হোম সাক্ষাৎকার প্রকাশনা ব্যবসাকে আমি আমার অহঙ্কারের জায়গাতেই রাখছি : দন্ত্যন ইসলাম

প্রকাশনা ব্যবসাকে আমি আমার অহঙ্কারের জায়গাতেই রাখছি : দন্ত্যন ইসলাম

প্রকাশনা ব্যবসাকে আমি আমার অহঙ্কারের জায়গাতেই রাখছি : দন্ত্যন ইসলাম
575
0

দন্ত্যন ইসলাম মূলত কবি। ‘রূপন্তি’ প্রকাশন থেকে ২০১৫ সালে প্রকাশ পায় তার কবিতার বই রঙমাখা নীল দরজা। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি প্রকাশনা-শিল্পের সঙ্গেও জড়িত। তার প্রতিষ্ঠান ‘জেব্রাক্রসিং প্রকাশন’ ২০১৬ সালে পথচলা শুরু করে। প্রকাশিত প্রথম বই ‘শিক্ষা পরিভাষা’। এ পর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৭২টি।

পরস্পরের পক্ষ থেকে আমরা এবার মুখোমুখি এই তরুণ কবি ও প্রকাশকের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তরুণ কবি মোস্তফা হামেদী। তাকে আর ধন্যবাদ দিয়ে দূরে ঠেলতে চাই না।

– সম্পাদক

মোস্তফা হামেদী

 দন্ত্যন ভাই, কেমন আছেন?

দন্ত্যন ইসলাম 

ভালো আছি হামেদী ভাই। আপনি?

মোস্তফা হামেদী

এই তো ভালো। ‘জেব্রাক্রসিং’য়ের কী খবর? কী কাজ করতেছেন এখন?

দন্ত্যন ইসলাম 

জেব্রাক্রসিং তো ভালোই আছে সাদায়-কালোয় মিলেমিশে! হা হা হা… মেলার কিছু কাজ বাকি ছিল, এখন সেগুলো করতেছি। ২/৩টি কবিতার বই এবং ১টি অনুবাদগ্রন্থের কাজ করতেছি।

মোস্তফা হামেদী

আপনার তো এইটা দ্বিতীয় মেলা ছিল। মেলার অভিজ্ঞতা বলেন।

দন্ত্যন ইসলাম 

হ্যাঁ, প্রকাশনী হিসেবে এটি জেব্রাক্রসিংয়ের দ্বিতীয় মেলা ছিল। প্রথম বছর তো লিটলম্যাগের উন্মুক্ত অংশে ৩২ ইঞ্চির একটা ছোট্ট জায়গায় ছিল আমাদের স্টল। এত ছোট জায়গায় থেকেও আমরা পাঠক-লেখকদের বিরাট সাপোর্ট পেয়েছি। বই বিক্রিও ছিল আশানুরূপ। আর এবারের মেলায় গতবারের তুলনায় ১০ গুণ বেশি বিক্রি ছিল। প্রকাশক হিসেবে আমি প্রথমেই বিক্রির কথা ভাবছি। কারণ, বই বিক্রি না হলে প্রকাশকের সঙ্গে সঙ্গে লেখকও হতাশ হন। তো, সে হিসেবে আমাদের অভিজ্ঞতা বেশ ভালো। আর অন্যান্য আরও কিছু অভিজ্ঞতা এবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে জেব্রাক্রসিংয়ের ঝুলিতে। যেটা নিয়ে এখনই ভাবা শুরু করেছি।


শেষ পর্যন্ত আমিও তো একজন তরুণ। কোনোভাবেই চাইব না, নতুন একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের গায়ে আঁচড় লাগুক।


মোস্তফা হামেদী

মেলার সময় প্রায়ই এই ঘটনাটা ঘটে যে, প্রকাশকরা শুরুর দিকে বই আনতে পারেন না। বিশেষ করে তরুণ বা অপ্রতিষ্ঠিত লেখকদের তরফ থেকে এই ধরনের অভিযোগ বেশি শোনা যায়। এটা কি পেশাদারিত্বের অভাব? নাকি তরুণদের প্রতি তাচ্ছিল্য?

