হোম নির্বাচিত কবিকহন : রেজাউল করিম রনি

কবিকহন : রেজাউল করিম রনি

কবিকহন : রেজাউল করিম রনি
449
0
10464332_828927910453198_7903433646731969811_n
রেজাউল করিম রনি

 স্বকীয়তার ধারণা বলে শিল্প-সাহিত্যের কারবারে যা কিছু আমদানি করা হয়েছে তা অতি পশ্চাৎপদ জিনিস

স্বকীয়তা আর স্বতঃস্ফূর্ততার মধ্যে কোনটি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ? এ দুয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য অাছে কি?

এইডা কি কইলেন? স্বকীয়তা কী জিনিস? আর স্বতঃস্ফূর্ততা কোনোদিন কি দেখছেন? তারপরে আবার দুয়ের মধ্যে পার্থক্য—খাইছে আমারে !

যাক, মশকারি করার জন্য কথাগুলা কইতেছি না। এই প্রশ্ন থেকে নজর না সরাইলে আমরা প্যাঁচাল পাইড়া খুব সুবিধা করতে পারব না। এই যে ‘স্বকীয়তা’, এই যে ‘স্বতঃস্ফূর্ততা’—এইসব ধারণা আমাদের মাথায় কেমনে ঢুকল? এগুলা কই থেকে আসলো? এর সাথে লেখালেখির কি কোনো সম্পর্ক আছে? এর সাথে কবিতার কি কোনো সম্পর্ক আছে? আপনার প্রশ্নের ইশারা ধরে অন্যদিকে চলে যাব। ফাঁকে বলে নিই, কবিতা নিয়ে আমাদের এখানে যে তরিকায় বা পদ্ধতিতে আলোচনা করা হয় তা নিয়া আমার গভীর আপত্তি আছে। আমাদের ভাবতে হবে কবিতার আলোচনা আসলে কিভাবে সম্ভব? কবিতা নিয়া আমরা কিভাবে কথা বলব? কী তরিকায় কথা বললে কবিতার ‘কথা’ আসলে বলা সম্ভব—তা নিয়ে গোড়া থেকে ভাবনার দরকার আছে। এখানে এ্ই প্রসঙ্গ বাদ থাক। দ্রুত কিছু কথা বলে যাব।

এক নাম্বার কথা হলো, স্বকীয়তার ধারণা বলে শিল্প-সাহিত্যের কারবারে যা কিছু আমদানি করা হয়েছে তা অতি পশ্চাৎপদ জিনিস। কিভাবে? মনোযোগ দিয়া খেয়াল কইরেন, আমরা যখন কোনো স্বকীয়তার কথা ক্লেইম করি তখন ধরে নিই যে, একটা লিনিয়ার ধারাবাহিকতা আছে। এর মধ্যে কিছু ‘নাম’ বা চিহ্নকে কিছু বৈশিষ্ট্য দিয়ে আমরা বুঝতে চেষ্টা করি। এ চেষ্টা আমার কাছে সবসময়ই হাস্যকর মনে হয়। আপনি ওয়াল্টার বেনজামিনের ‘কনসেপ্ট অব হিস্ট্রি’ দেখলে বুঝবেন সেইসব লিনিয়ার বুঝের কিছু সমস্যা তিনিও এড্রেস করেছেন। আমি বেনজামিনের লাইনে যাব না। আমি আরও আগাই। দেখতেছি আধুনিকতার মধ্যে যে ‘নফসে নাসিসার্স’ তৈরির প্রতিযোগিতা জারি আছে সে এই ধরনের স্বকীয়তার ধারণার মধ্যে এসে হয়ে উঠতে চায় স্টাইল-ফান্ডামেন্টালিস্ট বা প্রকরণ মৌলবাদি । আমরা একটা ড্যামকেয়ার বা ডেসপারেটভাবে আত্মরতিমগ্ন সময়ে বাস করছি। ফলে স্বকীয়তার নসিহত লেখককে হত্যা করার চেয়ে খারাপ। আমি কি আমার পয়েন্টটা বানাইতে পারছি? আমি মার্কসিস্টদের মতো বেহুদা গণসাহিত্য কনসেপ্ট নিয়া উতলা না। এগুলা বাজে তর্ক। এই সময়ে লেখক কেবল তাঁর সত্তার সাথে মোকাবেলা করেই আগাতে পারে। মিলান কুন্দেরার এই মতের সাথে আমিও একমত। আর সত্তার খবরের জন্য সবার থেকে নিজেরে আলাদা করার অসুখ একটা সিভিলাইজেশনাল বিকার। প্রথম অংশ নিয়া এখানে কেবল একটু ইশারা দিলাম।

