হোম সাক্ষাৎকার দানব-তাড়িত এক বৌদ্ধের সাক্ষাৎকার

দানব-তাড়িত এক বৌদ্ধের সাক্ষাৎকার

দানব-তাড়িত এক বৌদ্ধের সাক্ষাৎকার
3.92K
0

কো উন কোরীয় ভাষার সবচাইতে নন্দিত ও খ্যাতিমান কবি। দেড় শতাধিক গ্রন্থের রচয়িতা বহুপ্রজ এই কবি শুধু কবিতাই লেখেন নি, উপন্যাস, নাটক ও সাহিত্য-সমালোচনাও তার রচনাভাণ্ডারের সম্পদ। গল্পকার ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ অনূদিত ২০০৯ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত সময়ে বিভিন্নজন গৃহীত ৫টি সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ পরস্পরের পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করা হলো, যাতে এই কবির নিজস্ব জগৎকে তারই ব্যাখ্যার সাহায্যে বোঝা যায়। ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদকে এই সাক্ষাৎকার ও কবি-পরিচিতিমূলক সংক্ষিপ্ত ভূমিকার জন্য বিশেষভাবে ধন্যবাদ।


ভূমিকা
❑❑

তার একটা জীবন যেন সাধুর, একটা জীবন রাজনৈতিক কর্মীর, একটা জীবন কারাবন্দির আর পুরো জীবনটা একজন কবির। নাগরিক তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার, কবি তিনি সারা বিশ্বের। তিনি কো উন। অ্যালেন গিন্সবার্গ (১৯২৬-১৯৯৭) তাকে নিয়ে অনেক আগেই একবার লিখেছিলেন, ‘বৌদ্ধ রসজ্ঞ, আবেগপ্রবণ রাজনৈতিক উদারবাদী এবং নিসর্গ ইতিহাসবিদের সমন্বয়ে কো উন এক মহান কবি।’ লিখেছিলেন, ‘কো উন এক দানব-তাড়িত বৌদ্ধ।’

কো উনের জন্ম ১৯৩৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমের প্রদেশ উত্তর জিওলার গুনশানের এক কৃষক পরিবারে। পারিবারিক নাম কো উনটায়ে। জাপানি শাসনের জাঁতাকল জাপানি ভাষায় তার নাম দিয়েছিল ‘ডাক্কাবাইয়াই ডোরাস্কে’। জেন সাধু হিশেবে একবার নাম হয়েছিল ‘ইল চো’। ওজন কম থাকায় কোরীয় যুদ্ধের সক্রিয় সেনা হতে হয় নি কো উনকে, কিন্তু সেনাদের ঘোড়ার গাড়ির কোচোয়ান হতে হয়েছে, সেই কৈশোরেই সেনাদের বইতে হয়েছে নিজের পিঠেও। যুদ্ধের সময় লাখ লাখ মানুষের লাশ মাটিচাপা দিতে গোরখোদকের কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে। আর্ত-অসহায়-মুমূর্ষু মানুষের আহাজারি-আর্তনাদ আর যুদ্ধের দামামা থেকে রেহাই পেতে নিজের কানে এসিড ঢেলে শ্রবণশক্তি হারিয়েছিলেন তিনি। প্রথম জীবনে জাপানি আগ্রাসন আর কোরীয় যুদ্ধের বীভৎসতায় মানসিক বিপর্যয়ের চূড়ান্তে পৌঁছে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন বারবার। বেঁচে থাকার জন্য বারবার আশ্রয় খুঁজেছেন এখানে-ওখানে, এতে-ওতে। এই সূত্রেই এক দশকের বৌদ্ধ ভিক্ষুর জীবন। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে কবি এবং রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীর জীবন—কারাভোগ এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী হওয়ার কারণে পুলিশি নির্যাতনে শ্রবণশক্তি হারিয়েছেন দ্বিতীয়বারের মতো। ১৯৭০ সালে আবারও আত্মহত্যার পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তিনি। বেঁচে যাওয়াটা এবারও যেন নিতান্তই সৌভাগ্য। সারা জীবনের আশ্রয় কবিতা আর দীর্ঘ জীবনের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী অ্যালকোহল।

আশির বেশি বয়স এখন। ভুবনজোড়া খ্যাতি কো উনের। কবিতা, কথাসাহিত্য, নাটক এবং অন্যান্য রচনা নিয়ে এক বিশাল সৃষ্টিভাণ্ডার তার। কোরিয়ার আধুনিক কবিতার প্রধান পুরুষ কো উন পূর্ব এশিয়ার সেই মরমি ভাববিশ্ব আমাদের সামনে উপস্থাপন করেন যেটির ভিত্তি ধরে আছেন সুপ্রাচীন শামান ভাবুক আর বুদ্ধ, কনফুসিয়াস ও লাওজুরা (তাওবাদ)। তাতে মিশে থাকে তার ব্যক্তিজীবনের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার অনন্য নির্যাস। সব মিলে তার কবিতা একেবারেই ভিন্ন দুনিয়ার উন্মোচন। সম্ভাব্য নোবেলজয়ীর তালিকায় নাম এলেও জীবিত কিংবদন্তি এই সাহিত্যিককেও হয়তো নোবেলের সীমাবদ্ধ হাত ছুঁতেই পারবে না।


সা ক্ষা ৎ কা র


প্রশ্ন ১ 

একজন কবির সাক্ষাৎকার শুরুর জন্য যথার্থ প্রশ্ন কী হতে পারে? আপনি কিভাবে আলাপ-সালাপ শুরু করতে পছন্দ করেন?

