হোম সাক্ষাৎকার জীবনের বেশিরভাগ সময় আমি কাটিয়েছি দুটি ভিন্ন জগতে

জীবনের বেশিরভাগ সময় আমি কাটিয়েছি দুটি ভিন্ন জগতে

জীবনের বেশিরভাগ সময় আমি কাটিয়েছি দুটি ভিন্ন জগতে
1.99K
0

গোলি তারাঘির জন্ম ১৯৩৯ সালের ১০ অক্টোবর, ইরানের তেহরানে। ১৯৬৯ সালে ছোটগল্প সংকলন অ্যাই অ্যাম চেগুয়েভারা টু প্রকাশের মধ্য দিয়ে তার লেখক জীবনের শুরু। প্রথম উপন্যাস উইন্টার স্লিপ প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে। উপন্যাসটি ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় অনূদিত হয়। তার দি পামোগ্রানাইট লাডি অ্যান্ড হার সন্স অ্যান্ড আদার স্টোরিজ বইটি প্রকাশ করেছে ডব্লিউ ডব্লিউ নর্টন। তিনি ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন, মিথোলজি এবং প্রতীকীবাদের ওপর উচ্চতর পড়াশোনা করেছেন। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেলে গোলি তারাঘি দেশ ছেড়ে প্যারিসে চলে আসেন। টেলিফোনে, তারাঘি’র এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাহিদ মোজাফ্‌ফরি, ২০১৩ সালের অক্টোবরে; ‘ওয়ার্ডস উইদাউট বর্ডারস’-এর সাইটে প্রকাশিত হয় একই বছরের নভেম্বরে।


সা ক্ষা কা


নাহিদ মোজাফ্‌ফরি

আপনি ইরানের সেই মুষ্টিমেয় লেখকদের একজন যাকে নির্বাসনের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে ১৯৭৯-এর ইসলামি বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে; জীবনের উল্লেখযোগ্য সময় অতিবাহিত হয়েছে স্বভূমি তেহরানে; পারসিক ভাষায় আপনার বইপত্র প্রকাশিত হয়েছে; শিক্ষকতা করেছেন; ইরানে আপনার পাঠকসংখ্যাও বিপুল। একইসঙ্গে আপনি প্যারিসেও গেছেন, থেকেছেন দীর্ঘদিন। সেখানে লিখেছেন, সেই লেখাও প্রকাশিত হয়েছে। এই যে চলমান একটি অভিজ্ঞতা আপনার জীবনে; দুই দিকে বিভক্ত হয়ে যাওয়ার যে লেখক-জীবন আপনার—এটাকে যদি এভাবে বলি—এই লেখক জীবন অনন্যসাধারণ। আর লেখাগুলির রয়েছে এমন এক নিজস্বতা যা পাঠকের চোখে বিশেষভাবে ধরা দেয়। আপনি কি আমাদেরকে বলবেন— নিজদেশে লেখালেখি আর নির্বাসনকালীন সময়ে আপনার লেখালেখির সেই অভিজ্ঞতার কথা?


গোলি তারাঘি 

জীবনের বেশিরভাগ সময়ই আমি দুইটি বিশ্বে থেকেছি। ৭৯-তে আমি ইরান ছেড়েছিলাম, ইসলামি বিপ্লবের একেবারে গোড়ার দিকে। তখন থেকেই আমার জীবনে প্যারিস আর তেহরানের মধ্যে অবিরাম ছুটে চলার ধারাবাহিক যাত্রার সূচনা হলো—এক বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেক বাস্তবতায়। আর খুব স্বাভাবিকভাবেই এই দ্বৈত অস্তিত্ব আমার সাহিত্যকেও একটা বিশেষ মাত্রা দিয়ে দিল।

কিন্তু তেহরানে আমাকে বারবার ফিরে যেতে হয়েছিল কারণ লেখালেখিতে আমার সমস্ত প্রেরণা ছিল আমার স্বদেশ। ইরান হচ্ছে পরস্পরবিরোধিতা আর মতানৈক্যের এক মহাসমুদ্র, এমন এক দুনিয়া যা হাস্যকরুণরসাত্মক অসংখ্য চরিত্র, কিম্ভূতকিমাকার ঘটনা আর পরাবাস্তব পরিস্থিতিতে ভরপুর। প্যারিসের কোথায় আমি বেদানাওলা সেই নারীকে খুঁজে পাব? দিলবারকে খুঁজে পাব? প্যারিসের কোথায় আছে সেই চোরের গল্প?