দন্ত্যন ইসলাম 

না না, এটা কখনোই ‘তরুণদের প্রতি তাচ্ছিল্য’ বলে আখ্যা দিতে পারব না আমি। আসলে জেব্রাক্রসিংয়ের ৯০% লেখকই তো তরুণ। অনেকেই এটাকে ‘অপেশাদারিত্ব’ নামে অভিহিত করে থাকেন। মূল ব্যাপার হচ্ছে, নতুন প্রকাশকদের তো মেলার শুরুর দিকে সব বই আনা সম্ভব না। বুঝেশুনে বই আনা হচ্ছে বুদ্ধিমানের কাজ। সমস্যাও থাকে রকমফের। কিছু বই ইচ্ছে করেই দেরিতে এনেছি, যেটা ছিল ব্যবসায়িক পলিসির অংশ। মেলার প্রথম সপ্তাহের মধ্যে সব বই চলে এলে পাঠকদের মাঝে ‘ওই বইটি এসেছে?’, ‘ওই বইটি কবে আসবে?’ এই রকম তাড়নাটা থাকবে না। তাই এটা করেছি হাতেগোনা কয়েকটি বইয়ের ক্ষেত্রে। যদিও এরজন্য অনেক ‘কথা’ শুনতে হয়েছে আমাকে। আবার কিছু বই দেরিতে আনা হয়েছে প্রেসে সকল প্রকাশনীর কাজের চাপ থাকার কারণে, কিংবা বাইন্ডিং কারখানার লোকেদের কারণে। আরও আরও নানান কারণ। আমি কিন্তু জেব্রাক্রসিংয়ের কথাই বলছি। আমাদেরই এরকম সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। মেলার শুরুর দিকে অনেকের বই আনতে পারি নি, এজন্য আমি প্রকাশক হিসেবে তাদের কাছে লজ্জিত ছিলাম। পরে অবশ্য সব ঠিকঠাক মতন করে ফেলেছি। পেশাদারিত্বের যদিও কিছু অভাব থেকে থাকে, সেগুলো কাটিয়ে উঠে আগামীতে মেলার শুরুর দিকেই বই রাখবে জেব্রাক্রসিং। সে অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছি ইতোমধ্যে।

মোস্তফা হামেদী

অনেকে তো বেশ হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন। কিভাবে সামলেছিলেন সেই চাপ?

দন্ত্যন ইসলাম 

এক তরুণের সঙ্গে আরেক তরুণের যেরকম খুনসুটি হয়, ঠিক সেরকমই হয়েছিল বলা যায়। আপনি হয়তো দেখে থাকবেন বা জেনে থাকবেন যে, সাময়িক ক্ষুব্ধতা ছিল সেসব। ‘বই সময় মতো আনতে পারছি না কেন, কেন তারিখ দিয়ে তারিখ মতো বই দিতে পারছি না’ এই পয়েন্টেই বেশি ক্ষুব্ধ ছিল জেব্রাক্রসিংয়ের লেখকগণ। তাদেরকে আমি আমার মতো বুঝিয়ে-শুনিয়ে অভিমান-অনুরাগ কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমিও তো একজন তরুণ। কোনোভাবেই চাইব না, নতুন একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের গায়ে আঁচড় লাগুক। যেটা লেগেছে, সেটা আস্তে আস্তে মুছে যাবে কাজের বিনিময়েই। আমি কাজ করতে এসেছি না? কাজেই সব চাপ সামাল দিতে চাই ভাই।

মোস্তফা হামেদী

যাই হোক, সবমিলিয়ে মেলা নিশ্চয়ই ভালোভাবেই শেষ হয়েছে। কেমন প্রতিক্রিয়া পাচ্ছেন? লোকজন কী বলতেছে?

দন্ত্যন ইসলাম 

লোকজনের ফিডব্যাক ভালোই পাচ্ছি। কিছু বই দুর্বল ছিল, থাকেই। পাঠকের অভিযোগ আছে এটা নিয়ে। আমি কিন্তু দুর্বল ভাবছি না কোনো বইকেই। কারণ, যেটিকে কেউ কেউ দুর্বল ভাবছেন, সেটি নিশ্চয়ই আরেকজনের কাছে সবল বই। তবে, সবমিলিয়ে প্রতিক্রিয়ার বাক্স ধীরে ধীরে ভরে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত যতজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে, ততজনই জেব্রাক্রসিংয়ের বইয়ের লেখার মান, কাগজ, বাইন্ডিং, ছাপা নিয়ে আশার বাণী শুনিয়েছেন। বড় বড় অনেক প্রকাশকও আমাদের বই দেখে অবাক হয়েছেন এই বলে যে, ‘২ বছরেই এত ভালো প্রোডাকশন দিচ্ছে যেহেতু, সেহেতু এরা ভালো করবে বলা যাচ্ছে’। এই যে এইটুকুই আমাদের জন্য বিরাট সার্টিফিকেট। কারণ, প্রকাশনায় জেব্রাক্রসিং এখনো শৈশবকাল পার করছে। যুবক হয়ে একদিন প্রৌঢ় হব, অভিজ্ঞতাও পাকবে। সকলকে নিয়েই থাকতে চাই। খারাপ বলুক আর ভালো বলুক, সকলকেই পাশে চাই।