কো উন

আমি তো মনে করি, একজন কবি যেকোনো ধরনের প্রশ্নই নিতে পারে; তার উত্তর—প্রশ্নের তোয়াক্কা না-ও করতে পারে—সব সময়ই অশেষ, ঠিক কবিতার উপাদান যেমন হয়। যখন কবিকে কেউ কোনো প্রশ্নই করে না, তখন সে আকাশের দিতে তাকাতে পারে এবং আকাশ তখন প্রশ্ন করবে আর সে সেগুলোর জবাব দেবে। আমার সাথে দেখা হলে যখন কেউ প্রশ্ন করে, আমি সেগুলোকে সাগরের ঢেউয়ের মতো নিই। আপনি জানেন, উত্তর কিন্তু সব সমাধান দিতে পারে না; সেগুলো হতে পারে ঠিক অন্য রূপে কেবল আরো কিছু প্রশ্ন।

প্রশ্ন ২

আপনার কবিতা―অন্তত একটি নির্দিষ্ট ব্যাপ্তিতে—হুয়াইয়ান দর্শন অনুসরণ করে। এই দিক থেকে আপনি ইতিহাসকে কিভাবে উপলব্ধি করেন? ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক দুই বিবেচনায়ই আমার এ প্রশ্ন।

কো উন

কোনো শিশু জানতে চাইলে যেভাবে বলতাম আপনার এ প্রশ্নের জবাবটা সেভাবেই দিই। আমি আপনার কারণে বেঁচে থাকি এবং আপনি আমার কারণে বেঁচে থাকেন। ‘হুয়াইয়ান’ শব্দটির প্রথম অংশ হচ্ছে ‘হুয়া’, মানে ফুলগুলো। আমি ফুলকে মহাবিশ্বের সাথে তুলনা করতে চাই। আপনি ও আমি মিলে, আমরা ফুল… আমরা যখন ফুল তখন ইতিহাস উধাও। মানবজাতির ইতিহাস আর সবকিছুকে বাদ দিয়ে দেয়। এটা খুবই নিষ্ঠুর ও সংকীর্ণ। এই ধরনের চিন্তা থেকে ইতিহাসকে উপলব্ধি করলে দেখবেন—ইতিহাসে তারকারাজি নেই, প্রজাপতিমণ্ডলি নেই… আমি বিশ্বাস করি, ইতিহাসের সাধারণ ধারণা আমাদের সংশোধন করা উচিত এবং প্রকৃতিকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, এই মহাবিশ্বের সবকিছুকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। যে ধরনের ইতিহাসের মধ্যে আমরা আছি তাতে প্রকৃতি যেন সত্য কিছু নয়। আপনি ‘হুয়াইয়ানের’ মধ্যে থাকলে সবকিছু একাকার হয়ে আসবে, ‘হুয়াইয়ানের’ সাগরে সাঁতার দিলে কোথায় গিয়ে যে শেষ মিলবে তা জানতে পারবেন না। আমি যেহেতু জীবিত, তাই আমি ‘হুয়াইয়নের’ সাগরে ভাসতে চাই। আমি নির্দিষ্ট কোথাও পৌঁছতে চাই না।

ko-un 1
অল্ডব্রো ফেস্টিভ্যালে নাওমি জাফা, কবি কো উন, কোরিয়ান সাহিত্যের ইংরেজি অনুবাদক ব্রাদার অ্যান্থনি এবং কবির স্ত্রী অধ্যাপক লি স্যাং-ওয়া। ছবি : পিটার অ্যাভারার্ড স্মিথ

আমাদের আদম ও হাওয়া থাকতে হয়, কারণ, তাদের দুজন না হলে কেবল একটি একক থাকে


প্রশ্ন ৩

এক সাক্ষাৎকারে আপনি ‘জীবন’ শব্দটির সমার্থক হিশেবে ‘সম্পর্ক’ শব্দটি ব্যবহারের প্রস্তাব রেখেছিলেন। কারণ, আমরা কেবল অন্যের সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে বেঁচে থাকি। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী সমাজের বিবেচনায় আপনি আমাদের সমসাময়িক সম্পর্ককে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

কো উন

মনে হচ্ছে, আপনার প্রশ্ন—সম্ভবত পরোক্ষভাবে—অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোনোকিছু নির্দেশ করছে। সম্পর্ককে সত্যিই উল্লেখযোগ্য মনে করলে যেসব শক্তি সম্পর্ক গড়ে তুলে সেগুলোকে উপেক্ষা করতে পারেন। আমি বলতে চাচ্ছি, দর্শনে প্রায়ই আগে আসে অস্তিত্ব, কিন্তু অস্তিত্বের এই আগে আসার ব্যাপারে আমি একমত নই। আমি মনে করি, আসলে আগে আসে সম্পর্ক। একক মানে তো সম্পর্কহীন। যেমন, আমাদের আদম ও হাওয়া থাকতে হয়, কারণ, তাদের দুজন না হলে কেবল একটি একক থাকে। প্রাচীন চীনের প্রখ্যাত পুস্তক ‘পরিবর্তনের গ্রন্থে’ (বুক অব চেঞ্জেস) আমরা ইন এবং ইয়াংকে পাই। তারা একসাথে বাঁচে, এক সাথে মহাবিশ্ব রচনা করে। প্রথমে আমাদের সম্পর্ক, এর পরে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী অস্তিত্ব। এটি একটি ক্রিয়া এবং একটি বিশেষ্যের সম্পর্কের মতো—ক্রিয়াই বিশেষ্য হয়ে যায়। মায়ের জরায়ু থেকে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই আমি আমি হই। মায়ের জরায়ুতে আমি আমার নড়াচড়ার মাধ্যমে হয়ে উঠি এবং সেখান থেকে পৃথিবীতে আসি। ক্রিয়া আসে অস্তিত্বের আগে। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, ‘আমি’ স্বাধীন হতে পারে এবং স্বাধীনতা বিচ্ছিন্নতায়ও অভিব্যক্ত হতে পারে। ‘আমি’ ‘আমি’র হাতে আটকা পড়ে অবরুদ্ধ হতে পারে। একই সময়ে, একটি সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রত্যেকের আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত হওয়া উচিত নয়—সম্পর্ক ও অস্তিত্বের মধ্যকার ব্যবধান মুছে ফেলা উচিত। এর কিংবা ওর—কারোরই এককভাবে একক মানের (ওনলি ভ্যালু) জায়গা থেকে অস্তিমানতা অব্যাহত রাখা ঠিক নয়, দুজনে মিলেই অন্য একটি জীবন গড়ে তোলা উচিত। আপনার প্রশ্নের উত্তরের একাংশ আমার ‘শোকাতুর প্রথম পুরুষ’ (ফার্স্ট পারসন সরোফুল) কবিতায় আছে।

