হোম সাক্ষাৎকার একান্ত আলাপচারিতায় প্রফেসর ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

একান্ত আলাপচারিতায় প্রফেসর ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

একান্ত আলাপচারিতায় প্রফেসর ড. রাহমান নাসির উদ্দিন
1.02K
0

সা ক্ষা কা


চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকতা করেন ড. রাহমান নাসির উদ্দিন। পড়া এবং পড়ানো তার পেশা এবং নেশা। সমাজ, সংস্কৃতি, রাষ্ট্র ও রাজনীতির গড়ন, আচরণ, মিথস্ক্রিয়া এবং বিকাশ বিষয়ে পঠন-পাঠন, চিন্তা-ভাবনা ও লেখালেখি করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর করে উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্ন মানুষের প্রান্তিকীকরণ প্রক্রিয়া ও এর জাতীয়তাবাদী রাজনীতি নিয়ে জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করেছেন। উপনিবেশবাদ ও উত্তর-উপনিবেশবাদের মধ্যকার সম্পর্ক (মোহাব্বত ও মোকাবেলা) বিষয়ে ‘ব্রিটিশ একাডেমি  ফেলো’ হিশেবে যুক্তরাজ্যে পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণা করেছেন। তাছাড়া তিনি উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে ঔপনিবেশিকতার আছর এবং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ‘দিল্লী স্কুল অব ইকোনমিক্স’-এ গবেষণা ফেলো হিশেবে তাত্ত্বিক ও আর্কাইভাল গবেষণা করছেন। অতি সম্প্রতি ‘নব্য-উদারবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা ও রাষ্ট্র-সৃষ্ট প্রান্তের আন্তঃসম্পর্ক’ বিষয়ে হুমবোল্ড ভিজিটিং স্কলার হিশেবে জার্মানির একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর গবেষণা সম্পন্ন করেছেন। এ ফেলোশিপের আওতায় তিনি জার্মান ও ফরাসি সমাজচিন্তার ইতিহাস, বিকাশ ও বর্তমান অবস্থার ক্রিটিক্যাল ও র‌্যাডিকাল দিক নিয়ে গবেষণা করেন। পাশাপাশি ‘রাষ্ট্র-বিষয়ক নৃবিজ্ঞান’ বিষয়ে জার্মানির একটি বিশ্ববিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বখ্যাত ‘লন্ডন স্কুল অব ইকোনিক্স’-এর নৃবিজ্ঞান বিভাগে ‘ভিজিটিং ফেলো’ হিশেবে উত্তর-উপনিবেশিক রাষ্ট্রে আদিবাসী ইস্যু, রাষ্ট্র-নির্মাণ এবং প্রান্তিকীকরণের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে উচ্চতর গবেষণা করছেন। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং আত্মপরিচয়ের সংকট নিয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা করেছেন। রোহিঙ্গাদের নিয়ে তার অসংখ্য গবেষণা প্রবন্ধ, বই-অধ্যায় এবং সম্পাদিত গ্রন্থ রয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে কানাডা, জাপান, আমেরিকা, জার্মান এবং ভারতসহ বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত সেমিনার-কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করেছেন, এবং প্রবন্ধ পাঠ করছেন রোহিঙ্গা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ এবং গবেষক হিশেবে। রাষ্ট্রবিহীন এ জাতির উৎপত্তির ইতিহাস, সমস্যা চিহ্নায়ন ও সমাধান অনুসন্ধান, অতীত-বর্তমান পরিস্থিতি—সেই সাথে মায়ানমারের রাজনীতি এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিশেবে বাংলাদেশের নানা ভূমিকা এবং এর উপর রোহিঙ্গা ইস্যুর প্রভাব ইত্যাদি নিয়ে তার সাথে কথা বলেছেন সাংবাদিক রাফসান গালিব।


রাফসান গালিব

রোহিঙ্গাদের ইতিহাস নিয়ে নানা মতভেদ আমরা দেখতে পাই। আপনার কাছে জানতে চাচ্ছি, জাতিগতভাবে উৎপত্তি হিশেবে রোহিঙ্গা জাতিকে ইতিহাসের নিরিখে কিভাবে বিচার করব?

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

মানবজাতির ইতিহাস হচ্ছে মাইগ্রেশানের ইতিহাস। পৃথিবীর কোনো স্থানে হুট করে কোনো মানুষ আসে নি। তবে রোহিঙ্গাদের হিস্ট্রিটা কিছুটা প্রবলেমেটিক। কারণ অথেন্টিক কোনো  সোর্সে রোহিঙ্গাদের মাইগ্রেশানের হিস্ট্রির সেরকম কোনো রেকর্ড নাই। একটা জনপ্রিয় মিথ আছে যা দিয়ে আরাকান অঞ্চলে কবে প্রথম মুসলমানদের আগমন ঘটে, তার একটা ধারণা পাওয়া যায়। জনশ্রুতি আছে, ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা:)-এর পুত্র হযরত মুহম্মদ বিন হানাফি কারবালার যুদ্ধের পর তার সৈন্য বাহিনী নিয়ে উত্তর আরাকানের, আজকে যেটা মংগদু নামে পরিচিত, আরব-শাহ পাড়ায় পৌঁছান। ধারণা করা হয়, তখন থেকেই আরাকানে মুসলমানদের আগমন ঘটে। এতদঞ্চলের বিখ্যাত গীতিকবি শাহ বরিদ খানের পুঁথিতে এর একটা আখ্যান পাওয়া যায়। যদিও এর কোনো একাডেমিক অথেনটিসিটি নাই। তবে হিস্ট্রি অব মিয়ানমার নামক বইয়ে এ পি ফেইরি নামক এক হিস্টোরিয়ান এই আরাকান অঞ্চলে বুড্ডিস্ট রিজিউনাল ডোমিনেন্টের ভিতরে কিভাবে মুসলমানদের উদয় হয়েছে সেটা দেখানোর চেষ্টা করেছেন। ধারণা করা হয় যে, পঞ্চাদশ শতকে পারস্য থেকে বিভিন্ন বনিক-ব্যবসায়ী, সুফি-দরবেশ-ধর্ম প্রচারকের আগমন এবং গ্রেটার চট্টগ্রামের (চট্টগ্রাম, নোয়াখালির কিছু অংশ এবং কুমিল্লার কিছু অংশ) কিছু মানুষের এ জায়গায় যাতায়াত ছিল যা বৃহত্তর আরাকন নামে পরিচিত ছিল। আপনি হয়তো জানেন,  চট্টগ্রামের কিছু মানুষ বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে রেংগুনে ইকোনোমিক মাইগ্রেনস হিশাবে যেত, অনেকে সেখানে আরাকানি মেয়েদের বিয়ে করে সংসার পাততো। এ নিয়ে প্রখ্যাত লোকশিল্পী ও সাধক আব্দুল গফুর হালীর একটা গানও আছে—‘ও শ্যাম, রেঙ্গুন ন যাইয়ো।’ তো এভাবে মূলত মাইগ্রেশানের কারণে পঞ্চদশ শতকের শেষদিকে ও ষোল শতকের শুরুর দিকে একটা মুসলিম কমিউনিটি সেখানে সেটেলড হয়। তবে, তারা বাঙালি এটা বলা যাবে না, বরঞ্চ রোহিঙ্গারা একটি স্বতন্ত্র জাতি যাদের সাথে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বাঙালিদের সাথে ভাষাগত কিছুটা সাযুজ্য রয়েছে এবং ধর্মগত মিল আছে। তবে, আরাকানে মুসলিমদের আধিপত্য সবসময় ছিল। সেসময় আরাকান রাজসভায় আলাওলের কথা আমরা শুনি। শুধু তিনি নয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদেও মুসলিমদের নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। এমনকি সেনাপতিদের বাবুর্চি আর দরবারের কিছু নর্তকীও ছিল মুসলিম।


