হোম সাক্ষাৎকার জিয়া হায়দার রহমান-এর সাক্ষাৎকার

জিয়া হায়দার রহমান-এর সাক্ষাৎকার

জিয়া হায়দার রহমান-এর সাক্ষাৎকার
515
0

ভাবুকদের ভাষায় জ্ঞান এবং জানা এই দুয়ের মাঝে পার্থক্য থাকে। জ্ঞানের পরই আসে জানার বিষয়। জানতে পারা এর উৎসের প্রতিধ্বনি মাত্র। সেই জানাও গৌরবেরই। ব্রিটিশ-বাংলাদেশী ঔপন্যাসিক জিয়া হায়দার রহমান-এর ইন দ্য লাইট অব হোয়াট উই নো উপন্যাসের অন্যতম অনুসন্ধিৎসা এই। এছাড়াও রহমান শ্রেণি-বিভেদ নিয়ে কথা বলেন এই উপন্যাসে, যার প্রেক্ষাপট লন্ডন, ন্যুয়র্ক, ইসলামাবাদ, বাংলাদেশ ও কাবুল। দুই হাজার চৌদ্দের জুন মাসে গুয়ের্নিকা পত্রিকার জন্য ই-মেইল চালাচালির মাধ্যমে নেয়া সাক্ষাৎকারে জোনাথান লি এসব জিজ্ঞাসা সামনে এনেছেন।

জিয়া হায়দার রহমান নিউ আমেরিকা নামক থিংক ট্যাংকের এরিক অ্যান্ড শ্মিট ফেলো। বাজার অর্থনীতির অন্তর্নিহিত রিরুদ্ধাচার মানুষের পরিপূর্ণতায় কী প্রভাব ফেলে এবং মানুষের আবাস এই পৃথিবীকে অ্যালগোরিদমের উত্থান কিভাবে রূপ দিচ্ছে এসব নিয়ে উপন্যাস লিখবেন বলে আমরা জানতে পারছি। এছাড়া একটি স্মৃতিকথাও লিখছেন তিনি। ২০১৪ তে প্রকাশিত তার প্রথম উপন্যাস ইন দ্য লাইট অব হোয়াট উই নো ব্রিটেইনের প্রাচীনতম পুরস্কার ‘জেইমস টেইট ব্ল্যাক মেমোরিয়াল’ প্রাইজ অর্জন করেছে। এর আগে এই পুরস্কার পেয়েছিলেন গ্রাহাম গ্রীন, এভলীন ওয়াহ, নাদিন গার্ডিমার এবং করম্যাক ম্যাকার্থী। জিয়া হায়দার রহমান আন্তর্জাতিক মানবাধিকার এবং দুর্নীতি বিরোধী আইনজীবী হিশেবে কাজ করেছেন। আইনজীবী হিশেবে তিনি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা হিশেবেও কাজ করেছেন। গোল্ডম্যান স্যাকস-এর ডেরিভেটিভ ট্রেডার হিশেবেও কাজ করেছেন তিনি। পড়ালেখা করেছেন অক্সফোর্ড, কেইমব্রিজ, ইয়েল এবং ম্যুনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে। ‘হাও ডু ইউ নো’ শিরোনামে গুয়ের্নিকা পত্রিকায় প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারটি পরস্পর-এর জন্য অনুবাদ করেছেন শফিউল জয়।

—সম্পাদক


সা ক্ষা কা


Untitled
জেমস টেইট ব্ল্যাক মেমরিয়াল পুরস্কারপ্রাপ্ত উপন্যাসটা নিয়ে কথা বলেছেন গুয়ের্নিকা ম্যাগাজিনের সাথে, ই-মেইল চালাচালির মাধ্যমে।

 জোনাথান লি

এই বইতে ব্যক্তি জীবন ও রাজনৈতিকতার মিশেলে আপনি অনুসন্ধান করেছেন আর্থিক সংকট এবং আফগান যুদ্ধ সম্পর্কে। উপন্যাস প্রয়োজনীয় এবং সেই সাথে মনোগ্রাহীও হতে পারে। আমি ভাবছিলাম : জগতের ঘটনাবলী সম্পর্কে এমন কী অন্তর্দৃষ্টির সন্ধান উপন্যাস দেয় যা পত্রিকার প্রবন্ধ বা কথাসাহিত্য দিতে পারে না?

জিয়া হায়দার রহমান

কথাসাহিত্য নিয়ে অতি সরল কিংবা মাত্রা ছাড়ানো কোনো মন্তব্য করার একধরনের ঝুঁকি আছে। এমনও হতে পারে জগৎ সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়া নিয়ে উপন্যাস কোনো ধারণা দেয় না, সংবাদ নিবন্ধও যে পারে তাও না। কিন্তু এটুকু বলতে পারি—সংবাদ মাধ্যমে যা পড়ি, উপন্যাস হয়তো সেই সাপেক্ষে আমাদের অবস্থান কিছুটা বদলে দেয়। খবরের একটা বৈশিষ্ট্য হলো তা আমাদের সাথে ঘটনাবলীর দূরত্ব তৈরি করে, এমনকি যখন তথ্য দিচ্ছে তখনও। খবরের লেখাগুলো কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা এবং সে সম্পর্কিত প্রতিক্রিয়াগুলো একই সাথে ছাপায়। ধরা যাক, অমুক ঘটনায় প্রেসিডেন্ট ওবামা অথবা কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া কী? আমার মনে হয় এসব দেখে বোঝা উচিত সবকিছু আসলে নিয়ন্ত্রণের আওতাধীন এবং ঘটনাবলীর ওপর আমাদের প্রভাব থাকে।

সংবাদ নিবন্ধের আরেকটা প্রভাব হচ্ছে—ঘটনাপ্রবাহ যত ভয়াবহই হোক না কেন আমাদের সাথে ঘটছে না, অন্য কারো সাথে হচ্ছে, এমন সব কাণ্ডের সাথে বাক্সবন্দি করে আমাদের হাতে তুলে দেয়া হয়। এবং আমরা এসব করছি নিয়ন্ত্রণ করারই জন্য। বরাবর এসবই গেলানো হচ্ছে আমাদের, এসবই গেলানো হয়, যেন আমরা এই সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠি। খবর তাই সবসময়ই আমাদের মন ও শরীর যে-সবে অভ্যস্ত সেই কাঠামো মেনে উপস্থাপিত হয়—ঘটনার বর্ণনা থাকে, ভীতি উদ্রেক করে, এরপর বলা হয় কিভাবে সামাল দেয়া হচ্ছে সব এবং পালের ক্ষমতাশীল পুরুষেরা কিভাবে সেটা মোকাবেলা করছে।


আমরা যা জানি এবং যা জানি বলে কল্পনা করি এই দুইয়ের পার্থক্যই আপনার উপন্যাসের কেন্দ্রে অবস্থান করছে।


জোনাথান লি

আমাদের শরীর ও মানস যাতে অভ্যস্ত, উপন্যাসের তো সেই বিন্যাস অনুসরণের বাধ্যবাধকতা নাই? আপনি যে কাঠামোর কথা বলছেন এই কাঠামোতে বহু উপন্যাস লেখা হয়েছে। অনেকটা সেই আঙ্গিকের প্রতিফলন ঘটিয়ে সৃজনশীল লেখনী ক্লাসের কিছুটা কুৎসিত ভাষায় দাঁড়া করানোর মতন—অর্থাৎ একটা দৃশ্যপট, সংঘাত ও তার সমাধান এবং শেষে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটা নিশ্চয়তার ঝলক দেয়া।

