এত প্রশংসা পাওয়াটা আমার জন্য ভালো হয়েছে। আমার দশকে কেউ মনে হয় না পেয়েছে এমন প্রাপ্তির প্রেরণা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আমি একটা জিনিস খেয়াল করেছি, ষাটের দশকের কবিরা, যাদের কথা আপনি বলছেন, সবাই-ই বই বের করে ফেলেছে ৬১ , ৬২, ৬৩ -র মধ্যে। আপনার—

রফিক আজাদ

আমার একটু দেরি হয়েছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

দেরিটা কেন হলো?

রফিক আজাদ

দেরিটা হয়েছে এজন্য যে একেবারে তৈরি হয়ে প্রকাশিত হতে চেয়েছি আমি। যাতে কোন দোষত্রুটি না থাকে কাব্যের। প্রথম বই বলে তাতে কবির প্রচুর ত্রুটি থাকবে, সেটা আমি চাই নাই কোনোভাবেই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, ধানমণ্ডির এই বাড়িতে আপনি থাকা শুরু করলেন কবে থেকে?

রফিক আজাদ

এইটা হলো ৮৮ সাল থেকে। সরকারি বাড়ি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

ও! সেই কারণেই কি এখনো আপনি এইটাকে আর উপরে বাড়ান নাই!

রফিক আজাদ

না, আমাদের কিছু করার নাই এখানে, সরকারই এই বাড়ি দেখাশোনা করেন। আমরা ভাড়া দিই।


সরকারি তরফ থেকে তো আমলারা থাকে, তারা আসলে টাকা-পয়সা খেয়ে চুপ করে থেকেছে মনে হয় ঐ লোকের কাছ থেকে। রাষ্ট্রপক্ষের উকিলটুকিলরা ঘুষ খেয়ে ধরো এজলাসে যায় না, জ্বর হইছে বলে।


শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, এই বাড়ির যে দারুণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, গাছপালা, এই যে আপনি ছাদে কুকুর পোষেন—এই সৌন্দর্য—

রফিক আজাদ

আমি খুবই উপভোগ করি। এবং আসলে খুব মায়া বোধ করি বাড়িটাকে নিয়ে। তবে আর বেশিদিন নাই। অন্য একজন মালিক সেজে জয়ী হয়ে গেছে। ছেড়ে দিতে হবে তাড়াতাড়িই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

ওহ! কিভাবে জয়ী হলো? সরকারের বাড়ি অন্য একজন কিভাবে নেবে?

রফিক আজাদ

দুর্নীতিতে আচ্ছাদিত দেশ হলে যা হয়। কোর্টের নানান ফ্যাচাং, প্যাঁচ। সরকারি তরফ থেকে তো আমলারা থাকে, তারা আসলে টাকা-পয়সা খেয়ে চুপ করে থেকেছে মনে হয় ঐ লোকের কাছ থেকে। রাষ্ট্রপক্ষের উকিলটুকিলরা ঘুষ খেয়ে ধরো এজলাসে যায় না, জ্বর হইছে বলে। নানান কারণে রাষ্ট্রপক্ষ হেরে গেছে। ছেড়ে দিতে হবে বাড়িটা। খুব মায়া লাগে এই জন্য। এই বাড়িতে কত কবিতা লেখা হলো আমার।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আহা রে! তাহলে তো এই বাড়ি ছেড়ে দিচ্ছেন আপনি!

রফিক আজাদ

ছেড়ে দিতে হবে ইভেনচুয়ালি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

কবের মধ্যে ছেড়ে দিতে হবে?

রফিক আজাদ

মামলা করছি আমরা। মামলা করে, যতদিন থাকা যায়,  দেখা যাক, কী হয়!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, এইটা তো খুব প্যাথেটিক, এইট্টি এইট মানে তো দীর্ঘসময় আপনি এই বাড়িতে ছিলেন, মায়া পড়ে যাবারই কথা!

রফিক আজাদ

এইদিকে আমার এইটুকুতে এই অবস্থা। ঐ পাশে আমার এক কলিগের বাসা, তারও একই অবস্থা। এইগুলা কোন ডেভেলপার মালিক সেজে তারপর কেসটেস করে এইসব করতেছে। নানান ভাবে প্রচারণা করে নিয়ে নিছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, ভয়ঙ্কর দশা! আমরা কি ছাদের ঐ পাশটাতে যেতে পারব?

রফিক আজাদ

হ্যাঁ, তবে ইয়ে আমার কুকুরটাকে বাঁধতে হবে।

(আমরা ছাদের যে পাশে ছিলাম তার অপর পাশে আসি। কবিকে দেখেই তার পোষা কুকুর ‘নিশি’ ডাকতে শুরু করে। আমার দিকে তেড়ে আসে, আমি ভয় পেয়ে লাফিয়ে পালাই কবির পেছনে। রফিক ভাই কুকুর নিশিকে আদর করে দেন গলায়। তারপর গলার বেল্টে চেইনটা পড়িয়ে কুকুরটাকে চুপ থাকতে বলেন। ওটা কবির পায়ে মুখ ঘষে চুপ হয়ে যায়, ছাদে বসলে আমরা, কবি তাঁর বাড়ির গৃহকর্মীকে গ্লাস দিতে বলেন, আমি কেরুর জরিনা ভদকার বোতল বের করি।)

রফিক আজাদ

(বোতল খুলে ঢেলে গ্লাসে) কী আনছো এইটা!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

কেরুর জরিনা ভদকা রফিক ভাই!

রফিক আজাদ

এহ হে কী করছো! এইটা তো ভালো, কিন্তু এখন তো আর খেতে পারি না এইটা!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

কী বলেন রফিক ভাই! কেন! সাকুরার ওরা তো বলল আপনি এইটাই খান! অবশ্য আমার গরিবি লেবাস দেইখাও কম দামেরটা দিতে পারে!

রফিক আজাদ

কে বলছে তোমারে! দাঁড়াও আমি গিয়া নিই, ফাউলের দল সব, নাহ এইটা, কেরু খাওয়া যাবে না। নাহ্।  বাদ দাও।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আপনি কী খান, রফিক ভাই? তাইলে এখন! আহা! আমার আগে আপনার কাছ থেকে জেনে নেয়া উচিত ছিল! আমি কি আনাইয়া দেব রফিক ভাই!

রফিক আজাদ

অসুবিধা নাই। চলো, কথা শেষ করে যাবো নে তোমারে নিয়া সাকুরায়। আমি এখন এই স্কচ হুইস্কি, তোমার, এখন বেশি খাই। স্বাভাবিক স্কচ হইলেই হয়। মানে ভদকা, কী কয়, ভ্যাট সিক্সটিনাইন না হলেই হইল। পাসপোর্ট আমার খুব পছন্দ।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

এহ-হে, ভুল হয়ে গেল রফিক ভাই!

রফিক আজাদ

অসুবিধা নাই। তুমি এত ক্ষেপছো কেন, ওইটা রাইখা দাও, আমি তোমারে খাওয়াইতেছি। ভালো কবিতার কবিরে খাওয়াতে সুখ আছে। তুমি প্রশ্ন করো। আমি সন্ধ্যায় সাকুরা গিয়েই খাব আজ!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

সন্ধ্যায় যাবেন আপনি?

রফিক আজাদ

হ্যাঁ, তুমি চলো আমার সাথে। শুধু শুধু টাকাটা পানিতে ঢাললা তুমি এইটা কিনা!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আমি বুঝি নাই রফিক ভাই। আপনে খান না জানলে কিনতাম না।

রফিক আজাদ

সেই জন্য না, তোমার তো ঝামেলাও হইতে পারত! পুলিশ আজকাল ঝামেলা করে। সেদিন তোমার, দুই সিনিয়র কবিরে নিয়া ঝামেলা পোহাইতে হইছে। (বোতলের দিকে তাকিয়ে) তুমি এইটা পাঠায়া দাও গাড়িতে, গিন্নি আসতেছে বাসায়, অযথা ঝামেলা করার দরকার নাই।

(সাইদুল নিয়া যা এইটা, বলে আমি সাইদুলকে ডাকি, ও গাড়িতে নিয়ে রাখে বোতল।)

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

(হেসে) এখনো তাহলে ঝামেলা করে ভাবী, রফিক ভাই?

রফিক আজাদ

আরে মিয়া, শরীর-টরীর তো বেশি ভালো না। আমাদের দুজনেরই। তাও তো আমি কথা শুনি না। শিরিন, এইখানে চা দে তো! (গৃহকর্মী শিরিনকে ডাকেন কবি)।


তোমাদের মতো এত বাজে অবস্থা আমাদের ছিল না। একে অপরের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাভাবাপন্ন ছিলাম। অন্তত সম্মান করতাম। তোমরা তো শুনলাম হাতাহাতিও করো!


শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই আপনারা যারা সিক্সটিজ-এ উইঠা আসলেন, আপনাদের দ্বৈরথ বা সংঘর্ষ ছিল না? আমাদের মধ্যে যেমন আছে, আমাদের দশকওয়ারি কবিতার রাজনীতিতে যেমন আর কি! শূন্যে কিংবা তারপরে!

রফিক আজাদ

তোমাদের মতো এত বাজে অবস্থা আমাদের ছিল না। একে অপরের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাভাবাপন্ন ছিলাম। অন্তত সম্মান করতাম। তোমরা তো শুনলাম হাতাহাতিও করো!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

এইটা তো প্রমাণ করে আমরা কবিতা নিয়া আপনাদের চেয়ে বেশি সিরিয়াস, নিজেরটা নিয়া সচেতন। আপনারা মনে হয় এত সিরিয়াস ছিলেন না!

রফিক আজাদ

হা হা। আরে, দেখো মারামারি করলেই সিরিয়াস হয় না। আমাদের মধ্যেও দ্বন্দ্ব ছিল, কিন্তু সেটা মনে মনেই। প্রকাশ্যে আমরা সৌজন্য লঙ্ঘন করি নাই কখনো।

12735982_1085186571521886_948406102_n
বাম দিক থেকে : সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, রফিক আজাদ, আল মাহমুদ ও শামসুর রাহমান

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আচ্ছা, তার মানে আপনারা মনে মনে বৈরীভাব পোষণ করলেও তা লুকায়া রাখতেন!

রফিক আজাদ

না না, তা না। তোমরা তো কবিতা নিয়া প্রতিযোগিতা করো না, করো কারটা ছাপা হইলো আর কারটা হইলো না এসব নিয়া। আর তোমাদের সংকট হলো, তোমরা আমাদের মতন ভালো সম্পাদক পাও নাই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

এইটা ভালো বলছেন। যাই হোক, রফিক ভাই, সিক্সটিজ থেকে আপনারা যারা, মানে আপনি, মোহাম্মদ রফিক, আবুল হাসান, নির্মলেন্দু গুণ, সিকদার আমিনুল হক, মান্নান সৈয়দ, ফরহাদ মজহার, আরো আরো যারা আছে, তাদের মধ্যে আপনার সবচেয়ে ভালো বন্ধু ছিল কে? কবিতা নিয়া শেয়ারিং কার সাথে সবচেয়ে বেশি হইত!

রফিক আজাদ

সিকদার আমিনুল হক আর প্রশান্ত ঘোষাল।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

সিকদার আমিনুল হক তো পড়ছি আমরা, প্রশান্ত ঘোষালের কবিতা তো পড়ি নাই!