ধর্মের চেয়েও রোহিঙ্গা ইস্যুটা জাতিগত সমস্যা।


রাফসান গালিব

কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমরা প্রায় সময় শুনে থাকি যে, ব্রিটিশ উপনিবেশের সময় সেখানকার কৃষিকাজসহ নানা কাজের জন্য শ্রমিক হিশেবে কিছু লোককে চট্টগ্রাম থেকে সেখানে নিয়ে আসেন। মায়ানমারও সেটা দাবি করে।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

এ ধরনের একটা জনশ্রুতি আছে। কিন্তু এটার অথেনটিক কোনো সূত্র নাই। তবে, আমার জানা মতে কোনো ব্রিটিশ প্রশাসক বাংলাদেশ (তৎকালীন বেঙ্গল) থেকে কোনো কারণে কোনো বাঙালিকে তৎকালীন বার্মায় নিয়ে যান নি। মায়ানমারে ১৩৫ টি জাতিগোষ্ঠী আছে। পূর্ব থেকেই এখনো এদের মেজরিটি ভাগ মানুষ কৃষিকাজ করে। সুতরাং শুধুমাত্র কৃষিকাজ বা যে কোনো কাজের জন্য একটা নির্দিষ্ট ধর্মে মানুষদের সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তা জাস্টিফাইড করা যাবে না। সে সময় সেখানে লেবার ফোর্সের তেমন কোনো অভাব ছিল না। মূলত ইকোনোমিক মাইগ্রেশনের কারণেই সেখানে রোহিঙ্গা জাতির উৎপত্তি হয়, সে সাথে সুফি মতবাদের কিছু পীর আউলিয়ারও প্রভাব আছে এতে। বলে রাখি, ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটা এসেছে ‘রোহাং’ শব্দ থেকে। আর আরাকানের আদি নাম ছিল রোহাং। এরা যেহেতু রোহাং অঞ্চলে বসবাস করত তাই তাদের রোহিঙ্গা বলা হয়। যারা ছিল আসলে ল্যাঙ্গুইস্টিক ও রিলেজিয়াস মাইনোরিটি, যেহেতু তারা সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী থেকে ভিন্ন এবং ভাষাগতভাবে ভিন্ন, মানে চট্টগ্রামের স্থানীয় ভাষার প্রভাবিত ছিল। এ রকম একটা স্টাডি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যায়ের ইতিহাসের অধ্যাপক মুহিবুল্লাহ সিদ্দিকী’র কাছ থেকে আমরা পাই।

রাফসান গালিব

দেশভাগের কিছু ইতিহাসে দেখা যায়, ব্রিটিশরা এ অঞ্চল ছেড়ে চলে যাওয়ার সময়, জিন্নাহ্‌ ও অং সান এর মধ্যে এক ধরনের সমঝোতা হয়, যার ফলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং চট্টগ্রামের মতো ভূ-প্রকৃতি ও সংস্কৃতি হওয়া সত্ত্বেও আরাকান অঞ্চল তৎকালীন বার্মার অন্তর্ভুক্ত হয়। এ সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি ।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

এ ধরনের কিছু বিতর্ক আছে। ব্রিটিশদের কাছ থেকে ভারতবর্ষ স্বাধীন হয় ১৯৪৭ সালে এবং দু’টি দেশ সৃষ্টি হয়। কিন্তু তৎকালীন বার্মা স্বাধীন হয় ৪৮ সালে। দেশভাগের সময় ভারতবর্ষের সীমানা নির্ধারণ আর বার্মার সীমানা নির্ধারণ নিয়েই ব্রিটিশরাই ডিটারমাইন্ড ছিল, এখানে আসলে মুসলীম লীগ, কংগ্রেস বা বার্মার লীডারশীপের কোনো ভূমিকা ছিল না। এ অঞ্চলের সীমানা নির্ধারণ নিয়ে যা হয়েছে, তা ব্রিটিশরাই করে গিয়েছে।

রাফসান গালিব

মায়ানমারের রাজনীতি, অর্থনীতি বা সামাজিক ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের অংশগ্রহণ বেশ ঐতিহ্যপূর্ণ। এখানকার অনেকেই তো এক সময়ে জাতীয় ইলেকশানে জিতে পার্লামেন্টে ভূমিকা রেখেছেন, কেউ কেউ মিনিস্ট্রির গুরুত্বপূর্ণ পদেও ছিলেন। তো এখন যে নির্দিষ্ট আইন দেখিয়ে তাদের নাগরিক হিশেবে অস্বীকার করা হচ্ছে, সেটিই কি এর কারণ নাকি অন্য কোনো কারণও আছে?

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

একটা কারণ তো আছেই। ব্যাকগ্রাউন্ড কিছুটা বলি। নেও উইনের সময় মানে ১৯৬২ সালে সে যখন ক্ষমতায় আসে একটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সূত্রপাত হয় এবং সে কারণে পরবর্তীতে রোহিঙ্গাদের মায়ানমার থেকে বের করে দেয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় পলিসিও যুক্ত হয়। ১৯৭৮ সালে এসে সেটা আরো প্রকট আকার ধারণ করে। যেটাকে আমরা ‘অপারেশান ড্রাগন’ হিশেবে জানি। এ কুখ্যাত অপারেশানের মাধ্যমে সেখানে একটা বিগ কিলিং করা হয়, রোহিঙ্গাদের সেখান থেকে পুরোপুরি বের করে দেয়ার প্রক্রিয়া সে সময় থেকে শুরু হয়েছিল। এ নিয়ে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাগুলো কথা বলতে শুরু করে তখন মায়ানমার সরকার বলেছিল যে, তারা আসলে রোহিঙ্গাদের নয় বরং অনুপ্রবেশকারীদের বের করে দিচ্ছে। এই কর্মকাণ্ডের পরও তারা সেখানে বসবাস করতে লাগল। কিন্তু ৮২ সালে এসে যখন বার্মিজ সিটিজেনশীপ ল করা হলো তখন সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও রোহিঙ্গাদের অস্বীকার করা হয়। এবং তখন থেকেই মূলত রোহিঙ্গারা কন্সটিটিউশনালি স্টেটলেস পিপল হয়ে যায়। তার মানে তারা রাষ্ট্রবিহীন মানুষ হয়ে কোনো রাষ্ট্রের নাগরিক হিশেবে নিজেদের দাবি করতে পারে না। সংবিধানের বলে আরাকান আর আরাকান থাকে না, এটা হয়ে যায় রাখাইন স্টেট। এ নাগরিকত্ব আইন বলে, রোহিঙ্গারা এখন আর মায়ানমারের নাগরিক না। ২০১২ সালে কানাডাতে সারা পৃথিবীর স্টেটলেস মানুষদের নিয়ে আমরা একটা ওয়ার্কশপ করে সিদ্ধান্তে উপনিত হই যে, সারা পৃথিবীতে রাষ্ট্রবিহীন মানুষের সংখ্যা ১২ কোটি। সেখানেও রোহিঙ্গাদের ইস্যুটাকে সবচেয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