প্রশ্ন ৪

দর্শন, কবিতা ও রাজনীতির সম্পর্কটাকে আপনি কিভাবে দেখেন? এই দিক থেকে কবিতার তাৎপর্য কী?

কো উন

ko un 2এই প্রশ্নের জবাবটা যতটা সম্ভব পরোক্ষভাবে দিই। তাহলে—আমাদের একদিকে আছে বাস্তবতা, আরেক দিকে আছে স্বপ্ন। আমরা বাস্তবতার বাইরে পা ফেলতে পারি না, কিন্তু, একই সময়ে আমরা স্বপ্ন ছাড়া বাঁচতেও পারি না—এমনকি একদিনও না। মাঝে মাঝে আমরা স্বপ্নের মধ্যে হারিয়ে যাই এবং অন্য সময় আমরা বাস্তবতার মধ্যে খুব স্বাভাবিকভাবে বাস করি। সবচেয়ে বোকার মতো আমরা যেটা করার চেষ্টা করি তা হচ্ছে এই দুটির একটি নিয়ে বাঁচার চেষ্টা; হয় বাস্তবতার মধ্যে বাঁচা, না হয় স্বপ্নের মধ্যে বাঁচা। আশা করি আপনি এই রূপকল্পটা ধরতে পেরেছেন।

প্রশ্ন ৫

এই ‘বিশ্বে যে বিষয়ে আপনি সবচেয়ে কৌতূহলী’ মৃত্যু আসলে তাই—এক সাক্ষাৎকারে এই কথাটা আপনি বলেছিলেন।

কো উন

এই অবস্থাটা শুধু আমার একার নয়। এই ভয়ের কারণেই তো ধর্ম। মৃত্যু তেমন কিছু নয় যে তা সম্পর্কে যে কেউ বলে ফেলতে পারবে।

প্রশ্ন ৬

আপনার মৃত্যুর পরও এই বিশ্ব আপনি ও আপনার অংশগ্রহণ ছাড়াই চলতে থাকবে। এই ব্যাপারে আপনি কী ভাবেন?

কো উন

Ko un 3এটা তো বেশ আকর্ষণীয় শোনাচ্ছে। ব্যক্তির জীবন শেষ হয়ে যায়, কিন্তু বিশ্ব চলতেই থাকে। মৃত্যুকে আমি ভয় পাই না। অনেক আধুনিক কবিই ২৫-২৬ বছর বয়সে মারা গেছেন। তাদের চেয়ে আমি তিন গুণ বেশি বেঁচেছি। আমি অসংখ্যবার মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে এসেছি। যুদ্ধে অনেক মৃত্যু দেখেছি এবং মৃত্যুর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছি। মৃত্যুকে আমি সব সময় আমার সঙ্গে বয়ে চলেছি।


মৃত্যু সম্পর্কে অজ্ঞতা দিয়েই জীবনকে চিহ্নিত করা হয়


প্রশ্ন ৭

আপনি মৃত্যু সম্পর্কে অনেক জানেন। মৃত্যুর পর আমাদের কী হবে?

কো উন

না, না। মৃত্যু তখনই উল্লেখযোগ্য যখন আপনি জীবিত। মৃত্যু সম্পর্কে অজ্ঞতা দিয়েই জীবনকে চিহ্নিত করা হয়। আপনি মৃত্যুকে জানতে চেষ্টা করছেন মানে জীবনের সঙ্গে ব্লাসফেমি করছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট কিম দায়ে-জুং এমন একটা জীবন কাটিয়ে গেছেন বিক্ষুব্ধ সমুদ্রের সাথে যেটির তুলনা করা যায় এবং তার মৃত্যুটা একটা পর্বতের পতনের মতো।

প্রশ্ন ৮

এক দশক আপনি বৌদ্ধভিক্ষু হিশেবে জীবন যাপন করেছেন। সেই জীবন কিভাবে আপনার কবিতাকে প্রভাবিত করেছে? কারাগারে থাকার সময় তা কি আপনার জন্য সহায়ক হয়েছে?

কো উন

ছোটবেলায় মায়ের বুকের দুধ খেয়েই আমি বড় হয়েছি। বৌদ্ধভিক্ষু হিশেবে আমার যে সময়টা গেছে সেটি আমার জন্য আরেক রকমের দুধ। আমি বৌদ্ধধর্ম খেয়েছি। এটি আমার হাড়, মাংস ও রক্তের অংশ হয়ে গেছে। বৌদ্ধধর্মের সাথে পরিচয় না হলে কিভাবে বেঁচে থাকতাম আমি জানি না। যে সময়টায় আমি পর্বতে গিয়েছিলাম (কোরীয় ভাষায় এই ‘পর্বতে যাওয়া’ বলতে ‘ভিক্ষু হওয়া জন্য বেরিয়ে পড়া’ বোঝায়), সেটা ছিল কোরীয় যুদ্ধের পর। ওই যুদ্ধে লাখ লাখ লোক প্রাণ হারিয়েছে। এমনকি তখন আমার নিজের গায়েও মৃত্যুর গন্ধ পেতাম। আসলে আমি তখন বেশ কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলাম।

