হোম নির্বাচিত কবিকহন : দোলনচাঁপা চক্রবর্তী

কবিকহন : দোলনচাঁপা চক্রবর্তী

কবিকহন : দোলনচাঁপা চক্রবর্তী
438
0
1610867_10152715544179296_486595380770565595_n
দোলনচাঁপা চক্রবর্তী

 আপনি কবি, সেটা সাধারণ পাঠক বলবে, আপনি নিজে বলবেন না

স্বকীয়তা আর স্বতঃস্ফূর্ততার মধ্যে কোনটি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ? এ দুয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে কি?

স্বকীয়তা এবং স্বতঃস্ফূর্ততার মধ্যে পার্থক্য অবশ্যই আছে। আমার কাছে স্বকীয়তা অধিক গুরুত্বপূর্ণও। কিন্তু একইসঙ্গে এ কথাও মনে করি যে, কবিতায় স্বকীয়তাকে ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে স্বতঃস্ফূর্ততাকে ভুলে যাওয়া চলবে না। কারণ, নির্মিত লেখা পড়তে গেলে স্বতঃস্ফূর্ততার অভাব প্রকাশ পায়। সেই কবির কাছে পাঠক দ্বিতীয়বার ফিরে যাবে না। আপনি এই ফিরে না আসাকে উপেক্ষা করতে পারেন। কিন্তু তার মধ্যে একটা দম্ভ আছে। আপনি ‘কবি’– আপনার চেতনার এই দম্ভ আপনার কবিতাকে ধ্বংস করবে। আপনি কবি, সেটা সাধারণ পাঠক বলবে, আপনি নিজে বলবেন না। এই যে সাধারণ পাঠক বললাম–এই সাধারণ শব্দে একটা দম্ভ প্রকট হল। আসলে কিন্তু সাধারণের মধ্যেই প্রকৃত লুকিয়ে থাকে। প্রকৃত পাঠকদের মধ্যেও নানারকম ভাগ আছে তো। সেকারণেই, কবি পাঠকের কথা ভেবে লিখবেন না ঠিকই, কারণ তাতে কবির স্বতঃস্ফূর্ততার অভাব ঘটবে। তবে একইসাথে এটা মনে রাখাও প্রয়োজন যে পাঠককে তৈরি করে নিতে হয়। আর কেবলমাত্র লেখার মাধ্যমেই সেটা সম্ভব। লেখার মধ্যে স্বকীয়তা না থাকলে আপনার কবিতার কাছে ফিরে ফিরে আসার কোন কারণ নেই। একজন প্রকৃত পাঠক একজন প্রকৃত কবিকে খোঁজেন। এই খোঁজ স্বকীয়তা ও স্বতঃস্ফূর্ততার সমন্বয়সাধনের মাধ্যমেই সফল হবে।

 কোনও একটা ছন্দ কবির নিজের ভাল না লাগলেও তাকে বাতিল না করে তাকে আরও কতভাবে ব্যবহার করে মনের মতো কবিতা লেখা যায়, সেই চেষ্টা করতে করতে আসলে লেখার মান উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে

কবিতার কথা উঠলেই দুটো প্রসঙ্গ চলে আসে—ছন্দ এবং দশক। দুটো বিষয় নিয়ে আপনার কী পর্যবেক্ষণ?

প্রচলিত, চেনা ছন্দে লেখা কবিতার একটা মজা হল, মানুষ তার সাথে খুব সহজে নিজের অনুভূতিকে মিশিয়ে ফেলতে পারে। আমার নিজেরই তো খুব সহজ ছন্দে লেখা এমন কবিতা যা আমি প্রায় পঁচিশ বছর আগে পড়েছি–মনে আছে, এবং এখনও তা মনে পড়লে আমার একইরকম আনন্দ হয়। ফলে তাকে অবজ্ঞা করি কি করে! তবে একটা কথা মনে হয় যে, ছন্দ নিয়ে নানা ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষা করলে কবি হিসেবে একজনের যাত্রাপথ সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। ফলে কোনও একটা ছন্দ কবির নিজের ভাল না লাগলেও তাকে বাতিল না করে তাকে আরও কতভাবে ব্যবহার করে মনের মতো কবিতা লেখা যায়, সেই চেষ্টা করতে করতে আসলে লেখার মান উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। নইলে নকলনবিশী হয়ে যায়। অগ্রজ কারুর কথা বাদই দিলাম। নিজের নকলনবিশীও একজন কবির করে চলা উচিত নয়। নিজেকে ভেঙেগড়ে নিতে হয় বারংবার। বহু বার।