রাফসান গালিব

নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলিম বলে তাদের প্রতি আমাদের দেশের সাধারণ মুসলমানদের এক ধরনের আবেগ-সহানুভুতি কাজ করে। তারা মনে করে শুধু মুসলমান হওয়ার কারণে তাদের সেখান থেকে বের করে দেয়া হচ্ছে। জানতে চাচ্ছি, বিষয়টা কি এরকম ধর্মীয় কারণে নাকি মূলত জাতিগত দ্বন্দ্বের ফলে সৃষ্ট ?

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

পৃথিবীর কোনো দ্বন্দ্ব আসলে ধর্মকে প্রাধান্য রেখে হয় না—ধর্ম বিষয়টা ইউজ করা হয়। যদিও এখানে ধর্ম বিষয়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তবে আমি বলব ধর্মের চেয়েও রোহিঙ্গা ইস্যুটা জাতিগত সমস্যা। তবে, এখন রোহিঙ্গা ইস্যুটাকে যেদিকে নিয়ে গেছে মায়ানমার, রোহিঙ্গাদের উপর যেভাবে অত্যাচার চালানো হচ্ছে তাকে আর জাতিগত সংঘাতও বলা যাবে না। এটা হচ্ছে একটা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এবং রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় সেখানে যা হচ্ছে, তা একটা পরিষ্কার ‘জেনোসাইড’। এটাকে মেনে নিয়েই এর সমাধানে আসতে হবে। সংবিধানিকভাবেই রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রহীন করে ফেলা হয়েছে, তাদেরকে নাগরিক বলে অস্বীকার করা হয়, বলা হলো তারা অনুপ্রবেশকারী। এখান থেকেই তো মূল সমস্যার সৃষ্টি। তো সেই জাতিগত দাঙ্গাটাই আরো বেশি জ্বলে উঠেছে ধর্মীয় অনুভূতি সংযুক্ত হওয়ার ফলে। আর আপনি যেটা বললেন, বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা যখন বলে যে, বুড্ডিস্টরা (রোহিঙ্গাদের ভাষায় মগরা) মায়ানমার থেকে তাদেরকে মেরে বের করে দিচ্ছে তখন এখানকার মানুষদের মধ্যে তাদের ব্যাপারে একটা সহানুভূতি ক্রিয়েট হয়, আবার এখানে রোহিঙ্গা ইস্যুটা মিডিয়া মাধ্যমগুলোতে কিভাবে প্রেজেন্টাশান করা হয় সেটাও একটা ব্যাপার। আপনি হয়তো জানেন যে, রোহিঙ্গারা পড়ালেখা বা চিন্তাগত বা জ্ঞানবৃত্তিক জায়গায় তেমন একটা এনলাইটমেন্টে না। ফলে তাদের মধ্যে জাতিগত দাঙ্গার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় ধর্ম বিষয়টা। তাদের এ বিষয়টা এখানে বেশ গুরুত্বপূর্ণ, তার কারণ হচ্ছে ‘ইসলাম’। এখানকার রাজনীতিতে ইসলাম হচ্ছে একটা এজেন্ডা। যার কারণে এখানে রোহিঙ্গাদের ইস্যুতে ধর্মীয় ব্যাপারটাকে বড় করে দেখা হয়। কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুটাকে বুঝতে হলে, মায়ানমারের ভূমিকাকে একটা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস হিশেবে দেখতে হবে।

21733198_1437651356318997_1445726410_n
রাফসান গালিব ও প্রফেসর ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

রাফসান গালিব

মাঝেমধ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে দেখা যায়, রোহিঙ্গাদের কিছু গোষ্ঠী আরাকান অঞ্চলে নতুন একটা রাষ্ট্র গঠন করার পরিকল্পনা করছে, সেখানে চট্টগ্রামের কিছু জায়গার কথাও বলা হয়। পত্রপত্রিকায় তাদের কিছু সশস্ত্র মুভমেন্টের কথাও আমরা জেনে থাকি। তাদের এ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন আসলেই সম্ভব কি না?

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

আপনি আরএসও’র কথা বলছেন—‘রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন’ যা এখন বিলুপ্ত। ২০১২/১৩ সাল থেকে আরসা বা আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি যারা ২০১৬ সালের অক্টোবরে এবং ২০১৭ সালে আগস্টে সীমান্তচৌকি এবং পুলিশফাঁড়িতে হামলা করে বিখ্যাত হয়েছে। এটা ইতিহাসের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে দেখতে হবে। মায়ানমার তাদের নাগরিক হিশেবে স্বীকার করে না, বাংলাদেশও তাদের আশ্রয় দিতে চায় না, এ জন্য স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গঠন করার যে তৎপরতার কথা আপনারা বলছেন,  তার কারণ আসলে ভিন্ন। মূলত তারা মায়ানমারের নাগরিকত্ব চায়। তবে চোখের সামনে নিজের আত্মীয়-পরিজন, পাড়া-প্রতিবেশীকে নির্বিচারে হত্যার অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে যে ক্ষোভ এবং বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছে, তারই একটি সংঘটিত রূপ হচ্ছে এসব সংগঠন। হতে পারে, তাদের কিছু কর্মকাণ্ডকে আপনি সমর্থন করেন না কিন্তু তারা কেন এরকম একটা পথ বেছে নিয়েছে, সেটাও বিবেচনায় নিতে হবে। এখনও সেখানে প্রায় আট/দশ লাখ রোহিঙ্গা মায়ানমারে আছে। আপনি নিশ্চয় দেখেছেন, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা গ্রামগুলো কী ভয়াবহ অবস্থা, পুরো গ্রাম কর্ডন করে জ্বালিয়ে দেয়া হয়ছে। দশকের পর দশক ধরে হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে। সেখান থেকে যারা পালিয়ে বাঁচতে পেরেছে তারাই মূলত এসব সংগঠনে যোগ দেয়। এদের তৎপরতা আসলে বাংলাদেশ থেকে এক টুকরো, মায়ানমার থেকে এক টুকরো নিয়ে আলাদা একটা রাষ্ট্র গঠন করা নয়। এ ধরনের সশস্ত্র আন্দোলন দিয়ে আসলে তারা মায়ানমার সরকারকে একটা চাপ সৃষ্টি করতে চায়। এ জন্য যে, তাদের নাগরিক হিশেবে স্বীকার করে নেয়া হোক, তাদের বেঁচে থাকার অধিকার ফিরিয়ে দেয়া হোক। তাদেরকে সন্ত্রাসী সংগঠন বলা হচ্ছে মায়ানমারের রাষ্ট্রীয় ডিসকোর্স। আমরা সেটা আনক্রিটিক্র্যালি নিতে পারি না।