একই সঙ্গে আমার কাছে প্যারিস হচ্ছে নিজেকে অবিরাম ঋদ্ধ করবার এক স্থান, নিজেকে সমৃদ্ধ করবার তীব্র এক অভিজ্ঞতা। প্যারিসের মুক্ত হাওয়া আমাকে লেখালেখির অদম্য শক্তিটা জোগাল। প্যারিস, রোম কিংবা নিউইয়র্কের উন্নত সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল; ফরাসি কিংবা আমেরিকান লেখক-শিল্পীদের সঙ্গে পরিচয়; সেখানকার মানুষের জীবনচর্চার ধারণাগুলি আমার চেতন-জগৎটাকে উদ্দীপিত করেছিল; যেখানে ইরানে তা অধিকতর জ্যান্তব; রক্তমাংসের ব্যাপার; শক্তিটা যেন একেবারে অস্থিমজ্জা থেকে উঠে আসছে; অস্তিত্বটাই যেন লেখকের প্রেরণা হয়ে উঠছে। আমার মতো একজন ইমিগ্রান্ট যে প্যারিসে বাস করছে, যার সঙ্গে এখানেই পরিচয় হয়েছে বহুসংখ্যক নির্বাসিত ইরানি’র সাথে যারা আর ইরানে ফিরতে পারবে না। তাদের দেশে ফিরবার আকাঙ্ক্ষা আর জীবন নিয়ে শঙ্কা ও অনিশ্চয়তাবোধ আমার বহু গল্পের বিষয় হয়ে এসেছে। ‘নির্বাসন’ এমন এক মানবিক পরিস্থিতি তৈরি করে; সে স্বয়ং এমন একটি ফেনোমেনন যাকে ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে প্রশ্নবিদ্ধও করা যায়।

এখন আসছি আমার চলমান দ্বৈত অস্তিত্ব সম্পর্কিত আপনার প্রশ্নটিতে যা আমাকে সুযোগ করে দিবে আমার সাহিত্যকর্মের দ্বিখণ্ডিত শৈলীটি নিয়ে কিছু কথা বলতে! আমার আইডিয়াগুলিকে যখনই লেখায় রূপ দিতে গেছি, প্রিয় শব্দগুলি দিয়ে বাক্যের পর বাক্য লিখেছি, তার আগমুহূর্তেই সেন্সরশিপ ডিপার্টমেন্টের সেই লোকটির মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। বহুবার সে তার ধারাল তরোয়াল নিয়ে নির্দিষ্ট কিছু শব্দ, কিংবা বাক্য এমনকি আমার বইয়ের বহু প্যারাকে নির্দয়ভাবে কেটে ফেলেছে। আমি বরফের মতো জমাট বেঁধে গেছি, পরিণত হয়েছি হতাশাগ্রস্ত, সীমিত পরিসরের এক লেখকে—এমন এক লেখক তার কল্পনাগুলি পর্যবসিত হয়েছে ক্রমাগত ভয়ভীতি প্রদর্শনের কাছে। সেন্সরশিপ ডিপার্টমেন্টের লোকটির জন্য নিজেই আমি নিজের লেখাকে সেন্সর করেছি, সেই লেখার আরেকটি সংস্করণ লিখেছি নিজের জন্য। পরবর্তীকালে—আমি এক মুক্ত লেখকে পরিণত হতে পেরেছিলাম; স্বাধীন ইচ্ছায় বেছে নিতে পেরেছিলাম আমার বিষয়, দৃশ্য আর শব্দগুলিকে। আমি আমার ভাবনাগুলিকে নিয়ে অসীম আকাশে উড়াল দিতে পেরেছিলাম; আমার অন্তর্গত আকাঙ্ক্ষাগুলিকে সমুদ্রপৃষ্ঠে ভাসতে দিয়েছিলাম!