Ko Unযখন আমি ভিক্ষু হিশেবে ভাষাকে এবং লিখিত ভাষাকে অগ্রাহ্য করতে শিখে গেলাম এবং ধ্যানে মনোনিবেশ করলাম তখন আমার মনে হলো আমি বদলে গেছি, আমি একেবারে ভিন্ন একটা আমি হয়ে গেছি। সম্ভবত আমার কবিতার অন্তস্তল, বিশেষ করে আমার দীর্ঘ আখ্যানিক কবিতাগুলোর, আমি ভিক্ষু (সন বা জেন) হিশেবে যা করেছিলাম তারই ফল। বৌদ্ধধর্ম দৃশ্যমান জগৎকে খারিজ করে দেয়। জগৎকে নাকচ করে দেওয়ার এই ব্যাপারটি যৌবনে আমার জন্য যথার্থ ছিল। কিন্তু তারপর আমি বৌদ্ধধর্মকে পেছনে রেখে এসেছি এবং জগৎকে স্বীকৃতি দেওয়াটাই আমার কাছে অধিক যথার্থ মনে হয়েছে। কিন্তু আমি বলতে পছন্দ করি না যে আমি একজন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং আমি একজন বুদ্ধ। নিৎশে যেমন বলতেন যে তিনি ইউরোপের বুদ্ধ! আমি একটা ঘাস, একটা কাঠবিড়ালি কিংবা একটা পাখি হতে চাই—টোটেম হিশেবে একটা পাখি।

প্রশ্ন ৯

আপনি জাপানি সম্রাটের শাসনের অধীনে বেড়ে উঠেছেন। ওই শাসনে নিজের ভাষায় কেউ কথা বলতে পারবে না এবং তার নাম পর্যন্ত বদলে দেওয়া হবে—এটা তো আমি কল্পনাই করতে পারি না।

কো উন

ব্যাপারটাকে আমি আমার জীবনে বলদের জোয়াল বা ঘোড়ার জোতা হিশেবে নিই নি। যাই হোক, এখনো সেই স্মৃতি কঠিনভাবে রয়ে গেছে। সেটা খুবই মর্মান্তিক ব্যাপার ছিল, যখন বুঝতে পারলাম যে, মায়ের দুধ খেয়ে যে ভাষা শিখেছি তা নয়, আমাকে আমার বাড়ির বাইরের একটি ভাষা ব্যবহার করতে হবে। আমাদের লিখিত ভাষার ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটেছিল। আরো মর্মান্তিক ব্যাপার ছিল, যখন আমি জানতে পারলাম যে আমার নামও পরিবর্তন করা হবে… প্রতিদিন আমাদের বাধ্য করা হতো জাপানের সম্রাটের প্রতি নতি স্বীকারে। আমরা শুধু আমাদের পরিবারের মধ্যেই আমাদের ভাষায় ফিসফিস করতে পারতাম। এবং পরে, ১৯৪৫ সালে কোরিয়া যখন স্বাধীন হলো, তখন উপলব্ধি করলাম যে স্বাধীনতা মানে আমার মায়ের ভাষায় কথা বলার স্বাধীনতাও। আমি আমার পুরনো নাম, কোরীয় নাম ফিরে পেলাম। ফিরে পেলাম নিষিদ্ধ কোরীয় ভাষা। ওইসব ঘটনা আমাকে কবি হিশেবে অনুপ্রাণিত করেছে। আমি এখনো ওইসব ব্যাপারে খুব সচেতন এবং আমার মায়ের ভাষাকে আমি নিয়তি হিশেবে নিয়েছি। তাই কবিতায় ব্যবহৃত হওয়ার আগেই আমার মায়ের ভাষার প্রত্যেকটি শব্দই আমার কাছে কবিতা। আমি যখন আমার নিজের ভাষার দিকে যেতে থাকি তখনই আমার হৃৎকম্প শুরু হয়।


সর্বোত্তম কবিতা হচ্ছে নীরবতা


প্রশ্ন ১০

১৯৫০ এর দশকের শুরুতে আপনি যেভাবে শ্রবণশক্তি হারিয়ে ছিলেন তা বলেছেন। তারুণ্যে শ্রবণশক্তি হারানো একজন হিশেবে আপনার সাথে কথা বলাটা আমার কাছে বেশ কৌতূহলের। আমার মনে হয়, এই বধিরতা আপনার কাজেরও একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক। শ্রবণশক্তি হারানো সত্ত্বেও আপনার কবিতা ধ্বনির ওপর জোর দেয় এবং যেসব শব্দের ধ্বনি আছে সেগুলোর ওপর আলোকপাত করে, যেমন—নদী ও তরঙ্গের ধ্বনি। বিশ্বের অভিজ্ঞতা লাভের ক্ষেত্রে শ্রবণ ও ধ্বনির ব্যাপারটা এখনো আপনার কতটুকু জুড়ে আছে? অন্যভাবে বললে—আপনার পরিপার্শ্বের ধ্বনি এড়িয়ে যাওয়ার মাধ্যমে আপনি কি আসলে অনিবার্যভাবে অন্তর্মুখী হয়ে ওঠেন? আপনি কি তখন থেকেই আপনার কবিতাকে এভাবে সামনের দিকে নিয়ে গেছেন?

