হোম নির্বাচিত প্রকাশক হাজির : আলী আফজাল খান

প্রকাশক হাজির : আলী আফজাল খান

প্রকাশক হাজির : আলী আফজাল খান
389
0

দুয়ারে অমর একুশে বইমেলা। প্রতিবছরের মতো এবারও বের হবে হাজারো বই। বাংলা একাডেমি আর সোহরাওয়ার্দি উদ্যান সরগরম হবে লেখক-পাঠকের পদভারে। একেকটা বই নতুন স্বর ও সুরের সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হয়। কিন্তু বলতে দ্বিধা নেই, এসবের বেশিরভাগই শুধু মলাটবন্দি আবর্জনা, অপাঠ্য, অপরিপক্ব।

এর মধ্যে নতুন লেখকরা কলম চালাচ্ছেন। তাদের রক্তালেখ্য পাঠকের সামনে হাজির করছেন প্রকাশকরা। এমন একজন ভিন্ন চোখ-এর প্রকাশক আলী আফজাল খান। তার সাথে কথা হলো কবি ও গল্পকার মাজুল হাসানের


শুরু করা যাক। প্রথমে বলেন, নিজে লেখেন, পত্রিকা করেন—সব সৃষ্টিশীল কাজ—এর ভিতরে প্রকাশনার মতো টেকনিকাল কাজে আসলেন কী করে? কেন?

আলী আফজাল খান: লিটলম্যাগের সম্পাদকের কিন্তু প্রকাশনার আদ্যোপান্ত অবশ্যই জানতে, বুঝতে হয়। নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে প্রকাশনার জ্ঞানটা তার ভালোভাবেই তৈরি হয়। ‘ভিন্নচোখ’ পত্রিকা প্রকাশনার উৎকর্ষের পিপাসা আমাকে নিরীক্ষাপ্রবণও করেছে। পত্রিকাটা ঘিরে যে লেখক সার্কেল তৈরি হয়েছে তাদের বই তাই আমার হাতে প্রকাশের একটা চাপ তৈরি হয়, আর কোনো প্রকাশনা থেকে নিজের প্রথম বই প্রকাশের অভিজ্ঞতা—এই দুই-ই ভিন্নচোখকে প্রকাশনায় নিয়ে আসছে প্রথমত। দ্বিতীয়ত, ভিন্নচোখের কাজই শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে কাজ করা—তো পত্রিকা এবং সিনে সার্কেলের পাশাপাশি আরও একটা ডানা মেলার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল ।

আপনি একটা সার্কেলের কথা বললেন। আমরা এটা দেখে থাকি উন্নত বিশ্বে। কিছু দেখেছি আমাদের দেশেও। যেমন হুমায়ূন আজাদের বই মানেই আগামী প্রকাশনা, হুমায়ূন আহমেদের বই বেশির ভাগই এসেছে অন্য প্রকাশ থেকে। জসীমউদ্‌দীনের বই পেয়েছি পলাশ প্রকাশনী থেকে। বিষয়টা এমন—লেখক লিখবেন, আর প্রকাশক বাজার অর্থনীতির ভেতর লেখকের নতুন শিল্পসম্ভার পাঠকদের হাতে তুলে দেবেন। এখন কি আমরা সেই বিষয়টা দেখি? লেখককে লেখার প্রসববেদনার সাথে প্রকাশের জন্য কাঠখড় পোড়াতে হয়, তাহলে কিভাবে চলে। আপনি কী বলেন?

আফজাল : স্পেশালাইজেশন একটা আধুনিক প্রপঞ্চ, সেটা ভেঙে যাচ্ছে। লেখক একই সাথে প্রকাশকও হতে পারছে, সুযোগটা এখন আরও বেশি, আর মাল্টিটাস্কিং খুব সাধারণ বিষয় হয়ে উঠবে আগামী প্রজন্মের কাছে। একটা পাণ্ডুলিপি তৈরি করে সেটার প্রোডাকশন নিয়েও কাজ করতে পারছেন লেখকরা, অনেকেই ই-বুকও করছেন। আর ছোটকাগজকে ঘিরে একটা চিন্তা ও তৎপরতার সার্কেল থাকবে এটাই স্বাভাবিক, যদি না তা তৈরি হয় তাহলে সেটা ছোটকাগজই না।