রফিক আজাদ

খুব বেশি কবিতা লিখে নাই ও। প্রথমদিকে কিছু কবিতা লিখছে, প্রবন্ধই বেশি লিখছে। সবারই তো আর সাহিত্য হয় না, তাই সবাই সবার কাছে পৌঁছায়ও না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, আপনার একটা কবিতা আছে ‘কেন লিখি’! এ কবিতায় আপনি লিখছেন, “নির্বিবেক মধ্যবিত্ত পাঠকের পরম্পরাময়/মাংসল পাছায় খুব কষে লাথি মারা সম্ভব হয় না বলে/ লাথির বিকল্পে লেখা, বারবার, মুদ্রিত পৃষ্ঠার/ মাধ্যমে পাঠাই…”— এই কবিতা আপনি লিখছেন ২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ঊনিশশো সাতাত্তর সালে—

রফিক আজাদ

আসলে মধ্যবিত্ত কোনো রিস্ক নিতে চায় না, কোনো দায়িত্ব নেয় না, শুধু দেখে যায়, কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারে না। এই সুবিধাবাদী মধ্যবিত্তের বিরুদ্ধে প্রচুর লেখা হইছে আমার।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আপনিও তো সেই শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করেন!

রফিক আজাদ

তা করি। কিন্তু আমি তো সেই শ্রেণির আসল ই না। আর হইলেও তারে আমি আমার কবিতা দিয়া সমালোচনাও করছি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

কিন্তু ধরেন রফিক ভাই, মধ্যবিত্ত তো মুক্তিযুদ্ধের মতো একটা বড় ঘটনাও ঘটাইছে বলা যায়! মোটামুটি যদি ধরেন আপনি!

রফিক আজাদ

সেইটা, তখন, মধ্যবিত্তের মধ্যে অধিকাংশ হইলো তরুণ। মুক্তিযুদ্ধ এমন ঘটনা, তাদের আসলে মধ্যবিত্ত বা বিত্ত দিয়া হিশাব করা ঠিক না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, এই যে এখন গণজাগরণ মঞ্চের যে প্রতিবাদ, এইটাও তো মধ্যবিত্তেরই তৈরি প্রতিবাদ। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?

রফিক আজাদ

আমার মনে হয়, এইটা একেবারে যথার্থ সময়ে যথার্থ প্রতিবাদ। এইটা আসা উচিত ছিল।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

মানে কী? এইটার দরকার ছিল!

রফিক আজাদ

এইটার দরকার ছিল, কারণ এই জাতি, দ্বিধাবিভক্ত এই জাতি থাকতে পারে না। একই সঙ্গে পাকিস্তানি এবং বাঙালি থাকতে পারে না। ওরা তো, যুদ্ধাপরাধ যারা করছে এখনো ঐ আদর্শেই বিশ্বাসী। বিশ্বাস করে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

ইসলামের নামে!

রফিক আজাদ

ইসলাম তো না। জামাত কোনো সময়ই ইসলামি দল নয়। এদের মধ্যে ভণ্ডই বেশি।


যেমন জাল পরিয়ে বাসন্তীকে দেখানো হইছে, ইত্তেফাকে, যেন না খেয়ে অভাবে জাল পরে আছে—শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে ইত্তেফাকের ফটোগ্রাফার আফতাব তাকে একশো টাকা দিয়া জাল পরাইছে


শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, আপনার অবজারভেশনের তো গুরুত্ব আছে এ বিষয়ে। যাই হউক, আপনি তো প্রায় সারাজীবন ধরে লিখলেন! আপনার সবচেয়ে প্রিয় কোনো কবিতা বা পঙ্‌ক্তির কথা মনে পড়ছে ঠিক এখন!

রফিক আজাদ

মনে তো পড়ে, বেশিরভাগ মনে পড়ে, বিশেষ করে প্রথম দিকের কবিতা। সেগুলো এখনো পড়ে মাঝে মাঝে বিস্মিত হই যে, কিভাবে লিখেছিলাম এসব! নিজের কাছে বিশ্বাস হতে চায় না। নিজের মনের মধ্যে অনেক ই, শ্লাঘা জাগে। পুরো কবিতা হয়তো ঐভাবে বলতে পারব না। কিন্তু দু-চারটা লাইন মনে পড়ে। বালক ভুল করে নেমেছে ভুল জলে, বালক জানে না তো কতটা হেঁটে এলে, সঠিক পাওয়া যাবে— পুরা মুখস্থ নাই আর কি!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, আমার যেটুকু মনে আছে যে, এই কবিতাটা এরকম ছিলে যে, বালক ভুল করে নেমেছে ভুল জলে, বালক ভুল করে পড়েছে ভুল বই, পড়েনি ব্যাকরণ, পড়েনি মূলবই। (রফিক আজাদ, শেষ দুইলাইন আমার সাথে পড়লেন) এরকম ছিল।

রফিক আজাদ

হ্যাঁ, পড়েনি ব্যাকরণ, পড়েনি মূলবই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, এরকম ছন্দের কাজওয়ালা ছোট্ট ছোট্ট জায়গা, আপনার কবিতায় এমন প্রচুর আছে। একটা কবিতায় এমন আছে আপনার যে, চারপাশে সব মানুষ না, ইট হেঁটে বেড়াচ্ছে, ইট বেড়ায় হেঁটে—পাথর বেড়ায় হেঁটে! পাথর হয়ে যাচ্ছে।

রফিক আজাদ

পাথর বেড়ায় হেঁটে—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আচ্ছা। রফিক ভাই, আপনার সবচেয়ে বেশি মানুষের মুখে মুখে ফেরা কবিতা তো—ভাত দে হারামজাদা—সবচেয়ে বেশি রিডেড আউট, স্প্রেডেড আউট—এই কবিতাটার প্রেক্ষাপটটা যদি বলতেন!

রফিক আজাদ

প্রেক্ষাপট চুয়াত্তর সালের দুর্ভিক্ষ। বিশেষ করে দুর্ভিক্ষ যতটা হোক না হোক, মিডিয়ার একটা চক্রান্ত ছিল, যেমন জাল পরিয়ে বাসন্তীকে দেখানো হইছে, ইত্তেফাকে, যেন না খেয়ে অভাবে জাল পরে আছে—শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে ইত্তেফাকের ফটোগ্রাফার আফতাব তাকে একশো টাকা দিয়া জাল পরাইছে, তেমনি আরেকটা দৃশ্য আছে রংপুর স্টেশনে কেউ বদহজম হইছে, বমি করেছে, সেই বমির উপর একটা ক্ষুধার্ত লোককে—তাকে বলা হয়েছে যে—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

তুই মুখ লাগাবি!

রফিক আজাদ

হ্যাঁ, মুখ লাগানোর চেষ্টা করবি। লাগাতে হবে না, একশো টাকা পাবি। এগুলা সাধারণ মানুষের মনে সাংঘাতিক ছাপ ফেলছে, তাদের মনে প্রচণ্ড ক্রোধ জমে গেছে। আমারও। তো এই ক্রোধ থেকেই ‘ভাত দে হারামজাদা’ লেখা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, ‘ভাত দে হারামজাদা’র পরে, আমার আপনার যে বইটা খুব প্রিয়, সেইটা হলো চুনিয়া আমার আর্কেডিয়াঅসম্ভবের পায়ে-তে তবু কিছু কাঁচা কবিতা ছিল মনে হয়।

রফিক আজাদ

‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’—ঐটা ম্যাচিউরড কবিতা। ঐ হইলো আমার প্রথম ম্যাচিউরড কবিতার বই। আগেরগুলো একটু আবেগতাড়িত ছিল। ঐ হইলো পুরোপুরি ম্যাচিউরড কবিতার শুরু।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আপনি এরকম মনে করেন যে, চুনিয়া দিয়াই আপনার ম্যাচিউরড কবিতার শুরু!

রফিক আজাদ

আগের দুইটা বইয়ের মধ্যেও কিন্তু অনেক ম্যাচিউরড কবিতা আছে। অনেক ভালো কবিতা আছে, কিন্তু কিছু দুর্বল কবিতাও আছে। কিন্তু চুনিয়ার মধ্যে এরচেয়েও ভালো, এর মধ্যে আমার মনে হয় কোনো দুর্বল কবিতা নাই। সবই ম্যাচিউরড এবং এর পর থেকে বলতে পারো আমার সত্যিকারের প্রকৃত কবিতার যাত্রা শুরুটা হইলো।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, আপনি ফরহাদ মজহারকে নিয়া একটা কবিতা লিখছিলেন, ‘ঘড়িভাবনা ও ফরহাদ’। কবিতাটা বলে যে আপনি তার চিন্তা ও দর্শন নিয়া ওয়াকিবহাল এবং লেইট সিক্সটিজে এই কবিতাটা লেখা। উনার বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান বা কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আপনার বিবেচনা কী?

রফিক আজাদ

এখন হইলো, ওর দর্শনে আমি বিশ্বাস করি না। সেটার কারণ হলো, ওর মধ্যে এখন একটা প্যান-ইসলামিজমের ব্যাপার পাওয়া যায়। তার নিজের ভাষাকে ইসলামাইজেশন করার একটা ঝোঁক আমি লক্ষ করছি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আপনি কি এবাদতনামার কথা বলতেছেন!

রফিক আজাদ

না, আমি গদ্যের কথা বলতেছি। তবে এবাদতনামার কথা তুমি বললা, এইটাও আমি পড়েছি, এবাদতনামার তো আমি প্রশংসা করে লিখছিলাম। কিন্তু এখন যা হচ্ছে সেটা ঠিক আর সমর্থনযোগ্য নয়। তার ঐ প্যান-ইসলামিজম আমি সমর্থন করি না। মুসলমান বলেই সব লেখকদের বাঙালি মুসলমান হইতে হবে, এমন আমি মনে করি না। আমরা তো বাঙালি প্রথম, প্রধানত। সেটা না ধরলে কিন্তু বাংলাদেশ হওয়া, পাকিস্তান থেকে আলাদা হওয়া, স্বাধীন হওয়া— এসব যাইবো গিয়া। কিন্তু তার দার্শনিক ভিত্তি যা, তার সাথে আমি একমত না, সে গুণী মানুষ, সব ঠিক আছে, কিন্তু আমি তাকে সাপোর্ট করি না।


নব্বই-এর কবিদের আমার কাছে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়। ভাষার দিক দিয়াও চেইঞ্জ হইছে, বিষয়ে অনেক বৈচিত্র্য আসছে, প্রেজেন্টেশনের ভঙ্গি বদলাইছে।


শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, আমাদের এই সময়ের যে কবিতা, আপনি দীর্ঘসময় ‘বিচিত্রা’র সম্পাদক ছিলেন—

রফিক আজাদ

‘বিচিত্রা’ না, ‘রোববার’।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

স্যরি, রোববারের সম্পাদক ছিলেন, দীর্ঘসময় বাংলা একাডেমির ‘উত্তরাধিকার’ পত্রিকা চালিয়েছেন, আপনার পরবর্তী যে কবিরা, তাদের কবিতা কেমন দেখতেছেন, কেমন সম্ভাবনা দেখতেছেন? মানে, আপনারা যে জার্ক নিয়া সিক্সটিজ এ আসছিলেন, সত্তুরে কিন্তু আমরা সে জার্ক খুঁইজা পাই না—

রফিক আজাদ

আশি কিন্তু ভালো।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আশিতে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, ফরিদ কবিররা—নাইন্টিজে কিন্তু একটা বড় জার্কিং ট্রেন আসছে আবার, আপনার পরের কবিতারে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

রফিক আজাদ

সত্তুর আশি তেমন নাই, সিক্সটিজ, এর পরে নাইন্টিজ—আমার কাছে মনে হয়। নব্বই-এর কবিদের আমার কাছে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়। ভাষার দিক দিয়াও চেইঞ্জ হইছে, বিষয়ে অনেক বৈচিত্র্য আসছে, প্রেজেন্টেশনের ভঙ্গি বদলাইছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

এইটিজ-এর কবিতা তাইলে আপনার ভাল্লাগে নাই সেইভাবে!