 এখন অনেক কবিই রাজনীতিকে এড়িয়ে চলেন। কিন্তু সেই এড়িয়ে চলার পরিস্থিতি আর আছে বলে আমি মনে করি না

দশক প্রসঙ্গে বলি–দশক গুরুত্বপূর্ণ। দশক ভিত্তিক কবিতা আন্দোলন, কোন কবি কোন দশকের, সেই দশকের সেই কবির উল্লেখযোগ্য কাজ কি–এইসব আমরা সাধারণত মনে রাখি।10966730_797425820347741_151852746_n

তাছাড়া, প্রতিটি দশকেই কিছু এমন উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে যায় যা আমাদের কোনোভাবে প্রভাবিত করে। বিশেষ করে রাজনৈতিক ঘটনা। এখন অনেক কবিই রাজনীতিকে এড়িয়ে চলেন। কিন্তু সেই এড়িয়ে চলার পরিস্থিতি আর আছে বলে আমি মনে করি না। আমার বক্তব্য আছে। আর সেটা আমি বলব। কী ভাবে বলব–সেটাই আসল কথা। এই বক্তব্য তো একটু সমাজ সচেতন যে কোনও কবিরই থাকা উচিত বলে আমি মনে করি। এবং সেটা দশক নির্বিশেষে। কথাটা হল, বিষয়ের গুরুত্ব দশকভেদে আলাদা হয়ে যায়। যেমন, আমি এখন নকশাল আন্দোলন নিয়ে কবিতা লিখতে গেলে তা প্রাসঙ্গিক হবে না। আবার, ফেলানীকে নিয়ে আজ থেকে ৩০ বছর পরে কেউ কবিতা লিখলে তাও প্রাসঙ্গিক হবে না। বিষয়কবিতায় প্রাসঙ্গিকতা গুরুত্বপূর্ণ একটা ভূমিকা নেয়। সুতরাং, দশকের ছাপ নিজের থেকেই লেখায় ফুটে ওঠে। সেটাকে জোর করে অবজ্ঞা করার কোনও কারণ দেখি না।

কবিতার বিষয়হীনতার ক্ষেত্রেও এই দশকচারিতা অন্যভাবে ছাপ ফেলবে বলে মনে করি। কেননা, বিষয়হীনের লিরিক্যাল, ধ্বনিসম্পৃক্ত হওয়ার একটা প্রবণতা দেখি। ধ্বনিচয়ন দশকভেদে আলাদা হতে পারে। তবে ধ্বনি তো অসীম আলোর সন্ধানী। যদিও তার উৎপত্তি একই, গন্তব্য ও যাত্রাপথ তো এক হবে না কখনও।

নিজের পাঠকের জন্য আপনার পছন্দের কিছু বইয়ের নাম বলুন।

আমার প্রিয় বইয়ের বেশির ভাগই উপন্যাস অথবা নাটক। বরং বলি যে ‘প্যারাডাইস লস্ট’ পড়ে প্রথমবার শিহরিত হয়েছিলাম। পূর্ণ চাঁদের জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া তাজমহলের অন্ধকার ছাতে বসে থাকার অনুভূতির সমান—! সেই ঐতিহাসিক অনুভূতিতে আনন্দ জানিয়ে এই নামটাই শুধু রাখি।♣

পেশা : Internet Assessor, Editor
সম্পাদনা : www.bookpocket.net
Email : koiiry@gmail.com