 ইঙ্গিতে কই, আমাদের সব কিছু পশ্চিমা চিন্তক ধরে বুঝতে হবে এমন কোনো কথা নাই

এবার দুই নাম্বার পয়েন্টে আসি, স্বতঃস্ফূর্ততা। বাহ, শুনতে কি মধুর লাগে! তাই না? এটা কি আমরা জানি, বিশেষ করে একজন কবি যদি নিজের স্বতঃস্ফূর্ততাও বুঝে যায়, টের পেয়ে যায় কোনটা তাঁর স্বতঃস্ফূর্ততা, তখন তার তো আসলে কিছু করার থাকে না। করার দরকারই নাই। কবি আমার কাছে একটা জেনারেল টার্ম, মানে যেখানে পয়েসি আছে আর কি। হোয়াট ইজ ফ্রি উইল? ইজ ইট উইল টু পাওয়ার? নিৎসে জানে। ‘স্পিরিট অব ফেনোমেনলজি’ কি আমরা খুঁজে দেখেছি? ‘আনকনডিশনাল উইল টু ট্রথ’ তো সব কাজেই ডিমান্ড করে। তার পরেও আমরা কি সব আগে থেকে জানি? বা সেই পুরানা প্রশ্ন, ‘জানাকে’ কি জানি? দেখেন স্বতঃ এবং স্ফূর্ততা। স্ব মানে নিজ না বা আমি না। মানে সেল্ফ মানে সত্তা। এখন এই সত্তা তো কোনো ভাবেই পারসোনাল ইনডিভিজুয়াল জিনিস না। এটা আরও গভীর ও সহজ জিনিস। স্বতঃস্ফূর্ততার নামে অামাদের কবিরা তো দেহি ইনডিভিজুয়াল টোটালাইজেশন করে। কল্পনার জোরে যা তাকে এসেনসিয়াল করে তোলে। তখন সৃষ্টিশীলতার নামে পারভারশন তৈরি হয়। এটা অন্য তর্ক। তাইলে এই স্লেবকে, এই সেলফকে কি আমি জানি? এই সেলফের মধ্যে কিভাবে চিন্তার ও অভিনিবেশের পয়দা হয়—আমি কি জানি?  আপনি যদি হাইদেগারের ফ্যাশন আমলে নেন তাইলে বলবেন, “উই নেভার কাম টু থট, দে কাম টু আস। আমরা চিন্তার কাছে যাই না, চিন্তাই আমাদের কাছে আসে। কিভাবে আসে? কী তরিকায় আসে? কিসের ডাকে ভাবের উদয়? খুব সহজ জিনিস নয়। এখানে বিস্তারিত বলতে পারলে ভাল হতো। কিন্তু এত অল্প জায়গায় তো হবে না। ইঙ্গিতে কই, আমাদের সব কিছু পশ্চিমা চিন্তক ধরে বুঝতে হবে এমন কোনো কথা নাই। যে কৃষক আকাশের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে কখন বৃষ্টি হবে তারে কি আপনি আমলে নিছেন? তার অন্টলজি কি আপনি বোঝেন? ফলে স্বতঃস্ফূর্ততার ক্যারিসমা আনপ্রিডিকটেবল একটা  অবস্থার মধ্যে জাগরিত হয়। যে এই সেলফকে কেয়ার করে চিন্তা বা ভাব তার কাছে এমনিতেই আশ্রয় করে। সব ভাষায় ধরতে হবে এমন কোনো কথা নাই।  ভিটগেনস্টাইনের মতো ভাষীক টোটালেটিরিয়ানও স্বীকার করেন, ‘ব্যবহারিক দিন থেকে ভাষা সবসময়ই অস্পষ্ট। কারণ আমরা যা নিশ্চিত করে বলি তা কখনও যথার্থভাবে বলা হয় না’। ফলে স্বতঃস্ফূর্ততা নিয়ে আহম্মক না হলে কেউ ডিটারিনেস্টক কথাবার্তা বলবে না। আমি কম জানি ঠিকাছে। বাট আহম্মক না।