জিয়া হায়দার রহমান

একমত। তবে তফাৎ সেখানে না যে, খবর যা করে পারে—উপন্যাস তা করে না। বরং উপন্যাস যা পারে এবং খবর তা পারে না—এখানেই পার্থক্য গড়ে ওঠে। অন্যভাবে বলতে গেলে, খবর পরিবেশনের কৌশলগুলো উপন্যাস ব্যবহার করতে পারে, এবং উপন্যাস এসব ছাড়াও নানাবিধ কৌশল ব্যবহার করে। উপন্যাস সংবাদগদ্যের নিয়মে একেবারেই বাধা পড়ে না। আর অভিজ্ঞতার নিবেদনই উপন্যাসের বিধেয়। অবশ্যই মৌলিক কিছু নিয়ম আছে বলে মনে হয়, তবে এসবের প্রভাব পৃথিবীতে জীববৈচিত্র্যের বিস্তারে অভিকর্ষ সূত্র যেমন বাধা হয়ে দাঁড়ায় না ততখানিই। উপন্যাসে অভিজ্ঞতার নিবেদন সংবাদের বিষয়ে আমরা যে অবস্থান নিয়ে থাকি তা বদলে দেয়। খুব বেশি বদলায় না, আমি নিশ্চিত, তবে উপন্যাস পাঠ আমাদের জন্য ‘অপর’-কে গোছানো বাক্সে ভরে ফেলার চর্চাকে কিছুটা কঠিন করে তুলতে পারে। চিন্তা করা খুব কঠিন কিছু না,  কল্পনামূলক জীবনকে প্রসারিত করলে হয়তো প্রতিবাস্তবতা নিয়ে ভাবার শক্তি বেড়ে ওঠে। আমাদের সামনে জিনিশগুলো যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে তা যে কিছুটা ভিন্নও হতে পারে, উপন্যাস ভাববার সে ক্ষমতাকে প্রসারিত করে।

এছাড়া, উপন্যাস দাঁড়িয়ে থাকে ব্যক্তিগতের উপরে। ওয়াহ কথাসাহিত্যকে বলছিলেন ‘সম্পূর্ণ রূপান্তরিত অভিজ্ঞতাসমূহ’ যার সাথে নাইপল সম্পূর্ণ একমত। এ থেকে আমরা দুটো সিদ্ধান্তে আসতে পারি। যদি লেখকের অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাকে এমন অভিজ্ঞতায় নিয়ে যায় যা খবর হয়ে উঠতে পারত তেমন অভিজ্ঞতা উপন্যাসের বিষয়বস্তু হতেই পারে—যদি নাইপল আর ওয়াহ সঠিক হয়েই থাকেন। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে—খবর ব্যক্তিগত হতে পারে না। বড় ম্যাগাজিনগুলো হয়তো চেষ্টা করতে পারে সেই বাধা পার করার, কিন্তু তারা এক চলতি আঙ্গিকের দ্বারা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। উপন্যাসকে তেমন কিছু সীমাবদ্ধ করতে পারে না। টেকনিকের দিক যাই হোক না কেন, উপন্যাসের ব্যক্তিগত হয়ে উঠবার গুণই পাঠকদেরকে বস্তুগত অথবা জাগতিক ঘটনাবলীর সাথে ভিন্ন এক সম্পর্কে নিয়ে যায়; যে নামেই একে ডাকুন না কেন। আমরা যা ভাবি, যেভাবে ভাবতে আমরা অবচেতনেই অভ্যস্ত হই, তা যে নানা অপ্রয়োজনীয় শর্ত দ্বারা আবদ্ধ থাকে—নির্ভরশীলতার সেই ক্ষেত্রকে উপন্যাস সহজেই অতিক্রম করতে পারে। জিমে যাওয়ার সময় আমরা হয়তো এলিভেটর ব্যবহার করি, কিন্তু শরীরচর্চার জন্যেই যদি যাওয়া হয়—তাহলে সিঁড়ি কেন নয়?

উপন্যাসের আঙ্গিক এবং ব্যক্তিগত হয়ে উঠবার বৈশিষ্ট্য আমাদের চিন্তার ক্ষেত্র এবং ঘটনাপ্রবাহের বিষয়ে আমাদের অবস্থান বদলে দিতে পারে। এমনকি সেই ঘটনা নিয়ে যা বুঝি সেই সামগ্রিক ব্যাপারকেও বদলে দেয়ার ক্ষমতা আছে উপন্যাসের। মনে হচ্ছে এরই মধ্যে আমি অনেকদূর কল্পনা করে ফেলছি। কোনো আপাত প্রমান ছাড়া আমার দাবিগুলো বাসনা অনুযায়ী চিন্তা ছাড়া কিছুই না।

জোনাথান লি

আমরা যা জানি এবং যা জানি বলে কল্পনা করি এই দুইয়ের পার্থক্যই আপনার উপন্যাসের কেন্দ্রে অবস্থান করছে। উপন্যাসের কোনো এক জায়গায় একজন বলেন—হার্ভার্ডের মূলমন্ত্র হচ্ছে ‘ভেরিতাস’ আর ইয়েলের ‘লুক্স এ ভেরিতাস ’—আলো ও সত্য। আলো ও সত্যের মাঝখানের জায়গার কোনো ব্যাপারটা আপনাকে আগ্রহী করে তোলে? মানে একটা জিনিসকে আলোকিত করলেই আমরা যে সত্য জানার কাছাকাছি যেতে পারি না এটাই কি?

জিয়া হায়দার রহমান

এই আলোচনা ব্যাপক এবং বলা যায় আমার উপন্যাসটা দাঁড়িয়ে আছে এর ওপর। এছাড়া বাকি সবকিছুই প্রতিসরিত হচ্ছে ‘তুমি কিভাবে জানো’ এই লেন্সের ভেতর দিয়ে।

আমি মনে করি স্বল্প কথায় জবাব দেয়াটাই সঠিক কাজ। বাইরের পৃথিবীর বাস্তবতা, পরমাণুর গতিপ্রকৃতি এবং এসব বিষয়ে আমাদের ধারণা—এই দুইয়ের মাঝখানে কী-লকটি কিভাবে প্রবেশ করানো যায় তার অনেক উপায় আছে। ওই জগতে প্রকৃত অর্থেই যা হচ্ছে এবং সেই সম্পর্কে আমাদের উপলব্ধি বা ধারণা—এর মধ্যবর্তী অঞ্চলটা আর কী! এসবের কিছু আমাদের জানানো হয়, কিছু বা এমন সংবেদনশীলতা যাকে সাংস্কৃতিক বলে বর্ণনা করা হয়, কিছুটা অভ্যাস আর হোমো স্যাপিয়েনস হিশেবে ক্রমাগত নিরীক্ষার ভেতর দিয়ে গ্রহণ-বর্জনের অভ্যাসের ওপর নির্ভর করে। এ ধরনের নানা অন্তরায় কাজ করে ভেতরে ভেতরে।

মানুষ তার বিশ্বাস কিভাবে তৈরি করে, কিভাবে ঘটে ব্যাপারগুলো তা নিয়ে আগ্রহী আমি। বিশ্বাসের সব প্রকরণগুলো আমাদের ভেতরকার উজ্জীবনী শক্তিকে সৃষ্টি করে। সেগুলো ছাড়া আমরা পঙ্গু, নিষ্প্রাণ—হাত ছাড়া দস্তানার মতো।