মোস্তফা হামেদী

দারুণ ব্যাপার। দেখা হলে মিষ্টি খাওয়ায়েন। হা হা।

দন্ত্যন ইসলাম 

হা হা হা, খাওয়ার ব্যবস্থা করতেছি, রহেন।

মোস্তফা হামেদী

আপনার বিক্রিবাট্টার খবর বলেন। কয়েকটা বই নিয়ে তো পাঠকের ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত ‘বেস্ট সেলার’ বই কোনটা হইল?

দন্ত্যন ইসলাম 

বিক্রিবাট্টা যে আলহামদুলিল্লাহ ভালো হয়েছে, তা আগেই বলে দিয়েছি। সে বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত করছি বেস্ট সেলার কিছু বইয়ের নাম। জেব্রাক্রসিং যেহেতু কবিতার বই বেশি করে, সেহেতু তাদের বেশি বিক্রিও হয় কবিতার বই-ই। এবারের মেলায় কবিতার বইয়ের পাশাপাশি গল্প, উপন্যাসের বইও ব্যাপক বিক্রি হয়েছে। বেস্ট সেলার বই না বলে বলব ভালো বিক্রি হয়েছে এমন কিছু বইয়ের নাম। যেমন : কবিতার মধ্যে মীনগন্ধের তারা, কালো বরফের পিস্তল, তামার তোরঙ্গ, কয়েক লাইন হেঁটে, পুষ্প আপনার জন্য ফোটে, রাতের অপেরা, একাই হাঁটছি পাগল, শর্তহীন দেবদারু, অপুষ্পক বেশি বিক্রি হয়েছে। আর শেফালি কি জানে বইটি ছিল না-কবিতা, না-গল্প—যদি এটিকে কবিতার বই হিসেবে ধরি, তাহলে এটিই বিক্রির শীর্ষে ছিল। পাশাপাশি পাগলা গারদে দুই বৎসর এবং মাওলার খোঁজে মনোরঞ্জন বই দুটি ছিল আমাদের মূল আকর্ষণ। গল্পের বইয়ের মধ্যে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া গল্প, যূথচারী আঁধারের গল্প, বাজপাখির পুনর্জন্ম এবং থ্রিলারগ্রন্থ দ্য ডায়রি অফ অ্যা ক্যানিবল-টিও দারুণ সাড়া ফেলেছে।

মোস্তফা হামেদী

বাংলাদেশের প্রকাশক ও লেখকদের বই নিয়ে যাবতীয় কর্মযজ্ঞ মেলাকেন্দ্রিক। মেলার পরে কেমন একটা শিথিলতা চলে আসে। প্রকাশকরা যেন মেলার পরে আর বই বেঁচতে চান না। কোথাও বই পাওয়া যায় না। বইয়ের প্রচারও বন্ধ হয়ে যায়। মনে হয় যেন, মেলা শেষ হওয়ার মধ্য দিয়া একটা বইয়ের আয়ু ফুরিয়ে যায়। কারণ কী আসলে?