রফিক আজাদ

খুব অত ই না। অত বেশি আকর্ষণ করে নাই আমারে। কিন্তু, এসব কিন্তু বলা উচিত না, শত্রু বাইড়া যাইবো।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আপনার শত্রু কি আছে? আমরা এডিট করব তো! বলতে চান না এসব?

রফিক আজাদ

দেখো, আমি এখন কারো মনে আঘাত দিতে চাই না। অনেকে মনে আঘাত পায়। বাঙালি তো সমালোচনা নিতে শিখে নাই। কী করবা!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রাইখা দিমু তাইলে এই অংশটা!

রফিক আজাদ

রাখো, আমি যে কারো মনে আঘাত দিতে চাই না, এটা সবাই জানুক।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হা হা হা। খারাপ কবিতার সাথে আপোস কইরাই-বা কী লাভ! রফিক ভাই, আমি তো ভুক্তভোগী। এক দশকের বেশি হইলো আমি লেখালেখি করি। কবিতা, সাহিত্য, শিল্প-সংস্কৃতি নিয়া পড়াশুনা করছি। আপনি শব্দের সাথে দীর্ঘদিন ধরে সংসার করতেছেন। আপনার তো পাকা চোখ। বাংলা কবিতার গতিপ্রকৃতি কেমন মনে করতেছেন আপনি?

রফিক আজাদ

এখন যে ব্যাপার-স্যাপার আছে, এই সময়ের কবিতায়, উত্তরাধুনিক যে ই-টি, একটু বাড়াবাড়ি হইতেছে। কিন্তু ঠিকভাবে এইসব তত্ত্ব ব্যবহার করতে পারলেও কিন্তু খারাপ না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আপনিই তো লিখছেন, চাদর বিষয়ক একটি উত্তরাধুনিক কবিতা, কবিতার নাম। সেখানে যে রাজনৈতিক এজেন্ডায় একটা চাদর কিভাবে বাংলাদেশ হয়ে গেল, সে ব্যাপারটা খুব পরিষ্কারভাবে আসছে। গালাগাল সমেত।

রফিক আজাদ

শুধু ঐটা না, আরো আছে কবিতা আমার। এটাই বললাম, ঠিকঠাকভাবে বুঝে করতে পারলে সম্ভাবনা আছে। এই সময়ের কবিতা ভালো করবে আরো।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আপনি কি প্র্যাকটিসের কথা বলতেছেন? কবি কি তাইলে প্লেয়ারের মতন প্র্যাকটিস কইরা কবি হবে?

রফিক আজাদ

না না, প্র্যাকটিস না। আমি বলতেছি যে, একটা দুইটা লিখা থাইমা থাকা না, লেখার জন্য লাইগা থাকা, লিখতে থাকা। জীবনে অনেক ঝামেলা থাকবে, কিন্তু কবিকে লেগে থাকতে হবে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, পঁচাত্তর থেকে তো দুই হাজার তেরো এখন, আপনিও তো লেগে আছেন। লেখার জন্য আপনার কী কী ত্যাগ-তিতিক্ষা করতে হয়েছে?

রফিক আজাদ

সে তো বটেই। কবিতার জন্য জীবন বিসর্জন দেয়া। আমি বলি বিসর্জিত এই জীবন। কবিতা, এইভাবে পণ করে কবিতা লেখা, খুব কঠিন ব্যাপার। যারাই এসেছে তাদেরই, সুখময় জীবন তাদের হয় নাই। কিন্তু সান্ত্বনা একটাই যে ছেড়ে যায় নাই। বা কবিতাকে আমারে ছাড়তে দেই নাই। অনেকে পারে না, মাঝপথে ছেড়ে দেয়। মাঝপথে ছেড়ে দিলে সর্বনাশ হয়।


একুশে পদক আপনি পাইলেন এত বছর পর। এত দেরি করে দেয়া হইলো। আপনার কোনো খেদ আছে?


শিমুল সালাহ্উদ্দিন

কবিতার জন্য প্রচুর গঞ্জনা সইছেন? দুঃখ অনেক পেয়েছেন?

রফিক আজাদ

সে তো বটেই। পারিবারিক সামাজিক সাংসারিক অবেহলা তো পেয়েছি, তারপরে, ব্যক্তিগত প্রচুর কষ্ট তো আছেই। কবিতা না লিখলে হয়তো এত কষ্ট পাইতাম না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

কিন্তু স্বীকৃতিও তো পেয়েছেন। এই যে একুশে পদক পাইলেন, স্বীকৃতিগুলি এইসব জায়গায় হেল্প করে নাই?

রফিক আজাদ

করে। মলমের মতো কাজ করে। কিন্তু সবাই তো পায় না। ভালো লিখেও সারাজীবনে অনেকে স্বীকৃতি পায় না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

একুশে পদক পাইয়া আপনার কী মনে হইতেছে? মলমের মতো কাজ করে বললেন। আপনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাইছেন ১৯৮১ সালে, কিন্তু একুশে পদক আপনি পাইলেন এত বছর পর। এত দেরি করে দেয়া হইলো। আপনার কোনো খেদ আছে?

রফিক আজাদ

খেদ তো অবশ্যই আছে। খেদ আছে, কিন্তু খেদ পুষে রাখার তো মানে নাই। কর্তৃপক্ষের মনে হলে দেবে, না হলে দেবে না। এতদিন পর যে ওদের মনে হইছে আমারে দেয়া যায়, এইজন্যই আমি আনন্দিত।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

পুরস্কারের জন্য তো লেখেন ও না!

রফিক আজাদ

হ্যাঁ, পুরস্কারের জন্য কেউ লেখেও না। তবে আকাঙ্ক্ষা হয়তো থাকে যে, একটা জায়গায় হয়তো পৌঁছবে, মানুষের কাছে একটা জায়গা তৈরি হবে। পাঠকের স্বীকৃতি, এইটাই বড় পুরস্কার।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

এই স্বীকৃতি তো আপনি ভালোই পেয়েছেন!

রফিক আজাদ

এটা মোটামুটি বলা যায়।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আপনি প্রথম কবে কোন পাঠকের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া পাইলেন? মনে আছে আপনার?

রফিক আজাদ

প্রথম বই বেরুনোর পর তো বললাম তোমাকে, শওকত ওসমান প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন। প্রতিক্রিয়া তো কবিতা ছাপা হলেই পাই। কালকে, ‘কালের কণ্ঠ’-এর কবিতাটা পড়ে টেলিফোন করেছে দুই বন্ধু, জানাইছে আর কি! এমন প্রতিক্রিয়া ভালো লাগে, পাইলে। খুব প্রসংশা করে রশীদ হায়দার আর অরুণাভ সরকার।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

বাহ্। তারা তো আপনার ভালো বন্ধু!

রফিক আজাদ

এটা তো অনেক বড় পাওয়া। অনেক বড় পাওয়া।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, আজকে আপনি আমাদের দেশে কবিতা লিখে যে জায়গায় দাঁড়ায়া আছেন, আমি আপনার নখের বয়সী একজন আপনার সাথে কথা বলতে আসছি, বাংলা কবিতার একজন কিংবদন্তির সাথে কথা বলছি এমন ফিলিং হচ্ছে, যখন শুরু করছিলেন তখন কি আসলে এই জায়গাটার কথা ভাবছিলেন?

রফিক আজাদ

সেইটা কারো ভাবনার মধ্যে থাকে বলে আমার মনে হয় না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

একটা বিষয় খেয়াল করছেন, টানা পাঁচ বা ছয় দশক ধরে কিন্তু আপনার কবিতা পঠিত হচ্ছে। ম্যাসপিপলের মধ্যে কবিতার পাঠক এমনিতেই কম। যারা পড়ে—

রফিক আজাদ

আমার কিন্তু মনে হয় সাধারণ মানুষের মধ্যেই কবিতার পাঠক বেশি। একেবারে খারাপ না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

কবি, কবিতাকর্মী ছাড়াও অনেকে যে আপনার কবিতা পড়ে, আপনার এই অনুভূতিটা কেমন?

রফিক আজাদ

এটা তো ভালোই লাগে। মনে হয় আমার কবিতা সহজবোধ্য, সবাই বোঝে। এখন যে পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছি, যে পরিমাণ পঠিত হচ্ছি, স্বাভাবিকভাবে এইটিই বোধহয় ভেতরের চাওয়া ছিল, সেই চাওয়াটা আজকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দ্বারা পরিপূর্ণ হলো আর কি! ভালো লাগলো, স্বাভাবিকভাবে দেরিতে পাওয়া সত্ত্বেও। যেকোনো স্বীকৃতিই সাহায্য করে। ভেতর থেকে উজ্জীবিত হতে সাহায্য করে। ভেতর থেকে একটা প্রণোদনা চলে আসে। সেটা হয়েছে। তো, আরো অনেকে আছে, তাদেরও এটা হওয়া উচিত। আমি বলব কর্তৃপক্ষকে যে, যাদের দেবেনই, যথাসময়ে যেন দেয়া হয়। দেরি না করে। তাহলে তার মানে…

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

প্রণোদনাটা ঠিক সময়ে আসে এবং আরো ভালো কাজ হতে পারে!

রফিক আজাদ

হ্যাঁ। এই যে নতুন করে পাওয়া ভেতরের প্রণোদনা, এইটা দারুণ কিছু হয়তো লেখাতে পারে। স্বীকৃতি, পুরস্কার তরুণ বয়সেই পাওয়া উচিত।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আচ্ছা। তো, পদকের টাকা দিয়া কী করবেন রফিক ভাই?

রফিক আজাদ

(প্রচণ্ড জোরে হাসি) এ দিয়ে কোনো মহৎ কাজ করা হবে না। আমার স্ত্রীকে অর্ধেক টাকা দিয়ে দেব আর পাঁচ সন্তানকে দশ দশ করে দিয়ে দেব। ওদেরকে তো কিছুই দিতে পারি নাই জীবনে প্রায়।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

বাহ্। চমৎকার। রফিক ভাই, এই যে আমের মুকুল আসতেছে, নতুন কি লিখলেন কিছু?

রফিক আজাদ

12722104_1085630181477525_1780063000_n
কবির বাসার ছাদে

লিখি নাই এখনো। কিন্তু এই পরিবেশ, আমার এই বাসাটার ছাদ, অনেক দিন ছাদে উঠি না, তোমার উসিলায় উঠলাম, এই ছাদে এসে আমের মুকুল, কচি কলাপাতার রঙ দেখে কেন যেন এইখানে থাকার ইচ্ছা করতেছে। মনে হচ্ছে, যতটা হোক সংগ্রাম করে এইখানে থাকাটা টিকিয়ে রাখি। মানে, আরো মানে মামলা করে এইখানে থেকে যাই। এই বাড়িটা আমার খুব পছন্দের।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

সরকার বাড়িটা নিয়ে নেবে! আপনার জন্যও কনসিডার করবে না?