জোনাথান লি

আমি যদি ভুল জিয়া হায়দার রহমানকে না পেয়ে থাকি তবে আপনি আগে দ্যা গার্ডিয়ানে লিখতেন। ২০০৭ সালের এক লেখায় রিচার্ড ডকিন্স আর কিছু নাস্তিক্যবাদী ঘরানার ব্যক্তিকে নিয়ে লিখেছিলেন—“বেশ কয়েকবছর আগে আমার এক ইহুদি বন্ধু মারা যায়। তার বন্ধু ও পরিবার কুয়াশাঘন এক সকালে উত্তর লন্ডনের এক কবরস্থানে একত্রিত হয়েছিল তাকে শেষ বিদায় দেয়ার জন্যে। আমরা যখন অপেক্ষা করছিলাম, শেষকৃত্যানুষ্ঠান পরিচালনাকারীদের একজন এসে আমাদের একটা স্কালক্যাপ দিয়ে ক্ষমা চেয়ে বললেন, আমাদের কাছে তো আর নেই। এগিয়ে গিয়ে নিলাম সেটা। বন্ধুদের একজন মজা করে বলল, একটু বেশি গরম লাগবে এটা পরে। ‘না’—ক্যাপটা মাথায় ঠিক করতে করতে উত্তর দিলাম, ‘আমি ঈশ্বরের সামনে কম নগ্ন অনুভব করব’।’’ বিশ্বাস—যে কোনো ধরনের বিশ্বাস কি আপনার জীবনের একটা অংশ, এবং সম্ভবত আপনার লেখারও?

জিয়া হায়দার রহমান

প্রেসের জন্যে আসলেও কিছু কিছু লিখেছিলাম আমি, তবে বছর পাঁচেরও বেশি ‘গে’ লেখা বন্ধ করে দিয়েছি। লক্ষ করলাম আমার দৃষ্টি পরিবর্তিত হয়ে যায়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা প্রকাশ করার সাথে সাথেই। আরও যা ঘটল, যাদেরকে এড়িয়ে চলতাম তারাই আমার লেখার পতাকাবাহী হয়ে উঠছিল। যে লেখাটার সূত্র আপনি হয়তো দিতে চাইছেন সেটা অবশ্য নিখুঁতভাবে আমার বর্তমান চিন্তাভাবনার প্রতিফলন।

যে-সকল বিশ্বাস কাঠামোবদ্ধভাবে ধর্মপ্রচারধর্মী কিংবা কোনো ব্যানার নিয়ে আসে, সে-সবের প্রতি কোনো আগ্রহ নেই। আমার সহমর্মিতা সেসব বিশ্বাসের প্রতি যা নিঃসঙ্গ মানুষ কাছে টেনে নেয় সহায়ক হিশেবে, বা যে বিশ্বাস মানুষকে সংগঠিত করার নীতি হিশেবে কাজ করে কিংবা মানুষ যাকে নিছক আচার বলেই পালন করে। বিশ্বাস হলো তাই যার জন্ম হয় বিনম্রতা থেকে—যখন মানুষ নিজের ভঙ্গুরতা উপলব্ধি করতে পারে। এমন বিশ্বাস আমি চিনতে পারি কারণ এমন বিশ্বাস পালন করে এমন মানুষ অনেক দেখেছি চারপাশে। তারা গলা উঁচু করতে অভ্যস্ত না। এই ধরনের বিশ্বাসগুলো সামগ্রিকভাবে বহুপ্রচলিত বলে চিহ্নিত হয় না, কর্তৃত্বপূর্ণ বিশ্বাস হিশেবে তো চিহ্নিত হয় না বটেই। যে-সবের কথা আমরা শুনি সে-সবই চড়া আওয়াজের।

আমি নিশ্চিত নই আমি যা লালন করি তা সাকুল্যে প্রচলিত অর্থে বিশ্বাস বলতে যা বোঝায় সেই পাল্লায় বিশ্বাস বলে গণ্য হয় কিনা। আস্থার বাস্তবে ‘বিশ্বাস করা’ শব্দটা কিভাবে কাজ করে তা বুঝতে অপারগ আমি। প্রতিটি ধর্মমতের ব্যাকরণে ‘বিশ্বাস করা’ শব্দটা উপস্থিত।

uk-cover-paperback-11-2014-shadow

জোনাথান লি

বইয়ের কোন অংশগুলো আপনার কাছে প্রথমে ধরা দিয়েছিল? মানে প্রাথমিক প্রণোদনা কিংবা খসড়া দৃশ্যের কথা উল্লেখ করলে?

জিয়া হায়দার রহমান

প্রথম দৃশ্যটা, যেখানে একটা মানুষ তার পুরানো বন্ধুর দরজার সামনে উপস্থিত হয়, বন্ধুর সাথে যোগাযোগ নাই বেশ কিছু বছর—এটাই আসছিল সবার আগে। বাকিটা খুব তাড়াতাড়ি হয়ে গেছে, এমনকি আমার লেখার আগেও। কাজের কিছু হচ্ছে এমন অনুভূতি পাবার জন্য আমার লিখতে হয় না। অনেকটা ফার্নিচার তৈরির মতো করে লিখি। খুলে বললে, একটা অংশের আঙ্গিক এবং পদ্ধতি কেমন হবে সেসব বেশ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ভাববার জন্য অনেক সময় নিতে পারি। এর উদ্দেশ্য হলো আমি যেন বুঝে উঠতে পারি শেষ কণাটি কিভাবে প্রকাশ করা হবে, বা কী ধরনের টুল ব্যবহার করব বা কোনো ধরনের টুল তৈরি করার দরকার আছে কি না।

কাজ নিয়ে শুধু চিন্তা করতে ভালো লাগত, কারণ বুঝতে পারতাম কিছুটা আগাচ্ছি। এর পেছনে গণিতচর্চা নিয়ে আমার অতীতের ভূমিকা রয়েছে। গণিতশাস্ত্রে অনেক সময় শুধু চিন্তা করে যেতে হয়। আবার মাঝে মাঝে এক গুচ্ছ প্রতীক লিখে চলা, যেগুলো খসড়ার কাজ করে। আমি বলেছি আমি ভাবতাম এমন, এর কারণ আজ আমি সন্দেহ করি চিন্তা করার এই প্রক্রিয়ার সাথে আমার মানসিক ধাতের আরও মৌলিক কিছু ব্যাপার সম্পর্কযুক্ত ছিল।

একটা ব্যাপার জানিয়ে রাখা যায়, তিন মাস ধরে লিখবার পর যখন বুঝতে পারলাম উপন্যাসটা দীর্ঘ হতে যাচ্ছে—তখন শেষটা লিখে ফেলার সিদ্ধান্ত নেই। এরপর আমি উপন্যাসটি পড়লাম এবং কিছু দৃশ্য বিক্ষিপ্তভাবে লিখে ফেলি, কারণ সেগুলোর নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ছিল।


এখনো বিশ্বাস করি মানবজাতির সমস্ত কাজের মধ্যে বিশুদ্ধ গণিত হচ্ছে সবচেয়ে সৃজনশীল,  যদিও আমি আর গণিতের অংশ নই।


জোনাথান লি

এভাবে আগানোর কারণ?

