হোম নির্বাচিত এক সময় প্রাণী মানুষের জায়গায় দাঁড়িয়ে যায়

এক সময় প্রাণী মানুষের জায়গায় দাঁড়িয়ে যায়

এক সময় প্রাণী মানুষের জায়গায় দাঁড়িয়ে যায়
375
0
মঞ্চকুসুম শিমূল ইউসুফ। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের প্রথম সারির নাট্য সংগঠন ‘ঢাকা থিয়েটার’-এর অন্যতম প্রধান অভিনেত্রী হিশেবে কাজ করছেন। এর বাইরে তিনি একজন সঙ্গীতশিল্পী। ঢাকা থিয়েটারের প্রতিটি প্রোডাকশনে সঙ্গীত ও কোরিওগ্রাফির দায়িত্ব সব সময় তাঁর ওপরই বর্তায়। সম্প্রতি তিনি নাট্য-নির্দেশনায় এসেছেন। সেলিম আল দীন-এর ধাবমান মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে নির্দেশক হিশেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। ২৫ জুন ২০০৯ তাঁর বাসভবনে ‘ধাবমান’-এর নির্দেশনার প্রেক্ষাপট, কৃৎকৌশল এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানা বিষয়ে আড্ডা হয়। আড্ডার মেজাজে এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন  রুবাইয়াৎ আহমেদ

রুবাইয়াৎ আহমেদ

আপনি তো মূলত অভিনয়শিল্পী। সেক্ষেত্রে নির্দেশনা দিতে ইচ্ছে হলো কেন?

শিমূল ইউসুফ

আশলে যখন পারফর্মার হিশেবে কাজ করেছি তখন মনে হয় নি কখনো ডিরেকশন দেবো। কিন্তু সুপ্ত একটা বাসনা নিশ্চয়ই ছিল। যেমন অনেক কিছুই তো নিজে থেকেই করি এমনি এমনি। নাটকে মিউজিক করছি, কস্টিউম করছি, কোরিওগ্রাফি করছি, তারপরে অভিনয় করছি, ছেলে-মেয়েদের রিডিং করাচ্ছি, মোটামুটি অর্ধেকের বেশি দায়িত্ব আমার ঘাড়েই থাকে। তো ভাবলাম একটা নাটকে ডিরেকশন দিয়েই দেখি। সেই কারণেই। আর সবচেয়ে বড় যেটা সেটা হচ্ছে, গ্রাম থিয়েটার সম্মেলন। এটা হয়ে যাওয়ার পর মনে হয়েছে আমার কাজ করাটা সহজ হয়ে গেছে। বুঝছিস? সেলিম ভাই যেভাবে বলত, মানে যেটা আমি স্যুভিনিয়রেও লিখেছি। আমার মনে হয়েছে আমি তো এখান থেকেই ধাবমান করতে পারি। সব আঙ্গিককে মিক্সড করে যদি আমি ধাবমান করি তাহলে পারব না কেন? সাহস করলে পারব।

রুবাইয়াৎ আহমেদ

সেলিম আল দীনের তো অনেকগুলো নাটক ছিল যেগুলো ঢাকা থিয়েটার এখনো করে নি। যেমন, স্বর্ণবোয়াল, পুত্র। তার মাঝে আপনি স্পেশালি ধাবমান বেছে নিলেন কেন?

শিমূল ইউসুফ

সেলিম ভাইয়ের ধাবমান প্রথম যখন পড়ি, তখনই এই লেখাটার ওপর আমার একটা মায়া জন্মেছিল। কারণ, তুই জানিস তো আমার গ্রামের বাড়িতে হাঁস-মুরগি, বাছুর পালি; সেখানে ওদের সাথে আমার যে সম্পর্ক…ওদের প্রত্যেকের নাম আছে; তারপর আমার নিজের একটা প্রাণী, পুত্র ছিল সম্রাট; তো সবকিছু মিলে আমার মনে হয়েছে যে, আমার জন্য এই জায়গাটা ধরতে সহজ হবে। যেমন নিমজ্জন অনেক কঠিন নাটক। বাচ্চুর জন্য ওটা ঠিক আছে। তারপর বনপাংশুল।ওগুলো বাচ্চু যেভাবে চিন্তা করেছে আমরা সেভাবে পোর্ট্রেট করেছি। কিন্তু একটা নাটক করার সময় আগে তো আঙ্গিকটা ঠিক করতে হয় যে, কোন আঙ্গিকে করব। বনপাংশুল যেভাবে করেছে বা প্রাচ্য যেভাবে হয়েছে, তার পুরো চিন্তাটাই বাচ্চুর। আমরা শুধু পারফর্মার হিশেবে যতটুকু কন্ট্রিবিউট করা যায় বা মিউজিকে যতটুকু, কোরিওগ্রাফিতে যতটুকু, কস্টিউমে যতটুকু কন্ট্রিবিউট করা যায় সেইটুকু করেছি। আর কিছু কিছু জায়গা নিজেরা করে নিয়েছি। সেটা একটা বয়সের পরে, আশলে ডিরেক্টরকে সব দেখিয়ে দিতে হবে, এমন আশা করাটাও ঠিক না। তাহলে আর আমার নিজের ক্রিয়েটিভ জায়গাটা কোথায় থাকে? আমি একটু একটু করে তৈরি হচ্ছিলাম। কাজেই আমার মনে হয়েছে যে, ধাবমান-এ যে জায়গাটা সেলিম ভাই ছুঁতে চেয়েছে, প্রাণিপুত্র এবং মানব মাতা-পিতার সঙ্গে সম্পর্ক, সে সম্পর্কটা তো আমি অনেক আগেই তৈরি করে ফেলেছিলাম আমার প্রাণীদের সাথে। আর একটা জিনিশ যেটা, আমার একটা প্রাণিপুত্র ছিল। যার নাম ছিল ‘শঙ্কর’, সেলিম ভাই যাকে ‘সোহরাব’ বলে ডাকত। সেই সোহরাব ভীষণ রাগী ছিল, সেলিম ভাইয়ের এই ধাবমান-এর সোহরাবের মতোই। তার মেজাজের জন্য তাকে পালা যাচ্ছিল না। তো আমি যখন কলকাতায় নাটক করতে গিয়েছিলাম, সেই সময়ে আমার সোহরাবকে বিক্রি করে দেয়া হয়। সেও কিন্তু বাজার লণ্ডভণ্ড করেছিল। মেরেওছিল দুইজনকে—হাত-পা ভেঙেছিল। আমার সোহরাব মানে ‘শঙ্কর’। কিন্তু সেলিম ভাই তো তার আগেই ধাবমান লিখে ফেলেছে, আর সোহরাব কাণ্ডগুলো কিন্তু তার পরে করেছে। আমিও শঙ্করকে বিক্রি করে দেয়াটা একদম মেনে নিতে পারি নি। সে যতই দুষ্টু হোক না কেন, আমার তো সন্তান—তা আমার অজান্তে বিক্রি করল, আমাকে একবার জিজ্ঞেসও করল না। কারণ ওদের পক্ষে পালা সহজ ছিল না—দড়ি ছিঁড়ে-টিড়ে ওদেরকেও মারতে যেত। প্রাণিপুত্রের বা প্রাণীর সঙ্গে মানবের যে সম্পর্ক সেটা বোধহয় আমি, এশা, বাচ্চু তিনজনেই খুব ফিল করতে পারি—কারণ নিজেরা পালি তো। পালি যখন, তখন নিজের সন্তান হিশাবেই পালি। তাই ধাবমান বেছে নিয়েছিলাম।