প্রত্যেক লেখকেরই কলমের মর্মে রয়েছে ঘুমন্ত সংগীত, তাদের নিজেদের ভাষার প্রতি তীব্র সংবেদনশীলতা আর একান্ত যোগাযোগ।


নাহিদ মোজাফ্‌ফরি

আপনি দুইটি বিশ্বের কথা বলছিলেন, ইংরেজিতে আপনার নতুন বই এ কালেকশন অব শর্ট স্টোরি‘জ ডব্লিউ. ডব্লিউ. নর্টন থেকে প্রকাশিত হয়েছে যার গল্পগুলি আপনার সেই ডালিমওলা নারী এবং তার পুত্ররা বইটি থেকে নেয়া হয়েছে। এই গল্পটিতে নস্টালজিয়ার বোধ কিংবা চেতনা, উপলব্ধি; হারিয়ে ফেলা কিংবা বিলুপ্তি;  বিচ্ছিন্নতা, নির্বাসন, দেশত্যাগ; এবং এসবের মিলিত ফল স্বরূপ জীবন ও বাস্তবতার মাঝে যে অসামঞ্জস্যতার জন্ম হয়—গল্পটিতে এই মর্মভেদী বিষয়গুলি এসেছে। এই অসামঞ্জস্যতা এবং বৈপরীত্য, আমি এক্ষেত্রে উদাহরণের সাহায্য নিচ্ছি—বেদানাওলা নারী আনার বানু আর বর্ণনাকারীর মধ্যে, আনার বানু’র পুত্রদের চরিত্রের মধ্যে অসামঞ্জস্যতা এবং বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অন্য গল্পগুলিতেও এই থিমটি প্রবাহিত হয়েছে। ‘অন্য কোথাও’ গল্পের আমির আলী চরিত্রের মাধ্যমে ব্যক্তির অন্তর্গত জটিলতাগুলি ফুটে উঠেছে।


গোলি তারাঘি 

দেখুন এখানে কিন্তু বর্ণনাকারী আর আনার বানু’র মধ্যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতা আছে। গল্পের বর্ণনাকারী একজন আধুনিক নারী, এদিকে আনার বানু গ্রাম থেকে শহরে এসেছেন। গল্পটিতে কিন্তু দুজনেই নিজেদের চাওয়া-পাওয়া এবং নিয়তিকে ব্যক্ত করেছেন। এই দুই নারীই ইসলামি বিপ্লবের দ্বারা গভীরভাবে আক্রান্ত। আনার বানু তার ঘরহীন পলায়নপর পুত্রের সন্ধান করছেন যে হয়তো তার দেশ থেকেই পালিয়েছে; আবার বর্ণনাকারীও তার হারিয়ে ফেলা ঘরের সন্ধান করছেন যে-ঘরকে তিনি তেহরানে খুঁজে পাচ্ছেন না, প্যারিসেও খুঁজে পাচ্ছেন না। নিরন্তর এই খোঁজ কিংবা অনুসন্ধান—দুই নারীকেই এক যোগসূত্রে গেঁথে ফেলে; ইতিহাসের একই নির্মম ট্র্যাজেডির ভিকটিম তারা।

আনার বানু’র পুত্ররা ইরানি তরুণদের দুটি ভিন্ন বৈশিষ্ট্যকে ফুটিয়ে তোলে যার মধ্যে একটি হচ্ছে রাজনীতিমনস্কতা, অপরটি মাইকেল জ্যাকসনের কমিক চেহারায় নিজেকে উপস্থাপন; তেহরানের রাস্তায় আপনি এরকম তরুণদের দেখতে পাবেন—যাদের আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে মুক্ত এবং কেতাদুরস্ত থাকা; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা প্রত্যেকেই বিচ্ছিন্ন এবং গৃহহীন।

জীবনের নিহিত প্রয়োজনে তারা ভাবে সুইডেনে পাড়ি জমাবে, সেখানে থিতু হবে; কিন্তু সেখানে তারা সবকিছু হারিয়ে ফেলে উদ্বাস্তু হয়ে যায়। তারা আমেরিকা’র স্বপ্ন দেখে কিন্তু ঘর তারা কখনোই খুঁজে পায় না। আমির আলিরও সেই একই ব্যাপার—ঘর। তার ঘর কোনো ভৌগোলিক স্থানে নয় তার অস্তিত্বের মধ্যে খুঁজে পাওয়া একটা মানসিক আশ্রয়।


নাহিদ মোজাফ্‌ফরি

কখন থেকে লেখালেখি শুরু করেছিলেন?