আপনি রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে কিংবা রাষ্ট্রের ভরণ-পোষণের সামর্থ্যের প্রশ্ন তুলে মানুষগুলোকে বাঁচতে দিবেন না, এটা তো মানবিকতা হতে পারে না।


রাফসান গালিব

আনান কমিশন যখন রাখাইন রাজ্যে স্থিতিশীল পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা নিয়ে মায়ানমারকে চাপ প্রয়োগ করছিল তখনই আরসা ক্রাকডাউন করল, যার ফলে সেনাবাহিনীর অভিযান। আরসার এ ক্র্যাকডাউন রোহিঙ্গাদের জন্য আত্মঘাতী হয়ে গেল না? আরসা কেন এ কাজটি করতে গেল, কী মনে করেন?

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

আপনার সাথে দ্বিমত করি না, তবে পুরোপুরি একমতও না। এটা সত্য যে, আরসা যে কাজটা করেছে, সেটা বেশ অপরিপক্ব এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ যা আমি আমার পত্রিকান্তরে প্রকাশিত নানান লেখায় লিখেছি। কিন্তু কফি আনান কমিশনের ফাইনাল রিপোর্টের দিনই কেন ঘটনাটা ঘটল এবং তাকে উসিলা হিশেবে ব্যবহার করে সিভিলিয়ান রোহিঙ্গাদের হত্যা এবং নির্যাতন করে দেশ ছাড়া করার একটা উপলক্ষ তৈরি হলো, সেটাও নানান প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কেউ যদি এভাবে একটা যুক্তি দাঁড় করায় যে, পুরো ঘটনাটাই এমন করে সাজানো হয়েছে যাতে করে এক দিকে কফি আনান কমিশিনের রিপোর্টটাকে প্রত্যাখ্যান করার একটা উপলক্ষ তৈরি করা হলো, অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন করে আরো কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে দেশ থেকে বিতাড়িত করা জন্য এ ঘটনা সাজানো হলো, তখন আপনি তাকে একোবারেই ফেলে দিতে পারবেন না। আমরা বিষয়টা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছি এবং কিছু তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করার চেষ্টা করছি।

রাফসান গালিব

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক রিফিউজি সনদে সিগনেচারিয়েট কান্ট্রি না হয়েও বিপুল সংখ্যাক রোহিঙ্গা রিফিউজিকে এখানে আশ্রয় দিয়েছে, অথচ বাংলাদেশ এদের রাখতে আইনত বাধ্য নয়। তারপরও কোন পরিস্থিতিতে এরা এ দেশে আছে?

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

১৯৭৮ সালে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা যখন প্রথম আসে তখন তারা দলে দলে বর্ডার ক্রস করার সময় বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী তাদের প্রবেশে বাঁধা দেয়। কিন্তু মানুষগুলো যাবে কোথায়? ওদিকে ম্যাসাকার কিলিং হচ্ছে, সুতরাং তারা তো তাদের সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশী দেশে ঢুকতে চাইবেই। তো বাংলাদেশ যখন তাদের ঢুকতে দিচ্ছে না তখন ইউএনএইচসিআর’র হস্তক্ষেপে এবং তাদের উদ্যোগে একটা তিন পক্ষীয় এগ্রিম্যান্ট হয়। বাংলাদেশ, মায়ানমার আর ইউএনএইচসিআর’র মধ্যে। সেই এগ্রিমেন্টের ভিত্তিতে রোহিঙ্গাদের এখানে সাময়িকভাবে থাকার ব্যবস্থা করা হয় এই শর্তে যে, পরবর্তীতে মায়ানমার তাদেরকে ফেরত নিবে। তো বাংলাদেশ মানবিক বিবেচনা করে সে সময় প্রথম রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ চারটি মন্ত্রণালয় যুক্ত হয়ে সে সময় বিশটি ক্যাম্প নির্মাণ করে, এখন তো আছে মাত্র দুইটা আর জাতিসংঘ তাদের ভরণপোষণ এর দায়িত্ব নেয়। যদিও বাংলাদেশ ১৯৫১ সালে আন্তর্জাতিক রিফিউজি কনভেনশনে সিগনেচারিয়েট কান্ট্রি ছিল না, তখন তো বাংলাদেশ নামের কোনো দেশের অস্তিত্বও ছিল না। সুতরাং বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে লিগ্যালি বাউন্ড না কিন্তু আবার যেসব ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস চার্টারে বাংলাদেশ সিগনেচার করে, সেখানে যে কজগুলো আছে তার ফ্রেমওয়ার্কে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে বাধ্য। তখন আর তাদের ইগনোর করার সুযোগ নাই। তো এভাবেই এখানে প্রথম রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সূত্রপাত। দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের মায়ানমারে ফেরত পাঠালেও তাদের অনেকেই কোনো না কোনোভাবে আবার ফেরত চলে আসে। কারণ ওখানে তো পরিস্থিতির উন্নতি হয় নি, সংঘাত চলতেই থাকে। এভাবেই কিছু যায়, কিছু আসে, কিছু থেকে যায়। ১৯৯২ সালে একটা হিউজ ইনফ্লাক্স হয় যার দুইটা ক্যাম্প এখনো বাকি আছে। ওদেরকে জায়গা দেয়া এবং পরবর্তীতে জোরপূর্বক পুশব্যাক করার চেষ্টাও করা হয় কিন্তু তাদের অনেকে আবার ইলিগ্যালি চলে এসেছে। এভাবে যখন চলতে থাকল ২০১২ সালে যখন সেখানে বিশাল একটা রায়ট হলো, তখন বাংলাদেশ তাদের আর ঢুকতে দেয় নি বরং খাবার-দাবার, নৌকার তেল দিয়ে নদীর দিকে ঠেলে দিয়েছে। তারপরও একটা বড় সংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে। সে সময় আমি বর্ডারে ফিল্ডওয়ার্কে ছিলাম। তাদের কী অমানবিক অবস্থা আমি দেখেছি। দলে দলে মানুষ হাত পা কাটাসহ নানাভাবে আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় বর্ডার ক্রস করার চেষ্টা করছে। খুবই ভয়াবহ দৃশ্য। ২০১৬ সালেও এটা বড় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, প্রায় ৮৭ হাজার, বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। এবারের অবস্থা আগের সব অবস্থাকে ছাড়িয়ে যায়। এবার এ পর্যন্ত প্রায় ৪ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। অত্যন্ত মানবিক কারণেই বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশে এ অবস্থানকে সমর্থন করছে।

রাফসান গালিব

গত কয়েক বছরে আরাকানে বিভিন্ন সহিংসতায় বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের ঢুকতে দেয় নি। সে সময় এ নিয়ে বেশ সমালোচনা হয়, বাংলাদেশ কেন তাদের ঢুকতে দেয় নি। তখনের  সে সিদ্ধান্ত কি সঠিক ছিল? আপনি কী মনে করেন?