রুবাইয়াৎ আহমেদ

মূল পাণ্ডুলিপি পাঠ করতে গেলে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা লেগে যায়, তারও বেশি। সেক্ষেত্রে মঞ্চায়নের জন্য আপনাকে সম্পাদনার আশ্রয় নিতে হয়েছে। এই যে আপনি সম্পাদনা করেছেন, সেটা কি কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে? মানে আমি এই ভাবে যাব… অনেকগুলো উপকাহিনি তো ছিল…

শিমূল ইউসুফ

হ্যাঁ, অনেকগুলো উপকাহিনি—এটা শুধু ধাবমান-এর ক্ষেত্রে না। আমি তো স্ক্রিপ্ট সম্পাদনা করি সেই কিত্তনখোলা থেকে। সেলিম ভাই তো লিখেন দীর্ঘ। কেরামতমঙ্গল তিন দিনে করার কথা ছিল আমাদের। সেই নাটকও কিন্তু কেটে পৌনে তিন ঘণ্টায় করতে হয়েছে। বনপাংশুলও তাই—প্রায় নয় ঘণ্টার নাটক ছিল। এই প্র্যাকটিস অনেক আগে থেকেই করেছি, কী করে কাটতে হবে বা কী করে প্রোডাকশন স্ক্রিপ্ট করতে হবে। আর কাটলেও যেন নাটকের মান ক্ষুণ্ন না হয়, ওই দিকে সবসময় প্রখর দৃষ্টি রাখা—অর্থাৎ নাটকে সেলিম ভাই যা বলতে চেয়েছে সেটা যেন অক্ষুণ্ন থাকে। যেসব মিথ এসেছে ধাবমান-এ, সেলিম ভাইয়ের প্রত্যেকটা নাটকে কিন্তু এ রকম অনেক মিথ থাকে। সেটা যৈবতী কন্যার মন-এ অনেক বেশি। তারপর প্রাচ্য-এ আরো বেশি, হরগজ-এ এরকম মিথ আছে, বনপাংশুল-এও এরকম মিথ আছে। নিমজ্জন-এ তো আরো অনেক বেশি, তাই না? নিমজ্জনও সেই তিনদিনে হওয়ার কথা। তিন এপিসোড তিনবারে হবে এইরকম। ধাবমান-এ আমার যেটা মনে হলো, আমি মিথগুলো করতে গেলে নাটকটা আর করা হবে না। এবং মিথ-এ যদি দর্শক একবার ঢুকে যায় তখন কিন্তু দর্শক মিথ-এর মজাটাই নিতে চাইবে। সেখান থেকে আবার ফেরত এনে নাটকে সেলিম ভাই যেটা আসলেই বলতে চেয়েছে—সেই জায়গাটা কিন্তু একটু মিস করবে, আমার কাছে মনে হয়েছে। আর অত বড় নাটক তো বাংলাদেশে দেখার মতো লোকও কম, তাই না? এই যে একঘণ্টা চল্লিশ, পঁয়তাল্লিশ মিনিট হয় তাই তো অনেকের কাছে দীর্ঘ মনে হয়। সেটা বিনোদিনী-র বেলায়ও দেখি, ধাবমান-এর বেলায়ও দেখি, প্রাচ্য-এর বেলায়ও দেখি। মানে আর কত ছোট করলে দর্শকদের ভালো লাগবে সেটা আমি ঠিক বুঝতে পারি না।


উইংসের পাশে বসে থাকলে কেউ কথা বললেই বলত যে, ‘এই কথা বলে না, নাকট চলছে।’


 রুবাইয়াৎ আহমেদ

 যিনি পাঠ করছেন আবার দেখছেনও, তার কাছে ধাবমান-এর দুটি সংস্করণ। একটি পাঠের আর একটি মঞ্চ-সংস্করণ। এই দুটি বিষয় নিয়ে কেউ কি কখনো আপনাকে কিছু বলেছে?

শিমূল ইউসুফ

এখনও বলে নি। আমি জানি না সেলিম ভাই থাকলে কী বলত! কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউ বলে নি যে, মিস করেছি ঐ জায়গাটা। যেমন আমার নিজের কাছে একটা জিনিস মনে হয়, জায়গাটা করতে পারলে আমার খুব ভালো লাগত। সেটা হলো, ‘সুবতী’ এবং ‘নহবত’-এর সোমেশ্বরীর বালুচরে একটা মিলন আছে…

রুবাইয়াৎ আহমেদ

সোহরাব দেখে—

শিমূল ইউসুফ

দেখে না, পিছন ফিরে থাকে। ঐ জায়গাটা আমার কাছে খুব লোভনীয় ছিল—এটা আমি খুব মিস করেছি। নিজে নির্দেশক হিশেবে বা টেকনিক্যাল স্ক্রিপ্ট করার জায়গা থেকে আমার মনে হয়—আমি যদি ঐ জায়গাটা রাখতে পারতাম, তাইলে নাটকটা আরো সুন্দর হতো যে, বন্ধ্যানারীর সঙ্গে জলবতী নদীর তীরে প্রকৃতির সংলগ্নতায় মিলন, ইচ্ছে এই, এতে করে যেন সে গর্ভবতী হয়, তাই তো? কিন্তু তারপরও ‘সুবতী’ গর্ভবতী হয় না। আমার কাছে মনে হয়েছে, আমি ঐ জায়গাটা রাখতে পারলে ভালো লাগত।

রুবাইয়াৎ আহমেদ

এশা তো এই প্রথম মঞ্চে এতবড় একটি চরিত্র রূপায়ণ করল। আগে কখনো এত বড় চরিত্র সে করে নি। আপনি একজন ডিরেক্টর হিসেবে কী করে তার উপর আস্থা রাখলেন? সে ভালো অভিনয় করবে সেটা কি আপনি আগে বুঝতে পেরেছিলেন? সেই আস্থাটা কীভাবে তৈরি হলো?

শিমূল ইউসুফ

আসলে আমার একটা বিশ্বাস ছিল। কারণ বিশ্বাস ছাড়া তো মানুষ কিছু করতে পারে না। সেলিম ভাইয়ের কোলেপিঠে বড় হয়েছে, প্রথম কথা। অক্ষর জ্ঞানদান…

রুবাইয়াৎ আহমেদ

হাতেখড়ি যেটা।

শিমূল ইউসুফ

হাতেখড়ি, সেটাও সেলিম ভাইয়ের হাতেই হয়েছে। তারপরে যত নাটক করেছি এশা হওয়ার পরে, সে তো বসে বসে সবই দেখত, উইংস-এর পাশে বসে।

রুবাইয়াৎ আহমেদ

অনেকগুলো তার মুখস্থও।

শিমূল ইউসুফ

হ্যাঁ, যৈবতী কন্যার মন পুরো মুখস্থ। তারপরে বনপাংশুল-এর ‘সুকি’ মুখস্থ তার, ‘পরী’ মুখস্থ, হাত হদাই-এর ‘হাসনা’ মুখস্থ, ‘চুক্কুনী’ মুখস্থ, মুনতাসির-এর সব ডায়ালগই মুখস্থ। কারণ এটা খুব মজার নাটক এবং ও যখন বড় হলো, মানে দুই-তিন বছরের হলো, তখন উইংসের পাশে বসে থাকলে কেউ কথা বললেই বলত যে, ‘এই কথা বলে না, নাকট চলছে।’ নাটকও বলতে পারত না। আমার বুকের ভেতরে একটা বিশ্বাস ছিল, এর মধ্যেই তো বড় হয়েছে—এর বাইরে তো বড় হয় নি। আর জেনেছে সেলিম ভাইকে, দেখেছে সেলিম ভাইকে, সেলিম ভাইয়ের লেখার সঙ্গে পরিচিত, ও ছোটবেলা থেকে আমাকে কাজ করতে দেখে, ওর বাবাকে কাজ করতে দেখে। তো এই বিশ্বাসটা আমার ছিল, এশা খারাপ করবে না।

রুবাইয়াৎ আহমেদ

আপনি ধাবমান-এর ডিজাইন যখন করেছেন, টোটাল ফ্রেম মাথায় ছিল আগে থেকেই যে, আপনি এভাবে এগোবেন, না কি মঞ্চেই সব তৈরি করেছেন?