  তাই আমি বিনয়ের সাথে অনুরোধ করব এগুলা নিয়ে ফাও ফাও না গ্যাজাইয়া বা ঢালাও কু-তর্ক  না তুলে গভীর অভিনিবেশ সহকারে আমাদের মনোযোগ দেবার অবসর দিন

10013352_10202519832716499_5179255621129189476_n
কা বুকস; অমর একুশে বইমেলা ২০১৫

সিস্টেমেটিকভাবে ভাবতে গেলে বিষয়টা মুখে বলার মতো সহজ না।  চিন্তা-ভাবনার দরকার আছে। অন্যদিকে সব কিছুর বাইরে যার কাছে নানা মুহূর্ত উদ্ভাসিত হয়। মোমেন্টাম তার সাথে খেলা করে এবং এই খেলায় ভাষা একটা সেকেন্ডারি মাধ্যম আকারে বেশ বড় ভূমিকা পালন করে এবং আমরা কবিতা বা পয়েসি টাইপের কিছু পাই তা কি যুক্তিশাসিত ভাষা-শৃঙ্খলা দিয়া ব্যাখ্যা করা সম্ভব? অন্য কেউ পারলেও আমি পারি না। ভাষাকে আমি সত্তার কমিটমেন্টের গুরুত্বপূর্ণ  ইশারা আকারে দেখি। এই জন্য কোনো অক্ষরের প্রতি আমার প্রেম নাই। অক্ষর শিখলে জ্ঞান হয় না।

জ্ঞান যখন সচেতনা হয়ে ওঠে তখন তারে নিয়া মোকাবেলা করা সহজ। কিন্তু জ্ঞান কিভাবে ‘জ্ঞান’ বা বিষয় কিভাবে ‘বিষয়’ হয়ে ওঠে তার প্রক্রিয়াতে ভাষা এখনও প্রবেশ করতে পারে নাই। ফলে কবিতার জন্ম হয়। কবিতা ছাড়া আমরা জন্মের সূত্র ধরতে পারি না। ফলে কবিতাকে ভাবাবেগমূলক বিষয় মনে করবেন না। এর গুরুত্ব আমরা আজও আন্দাজ করতে পারি নাই। মার্কসবাদিদের মতো সব কিছু ম্যাটেরিয়াল প্যারাডকস বা ইউটেলিটারিয়ান বা ব্যবহারবাদী জায়গা থেকে দেখলে বিপদ আছে। তাই আমি বিনয়ের সাথে অনুরোধ করব এগুলা নিয়া ফাও ফাও না গ্যাজাইয়া বা ঢালাও কু-তর্ক  না তুলে গভীর অভিনিবেশ সহকারে আমাদের মনোযোগ দেবার অবসর দিন।

 এর মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য চর্চা হলো ছোট কবি-বড় কবি বা অমুক গুরুত্বপূর্ণ-তমুক একটা ছাগল—এ টাইপের আলাপ

কবিতার কথা উঠলেই দুটো প্রসঙ্গ চলে আসে—ছন্দ এবং দশক। দুটো বিষয় নিয়ে আপনার কী পর্যবেক্ষণ?