রফিক আজাদ

এরকমই তো বলতেছে, মামলা চলতেছে অবশ্য। মামলার ফেভারও আমার দিকে, কিন্তু প্রতিপক্ষ খুব ক্ষমতাবান, তারা টাকা পয়সা দিয়ে যা কিছু করে ফেলতে পারে। আমার তো বেশি টাকা নাই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

ছাদটা খুব সুন্দর। আপনি কিন্তু লিখছিলেন, আমার ছাদে বৃষ্টি/ তোমার ছাদে ক্রোধ// বৃষ্টি তোমার খুব পছন্দ/ আমার কিন্তু রোদ//—

রফিক আজাদ

হা হা, হ্যাঁ, আমার কিন্তু রোদ। ভালো লিখছি না!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হ্যাঁ, এই কবিতা যখন লিখতেছেন আপনি তখন ১৯৮১ সালে—

রফিক আজাদ

হ্যাঁ, আমার প্রেমের কবিতা কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সব সময়ই চলে আসছে।


কিন্তু স্যার, এই ভীড়ের লোকেদের মধ্য থেকে এবার একটি পাঁদ দিন তো// পাঁদ দিয়ে প্রমাণ করুন আপনিও একজন মানুষ!


শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হুমম, প্রেমের কবিতা নিয়া আপনার কিন্তু সব সময়ই একটা স্পেশালিটি আছে।

রফিক আজাদ

এটা অনেকেই বলে। এবং এগুলা দিয়েই আমি মনে করি, আমি না থাকলেও পঠিত হব। অনেক সময় দ্বিধা হয় না যে, যা লিখছি তা হচ্ছে কি না! প্রেমের কবিতাগুলি নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নাই, দ্বিধা নাই। এইগুলি দিয়াই আমার মনে হয় যে, না, আমি বোধহয় কবি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, আপনার একটা কবিতার বইয়ের নাম পাগলা গারদ থেকে প্রেমিকার চিঠি। এই বইটার প্লানিং কিভাবে করছিলেন?

রফিক আজাদ

প্লানিং হলো, এইটা সম্পূর্ণ, কোনো বাস্তব ঘটনা না, একটা অবাস্তব কল্পনা থেকে—যে, কোনো প্রেমিকা যদি পাগলা গারদে থাকে, এবং তার দিক থেকে যদি ভালোবাসাটা বেশি থাকে, সে যদি চিঠিই কেবল লিখতে পারে, এমন একটা চরিত্র ভেবে এই কবিতা লেখা। আমার অনেক কবিতাই এমন কাল্পনিক বিষয় অনুসারে লেখা। আসলে আমার নিজের কোনো ভালোলাগালাগি থেকে বা দুর্বলতা থেকে এটা হয় নাই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হা হা হা। একটা সিলি প্রশ্ন করি রফিক ভাই, প্রথম প্রেমে কি প্রথম বই বেরুবার পরে পড়ছেন? নাকি আগে?

রফিক আজাদ

আগে। অনেক আগে। অসম্ভবকে সম্ভব করেছি তখন বলেই তো নাম প্রথম বইয়ের নাম অসম্ভবের পায়ে

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

প্রেমিক হিসেবে তো আপনার সুনাম আছে। আগে মানে কত আগে?

রফিক আজাদ

কৈশোরেই প্রথম প্রেমে পড়ছি। আগেই, ছোটকালেই, কৈশোরে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

লায়লা?

রফিক আজাদ

তুমি তো ঐ কবিতা পড়ে আসছো। হ্যাঁ, ‘লায়লার লাল বাড়ি’।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

12721852_1085630184810858_436191780_n
রফিক আজাদের সঙ্গে শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন

রফিক ভাই, একটি চাদর বিষয়ক দৃষ্টি আকর্ষণী প্রস্তাবে—আমি যে বিষয়টির কথা বলতেছিলাম, সেইটা হইলো, কবিতাটার মাঝখানে, সৌন্দর্যবোধ বা চেতনার প্রতি যে তীব্র কটাক্ষ আছে—যেমন আপনি লিখতেছেন, অভিনেতাকে বলতেছেন, “আপনার মুখে সারাজীবন হাসি দেখতে চাই/ সারাজীবন শুধু কান্নার অভিনয় করলেন স্যার’/—(রফিক আজাদ হাসছেন) শিল্পীকে বলছেন—সারাজীবন শুধু গোলাপের ছবি আঁকলেন স্যার, এবার কিছু গু-গোবর আঁকুন!/ আমরা খুব গরীব মানুষ, একটানা ক্লান্তিহীন সৌন্দর্য/ চোখে সইবে না স্যার,/ দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর ধরে আপনি আমাদের/ মনের অন্ধকার দিক নিয়ে/ তিনতিনটি উপন্যাস লিখেছেন,/ কিন্তু স্যার, এই ভীড়ের লোকেদের মধ্য থেকে এবার একটি পাঁদ দিন তো// পাঁদ দিয়ে প্রমাণ করুন আপনিও একজন মানুষ!’’—এইরকম শব্দ ব্যবহারের কারণ কী? এ তো সচরাসচর পাবলিক স্পেসে উচ্চারণ করা হয় না, বা রুচিশীল না এমন শব্দ আপনি অবলীলায় ব্যবহার করেন, কেন?

রফিক আজাদ

মধ্যবিত্তকে আক্রমণ করা আমার একটা অনুষঙ্গ ছিল।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

এটা কি মধ্যবিত্ত রুচিকে আঘাত করা!?

রফিক আজাদ

এটা ঐ মধ্যবিত্ত রুচির সাথে একটা লড়াই। যেসব জনসমক্ষে বলা যায় না, অসভ্যতা, সেটার ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে রুচিকে আঘাত করা। মধ্যবিত্ত রুচিটাকে, তার মুখোশ খুলে দেয়ার একটা চেষ্টা। এরকম পাঁদ শব্দটার মতো বহু আছে আমার কবিতায়।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হ্যাঁ, অনেক আছে। এই যে ভাষা নিয়া আপনার এই রুচিপ্রকল্প (রুচি নামের একটা চানাচুর আছে), ভাষা নিয়া যে এই চিন্তাটা, এই চিন্তার সূত্রপাত আসলে কিভাবে হলো? কোন বই থেকে হলো?

রফিক আজাদ

এমনে কোনো নির্দিষ্ট সময় মনে পড়তেছে না (বিমান যাইতেছে বাসার উপর দিয়া, আওয়াজ অস্পষ্ট, বিমান চলে গেলে কথা)। তবে ফিফটিজ-এর ইংল্যান্ডের আন্দোলন, যে অ্যাংরি মুভমেন্ট তার একজন কবি পাঁদ শব্দটা ব্যবহার করে প্রথম। নামটা ভুলে গেছি। আমি তখনি ভাবছিলাম আমি কোথাও ব্যবহার করব, একটা বড় কোনো কবিতায়। এই যে শিল্পী সাহিত্যিক অভিনেতা রাজনীতিবিদ—এরা, এদের যে সুশোভন চেহারা হয়্যা থাকে, আসলে যে ভেতরে কত ক্লেদ—সেই সত্যগুলোকে টেনে বের করে আনা, সেজন্য এমন অশোভন শব্দও আমি ব্যবহার করেছি। খেয়াল করো, সবচেয়ে উচ্চরুচির লোক এরা—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হ্যাঁ, শিল্পী—সাহিত্যিক—কবি!

রফিক আজাদ

উঁচু শ্রেণির লোক না! তো এদের যদি আক্রমণটা করা যায়, তাহলে পুরো সমাজেই সেটা লাগবে আক্রমণ হয়ে। রুচির হয়তো পরিবর্তন হতে পারে, এমন ভাবনা থেকে লেখা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

বাংলাদেশে আর কোনো কবি-সাহিত্যিককে পাইছেন আপনি, যিনি রুচিকে আক্রমণ করতে পারতেছেন!

রফিক আজাদ

আমার হয়তো অজ্ঞানতা থাকতে পারে। আমার জানা-মতে নাই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আপনি ব্রাত্য রাইসুর কবিতা পড়ছেন?

রফিক আজাদ

ওর কথা শুনেছি, কেউ কেউ আমাকে বলেছে, আমার প্রচেষ্টার নকল নাকি করেছে। নকল করতেই পারে। কিন্তু আমার পড়ার আগ্রহ হয় নাই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

কিন্তু রফিক ভাই, আপনি বললেন, নাইন্টিজ-এর কথা।

রফিক আজাদ

হ্যাঁ, নাইন্টিজ-এর অনেকের কবিতা আমি পড়েছি সংকলনে। আমার মনে হয়েছে নাইন্টিজ পরিণত বয়সে দারুণ একটা কিছু দেবে। যেটা সত্তুর ও আশি পারে নাই বা পারবে না হয়তো।

(এমন সময় ছাদের কোনায় একটা বন্দি কুকুরের দিকে চোখ পড়ে কবি রফিক আজাদের। আমাদের বলেন, দাঁড়াও ওকে একটু আদর করে নিই, নইলে ঘেউ ঘেউ করবে, বলে, গৃহপরিচারিকাকে কুকুরের গলায় বাঁধা শেকল খুলে দিতে বলেন, কথোপকথন চলতে থাকে—)

রফিক আজাদ

আঃ আঃ আঃ আমার সোনাটা, আমার যাদুটা, ও সোনা ও সোনা ও সোনা, সোনামানিক, ও সোনা ও সোনা (কুকুরকে কোলে নিয়ে আদর করেন)।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, ও আপনার সাথে কবে থেকে আছে?

রফিক আজাদ

বছর ছয়েক। এরা তো বেশিদিন বাঁচে না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

এরে পাইছিলেন কই?

রফিক আজাদ

ওরে আনছিলাম নরসিংদী থেকে। নাম নিশি। (কুকুরের সাথে কথা বলেন, ওকে আদর করেন, ও সোনা ও সোনা বলেন, কুকুর ঘেউ ঘেউ করতে থাকে।)

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, কবিতা শোনান নাকি ওরে? পছন্দ করে?

রফিক আজাদ

হ্যাঁ-এ-এ। মনটন খারাপ থাকলে বারান্দায়, ছাদে ওরে নিয়া আসি, হাঁটি, আমি কবিতা পড়তে থাকলে ও চুপ করে থাকে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, আপনার শৈশবের দিকে যাই। আপনার সর্বপ্রাথমিক স্মৃতি কোনটা? মানে আপনার জীবনের! আপনার মনে আছে এমন!