শিমূল ইউসুফ

আমার কোনো কিছুই মাথায় ছিল না। আমি জাস্ট শুরু করে দিয়েছিলাম রিদম দিয়ে। আমার শুধু মনে হয়েছিল যে, আমার সব ছেলে-মেয়েরা নাচবে মঞ্চে। এবং প্রত্যেককেই হাত-পা মেলাতে হবে। তুই যদি খেয়াল করে থাকিস, আমি কিন্তু প্রথম দিকে শুধু রিদম দিয়ে আমি ওদেরকে তালটা, লয়টা বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম। প্রথমে ওদেরকে রিদমটা প্র্যাকটিস করালাম আর একটা রিদমই। মান্দিদের যে রিদমটা। তো আলটিমেটলি ওই রিদমেই তো নাচগুলো হলো, কিন্তু একটু ফরমেটটা চেঞ্জ ক’রে। তো সেইখানে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, ওই প্র্যাকটিসটা ওদের দরকার ছিল। আর একটা জিনিশ, আমি কিন্তু ওদেরকে রিডিং করাই নি। স্ক্রিপ্ট রিডিং, যেটা অনেক দীর্ঘ সময় ধরে আমরা ঢাকা থিয়েটারে স্ক্রিপ্ট রিডিং করি, সেটা কিন্তু আমি করি নি।

রুবাইয়াৎ আহমেদ

সম্ভবত, এটা ঢাকা থিয়েটারের দ্রুততম সময়ের প্রযোজনা।

শিমূল ইউসুফ

দ্রুততম এবং উইদাউট রিডিং। যে কারণে পারফর্মাররা প্রথমদিকে একটু হোঁচট খেয়েছে। কিন্তু আমার কাছে সবসময়ই মনে হয়েছে যারা পারফর্ম করে, যারা মুখ দিয়ে কথা বলতে পারে—তারা ঠিকই পারবে। কিন্তু হাত-পা না নাড়াতে পারলে তো খারাপ লাগবে। এ কারণে আমি হাত-পা নাড়ানো—অ্যাটলিস্ট তালে যেন হাত-পা নড়ে, সেই চেষ্টাই আগে করেছিলাম। ওটা যখন হয়ে গেছে তখন আমি ওদের এডিটেড স্ক্রিপ্টটা দিয়ে দিলাম, এই তোমাদের ক্যারেক্টার, এখন করো। সেখান থেকে নাটক যখন হচ্ছে তখনই কিন্তু আমার মনে হয়েছে, বাঁশ দিয়ে যখন সবকিছু হচ্ছে, তাহলে বাঁশ দিয়ে বাজার কেন হবে না, বাঁশ দিয়ে যুদ্ধের ময়দান কেন হবে না, কিংবা বাঁশ দিয়ে কেন ঘর হবে না, বাঁশ দিয়ে কেন বাথান হবে না বা ওই যে ছোট ছোট স্টিকগুলো, ওইগুলো দিয়ে কেন নাচ হবে না। মান্দিদের আলাদা করবার জন্য আমি ঢাল ব্যবহার করতে চেয়েছিলাম। এগুলো কিন্তু করার সময় আমার মনে হয়েছে।


হ্যাঁ, এটাই প্রথম এম্পটি স্পেস-এ করা। এরকম এম্পটি স্পেসে এর আগে ঢাকা থিয়েটারের কোনো নাটক হয় নি


রুবাইয়াৎ আহমেদ

যখন আপনি নির্দেশনা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তখনই কি আপনি ভেবে নিয়েছিলেন যে, লাঠি ব্যবহার করবেন?

শিমূল ইউসুফ

হ্যাঁ, মঞ্চে আমি কোনো সেট করব না।

রুবাইয়াৎ আহমেদ

সেট-এর বিকল্প হিশেবে—

শিমূল ইউসুফ

হ্যাঁ, সেট-এর বিকল্প হিশেবে, এটা প্রথম থেকেই ডিসাইডেড ছিলাম।

রুবাইয়াৎ আহমেদ

সম্ভবত লাঠির ওপরে একটা ওয়ার্কশপ বা ট্রেনিং হয়েছে।

শিমূল ইউসুফ

না, ওইরকমভাবে তো ট্রেনিং হয় নি, দুদিনের একটা ওয়ার্কশপ হয়েছে। তবে ওদের প্রত্যেককেই আমার বলা ছিল যে, আমি এম্পটি স্পেস-এ নাটক করব এবং শুধু প্রপস দিয়ে নাটক করব। এম্পটি স্পেসে এ কারণেই যে, একজন পারফর্মারকে তখনই বোঝা যায় সে কতখানি দক্ষ, যখন সে স্পেসটা ব্যবহার করতে পারে।

রুবাইয়াৎ আহমেদ

ঢাকা থিয়েটারের আর কোনো নাটকে এইরকম এম্পটি স্পেস ছিল কি? সম্ভবত মুনতাসির…

শিমূল ইউসুফ

মুনতাসির-এর পেছনে সেট ছিল।

রুবাইয়াৎ আহমেদ

তাহলে তো এটাই প্রথম?

শিমূল ইউসুফ

হ্যাঁ, এটাই প্রথম এম্পটি স্পেস-এ করা। এরকম এম্পটি স্পেসে এর আগে ঢাকা থিয়েটারের কোনো নাটক হয় নি।

রুবাইয়াৎ আহমেদ

সেক্ষেত্রে এটা নিশ্চয়ই অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং ছিল। কারণ একজন অভিনেতা বা পারফর্মার তার সেটের সহায়তা পায়।

শিমূল ইউসুফ

হ্যাঁ, পায়। কিন্তু এখানে আমার যেটা মনে হয়েছে, আমি যদি ধাবমান-এ সেট করে দিতাম তাহলে কিন্তু পারফরমারদের অনেকের ব্যথা পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। অনেক দৌড়-ঝাঁপ আছে, নাচ আছে, গান আছে এবং তাড়াতাড়ি করে তাদের একটা জায়গায় দাঁড়াতে হচ্ছে, বসতে হচ্ছে। এখানে সেট করলে অবশ্যই ওরা ওদের পারফরমেন্সে বাধাগ্রস্ত হতো। যে কারণে প্রথম থেকেই মনে হয়েছিল, আমি ধাবমান করব এম্পটি স্পেস-এ। ধাবমান করব যখন স্থির করি তখন একটা জিনিশ মাথায় ছিল যে, সোহরাব একা দৌড়াচ্ছে। সোহরাব লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে পালাচ্ছে। সেই লণ্ডভণ্ডের জায়গাটা কীরকম হবে—নিশ্চয়ই সেখানে বাড়িঘর, সেট বা গাছপালা এগুলো থাকবে না। সোহরাব যখন দৌড়াচ্ছে তখন সবকিছু ধ্বংস করে দিয়ে দৌড়াচ্ছে। সেই জায়গাটা এম্পটি হবে। সোহরাব-এর শক্তির কাছে মৃত্যুও মাথা নত করবে, এমনই ভাবনা কাজ করবে। কিন্তু মৃত্যু যাকে পেছন থেকে তাড়া করে সে কিন্তু চোখে কিছুই দেখতে পায় না। শুধু উদ্ভ্রান্তের মতো দৌড়াতে থাকে। সে কারণেও মঞ্চ ফাঁকা রাখতে হয়েছে।

রুবাইয়াৎ আহমেদ

বাংলার ঐতিহ্যবাহী নাটকের যে ধারাগুলো আছে, সেগুলো থেকে অনেক এলিমেন্টস আপনি যোগ করেছেন ধাবমান-এ। ঢাকা থিয়েটারের এ ধরনের একটা চর্চা আছে। কিন্তু ধাবমান-এ ‘মাদার পীর’ ইত্যাদি প্রসঙ্গগুলো থাকাতেই কি আপনি পালাগুলোর অনুষঙ্গ যুক্ত করেছেন? না কি আপনার পরিকল্পনাই ছিল যে বিষয়গুলো যুক্ত করবেন?