দেখেন, নন্দনতত্ত্ব নিরীহ-পবিত্র কোনো বিষয় নয়। নন্দনতত্ত্বের গভীর রাজনীতি আছে। দশক এবং ছন্দ এগুলা কু-কবিদের চিন্তার বিষয়। অন্যদিকে আরও জঘন্য হইল এগুলার মধ্যে ঘাপটি মেরে আছে কলোনিয়াল চিন্তা/রুচি বা সাহেবের প্রেজুডিস।। কবিতা বা যেকোন লেখালেখির জন্য এগুলার দুই পয়সারও দাম নাই। কোনো কিছু শিক্ষা দেবার খাসলত সবচেয়ে অশিক্ষিত স্বভাব থেকে তৈরি হয়। তুমি দশক সম্পর্কে ধারণা রাখো না, ছন্দ জানো না—এইসব কথা শুনলে এখন আমরা হাসাহাসি করি। বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিকদের একটা বিরাট সাংষ্কৃতিক ফাঁড়া কী জানেন, এরা লেখালেখি করার মধ্য দিয়া পচা কালচারাল ইন্ডাসট্রিতে উঠতে যাওয়ার সামন্তীয় প্রতিযোগিতা করতে করতে জীবন থেকে চূড়ান্তভাবে পালাতে বাধ্য হয়। লেখালেখি তো এখন অলমোস্ট একটা ইন্ডাসট্রিয় ব্যাপার হয়ে গেছে। আগেও ছিল। লেখক যদি ছাগলের মতো এই ইন্ডাসট্রির ঘেঁটুপুত্র হইতে কুত্তাদৌড় শুরু করে তখন কেমন লাগে বলেন? নিজের স্বাভাবিক আবেগ-সংকল্প সব পুঁজি করে লেখক যখন মেইনস্টিম হইতে চায় এবং মেইনস্টিম হয়ে যায় তখন তার লেখালেখি দৈত্যের লাফালাফির মতো মনে হয়। এটা তো তার হেডেকের বিষয় না। অথচ বাংলাদেশে দেখবেন (বিশেষ করে কবিতা নিয়ে) একটা ইগোর লড়াই জারি আছে। কবিতা লেখা ব্যক্তি ইগোর পূজা হয়ে উঠেছে এখানে। এমন বেকুব লোক কবি হলে দুঃখের অার শেষ আছে?  এর মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য চর্চা হলো ছোট কবি-বড় কবি বা অমুক গুরুত্বপূর্ণ-তমুক একটা ছাগল—এ টাইপের আলাপ।  এর মধ্যে কিছু মাথানষ্ট স্বঘোষিত দার্শনিক আছেন; এরা করে কি, ‘শ্রেণি’চেতনা ও গণমানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে একটা ডিভিশন করে। পরে এই ডিভিশনকে পোস্টমর্ডান তত্ত্ব দিয়া জাস্টিফাই করে। খুলে বলি, দেখবেন একদল অতি বিপ্লবী অশিক্ষিত বুদ্ধিজীবী আছে, এরা করে কি, বলবে ফকির লালন বা জালালউদ্দিন খাঁ হলেন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কবি! শামসুর রাহমান বা এই টাইপের আধুনিকরা বাজে কবি। এই ডিভিশনটা একটা মূর্খতা থেকে তৈরি হইছে। এই ডিভিশন করে কিন্তু এরা সেকুলার-ফাঁদেই পরে যায়। কারণ ভালো কবি-খারাপ কবি বলে কোন বিষয় নাই। এভাবে কবিতার আলোচনা হয় না। সমাজ বা শ্রেণি দিয়েও না। কারণ কবির প্রক্রিয়াটা একদম ভিন্ন। হাইদেগার বলতেছে, poets demand of us another kind of thinking—less exact but no less strict.

 রাহমান যে সত্যের উপাসনা করে জালাল বা লালন তা করে না। দুইজনের এই ভিন্নতার মধ্যে ঝগড়া আবিষ্কার করা অশিক্ষিতদের কাছে বড় প্রতিভার কাজ