কোনো নবীন লেখকই ভালো লিখছে না তা আমি মানতে রাজি না, আর ব্যবসাটাও যে আসলে তারা খুব ভালো বুঝে তাও বলবো না। রেডিমেট জিনিস আইনা শো রুমে বেচা আর একটা জিনিস তৈরি করে বেচা—এই দুইয়ের মধ্যে লাভের অঙ্কটাও তারা বুঝে না।


মোটা দাগে বড় প্রকাশকরা স্ট্রাগলার নবীন লেখকদের বই করতে চায় না। এমন একটা অভিযোগ শোনা যায়। এর ভিত্তিও আছে। এই অবস্থায় আপনার স্ট্যাটেজিটা কী? আপনি কাদের বই করেন? ডিলটা কেমন হয়?

আফজাল : নবীন লেখকদের বই বড় প্রকাশকরা এখনও করতে চায় না। কারণটা মূলত ব্যবসায়িক, বললাম এই কারণে যে, কোনো নবীন লেখকই ভালো লিখছে না তা আমি মানতে রাজি না, আর ব্যবসাটাও যে আসলে তারা খুব ভালো বুঝে তাও বলবো না। রেডিমেট জিনিস আইনা শো রুমে বেচা আর একটা জিনিস তৈরি করে বেচা—এই দুইয়ের মধ্যে লাভের অঙ্কটাও তারা বুঝে না। নবীন-প্রবীণ সব ধরনের লেখকের বই ভিন্নচোখ প্রকাশ করছে। স্থির কৌশলের চেয়ে সময়ের সাথে সাথে, পরিস্থিতির সাথে সাথে পরিবর্তনশীল কৌশলে কাজ করা বেশি পছন্দ করি। প্রকাশনার ডিল একেক লেখকের সাথে একেক রকম, নির্দিষ্ট নীতিমালায় আমরা এখনও যাই নি। ভিন্নচোখ একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, ভিন্নচোখকে যেমন এর সদস্য এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সহযোগিতা করছে একইভাবে ভিন্নচোখও নবীন লেখকদের সহযোগিতা করছে।

এই বছর আপনার প্রকাশনী থেকে কয়টা বই আসবে? এগুলোর মধ্যে কটা গুরুত্বপূর্ণ (আপনার চোখে) বইয়ের নাম যদি আমাদের জানান।

আফজাল : গত বছর ভিন্নচোখ প্রথম বই করে, গত বছর করা হয়েছিল ২০টা বই। এবার আশা করছি ২৫-৩০টা করা হবে। সব বই তো গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, আলাদা মর্যাদা দিব কাকে? বিশেষ কারণে ‍উল্লেখযোগ্য ইমরান চৌধুরীর উপন্যাস ‘পাতা’, আশরাফুল মোসাদ্দেকের জাপানিজ ভালোবাসার হাইকু (অনুবাদ), মঈন চৌধুরীর কবিতার বই ‘মূল্যহীন দুই ফর্মা’, ড. শরীফ আখতারুজ্জামানের ‘বিচার ব্যবস্থায় ডিএনএ প্রযুক্তি’, ভাস্কর চৌধুরীর উপন্যাস ‘টান’ ইত্যাদি।Book Vinnochokh

পাণ্ডুলিপি বাছাই একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই কাজে আপনার কোনো কমিটি বা টিম আছে কিনা?

আফজাল : পাণ্ডুলিপি বাছাই করার কাজটা অগ্রজদের সাথে পরামর্শ করে করি, টিমটা ঠিক ফর্মাল না। পেশাদার প্রতিষ্ঠানের টিম থাকা উচিত বলে মনে করি।

বইমেলায় বইয়ের সংখ্যা কিংবা প্রকাশনীর নাম-ডাক দেখে স্টল বরাদ্দ দেয়ার অভিযোগ শোনা যায় অনেক সময়, এতে অনেক কুটির শিল্প টাইপ প্রকাশনী স্টল পান না, কিন্তু আমরা জানি অনেক ভালো বই ব্যক্তি বা বন্ধু বা ছোট প্রকাশনী থেকে বের হয়েছে। আপনার অভিজ্ঞতা কী স্টল বরাদ্দ পাওয়ার ক্ষেত্রে?