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

রাষ্ট্র হিশেবে বাংলাদেশের এ সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। বাংলাদেশ এর আগে দুইবার তাদের আশ্রয় দিয়েছে। রেজিস্টার্ড রোহিঙ্গার তুলনায় আনরেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা এখানে অনেক বেশি। সে অবস্থায় আরো কয়েক লাখ মানুষের দায়িত্ব নতুন করে নেয়া বাংলাদেশের মতো ঘন জনবসতিপূর্ণ রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব কি না… সেটা তো ভাবা উচিত। টেকনাফ ও উখিয়া এমনিতেই রিসোর্স এলাকা, সেখানে তো এতগুলো মানুষের বোঝা নেয়া সম্ভব না। ইউএনএইচসিআর তাদের আশ্রয় দেয়ার কথা বলে কিন্তু ফেরত পাঠাতে তো বড় কোনো ভূমিকা নিতে তাদের দেখা যায় না। তো রাষ্ট্র হিশেবে এ সিদ্ধান্তটা সঠিক ছিল বাংলাদেশের। কিন্তু হিউম্যানিটেরিয়ান গ্রাউন্ডে যদি বলি তাহলে এ সিদ্ধান্তে প্রশ্ন আছে। যেখানে মানুষ নির্যাতিত হচ্ছে, নির্বিচারে খুন হচ্ছে সেখানে রাষ্ট্রের ক্ষতির বিবেচনায় তাদের বাঁচার অধিকারটা কি আমরা দেবো না? মানুষের অধিকারই যদি  রক্ষা করতে না পারলাম তবে রাষ্ট্র দিয়ে কী হবে। তাই, বর্তমানে বাংলাদেশ যে অবস্থান নিয়েছে আমরা তাকে সাধুবাদ জানাই। বলে রাখি, ২০১২ সালে জুনের ৩ তারিখ সম্ভবত সেখানে রায়টটা লাগে, ঐ জুনেই অং সান সুচিকে নরওয়েতে নোবেল শান্তি পুরস্কার তুলে দেয়া হয়। অ্যাওয়ার্ডেড হয়েছিলেন আগেই, গৃহবন্দি থেকে মুক্তি পাওয়ার পরে তাকে সেটা হস্তান্তর করা হয়। সে সময় সাংবাদিকরা তাকে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে জিজ্ঞাসা করে। তখন তিনি বলেছিলেন—‘আমাকে বিষয়টা বিস্তারিত জানতে হবে’। তিনি আসলে বিশাল বুড্ডিস্ট কমিউনিটির সমর্থন হারাতে চান না বলেই এ ধরনের মন্তব্য করেছেন। ২০১২ সালের নভেম্বরে কানাডার সেই ওয়ার্কশপে আমরা এর সমালোচনাও করেছি। মানবিকবোধের জায়গা থেকেই তো একটা বাচ্চা যখন পাইপের মধ্যে আটকে গিয়েছিল পুরো রাষ্ট্র তখন তাকে বাঁচাতে এক জায়গায় চলে এসেছিল। তো এদিক থেকে চিন্তা করলে আমি বলব, তাদেরকে ২০১২ সালে আশ্রয় না দেয়ার সিদ্ধান্তটা সঠিক ছিল না। আপনি রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে কিংবা রাষ্ট্রের ভরণ-পোষণের সামর্থ্যের প্রশ্ন তুলে মানুষগুলোকে বাঁচতে দিবেন না, এটা তো মানবিকতা হতে পারে না।

রাফসান গালিব

কিন্তু এ বছরের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার শুরু থেকেই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দানে সহানুভূতিশীল। শুরুতে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে কোনো ধরনের বক্তব্য না পাওয়া গেলেও রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশে তেমন বাধা দেয়া হয় নি। পরবর্তীতে তো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখানে গেলেনই। গত কয়েক বছরের বিবেচনায় সরকারের এই যে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনকে কিভাবে দেখছেন?

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

আমি আগেই বলেছি, মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে এবারের ঘটনার নিষ্ঠুরতা আগের সবগুলো ঘটনাকে ছাড়িয়ে গেছে। হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, অমানবকি নির্যাতন এবং নিষ্ঠুর অত্যাচার থেকে বাঁচতে এসব রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসা ছাড়া আর কোনো পথ নাই। তাই, দলে দলে লোক নিজের ‘জান’টা হাতে নিয়ে কোনো রকমে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এ অবস্থায় আপনি তাদেরকে আশ্রয় না-দিয়ে কী করতে পারেন? মানুষ হিশেবে মানবতার ডাকে আপনাকে সাড়া দিতেই হবে। বাংলাদেশ এবার হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাদেরকে আশ্রয় দিয়েছে। তাই, ২০১৬ এবং ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ যে অবস্থান নিয়েছে, তাকে আমরা সমর্থন করি। এবং এর মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ বিশ্ববাসীর কাছেও বেশ প্রশংসা অর্জন করেছে।

রাফসান গালিব

এবারে পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে বাংলাদেশ সরকার কি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগেছিল বলে মনে করেন? এছাড়া বাংলাদেশ সীমান্তের অভ্যন্তরে মায়ানমারের অনুপ্রবেশ ও গুলি চালানোরও কোনো জবাব দিতে পারে নি বাংলাদেশ, এতে কি মায়ানমার বাংলাদেশকে দুর্বল হিশেবে দেখল না?

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগাটাকে আমি কূটনৈতিক অদক্ষতা বলব না কারণ আগের অভিজ্ঞতাগুলো থেকে বাংলাদেশ এটা উপলব্ধি করতে পেরেছে যে, রোহিঙ্গাদেরকে একবার ঢুকতে দিলে তাদের ফেরত পাঠানো খুব একটা সহজ কাজ নয়। তাছাড়া, আগে থেকেই বাংলাদেশে প্রায় ৫ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আছে, তাই নতুন করে আর কাউকে ঢুকতে দিবে কিনা বাংলাদেশ সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে পরিস্থিতির ভয়াবহতা চিন্তা করে বাংলাদেশ তার অবস্থান পরিবর্তন করেছে। আর গুলির জবাব গুলি দিয়ে দিতে হবে এমন কোনো কথা নেই। একবিংশ শতাব্দীতের দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে এবং যথাযথ কূটনৈতিক তৎপরতার ভেতর দিয়ে এসবের জবাব দিতে হবে। তবে একথা অনস্বীকার্য যে, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় প্রদানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাস্তব অবস্থা তুলে ধরে মায়ানমারের উপর সময় মতো চাপ সৃষ্টি করার ব্যাপারে বাংলাদেশের কূটনৈতিক দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়েছে।

রাফসান গালিব

বাংলাদেশ কিন্তু এ সংকট মুহূর্তে প্রতিবেশী বন্ধু ভারতকে পাশে পায় নি। ভারতও তার বিশাল সীমান্ত দিয়ে কোনো রোহিঙ্গাকে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। সেই সাথে এ সময়েই মোদি তার প্রথম মায়ানমার সফরে গিয়ে সু চিকে সমর্থন দিলেন। এখানে ভারতের স্বার্থটা কোথায় এবং ভারতের সাথে এ বিষয়ে কূটনৈতিক যোগাযোগে বাংলাদেশ ব্যর্থ কিনা?