দন্ত্যন ইসলাম 

এই সমস্যাটা মূলত নতুন প্রকাশনীর। পুরনোরা তো বাংলাবাজার, শাহবাগ [আজিজ মার্কেট, কনকর্ডসহ] আশেপাশে অফিস, শোরুম করে তাদের প্রকাশিত বইগুলি রাখছে। বেশকিছু প্রকাশনী তাদের নিজস্ব ডিস্ট্রিবিউটরের মাধ্যমে সারাবছরই সারাদেশে বই বিক্রি করছে। যত সমস্যা এই আমাদের নতুনদের। নেই নিজস্ব শোরুম কিংবা অফিস। তবুও কিন্তু দমে যাচ্ছি না। চেষ্টা করছি বাংলাদেশের যেসব জায়গায় সাহিত্যের বই বিক্রি হয়, সেখানে বই পাঠাতে। হামেদী ভাই, সারাদেশে বই দিয়ে লাভ কী, যদি দোকানদাররা বই বিক্রি করেও ঠিক মতো বিল না দেয়! অভিজ্ঞতা হচ্ছে আমার। টাকা না পাওয়ার কারণে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় বই পৌঁছাই না। শুধু সেসব বিপণিতে পাঠাই, যারা আর যাই হোক, বিল আটকাবে না। মেলার পরে বইয়ের আয়ু ফুরিয়ে যাওয়ার এইটা একটা অন্যতম কারণ। তবে ইদানীং অনলাইন বুকশপগুলি এই অভাব ঘোচাচ্ছে তো। আপনি জানেন না? তাছাড়া একুশে বইমেলার পরে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন মেলা হয়, যেখানে জেব্রাক্রসিংয়ের সব বই পাওয়া না গেলেও কিছু কিছু বই পাচ্ছেন পাঠকরা। এগুলোর প্রচারণা কিন্তু সারাবছরই চলে ইন্টারনেটের এই যুগে…

মোস্তফা হামেদী

তাহলে বিক্রয়কেন্দ্রগুলি সম্পর্কে টাকা বা বিক্রির হিসাব ঠিকঠাক মতো না দেওয়ার যে অভিযোগ শোনা যায়, তার সত্যতা আছে। অন্তত আপনার অভিজ্ঞতা তো তাই বলছে। লেখকরাও আবার প্রকাশকদের সম্পর্কে প্রায় একই রকম অভিযোগ করেন। এমনও শোনা যায়, বই যত কপি ছাপানোর চুক্তি থাকে তার অর্ধেকটাও ছাপানো হয় না। রয়্যালটি তো দূর-অস্ত।

দন্ত্যন ইসলাম 

হ্যাঁ, হতে পারে। অনেক লেখকের সঙ্গে ঘটেছে এমন। অবশ্য জেব্রাক্রসিংয়ের ব্যাপারে এই পয়েন্টে অভিযোগ করার কোনো সুযোগ নেই লেখকদের। এমনটাও শুনেছি, বই ছাপাবেন বলে অনেক প্রকাশক লাখ লাখ টাকা নিয়ে উধাও হয়েছেন। এবারের মেলার শেষেও শুনেছি এমন। কিন্তু, নিয়মিত প্রকাশনা জগতে এটা করার দুঃসাহস কারও নেই যে। যারা এটা করছে তারা নিশ্চিত এটা করার আশায়ই এসেছে। কারও থেকে টাকা এনে টাকা মেরে দেওয়ার ঘটনা আমাদের নেই। ২/১টি বই করতে পারি নি বলে লেখকদের পক্ষ থেকে বই না করার ইঙ্গিত পেয়ে সেগুলি আর করি নি। কিন্তু কোনো লেখকের টাকা মেরে দেওয়া, কিংবা বই কম ছাপানোর কোনো রেকর্ড নেই আমাদের। আমরা বরঞ্চ এমন করেছি, কার কত কপি বই বিক্রি হয়েছে, সে হিসাব আপডেট জানিয়ে দিয়েছি। এবার তো আমরা রয়্যালটিও দিচ্ছি। নতুনদের জন্য রেওয়াজ চালু করে দিয়েছি। দেখাদেখি অনেকেই শুরু করছে। খুশি হয়েছি এটা দেখে।


আমার ব্রত হচ্ছে এটা। শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে দিয়ে তাহলে কেন এলাম এই পেশায়। আমার একমাত্র উপার্জন এখন এই প্রকাশনী। 


মোস্তফা হামেদী

বেশ ভালো। সারাবছর পাঠকের কাছাকাছি বা নজরে থাকার জন্য জেব্রাক্রসিংয়ের পরিকল্পনা কী?

দন্ত্যন ইসলাম 

নিয়মিত বই করা। বিশেষ করে অনুবাদগ্রন্থ করা, যেগুলো বাংলাদেশে হয় নাই এমন অনুবাদের বই। বছরে অন্তত দুইবার জেব্রাক্রসিংয়ের লেখকদের সঙ্গে বসে আলোচনা করা। জেব্রাক্রসিংয়ের আয়োজনে সারাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলিতে মেলার আয়োজন করা। মানে সারাবছরই জড়িত থাকতে চাই পাঠকদের সঙ্গে।

মোস্তফা হামেদী

কাগজ, বাধাই, ছাপা, মলাট—এইগুলি নিয়ে বাংলাদেশে বেশ আশাব্যঞ্জক প্রতিযোগিতা শুরু হইছে মনে হয়। তারপরও মন ভরে না। আর আর্দ্র আবহাওয়ায় বই টেকানোও মুশকিল হয়ে ওঠে। বইয়ের মান নিয়ে আপনার চিন্তাভাবনা কী?