কো উন

16997184_1231694696951798_1735400534_n(হাত বাড়িয়ে দিয়ে) আমার মতোই শ্রবণশক্তি হারিয়েছিল এমন কারো সাথে দেখা হওয়ায় আমিও আনন্দিত। একবার এমন একজনের সাথে আমার দেখা হয়েছিল যে একেবারেই বধির। পরে অবশ্য তার অবস্থার উন্নতি হয়েছিল। আমরা তখন এই উপসংহারে পৌঁছেছিলাম যে, আপনাকে অবশ্যই এই পৃথিবীকে ধ্বনি ও কোলাহলের পৃথিবী হিশেবে নিতে হবে। যে আগে শুনত এবং পরে আর শুনতে পায় না তার ভেতরে ওই শোনা শব্দগুলোই সারা জীবনের জন্য থেকে যায়। এই ধরনের স্মৃতি কিছু ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে দুর্বল ও ক্ষীণ হয়ে আসে, কিন্তু অন্য ক্ষেত্রে তা আবার বলিষ্ঠ এবং আরো জোরদার হতে পারে। তাই, যা বললেন, বিষয়টা ঠিকই আছে। আমার এসব ধ্বনির স্মৃতি আছে, আছে হাওয়া ও সাগরের আওয়াজ, অন্য কবির চেয়ে তা বেশ জোরালোভাবে আছে—এটা হচ্ছে স্মৃতি। কারণ, একদিকে কোনো শ্রবণশক্তি নেই, অন্যদিকে আছে কেবল কানের কৃত্রিম পর্দা। আপনি যদি সেটিও সরিয়ে নেন আমি একেবারেই নীরবতার মধ্যে পড়ে যাব।

প্রশ্ন ১১

আমার মনে হয়েছে, আপনার কবিতায় পৃথিবীর কোলাহল খুব গুরুত্ব নিয়ে আছে। কিন্তু আপনার অনেক কবিতায় আবার গভীর, অনুমান, নিবিড় এক নীরবতাও আছে। নীরবতা যে কী তা আপনি হয়তো শব্দ দিয়ে প্রকাশ করতে পারেন। এক্ষেত্রে আপনার অনুভূতিটা কেমন?

কো উন

(নীরবতা) নীরবতা শব্দের জঞ্জালের মতো কিছু নয়, শব্দের সমাধিও নয়। আমি নীরবতা (সাইলেন্স) ও শব্দের (ওয়ার্ড) মধ্যে পুনর্মিলনের স্বপ্ন দেখি। তারা পৃথকও নয়, তাদের কোনো বিরোধও নেই। সর্বোত্তম কবিতা হচ্ছে নীরবতা।

প্রশ্ন ১২

ইউরোপীয় কবিতা কি আপনাকে প্রভাবিত করেছে?

কো উন

ko-un 6দুর্ভাগ্যজনকভাবে, কবিতায় আমাকে কেউ প্রভাবিত করে নি। এক সময় আমি বোদলেয়ারের প্রেমে পড়েছিলাম। ওমর খৈয়াম, গিলগামেশরামায়ণ আমার ভালো লাগে। যদিও প্রাচীন কবিদের কবিতা আমার ভালো লাগে, তারপরও মনে হয় না যে, আমি তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছি, এটাই আমার দুঃখ। জেলে থাকার সময় আমি দান্তের ডিভাইন কমেডি পড়া শুরু করেছিলাম। আমি যতদিনে এসব কবিকে চিনেছি, ততদিনে আসলে কবিতায় আমার নিজের বাড়ি নির্মাণ শেষ হয়ে গেছে। তবে সেই বাড়িতে তাদের অতিথি হিশেবে পেয়ে আমি খুবই খুশি। আধুনিক কোরীয় কবিতার ইতিহাস তো মাত্র একশ বছরের।

প্রশ্ন ১৩

এবার ম্যানিবো-র (দশ হাজার জীবন) কথায় আসা যাক। কেন দশ হাজার? আপনার কিংবা কোরীয় মানুষের দিক থেকে এই সংখ্যার কোনো বিশেষত্ব আছে নাকি?

কো উন

এটা আসলে গণিতের বিষয় নয়, এটা ‘আরব্য রজনী’র মতো, যেখানে ‘হাজার এক’ মানে ‘বিপুল’ কিংবা ‘অনেক’। কোরিয়া এবং চীনে আবার এটা হচ্ছে একটা বিরাট সংখ্যা প্রকাশের উপায়, বিপুল জনতা— অর্থাৎ ‘নিতান্ত কম নয়’ বলতে যা বোঝায় তার চেয়েও অনেক বেশি।

প্রশ্ন ১৪

ম্যানিবো-কে কি আপনি মহাকাব্য বলবেন? এটা কি একটি কবিতা নাকি দশ হাজার কবিতা?

কো উন

এটি এক ঝাঁক প্রজাপতির মতো…

প্রশ্ন ১৫

১৯৮০ সালে ‘কিম দায়ে-জুংয়ের নেতৃত্বে বিদ্রোহের ষড়যন্ত্রে’ জড়িত থাকার অভিযোগে নামহান মাউনটেইন ফোর্ট্রেসের সেনা-কারাগারে শাস্তি ভোগ করার সময় আপনি ম্যানিবো লেখার পরিকল্পনা শুরু করেছিলেন।

কো উন

আমার কারাকক্ষের কোনো জানালা ছিল না, একটা বাল্ব ঝুলত ওপর থেকে। সেই বাল্বটা নিভিয়ে দিলে কক্ষটা হয়ে যেত একেবারে আলোকচিত্রীর ডার্করুমের মতো। তখন মনে হতো আমি একটা বিশাল কফিনের মধ্যে শক্ত করে বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছি। আমার রেহাই পাওয়ার সম্ভাবনা খুব স্পষ্ট ছিল না। সেখানে থেকে আমার পরিচিত লোকজনের কথা মনে করাটাই ছিল কেবল সান্ত্বনা। তখনই আমি আমার মন ঠিক করে ফেললাম। বেঁচে থাকলে ইতিহাসে যেসব লোকের কবর হয়ে গেছে তাদের কথা লিখব।


আমার মনে হয় আধুনিক কবিতার মারাত্মক দুর্বলতা হচ্ছে এটির স্বগত স্বভাব


ko un 7

প্রশ্ন ১৬

চমৎকার! ম্যানিবো-র রীতি ও আঙ্গিক আপনার অন্য কাব্যগ্রন্থের চেয়ে আলাদা বলে মনে করেন কি?