গোলি তারাঘি 

আমার বিশ্বাস, যেদিন থেকে মায়ের জঠর থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম; বাইরের দুনিয়া দেখে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে আগমন সংবাদ জানান দিয়েছিলাম, সেই চিৎকারটিই ছিল আমার প্রথম গল্পের প্রথম বাক্য যে-গল্পটিকে ভবিষ্যতের কোনো একদিন লিখব। বাবা ছিলেন লেখক, এবং দুটি সাপ্তাহিক জার্নালের এডিটর। আমি দেখতাম কালির পটে তিনি তার কলমটিকে চুবিয়ে চুবিয়ে কাগজের বুকে খুদে খুদে অদ্ভুত পিঁপড়া, মাছি আর দুনিয়ার সমস্ত প্রাণী’র ছবি আঁকতেন। তারপর তিনি আমাকে সেই ছবিগুলি দেখিয়ে বলতেন—দেখো তাকিয়ে, তাদেরকে যখনই তুমি একসাথে আঁকবে তখনই তারা মিলেমিশে কখনও চকোলেট, কখনও বড় একটি ক্রিম কেক হয়ে যাবে, অথবা তোমার নাম। আমি তো হতবাক এই ম্যাজিক দেখে! সবকিছু তাহলে কালির পটেই লুকিয়ে থাকে!  যতগুলি গল্প আমি লিখতে চেয়েছিলাম… সব!?

বাবা যেদিন বাইরে যেতেন সেদিন তার ঘরে গিয়ে ঢুকতাম। কোনোমতে চেয়ারের ওপর ওঠে—আমার বয়স তখন মাত্রই চার বছর—কালির পটে আঙুল ঢুকিয়ে দিতাম। তারপর আমার আঙুল আর বাবার কলম দিয়ে পিঁপড়া ও মাছি আঁকতে আঁকতে গল্প লিখতে শুরু করে দিতাম। একসময় হাতের আঙুলগুলি আর চোখমুখ, গায়ের সাদা জামা সব পটের কালিতে ভরে যেত। আসলে তখন স্বর্গেই ছিলাম। বাবার ঘরে তখন পুরোদস্তুর  এক লেখক; আচমকা পেছনে মা’র রাগী চিৎকার : কী জঘন্য আর নোংরা তুমি, যাও এখনি, জামাকাপড় বদলে হাত ধুয়ে এসো।

কেউই জানতে পারল না—এটাই ছিল আমার লেখা প্রথম কোনো গল্প; এবং সম্ভবত সবচে ভালো গল্প; এত বছর পরও এরকম আরেকটি গল্প আমি লিখে উঠতে পারি নি। গল্পটি ধুয়ে মুছে হারিয়ে গেল চিরদিনের জন্য; এবং আমি এখানে বলতে চাই—এটাই আমার জীবনে সেন্সরশিপের প্রথম বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা!


নাহিদ মোজাফ্‌ফরি

কোন কোন লেখক আপনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন?


গোলি তারাঘি 

লেখার ক্ষেত্রে আমার নিজের একটা স্টাইল আছে, ভাবনার একটা বিশেষ ধরন আছে। তবে এটা তো সত্য যে নবোকভ এবং সালমান রুশদি’র বইয়ের কিছু কিছু জায়গা আছে যা আমাকে সত্যিকার অর্থেই স্পর্শ করেছে। দৃশ্যের বিবরণ কিংবা ব্যক্তির খুঁটিনাটির বর্ণনার জন্য এক মাস্টার লেখক হলেন নবোকভ। নবোকভের কাছে ভাষা আর খুঁটিনাটির বিস্তারিত বিবরণই হচ্ছে সাহিত্যের সারকথা। রুশদি নতুন শব্দ কিংবা একেবারে নতুন একটি সাহিত্য ভাষা আবিষ্কার করতে করতে লেখেন। হিন্দি, পারসিক, ইংলিশ আর পুরোনো লাতিন শব্দগুলিকে তিনি অবলীলায় মিশিয়ে দেন তার উদ্ভাবিত ভাষায়। ভাষা নিয়ে তিনি কখনোই পিছিয়ে পড়েন না বরং তার কলমটি এবং তার ইমাজিনেশনকে অবাধ স্বাধীনতা প্রদান করেন। তিনি আমাকে সত্যিকার অর্থেই প্রভাবিত করতে পারেন। ভাষার ক্ষেত্রে রুশদি হলেন এক নিষ্ঠুর ম্যাজিশিয়ান। ফোরুখ ফারুখজাদ, যিনি ইরানের একজন প্রখ্যাত কবি, তার কবিতাও আমার ভীষণ প্রিয়। খুব আটপৌরে শব্দগুলিকে যা কোনোভাবেই অন্য কেউ ব্যবহার করবেন না কবিতায়; যেমন : সেলাইমেশিন; এরকম শব্দগুলিকে কবিতায় অদ্ভুত কল্পিত কাব্যিক শব্দে ব্যবহার করায় তিনি ছিলেন এক ওস্তাদ। দুটি একেবারে ভিন্ন শব্দের সমান্তরাল ব্যবহার করে তিনি নতুন এক কাব্য ভাষার জন্ম দিতে পেরেছিলেন। অবশ্যই প্রত্যেক লেখকেরই কলমের মর্মে রয়েছে ঘুমন্ত সংগীত, তাদের নিজেদের ভাষার প্রতি তীব্র সংবেদনশীলতা আর একান্ত যোগাযোগ।