দন্ত্যন ইসলাম 

ঠিকই বলেছেন। সবাই চাইছে ভালো প্রোডাকশনে তার বইটি আসুক। প্রকাশক হিসেবে আমি সেটা করার চেষ্টা করি। অন্ততপক্ষে একজন লেখক হয়ে আরেকজন লেখকের মনোবাসনা বোঝার চেষ্টা করে সে লক্ষ্যে কাজ করি আমি। লেখক খ্যাত বা অখ্যাত যে-ই হোক না কেন, বইয়ের কাগজ, ছাপা, বাঁধাই আমরা কাছাকাছি রাখি। দু-একটা বই একটু ভিন্নরকম কোয়ালিটির করি। যেটা প্রকাশকের এখতিয়ারেই করা হয়ে থাকে। সব বই তো আর ‘নিয়মিত ভালো’র ঊর্ধ্বে উঠে করা সম্ভব নয়। যেগুলি একটু ভিন্ন করি, সেগুলিই আমাদেরকে নানান রকমের প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখে। আপনার প্রশ্নের খাতিরেই এটা বললাম। না-হয় এভাবে হয়তো বলতাম না। কিছু বই ভিন্ন করতেই হবে। তাহলে তো ভিন্ন কাজের উদাহরণ থাকবে না। একটা বইকে বই হয়ে আসতে কমপক্ষে বইটিকে ৩২ বার হাত ঘুরতে হয়। আঠা ঠিক মতো না শুকিয়ে বই আনলে সেটা আর্দ্র আবহাওয়ায় টেকানো মুশকিল। কিছু বইতে দেখবেন কালো কালো ফাঙ্গাস পড়ে যায়, সেগুলি ভেজা থাকার কারণে হয়। বইয়ের মান ভালো রাখার জন্য আমাদের হাতে অনেক প্ল্যান। যেগুলোর কিছু কিছু আমরা প্রয়োগ করে থাকি। হাতে অগণিত টাকা থাকলে সবটাই করা সম্ভব। প্ল্যানগুলো বাস্তবায়ন করব ইনশাল্লাহ।

34774050_1875711769140602_5367044450805612544_n
জেব্রাক্রসিংয়ের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বই

মোস্তফা হামেদী

আপনার হাতে অনেক টাকা আসুক। প্ল্যানগুলি দ্রুত বাস্তবায়ন হোক। অন্য একটা প্রসঙ্গে যাই। অনেকেই তো পাণ্ডুলিপি পাঠায়। হয়তো আপনি তারটা চাচ্ছেনই না। আবার অনেক পাণ্ডুলিপির জন্য আপনি মুখিয়ে থাকেন। কিভাবে ডিল করেন ব্যাপারগুলা?

দন্ত্যন ইসলাম 

আমি যাদের বইগুলি করতে চাই, তাদেরকে বিনয়ের সঙ্গেই বলে বসি ‘আপনার বইটি করব, পাণ্ডুলিপি দেন’। তারাও কেন জানি খুব সহজে দিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেন। শুধু তাদের চাওয়াটা থাকে প্রোডাকশন যেন ভালো হয়। কিছু বই আবার পরামর্শে করি। পরামর্শ বলতে রেফারেন্স আর কি। পাণ্ডুলিপি পছন্দ হলেই সেগুলি গ্রহণ করি। আবার অনেকেই আছে নিজের থেকেই বই প্রকাশের আগ্রহ দেখায়। তুলনামূলক বিচারে তারা নতুন লেখক, তাদের লেখার ঢঙও নতুন। সে সুবাধে সেখান থেকেও বাছাই করে কিছু পাণ্ডুলিপি নিই। ব্যাপারগুলো ডিল করার মাধ্যম এই ফেসবুক, ফোনালাপ আর কয়েকজনের সঙ্গে ব্যক্তিগত বৈঠকে বসেই কার্য সম্পাদন করি। এভাবেই হয়ে যাচ্ছে সব… কিন্তু, সব পাণ্ডুলিপিই বই করে আনছি না।

মোস্তফা হামেদী

পাণ্ডুলিপি বাছাই করেন কিভাবে? লেখকের নাম দেখে? প্রতিটা পাণ্ডুলিপি পড়া তো সম্ভব না। সম্পাদকীয় বোর্ড আছে জেব্রাক্রসিংয়ের?