রফিক আজাদ

সর্বশেষ স্মৃতি হলো একটা মৃত্যুর স্মৃতি। ওটা আমার দিদা যখন মারা যান, তখন আমার বয়স ছয়-সাত। ছয়-সাত বছরের। এর আগের একটা স্মৃতি মনে আছে, অপমানের ছিল বলে মনে আছে। এটা আরো আগের। ওটা চার-পাঁচ বছরের। আমাদের বাড়ির, শরিকের বাড়ির উঠানে, একটা ই গাছ ছিল, পেয়ারা গাছ ছিল। নিচে থেকেই পেয়ারা ছোঁয়া যায়, ডালও নিচের দিকে। ওটার ডালের উপর উঠে বসে আছি আমি। যাদের বাড়ির গাছ, উনি সম্পর্কে দাদা ছিলেন আর কি! সে এসে আমার কানের মধ্যে ধরে, টেনে ধরে নামিয়ে দিয়েছিল।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হা হা হা, এটা ঘাটাইলে?

রফিক আজাদ

এটা বাড়িতে, গুণীগ্রামে। কিন্তু ঐটার, ঐ সময়ের মতো আগের, আচরণের স্মৃতি, আসলেই আর নাই। অপমান বলে এটা মনে আছে, আর মৃত্যুর ঐটা বললাম, ঐটাও ছয় বছরের মতো বয়স হবে তখন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, আপনার এক বন্ধুর কথা আমরা পড়েছি, আপনার স্মৃতিকথা থেকে—

রফিক আজাদ

মাঈনুদ্দিন?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হ্যাঁ, তার নাম মাঈনুদ্দিন। তার সাথে আপনার দেখা হলো কিভাবে! এবং তার মধ্যে দিয়ে আপনার জীবনে কী প্রভাব পড়ল?


কী এক অজ্ঞাত কারণে নব্বই পৃষ্ঠার একটা নোট লিখে আত্মহত্যা করে।


রফিক আজাদ

ঐটা বলতে হলে, আগে একটু ব্যাকগ্রাউন্ড বলতে হবে। ঐ আমার গ্রামের কাছের যে স্কুল, প্রথম যে পড়ি, ঐটা ছিল মিডল ইংলিশ স্কুল, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। সে তো পায়ে হেঁটেই বাড়ি থেকে যাওয়া যেত। ওটা পাশ করার পরে, সম-দূরত্বে—কালিহাতী আর ঘাটাইল—এই দুটা হাইস্কুল ছিল। তো কালিহাতীর স্কুলের নামটাই (সুনাম) বেশি ছিল আর কি! ঐ সময়ে। সেটাও সাড়ে তিন মাইল হেঁটে তারপরে যেতে হতো। তো, এইভাবে তোর আর স্কুল করা সম্ভব না। আমার বাবা ব্যবস্থা করলেন স্কুলের কাছে এক বাড়িতে জায়গির থাকার। চাল, ডাল এগুলা সব দিত বাবা, আর মাসে মাসে টাকা দিত। তো যাই হোক, সেইখানে, হাইস্কুল পাশ করার পর নাইনে যে ভর্তি হলাম, সেইখানে এই অসাধারণ, ব্রিলিয়ান্ট মাঈনুদ্দিনের সাথে আমার পরিচয়। ক্লাস নাইনেই তার শেক্সপিয়ার পড়া শেষ। তার প্রণোদনায়ই আমি সুধীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ দাশ, শেক্সপিয়ার—স্কুলেই এগুলা তার প্রণোদনায়ই পড়ে ফেলি। স্কুল লাইব্রেরিটাও অসাধারণ ছিল। মাঈনুদ্দিনের সাথে দেখা না হলে হয়তো আমার কবি হওয়াও হতো না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

এটা অসাধারণ। এমন বাল্যবন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার!

রফিক আজাদ

কাছেই তার বাড়ি ছিল। মাটির রাস্তা দিয়ে যেতে হতো গ্রামের বাড়ি। একদম কৃষকের ছেলে। কিন্তু এত ব্রিলিয়ান্ট, এত দরদি, অবিশ্বাস্য! ও স্কুলে আসার সময়, ধরো, হালের গরুটাকে মাঠে খুঁটি গেড়ে চড়তে দিয়ে স্কুলে আসত, যাওয়ার সময় নিয়ে যেত বাড়িতে গরুটা। এই রকম, কোনো রকমের আত্মম্ভরিতা ছিল না তার মধ্যে। সহজ সরল, কিন্তু অনতিক্রম্য মেধাবী। অসম্ভব সব মার্কস পেত। সবচেয়ে বেশি তো অবশ্যই, কেউ কল্পনা করতে পারে না এমন মার্কস পেত ক্লাসে, সব বিষয়ে। কী এক অজ্ঞাত কারণে নব্বই পৃষ্ঠার একটা নোট লিখে আত্মহত্যা করে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আহ্!

রফিক আজাদ

আমি অনেক চেষ্টা করেও দুর্ভাগ্যক্রমে নোটটা দেখতে পাই নাই। এর আগে ও আমাকে পোস্টকার্ডে একটা চিঠি লিখছিল। বন্ধু, তোমার সাথে আর কোনোদিন দেখা হবে না, ভালো করে পড়াশোনা করো, এরকম। এর মধ্যে আমি আবার আমার গ্রামের কাছে একটা স্কুল, মাদ্রাসা থেকে স্কুল, মাদ্রাসা চলে নাই, মাদ্রাসা থেকে হয়েছে এমন স্কুল, নতুন, তাতে চলে এসেছি। এজন্য পোস্ট কার্ডে ঐ চিঠি। এই হইলো শৈশবের বন্ধুকে নিয়ে বেদনার স্মৃতি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, শৈশবের বন্ধুর স্মৃতি শুনলাম, আপনাদের শৈশবটা কেমন ছিল! মানে আপনার বাড়ির পরিবেশ!

রফিক আজাদ

বাড়ির পরিবেশ একটু কী বলে, গ্লুমি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

গ্লুমি মানে? গুমোট? গ্লুমি কেন? বাবা কি খুব রাগী ছিলেন!

রফিক আজাদ

না, বাবা রাগী বলে না। আমি হইলাম সর্বশেষ সন্তান। আমার আগে, ইমিডিয়েট আগে, আমার এক ভাই, পানিতে ডুবে মারা গিয়েছিল।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

এজন্য আপনার নাম জীবন রাখা হলো?

রফিক আজাদ

না, সেটারও কাহিনি আছে। বাড়িতে নাইয়র এসেছে, নাইয়র তো চিনো—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হ্যাঁ, মেয়েদের বাপের বাড়ি আসা, জামাইবাড়ির লোকজন নিয়ে।

রফিক আজাদ

হ্যাঁ। নাইয়র এসেছে আমাদের বাড়িতে। বড়বোনের আত্মীয়স্বজনরা। তো, মা তো রান্নাবান্নায় ব্যস্ত, আমার এক বোন, ওকে দেখতে দিয়েছিল আমার ভাইকে। বাচ্চা মেয়ে, সেও ওকে দেখা বাদ দিয়ে খেলা শুরু করে দিয়েছে। আর তখন পানসির নৌকায় নাইয়র আসত, সেই নৌকা সাজানো থাকতো, আঁকা বাঁকা চোখ-টোখ নকশা আঁকা থাকত। ওটা দেখে ও-ও ঘাটের কাছেই ভিড়ানো নৌকায় উঠতে চেষ্টা করে পানিতে পড়ে গেছে। খেলায় মগ্ন হয়ে আমার বোন আর তার দিকে লক্ষই করে নাই। আর ঐ ইয়েতেই, আমার মা যে কী মানুষ, এর মধ্যে খবর গেছে আমার মায়ের কাছে যে, আপনার ছেলে পানিতে পড়ে মারা গেছে। আমার মা কী যে মানুষ, সে সবাইকে বলল, বাসায় মেহমান, সাবধান, কেউ যেন টু শব্দটা না করে, কান্নাকাটি না করে, ওকে তুলে পাশের মানে তৃতীয় বাড়ি, গোলাবাড়িতে নিয়া রাখো, আমি রান্নাবান্না শেষ করে আগে নাইয়র খাওয়ায়া নেই। তারা চলে যাওয়ার পরে কী করা যায় দেখা যাবে!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

অসাধারণ। শোকের আগে দায়িত্ব!

ma
মায়ের সঙ্গে কবি

রফিক আজাদ

আমার জন্ম যখন, আমি যখন মা’র পেটে, তখন আমার বড় বোন, তিনি আবার কোলকাতার টোলে সংস্কৃত পড়তেন, উনি অন্ত পাশ করা, অন্ত মানে মাস্টার্স, আদ্য মধ্য অন্ত—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আচ্ছা।

রফিক আজাদ

আমাদের বাড়িতে সংস্কৃত বই ভরা একটা তাক ছিল। ঐটাতে কারো হাত দেয়া নিষেধ ছিল। আমি খালি একবার মা’র অনুমতি নিয়া তাক যে ঘরে রাখা ওখানে গেলাম। ওখানেই ব্যাকরণ কৌমুদী পাইছিলাম। আমার যে ছোটকাল থেকেই ব্যাকরণের প্রতি ঝোঁক, এটা ঐ কারণে। ঐটা পড়ে খুব মজা পাইছিলাম, বাংলার সাথে মিলগুলো বুঝতাম তখন সংস্কৃতের। উনি, ঐ আপা তখন আসছিলেন পরীক্ষা দিয়ে, মা তখন গর্ভবতী, পেটে হাত দিয়া বলে, নড়াচড়া করে তো! বলছে, এ, মানে আমি, নাকি সহ্য করতে পারব না কাউকে। পরে মাকে বলছে, যদি ছেলে হয় তবে নাম হবে জীবন। জীবন কুমার। জীবন, আর মেয়ে হলে ফাউজিয়া। তারপর আমি পেটে থাকতেই, কালাজ্বর হয় না, কালাজ্বর হয়—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হ্যাঁ, কালাজ্বর, ঐ সময়েই তো হইতো ওইটা।

রফিক আজাদ

এত ভুগতো তখন মানুষ এটাতে, ব্ল্যাক ফিভারে, পাশবিকভাবে মারা গেল।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আপনার বড় বোন!

রফিক আজাদ

হ্যাঁ, আমার বড় বোন। আমি তখন পেটে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আপনার মা তো তাহলে খুব শক্তমনের মানুষ।

রফিক আজাদ

সব সময় এজন্য বাড়ির পরিবেশ বড় গ্লুমি থাকত।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, আপনারা কয় ভাইবোন?

রফিক আজাদ

এখন তো তিন ভাইবোন, বেঁচে আছি। মারা গেছে অনেকগুলা। জ্বরে, পানিতে ডুবে, অসুখে। আমাদের সময় চিকিৎসা তো অত উন্নত ছিল না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, আপনার বাবা কী করতেন?

রফিক আজাদ

আমার বাবা কন্ট্রাকটারি করতেন, কন্সট্রাকশনের। রোড কন্সট্রাকশন, বিল্ডিং কন্সট্রাকশন, রোড এন্ড হাইওয়ে ডিপার্টমেন্টের কাজ করত বাবা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, আপনার প্রচুর কবিতায় কৃষির প্রচুর অনুষঙ্গ এসেছে, সেটা কি আপনি বাঙালি এ কারণে এসেছে, নাকি কৃষকের সন্তান বলেও?