আপনি অসাধারণ কল্পনাশক্তির অধিকারী যা আপনার গল্প থেকে স্পষ্টতই অনুভব করা যায়।


নাহিদ মোজাফ্‌ফরি

ইরানে লেখালেখির বর্তমান পরিস্থিতিতে নারী লেখক এবং তাদের কাজের মূল্যায়ন হচ্ছে কিভাবে? তারা কি বিভিন্ন ধরণের এবং ব্যতিক্রমধর্মী লেখা লিখছেন? আপনি কি মনে করেন পুরুষ লেখকরা নারীদের দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন?


গোলি তারাঘি 

নারী লেখকদের কাজকে আমি সিরিয়াসলি নিই, কারণ তাদের লেখায় এমন এক নম্র আন্তরিকতা থাকে, পুরুষ লেখকদের লেখায় আপনি তা পাবেন না। বিপ্লবের আগে ইরানি সাহিত্যে কমিউনিস্ট আদর্শের আধিপত্য ছিল; যে কেউই এই সাহিত্যকে মোটা দাগে সমাজতান্ত্রিক সাহিত্য বলে চিহ্নিত করতে পারত। ইরানি লেখকদের বেশিরভাগই এসেছেন নিম্ন-মধ্যবিত্ত-শ্রেণি থেকে, আর তারা লিখেছেন খেতমজুর কিংবা নিপীড়িত শ্রমিকদের নিয়ে। লেখকদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন সচ্ছল পরিবারগুলি থেকে আসা। তারা মার্কসবাদী ছিলেন; সমাজের লাঞ্ছিত বঞ্চিতদের নিয়েই তারা লিখতে ব্রত হয়েছেন। কিন্তু, নারী লেখকরা ইরানি সাহিত্যে নতুন ধারা তৈরি করেছেন—যা নিজস্ব, ব্যক্তিগত।

তারা নিজেদের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থেকে নিজেদের একান্ত সমস্যাগুলি, অসুখী বিবাহিত জীবনের নিঃসঙ্গতা নিয়ে কথা বলেছেন। সরকারি সেন্সরশিপ, পারিবারিক সেন্সরশিপ, এবং প্রকাশের লজ্জার কারণে তারা অনেক কিছুই খোলাখুলি বলতে পারেন নি, তবে তারা যা কিছু বলার তা তাদের মতো করেই বলেছেন—আকারে-ইঙ্গিতে, কখনও প্রতীকী। তারা প্রেম বিষয়ে বলেছেন এবং তারা দেখেছেন ভালোবাসার স্বপ্ন, কিন্তু সেই স্বপ্ন ছিল ছায়াচ্ছন্ন, অন্ধকারময়। স্বপ্নে আলো ছিল না। তারা এমনভাবে বলেছেন যেন কিছুই বলা হয় নি। মনে করুন, কেউ একজন লিখলেন—যদি আমার স্বামী জানতে পারেন আমি কী ভাবছি, তাহলে তিনি হয়তো আমাকে মেরে ফেলবেন। এই একান্ত ভাবনাগুলিকে হয়তো নারী লেখকরা ‘যৌন উত্তেজক কল্পনা’র সাথে মিলিয়ে দেবেন। পুরুষরা কখনোই এমন লিখতে পারবেন না কিংবা এরকমের সাহিত্যকে তারা গুরুত্বের সঙ্গে নিবেন না।


নাহিদ মোজাফ্‌ফরি

আমরা দুজনেই জানি যে ইসলামি বিপ্লব থেকেই ইরানে ব্যাপক সংখ্যক নারী লেখকের জন্ম হয়েছে এবং তাদের অনেকেই এখন বিশিষ্ট লেখকে পরিণত হয়েছেন। এই বিষয়টিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?