আফজাল : স্টল পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যার সম্মুখীন ভিন্নচোখ হয় নি, এবারই প্রথম প্রকাশক হিসেবে স্টলের জন্য আবেদন করি। স্টল পাওয়ার প্রক্রিয়াগুলো গতবছরই জেনে নিয়েছিলাম (একাডেমির নীতিমালা), সে অনুযায়ী প্রস্তুতি থাকায় এবং যথাযথভাবে আবেদন করায় মনে হয় সমস্যায় পড়তে হয় নি।


বিতরণ ও বিপননের যে চেইন ১০-১৫ বছর আগেও ছিল, তা এখন আর দেখি না। যা ছিল তার উন্নতি তো হয় নি, বরং ধ্বংস হয়ছে।


এবার একটু পোস্ট-প্রডাকশনে আসি। আমরা দেখি প্রতি বছর হাজারও বই হয়। কিন্তু মেলা শেষ তো বই শেষ। জেলা শহর তো দূরের কথা বিভাগীয় সব শহরেও বই পৌঁছায় না। এই যে অবস্থা, এর থেকে উত্তরণে কী করা যায়?

Vinnochok morok
ভিন্নচোখ’র একটি প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রকাশকসহ বিশিষ্টজনেরা

আফজাল : বিতরণ ও বিপননের যে চেইন ১০-১৫ বছর আগেও ছিল, তা এখন আর দেখি না। যা ছিল তার উন্নতি তো হয় নি, বরং ধ্বংস হয়ছে। একটা বড় কারণ আমার মনে হয়েছে খুচরা বিক্রেতার অসততা। ভিন্নচোখ বিভাগীয় শহরগুলোতে নিয়মিত পাঠায়। বই পাঠিয়েছি গত বছর, দুঃখের বিষয় কোনো ফিডব্যাক পাওয়া যায় না কারও কাছ থেকে, একটা টাকাও কেউ দেয় না বা অবিক্রিত বইও ফেরত দেয় না। বই বিতরণ ও বিপননের একটা সিস্টেম তৈরি করার জন্য কাজ করছি, সফল হলে বলতে পারব এই প্রত্রিুয়ায় অবস্থা উত্তরণ হবে।

আমরা দেখি একটা বই হবার আগে ও পরে এই বইটার প্রচারণা, পাঠ আড্ডা, বিজ্ঞাপন অনেক কিছু হয় বাইরে। আমাদের এখানে এগুলো যে একেবারে হয় না সেটা বলছি না, কিন্তু লেখক ও বইয়ের ব্র্যান্ডিং করার ক্ষেত্রে প্রকাশকদের এই অনীহা কেন? এটা তাদের ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে সহায়ক হবার কথা…

আফজাল : সত্যি যদি বলি আমাদের এখানে এখনও বইয়ের কোনো ডিস্ট্রিবিউশন এবং মার্কেটিং ব্যবস্থা গড়ে উঠে নি। ব্র্যান্ডিং তো মার্কেটিংয়ের আরও গভীর বিষয়। ব্র্যান্ডিং সম্পর্কে প্রকাশকদের অজ্ঞাতাই এর কারণ বলে মনে হয়।

ধন্যবাদ আপনাকে, আমাদের সাথে বাতচিতের জন্য।

আফজাল : ধন্যবাদ।

মাজুল হাসান
মাজুল হাসান

মাজুল হাসান

কবি ও গল্পকার
জন্ম : ২৯ জুলাই ১৯৮০, দিনাজপুর।
পড়াশুনা করেছেন দিনাজপুর জিলা স্কুল, নটরডেম কলেজ
ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অর্নাস।।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ:
বাতাসের বাইনোকুলার ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১০।
মালিনী মধুমক্ষিকাগণ ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১৪।
ইরাশা ভাষার জলমুক ● চৈতন্য, ২০১৬।

প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ:
টিয়ামন্ত্র ● ভাষাচিত্র প্রকাশনী, ২০০৯।
নাগর ও নাগলিঙ্গম ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১২।

অনুবাদগ্রন্থ:
টানাগদ্যের গডফাদার, রাসেল এডসনের কবিতা ● চৈতন্য, ২০১৬।

মাজুল হাসান পেশায় সাংবাদিক। বর্তমানে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে বার্তা বিভাগে কর্মরত।
মাজুল হাসান
মাজুল হাসান