জিয়া হায়দার রহমান

ভেবে দেখলাম উপন্যাসটা লিখতে দুই তিন বছর সময় লাগবে এবং এই দুই তিন বছরে মানুষ হিশেবে আমি যতখানি পরিবর্তিত হবো, তার ছাপ উপন্যাসের মৌল স্বর অথবা চাবিতে পড়বে। এছাড়া গল্পগুলোকে নানাভাবে, নানা আমেজে বলাটাও মাথায় ছিল, তাই চাচ্ছিলাম না যেন এমন মনে হয় যে মূলধারাটা গায়েব হয়ে গেছে। নিজের ভেতর পুরো ব্যাপারটাকে আত্মস্থ করার প্রক্রিয়া আমি নিজের মাথায় খুঁজছিলাম, এবং কিছু দৃশ্য লিখে ফেলতে চেয়েছিলাম যে-সবে সেই সময়ের স্বরটি প্রতিফলিত হবে। এই কাজটি করেছি আমার ভেতর যেসব পরিবর্তন অবধারিতভাবে ঘটে যেত তার প্রতি উপন্যাসকে ঘাতসহ করে তোলা। সম্প্রতি শুনতে পারলাম একজন লেখকও একই কাজ করেন, নিজের দেয়ালের সামনে মৌলিক একটা অনুচ্ছেদ লিখে রাখেন একই কারণে।

জোনাথান লি

লেখার সময়ের এমন আরও কোনো মুহূর্ত আছে যখন মনে হয়েছিল সবকিছু বদলে যাচ্ছে বা একটা পথ স্পষ্ট হয়ে উঠছে?

জিয়া হায়দার রহমান

ম্যাক্রো মাপের কিছু ঘটে নি, তবে বহুবার ছোটখাট এমন পরিবর্তন হয়েছে। সমস্যা সমাধানে আমি সবচেয়ে আনন্দ পাই, লেখালেখির কাজের এক বড় অংশ আমার কাছে সমস্যা সমাধানের মতো মনোরম শ্রম মনে হয়। লেখালেখির এই আবিষ্কারের প্রতিমুহূর্ত হচ্ছে আমি কি দেখছি না আর কী দেখা উচিত তা বের করার পদ্ধতি। তুচ্ছাছিতুচ্ছ অনুভব, অস্বস্তি; বারবার মনে হয় কিছু ভুলে গেছি অথবা বাদ দিয়ে গেছি, বা যদি এমন হতো এখানটায় এমন হঠাৎ করে জাগা এমন অনুভূতি—এসব অমূল্য। এটাই সমস্যা এবং সমাধানের পথেও নিয়ে যায়।

জোনাথান লি

‘সমস্যা সমাধানের মনোরম শ্রম’—ভালো লাগল সংজ্ঞাটা। আপনি বিনিয়োগ ব্যাংকিং এবং মানবাধিকারকর্মী হিশেবে কাজ করেছেন, পড়ালেখা করেছেন গণিতে। এইসব কিছুই কি আপনার সমস্যা সমাধানের প্রেরণা দিয়েছে?

জিয়া হায়দার রহমান

বিষয়বস্তুর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংক এবং মানবাধিকারকর্মী হিশেবে কাজ করার সরাসরি একটা প্রভাব আছে, তবে বইয়ের কিছু অংশে মাত্র। গণিতের প্রভাবটা বিচিত্র, বিচিত্র কারণ আমি জানি না কতখানি প্রভাব আছে। সবকিছু দেখার মৌলিক ব্যাপারটা এর থেকেই আসছে, যদিও জানি না কিভাবে। এর কারণ নিশ্চয়ই আমার গড়ে উঠবার বছরগুলোতে গণিতই ছিল সব, জীবনের একমাত্র সৌন্দর্যের ভূমি, এবং তাতে রুদ্ধশ্বাস সৌন্দর্য। এখনো বিশ্বাস করি মানবজাতির সমস্ত কাজের মধ্যে বিশুদ্ধ গণিত হচ্ছে সবচেয়ে সৃজনশীল,  যদিও আমি আর গণিতের অংশ নই।

আমার বিশ্বধারণার পটভূমির মূলে এখনো গণিত, স্থির রাত্রে জানার সীমানার দীনতার প্রতি করুণ কৈফিয়ত। আমার বাবা-মা’র সাথে কথা বলার সময় মুশকিল হতো গণিতের জন্যে। গণিতে কোনো প্রমাণ কিভাবে এসে ধরা দেয় সেই রহস্য ধরাছোঁয়ার বাইরে। স্পষ্টত কিছু কিছু শর্ত আছে সে-সব রহস্যময় প্রকাশকে পাবার। চিন্তা করতে হবে, বারবার চিন্তার চেষ্টা করতে হবে, তারপর অন্য পথে আগাতে হবে, তারপর আবার চিন্তা করতে হবে। আমি কি তোমাকে বলছি আবার যে চিন্তা করতে হবে? এরপর মাঠে নামতে হবে। হুট করে একটা প্রমাণ আসবে, জাদুর মতো। কিন্তু পার্থক্যটা হচ্ছে জাদুকর জানেন কোথা থেকে খরগোশটা বের হচ্ছে। এটা হচ্ছে সেই জাদুর মতো, যেখানে জাদুকর জানেনই না কিভাবে জাদুটা সে দেখাচ্ছেন।

জোনাথান লি

বাবা- মার সাথে কথা বলতে যে সমস্যা হতো, তা লেখায় কিভাবে আসছে?

জিয়া হায়দার রহমান

ওহ, মনে হচ্ছিল আপনি জিজ্ঞেস করবেন—অস্বীকার করবো ন ব্যাপারটা। যোগাযোগ এবং লেখার পরিপ্রেক্ষিতে বিশাল প্রভাব রেখেছে। আমার বাবা মা খুব ভালো ইংরেজি বলতে পারতেন না। আমরা যখন ইউকেতে আসি, কেউই ইংরেজি বলতে পারতাম না, কিন্তু শিশুরা ভাষা রপ্ত করে তুলনামূলক সহজে। সমস্যাটা ভাষার ছিল না, সমস্যাটা ছিল যে কোনো ভাষাতেই যোগাযোগ না করতে পারাটা। মনে রাখা ভালো, তারা গ্রামীণ বাংলাদেশ থেকে এসেছিলেন যেখানে শিক্ষার সুযোগ সুবিধা তেমন পান নাই। আমি নিশ্চিত যে তারা আতঙ্কের সাথে দেখল তাদের সন্তানকে তাদের পক্ষ থেকে শেখানোর যেটুকু বাকি ছিল সে-টুকুর সদ্ব্যবহার সন্তানটি নিজেই করে ফেলেছে। এছাড়া আরও যা ছিল, আমার বাবা-মা তারা কখন কী করবেন একেবারেই বোঝা যেত না, আর যা বলতেন তার ওপর ভরসা রাখা যেত না। ফলে কথা বিনিময়ের সময় অন্যান্য যেসব ইঙ্গিত মানুষ দেয় আমি সে-সব খেয়াল করতাম—শারীরিক ভাষা কিংবা ফ্রয়েড যাকে নির্দিষ্টার্থক ভাষায় বলেন ’প্রত্যেকটা রন্ধ্র থেকে বিশ্বাসঘাতকতা ঠিকরে বের হয়ে আসছে’। বিশ্বাসঘাতকতা— অর্থাৎ তারা যা বলতেন তার সব অর্থ উল্টো। এখনো কথা বলার সময় আমি শুধু মানুষের কথাই শুনি না, ক্লান্ত হয়ে তার অঙ্গভঙ্গিও লক্ষ করি। অনেকটা একই সময়ে দুইটা রেডিও স্টেশনের শুনবার মতো। ক্লান্তিকর এই ব্যাপারটার সাথে অভ্যস্ত হয়ে গেছি এখন। বন্ধুদের সঙ্গটা খুব চমৎকার, কিংবা মানুষের সাথে হাঁটা, যার দিকে তাকানো যায় না।

আরও বলা যায়। আমাদের বাসার শর্তসূচক ব্যাপারগুলোর অনুপস্থিতি নিয়েও আমি বলতে পারি। এটা আমাকে কিছুটা মুচড়ে দিয়েছে যাতে তার সাথে খাপ খাইয়ে নেয়া যায়। অসংখ্য পথের কথা বলা যায়, যে-সব তৈরি করতে হয়েছিল বাবা-মা’র সাথে সহজবোধ্য ভাষায় কথা বলতে। এখানেই বাদ দিই।

জোনাথান লি

খুব আশ্চর্য হয়েছিলাম আপনি কত দ্রুত উত্তম পুরুষে স্থিত হয়ে গেলেন। নাম পুরুষে অনেক কিছুই সম্ভব হয় না, যেটা উত্তম পুরুষে সম্ভব হয়—এ নিয়ে আপনার কী ভাবনা?