গোলি তারাঘি 

বিপ্লবটা যখন শুরু হলো তখন শিল্পী ও বুদ্ধিজীবী, লেখক ও চিত্রকররা—আমার জানা ছিল না যে তাদের সত্যিকার মনোভাবটি কী—অতি উৎসাহী হয়ে উঠেছিলেন। সে সময়ে আমি তেহরানেই ছিলাম, দেখলাম তেহরানের রাস্তায় অগুনতি মেয়ে শুধু ওড়না পরে তাদের বাদ্যযন্ত্রগুলি নিয়ে বের হয়ে পড়েছিল, গান শেখাবার ক্লাস উপচে পড়ছিল তাদের উপস্থিতিতে; আর কী দ্রুতই না এই সুবর্ণ সময়ের মুখরতা গভীর হতাশায় ডুবে গেল। কিন্তু এমন একটা কিছু ঘটেছিল যাকে আর কোনোভাবেই পরিবর্তন করা যাবে না। বিপ্লবের সময়ে, বহু সংখ্যক তরুণী, বিশেষ করে সমাজের একটু নিচু শ্রেণির কম বয়সী নারীরা দলে দলে রাস্তায় নেমে এসেছিল, জনতার ভিড়ে এসে মিশে গিয়েছিল। তারা নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ এবং বাঁধন মুক্ত বলে মনে করছিল। নতুন এই আত্মপরিচয়টিকে তারা আঁকড়ে ধরতে চাচ্ছিল।

তারা আর কোনোভাবেই তাদের আগের পরিচয়ে ফিরতে চাইছিল না—যেখানে তারা ছিল একেবারে  নামহীন, আত্মপরিচয়হীন। আমাকে একজন বিখ্যাত লেখিকা একদিন বলছিলেন, তাকে মহিলাদের জেলখানায় একজন সবসময় পাহারা দিত। বিপ্লবের আগে তিনি কখনও লিখতে সাহস পেতেন না। আর এখন তার স্বামীও তাকে লিখতে উৎসাহ দেন। অন্য অনেকের বেলায়ও এটা সত্য। তখনই নারী চিত্রশিল্পী, আলোকচিত্রী, নার্স, টেক্সি ড্রাইভারসহ বিভিন্ন পরিচয়ে উত্থান ঘটে। ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন ছাত্রীদের সংখ্যা ৬৫%। মনে রাখতে হবে, এদের বিরাট অংশটাই এসেছে নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে।


নাহিদ মোজাফ্‌ফরি

আপনি অসাধারণ কল্পনাশক্তির অধিকারী যা আপনার গল্প থেকে স্পষ্টতই অনুভব করা যায়। তবে আপনি এমন একজন ক্ষমতাধর লেখক যে জীবনের প্রকৃত অ্যাবসার্ডিটিকে দেখতে পান। হতে পারে তা তেহরানে কিংবা নির্বাসিত জীবনে। আর তাই গল্পে আপনি জীবনের এইসব অ্যাবসার্ডিটিকে আপনার শৈলী দিয়ে, আপনার নিজস্ব বয়নপদ্ধতি দিয়ে বড় বেশি তীব্র করে তুলেছেন, ধরতে চেয়েছেন। এতে করে পাঠক যুগপৎ ট্র্যাজিক-কমিক একটা পাঠকৃতির দিকে ধাবিত হয় কিংবা হতে বাধ্য হয়। একই সঙ্গে ট্র্যাজিক এবং কমিক হিসেবে আপনার সাহিত্যকে তারা গ্রহণ করে নিতে পারে কিংবা অনুভব করতে পারে।