শিমূল ইউসুফ

না, আমাদের হাজার বছরের আঙ্গিকের বাইরে তো আমি কখনোই করতাম না। এই যে প্রথমেই বললাম, গ্রাম থিয়েটার সম্মেলন আমাকে নতুন কিছু ভাবতে শিখিয়েছে যে, এভাবে করতে পারব। এম্পটি স্পেস-এর আরেকটা ব্যাপার, আমাদের ঐতিহ্যবাহী আঙ্গিকের পরিবেশনা তো এম্পটি স্পেসেই হয়। ওরা কি সেট দিয়ে করে? ওরা কিন্তু সেট ব্যবহার করে না। ওরা প্রপস দিয়েই কিন্তু অভিনয় করে। এবং গেটআপও খুব একটা বদলায় না। যে যার গেটআপেই করে। ও-রকম চুল-দাড়ি লাগিয়ে ওরা করে না। সঙ-এ বোধহয় একটু মেকাপ নেয়। এছাড়া আমি যতগুলো শো দেখলাম ‘গ্রাম থিয়েটার সম্মেলন’-এ, তাতে কাউকে তো ঐভাবে মেকাপ নিতে দেখি নি। শুধু পুরুষরা যখন নারী হিশেবে মঞ্চে আসছে তখন তারা লম্বা চুল, শাড়ি এগুলো পড়ে আসছে। সেটা তো আঙ্গিকের কারণেই আসছে, তাই না?

রুবাইয়াৎ আহমেদ

সেক্ষেত্রে ধাবমান তো হয়েছে প্রসেনিয়াম-এ। সেটা যদি বনপাংশুল-এর মতো প্রসেনিয়াম ভেঙে করা যেত, তবে ডিরেক্টর হিশেবে আপনার কি মনে হয় না আরো অনেক বেশি ভালো হতো?

শিমূল ইউসুফ

হ্যাঁ, আমি সেটা ভেবেই নিয়েছি যে, যদি আমি পরপর দুইদিন এক্সপেরিমেন্টাল হল পাই, তাহলে এটা নিচে করব। মানে অর্ধচন্দ্র আকারে দর্শক বসাব। আর একটা সাইড নিয়ে ধাবমান করব। প্রসেনিয়াম ভেঙে করা আমাদের অনেক নাটক যেমন বনপাংশুল, প্রাচ্য—এগুলো নিয়ে কিন্তু বাইরে যেতে পারি নি। স্টাইলের কারণে। এত সুন্দর প্রোডাকশনগুলো আমরা কোথাও নিয়ে যেতে পারি নি। মানে বাংলাদেশের ভেতরেও আমরা কোথাও নিয়ে যেতে পারি নি। কাজেই ঐ স্পেসটা পাওয়া যায় না। খোলা মঞ্চটা পাওয়া যায় না। যে কারণে আমি আগে বক্সের ভেতরে ঢুকিয়ে দেখলাম যে, এটা সব জায়গায় নেওয়া যায় কি না। এখন তো বোঝা যাচ্ছে যে, এটা সব জায়গায় নেওয়া যাবে। বাংলাদেশের যে কোনো জায়গায় একটা মঞ্চ থাকলেই এই নাটকটা করা যাবে। এখন চেষ্টা করবো এটাকে মঞ্চের বাইরে করার। এতে করে দর্শকরা দুটো ফ্লেভারই পাবে বা আমরাও করে দেখব যে, কেমন লাগে—ভালো না খারাপ।

735056_10200283118582715_2116799179_n
ধাবমান-এর একটি দৃশ্যে রাজীব, এশা, জয়শ্রী, হাসনাত, নার্গিস

রুবাইয়াৎ আহমেদ

ধাবমান-এ আপনি একটি চমৎকার বন্দনাগীত লিখেছেন। সেখানে সেলিম আল দীনের অনেক ব্যক্তিগত প্রসঙ্গও এসেছে। এভাবে বন্দনাগীতি লেখার প্রণোদনা কোত্থেকে পেলেন?

শিমূল ইউসুফ

ওইটা সেলিম ভাই, মানে পেছন থেকে ঠ্যালে সব সময়। ওইটাই বোধহয় কাজ করে। নইলে আমার তো লেখার কথা না, তাই না? আমার হঠাৎই মনে হলো যে, শুরু করব কী করে নাটকটা। নাটকটা যদি আমি শুরু করতে চাই, তাহলে তো আমার একটা বন্দনাগীত লাগবেই। আর সেলিম ভাই যেভাবে এপিসোড হিসেবে ধাবমান-এ বন্দনা লিখেছেন, তাঁর পিতৃভূমির বন্দনা, তাঁর মাতা-পিতার বন্দনা, তাঁর ভাই-বোনের বন্দনা, তারপরে তাঁর ঘর, দরজা-জানালা, আঁতুড়ঘর, যেখানে সে জন্মেছে—সেই যে বর্ণনা, সেগুলো যদি আমি বলতে যাই তাহলে আমার দীর্ঘ সময় লাগবে। সেলিম ভাইয়ের কথাই কিন্তু এগুলো। সবই সেলিম ভাইয়ের কথা, আমি জাস্ট গানের মধ্যে সুরের মধ্যে কথাগুলো ঢুকিয়ে দিয়েছি। আর ‘মাদার পীর’-এর সুর পুরোটা না, শুধু ওই ‘ও…’ যে টানটা, এই টানটা মাদার পীরের। আর বাদ-বাকিটা আমার তৈরি করা। আর নাচটাও কিন্তু পুরো যে মাদার পীর, তা কিন্তু না। ওখানে মাদার পীর আছে, ওখানে মহররমের জারি আছে, ওখানে পদ্মার নাচন আছে—এই তিনটা তো মিক্সড হয়েছেই। তারপর আবার মণিপুরী স্টেপিং মিক্সড হয়েছে। ধাবমান সেই নাটক যেখানে সেলিম ভাই ঈশ্বর থেকে শুরু করে মাতাপিতা-ভাইবোন, এমনকি হাতের লেখার কলমেরও বন্দনা করেছেন। কেন করেছেন? হয়তো ঋণশোধ করার একটা তাগিদ তার বুকের ভেতরে কাজ করেছে।

রুবাইয়াৎ আহমেদ

ধাবমান-এ সোহরাবের যে পরিণতি সেটাকে কি আপনি নিয়তি বলবেন না ট্র্যাজেডি বলবেন, না কি ফোররিয়ালিজম?