জিয়া হায়দার রহমান

আমি আপনাকে এমন ধারণা দিতে চাই না যে আমি ইচ্ছে করে ভোঁতা বুদ্ধির পরিচয় দিচ্ছি। কিন্তু আমি কখনোই বুঝতে পারি নি কেমন করে দৃষ্টিকোণ গল্প নিরপেক্ষ হিশেবে পছন্দনীয় হতে পারে। যে গল্প আপনি বলতে চান দৃষ্টিকোণ তার বুননে অন্তরঙ্গভাবে জড়িয়ে থাকে। গল্পের একটা রূপ এটা। ধরা যাক বইয়ের প্রথম অনুচ্ছেদটা লিখতে বলা হলো একজন লেখককে, একবার উত্তম পুরুষে, আরেকবার নাম পুরুষে। এই বাছাই করাটা শুধু দুটি দৃষ্টিকোণের তফাৎ নয়, বরং দুটা সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্পকে বেছে নেয়া।

যে গল্পটা আমার মনে বাড়ছিল এবং যেটা বলা জরুরি মনে হয়েছে তা একজন বিবরণদাতার মুখ দিয়ে বলানো, যে হারিয়ে যাওয়া বন্ধুর সাথে আলাপের স্মৃতি রোমন্থন করছে। গল্পের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ হচ্ছে বর্ণনাকারী গল্পটা বলতে চায়। দ্য রাইম অফ দ্য এইনশান্ট মেরিনার এ মেরিনার তার নিজের গল্পটা বলছেন এবং সম্পূর্ণটা বুঝবার জন্য তার এই বলতে চাওয়ার ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ। যাই হোক, এটা ছাড়াও কিছু আকস্মিক সুবিধাও ছিল সেভাবে লেখার। উত্তম পুরুষটা ক্রমাগত বদলাতে থাকে জাফর আর বিবরণদাতার মধ্যে। নিবিড় প্রয়োগে নাম পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা সমবেদনাহীন মনে হতে পারে বলে বোধ হয়েছিল।

জোনাথান লি

যেমন?

জিয়া হায়দার রহমান

যেমন চরিত্রটা হয়তো নির্ভরযোগ্য নয়, অথবা তার আত্মসচেতনতায় ঘাটতি রয়েছে, বা পাঠক হয়তো এমন কিছু বুঝতে পারছেন যা চরিত্রটা বুঝতে পারছে না অথবা কোনো উপলব্ধির ঘাটতি আছে তার মাঝে। নাম পুরুষ নিয়ে মৌলিক সমস্যা হচ্ছে এই প্রশ্নটা—কে আসলে উপলব্ধিগুলো করছে? লেখক? কথাসাহিত্যের মজার বিষয় হলো এর কোনো লেখক নাই। আমি যতদূর বুঝি ডব্লিউ জি সেবাল্ড এসব কারণেই নামপুরুষের সন্দেহ পোষণ করতেন।

কিন্তু আমি এও বলতে চাই না উত্তম পুরুষ একমাত্র সঠিক অবস্থান। এটা এমনকি জটিলতাও তৈরি করতে পারে। যেমন একটা অনুচ্ছেদ আছে যেখানে বর্ণনাকারী তার ছোটবেলার হারিয়ে যাওয়া একটা আদরের বাইসাইকেলের কথা পুনঃবর্ণনা করেন। সে গল্পটি পার হয়ে যায় তার মায়ের প্রেমের সম্পর্কটির দিকে না দেখেই। কারণ সে সারাক্ষণ সেই হারানো বাইসাইকেলটির দিকেই মন দিয়েছিল। তবে সেটাই যথেষ্ট না। গল্পের তথ্য একটা শেকল আর তালার রূপকের মাধ্যমে ফিরে আসছে। তার বাবা বদলি সাইকেলটার সাথে এই শেকল ও তালা কেনার ওপর জোর দিচ্ছিল। গল্পের প্রতি সৎ থাকা দরকার, উত্তম পুরুষে গল্পগুলোতে, যদিও-বা কিছু কিছু ব্যাপারে পৌঁছানো কঠিন হয়।


শ্রেণি শুধু দুনিয়াতে আমাদের বিভেদ ঘটায় না, আমরা যে গল্পে উপস্থিত হই সেখানেও আমাদের বিভাজিত করে।


জোনাথান লি

এপিগ্রাফ নিয়ে আগ্রহের কারণ বলবেন? প্রত্যেকটা অধ্যায়ের রয়েছে অধ্যায়ক্রম, অধ্যায়ের নামসহ এপিগ্রাফের সারি। আপনার কি ভয় ছিল যে এপিগ্রাফগুলো প্রজ্ঞার আভাস হিশেব যেটা জাফরের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ—সেগুলো হয়তো পাঠকের কাছে অনাহূত প্রবেশ ঠেকতে পারে? অথবা, আপনার বিষয়বস্তুর সাপেক্ষে এভাবে বলা হয়তো সমীচীন হবে, খুব বেশি তথ্য দিচ্ছেন?

জিয়া হায়দার রহমান

না এবং না। প্রথমত, উপন্যাসে এপিগ্রাফ বলতে যা বোঝায় তেমন সেই ভাব এই উপন্যাসে এপিগ্রাফগুলো পায় নি। এগুলো আসলে লেখক যে পর্দার আড়াল থেকে দেখছেন, সেটার প্রমাণ, কিন্তু নিয়ে আসা হয়েছে বর্ণনাকারীর মাধ্যমে। এগুলোর বেশিরভাগই জাফরের নোটবই থেকে বর্ণনাকারী নির্বাচন করেছেন এবং উপন্যাসেই সেটা পরিষ্কার করে দেয়া হয়েছে। আর বইয়ের শেষের দিকে কোনো বিশেষ অধ্যায়ের এপিগ্রাফ গল্প বলার মতো ওজনদার হয় এবং এদের মাধ্যমে কিছু একটা উদ্‌ঘাটন করা হয়। জাফর নোটবুকগুলো বর্ণনাকারীকে দিয়েছে, এবং যেটা বর্ণনাকারীর কাছে জ্ঞানের উৎস হয়ে ওঠে। সে জ্ঞান জাফর এবং তার আগ্রহ সম্পর্কে, অন্যরা কী বলেছেন বা লিখেছেন যা জাফর টুকে রেখেছিল, যা জাফরের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অবাক হওয়ার কিছু নাই যে জাফরের এরকম নোটবই আছে, তার চরিত্রের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। এতেও অবাক হবার কিছু নাই যে বর্ণনাকারী এই নিয়ে আগ্রহী হবেন এবং দুই-একটা অনুচ্ছেদ সেখান থেকে বের করবেন নির্দিষ্ট করে। এটা বর্ণনাকারীর চরিত্রের সাথে যায়, যে চরিত্র কিছুটা অগভীর, অনির্ভরযোগ্য এবং প্রচুর আপোসকামীমারাত্মকভাবে না হলেও।