রফিক আজাদ

আসলে ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ডে তো কৃষিই ছিল। কৃষিভিত্তিক একটা অর্থনীতির মধ্যে আমাদের বেড়ে ওঠা। ফলে মাঠ, ঘাট, ফসল তো আছেই অন্তঃকরণে। আমরা না করলেও, হালটাল ছিল, ঐ রাখাল রাখে না, আমাদের বাড়িতে রাখাল ছিল কয়েকজন। এদের সঙ্গে একটু খাতিরও ছিল আমার। ভাই-টাই বলতাম। স্বাভাবিকভাবেই কৃষিজীবীদের প্রতি আমার আলাদা প্রেম ও দুর্বলতা ছোটকাল থেকেই আছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, প্রেমের কবিতায় তো আপনার একটা স্পেশালিটি আছে, আপনার ‘প্রেমের কবিতা’ শিরোনামে একাধিক সংকলনও আছে। আপনার প্রেমের মধ্যে যৌনতার একধরনের উচ্ছ্বাস, উন্মীলন লক্ষ করা যায়। আপনার প্রেমের কবিতার বৈশিষ্ট্যগুলিকে আপনি কিভাবে চিহ্নিত করেন? আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করেন এইটাকে?

রফিক আজাদ

আমি মনে করি যে, যৌনতাহীন প্রেম একেবারেই সম্ভব না। এগুলা একেবারে ফালতু গল্প। (শিমুলের হাসি) নারী পুরুষ দুজনের দিক থেকেই। আকর্ষিতটা হবে কী দিয়ে! যৌনতা না থাকলে প্রেম নাই।


সুন্দরী নারীদের দেইখা আসলো, আসলো হইলো নিজেদের বাড়িতে, নিজের বউয়ের কাছে, আইসা তার মনে হইলো, কী একটা বউ, বুক নাই, পাছা নাই,


শিমুল সালাহ্উদ্দিন

কবি তো প্রতিমুহূর্তেই প্রেমে পড়ে, আপনি পড়েন?

রফিক আজাদ

প্রতিমুহূর্তে না, আমি বেছে বেছে পড়ি!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হা হা হা হা হা হা হা, আপনার বাছবিচারটা করেন কিভাবে! বলেন একটু, শিখে নেই।

রফিক আজাদ

আগে তো চেহারা। বাছবিচার—চোখ, নাক, মুখ ঠিক জায়গায় থাকতে হবে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হা হা হা। রফিক ভাই, আপনাদের কালের ব্যর্থ কবি, সফল ঔপন্যাসিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস খোয়াবনামায় না কোথায় একটা জায়গা আছে, মঞ্জু যখন তার বন্ধুর বাড়িতে সাজুগুজু করা সুন্দরী নারীদের দেইখা আসলো, আসলো হইলো নিজেদের বাড়িতে, নিজের বউয়ের কাছে, আইসা তার মনে হইলো, কী একটা বউ, বুক নাই, পাছা নাই,

রফিক আজাদ

হা হা হা হা, বুক নাই পাছা নাই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আপনি যে বাছবিচারের কথা বলতেছেন, সেখানে কি তাহলে চেহারা, মানে বুক পাছাই জরুরি! নাকি মানবিক গুণাবলিগুলোও থাকতে হবে?

রফিক আজাদ

আরে তারুণ্যের চাপে, যৌবনের ধাক্কায় এমন অনেক কিছু মানুষ বলে, কিন্তু মানবিক গুণাবলিটাই প্রধান।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আমরা আপনার প্রেমের কবিতার আলোচনায় ছিলাম। অন্যদিকে চলে গেছি। রফিক ভাই, আপনার প্রেমের কবিতাই তো প্রধান। কবিতার কৌশলগত জায়গাটা কেমনভাবে কাজ করে আপনার মধ্যে। ধরেন, একটা কবিতা ছাপতে দেবার আগে কী কী বিষয় কাজ করে?

রফিক আজাদ

প্রথমেই তো ছাপা না। প্রথমে তোমার বিষয়। প্রথমে বিষয়টা আসে। এল তো? তারপর এটা কিভাবে উপস্থাপন হবে, মানে সেটা ছন্দে কি? ছন্দে হলে কোন ছন্দে হবে? কিভাবে হবে?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

বা গদ্যে হবে কি না!

রফিক আজাদ

হ্যাঁ, আবার বিষয়ই নির্ধারণ করে—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

কী হবে।

রফিক আজাদ

কী হবে! চটুল হবে না ভারি হবে। তা, বিষয় অবশ্য এইভাবে দেখা সম্ভব না। তবে কবিতা অবশ্যি ইয়ে থেকেই লেখা উচিত—অনুশাসনের মধ্য থেকে। ভেতরের থেকে চর্চা করা ভালো, হাত-পা ছেড়ে দিলে, মুঠোটা ছেড়ে দিলে, সর্বনাশ, পরে আর মুঠোবদ্ধ করা যায় না। প্রথমে, মুঠোবদ্ধ করে, ভালো করে নিজেকে পরিচালনা করে, নিজেকে প্রমাণ করে, তারপরে ছেড়ে দিয়ে কিছু, দু চারটা বই, ছেড়ে দিয়ে তারপর দেখবে অটোম্যাটিকেলি হয়ে আসছে তার, ছন্দে। এই হইলো ই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, তরুণ কবির কবিতা বিষয়ে আপনার একটা কবিতা আছে যেটার মধ্যে আছে যে, তরুণ কবির প্রথম বইটা হবে এরকম, ২য় বইটা হবে এরকম……

রফিক আজাদ

হা হা হা হা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

৩য় বইটা হবে দেশ প্রেমে ভরপুর, ৪র্থ বইটা হবে নারীর প্রেমে আবেগ-কম্পনে থরোথরো, আপনি এভাবে বলছেন…

রফিক আজাদ

মানে প্রেম প্রথম একভাবে…মানে তরুণ বয়সে প্রেমিক হতে গেলে ঐ তিনটা স্টেজ আসতে হবে। ওটা ঠিক পড়েছ তুমি?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

অবশ্যই অবশ্যই। এই বইটা আমি ২০০৮ সালে কিনেছি রফিক ভাই। দুই রফিক আমার খুব প্রিয়, একটা রফিক আজাদ, একটা মোহাম্মদ রফিক। এবং আপনাদের কবিতার ধরনটাও স্বতন্ত্র।

রফিক আজাদ

একেবারেই আলাদা। ও খুব ভালো লেখে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

একেবারেই আলাদা। একজন হলো একদমই প্রকৃতি মাটি, মানুষ, নদী—এইসব জায়গায়। আরেকজন প্রেম এবং স্যাটায়ার এবং যে রুচিকে আঘাত করা ঐ জায়গাগুলো, চমৎকারভাবে আসে। তো রফিক ভাই, যে বইটা নিয়ে আমি খুব জরুরিভাবে কথা বলতে চাই, যেটা আমি মনে রাখলাম, এই প্রশ্ন আমি পরে বলবো আপনাকে, সেটা হলো যে, চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া—তার পরের বইটার নাম হলো কী?

রফিক আজাদ

ধারাবাহিকভাবে নাম মনে নাই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আমার মনে আছে, বিরিশিরি পর্ব

রফিক আজাদ

তো সেদিনের ঘটনা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হ্যাঁ, সেদিনের অসাধারণ একটা বইয়ের নাম আছে আপনার, সেটা হলোবর্ষণে আনন্দে যাও মানুষের কাছে

রফিক আজাদ

হ্যাঁ, হ্যাঁ।


চুয়াত্তরে আপনি লিখলেন ‘ভাত দে হারামজাদা’। বঙ্গবন্ধু হলো, তখন হলো প্রেসিডেন্ট এবং এই ঘটনায় আপনার অনেক বন্ধুরাই ভেবেছিল আপনাকে বুঝি না জেলে যেতে হয়—


শিমুল সালাহ্উদ্দিন

তো যেই বইগুলো, এই বইগুলোর কথা একটু একটু করে আমরা শুনব আপনার কাছ থেকে। তো জানতে চাই, ১৯৭১ এর আগে, ১৯৫২ প্রসঙ্গে জানতে চাই, সে সময়টাতে আসলে, আপনি প্রভাতফেরিতে হাঁটতে গিয়েছিলেন পরিবারের সবার বাধা উপেক্ষা করে, সেই সময়ের স্মৃতিটা যদি একটু বলেন, যা যা আপনার মনে আছে।

রফিক আজাদ

খুব একটা ঐ রকম মনে নাই। ঐ তো মনে আছে যে, উত্তপ্ত রোদের মধ্যে দুই পায়ে সেই যে সাড়ে তিন ঘণ্টা হেঁটে গিয়ে সেখানে প্রতিবাদ নিয়েছিলাম। এইটুকুই। তবে ফিরে আসার পরে মা কষ্ট করে, বাবা ঐ ভয়ে যে অসুখ বিসুখ হবে এই জন্য বকাবকি করত। তবে পরে দুজনেই শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করেছে আর কি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাটা জানতে চাই। আপনি টাঙ্গাইল্যা মানুষ, টাঙ্গাইলের আরেক বঙ্গবীর—তাঁর সাথে আপনি যুদ্ধ করেছেন। তো মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়লেন কিভাবে?

রফিক আজাদ

সেটা হলো আমি…ভালো প্রশ্ন করেছ, আমি ওই সময়ে মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজে চাকরি করি। বাড়িতে তখন ঐ ট্রেনিং চলছে, কাছের অবসরপ্রাপ্ত লোক দিয়ে, ইয়ে দিয়ে, কাটা রাইফেল দিয়ে। তো অবসরপ্রাপ্ত ইয়েদের নিয়ে…

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

অবসর প্রাপ্ত আর্মি বা সেনাবাহিনী বা সামরিক যারা আছে…

রফিক আজাদ

সামরিক যারা আছে তাঁরা ট্রেনিং নিত। তো বুঝতে পারছিলাম যে অবশ্যম্ভাবী, আর আমাদের পক্ষে ঐভাবে শহরে থাকাও সম্ভব না, তো গেলাম প্রথম দিকে। তো রাইফেল আমার চাচাতো ভাই একটা, আমি একটা নিয়ে মোটর সাইকেল করে গ্রামের বাড়িতে গেলাম আর বাড়ির যারা তাদেরকেও বললাম যে অবস্থা বুঝে তোমরা চলে আসবে তালা-টালা দিয়ে। তো ওই যে বাড়িতে অবস্থানকালেই টাইগার জোগাড় করছে, মানে লোকজন চতুর্দিকে খোঁজ করে রিপোর্ট করার জন্যে তো আমাদের ওইখানেও গিয়েছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

টাইগার মানে কাদের সিদ্দিকী টাইগার?

রফিক আজাদ

হ্যাঁ।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

তাঁকে আপনারা টাইগার বলে সম্বোধন করতেন?