কবির চিন্তা প্রক্রিয়া দার্শনিকের মতো না। মেথডলজিক্যাল না। তাই বলে এটা যা—তাও না। সে তার মতো একটা নির্দিষ্ট চিন্তা করে বা চিন্তা হাজির হয়। এখন কবির এই প্রক্রিয়াকে আমলে না নিয়ে ফাও বিপ্লবীপনা দেখাইয়া বিভাজন করলে তো বিষয়টা হাস্যকর হয়। রাহমান যে সত্যের উপাসনা করে জালাল বা লালন তা করে না। দুইজনের এই ভিন্নতার মধ্যে ঝগড়া আবিষ্কার করা অশিক্ষিতদের কাছে বড় প্রতিভার কাজ। কিন্তু কবিতার প্রক্রিয়া যারা জানেন-বোঝেন তাদের কাছে দুইয়ে কোন বিভেদ নাই। দুইজনের প্যারাডাইম ভিন্ন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সেকুলারাইজড কালচারাল ইন্ডাসট্রিতে আপনি দুটারেই পাবেন। জালাল বা লালন ‘সেকুলার’ হয়ে হাজির হচ্ছে। আর রাহমানরা তো সেকুলার হওয়াকেই নিজের জীবনের জেহাদ মনে করে নিছেন। তাইলে কবির যে ভিতরগত লড়াই তা কিন্তু আপনি বাইরে থেকে প্রভাবিত করতে পারছেন না। আপনি বিকৃত করলেও জালাল জালাল আর রাহমান রাহমান। দেরিদা না বললেও আমি মনে করি কবিতা নিজেই নিজের ডিকনসট্রাক করে। নিজের এসেন্সকে নিজেই ধরে রাখতে জানে। তারপরেও লালনে বা জালালে ‘ইডেজিনাস’ ক্যাপাসিটি খুঁজে বামপন্থা ফলানোর কাজকে কবিতার জন্য জরুরি মনে করি না। আর এই অরগানিক খোঁজার তরিকাটাও পোস্টমর্ডান। সো এইসব ফাও পণ্ডিত থেকে সাবধানে থাকা দরকার। এরা আমাদের চিন্তাশীলতা নামে চিন্তা বিনাশী প্রবণতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। শাসকরা যেমন গণতন্ত্রের নামে গণবিনাশী। মজার ব্যাপার হলো এরা হাইদেগারের নামেও এইসব কথা বলবে…! এদের আচরণের ফ্যাসিবাদ আপনাকে পঙ্গু করে দিতে সক্ষম। আমাদের ভাবতে হবে কবিতার আলোচনা কিভাবে সম্ভব এই গোড়ার প্রশ্নটা নিয়ে।

ফলে আপনি এদের একটাকে এসেনশিয়ালাইজ করতে পলিটিসাইজ করলে এটা কবিতার আলোচনার কোন কাজে আসে না। খুব উত্তেজনা হয়। এটা একটা বামপন্থী ব্যবহারবাদী অপকৌশল। এর মধ্যে বিন্দুমাত্র চিন্তাশীলতার লক্ষণ নাই। কিন্তু খুব বিপ্লবী ভাবের কারণে পাবলিক তালিও দেয়, বাট এটা আমাদেরকে কবির ‘করণ’প্রক্রিয়া বুঝতে সাহায্য করে না। অন্যদিকে ভাষাকে জিমনেশিয়ামের মতো জোরজবরদস্তি করে ব্যবহার করলে, নিজের ইচ্ছামতো অর্থের ভার দিয়ে ছেড়ে দিলে এক ধরনের পারভারশন তৈরি হয়। এই পারভারশন তৈরিতে বামপন্থার অবদান অনেক। বাংলাদেশের লেখালেখি কেন যেন একটা বামপন্থী ব্যাপার হয়ে থেকে গেছে। অদ্ভূত!

 আনন্দের জন্য, আড্ডার জন্য লেখকদের এক সাথে থাকার পক্ষে আমি। কিন্তু কোন পিরালি চলবে না

লেখালেখিকে একটা বিশেষ কর্ম এবং কবি-লেখক বলে একটা হায়ারারকি ক্লেম করার যে হীনম্মন্যতা তা বাংলাদেশে মহামারীর আকার ধারণ করেছে। এর সাথে কিছু পত্রিকার বান্ধা লেখক ও শিশু বুদ্ধিজীবী পয়দা করার যে মিডিয়াবাজি জারি আছে তা আমাদের কালচারাল মূর্খতাকে জেনারেশন টু জেনারেশন কনটিনিউ করতেছে। সো  লেখালেখি কোনো বিশেষ কাজ নয়। এটা কোনো ক্ষমতামূলক কাজ বা জাতে ওঠার বিষয়ও নয়। এটা খুব স্বাভাবিক একটা প্রবণতা। এই জাতে ওঠার প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে কতো পোলাপান পাগল হয়, কতো মেয়ে ইজ্জত খোয়ায়, ভাবলেই দুঃখ হয়। কিন্তু বিষয়টার সাথে যার সম্পর্ক আছে তা হলো খেলা। ভয়াবহ নিরাসক্তির প্রতি গভীর অভিনিবেশের মধ্যে একটা বিউটি আছে। এই বিউটিটা আপনার তাবৎ নন্দন-শাসনকে হজম করে ফেলতে পারে। এটার সাথে যে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারে সে লিখবে। না পারলে লেখার দরকার নাই। কিন্তু কবি হবার জন্য, লেখক হবার জন্য নানান কূট-ক্যাচাল করে, নানান গ্রুপবাজি, দশকগিরি, তত্ত্ববাগিতা করে, খাদেম পুষে, শিষ্য পেলে অনুষ্ঠান করে, নিজেকে বা নিজেদের মামুদের কবি-লেখক বানাবার পাঁয়তারা উম্মাদের লক্ষণ। লেখালেখিকে অর্গানিক প্রক্রিয়ার মতো না করতে পারলে এটা একটা মানসিক অসুখে পরিণত হয়। যা-তা লিখে যাওযা, নিজেরে ক্লাসিক করার চেষ্টা করা একটা গূঢ় অসুখ। আনন্দের জন্য, আড্ডার জন্য লেখকদের এক সাথে থাকার পক্ষে আমি। কিন্তু কোন পিরালি চলবে না। দশক ও ছন্দ বা  এই টাইপের পরাধীন নন্দনতত্ত্বের সাইনবোর্ড অলাদের নিয়ে কৌতুক করতে অনেকেই নিশ্চয়ই মজা পায়।

 কিতাবপূজা একধরণের পৌত্তলিকতা। মূর্তি পূজার চেয়ে কম সেনসেটিভ না

নিজের পাঠকের জন্য আপনার পছন্দের কিছু বইয়ের নাম বলুন।

পড়াশোনার মতো বোরিং কাজ পাঠকের উপর চাপানো কোন মানে হয় না। বই পড়াটা আমার কাছে ‘যন্ত্র’ ব্যবহারের মতো। পড়ে ফেলে দেই। কোন কিছু মুখস্থ থাকে না, করিও না।  ৪/৫ বছর ধরে নানা কিছু আনলার্ন  করার চেষ্টা করছি।  ফলে আমি কোনভাবেই পড়ার নসিহত দেবো না। আনলার্ন করে অতি সহজ লাইনে ফিরে আসার লড়াই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প আমার। অতি নাপতামি করে, ইগোর প্যাঁচে পরে, বাজারের ভেলকিতে পড়ে, অমুক তত্ত্বগুরুর ফাঁপড়ে পরে যে সহজ ভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে পারার মতো ইনোসেন্সি হারাইছে তাঁর মতো দুর্ভাগা আর কে আছে! তার জন্য আমাদের শোক করা উচিত। এই জন্য কবি হলেন, এলভেটর অব লাইফ। অতি পণ্ডিতরা বা বাস্তবের চাপে চেপটা মুমূর্ষু কবিতা রচায় প্রশান্তি পায়। কবি যদি ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে এই প্রশান্তিকে খুন করে তখন সেই কবির অবস্থা হয় বকধার্মিকের মতো। উপরে ফিটফাট ভিতরে সদর ঘাট। পাঠক এটা ধরে ফেলতে পারেন। তখন কবিতার বইটা দিয়ে খাটের পায়ার ঠেকনা ঠিক করে নেন।

বইপুস্তক অনেকে এটা আঁকড়ে ধরে বসে থাকেন। কিতাবপূজা একধরণের পৌত্তলিকতা। মূর্তি পূজার চেয়ে কম সেনসেটিভ না। এটা করলে আপনি ধর্মপূজারী হতে পারেন। পণ্ডিত হতে পারেন কিন্তু নিজেই ধর্ম বা অভিনিবেশের আধার হতে পারবেন না।

 বই পইড়া আপনি শিক্ষিত হবেন এমন কোন গ্যারান্টি নাই। আপনি মূর্খও হতে পারেন। অক্ষর জ্ঞান ভয়াবহ

পাঠের সময় আসলে ঘটনাটা কী ঘটে তা গুরুত্বপূর্ণ। একটা অদ্ভূত মোমেনটাম তৈরি হয়। দেরিদা এগুলা আরও ভাল বলেন। যা হোক এই মোমেনটাম তৈরির কোন ব্যাকরণ নাই। একমাত্র  ব্যাকরণ হলো, আপনি যদি জীবিত হন এবং যদি কানা না হন (এখন মনে হয় অন্ধরাও পড়েন বিকল্প পদ্ধতিতে) তাইলে আপনি পড়তে পারবেন। মৃত মানুষ পড়তে পারে না। সো ফাইন হইল ব্যাসিক রিডিং সোর্স । কথাটাকে এবার আপনি যে ভাবে ব্যবহার করেন। আর বাংলাদেশে ‘বইপড়া’ তো রীতিমতো আতঙ্কের ব্যাপার। গরিবের পোলা এমএ পাশ করলে যে ‘গরম’ তৈরি হয় চারপাশে তা দেখলে লেখাপড়া না করার যে সহজ আনন্দ তা রক্ষা করার জন্য সংগ্রাম করা দরকারের কথা মনে হয় আমার। বই পইড়া আপনি শিক্ষিত হবেন এমন কোনো গ্যারান্টি নাই। আপনি মূর্খও হতে পারেন। অক্ষরজ্ঞান ভয়াবহ। চিহ্ন না বুঝে হরফ ধরে জ্ঞান দখল করার প্রতিযোগিতার ফলে বৈষম্য তৈরি হয়। এইসব বিষয় মনে রেখে লেখাপড়ার প্রতি আমার কোন পিরিত নাই।

 শিক্ষা হইল এমন জিনিস যে প্রক্রিয়ায়, সবগুলা গাধা ছেড়ে দিলে একটা ফার্স্ট হয়

আমি নিজের জন্য ফ্রি স্টাইলে পড়ি। জোকস থেকে শুরু করে রান্নার বই, ক্যালকুলাস থেকে জ্যামিতি, দর্শন নানান বই পড়ি। তবে বই থেকে সাধারণ তো ডাইরেক্ট কোন শিক্ষা নিই না। আমার শিক্ষার ভীতি আছে। আমার ওস্তাদ নাসিম লস্কর কইছে, ‘শিক্ষা হইল এমন জিনিস যে প্রক্রিয়ায়, সবগুলা গাধা ছেড়ে দিলে একটা ফার্স্ট হয়’। পড়াশোনার ব্যবস্থাপনাটাই একটা বিকার তৈরি করে। তাই দুর্দান্ত তথাকথিত ‘ভাল’ ছাত্র হয়েও আমি এডুকেশনফোবিক। পাঠকে আমার কিছু বলার নাই। শুধু বলি এতক্ষণ কষ্ট করে আমার বকবক পড়ছেন তাই ক্ষমা চাই। খুশি হবো পড়াটা ভুলে ইশারাটা বুঝে নিয়ে নিজের সাথে নিজের মোকাবেলায় গেলে। এই নিজ মানে পরস্পরের মধ্যের কমন ‘আমি’। একটা গাছের পাতাকে পড়তে পারলে জীবন ধন্য হইত। আফসোস। ধন্যবাদ।

রেজাউল করিম রনি

রেজাউল করিম রনি

সাংবাদিক, সহকারী সম্পাদক at নিউ এজ
জন্ম : ২০ জুলাই, ১৯৮৮, মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ। কবি। তবে বিশেষ ঝোঁক তার সাহিত্য, রাজনীতি ও দর্শন নিয়ে বিশ্লেষণী লেখার প্রতি।

প্রকাশিত কবিতার বই : ‌‘গোলাপসন্ত্রাস’, ‘দাউ দাউ সুখ’। গদ্য: ‘শহীদুল জহিরের শেষ সংলাপ ও অন্যান্য বিবেচনা’।

ই-মেইল : rkrony@live.com
রেজাউল করিম রনি