শিমূল ইউসুফ

ফোররিয়ালিজম। প্রথম থেকেই কিন্তু মুনীন্দ্র মারাক—তার মুখ থেকে যদি আমরা শুনি বা সেই যে শচীন্দ্র ডাক্তার আসে সোহরাবকে দেখতে, তার মুখ থেকেও যা শুনি সেটা কিন্তু অবধারিত আমাদের জন্যও, মানে মানুষের জন্য একটা পশুর পরিণতি কিন্তু ওরকমই হয়। হয় সে বিক্রি হবে, কসাইখানায় ছুরির নিচে তার গলা যাবে…অর্থাৎ সাপের দংশনে যদি তার মৃত্যু না হয় তাহলে কসাইখানার ছুরির তলেই তার গলা যাবে।

রুবাইয়াৎ আহমেদ

তার মানে নিয়তি না আশলে।

শিমূল ইউসুফ

নিয়তি আর ফোররিয়ালিজমের মধ্যে কি কোনো ভেদ আছে? ফোররিয়ালিজমই তো ভাগ্যকে নিয়তির দিকে বা পরিণতির দিকে ঠেলে নিয়ে যায়।

রুবাইয়াৎ আহমেদ

সেটাই তো, মানে নিয়তি তো পূর্বনির্ধারিত।

শিমূল ইউসুফ

পূর্বনির্ধারিত। যাহা কিছু পূর্বনির্ধারিত তাহাই কণ্ঠের হার, যাহা প্রাণিকুল জন্মক্ষণেই কণ্ঠে ধারণ করে এই ধরায় আসে। নিয়তি এবং সম্মুখবাস্তবতা (ফোররিয়ালিজম) সমান্তরাল পাশাপাশি চলে, কেউ কাউকে ছুঁতে পারে না। শুধু একবার তারা একত্র হয় সেই অনিবার্য ক্ষণটিতে। আমার মনে হয়, অন্বিতা যদি সুস্থ হয়ে উঠত তবে সেলিম ভাই সোহরাবকে আত্মসমর্পণ করাতেন না। অথবা সেলিম ভাইয়ের মধ্যে হয়তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই বাণীগুলো কাজ করেছে :

চির-পিপাসিত বাসনা বেদনা, বাঁচাও তাহারে মারিয়া
শেষ জয়ে যেন হয় সে বিজয়ী তোমারি কাছেতে হারিয়া

যে প্রাণী ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পণ করে সে সেলিম ভাই হোক আর সোহরাবই হোক সে আমার কাছে নমস্য। সোহরাব মৃত্যুকে জয় করে, সে বিজয়ী বীর।

রুবাইয়াৎ আহমেদ

গৃহপালিত পশুদের যে এই ধরনের পরিণতি হবে সেটা এক অর্থে পূর্বনির্ধারিত। তাহলে এখানে ফোররিয়ালিজম ঘটছে কীভাবে?

শিমূল ইউসুফ

ফোররিয়ালিজম ঘটছে—প্রত্যেকের ভাবনার ভিতর দিয়ে। একসময় নহবত, সুবতী এবং এসাকও ভাবে যে, তাদের প্রাণী সদস্যটির পরিণতি এই হবে, তাই না? কিছু লোক বা মানুষই তো ফোররিয়ালিজম থেকে আস্তে আস্তে সোহরাবকে ঠেলে নিয়ে যায় নিয়তির দিকে। সোহরাব-এর ভাগ্য নির্ধারণ করে কিছু মানুষ। প্রকৃতি, প্রাণিকুল এমনকি সোহরাব নিজেও জানে তার ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে।

রুবাইয়াৎ আহমেদ

সোহরাবের পরিণতিকে কি তাহলে আমরা ট্র্যাজিক বলব? শেষ পর্যন্ত তো বুদ্ধের স্তোত্র দিয়ে বিষয়টি সম্পর্কে মানুষকে এক ধরনের সান্ত্বনা দেয়ার কিংবা সেটাকে সহজভাবে মেনে নেয়ার একটা ভিত্তি তৈরি করে দেয়—

শিমূল ইউসুফ

একটা ভিত্তি তৈরি করে দেয়, কিন্তু সেখানে কি ভিত্তিটা সেইভাবে তৈরি হয়—জননী যে, অর্থাৎ যার সন্তান, সে কিন্তু ঊষর যাত্রা জেনেও বুদ্ধের কুটির থেকে দূরের প্রান্তরে চলে যায় মৃত সন্তানকে নিয়ে। তাহলে কি আমি বলব, সেলিম ভাই মেনে নিয়েছেন মৃত্যুটাকে। অথবা আমরা সেলিম ভাইয়ের মৃত্যুকে কি মেনে নিয়েছি? সেলিম ভাইও তো ফোররিয়ালিজমের দিকে প্রথমে নিজেকে নিয়ে গেছেন এবং তিনি নিজেই ফোররিয়ালিজমকে নিয়তিতে রূপান্তরিত করেছেন। আসলে কী থেকে কী হয় বলাটা বড় কঠিন।


সেলিম ভাই তো সেই কষ্ট প্রথমেই পেয়ে গেছে তার পুত্র মঈনুল হাসানের মৃত্যুতে। যে মাত্র বিশ মিনিট বেঁচে ছিল


রুবাইয়াৎ আহমেদ

সে জায়গায় তাহলে কী করার থাকতে পারে?

শিমূল ইউসুফ

কোনো সন্তানের মৃত্যুই কোনো পিতা-মাতা মেনে নিতে পারে না। সেই সন্তান যদি তার চোখের সামনে মারা যায়—সে সন্তানের স্মৃতি কিন্তু আজীবন তাকে তাড়িত করে, এক। আর দুই নম্বর হলো, সন্তানের মৃত্যু যারা দেখে, তাদের মতো কষ্ট তো আর কেউ পায় না। তাদের মতো হতভাগ্যও কেউ নয়। সেলিম ভাই তো সেই কষ্ট প্রথমেই পেয়ে গেছে তার পুত্র মঈনুল হাসানের মৃত্যুতে। যে মাত্র বিশ মিনিট বেঁচে ছিল, তাই না? সেলিম ভাই জানে সন্তানের মৃত্যু কী জিনিশ এবং পারুল ভাবী যেভাবে সেই সন্তানের স্মৃতি বহন করে বা সেলিম ভাই যেভাবে সেই সন্তানের স্মৃতি শেষদিন পর্যন্ত বহন করেছে। সন্তান কখনো পিতা-মাতার কাছে মৃত না। সব সময় সে জীবিতের একটা বেশ ধরে আসে। অনেকের মধ্যে সেলিম ভাই, ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যেও তার সন্তানকে খোঁজার চেষ্টা করেছে। জোর করে বলত যে, ‘আমাকে বাবা ডাকবি’—তাই না?

রুবাইয়াৎ আহমেদ

হ্যাঁ, পরিচয় করিয়ে দিতেন এই যে আমার ‘পুত্র’।

শিমূল ইউসুফ

পুত্র, হ্যাঁ। এই যে আকাঙ্ক্ষা, এই যে চাওয়া, আশা করা—তার সবই তো নির্মূল হয়ে গিয়েছিল মঈনুল মারা যাওয়ার সময়। তারপরও এটা তো কেউ নিবৃত্ত করতে পারে নি। কাজেই সন্তানের মৃত্যু কিন্তু কেউই সহজভাবে মেনে নেয় না। এখন আমরা বলতে পারি যে, মানব-সন্তান এবং প্রাণী-সন্তানের মধ্যে তফাৎ আছে। কিন্তু সেই তফাৎ, যদি একজন মানুষ হিসেবে আমি বলি যে, আমি তো এখনো আমার সম্রাটকে ভুলতে পারি না, আমি তো আমার শঙ্করকে ভুলতে পারি না—

রুবাইয়াৎ আহমেদ

তার মানে, প্রকৃত আবেগের আসলে কোনো জেনার নাই?

শিমূল ইউসুফ

না। যদি সে সত্যিকার অর্থে তার মানব মাতা-পিতা হয় এবং তাকে পুত্রবৎ স্নেহ করে বা কন্যারূপে স্নেহ করে, তাহলে সেই স্নেহের জন্য—

রুবাইয়াৎ আহমেদ

কোনো বিভাজন থাকে না।

শিমূল ইউসুফ

হ্যাঁ, ওইখানে কোনো প্রাণী বা মানব বা পশুপাখি—এগুলোর মধ্যে পার্থক্য থাকে না। এমনকি একটা গাছকেও তো ভালবাসি, তাই না? তাকেও তো সম্বোধন করি কন্যা বা পুত্র হিশাবে।

রুবাইয়াৎ আহমেদ

ধাবমান-এ প্রাণীর মুখ দিয়ে কথা বলানো কিংবা একাধিক প্রাণীকে সরাসরি চরিত্র হিশাবে হাজির করা হয়েছে, যেটা বাংলা সাহিত্যে এর আগে ঘটে নাই। একদম অভিনব। এই ধরনের সাহিত্যকে যখন আপনি মঞ্চে আনতে যাচ্ছেন এবং নিশ্চিতভাবেই আমরা যা দেখি, অর্থাৎ সোহরাব এক মহিষ-শাবক—নিশ্চয়ই কোনো মহিষ শাবক এসে মঞ্চে অভিনয় করবে না, মানুষই অভিনয় করবে সেখানে। সেটা করতে গিয়ে কি কখনো আপনার মনে হয় নাই, বিষয়টি অডিয়েন্স কীভাবে এক্সসেপ্ট করবে, আপনার শঙ্কা জাগে নাই কখনো?

শিমূল ইউসুফ

না।

রুবাইয়াৎ আহমেদ

আমি অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা ভেবেছে, মহিষশাবক বলাতে হয়তো দুটি শিং দেয়া হবে, লেজ থাকবে—এভাবে মহিষের একটা আদল। কিন্তু দেখা গেল যে তার কিছুই নাই। অন্যান্য পারফরমারদের মতো সেও পারফরমার। কিন্তু তাকে বলা হচ্ছে মহিষশাবক।

শিমূল ইউসুফ

এবং সে তার পারফর্মেন্স দিয়ে প্রমাণ করছে যে, সে মহিষশাবক। কিন্তু সে মানবিক গুণের সবকিছুই বোঝে। আমার যেটা মনে হয়েছে, সেটা হলো, আমি প্রাণিপুত্রের সঙ্গে সারাক্ষণই কথা বলতাম। এবং ও আমার কথা এত বুঝত যে, আমি নিজেই অবাক হয়ে যেতাম। আমিও ওর কথা বুঝতাম। ও কী কী চায়, ও কী বলবে, ও কী করবে। যেমন, আমি যখন গান গাইতাম তখন ও আমার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে থাকত। যতক্ষণ গান গাইতাম আমি। আমি খুব মিস করি এখন, যখন বাইরে থেকে আসি, বিদেশ থেকে আসি, তার আগের দিন কিন্তু আমার প্রাণীর আচার-আচরণ একটু অন্যরকম হয়ে যেত। সে বিমর্ষ থাকত—যে কয়দিন আমি বাইরে থাকতাম। কিন্তু আমি আসার আগের দিন থেকে সে একটু উৎফুল্ল থাকত। তারপর তাকে গোসল করানো হতো—

রুবাইয়াৎ আহমেদ

সে টের পেত।

শিমূল ইউসুফ

হ্যাঁ টের পেত—কী করে, হ্যাঁ—সিক্সথ সেন্স তাদের এত বেশি যে, আমার আপনজন যে, সে চলে আসবে। এবং আমি যেদিন আসতাম সেদিন আমি দেখতাম ও নিচে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। সেই যে আদর, ফিরে আসার পরে, সেটা তো আমার বুঝতে বাকি থাকত না। এই আদর তো মিথ্যা না। আর আমরা মানুষরা যত সহজে মানুষকে ঘৃণা করতে পারি, শর্তসাপেক্ষে ভালোবাসতে পারি, প্রাণীদের কিন্তু তা নয়। প্রাণীরা নিরপেক্ষ হয়ে শর্তহীন হয়ে ভালোবাসে। কাজেই ওদের বিবেচনার মধ্যে মালিক বা ঐ ধরনের কোনো কিছু থাকে না। তারা ওই একজনকেই মেনে নেয় বা পরিবারের সবাইকে মেনে নেয় যে এরা।

রুবাইয়াৎ আহমেদ

নির্মল ভালোবাসা।

শিমূল ইউসুফ

হ্যাঁ, নির্মল ভালোবাসা। পবিত্র ভালোবাসা। এর মধ্যে কোনো খাদ নাই। কাজেই ওইটা ফিল করতে পারলে কাজটা আর কঠিন মনে হয় না। এশাও খুব ছোটবেলা থেকেই এই প্রাণীদের সঙ্গে মিশতে মিশতে ওরও একটা ধারণা হয়েছে যে, প্রাণীদের সঙ্গে কথা বলার অর্থাৎ আদান-প্রদান কীরকম হবে। আমার সম্রাটের সাথে কিন্তু সেলিম ভাইয়ের ভীষণ ভাব ছিল। সেলিম ভাই এলে সম্রাট ভীষণ খুশি হতো। সেলিম ভাইকে দেখে লেজ নাড়তে নাড়ত, মানে সে আকুল হয়ে যেত। কাজেই এই যে ভাব প্রকাশের ভঙ্গিগুলো, সেগুলো ফলো করলেই কিন্তু বোঝা যায়, কী করে একসময় প্রাণী মানুষের জায়গায় দাঁড়িয়ে যায়।

রুবাইয়াৎ আহমেদ

মঞ্চে তো প্রকৃত অর্থে আমাদের অভিজ্ঞতার এক ধরনের পুনর্নির্মাণ হয়। সেটা অন্যরূপে হয়, অন্যভাবে হয়। ধাবমান-এর যে চরিত্রগুলো আপনি মঞ্চে উপস্থাপন করেছেন, সেক্ষেত্রে আপনার কী অভিজ্ঞতা কাজ করেছে?

শিমূল ইউসুফ

আমার কাছে প্রথম যেটা মনে হয়েছে, এটা সেলিম ভাইয়ের একটা স্বপ্ন। খুব সুন্দর স্বপ্ন। সে স্বপ্নটাকে যথাসম্ভব সুন্দরভাবে যেন আমি মঞ্চে উপস্থাপন করতে পারি। এবং সেলিম ভাইয়ের দুঃস্বপ্ন—স্বপ্নভঙ্গ যেটা—সে স্বপ্নভঙ্গটা হলো অন্বিতার অসুস্থতা এবং এর অনিবার্য পরিণাম যেটা ঘটবে সেটা সেলিম ভাই বুঝে গিয়েছিলেন। সুস্থ ফুটফুটে অন্বিতা আর রোগাক্রান্ত অন্বিতা এই দুটোকে মেলাতে চেয়েছিলাম মঞ্চে। মানুষ স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে, স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখতেও ভালোবাসে। সোহরাবকে সে বিজয়ী বীর করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার স্বপ্নভঙ্গ হয়। সেলিম ভাইয়ের তখনকার মানসিক অবস্থা নিয়েই কিন্তু আমার পুরোটা কাজ। তাঁর স্বপ্ন দেখা এবং স্বপ্নভঙ্গ।

রুবাইয়াৎ আহমেদ

প্রথম শো হয়ে যাওয়ার পর বাচ্চু স্যার (নাসির উদ্দীন ইউসুফ) বলেছিলেন যে, বর্ণনাত্মক বাংলা নাট্যাভিনয়-রীতি বা উপস্থাপনা-রীতির যে লড়াই তারা দীর্ঘদিন ধরে করছেন, তার একটি আদর্শরূপ যদি ধরি, তাহলে ধাবমান-কে তিনি সেই উদাহরণ হিশেবে উপস্থাপন করতে চান। এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী?

শিমূল ইউসুফ

আমি তো আমার জায়গায় থেকে চেষ্টা করেছি। ওই যে প্রথমেই বললাম আমি আঙ্গিকের বাইরে গিয়ে তো কোনো কাজ করবো না। অত বড় ঔদ্ধত্যও আমার নাই। আর আমি শিখিও নাই। সবচেয়ে বড় কথা আমি সেলিম ভাই ও বাচ্চুর সঙ্গে থেকে যা শিখেছি, তা কিন্তু এই আঙ্গিকের ভিতর থেকেই শিখেছি। ন্যারেটিভ স্টাইল বলি বা ডায়লেক্টিক স্টাইল বলি, যে-কোনো স্টাইল বলি না কেন, ওগুলো তো আমি ওনাদের কাছ থেকে শিখেছি। সেই আঙ্গিকের বাইরে গিয়ে কাজ করা তো আমার পক্ষে সম্ভব না। কাজেই ওই আঙ্গিকের ভেতরে থেকে যতটা আমি পেরেছি সেভাবেই নাটকটিকে মঞ্চে আনার চেষ্টা করেছি। এটা যদি কিছু হয় তাহলে তো হলো, আর না হলে তো কিছুই…


সাইমন জাকারিয়ার স্ক্রিপ্ট না। ওটা বিনোদিনী দাসীরই নিজের লেখা


 রুবাইয়াৎ আহমেদ

 ধাবমান নির্দেশনা দিতে গিয়ে কি আপনার মনে হয় নি, নাসির উদ্দীন ইউসুফের কোনো প্রভাব আপনার ভিতরে ক্রিয়াশীল আছে?

শিমূল ইউসুফ

এটা তো থাকবেই। এবং শুধু নাসির উদ্দীন ইউসুফ না পুরো ঢাকা থিয়েটারের একটা প্রভাব কিন্তু থাকবেই। কারণ এই জীবনে যতগুলো নাটক করেছি তার থেকে বেরিয়ে এসে কোনো একটা কাজ করতে গেলে তখন—মানে যে কাজটি আমাকে করতে হয়েছে সেটা হলো—আমাকে সঙ্গীতনির্ভর, নৃত্যনির্ভর কাজ করতে হয়েছে। এবং স্বপ্ন যেটা আমি বললাম—স্বপ্ন রঙিন, আমার মঞ্চে কিন্তু কাপড়গুলো বা স্টিকগুলো—যে স্টিকগুলো নিয়ে মান্দিরা নাচে—সেগুলো কিন্তু রঙিন করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু যদি কস্টিউম বলি, কস্টিউমে কিন্তু একটা ধারাবাহিকতা আছে। সে কস্টিউমের কালারগুলো কিন্তু খুব লাইট। লাইট কালারের মধ্যে থেকে আমি কস্টিউম করার চেষ্টা করেছি। বিকজ লাউড হয়ে গেলে অনেক খারাপ লাগবে দেখতে। শুধু লাউডের মধ্যে আমার একটা জিনিশই লাউড আছে, সেটা হলো গাউনটা। আমি প্রথমে পরাই যে গাউনটা—গেরুয়া রঙের। এছাড়া আর সব কস্টিউমের কালার কিন্তু লাউড না, খেয়াল করলে বোঝা যায়। কী বলেছিলি তুই আমাকে?

রুবাইয়াৎ আহমেদ

জি, নাসির উদ্দীন ইউসুফের প্রভাব—

শিমূল ইউসুফ

এ প্রভাব যদি থাকেও তাহলে আমি তো খারাপ বলব না। পজেটিভ অর্থে যদি কেউ ধরে যে প্রভাব আছে, তাহলে তো এটাতে কিছু মনে করার নাই। কারণ আমি এত বছর তার আন্ডারে কাজ করেছি, আমার মধ্যে তো প্রভাব থাকতেই পারে। এটা তো অস্বীকার করার কিছু নাই, তাই না?

রুবাইয়াৎ আহমেদ

পরবর্তী সময়ে আরো নির্দেশনা দেবেন?

শিমূল ইউসুফ

এখনো বলতে পারি না আশলে।

রুবাইয়াৎ আহমেদ

আপনি সর্বশেষ অভিনয় করেছেন ‘বিনোদিনী’তে—বিনোদিনী দাসীর আত্মজীবনী, সাইমন জাকারিয়ার স্ক্রিপ্ট—

শিমূল ইউসুফ

সাইমন জাকারিয়ার স্ক্রিপ্ট না। ওটা বিনোদিনী দাসীরই নিজের লেখা আত্মজীবনী। ও শুধু গবেষণা করে কিছু কিছু জায়গায়, মানে বিনোদিনী দাসী যে সব নাটকে অভিনয় করেছিলো, সেসব নাটকের কিছু কিছু অংশ ঢুকিয়ে দিয়েছে। এগুলো হচ্ছে, শত্রু-সংহার, নীলদর্পণ, মৃণালিনী, মেঘনাদবধকাব্য এবং গিরিশ ঘোষের লেখা চৈতন্যলীলা। এই গবেষণাটুকু ও করেছে। আর প্রথম মুখবন্ধটি তো সেলিম ভাইয়ের লেখা, যেখানে এই সময়ের একজন অভিনেত্রীর কাছে বিনোদিনী তার পুড়ন্ত চন্দন কাঠের কলমটি দিয়ে বলেন, ‘বয়ে নিয়ে যাও লোক লোকান্তরে, বলো ভালবাসায় ভাগ্য ফেরে না।’ এই বর্ণনা তো সেলিম ভাইয়ের লেখা। কারণ আমি বলেছিলাম সেলিম ভাইকে, মঞ্চে তোমার শব্দ উচ্চারিত হবে আমার মুখে, তারপর বিনোদিনীর আত্মজীবনী। কারণ সেলিম আল দীনের বর্ণনার প্রতিটি শব্দ আমার বুকের ভেতর সাহস এবং শক্তি সঞ্চার করে।

রুবাইয়াৎ আহমেদ

বিনোদিনী-র পর ধাবমান-এ আপনি মঞ্চে এসেছেন। কিন্তু অন্যান্য নাটকে আপনার যে ধরনের পারফর্মেন্স দেখি, ধাবমান-এ আপনি সেভাবে অভিনয়ে আসেন নি। পরবর্তী সময়ে কি মঞ্চে অভিনয় করার ইচ্ছে আছে?

শিমূল ইউসুফ

যদি কাস্ট করে তাহলে অবশ্যই কাজ করব। আর ধাবমান-এ কাজ করতাম না… মানে একজন ডিরেক্টর হয়ে আবার অভিনয় করছি, সবই করছি—মানে নিজের কাছেই লজ্জা লাগে। কিন্তু একটা যদি গানের মেয়ে পেতাম আমি—

রুবাইয়াৎ আহমেদ

আপনার সহকারী নির্দেশক হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে আমি জানি, আপনি যে জায়গাগুলোতে ছিলেন সে জায়গাগুলোতে আপনার বিকল্প কেউ ছিল না।

শিমূল ইউসুফ

যদি থাকত তাহলে আমি এটাতে অভিনয় করতাম না। আমি ব্যাকস্টেজে মিউজিক করতাম। এইটাই আমার পরিকল্পনায় ছিল। কিন্তু যেহেতু পেলাম না, সে কারণে এই গানগুলো গাওয়ার জন্যেই আমাকে মঞ্চে উঠতে হয়। আর যে দুটো ন্যারেশন আমি বলি, সেটাও কিন্তু গানের সঙ্গেই ন্যারেশনটা আছে। কাজেই ন্যারেশন দুটো আমাকে বলতে হয় গানের কারণেই।

রুবাইয়াৎ আহমেদ

প্রথম শো হয়ে যাওয়ার পর, একটি পত্রিকায় সমালোচনা লিখতে গিয়ে একজন এর সঙ্গে জাপানি বুনরাকু এবং তার ড্রেসের সঙ্গেও সাদৃশ্য খোঁজার চেষ্টা করেছেন। এ সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কী?

শিমূল ইউসুফ

বুনরাকু থিয়েটার আমি কখনো দেখি নি। আর আমি যা দেখেছি, আমি বারবারই বলছি, আমার দেশের ঐতিহ্যবাহী নাট্যাঙ্গিক। এই ফর্মগুলো আমার দেখা। বুনরাকু দেখি নি, ওখানকার পুতুল নাচও দেখি নি। ওখানকার কোনোকিছুই আমি দেখি নি। যা দেখেছি তা ওদের ফিল্ম। কুরোশাওয়ার ফিল্ম। তো আমাদের কস্টিউমে আমি যা আনার চেষ্টা করেছি, যেটা আমি বারবারই বলছি, সেলিম আল দীনের স্বপ্ন। এই স্বপ্নটা কত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা যায়—সেখানে কস্টিউমে একটা সৌন্দর্য আনার জন্য ওই ফিশারম্যান প্যান্ট, ওই ঢিলা প্যান্ট আর উপরে পাঞ্জাবিটা দিয়েছিলাম। এখানে কী হয়, গ্রামের নাটক মানেই লুঙ্গি, ফতুয়া, গলায় গামছা—এরকম পরিয়ে দেয়। সেটা আমাদের প্রোডাকশানে কখনোই আসে নি। লুঙ্গিটাও যদি আগে পড়ে থাকে হাত হদাই-এ—সে লুঙ্গিগুলোও কিন্তু আলাদা লুঙ্গি।


মানুষ এমনই একটা প্রাণী, সে তার সুবিধামতো ধমর্কেও তার মতো করে নেয়, রাজনীতিও তার মতো করে নেয়। অ্যাবসলিউটলি তার সুবিধার কারণে


রুবাইয়াৎ আহমেদ

ধাবমান-এর কততম শো পর্যন্ত দেখতে চান?

শিমূল ইউসুফ

আমার ইচ্ছে তো ১০০। যদি হয়, যদি বেঁচে থাকি ততদিন, তাহলে দেখতে চাই। সবাই যদি, মানে আগ্রহী থাকে—পারফর্মারদের আগ্রহই সবচেয়ে বড় কথা। সময় দিতে পারে যদি সবাই, নিশ্চয়ই এটা দেখতে চাই আমি।

রুবাইয়াৎ আহমেদ

ধাবমান-কে কেন্দ্র করে কি কোনো মজার স্মৃতি আছে?

শিমূল ইউসুফ

(হেসে) না, না, মজা তো পাই নাই। কারণ এত কাজ করতে হয়েছে আমাকে!

রুবাইয়াৎ আহমেদ

এমন কোনো ঘটনা কি করতে করতে ঘটে নাই—

শিমূল ইউসুফ

ও আচ্ছা, আমি কস্টিউমের ব্যাপারে আরেকটা কথা বলে নেই। আমি কিন্তু কস্টিউম হিসেবে পাঞ্জাবিই দিয়েছি। পাজামাগুলো অনেকটা লুঙ্গির মতোই মনে হয়। কিন্তু, যেহেতু নাচ অনেক বেশি আছে, তারপর আমাদের যেটা হয় ঢাকা থিয়েটারের নাটকে—আমরা কিন্তু কখনোই স্ট্রেইট লুঙ্গি ব্যবহার করি না। পায়জামার মতো করে কিন্তু লুঙ্গিটাকে ব্যবহার করি। সে কারণেই বনপাংশুল-এও যখন আমি লুঙ্গি দিয়েছিলাম—খোলা লুঙ্গি, কাটা লুঙ্গি। তার নিচে কিন্তু প্যান্ট ছিল—ঢোলা পান্ট। এত নাচতে হয়, এত লাফালাফি করতে হয় যে, আমরা ওই লুঙ্গিতে ভরসা পাই না। আর তারপর মেয়েদের যেটা আমি দিয়েছি সেটা কিন্তু শাড়ি—ফুলস্লিভ ব্লাউজ, শাড়ি আর ভেতরে পায়জামা। পেডিকোট দেয়া যেত, কিন্তু নাটকে নাচানাচি এবং অনেক মুভমেন্টের কারণে ওই রিস্কটা আমি নেই নি। এ কারণে পায়জামা দিতে হয়েছে। তাও চুরিদার পায়জামা। এগুলোর সঙ্গে জাপানি পোশাকের কোনো মিল আছে কি না তা আমি জানি না। আরেকটা কথা, যদি মিল থেকেও থাকে আমরা কিন্তু প্রাচ্যের লোক—

রুবাইয়াৎ আহমেদ

জাপান তো প্রাচ্যের মাঝেই পড়ে…

শিমূল ইউসুফ

হ্যাঁ। এবং আমার যতটুকু জ্ঞান আছে তাতে আমি বলতে পারি যে, বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের সময় তিব্বত থেকে শুরু করে বাংলাদেশ হয়ে ইন্ডিয়া হয়ে থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়া হয়ে এই যে পুরো চেইন, এটা কিন্তু আমাদের আঙ্গিক, আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সমস্ত কিছুর কিন্তু অনেক মিল পাওয়া যায়—

রুবাইয়াৎ আহমেদ

বাহিত হয়েছে।

শিমূল ইউসুফ

হ্যাঁ, বাহিত হয়েছে।

রুবাইয়াৎ আহমেদ

এসেছে এবং গিয়েছে—

শিমূল ইউসুফ

হ্যাঁ, বৌদ্ধ ধর্মের সঙ্গে সঙ্গে এটা কিন্তু বাহিত হয়েছে। কাজেই যদি কোনো কালচারাল মিল থেকেও থাকে, যদি আঙ্গিকগত কোনো মিল থেকেও থাকে—লাঠি খেলা কি জাপানে নাই? বাংলাদেশেও আছে, জাপানেও আছে, নেপালেও আছে—

রুবাইয়াৎ আহমেদ

তাদের মতো করে আছে।

শিমূল ইউসুফ

হ্যাঁ, তিব্বতেও আছে, ভুটানেও আছে, থাইল্যান্ডেও আছে, সব জায়গায় আছে। এটা তাদের মতো করে তারা করে। আমরা আমাদের মতো করি। কিন্তু আছে। এটার সাথে যদি আমি মনে করি যে, লাঠি খেলা ধাবমান-এ আছে এটা জাপানের কোনো নাটকেও আছে, কাজেই এটা ওখান থেকে নেয়া হয়েছে—কথাটা আসলে কতখানি গ্রহণ করার মতো সেই বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে।

রুবাইয়াৎ আহমেদ

ধাবমান-এ আমরা দেখতে পাই, ধর্ম ও রাজনীতি—দুটি খুব ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং শেষ পর্যন্ত দেখতে পাই যে, দুটি বিষয়ই মানুষের কল্যাণ করতে গিয়ে অনেক সময় মানবিকতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে যায়—এই বিষয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী? ধর্ম বা রাজনীতি কি এখন ব্যর্থ হয়ে গেছে মানুষের জন্যে? না কি মানুষ সেটা…

শিমূল ইউসুফ

মানুষ ব্যবহার করছে। ধর্মকেও ব্যবহার করছে, রাজনীতিকেও ব্যবহার করছে। মানুষ এমনই একটা প্রাণী, সে তার সুবিধামতো ধমর্কেও তার মতো করে নেয়, রাজনীতিও তার মতো করে নেয়। অ্যাবসলিউটলি তার সুবিধার কারণে। ঐ সুবিধাভোগী বলে আর কি। মানুষ জাতই তাই। এটা শুধু আজকের দিনে না, যদি হাজার বছর ধরে মানবজাতিকে দেখে আসি তাহলে আমরা কিন্তু এটাই দেখব। নিজেদের সুবিধার কারণে বারবার ব্যবহার করেছে তারা রাজনীতি ও ধর্মকে।

রুবাইয়াৎ আহমেদ

আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

শিমূল ইউসুফ

তোকেও ধন্যবাদ।

 

শ্রুতিলিখন : শাহাদৎ রুমন
সোহেল হাসান গালিব সম্পাদিত  বনপাংশুল পত্রিকা থেকে