কো উন

প্রত্যেক কবিতাই আলাদা, প্রত্যেক কবিতাই আলাদা আলাদা ব্যক্তিকে নিয়ে, সেই আলাদা মানুষ সম্পর্কে আমি যা বলতে চাই তার জন্য প্রত্যেক কবিতার জুতসই রীতি ও আঙ্গিক খুঁজে নিতে হয়। যে কারণে এটি রীতি ও আঙ্গিকে বহুমাত্রিক। আমি আঙ্গিকে আগ্রহী নই—বিষয়ই আঙ্গিক তৈরি করে।

প্রশ্ন ১৭

আজকের দিনে পয়েটিক ডিসকোর্সের ভূমিকা কী?

কো উন 

আমি মনে করি এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে কবিতা নিজেকে কোনো বিচ্ছিন্ন মহল্লার মধ্যে আটকে ফেলে নি। আমার মনে হয় আধুনিক কবিতার মারাত্মক দুর্বলতা হচ্ছে এটির স্বগত স্বভাব। সবচেয়ে অনুকূল পরিস্থিতিতে সংলাপ ও স্বগতোক্তির মধ্যে সংযোগ থাকার কথা, নতুন কিছু তৈরির লক্ষ্যে তাদের একসাথে কাজ করার কথা। কবিতার ইতিহাসে আমাদের অনেক অনেক পয়েটিক ডিসকোর্স আছে। আমরা সেগুলোকে সাপের অদৃষ্টের সাথে তুলনা করতে পারি। শীত আসার আগেই সাপ নিজের শরীরের খোলস পাল্টে ফেলে। বলতে কী, চারপাশে এই ধরনের অনেক মরা চামড়া ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। যা হোক, আমি ‘ডিসকোর্সের’ খুব বড় ভক্ত নই এবং সেসব রচনার সময়ও আমার নেই। আমি শুধু যত বেশি পারি কবিতা লিখতে চাই। গরু যেমন হাম্বা হাম্বা করতে পছন্দ করে, সিংহ যেমন গর্জন করতে পছন্দ করে, আগ্নেয়গিরি যেমন লাভা নির্গমন করতে পছন্দ করে, ঝিল যেমন ছোট ছোট ঢেউ তুলতে পছন্দ করে কিংবা প্রজাপতি যেমন চমৎকারভাবে উড়তে পছন্দ করে, তেমনি কোনো ‘ডিসর্কোস তৈরির’ চেয়ে বরং পৃথিবীতে আমার যতটুকু সময় সেটুকুর যত বেশি সম্ভব কবিতা লেখার জন্য উৎসর্গ করতে চাই। যা হোক, পৃথিবীটা হয়তো ডিসর্কোস তৈরির কাজেই অনেক ব্যস্ত রয়েছে।

ko un 8
গায়োংগি প্রদেশের অ্যানসিয়োংয়ে নিজের বাড়ির স্টাডিতে কাজে ব্যস্ত কবি কো উন। ছবি : কোরিয়া টাইমস

প্রশ্ন ১৮

কবি হিশেবেই মূলত আপনার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়, কিন্তু আপনি তো একজন ঔপন্যাসিকও। গদ্য লিখতে আপনার কেমন লাগে?

কো উন

সাহিত্যের এই দুই শাখার মধ্যে ভেদাভেদ করতে চাই না। দুটিকে নিয়েই অন্য পর্যায়ের আলোচনা করতে চাই। উপন্যাসের চেয়ে বরং কবিতার—অন্তত আমার কাছে—অন্য ধরনের আত্মা আছে। কবিতা গদ্যের চেয়ে একেবারেই আলাদা কিছু। আমি বরং বলব—দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং অন্যান্য বিজ্ঞানের সংমিশ্রণ হিশেবে কবিতা বিরাজমান। আমি এমন কোনো প্রস্তাব রাখছি না যে গদ্য কোনোভাবে কবিতার চেয়ে হীন কিছু। এটা এভাবেও বলা যায়—কবিতা পর্বত হলে, গদ্য হচ্ছে সমুদ্র। গদ্য লেখার সময় আমি একজন গদ্যলেখকের মতোই লিখি। কবিতা লেখা আমার কাছে অন্তত গদ্যের ধারাবাহিকতা নয়, কবিতা লিখি একেবারে স্বাধীনভাবে। এমনকি আমার পড়ার ঘরে বেশ কয়েকটি লেখার টেবিল আছে—একটা গদ্য লেখার, কবিতা লেখার জন্য একটা এবং ম্যানিবো লেখার জন্য আরেকটা। একই টেবিলে বসে ভিন্ন কিছু লেখায় মনোযোগ দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।


কবিতায় আপনি কোনো উপলব্ধিতে পৌঁছতে পারেন না, আপনি প্রমত্ততার মধ্যে পৌঁছতে পারেন


প্রশ্ন ১৯

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি কী, অথবা, এমনকি উদ্‌ঘাটনও বলা যায়, যেটায় একজন লেখক পৌঁছতে পারেন?