গোলি তারাঘি 

লেখার এই পদ্ধতিটিই আমার বেঁচে থাকবারও পদ্ধতি। আমি আসলে কথক হয়েই জন্মেছি অর্থাৎ আমি জন্ম থেকেই গল্পকথক। খুব মামুলি, সাদামাটা ঘটনা আমাকে বিরক্ত করে বলে আমি সেগুলিকে আবার জন্ম দিই। ঘটনার গায়ে আমি রক্তমাংস লাগাই; কিছু রং ছিটিয়ে দিই তাদের ওপর। বাচ্চারা প্রায়ই আমাকে বলে—তুমি মিথ্যে বলছ মা, কিছুই তোমার কথার মতো নয়; তুমি তাদের তৈরি করছ। হ্যাঁ, অবশ্যই তৈরি করছি। সবকিছুই নিষ্প্রভ, একঘেয়ে আর একেবারেই রংহীন। কিন্তু তাদেরকেই আমি যখন হাস্যকরুণরসাত্মক বাস্তবতায় গড়ে তুলছি কেবল তখনই তাদের ভেতরের মর্মকথা আমাদের অনুভবে আসছে। আমাদের দরকার ফ্যান্টাসি। দরকার অদ্ভুত সব স্বপ্নের। যত মানুষের সঙ্গে আমার দেখা সাক্ষাৎ হয়, চেনাজানা হয় তাদের সবাইকে আমি আমার মনের ভিতর ভরে রাখি যেন তারা সেখানে এক ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করে কখন তাদের পালা আসবে আমার গল্পে তাদের ভূমিকা রাখবার জন্য। জীবন সব সময়ই ট্র্যাজিক আর কমিক ঘটনাবলীর এক সংমিশ্রণ। এই ‘কমিক’কে আমরা অ্যাবসার্ড (অযৌক্তিকতা, অদ্ভুত, উদ্ভট); পরাবাস্তব, পরস্পরবিরোধী, অতিরঞ্জিত এবং এখনও যা বাস্তব—এইসব অর্থে নিতে পারি। এখানে আমি বিশেষ করে নিকোলাই গোগোলের উদাহরণ দিব; আমার বিশ্বাস রুশ সাহিত্যের মাস্টার লেখক তিনি। তার মৃত আত্মার পুরো আইডিয়া, পুরো থিমটাই অ্যাবসার্ড… বইটিতে বিস্ময়কর কিছু আগন্তুকের দেখা পাই যারা ক্রয় করতে চায় মৃতদের আত্মা! চরিত্ররা প্রত্যেকে যেন রাশিয়ার প্রকৃত আত্মাটিকেই ফুটিয়ে তুলছে। মৃত আত্মা’ই সমগ্র রাশিয়া এখানে। মৃত আত্মা পুরো এই বইটি কমিক, কৌতুককর, মজাদার; এবং অতিরঞ্জিত—এখনও বাস্তব! এদিকে, প্রত্যেকের মাঝেই রুশ চরিত্রের ট্র্যাজিক দিকটিও রয়েছে যা একই সঙ্গে সমগ্র মানবজাতির এবং বিশ্বজনীন। দুনিয়ার সর্বত্রই আপনি এদের খুঁজে পাবেন, ইরানে তো অবশ্যই। গল্পে আমি মানবচরিত্রের এসব দিককেই ধরতে চেয়েছি।


কোনো কোনো অপেক্ষা আবার সারাজীবনেও শেষ হবে না; অগত্যা বগলে আপনার বইটিকে চেপে ধরে এই অদ্ভুত দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হবে।


নাহিদ মোজাফ্‌ফরি

ইরানে সেন্সরশীপ কিভাবে প্রয়োগ করা হয়? নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে কি পরিস্থিতি কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে? নাকি এ ব্যাপারে এত আগে কিছু বলা ঠিক হবে না?


গোলি তারাঘি 

হ্যাঁ, এ ব্যাপারে একদম শুরুতেই কথা হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট রূহানী দাবি করছেন যে তিনি বন্ধ দরজাগুলি খুলে ফেলার জন্য চাবি নিয়ে এসেছেন। প্রেসিডেন্ট এবং তার চাবির জাদুশক্তির ব্যাপারে আস্থা এনেও বলতে হবে—ইরানি জনগণ হয় অতিমাত্রায় হতাশাগ্রস্ত, না হয় অতিমাত্রায় আদর্শবাদী হয়ে পড়েছে। আমার কিছু লেখক বন্ধু আবার আশাবাদীদের দলে, আর আমার প্রকাশক এ-ব্যাপারে একটু বেশিই যেন উত্তেজিত। দেখে মনে হচ্ছে খুব ছোট্ট একটি দরজা একটুখানি ফাঁক হয়েছে। কিন্তু খোলা দরজার কাছেই খুব কঠোর আর চামড়াসর্বস্ব একটি হাত আমাদের বইগুলিকে খুব শক্ত করে ধরে রেখেছে, কিছুতেই যেতে দিচ্ছে না। অনিশ্চিত এই দরজা যে কোনো মুহূর্তে বন্ধ হয়ে যেতে পারে আপনার কম্পিত আঙুলগুলিকে থেঁতলে দিয়ে। আমার মনে আছে খাতামি’র আমলে একটি জানালা খুলে গিয়েছিল, আর সেটা এক মুহূর্ত খোলা ছিল। সেই মুহূর্তে আমরা নিজেদের উপস্থাপন করার সুযোগ পেয়েছিলাম, আমরা আমাদের বইগুলিকে নিয়ে সেই জানালার কাছে পৌঁছেছিলাম।

দুর্ভাগ্যবশত, সেই সময়টা দীর্ঘ হয় নি। সেন্সরশিপ নিয়ে তখন লুকোচুরি খেলাটা শুরু হয়েছিল। আপনাকে কোনার দিকের একটি চেয়ারে বসে বসে অপেক্ষা করতে হবে। কোনো কোনো অপেক্ষা আবার সারাজীবনেও শেষ হবে না; অগত্যা বগলে আপনার বইটিকে চেপে ধরে এই অদ্ভুত দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হবে। দুই বছর আগে ইসলামিক গাইডেন্স মিনিস্ট্রিতে আমি আমার শেষ বইটি জমা দিয়েছিলাম প্রকাশের অনুমতির জন্য। সেই অনুমতি আজও আসে নি। আমি অপেক্ষা করছি। আপনাকে দীর্ঘ দিন ধরে নির্যাতন করার এটা তাদের এক কৌশল। কিছু বইকে তারা ‘শর্তসাপেক্ষ’ বলে ঘোষণা করে। মানে হচ্ছে, এই বই নিয়ে তাদের সঙ্গে আপনি দরাদরি করতে যাবেন, বইয়ের বেশিরভাগ অংশই ফেলে দিবেন, ‘অগ্রহণযোগ্য’ শব্দ ও নামগুলিকেগুলিকে ছেঁটে ফেলবেন। নামের প্রতি তারা বড়ই সংবেদনশীল। এতকিছুর পর আপনার বিস্ফোরক বইটিকে তারা প্রকাশের অনুমতি প্রদান করতেও পারে। বইটি তখন বেশ ভালো বিক্রি হবে, সমালোচকরা বইটিকে প্রশংসা করবেন, আর তারপর অজ্ঞাতকারণে বইটি বাজেয়াপ্ত হয়ে যাবে; আমার একটি বইয়ের ক্ষেত্রেও তা হয়েছিল।


নাহিদ মোজাফ্‌ফরি

‘ওয়ার্ডস উইদাউট বর্ডারস’ আপনার লেখা প্রকাশের পর আপনার জীবন এবং পাঠকদের মধ্যে কী প্রভাব পড়েছিল?


গোলি তারাঘি 

শুধু আমার লেখাতেই যে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে তা নয়, ‘ওয়ার্ডস উইদাউট বর্ডারস’-এ আন্তর্জাতিক পাঠক সমাজের জন্য এ পর্যন্ত বহুসংখ্যক লেখকের লেখাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক লেখক হিসেবে আমেরিকায় তাদের বই প্রকাশের ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছে এই সংস্থাটি, এটা না হলে এই লেখকদেরকে খুঁজে বের করা খুব জটিল ছিল। তরুণ পাঠকদের তারা টানতে পেরেছে, সাহিত্যের প্রতি তাদের আগ্রহকে উসকে দিয়েছে। পড়ুয়া তরুণদেরকে তারা দারুণ এক প্ল্যাটফর্ম দিয়েছে যারা মূলত সারাবিশ্বের সাহিত্যের ব্যাপারে আগ্রহী।

এমদাদ রহমান

গল্পকার ও অনুবাদক
জন্ম ১ জানুয়ারি, ১৯৭৯; বাদেসোনাপুর, কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পলিটিক্যাল স্টাডিস অ্যান্ড পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন-এ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। পেশায় শিক্ষক।

প্রকাশিত বই—

পাতালভূমি ও অন্যান্য গল্প [গল্প, চৈতন্য, ২০১৪]

ই-মেইল : emdadrahman777@gmail.com