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

বাংলাদেশ ভারতকে কাছে না-পাওয়ার পেছনে যতটা না বাংলাদেশের কূটনৈতিক যোগাযোগের ব্যর্থতা, তার চেয়ে বেশি কাজ করেছে ভারতের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক ও অথনৈতিক স্বার্থ। কূটনীতি আবেগ দিয়ে চলে না। কূটনীতি চলে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক স্বার্থ দিয়ে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত বাংলাদেশের পক্ষ নিয়ে মায়ানমারের বিপক্ষে গেলে ভারতে অর্থনৈতিক এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক ক্ষতি। সুতরাং ভারত তার নিজের স্বার্থ আগে দেখবে, এটাই আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রাথমিক পাঠ। তবে, ভারত নিজের অবস্থান খানিকটা পরিবর্তন করেছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে আছে বলে জানিয়েছে। এখানেও যতটা না পাশে আছে, তার চেয়ে বেশি দেখানোপনা আছে। কারণ, বাংলাদেশের আস্থায় থাকাও ভারতে অর্থনৈতিক এবং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের প্রশ্ন জড়িত।


সু চি জাতীয়তাবাদি এবং জাতীয়তাবাদের চরিত্র হচ্ছে পপুলিস্ট সেন্টিমেন্টকে ব্যবহার করে নিজের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে পূর্ণ করা


রাফসান গালিব

অং সান সুচি’র কথা যখন চলেই এসেছে তখন বলি, রোহিঙ্গা ইস্যুতে তার নীরবতা কি আসলে রাজনৈতিক কৌশল নাকি মায়ানমারের সামরিক জান্তা ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দের মতোই রোহিঙ্গাদের নিয়ে তার বিদ্বেষ কাজ করছে? বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মহল তার প্রতি ক্ষুদ্ধতা প্রকাশ করলেও উলটো তিনি রোহিঙ্গাদেরকেই এর জন্য দায়ী করছেন।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

সুচি’র ব্যক্তিগত মনোভাব নিয়ে আসলে তাকে ব্যাখ্যা করা যাবে না। উনি একটা পলিটিক্যাল পার্টির প্রধান। তাকে গৃহবন্দি করে রাখা ও দীর্ঘদিন পর মুক্তি দেয়া—এসব কারণে গ্লোবালি ও লোকালি তার যে পপুলার ইমেজ ক্রিয়েট হয়েছে তার জন্য এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া দেখানোটা ডিফিকাল্ট হয়ে গেছে তার জন্যে। সে যদি বুড্ডিস্টের পক্ষে নেয় এবং রোহিঙ্গাদের বিপক্ষে নেয় তাহলে তার গ্লোবালি ইমেজ নষ্ট হচ্ছে আবার উল্টোটা হলে তার লোকালি ইমেজ নষ্ট হচ্ছে এবং তার পলিটিক্যাল ফিউচার ক্রাইসিসে পড়ে যাচ্ছে। আসলে সে পপুলিস্ট পলিটিক্স স্ট্যান্ডার্স ম্যান্টেইন করে তার অবস্থান নিয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, পলিটিক্স চলে পপুলিস্ট দর্শন দ্বারা। আর মায়ানমারের সামাজিক বাস্তবতায় গণতন্ত্র বলি, আর জনপ্রিয়তার ভিত্তি মূল বলি, সেটা হচ্ছে পপুলার বুদ্ধিস্ট সেন্টিমেন্ট। আর এ সেন্টিমেন্টকে পুঁজি করেই আজকের অং সান সু চি। তাছাড়া, অপ্রিয় হলেও সত্য যে মায়ানমারের, বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যের, সাধারণ জনগণের দৃষ্টিভঙ্গিই হচ্ছে, রোহিঙ্গারা বাঙালি এবং রোহিঙ্গারা মুসলিম। সুতরাং তারা রাখাইন রাজ্যে থাকতে পারবে না। এ যখন সাধারণ জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি সেখানে সু চি কোন বিবেচনায় এত বড় ঝুঁকি নিয়ে মায়ানমারের মেজরিটি জনগণের সেন্টিমেন্টের বিরুদ্ধে গিয়ে দাঁড়াবেন? মনে রাখতে হবে, সু চি জাতীয়তাবাদি এবং জাতীয়তাবাদের চরিত্র হচ্ছে পপুলিস্ট সেন্টিমেন্টকে ব্যবহার করে নিজের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে পূর্ণ করা এবং প্রয়োজনে না-জায়েজ বিষয়কে জায়েজ করা। জাতীয়তাবাদে মানবতাবাদের কোনো স্থান নাই। তবে, এবার সুচি বিশ্বব্যাপী বেশ সমালোচনা মুখে পড়েছেন। তার সেই গণতান্ত্রিক ইমেজ এখন আর নাই।

রাফসান গালিব

বাংলাদেশ, বিশেষ করে চট্টগ্রামে সামাজিকভাবে নানা অপরাধের সাথে রোহিঙ্গারা জড়িয়ে পড়ছে। উল্লেখ্য যে, ইয়াবা পাচার, মানবপাচারের সাথে তাদের একটা বিশাল সিন্ডিকেটের কথা আমরা প্রায় সময় শুনি। এটা কি এ অঞ্চলের সামাজিক নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে না?