দন্ত্যন ইসলাম 

প্রথমে আমিই বাছাই করি। হ্যাঁ, পুরোটা পড়েই বই করি আমি। জেব্রাক্রসিং থেকে যেসব বই প্রকাশিত হয়েছে, তার সবগুলি পাণ্ডুলিপি প্রথমে আমি পড়েছি। পড়তে গিয়ে দেরি হয়, বই আসতেও দেরি হয়। অনেকের লেখা আমিই সম্পাদনা করি। কয়েকজন তরুণ লেখক আছেন আমাদের সম্পাদকীয়তে। তারা পড়ে ভালোমন্দ মতামত দেন, তারপর আমি বিবেচনা করে পাণ্ডুলিপি ফাইনাল করি। আশা করছি, এ বছরই পূর্ণাঙ্গ সম্পাদনা পর্ষদ করে ফেলতে পারব। এটা করা দরকার।

মোস্তফা হামেদী

‘মুরগি লেখক’ বলে একটা কথা শোনা যায় প্রকাশক পাড়ায়। এই ধরনের অভিধা তো নিশ্চয়ই খুবই অপমানজনক। পাণ্ডুলিপি পছন্দ না হওয়ার পরও শুধু টাকা হাতানোর জন্য বই করা আর ‘মুরগি লেখক’ অভিধা দিয়ে কৌতুক করা, তাচ্ছিল্য করা—প্রকাশকদের নৈতিকতার জায়গাকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। পাণ্ডুলিপি পছন্দ না হলে আপনি কী করেন?

দন্ত্যন ইসলাম 

‘মুরগি লেখক’ শব্দ দুটি শুনে আমি প্রথমে থ খেয়েছিলাম। দু’একজন পরামর্শ দিতেন আমাকে এই বলে যে, “মিয়া, মুরগি লেখক ছাড়া প্রকাশনী টিকব না, মুরগি লেখক খোঁজো!” আমি বলি, “মুরগি লেখক আবার কী!” সত্যি বলছি হামেদী ভাই, ২০১৬ সালের কথা এটা। এ বছর বাংলাবাজার বইপাড়ায় এই শব্দবন্ধ বহুবার শুনেছি, বলাবলি করছিল একে অপরকে। আমি ওদিকে কান পাতি না। আমি লেখককে ‘মুরগি লেখক’ বলতে ইচ্ছুক নই। টাকা দিয়ে বই করাটাকে আমি মুরগি লেখক বলব কেন? লেখকের জন্য এটা অপমানজনক! যাদের পাণ্ডুলিপি আমার পছন্দ হয় না, তারা কেউ কেউ বিষাদবদনে ব্যথিত হয়ে ফিরে যান; কেউ লেগে থাকেন। মানে জেব্রাক্রসিং থেকে বই করবেন। সেক্ষেত্রে কেউ কেউ আর্থিকভাবে আমাকে সহযোগিতা করেছে, তাও বই কেনার বিনিময়ে, মাগনা নয়। কোনো কোনো আনকোরা লেখকের বই করার খরচ পুরোটাই আমি দিয়েছি। কারণ, আমার ব্রত হচ্ছে এটা। শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে দিয়ে তাহলে কেন এলাম এই পেশায়। আমার একমাত্র উপার্জন এখন এই প্রকাশনী। কিন্তু, আমি কী উপার্জন করছি এখান থেকে? আপাতত কিছুই না, ত্যাগ ছাড়া, অপমান ছাড়া। হয়তো একদিন বৃক্ষটি একা একাই বড় হবে।

মোস্তফা হামেদী

শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে হঠাৎ প্রকাশনায় আসলেন কেন?