রফিক আজাদ

হ্যাঁ, হ্যাঁ। ও তখন, মানে ছাত্র ছিল তখন ইন্টারমিডিয়েটের। মানে আমার সাথেই। তো আমাকে বলল, আপনি এখানেই থাকেন গ্রামে। আমি আপনার জন্যে, যাবেন না, আমি তো লোক পাঠাব। লোক সঙ্গে সঙ্গেই এপ্রিল মাসেই পাঠিয়ে দিল। তারপর ট্রেনিং। ট্রেনিং হলো। আমাকে অবশ্য একটু সেভ করেই রাখত, মানে নিজে যে অপারেশনে যেত সে অপারেশনেই নিয়ে যেত। মানে একা ছেড়ে দিত না। মানে বিবাহিত, তাদেরকে খুব…মানে ইয়ে দিয়ে রাখত।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

সেইফ গার্ড।

রফিক আজাদ

সেইফগার্ড। তখনকার তো, মানে সাংঘাতিক গুণ ছিল টাইগারের।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, আপনার, মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা…মানে সাম্প্রতিক সময়ে কি আলোড়িত করে? মানে কোন স্মৃতি আপনাকে বেশি আলোড়িত করেছে? মানে, টুকরো স্মৃতি বা ঘটনা যদি আমাদের জানান।

রফিক আজাদ

মুক্তিযুদ্ধের ইয়ের মধ্যে অল্প ইয়ে দিয়ে একবার আমি, মাহবুব, ছোট্ট একটা দল নিয়ে যাচ্ছি আমরা ইয়ে করতে, মাঝপথে আমরাই আক্রান্ত হয়ে যাই—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

মানে আপনি অ্যাম্বুশের মুখে পড়েন।

রফিক আজাদ

অ্যাম্বুশের মুখে পড়ি। এবং তাও মানে আর্মি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রাজাকার টাজাকার না?

রফিক আজাদ

রাজাকার বা ঐ যে ওদের ওইখান থেকে যে কী নিয়ে আসছিল…

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

মিলিশিয়া

রফিক আজাদ

মিলিশিয়া না, মান…তো একদম নদীর এই পার ঐ পার। পরে গোলাগুলি হচ্ছে। আমাদের দিকে তো অস্ত্র, বোমা কম।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

গুলিও কম।

রফিক আজাদ

গুলিও কম। কিন্তু একটা জিনিশ আমরা শুধু লক্ষ করছি যে, কোনো রকম যদি সন্ধ্যাটা—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

সন্ধ্যা নামলে আর থাকবে না।

রফিক আজাদ

সন্ধ্যা নামলে আর থাকবে না। এই করে…এখন মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে তো…

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হা হা হা। একদম শিষ কেটে যাচ্ছে।

রফিক আজাদ

হ্যাঁ একদম শিষ কেটে কেটে যাচ্ছে, মাথার উপর দিয়ে শব্দ তো। এই হতে হতে থেমে গেল। তখনও আরও কিছু সময়, দশ-পনের মিনিট চালাতে পারত। সন্ধ্যা হবার মিনিট দশেক বাকি ছিল। তো আমরা ভাবলাম যে নৌকা দিয়ে পার হবার কোনো চেষ্টা করব কি না? তো ঐ আমাদের দেশের লোকজন খুব ইয়ে ছিল, ওই যে ঐ পারে যত ইয়ে পেয়েছে, সব নৌকা তারা নিয়ে গিয়েছে। তো খুব খারাপ কথা। তো যখন ওঠেছি, সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে, তখন উঠে দাঁড়িয়েছি। দেখি যে ইয়ে ভিজে গেছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হি হি হি।

রফিক আজাদ

খুব স্বাভাবিক। তো এই বর্ণনা আছে ইয়েতে, ওই সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারে, ওই বারোজের একটা উপন্যাস আছে। ওইখানে ট্যাঙ্ক মানে ওই ইয়ের মধ্যে তোমার ওই যে…

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

বাঙ্কার?

রফিক আজাদ

বাঙ্কারের মধ্যে বসে, এদিকে ও মানে বুঝতেই পারে নি যে একটা ট্যাঙ্ক আসছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হা হা হা। ট্যাঙ্ক কি মাটির উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে?

রফিক আজাদ

মানে যেভাবে আসছে ওর বাঙ্কারের উপর দিয়ে গিয়েছে। আরও অনেকগুলো বাঙ্কার পাশে। অনেকগুলো বাঙ্কার। গোলাগুলি চলছে তো বাঙ্কার আসছে। ভাগ্য ভালো, কার যেন মানে এই করে জাম্প দিয়ে, বাঙ্কারের পিছন দিক উড়ে মানে গিয়েছিল। তো বাঙ্কার থেমেছে ওর মাত্র বিশ হাত দূরে দিয়ে এসে ।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

বাঙ্কারে এসে পড়ল?

রফিক আজাদ

বাঙ্কারে এসে পড়ল আর কি। তো পরে ও দেখে যে ওর পিছনটা ভিজে গেছে, মানে ঐটা হয়ে গেছে। যুদ্ধাবস্থায় এমন অনেক কিছু হয়ে যায়।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হা হা হা। এগুলা কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের গল্প, মানে সেই সময়টায় এমনি করেছেন। চুয়াত্তরে আপনি লিখলেন ‘ভাত দে হারামজাদা’। বঙ্গবন্ধু হলো, তখন হলো প্রেসিডেন্ট (হবে প্রধানমন্ত্রী) এবং এই ঘটনায় আপনার অনেক বন্ধুরাই ভেবেছিল আপনাকে বুঝি না জেলে যেতে হয়—

রফিক আজাদ

বুঝি মেরে ফেলবে—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হ্যাঁ। এই কবিতাটা নিয়ে আপনি আসলে কি টেনশনে ছিলেন?

রফিক আজাদ

না, টেনশন তো বটেই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রক্ষীবাহিনী তখন খুব ফর্মে।

রফিক আজাদ

ভাগ্য ভালো, মানে, বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী আর আনওয়ারুল আলম শহীদ—এরা যোদ্ধা তো—আমি যুদ্ধ করছি তাদের সাথে—বঙ্গবন্ধুর কাছে আমারে নিয়া গেছিলেন। উনি ব্যাখ্যা চাইলেন। আমি ব্যাখ্যা দিছি—সারা পৃথিবীর নিরন্ন মানুষের প্রধান চাওয়া হলো ভাত। আমি সারা পৃথিবীর লোকের কথা বলছি। (শিমুলের হাসি)। আর আমাদের দেশে, নিরন্ন মানুষ এই ভাষাতেই কথা বলে। এটা বলার পর উনি বলে, ‘তা বটে!’।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হা হা হা হা। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘তা বটে’!

রফিক আজাদ

হ্যাঁ। আমার কাঁধে হাত রাইখা বলল, ভালো লিখছিস, যাহ। তুই ইয়ের কাছে যা, উনি মনসুর আলীর কাছে পাঠাইলো, ফোন করলেন আমার সামনেই, ফোনে বললেন, এই যে ওরে পাঠাইলাম, ওর কথা শুইনা ওরে ছাইড়া দিয়ো।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হা হা হা হা। দারুণ তো!

রফিক আজাদ

ক্যাপ্টেন মনসুর আলী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন তখন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আপনি একটা কবিতায় লিখতেছেন রফিক ভাই—চিত্রদার্শনিক ধ্যানী তোমার অনুজ যারা/ তাদের কাছেও প্রিয় চাঁদহীন এই মধ্যরাত…

রফিক আজাদ

‘চোর’।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হ্যাঁ। হা হা হা। আপনার মনে আছে তাইলে!

রফিক আজাদ

কী বলো, আমি লিখছি, মনে থাকবে না!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

তারাও তোমার মতো কম্প্রবক্ষে খুব চুপিসারে/ নিঃশব্দে একাকী ঢুকে পড়ে অজানা-অচেনা কোনো/অর্গলিত ভাবনার দ্বারে। তোমার মতোই তারা,/সুন্দরের সুরক্ষিত ঘরে, ধনাগারেসিঁধ কাটে;/তারাও শিউরে ওঠে, আনন্দিত, কার্যোদ্ধার হ’লে।/উভয়ে ধিক্কারযোগ্য কর্মে রত, দুই সহোদর/ঘৃণিত মানব-কুলেজনসাধারণের অপ্রিয়।/ নগরের নোংরা এলাকায় উভয়ের যাতায়াত/আছে; সর্বদা ‘জীবন’-নাম্মী এক বেশ্যার সহিত/দুই সহোদর করো কম্পমান মত্ত কাম-কেলি। তোমরা দু’জন তবু কেউ কারু প্রতিযোগী নও,/ আজীবন তোমাদের দু’জনের সমান সদ্ভাব।/

এটা হলো আপনার প্রথম বই অসম্ভবের পায়ের কবিতা।

রফিক আজাদ

প্রথম বইয়ের।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

এইখানে আপনি চোরের সাফাই গাইতেছেন। এইটা কেন? এই প্রেক্ষাপটটা যদি বলতেন!

রফিক আজাদ

আরে চোরের সাফাই না, ওর নৈপুণ্যের প্রশংসা। ঐ যে সিঁধ কাটে না, অসাধারণ। হা হা হা হা। (অসাধারণ বলার ভঙ্গিতে দুজনেরই উচ্চস্বরে হেসে ওঠা)

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আপনি কোনোদিন চুরি করছেন? না চুরির শিকার হইছেন?

রফিক আজাদ

হা হা হা। আমি কিভাবে শিখব? নাহ চুরি করা দেখছি। সিঁধ কাটাও। সে যে কী দারুণ ব্যাপার! আর আমার এক বন্ধু ছিল চোর। (দুজনের হাসি) আমাদের বাড়িতে একদিন কাটতে গিয়া, অর্ধেক কাটার পর ওর মনে পড়ছে, আরে সর্বনাশ, এইটা তো অমুকের বাড়ি। আমার বন্ধুর বাড়ি। পরের দিন আমারে বলছে, ঐটা আমি কাটতেছিলাম—হা হা (দুজনের মিলিত হাসি)—তোর কথা মনে কইরা বাদ দিছি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

এই যে চোরকে আপনি বীরশ্রেষ্ঠ, সাহসজীবী বলতেছেন, এবং রাতের অন্ধকারে, সঙ্গোপন হরণকারী চোর, দুর্দান্ত! রফিক ভাই, অন্য প্রসঙ্গে যাই, আপনি ভালো মুডে আছেন, একটা খারাপ প্রসঙ্গে। আপনার বিরুদ্ধে কিন্তু প্রথম দিকে এই অভিযোগ ছিল, আশির দশকের কবি ফরিদ কবির একটা সংখ্যা বের করেছিলেন, আশির দশকের চৌর্যবৃত্তি, ঐখানে আপনারা, মানে আপনি, শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, সিকদার আমিনুল হক কার কার আইডিয়া মেরে দিয়েছেন, চুরি করেছেন সেসব নিয়ে লেখা ছিল। আপনাকে দেখানোর পর ঐ সংকলন, আপনি নাকি চুরির পক্ষে সাফাই গাইছিলেন, বলছিলেন, বড় মাছ সবসময় ছোট মাছ খেয়ে ফেলে। আমি তো বড় মাছ।

রফিক আজাদ

(অট্টহাসি) একদম ঠিক শুনছো। ফরিদের সাথেই এইটা আমার কথোপকথন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

এবং এই ঘটনার সাথে কিন্তু আপনার এই কবিতার ভাবনার মিল আছে রফিক ভাই!

রফিক আজাদ

দেখো, অন্য কারো লেখা পড়ে প্রভাবিত হওয়া, ঐ লেখার কোনো বাক্য, শব্দবন্ধ-প্রভাবিত হয়ে কবিতা লেখার ঘটনা যুগে যুগে ঘটে আসতেছে। কোনো কিছুই মৌলিক না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

মানে এই গ্রহণ করবার ব্যাপারটাকে আপনি দূষণীয় মনে করতেছেন না!

রফিক আজাদ

একদম না। গ্রহণ করতেই পারে। আর কনসাস-আনকনসাসের ব্যাপার আছে। মানুষ যে সাহিত্য পড়ে, সে লিখলে, কিছু না কিছু পঠনের ভেতর থেকে ঢুকেই যায়।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

মানে আপনি অবচেতনের কথা বলতেছেন!