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

ঝুঁকি তো একটা আছেই। আমরা একটা স্ট্যাডিতে দেখিয়েছি বিষয়গুলো। তারা কিভাবে সারভাইব করবে। উখিয়া ও টেকনাফ অঞ্চলে কোনো শ্রমিককে দিনে ৩০০ শত টাকা দিতে হয় সেখানে ৫০ টাকা দিলেও একজন রোহিঙ্গা একই কাজটা করে দিচ্ছে। ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের তো কোনো কাজই করার অনুমতি নাই। কিন্তু যারা ক্যাম্পের বাইরে আছে, তো তারা চলবে কিভাবে, ইউএনএইচসিআর তো তাদের কোনো দেখাশোনার দায়িত্ব নেয় না। তো তারা চলবে কিভাবে, খাবে কিভাবে, কিছু করলেই তাদের ধরে নিয়ে যায়, তাদের অনেকেই তো আবার ‘অবৈধ’ কারণ তাদের কোথাও সে অর্থে নিবন্ধন নাই। অনেক মেয়ে তো জীবিকার তাগিদে পতিতাবৃত্তিতে চলে যাচ্ছে। নানা ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতে বসবাস করতে হয় বলে হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশনের যত ধরনের লেভেল আছে সবগুলো সেখানে আপনি পাবেন। বাঁচার জন্য তারা কী না করছে। দুইটা ক্যাম্পে শুধুমাত্র রেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা আছে এখন প্রায় ৩২ হাজার। ইউএনএইচসিআর তাদের ভরণপোষণ করে। কিন্তু বাকি যারা আনরেজিস্টার্ড, তাদের সংখ্যা এখন প্রায় ৮ লাখ, তাদের একটা অংশ হয়তো নানা ধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ছে। এ কারণে সেখানকার মানুষের অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে এবং একধরনের নিরাপত্তা হীনতার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে সেটা সত্য। কিন্তু তাদের তো বেঁচে থাকার অধিকার আছে। পৃথিবীতে ‘রাষ্ট্র’ ধারণায় ‘নাগরিক’ বিষয় বলে যেটা আমরা পাই সেখানে তাদের কোনো স্থান নাই। অথচ স্টেটলেস পিপলরা তো পৃথিবীর কোনো না কোনো ভূমিতে জন্মেছে, কোথাও না কোথাও তাদের উৎপত্তি হয়েছে। কিন্তু নিওলিবারেল স্টেট পলিসি তাদের এনটিটি মানে অ-মানুষ হিশেবে ঘোষণা করছে। তাদেরকে আপনি বেঁচে থাকার অধিকার দিচ্ছেন না, কিন্তু তারা তো মানুষ। এ যে রোহিঙ্গাদের আজ বাঁচার জন্য নানা ইলিগ্যাল কাজের সাথে জড়িয়ে পড়ছে, সেটার জন্য কেবল কি তারাই দায়ি? এসব বিবেচনায়, ঢালাওভাবে তাদের দোষ দেয়া যায় না। আমাদের বরং একে ডিসকোর্স আকারে আলোচনায় আনতে হবে।

রাফসান গালিব

আগে থেকেই ৫ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী ছিল এবার যোগ হয়েছে আরও প্রায় ৩-৮ লাখ। অনেকের মতে, এ বিশাল শরণার্থী নিয়ে বাংলাদেশ সংকটে পড়বে। সামাজিক সংকট সৃষ্টির কথাও আসছে। সরকার রোহিঙ্গাদের নির্দিষ্ট ক্যাম্পের বাইরে যেতে দিবে না বললেও ইতোমধ্যে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা মূল ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিত বাংলাদেশ কিভাবে মোকাবেলা করবে বা আদৌ পারবে কিনা?

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

এ আশঙ্কায় মধ্যে সত্যতা আছে। কারণ কেবল উখিয়া এবং টেকনাফে বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে আপনি আশ্রয় দিতে পারবেন না। তারা, বেঁচে থাকার তাগিদেই দেশের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে, সরকারকে বিষয়টা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সুচিন্তিত পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। যেমন, সকল রোহিঙ্গাদের একটা বায়োমেট্রিক তালিকা তৈরি করছে সরকার। এটা অত্যন্ত ভালো উদ্যোগ। আপনি যদি সত্যিই একটা ডাটাবেইজ তৈরি করতে পারেন, তাহলে তাদেরকে আপনি সহজে শনাক্ত করতে পারবেন। আর শনাক্ত করতে পারলে তাদেরকে নজরেও রাখা সম্ভব। আন্তর্জাতিকভাবে একটা চাপ সৃষ্টি করে মায়ানমারকে যদি রোহিঙ্গাদেরকে সে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটা ব্যবস্থা করা যায়, তখন এ ডাটা বেইজ ধরে কাজ করা সম্ভব হবে। তবে, সেটা বাংলাদেশ আদৌ কতটুকু করতে পারবে, সময়ই তা বলতে পারবে।

রাফসান গালিব

জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহল বাংলাদেশ সীমান্তে মানবিক বিপর্যয় হয়েছে বলে স্বীকার করেছে। একই সাথে রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধে মায়ানমারকে পদক্ষেপ নিতে বলেছে। কিন্তু বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মায়ানমারে ফেরত নেয়ার ব্যাপারে জোড়াল চাপ প্রয়োগ করছে না। এ মুহূর্তে বিপুল পরিমাণ শরণার্থীদের বাংলাদেশ কতদিন আশ্রয় দিতে পারবে। আদৌ মায়ানমার তাদেরকে ফেরত নিবে কিনা, কী মনে হয় আপনার?

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

এ প্রশ্নের খানিকটা উত্তর আমি আগেই দিয়েছি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বলতে আমরা যা কিছু বুঝি তাদের চরিত্র এবং ভূমিকা নিয়ে আমার গুরুতর সন্দেহ আছে। এরা কেবল উদ্বেগ জানায়, আহবান জানায়, কনসার্ন জানায় কিন্তু এসবে কতটুকু আসল কাজ হয়, সেটা বিবেচনার বিষয়। যেমন, গত ১৪ আগস্ট রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে প্রথমবারের মতো একমত হতে পেরেছে নিরাপত্তা পরিষদের ১৫টি সদস্য রাষ্ট্র। নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষ থেকে রাখাইনের সামরিক অভিযানে ‘মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ’র অভিযোগ তোলা হয়। সেখানকার চলমান সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে ত্রাণকর্মীদের অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিতের তাগিদ দেওয়া হয়।…হিউম্যান রাইটস ওয়াচ একে ‘বিরল ঐকমত্য’ আখ্যা দিয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদেরকে নাগরিকত্ব দিয়ে মায়ানমারে ফিরিয়ে নিয়ে সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক অধিকার দিয়ে মানুষের মর্যাদায় শান্তিতে বসবাসের নিশ্চয়তা প্রদানের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত এবং ঐক্যমত হয় নি। এরা কেবল বসে, আলোচনা করে এবং বিভিন্ন বিষয়ে সম্মত/ ঐকমত্য হয়, কিন্তু ঘটনা কেন্দ্রে ঘটনার কোনো স্থায়ী সমাধান হয় না। তাই, রোহিঙ্গা অকাতরে মরে, আর এরা কেবল নড়েচড়ে! তাই, আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করে রোহিঙ্গাদের মায়ানমারে আদৌ ফেরত পাঠাতে পারবে কিনা তাতে আমি সন্দিহান।

রাফসান গালিব

এক সময় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে আমরা জেনেছি, বর্তমানের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের হাতিয়া দ্বীপাঞ্চলে সরিয়ে নেয়া হবে। এ সিদ্ধান্তের ইতিবাচকতা কী দেখছেন?