দন্ত্যন ইসলাম 

সে অনেক বড় কাহিনি। বলা যায় একটা ইতিহাস। আসলে ভালো লাগছিল না শিক্ষকতা পেশাটা। কেমন জানি একঘেয়েমি লাগত। ১৬ মাস চাকরি করেছি, বাংলা পড়াতাম। যাচ্ছিল না নিজের সঙ্গে। গ্রামে থাকতাম। খুব করে ইচ্ছা করছিল লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত এমন কিছু করি। ২০১৫ সালে একবার কয়েকজন মিলে প্রকাশনী করার কথা ছিল। কিন্তু যৌথ ব্যবসা খুব একটা আরামপ্রদ না ভেবেই সেই চিন্তা বাদ দিয়েছি। হুট করে চাকরি ছেড়ে ঢাকায় চলে এসেছি। এসে নতুন একটা টিভি চ্যানেলে জয়েন করলাম। সেখানেও ভালো লাগছিল না। উত্তরায় খাবারের বিজনেস ছিল আমাদের দুজনের। সেটার সঙ্গে অবসর সময় কাটাচ্ছিলাম। পেশাগত জীবনে কী করব, তখনো ভাবছিলাম। একজন প্রকাশক আমার চিন্তাকে উসকে দিলেন। নেমে গেলাম প্রকাশনীতে। এটা তো গেল কেন শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে প্রকাশনায় এলাম, তার প্রসঙ্গে; কিন্তু প্রকাশনা পেশা কেন বেছে নিলাম সেটারও আছে অনেক গুপ্তকথা।

মোস্তফা হামেদী

ছোট করে কিছু বলতে পারেন…

দন্ত্যন ইসলাম 

জেব্রাক্রসিংয়ের জন্মের আগে আমার মাধ্যমে কয়েকজনের বই প্রকাশ করেছিলাম একটি প্রকাশনী থেকে। সেই প্রকাশক আপনার একটা প্রশ্নের মতোই কাজ করল। কাগজ, ছাপা, বাঁধাই এত এত নিম্নমানের ছিল যে, সেগুলি আমি এখনো বস্তা ভরে রেখে দিয়েছি। এছাড়া একটা বই নিয়ে এক প্রকাশকের সঙ্গে বেশ ঝামেলা হয়েছিল, সেইসূত্রে ঝামেলা হয়েছিল ওই বইয়ের লেখকের সঙ্গেও। ঝামেলাটা এখানে ভুল বোঝাবুঝি। এটা ছাড়া আরেকটা ব্যাপার ছিল, একজন প্রকাশককে আমাদের সময়কার আরেক কবির প্রথম বইটি প্রকাশের কথা বলেছিলাম উনার স্বনামখ্যাত প্রকাশনী থেকে। উনি আমাকে পাত্তা দিলেন না। আরেকটা বিষয় হলো, প্রকাশকদেরকে মানুষ/লেখকরা ধান্ধাবাজ, ধাপ্পাবাজ হিসেবে আখ্যায়িত করছিল। এসব শুনছিলাম তরুণ লিখিয়েদের কাছ থেকে। এই ধরনের অনেকগুলি জটপাকানো কারণ আমাকে প্রকাশক হতে বাধ্য করছিল। আমি অন্তত কারও সঙ্গে ধান্ধাবাজি করছি না, কারও সঙ্গে ধাপ্পাবাজিও করছি না। প্রকাশনা জগতে যেগুলি কমন বিষয়, শুধু সেগুলির কিছুটা ভুলভ্রান্তি সকলেরই থাকে। কিন্তু হলফ করে বলতে পারি, এই প্রকাশনা ব্যবসাকে আমি আমার অহঙ্কারের জায়গাতেই রাখছি। কলুষিত করার সুযোগ কারোরই নেই। বদনাম করবেন? সেটা আমি হাজার ভালো করলেও করবেন… বলে ফেললাম ছোট করে। পরে আবার বলব কোনো এক সময়।


একদিন হয়তো লোন করব, লোনের ঘানি টানব, কিন্তু চাইব প্রকাশনা টিকে থাকুক সম্মানে-সমমানে।


মোস্তফা হামেদী

কী রকম পয়সাপাতি নিয়া শুরু করলেন? যোগাড়যন্ত্র ক্যামনে করলেন? পরিবার সাপোর্ট দিছিল? এখনই-বা কিভাবে সামাল দিতেছেন?

দন্ত্যন ইসলাম 

হা হা হা… আমার কাছে সবচে জটিল প্রশ্ন এইটা। কইরা বসলেন। কী যে বলি!!! শুনেন, আমার নির্দিষ্ট কোনো পয়সাপতি ছিল না। বউয়ের কিছু টাকা জমানো ছিল, সেটা আমার প্রকাশনায় বেশ উপকার দিছে। এছাড়া কাজ করিয়েছি বাকিতে। আস্তে-ধীরে শোধ করছি। এখনো দেনা আছি প্রেসে। যেহেতু পথে নেমেছি, কাঁটার ভয়ে চলব না কেন সে পথ? কষ্টের বিনিময়ে গড়ে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আর হ্যাঁ, পরিবার বলতে বাবার থেকে আমি কোনো হেল্প চাই নি। কারণ, আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাইছিলাম। অবশেষে একটা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে পেরেছি তো। এটাই পাওয়া, বাবাকে এখন বলতে পারব, চাইতে পারব। হা হা হা… আমি আমার বন্ধুদের থেকে হেল্প পাই ভীষণ। বন্ধু বলতে জেব্রাক্রসিংয়ের লেখকরাই আমাকে যথেষ্ট হেল্প করে। এভাবে সামলে নিচ্ছি। কিন্তু, এভাবে তো টিকে থাকা দুঃসাধ্য হবে। একদিন হয়তো লোন করব, লোনের ঘানি টানব, কিন্তু চাইব প্রকাশনা টিকে থাকুক সম্মানে-সমমানে। দোয়া রাইখেন হামেদী ভাই, যেন টিকায়া রাখতে পারি।

34483584_1875711732473939_4646689447839006720_n
জেব্রাক্রসিংয়ের আলোচিত কিছু বই

মোস্তফা হামেদী

জেব্রাক্রসিংয়ের লোগো ও নামলিপিটা সুন্দর! কার করা?

দন্ত্যন ইসলাম 

কাব্য কারিম করে দিয়েছেলেন এটা। সকলেই পছন্দ করছেন, প্রশংসা করছেন। ভালো কিছুই আশা ছিল, পেয়েছিও। কাব্য কারিমের সঙ্গে লোগো নিয়ে অনেক কথামর্শ হয়েছিল। তারপর ফাইনালি এটা বেরিয়ে এল তার থলে থেকে। জানেন, এক অর্থে কাব্য কারিম প্রত্যেকটি বইতে মিশে আছে এই লোগোর কারণে। আহা।

মোস্তফা হামেদী

কাব্য কারিমকে ভালোবাসা। তার অন্যান্য কাজও দারুণ।

দন্ত্যন ইসলাম 

হুম, পৌঁছে দেব।

মোস্তফা হামেদী

আপনার কবিতা ও ছড়া চর্চার কী অবস্থা? প্রকাশনার চাপে পিষ্ট হয়ে যাচ্ছে না তো!

দন্ত্যন ইসলাম 

কিছুটা তো পিষ্ট হতেই হচ্ছে। যার রক্তে মিশে আছে কবিতা, তার কি চলা বন্ধ হতে পারে? হামেদী ভাই, ছড়ার বইটা ২০১৭ সালের মেলায় আসার কথা ছিল। আসে নাই। এবারও আনতে পারলাম না। নিজের প্রতি খেয়াল রাখা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। এবারের মেলা শেষ করে কিছু নতুন পাণ্ডুলিপির কাজ শুরু করেছি। নিজের লেখা…

মোস্তফা হামেদী

লেখার রোখ চাপলে চেপে যাইয়েন না যেন। লেখাও চলুক। প্রকাশনাও। “মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণতূর্য”-র মতন। ভালো কিছু হোক। জয় হোক নতুন ও চিরনতুনের। শুভকামনা দন্ত্যন ইসলাম ও জেব্রাক্রসিংয়ের জন্য।

দন্ত্যন ইসলাম 

ভালোবাসা ভালোবাসা। কাজী নজরুল ইসলাম আমার আদর্শ। তাকে দিয়েই শেষ করাতে পূর্ণ তৃপ্ত হলাম। ভালো থাকবেন হামেদী ভাই। ভবিষ্যতে আপনার সমগ্র, সংগ্রহ সব বের হোক জেব্রাক্রসিং থেকেই।

মোস্তফা হামেদী

ধন্যবাদ, আপনাকে।

দন্ত্যন ইসলাম 

আপনাকেও ধন্যবাদ।

মোস্তফা হামেদী

২৭ আগস্ট, ১৯৮৫; ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, সরকারি মুজিব কলেজ, কোম্পানীগঞ্জ, নোয়াখালী।

প্রকাশিত বই :
মেঘ ও ভবঘুরে খরগোশ [কবিতা; কা বুকস, ২০১৫]
তামার তোরঙ্গ [কবিতা; জেব্রাক্রসিং. ২০১৮]

ই-মেইল : mostafahamedchd@gmail.com