শিল্প-কৌশল নিয়ে কথাবার্তা চালানোর জন্য আপনি যে ‘পাঠক’ শব্দের উল্লেখ করলেন তা বেশ উপযোগী এবং প্রয়োজনীয়। তবে লেখার কাজ চলা অবস্থায় পাঠকের জন্যে সেই দরজা খুলে দেয়াটা সর্বনাশা ব্যাপার—অথবা আমার জন্যে তাই। ‘পাঠকগোষ্ঠী’ বলে কিছু নাই, যা আছে তা হচ্ছে পাঠক এবং তারা মানুষের মতোই বিচিত্র। তো কোন পাঠককে আপনি ঢুকতে দিচ্ছেন? যদি তারা দ্বিমত প্রকাশ করে সেক্ষেত্রে তারা আসলে কার কথা শোনে? উপন্যাস নিয়ে মানুষের আলোচনা খুব কৌতূহলোদ্দীপক হতে পারে, যদি সে উপন্যাসটা আপনি পড়ে থাকেন। কেউ বলে না—‘বইটা চমৎকার কিন্তু আমার ভালো লাগে নাই’। কেন এমন হচ্ছে একটু সময় নিয়ে ভাবলে জিনিশটা অনেক কিছু পরিষ্কার করে।

আমার কথা হচ্ছে পাঠককে বিশ্বাস করো। পাঠককে বিশ্বাস করা এবং পাঠক আপনার মন বুঝতে পারবে এমন আশা করার মাঝে অবশ্যই একটা রেখা টানা আছে। এই জায়গাটাতেই বন্ধু অথবা সম্পাদকেরা এসে পড়ে। একজন ভালো সম্পাদক আপনাকে সোজাসুজি বলবে আপনি কখন পরেরটার সীমানায় ঢুকে গেছেন।

জোনাথান লি

গত বছর গুয়ের্নিকাতে আলেকজান্ডার হেমন সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে বলেছিলেন :

কিছু দিকে দেখলে বাস্তব জীবন বলে আসলে কিছু নাই, আপনি সবসময়ই আপনার জীবনের গল্পকে যাপন করছেন।

বাস্তব কতখানি অবাস্তব এবং আমাদের জীবনকে গল্পের কথকতায় কিভাবে সাজাই তা নিয়ে আপনিও কৌতূহলী। উপন্যাসের প্রত্যেকটা গল্পের কথনভঙ্গির সূক্ষ্ম কাঠামোগুলো কিভাবে তৈরি করেছিলেন? এবং সেই সাথে কাঠামোর ভাবটা কিভাবে গল্পের সাথে মিলিয়েছেন?

জিয়া হায়দার রহমান

হেমনের সাথে সম্পূর্ণ একমত, যতখানি আপনি তাকে সঠিকভাবে উদ্ধৃত করলেন। উদাহরণত বলা যায়, বন্ধুবান্ধবদের সাথে আমাদের মিথস্ক্রিয়া বহুলাংশে আমাদের মস্তিষ্কে আমাদের সামনে যারা আছে আমাদের মাথায় তাদের এক প্রতিনিধিত্বের সাথে মিথস্ক্রিয়া। সে জন্যেই একজন বন্ধু আপনাকে বিস্মিত কিংবা হতাশ করতে পারে। আপনি জানেন, বিশ্বাসঘাতকতা এই উপন্যাসের কেন্দ্রে আছে।আরেকটা উপায় আছে আপনার এই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার। উপন্যাসটাকে কাঠামোবদ্ধ করতে আমি পোস্ট-ইট নোট, কার্ড আর ফেলে দেওয়া জিনিসের মাঝে লিনোলিয়ামের একটা টুকরা ব্যবহার করছি কর্কবোর্ড হিশেবে। এটাকে মোড়ানো যেত তাই পোর্টেবলও ছিল। উপন্যাসটা লেখার সময় প্রচুর ঘোরাঘুরি করেছি, ফলে জিনিশটা অনেক সাহায্য করেছে। মাথায় যা আসছে, পোস্ট-ইট নোট আর কর্কবোর্ডটা ছিল সেটার শরীরী মাত্রা। কারণ মাঝে মাঝে মনে রাখাটা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়।

জোনাথান লি

প্রতিমাসেই কোথাও না কোথাও একটা নিবন্ধ বেরুচ্ছে যেখানে উপন্যাসের মৃত্যু ঘোষণা করা হয়। প্রশ্নটা পুরানো, কিন্তু ঘুরেফিরে বারবার আসে। আপনার কি মনে হয় আপনি একটা মৃত বা মৃতপ্রায় ফর্ম নিয়ে কাজ করছেন, যেটাকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করতে হবে?

জিয়া হায়দার রহমান

না, আমার তেমন মনে হয় নি। তবে এমন বোধ করা যেতে পারে উপন্যাস একটা মৃতপ্রায় মাধ্যম। এ ব্যাপারে কোনো পূর্বাভাস কিভাবে দেয়া যায় জানি না, তবে কোনো আগাম কথা বলার পূর্বে কী কী ব্যাপার আমলে নেয়া যায় তা সম্পর্কে ধারণা দিতে উপন্যাস একটা বিশেষ ধরনের পাঠক দাবি করে, যারা আনন্দের সাথে অন্য একটা পরিপ্রেক্ষিতে ধৈর্য ধরে নিরবচ্ছিন্ন সময় ব্যয় করতে পারবেন। পাঠাভ্যাসও বদলে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। যারা উপন্যাস পড়ার জন্য ব্যয় করেন, তাদের সাথে ফেসবুক টুইটার ব্যবহারকারীদের উল্লেখযোগ্য একটা অদলবদলের সম্ভাবনা রয়েছে। এই ব্যাপারগুলো, এমনকি প্লেইন-ভ্যানিলা ই-মেইলও অনেকের সময়কে খণ্ড বিখণ্ড করছে। যোগাযোগ রক্ষার মাঝে খপ্নড সময়ে কাজ করতে হচ্ছে এমন ঘটছে। এমন কী তারা যখন মানুষ কোনো মেসেজের জবাব না দিয়ে থাকে, তখনও তার মাঝে উৎকণ্ঠা কাজ করে যা তার মনোযোগ বিক্ষিপ্ত করে। অনেকটা খেলার মাঠে গল্পরত বাবা-মা’র মতো যারা বন্ধুর সাথে গল্প করতে করতে বাচ্চার দিকে লক্ষ রাখছে। কিংবা একজন মহিলা যিনি রেস্টুরেন্টে খেতে খেতে তার হাতব্যাগের দিকে চোখ রাখছেন।

খোশগল্প প্রামাণ্যভাবে বেশ মূল্যবান মানবিক কার্যসাধন করে। কারণ গুহায় আমাদের বন্ধু আর সম্ভাব্য শত্রু সম্পর্কে খোঁজখবর রাখতে হয়। এবং খোশগল্পের জন্য বা খোশগল্পের জোরদার খোঁজে ক্ষুধা থাকা বিশেষ গুরুত্ব রাখে যখন তথ্য পাওয়া কঠিন এবং তথ্য মিলবার কাজে ভ্রমণ করে মানুষের সাথে দেখা করতে হয়। এক তীব্র উদ্যম থেকে এই প্রয়াস নেবার সক্ষমতা আসে।

প্রযুক্তি ব্যক্তির সামাজিক ক্ষেত্রকে ব্যাপক প্রসারতা দেয়, এবং একই সাথে অনেক অনেক বেশি সুযোগ করে দেয় এবং সস্তা করে দেয় খোশগল্প ভোগ করাকে। গল্পগুজব করার সেই একই আদিম ক্ষুধা আমাদেরও আছে, কিন্তু এখন এই গল্পগুজব আপ্ত করার ব্যাপারটা সুপারমার্কেটের তাক থেকে চিনি ও চর্বিযুক্ত খাবার পাবার চেয়েও সুলভ। এবং দেখুন এটা আমাদের কোথায় নিয়ে গেছে। যখন দেখি মানুষজন তার যন্ত্রটা সমানে গুতাচ্ছে, আসক্তির কথা না ভেবে উপায় থাকে না।

বলে রাখি, বড় ঝুঁকিটা শুধু এই নয় যে উপন্যাসের পাঠ সংকুচিত হবে, বরং যা কিছুতে ধৈর্য ও দৈনন্দিনতাকে ত্যাগের প্রয়োজন সে-সব হারিয়ে যাবে। ভালো খবর অবশ্য এই, আমরা এখন হাজার মানুষের সাথে গভীর এবং মূল্যবান বন্ধুত্ব গড়ছি, এমন সব বন্ধু যাদের আমরা আন্তরিকভাবে চিনি এবং যাদের ব্যাপারে ভাবি। অ্যান্ডি বরোভিটযের মতে, ‘সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং এবং নিজের চোদার জীবনকে নষ্ট করার মাঝখানে একটা সূক্ষ্ম রেখা আছে’।

জোনাথান লি

আপনার জীবনের দিকে ফেরা যাক, অপচয়িত হোক বা না হোক তা। আমরা সম্প্রতি গুয়ের্নিকার ‘ক্লাস ইন অ্যামেরিকা’ বিষয়বস্তু ভিত্তিক সংখ্যা প্রকাশ করেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে আপনার উপন্যাসটা সাম্প্রতিককালে আমার পড়া দুর্লভ উপন্যাসগুলোর একটা যেখানে শ্রেণির বিভেদের বিষয়টা প্রধান হয়ে উঠে এসেছে। আপনার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার নিরিখে এই নিয়ে কিছু বলবেন? আপনি জন্মছিলেন বাংলাদেশে, এবং মুক্তিযুদ্ধের এক বছর পর শিশু বয়সে লন্ডনে আসেন। এবং শেষপর্যন্ত অক্সফোর্ড এবং ইয়েলের অভিজাত বারান্দায় হেঁটেছেন।

জিয়া হায়দার রহমান

যতদূর মনে পড়ে, কিছু গবেষণায় দেখা গেছে বেশিরভাগ মানুষ তার নিজের সামাজিক শ্রেণির লোকের সাথেই বেশি পরিচিত হয়, যদিও এমন সিদ্ধান্ত কম লোককেই চমক দেবে। আমি মনে করি ব্যাপারটা যে আরও সংকীর্ণ তার প্রমাণ আছে। আইভি লিগারদের সব বন্ধু-বান্ধব আইভি লীগ থেকেই হয়। এভাবে কথাসাহিত্য লিখতে জানে এমন একদল মানুষে পরিধি আরও ছোট হয়ে আসে। এই লিখিয়েরা নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে শিখে শ্রেণিবিভেদের প্রশ্নকে ভেদ করেন। অবশ্য একজন ইংরেজ বনেদি নিচতলায় তার কর্মচারীর সাথে কিছু যোগাযোগ রাখতে পারেন। এবং তার বাসায় আন্তঃশ্রেণি নাটকীয়তার ব্যাপারও উঠে আসতে পারে তার কথায়। কিন্তু এর বেশি সংকীর্ণ আর কিছু সম্ভব হয় না! তার কারণ শ্রেণির বিভেদ নিয়ে গল্পগুলো আসলে শ্রেণির দেয়ালগুলোর দুইপাশ থেকেই পরিস্থিতিটা দেখায়। কয়লা খনির শহরে একজন কয়লাখনি শ্রমিককে নিয়ে গল্প নির্ঘাত শ্রেণিবিভেদের গল্প বলে না। শ্রেণি শুধু দুনিয়াতে আমাদের বিভেদ ঘটায় না, আমরা যে গল্পে উপস্থিত হই সেখানেও আমাদের বিভাজিত করে।

জোনাথান লি

কিন্তু আপনার জীবনে কী হয়েছে? বইয়ের সাথে যতখানি সম্পৃক্ত, সে-টুকু নিয়ে আলোচনা করা যাক।

জিয়া হায়দার রহমান

শ্রেণির বিভেদের প্রেক্ষিতে নিজের বিষয়ে বলার বেলায় আমার সমস্যা হলো আমি হতে পারি এবং আসলেও আমাকে —অন্যরা ব্যবহার করেছে এর অনুপস্থিতি দেখিয়ে দিতে। এবং এমন এমন ধারণা উপস্থাপন করতেই যে সামাজিকভাবে ওপরে ওঠা শুধুমাত্র কঠোর পরিশ্রমের ব্যাপার। আমি এটা নিয়ে কিভাবে অভিযোগ করব কেউ যদি এভাবে জবাব দেয়, ‘দেখো তুমি নিজ যোগ্যতায় কতদূর এসেছ? ব্যাপারটা অত খারাপ নয় আসলে।’

কিন্তু প্রায়োগিক উদ্ভটতার বাইরেও এটা একেবারে অর্থহীন যুক্তি। কারণ একটি উদাহরণ পরিসংখ্যানগত বাস্তবকে অসার প্রমাণ করতে পারে না। একটা বিষ যদি আমার শরীরে কার্যকর না হয় তাহলেই সেই বিষকে নিরাপদ বলা যায় না। মানুষের মনে গল্পের প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা এমন যে অ্যানেকডোটের ক্ষমতা সংখ্যার হিশাবের চেয়ে বেশি বোধযোগ্য। একারণেই খবরের গল্পগুলো প্রায়ই সরকারের নীতি পরিবর্তনের প্রভাবের প্রতিফলন স্পষ্ট করে তুলে ধরতে গিয়ে একজন ব্যক্তির গল্পই বলে।