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

নিউজটা তখন আমিও দেখেছি। গত ২০ বছর ধরে আমি রোহিঙ্গা বিষয়ে ক্লোজ অবজার্বেশানে আছি। আমার জন্মও সে এলাকায় মানে কক্সবাজারে, রোহিঙ্গা ইস্যুর সাথে সাথেই আমার বেড়ে ওঠা। তো আমি বুঝতে পারছি না, কেন তাদের হাতিয়ায় সরিয়ে নেয়া হবে। এখন গুয়ান্তেনামার মতো করে তাদের আলাদা জায়গায় নির্দিষ্ট করে রাখলে মানে দ্বীপাঞ্চলে নিয়ে গিয়ে লোকালি লকড্‌ করে রাখলে তাদের মুভমেন্টকে রেস্ট্রিক্টেড রাখা যাবে—এ ধরনের ভাবনা কোনো পলিটিক্যাল ভিশন থেকে এসেছে কিনা আমার মনে হয় না। জানি না তিনি কোনো চিন্তা দ্বারা মিসগাইডেড কিনা। একজন একাডেমিশিয়ান হিশেবে বলব, আমি মনে করি কোনো ধরনের চিন্তা ভাবনা না করেই তিনি এ ধরনের সিদ্ধান্তের কথা বলেছেন। রোহিঙ্গারা হয়তো নানা ধরনের সমস্যা করছে, এ জন্য পূর্বের আন্দামান ঘটনার মতো তাদেরকেও দ্বীপে ফেলে আসতে হবে এ ধরনের চিন্তার পক্ষে আমি নই। এটা হয়তো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তাৎক্ষণিক মন্তব্য, সুচিন্তিত মনে  তিনি এটা বলেন নি। এ নিয়ে বিস্তর সমালোচনাও হয়েছে এবং সে কারণে সম্ভবত এ প্রকল্প আপাতত স্থগিত আছে।


বৌদ্ধদের ওপর প্রতিশোধ হিশেবে রোহিঙ্গারা রামুর ঘটনা ঘটিয়েছে এটা আমি বিশ্বাস করি না।


রাফসান গালিব

২০১২ সালে রামুতে বৌদ্ধ বিহারগুলোতে যে সাম্প্রদায়িক হামলা ঘটে, তার সাথে রোহিঙ্গা বিচ্ছিন্নতাবাদিদের সম্পৃক্ততা আছে বলে সন্দেহ করা হয়। যদিও আমরা এ ঘটনার সাথে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ দেখিছি। এ ব্যাপারে আপনার কাছে জানতে চাচ্ছি।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

আগে একটা বিষয় একটু ক্লিয়ার করি। ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ শব্দটার ব্যাপারে আমার আপত্তি আছে। বিচ্ছিন্নতাবাদী কারা? রোহিঙ্গা বা পার্বত্য চট্টগ্রামের ব্যাপারে বিচ্ছিন্নবাদী শব্দটা শুনি। এরা তো বিচ্ছিন্নবাদী না, বরং রাষ্ট্রই হচ্ছে বিচ্ছিন্নতাবাদের দর্শনে বিশ্বাস করে। রোহিঙ্গারা তো রাষ্ট্রের সাথে অন্তর্ভুক্ত হতে চাইছে। পাহাড়ি আদিবাসীরা পঞ্চদশ সংশোধনীতে আদিবাসী হিশেবে স্বীকৃতি চেয়েছে। সেটা তাদের দেয়া হলো না। তার উপর ১৯৭২-এর সংযুক্ত বিষয়টা এখনও সংবিধানে রেখে দেয়া হলো, যেখানে বলা আছে যে, বেঙলি শেল বি আইডেন্টিফাইড এস দ্য সিটিজেন অব বাংলাদেশ; মানে বাঙালিরাই বাংলাদেশের নাগরিক। কিন্তু তারা তো বাঙালি না—মারমা, চাকমা, গারো, সাঁওতাল, মনিপুরি। তাহলে কে তাদের বিচ্ছিন্ন করল? রাষ্ট্রই তো। শুধু এখানে না, সারা বিশ্বে যারা সংস্কৃতি ও ধর্মীয় জাতিসত্তার মানুষগুলোকে বিচ্ছিন্নবাদী বলে চিহ্নিত করা হয়, এটা রাষ্ট্রের একটি ঐতিহাসিক চরিত্র। এবার আপনার কথায় আসি, রামুতে বৌদ্ধ মন্দিরে যে হামলা হয়েছে সেটার সাথে রোহিঙ্গাদের মিলিয়ে ফেলে এক ধরনের সামাজিক আলোচনা আমাদের এখানে জারি আছে—ওখানে বৌদ্ধরা রোহিঙ্গাদের যেভাবে মেরেছে, রোহিঙ্গারাও তার প্রতিশোধ হিশেবে এখানে বৌদ্ধদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এটা হয়তো যুক্তি আকারে সত্য বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ঘটনা পরবর্তী ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টে দেখা গেছে প্রেক্ষাপটটা আসলে ভিন্ন। একজনের ফেসবুকে একটা ছবি ট্যাগ করা নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত হয়। রিপোর্টে এসেছে, ঘটনাস্থলে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা সহিংসতায় বাঁধা না দিয়ে বলছে, উর্দি পরা না থাকলে সেও এ হামলায় অংশগ্রহণ করত। আমি নিজে রামুর ঘটনার পর সেখানে সরেজমিনে গিয়ে একথা নিজের কানে শুনে এসেছি একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুর মুখে। এ হলো সেদিনের পরিস্থিতি। তো এখানে বৌদ্ধদের ওপর প্রতিশোধ হিশেবে রোহিঙ্গারা রামুর ঘটনা ঘটিয়েছে এটা আমি বিশ্বাস করি না। হয়তো এরা ঘটনায় যুক্ত থাকতে পারে, যেভাবে আমি পারি বা আপনি থাকতে পারেন। তাদের হয়তো এ কাজের জন্য ভাড়া করে আনা হয়েছে, তারা পরিস্থিতির স্বীকার—হয়তো বলা হয়েছে, তোমরা সেখানে গিয়ে হামলা করবে। এ ঘটনার জন্য যাকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে সে তো আওয়ামী লীগের নেতা। আরো অনেক রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের কথা এসেছে এ ঘটনা ঘটানোর পিছনে। এখন ‘হুকুমের আসামি’ হিশেবে কাউকে অভিযুক্ত করেন তাহলে দেখবেন সেখানে কোনো রোহিঙ্গাদের সম্পৃক্ততা নেই। আমি মনে করি, এখানে লোকাল কিছু মানুষের ইন্টারেস্ট জড়িত। ২০১২ সালের রাখাইন স্টেটের ঘটনার সাথে এর কোনো সম্পর্ক আছে বলে আমি মনে করি না।

রাফসান গালিব

দীর্ঘক্ষণ সময় দেয়ার জন্য আপনার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

আপনাকেও ধন্যবাদ।

রাফসান গালিব

জন্ম ২০ ডিসেম্বর; চট্টগ্রাম।

শিক্ষা : গণিতে স্নাতক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : সাংবাদিকতা।

ই-মেইল : galibrafsan@gmail.com