কো উন

আমি অবশ্যই বলব যে, উপলব্ধির নেশা আমার পছন্দ। কিছু পান না করেই মাতাল হওয়ার সাথে আমি এটির তুলনা করতে চাই। কবিতায় আপনি কোনো উপলব্ধিতে পৌঁছতে পারেন না, আপনি প্রমত্ততার মধ্যে পৌঁছতে পারেন। যেমন, টি এস এলিয়টের কথা বলা যায়। তার কবিতা অবশ্য আমার খুব পছন্দ নয়। তার কবিতায় এই বিশেষ ধরনের মাদকতা খুব নেই। আমি মনে করি সব কবিতায়ই এই ধরনের মাদকতা কিছু না কিছু থাকা উচিত। এটা অনেকটা শামানিজমের (তন্ত্রমন্ত্রের) মতো, যেখানে শামান (তান্ত্রিক) ঈশ্বরের সাথে সংযোগ স্থাপন করে। কবিতা হচ্ছে আমার হৃদয় ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের একটা উপায়। কবিতা আপনাকে এবং এই ব্রহ্মাণ্ডকে একাকার করে দিতে পারে। নাচার সময় যেমন আপনার কাঁধে ডানা থাকে, এটাও তেমন।

ko un 9
রাশিয়ায় কবি কো উন।

প্রশ্ন ২০

এর মধ্যে আপনার আশি বছর হলো।

কো উন

(হেসে) এই কারণে আমার কবিতায় কোরিয়ার আধুনিক কবিতার শুরু আছে, বয়ঃসন্ধি আছে এবং শিশু প্রাপ্তবয়স্ক হলে যেমন হয়, তেমন যৌবনও আছে। আমি এ-ও মনে করি, সীমাহীন সেই অতীত কাল থেকে প্রাচীন মানুষের রক্তও আমার দেহে প্রবাহিত হচ্ছে।

প্রশ্ন ২১

কেউ যখন বৃদ্ধ হতে থাকে তখন কী জীবনটা আরো সহজ হয়?

কো উন

ko un 10আমি সব সময় সতর্কতা অবলম্বন করি। আমি বৃদ্ধ হচ্ছি, এই ভাবনার আরাম থেকে নিজেকে বিরত রাখি। আমার স্ত্রী এ ব্যাপারে আমার প্রশংসার চেয়ে বরং যখন সামলোচনা করে তখন তা আমি বেশি অর্থপূর্ণ হিশেবে নিই। আমি কোনো গভীর উপত্যকায় যেতে চাই না এবং সেখানে ঘুমাতে চাই না। আমার সবচেয়ে পছন্দ ঘূর্ণিঝড়, সাগরের ক্রুদ্ধ তরঙ্গ। যাই হোক, এই যে বাগিচায় প্রজাপতিরা উড়ছে, এই বাগিচায় আমার কিছু কর্তব্য আছে। কবিতায় আমার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। মুক্তি পাব বলে আমি কখনোই আশা করি না।

প্রশ্ন ২২

গাইয়োংগি-দো প্রদেশের অ্যানসিয়োং থেকে সুওনে গিয়েছেন আপনি এক বছর হলো। নতুন পরিবেশ আপনাকে কিভাবে প্রভাবিত করেছে?

কো উন

অ্যানসিয়োংয়ে তিরিশ বছর ছিলাম। সেটা আমাকে একেবারে কানায় কানায় ভরিয়ে রেখেছিল। লেখক হিশেবে সেটা ছিল এক উর্বর জীবন। সুওনে এসেছি এক বছরেরও কম হলো। এখানে আমার জীবন এখনো একেবারে শৈশবে। সম্ভবত এখানেও আমার বিকাশের দৌড় শুরু হবে। সুওন পর্বের প্রথম বছরের উন্মোচন ঘটেছে আমার ‘শিরোনামহীন’ কবিতাগুলো দিয়ে। মনে হয় গাইয়োংগিয়োসান পর্বতের পাদদেশেই আমার সাহিত্য বীরত্বগাথার সমাপ্তি ঘটবে। কোরীয় যুদ্ধে লড়াই করা এক মার্কিন সেনার কথাগুলো এখানে স্মরণ করতে চাই :

মানুষ যেখানে জন্ম নেয় সেটাকে তার আদিবাস (হোমটাউন) বলা হয়, কিন্তু মানুষ যেখানে মারা যায় সেটাই আসলে তার সত্যিকারের আদিবাস।

ওয়েস্ট কোস্টে জন্মেছিলেন রবার্ট ফ্রস্ট, কিন্তু কবি ছিলেন নিউ ইংল্যান্ডের। রবিনসন জেফার্সের মতো কবি আছেন যিনি জন্মেছেন পেনসিলভানিয়ায়, কিন্তু সবাই তাকে ক্যালিফোর্নিয়ার বিগ সুরের কবি হিশেবেই জানে।


স্বাতন্ত্র্য দীর্ঘ সময় ধরে নির্বিঘ্ন অবস্থায় থাকলে তা বিচ্ছিন্নতায় পর্যবসিত হয়


প্রশ্ন ২৩

আজকাল কী নিয়ে কাজ করছেন?

কো উন

‘কুমারী’ নামে একটি মহাকাব্যিক কবিতা লিখছি। কোরীয় ধ্রুপদী উপন্যাস সিমচিয়োংজিয়োন-এর (সিম চিয়োংয়ের কাহিনি) ওপর কাজ। স্বর্গ থেকে সিম চিয়োংয়ের মর্তে নেমে আসা, পাতাল গমন, আবার ভূপৃষ্ঠে ফিরে আসা, আবার স্বর্গে ফিরে যাওয়া—এই নিয়ে একটি গীতিধর্মী কবিতা লেখার পরিকল্পনা এঁটেছি। দান্তে যেভাবে ইনফার্নো, পুরগ্যাটোরিয়ো এবং পারাদিসোকে চিত্রিত করেছেন, এটিও তেমন কাঠামোর। ‘কুমারী’র মাধ্যমে জীবন ও মৃত্যুর চক্রটি ফুটিয়ে তুলতে চাই। এর মধ্যে এসে মিশে যাবে কনফুসিয়ানিজম, বুদ্ধিজম এবং তাওয়িজম। আমি সিম চিয়োংকে এমন একটা চরিত্র হিশেবে ভাবছি যে অনেক জায়গায় ঘুরেছে কিন্তু তার কুমারিত্ব অক্ষুণ্ন আছে। সে অস্তিত্বের বিশুদ্ধতার প্রতিনিধিত্ব করে। তার এই অস্তিত্ব তার চারপাশের নানা প্রতিবন্ধকতার কাছে নতি স্বীকার করে নি। দার্শনিক দিক থেকে সিম চিয়োং আমার ‘আইডিয়া’।

ko un 11
কবি ও তার স্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী ব্রেন্ট মির্সম্যান। ছবি : ড্যাভিড হ্যারিসন।

প্রশ্ন ২৪

কোরিয়া ও জাপানের ইতিহাস বিতর্ক এবং চীন ও জাপানের মধ্যে সীমানা নিয়ে বিরোধের কারণে পূর্ব এশিয়ায় উত্তেজনা বাড়ছে। আপনি এক সময় বলেছিলেন, পূর্ব এশিয়ার শান্তির স্বার্থে তিন দেশকেই সমুদ্রকে অভিন্ন ক্ষেত্র (কমন গ্রাউন্ড) হিশেবে নিতে হবে।

কো উন

একবার আমি জাপানে গিয়েছিলাম। সেখানকার জেলেরা একটি ‘সেনোইয়া’র স্থায়ীটুকু (ধুয়া) বারবার গাচ্ছিল। গানের একই ধুয়া আপনি এখানকার জেলেদেরও গাইতে শুনবেন। সিল্লা রাজবংশের সময় সমুদ্রবাণিজ্য ছিল সমুদ্রের রাজা জ্যাং বো-গোর নিয়ন্ত্রণে। তিনি ছিলেন কোরীয়। কিন্তু তাকে চীন এবং জাপানেও সম্মান করা হতো। সমুদ্র ভূমির মতো নয়। সমুদ্রের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। বিক্ষুব্ধ তরঙ্গের ওপর আপনি সীমারেখা টানেন কিভাবে? পূর্ব এশিয়ার তিনটি দেশেরই সমুদ্রকে একটা সংহতির পরিসর হিশেবে নিতে হবে। তা করার জন্য অবশ্যই আমাদের ইতিহাসকে সমুদ্র সংক্রান্ত ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্নিরীক্ষা করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী ইতিহাস পুনর্গঠন করতে হবে।

ko-un 12

প্রশ্ন ২৫

আপনার এই প্রতিরোধ তো কোরীয়দের মতোই হলো।

কো উন

জাতি যখন বাইরের শক্তির দিক থেকে হুমকির মধ্যে থাকে তখন এই ধরনের পরিচয় গ্রহণ করা প্রয়োজনীয়। কিন্তু পরিচয় তো সাধারণভাবে পাথরে খোদাই করা নয়। আমার আদিবাস গুনশানে গিয়ে আমি আর আমার সেই প্রাকৃতিক দৃশ্য খুঁজে পাই না, কিন্তু আমেরিকার গ্রামাঞ্চলে আমার শৈশবের ওই প্রাকৃতিক দৃশ্যের সন্ধান মিলতে পারে। তেমন হলে আমেরিকার সেই গ্রামই আমার আদিবাস (হোমটাউন) হয়ে ওঠে। কোরীয় সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্যকে আমি শ্রদ্ধা করি, কিন্তু আমি একটি স্বতন্ত্র সংস্কৃতির মধ্যে আটকে থাকতে পছন্দ করি না। শরীরবিদ্যার দিক থেকে বলছি, সংস্কৃতি একটা উদ্বায়ী বিষয়। অন্যভাবে বললে, এটি রসায়ন। একটি দেশের সংস্কৃতি অবিমিশ্র কিছু নয়, অন্য সংস্কৃতির সংস্পর্শেই তা গড়ে ওঠে। স্বাতন্ত্র্য দীর্ঘ সময় ধরে নির্বিঘ্ন অবস্থায় থাকলে তা বিচ্ছিন্নতায় পর্যবসিত হয়।


[জ্ঞাতব্য : ২০১৬ সালে স্লোভেনিয়ার তরুণ সাহিত্যিক আনজা রাদালজ্যাকের নেওয়া সাক্ষাৎকার থেকে ১, ২, ৩, ৪, ১৭, ১৮ এবং ১৯ নম্বর প্রশ্ন। ‘কোরিয়ান লিটারেচার নাও’য়ের পক্ষ থেকে ২০১৪ সালে পার্ক হ্যাই-হিয়ুনের নেওয়া সাক্ষাৎকার থেকে ২২, ২৩, ২৪ এবং ২৫ নম্বর প্রশ্ন। দক্ষিণ আফ্রিকার কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক ব্রেন্ট মির্সম্যানের ২০১৩ সালে নেওয়া সাক্ষাৎকার থেকে ৮, ৯, ১২, ২০ এবং ২১ প্রশ্ন। দক্ষিণ কোরিয়ার দৈনিক ‘চোসান ইলবো’র জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক চোই বো-শিকের ২০০৯ সালে নেওয়া সাক্ষাৎকার থেকে ৫, ৬ ৭, এবং ১৫ নম্বর প্রশ্ন। অস্ট্রেলিয়া-ভিত্তিক কবিতা বিষয়ক ই-জিন ‘কোরডাইট পয়েট্রি রিভিউ’য়ের পক্ষে ই-জিনের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও কবি ড্যাভিড প্র্যাটারের ২০০৯ সালে নেওয়া সাক্ষাৎকার থেকে ১০, ১১, ১৩, ১৪ এবং ১৬ নম্বর প্রশ্ন।]

ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ

জন্ম ১৯৭৭; ময়মনসিংহ। পেশায় সাংবাদিক।

প্রকাশিত বই :
আলো অন্ধকারে আলো অন্ধকারের যাত্রা [গল্প; ঐতিহ্য, ২০০৪]
বিপন্ন সিরিয়ার কথাকার জাকারিয়া তামেরের গল্প [অনুবাদ; মেঘ, ২০১৫]
মওদুদিপুত্রের জামায়াত-বিরোধিতা [অনুবাদ ও সম্পাদনা; প্রকৃতি, ২০১৭]

ই-মেইল : soroishwarja@gmail.com