আমার শৈশব সুখকর ছিল, কঠিন ছিল। বাংলাদেশের গ্রামের এমন পরিবারে আমার জন্ম। বাবা-মা হাইস্কুলের বেশি পড়েন নি। ইউকে-তে অভিবাসী হয়ে আমি দারিদ্র্যের ভেতর বেড়ে উঠেছি, বলতে গেলে উন্নত অর্থনীতির সবচেয়ে মন্দ অবস্থায়। স্বর্গের মতো প্রজেক্টগুলোতে চলে আসবার আগে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার আগে আমি বিশেষত্বহীন একটা স্কুলে পড়েছি। আমার বাবা প্রথমে ছিলেন বাস কন্ডাক্টর, মা দর্জি।কৈশোরের শেষে পৌঁছা পর্যন্ত আমার জীবনে বিলাসিতা ছিল না কোন—না ছুটির দিন, গাড়ি বা কম্পিউটার। আমি আসলে প্রোগ্রামিং করা শিখেছি বই পড়ে পড়ে। প্রোগ্রামগুলো নোটবুকে লিখে রাখতাম এবং বছর কয়েক পর যখন কম্পিউটার কিনি, তখন সেগুলো যাচাই করে দেখেছিলাম সেসব কাজ করে কিনা। প্রোগ্রামগুলো কাজ করেছিল। আমার ভাগ্য ভালো ছিল। সবকিছু নিয়েই অক্লান্ত আগ্রহ ছিল। কিন্তু আমার কপালকে এমন পরিস্থিতির ওপর কেন নির্ভর করতে হবে? কেন নিচু শ্রেণিতে জন্মানো একটা বাচ্চাকে, তার কৌতূহলকে স্তব্ধ করে দিতে পারে এমন সব বাধা অতিক্রম করে আসতে হবে? যেখানে অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের একটা শিশুর অতি অল্প কৌতূহলকেও উদ্দীপ্ত করা হয়, লালন করা হয়? বিভিন্ন বয়সের শিশুদের সাথে ঘটছে এমন বৈষম্য তা অনুধাবন করলে এটা খুব ভয়ংকর, যখন একজন শিশুর জায়গা থেকে সম্পূর্ণ ব্যাপারটা দেখা যায়।

এইই কি সবচেয়ে ভালো কাজ মানবজাতির জন্য আমারা যা করতে পারি? আমরা চাঁদে মানুষ পাঠিয়ে দাবি করছি এটা মানবজাতির অর্জন। পাঁচটা ক্লিকের কমে প্যারিসে থাকা আমার গডসনের সাথে কথা বলতে পারি। তার চলন্ত ছবি দেখতে পারি, তাকে হাসাতে পারি এবং সেও আমাকে দেখতে পারে। আমরা এমন মহান শিল্প সৃষ্টি করি যা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে স্তম্ভিত করে দেয়, কাঁদায়। কিন্তু ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করার সেই হৃদয় আমাদের নাই।


আজকাল প্রায়ই বই বিক্রি হয় বইয়ের গুণে না, লেখকের নামে।


জোনাথান লি

কিছুটা হালকা শোনালেও প্রশ্নটা করতে যাই—আপনি কি বই লিখাটা উপভোগ করেছেন?

জিয়া হায়দার রহমান

যদি মগ্ন হয়ে থাকা, প্রবাহে ডুবে থাকা, অবিরত ভাবে সৃষ্টিশীল ভাবনা নিয়ে থাকা আনন্দের অন্য নাম হয়, তবে আমি পুরো প্রক্রিয়াটাই উপভোগ করেছি। হয়তো আইসক্রিম খাওয়ার মতো না, তবে নিরস  সময়ও ছিল না।

মাঝখানে কিছু সময় ছিল যখন ভয়ানক শারীরিক যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে গেছি আমি। তখন মাত্র একটা অংশ শুরু করেছি, ভাবছি এই যন্ত্রণা হয়তো লেখাকে প্রভাবিত করবে। ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যেত, মাঝরাতেও সেই ব্যথা থাকত। লেখালেখি তারপরেও চলেছে বেশ, যদিও ব্যথানাশক ওষুধ ব্যথা কমাতে খুব কাজ করে নি। পরিষ্কার বুঝতাম ভালো ঘুম না হবার ফলে দুঃস্বপ্ন দেখছি, আর ভালো ঘুম হতো না ব্যথার জন্যে। কয়েকজন ডাক্তারের কাছে গেছি, পরীক্ষা করেছি, কিছুই ধরা পড়ে নি। সেবাদানকারীদের কাছেও এটা রহস্যজনক ছিল।

অধ্যায়টা লেখা শেষ হবার দুইদিন পর মিলে গেল সব। ব্যথা হঠাৎ করেই উধাও। দুঃস্বপ্নও চলে গেল। আমি সব জট পাকিয়ে ফেলেছিলাম। ব্যথা আর দুঃস্বপ্ন ছিল মনোদৈহিক। এবং এগুলো অই অধ্যায়ের বিষয়গুলো থেকে তৈরি হচ্ছিল। আহ মরণ, এটা এত স্পষ্ট ছিল। আকর্ষণটা মাটি করে দিতে চাই না, আর কথা বাড়াব না। কিন্তু তারপরেও বলি এই এতকিছু যখন ঘটছিল তখনও লেখাটা উপভোগ করেছি, শরীর বিদ্রোহ করার পরেও।

জোনাথান লি

এবং শরীর বিদ্রোহ করার পরেও লেখালেখিটা আপনার কাছে অপরিহার্য। আরও বই লিখবেন?

জিয়া হায়দার রহমান

লেখালেখি অপরিহার্য আমার কাছে। পরবর্তী বইয়ের উপর কাজ করছি। কিন্তু দুটা প্রশ্ন অন্তঃপ্রকৃতিগত দিক থেকে এক না। বহুদিন ধরে লিখছি, প্রকাশ করার জন্যে না। আমি নিশ্চিত এমন অনেক মানুষ আছে যারা এমন করে। লেখালেখির পুরস্কারটা এই প্রক্রিয়াটার মধ্যেই থাকে,  যা উপস্থাপন করছি তার মধ্যে না। এটা শুধু আমার কথা না, আমার সাথে দেখা হয়েছে এমন অনেকেই এমন ভাবেন।

বিংশ শতাব্দী লেখালেখির পেশাদারিত্বকে দেখতে পেল। বিশেষ করে দ্বিতীয় ভাগে অ্যাংলো স্যাক্সন দুনিয়ায়, উদাহরণত ইউরোপের মূল ভূখণ্ডের বাইরে। লেখালেখির এই পেশাদারিত্ব একটা ট্র্যাজেডি। জানি না কার্যকারণগত সম্পর্কগুলো কী —তবে পেশাদারিত্বের মকো ব্যাপারেরই হাত ধরে—বেড়েছে লেখক পরিচিতির ধারণার প্রসার। সেজন্যই আজকাল প্রায়ই বই বিক্রি হয় বইয়ের গুণে না, লেখকের নামে। নাক উঁচু একটা ধারণা আছে যে আধুনিক সেলিব্রিটি কাল্ট পড়াশোনার উঁচু জগৎকে স্পর্শ করতে পারে নি। আমরা হচ্ছি বাগান কিংবা ফুলের প্রদর্শনীতে আসা দর্শক যারা হেঁটে হেঁটে চারপাশ দেখছি, আর সুন্দর ফুলগুলোর দিকে না তাকিয়ে মাটিটা দেখতে কেমন লাগছে তা নিয়ে একে অপরের সাথে গুঞ্জন তুলছি। ভালো লাগছে শুনতে এসব, স্বচ্ছদৃষ্টিসম্পন্ন বলেও বোধ হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না মাটি বলছে : মনোযোগ দেয়ার জন্য ধন্যবাদ, তবে তোমরা কি দেখেছ আমি কী সৃষ্টি করেছি? এত রঙের দিকে চেয়ে মুগ্ধ হয়েছ কি? গন্ধ নিয়েছ টেনে? এই পৃথিবীর ফলগুলোর স্বাদ নিয়েছ?

শফিউল জয়

জন্ম ১৯ এপ্রিল, ১৯৯৩; ঢাকা। অনুবাদক।

শিক্ষা : বর্তমানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়-এ নৃতত্ত্বের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার শেষপ্রান্তে এখন থিসিস করছেন ‘আবুল মনসুর আহমেদ’-এর উপর।

ই-মেইল : joyshafiul@gmail.com

Latest posts by শফিউল জয় (see all)