রফিক আজাদ

হ্যাঁ, অবচেতনে। সেটা মোটেও দুষণীয় না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, আমরা আপনার অনেক সময় নিলাম। আপনার শিষ্য তো ছিলেন জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক ইমদাদুল হক মিলন! গদ্যের জন্য কিন্তু আপনার একটা হাহাকার আমি টের পাই। আপনার দারুণ একটা গদ্য হাতে থাকলেও, কবিতার তুলনায় গদ্য কিন্তু খুবই কম লিখছেন রফিক ভাই!

রফিক আজাদ

হ্যাঁ, খুবই কম।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আমাদের গদ্যসাহিত্যে যারা কাজ করেছে, তাদের নিয়ে আপনার মূল্যায়নটা কী আসলে?

রফিক আজাদ

গদ্যে এখন কাজ হচ্ছে, অনেক ভালো কাজ হচ্ছে। আমাদের ষাটের দশকে গদ্য কিন্তু খুব ভালো ছিল না। দুচারজন হাতে গোনা। এখন তো অনেকে ভালো গদ্য লিখতেছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, আপনার খুব বিখ্যাত একটা কবিতা আছে, ঐ যতিচিহ্ন নিয়া প্রমাদ এর কবিতা— আবৃত্তিশিল্পীরা খুব পড়ে।

রফিক আজাদ

ওটাও প্রেমের কবিতা। প্রেমের কবিতা হিসেবেই লেখা। বিশ বছর আগে ও পরে তুমি। ‘তুমি; বিশ বছর আগে ও পরে’।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

এই তুমিটা কে রফিক ভাই?

রফিক আজাদ

এইটা আসলে কিছুটা কল্পনা, কিছুটা বাস্তব। আমার স্কুলের এক সহপাঠিনী ছিল, ও ও-রকম প্রমথ চৌধুরীকে প্রথম চৌধুরী বলত, জনৈকরে জৈনিক বলত, পরে গিয়া ই করলাম, কবিতা বানানোর জন্য অনেক কিছু আনা হইলো।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

বাহ। তার মানে আপনি কবিতা বানান।

রফিক আজাদ

স্বীকার করুক আর না করুক, সব কবিই কবিতা বানায়।


আইসা যখন আর কোনো জ্ঞানও নাই , তখন আমি টেবিলে (টেবিল দেখিয়ে)… সকালবেলা দেখি একটা পুরা কবিতা লেখা।


শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, ‘রফিক আজাদ’ শিরোনামে আপনার একটা কবিতা আছে। নিজের নাম শিরোনামের কবিতা—দুঃখে তোমার ডুবিয়ে দেবো/ দুঃখনদীর অগাধ জলে/ অগাধ জলে/ তোমার সাঁতার না জানা প্রাণ/ ডুবতে ডুবতে ডুবে যাবে/ ডুবে যাবে/ শরীর তোমার ভাসবে শুধু অগাধ গভীর জীবন জলে/ ভাসবে তুমি ডুববে তুমি উঠবে ভেসে/ দুঃখে তোমায় ভাসতে হবে ভাসতে হবে/ ভাসবে ডুববে/ অন্তহীন এক লবণজলে/ দুঃখী জীবন এ ছাড়া আর কী পেতে চায়!// সুখের কুলুপ আঁটা দুখের ঘরে ঢুকতে মানা,/ এ তো তোমার ছিলোই জানা/ তবু মাইকেল কী দুরাশায়/ বাঁধছো এ বুক গভীর গহন, অমানিষায়!

মাইকেলের সাথে নিজের তুলনা করতেছেন?

রফিক আজাদ

মাইকেল তো দুখি মানুষ।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আপনিও দুখি?

রফিক আজাদ

তা তো বটেই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আপনার অনেক দুঃখ তাইলে রফিক ভাই!

রফিক আজাদ

খালি এইটা না। দুঃখ না থাকলে আমার কবিতা, কবি হওয়াই হইতো না। আমার আগের দুইজন মারা না গেলে বাপ-মা আমারে হয়তো অন্যভাবে মানুষ করতে পারতেন। এত মনমরা থাকতেন না তারা। দুঃখ তো সেই পৃথিবীতে আসার আগে থেকেই শুরু হইছে। আমার মা খেতে বসলেই কান্নাকাটি করে, চোখ দিয়া টপটপ করে পানি পড়ে, এইটা সেই ছোটবেলা থেকে দেখতেছি। এমন নিরবচ্ছিন্ন দুঃখের মধ্যে না থাকলে হয়তো আরো অনেক আনন্দের কবিতা লেখা যাইত। ভালো খাবার থাকলেই তার কান্না। আত্মীয়স্বজন বাড়িতে আসার পরে যে আমার ভাই পানিতে পড়ে মারা গেলেন, তারপর আর মা কোনোদিন কান্না ছাড়া খাবার খায় নাই। এখন তো মারা গেছেন, নাইনটি সেভেনে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আপনার যে বইটা আমার সবচেয়ে প্রিয়, সেটা হলো— সশস্ত্র সুন্দর

রফিক আজাদ

আমারও প্রিয়। নতুন সংস্করণ হচ্ছে বইটার।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

তাহলে তো আপনার পছন্দের সাথে আমার পছন্দের মিল আছে রফিক ভাই। আপনার কিন্তু ভালো কবিতাগুলোতে, বেশিরভাগ ছন্দে লেখা। ছন্দের একটা ঝোঁক আপনার আছে।

রফিক আজাদ

ছন্দ বলতে তো মাত্রাবৃত্ত। অন্যগুলি কথাবার্তা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

ছন্দ বলতেই মাত্রাবৃত্ত?

রফিক আজাদ

সমিল মাত্রাবৃত্ত। তুমি রবীন্দ্রনাথ দেখো, সুধীন্দ্রনাথ দেখো।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আচ্ছা।

রফিক আজাদ

মাত্রাবৃত্তে মাস্টার হও, তোমার হাতের মুঠোয় একদম পুরো পৃথিবী চলে আসবে। বিষয় চাকরের মতো হয়ে যাবে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আপনার এই কথাটা মনে থাকবে। মাথায়ও রাখব। আপনার অগ্রজ কোন কবিদের আপনি সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন?

রফিক আজাদ

আমার প্রিয় কবি নাই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

মানে বাংলা সাহিত্যে নাই?

রফিক আজাদ

বাংলাদেশে নাই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, বাংলা সাহিত্য মিলায়া… আপনারে কি ধরে ফেলছে নাকি (গ্লাসের দিকে ইঙ্গিত)?

রফিক আজাদ

আরে না। তুমি যে চাপাচাপি করতেছ। সুধীন দত্ত, জীবনানন্দ দাশ। জীবন দাশ যদিও ছন্দের দিক থেকে একটু ত্রুটিপূর্ণ আছে, কিন্তু আমি জীবন দাশ, সুধীনকে, মাইকেলকে ভালোবাসি আর কি!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

ঠাকুর?

রফিক আজাদ

রবীন্দ্রনাথ তো বটেই। আমার প্রিয় মাত্রাবৃত্তে রবীন্দ্রনাথ মাস্টার। রবীন্দ্রনাথ সবার উপরে, এর মধ্যে কোনো সন্দেহ নাই। রবীন্দ্রনাথ এখন বাঙালির নিশ্বাস হইয়া গেছে। এইটা আরো অনেক বছর থাকবে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, এখন আপনি প্রতিদিন লেখেন?

রফিক আজাদ

আমি কোনোদিনই প্রতিদিন লিখি নাই। ভেতরে কাজ হয় আমার। ভেতরে হয়ে যাওয়ার পর হয়তো আমি কাগজে কলমে নামাই। সবসময়।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

এখনো তাই করেন?

রফিক আজাদ

এখনো তাই করি। আরেকটা যেটা হয়, অনেকদিন ধরে, ধরো কিছু অবচেতনে থেকে যায়, আগেও যেত। সেটা নিয়ে হয়তো শর্ট প্লান করে লিখতে বসি। আমি হয়তো, রাতে সুরাটুরা পান করে এসে, আইসা যখন আর কোনো জ্ঞানও নাই , তখন আমি টেবিলে (টেবিল দেখিয়ে)… সকালবেলা দেখি একটা পুরা কবিতা লেখা। আমার হাতের লেখাতেই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হা হা হা হা।

রফিক আজাদ

এই রকম বেশ কিছু ঘটেছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

জোসস, দারুণ! লাস্ট প্রশ্ন রফিক ভাই, আপনার সুরাপান নিয়া আপনার পরিবার, কাউন্টারপার্ট—

রফিক আজাদ

কী যে বলো! আমি কি কারো আপত্তি শোনার লোক! এখন আর কারো আপত্তি নাই। সবাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে আমাকে নিয়ে। এখন বড় ভাই, ছোট ভাই, অনেক পরের কবিকে নিয়েও তো আমি খাই। তুমি আমার জন্য নিয়ে এসেছ যে আজ, কী যে খুশি হয়েছি! তোমাকে বোঝাতে পারব না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

প্রথম জীবনে তো লুকিয়ে খাইতেন! আপত্তি ছিল!

রফিক আজাদ

হা হা হা। প্রিয়জনরা সবাই চায়, বেশিদিন বাঁচি। বাঁচতে হবে। এখনো তোমার, ঐ দিলারা মাঝে মাঝে ঝামেলা করে। বাইরের কেউ না থাকলে। কেউ থাকলে ঝামেলা করতে পারে না। হা হা হা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রফিক ভাই, রেকর্ডিং কার্ড শেষ। আপনার সাথে আলাপ তো শেষ হবার না। অনেক সময় দিছেন, ধন্যবাদ আপনারে।

রফিক আজাদ

তোমারে অনেক ঘুরাইছি, তাই পোষায়া দিলাম। তোমাদেরও ধন্যবাদ। চলো সাকুরায়।

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন

চলেন।

.


পড়ুন : রফিক আজাদের কয়েকটি কবিতা

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন

কবি। শিল্প, সংস্কৃতি ও বিনোদন বিভাগের প্রধান হিসেবে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনে কর্মরত। জন্ম ১৭ অক্টোবর, ১৯৮৭, তুরাগ, ঢাকা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যায়ন বিভাগ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। শিক্ষাজীবনে পালন করেছেন জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোট ও আবৃত্তি সংগঠন 'ধ্বনি'র সভাপতির দায়িত্ব।

কবিতার বই চারটি : শিরস্ত্রাণগুলি (২০১০, ঐতিহ্য), সতীনের মোচড় (২০১২, শুদ্ধস্বর) ও কথাচুপকথা…(২০১৪, অ্যাডর্ন বুকস) ও সংশয়সুর (২০১৬, চৈতন্য)।

সাক্ষাৎকারগ্রন্থ: আলাপে, বিস্তারে (২০১৬, চৈতন্য)।

‘কবির কবিতা পাঠ’ অনুষ্ঠানের আয়োজক সংগঠন ‘গালুমগিরি সংঘ’র সমন্বয়ক। বিবাহিত; স্ত্রী ও ছোটভাইকে নিয়ে থাকেন বাংলামোটরে।

ই-মেইল : shimulsalahuddin17@gmail.com
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন