হোম সাক্ষাৎকার আমার কোনো ইন্সপিরেশান নাই—ছিল না কোনোদিনই : অনুপম মণ্ডল

আমার কোনো ইন্সপিরেশান নাই—ছিল না কোনোদিনই : অনুপম মণ্ডল

আমার কোনো ইন্সপিরেশান নাই—ছিল না কোনোদিনই : অনুপম মণ্ডল
694
0

কবি অনুপম মণ্ডল এ বছর অর্জন করেছেন ‘আবুল হাসান সাহিত্য পুরস্কার-২০১৭’, তার ‘অহম ও অশ্রুমঞ্জরি’ পাণ্ডুলিপির জন্য।
অনলাইন সাহিত্যপত্রিকা ‘পরস্পর’ ও প্রকাশনা সংস্থা ‘অগ্রদূত অ্যান্ড কোম্পানি’ যৌথভাবে এই পুরস্কারটি প্রবর্তন করেছে ইউসিবিএল-এর সৌজন্যে ও সহযোগিতায়।

‘পরস্পর’-এর পক্ষ থেকে ঈদ উপলক্ষে তার মুখোমুখি হয়েছিলেন তরুণ কবি তুহিন খান।
তুহিনকে ভালোবাসা…

– সম্পাদক

তুহিন খান

আগে বলেন যে, আজকে কেমন আছেন?

অনুপম মণ্ডল

সত্যি বলতে কি, আমি ভালো নাই। পারিবারিক কিছু ঝামেলা চলছে। তবু… এই তো চলে যাচ্ছে বলতে হচ্ছে।

তুহিন খান

খারাপ লাগল ভাই। আচ্ছা, আমি খারাপ থাকার ব্যাপারটা ধরেই শুরু করি। আমরা যদি আপনার কবিতার সময় নির্ধারণ করতে চাই প্রচলিত নিয়মে, তাইলে আপনি দ্বিতীয় দশকের কবি। এসময়ের কবিরা একেকজন একেকরকম কাজ করলেও, সবার ভেতরে কমন একটা ব্যাপার হলো, সরব থাকা, একটু মজা করে যদি বলি, অ্যাকটিভ থাকা। আপনি বরাবরই খুব নীরব, নির্জন। আপনার কবিতারও সম্ভবত এই স্বভাবের সাথে কোথাও না কোথাও একটা মিল আছে। দ্বিতীয় দশকের একজন কবির এই নির্জনতার কারণ কী?

অনুপম মণ্ডল

এইটাই আমার স্বভাব। আমার সবটুকুই এই। কোলাহল ভালো লাগে না আমার। তো ওই কোলাহল থেকে নিজেকে লুকাতে গিয়েই হয়তোবা ভাষাটাও কিছুটা অমনই হয়ে গিয়েছে। খুব ছোটবেলা থেকেই মানুষকে এড়িয়ে চলেছি আমি। কথাবার্তাও তেমন বলতে ইচ্ছে করে না আমার কারোর সাথেই।

তুহিন খান

ছোটবেলার সাথে, আপনার চাইল্ডহুড বা পরিবেশ-প্রতিবেশের সাথে সম্ভবত এইসবের একটা যোগ আছে। আচ্ছা, ছোটবেলার গল্প বলেন একটু। আপনার জন্ম কি খুলনাতেই?

অনুপম মণ্ডল

হ্যাঁ খুলনাতেই। কৃষ্ণনগর। আমার মামার বাড়ি। ছোটবেলার তেমন কোনো গল্প নাই। আমার মার ধারণা ছিল পাড়ার ছেলেরা ভালো না। কারোর সাথেই মিশতে দিতেন না তেমন। ওই সময় একা একাই ঘুরতাম। কল্পনা করতে শেখা ওইখান থেকেই। বাবা স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তার লাইব্রেরি থেকে গল্পের বই এনে পড়তাম। জানেন অনার্স সেকেন্ড ইয়ারের আগে কবিতাই পড়ি নি আমি, ওই পাঠ্যবইয়ের কবিতা ছাড়া। আমি গল্পকার হতে চেয়েছিলাম।

তুহিন খান

ইন্টারেস্টিং! তার মানে, ছোটবেলায় আপনার কবিতাকেন্দ্রিক কোনো চিন্তা ছিল না?

অনুপম মণ্ডল

নাহ। বরং কবিতা খুবই বিরক্তিকর একটা ব্যাপার ছিল। এতটাই যে, বাংলার কোনো মেয়েকে বিয়ে করব না এমন একটা প্রতিজ্ঞা করে ফেলেছিলাম। আমার ধারণা ছিল বাংলা-পড়া মেয়েরা রাত-দুপুরে স্বামীকে কবিতা পড়ে শোনায়। হা হা হা।

তুহিন খান

হা হা হা! কবিতা বিরক্ত লাগার ব্যাপারটা কেন ছিল? আপনার যে মানস তৈরি হইছিল, তাতে তো কবিতা ভালোই লাগার কথা…

অনুপম মণ্ডল

জানি না। এই ব্যাপারটার কোনো ব্যাখ্যাই আমার কাছে নাই।

তুহিন খান

আচ্ছা, মার বাধা আর বাবার বই পড়ার প্রতি উৎসাহ—এর বাইরে আর বিশেষ কিছু কি মনে পড়ে, যেটা আপনাকে আপনার পরবর্তী জীবনের এবং যাপনের দিকে ঠেলে দিয়েছে?

অনুপম মণ্ডল

বাবাও কখনো উৎসাহ দেন নি। আমি শুধু তার লাইব্রেরি থেকে বই এনে পড়েছি, তিনি উৎসাহ দেন নাই। নিরুৎসাহিতও করেন নাই। আমার ফ্যামিলি আমার লেখালেখি পছন্দ করে না একেবারেই। লেখালেখিতে আসার পেছনে কোনো কারণ নাই। হুট করেই লিখতে আসা আমার।

তুহিন খান

এখন কি উনাদের দৃষ্টিভঙ্গি পালটে গেছে, না আগের মতোই? পুরস্কারপ্রাপ্তির ব্যাপারটা উনারা জানেন?

অনুপম মণ্ডল

হ্যাঁ জানেন। তবে দৃষ্টিভঙ্গি আগের মতোই আছে।

তুহিন খান

আপনার শিক্ষাজীবনের কথা বলেন।

অনুপম মণ্ডল

বাবার স্কুলে পড়েছি ক্লাস এইট পর্যন্ত। কপিলমুনি থেকে এসএসসি। খুলনা সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি। খুলনা ইউনিভার্সিটি থেকে অনার্স মাস্টার্স সমাজবিজ্ঞানে। খুব ভালো ছাত্র ছিলাম না। এসএসসিতে পদার্থবিজ্ঞানে ফেল করেছিলাম।

তুহিন খান

ইন্টারে কি সাইন্স থেকে আর্টসে মাইগ্রেট করছিলেন?

অনুপম মণ্ডল

হ্যাঁ।

তুহিন খান

ইউনিভার্সিটি লাইফটার কথা বলেন। খুলনা, আমরা জানি যে, দেশের একমাত্র ভার্সিটি, যেখানে প্রকাশ্য কোনো ছাত্ররাজনীতি নাই, ক্যাম্পাসটাও খুব ঠান্ডা। ভার্সিটি লাইফটা কেমন কেটেছে?

অনুপম মণ্ডল

ভালো। খুবই ভালো। রাত-দুপুর পর্যন্ত ক্যারাম খেলে মাঠে মাঠে ঘুরেছি। তবে একা একাই ঘুরতাম আমি। বন্ধু ছিল না তেমন। ওই নিঃসঙ্গতার কোনো এক পর্যায়ে কবিতা পড়তে শুরু করেছিলাম।

তুহিন খান

সেকেন্ড ইয়ারের সময়টাতে আপনার কবিতা পড়ার শুরু। এটা কি বিশেষ কোনো কারণে? না অবচেতনেই? অপছন্দ থেকে পড়ার শুরুটা ঠিক কিভাবে হলো?

অনুপম মণ্ডল

আমি গল্প লিখেছিলাম কিছু। ওইগুলা কিছুই হচ্ছিল না। তো ভাবলাম এই যে জীবনটা, একে তো একেবারেই বাজে খরচ করা যায় না। তো অন্য কিছুই পারি না আমি। ভাবলাম কবিতা লেখার চেষ্টা করে দেখা যাক। লিখতে গেলে তো পড়তেই হয়, তাই কবিতা পড়তে শুরু করেছিলাম। জীবনানন্দকে দিয়েই।

তুহিন খান

গল্প যে কিছু লেখলেন, এই শুরুটা কখন? মানে, জানতে চাচ্ছি, আপনার আর্ট সৃষ্টির তাড়নায় যে লেখালেখি, গল্প বা কবিতা, এর শুরুটা কখন? ভার্সিটিতে উঠার পরে, না আগেই?

অনুপম মণ্ডল

পরে। সেকেন্ড ইয়ারের শুরুতে। কবিতা সম্ভবত সেকেন্ড ইয়ারের শেষে লিখেছি। সবই জীবনানন্দ টাইপ। কুয়াশা শিশির এইসব নিয়ে।

তুহিন খান

মানে, সেকেন্ড ইয়ারেই আপনার লেখালেখির দৃশ্যমান সূচনা। এর আগের যে সময়টা, এই সময়টাতে, লেখকই হবেন বা এই ধরনের কিছু কি ভাবছেন?

অনুপম মণ্ডল

নাহ্। তেমন কোনো ভাবনা আসেই নি আমার মাথায়।

তুহিন খান

গল্প যেগুলা লিখছিলেন, ছাপা হইছিল কোথাও?

অনুপম মণ্ডল

নাহ্। পাঠাই নি কোথাও। ওইগুলা ছিঁড়ে ফেলছিলাম পরে।

তুহিন খান

ছিঁড়লেন কেন! থাকত!

অনুপম মণ্ডল

ওইগুলা তেমন কিছুই হয় নি। অবশ্য এখন যা লিখছি তা যে হচ্ছে তা কিন্তু বলছি না। তবু… কেন জানি মনে হয় গল্প ঠিক আমার জন্য না।


ওই সময় কবিতা লেখাটা খুবই লজ্জার ব্যাপার ছিল। সম্ভবত এখনও।


তুহিন খান

কবিতায় আসি। জীবনানন্দ দিয়েই শুরু করলেন! আগে থেকে চিনতেন উনারে? মানে পড়ছিলেন উনার কোনো কবিতা?

অনুপম মণ্ডল

হ্যাঁ। পাঠ্যবইয়ে পড়েছিলাম। ওইটুকুই। এর বেশি আর না।

তুহিন খান

জীবনানন্দকে পেলেন কিভাবে? কারোর মাধ্যমে, না একাই? এই প্রসঙ্গে, আরো একটা প্রশ্ন কইরা রাখি। এই যে ভার্সিটিতে সাহিত্যচর্চা শুরু হলো, কোনো সার্কেল কি ছিল? বা সতীর্থ কেউ?

অনুপম মণ্ডল

পাঠ্যবইয়ে তার কবিতাগুলা মোটামুটি ভালোই লাগত। সম্ভবত নেচারের সাথে একটা সংযোগ থাকার কারণেই। ভার্সিটিতে সতীর্থ কেউ ছিল না। কোনো সার্কেলও না। আমি লুকিয়ে কবিতা লিখতাম, বন্ধুরা ঘুমিয়ে গেলে। খাতাটা তারপরে লুকিয়ে রাখতাম। ওই সময় কবিতা লেখাটা খুবই লজ্জার ব্যাপার ছিল। সম্ভবত এখনও। সবাই ঘুমালে লিখতে বসি।

তুহিন খান

পুরো ভার্সিটি লাইফটা কি এভাবেই কাটল? একা একাই কবিতা লিখে? শিল্পের সাথে লেগে থাকা, এই যে জার্নি, এটা খুব চাপের ব্যাপার, আর কবিতা হইলে তো কথাই নাই। একটা যেকোনো ইন্সপিরেশান কবি-সাহিত্যিকদের লেগে থাকতে প্রেরণা দেয়, এবং বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই সেটা হয় সার্কেল বা আর্টসূত্রের বন্ধুরা। আপনি ওইসময় এই কবিতা লেখার দুরূহ সিদ্ধান্ত নিয়ে সেটা একা চালিয়ে গেলেন কিভাবে? ইন্সপিরেশানটা ঠিক কিভাবে পেলেন? কিছুদিন পর হতাশ লাগত না?

অনুপম মণ্ডল

আমার কোনো ইন্সপিরেশান নাই। ছিল না কোনোদিনই। ওই যে বলেছি জীবনটাকে একেবারেই বাজে-খরচ করতে ইচ্ছে করে না। তাছাড়া আর একটা কারণ আছে, আমি বাস্তবজীবনে খুবই ব্যর্থ একজন মানুষ। তেমন কিছুই পারি না আমি। এইটাও একটা কারণ, যা কবিতার পিছে লেগে থাকতে হেল্প করেছে। আমি পড়তাম খুবই। ওইটাই মূলত পথ থেকে ছিটকে পড়তে দেয় নি। আগে এমন অবস্থা ছিল যে, না পড়ে একটা দিন থাকতে পারতাম না।

তুহিন খান

যাক, সেক্ষেত্রে মনে হয়, যথাযথ লোকের সাথেই দেখা হইল পয়লা, জীবনানন্দ! ওই সময়ের কবিতায় জীবনানন্দের প্রভাব ছিল বললেন। প্রস্তুতিপর্বের ওই কবিতা থেকে সিরিয়াস কবিতা লেখার দিকে মন দিলেন কখন? মানে, চলতি অর্থে ‘সিরিয়াস’ বললাম আর কি!

অনুপম মণ্ডল

ডাকিনীলোক লেখার সময়। যদিও আমার লেখালেখিকে ওই অর্থে ‘সিরিয়াস’ বলা যাবে না বোধহয়। আমি শেষ পর্যন্ত লিখব কিনা আদৌ জানি না। এই যেমন ধরুন, অহম ও অশ্রুমঞ্জরির পরে বলতে গেলে আর লিখি নি। হয়তো আবার কোনো এক সময় লিখব। হয়তো আর লিখবই না।

তুহিন খান

এইটা কি ঔদাসীন্য, না অন্য কিছু? লেখালেখিকে সিরিয়াসলি না নেওয়াটা কেন? নাকি হেলাল হাফিজের মতো অহেতুক ভয়?

অনুপম মণ্ডল

একটা ভয় তো আছেই—হচ্ছে কি হচ্ছে না। আমি মূলত না পড়লে লিখতে পারি না। যেহেতু পড়তে পারছি না, লেখালেখিও হচ্ছে না। তা ছাড়া নিজের কবিতার অনুকরণ আমার পছন্দ না। আমার না লেখাটাকে ঔদাসীন্য মনে হয় বলা যাবে না। হয়তো কোনো টেক্সট লুকিয়ে রয়েছে যা আমাকে লিখতে ফোর্স করবে। অহম ও অশ্রুমঞ্জরি-র ক্ষেত্রে এমনটি হয়েছিল। ভেবেছিলাম আর হবে না আমাকে দিয়ে।
.

28928872_2126580357570439_1533912349_o

বইয়ের লিংক : অহম ও অশ্রুমঞ্জরি

.
তুহিন খান

আগের আলাপটায় ফিরি। প্রথম কবিতা ছাপা হইল কবে? আরেকটু এক্সটেন্ড করি সওয়ালটা, এই যে কবিতা লেখলেই কবি হওয়া যায় না, ছাপাইতে হয়, ‘মূলধারা’র সাথে পরিচয় হওয়া লাগে, তাদের সাথে সম্পর্ক, সিন্ডিকেট [ভালো/খারাপ দুই অর্থেই বললাম] এসব ব্যাপার বুঝতে শুরু করলেন কবে থেকে? এসব আপনারে প্রভাবিত করল কি? কিভাবে?

অনুপম মণ্ডল

আমার প্রথম লেখা কবিতা কবে ছাপা হইছিল মনে নাই। সম্ভবত ২০০৯ এর দিকে। তবে এই ‘সিন্ডিকেট’ বা ‘মূলধারা’ এরা আমার কাছে এখনও রহস্যময়। আমি কারোর সাথেই কবি হওয়ার জন্য যোগাযোগ করতে যাই নাই। যাদের কবিতা আমার ভালো লাগত তাদেরকে কবিতা পাঠাতাম। ওইভাবেই দুইএক জনের সাথে পরিচয় আমার। আর তারা আমাকে প্রভাবিত করতে পেরেছে বলে মনে হয় না।

তুহিন খান

প্রথম কবিতা কই ছাপা হলো? কিভাবে মাথায় এল ছাপানোর ব্যাপারটা? বলেন।

অনুপম মণ্ডল

সম্ভবত ‘কালের কন্ঠে’। সাহিত্যপাতায় না। সুহৃদ বা অন্য কোনো একটা নামে ওরা একটা পেজ বার করত মূল পাতার সাথে। ওইখানে ছাপা হইছিল। ভার্সিটিতে অনেক পেপার রাখা হতো। ওইসব পড়তে পড়তেই ছাপাতে ইচ্ছে হয়েছিল।

তুহিন খান

এইটা কত সালে যেন?

অনুপম মণ্ডল

২০০৯-এর শেষের দিকে।

তুহিন খান

তখন কি অনলাইনকেন্দ্রিক কোনো সাহিত্যচর্চার সাথে পরিচয় ছিল?

অনুপম মণ্ডল

নাহ্। এইটা জেনেছি মনে হয় আর ৪ বছর পরে।

তুহিন খান

সাধারণত লিটলম্যাগরে কেন্দ্র কইরাই এই গত দুই দশক আর চলতি দশকের সাহিত্যচর্চা। চলতি দশকে আবার যোগ হইছে ওয়েবজিন। আপনার ক্ষেত্রে কেন জাতীয় দৈনিক দিয়ে শুরু হইল জার্নিটা, তা পিছনের আলাপে অনেকটাই খোলাসা হয়। তবুও, লিটলম্যাগের দিকে ঝুঁকলেন না কেন?

অনুপম মণ্ডল

লিটলম্যাগ বলে যে কিছু আছে এইটা জানতামই না আমি। যেহেতু হুট করেই লিখতে এসেছি। আর সামনে যেহেতু জাতীয় দৈনিকগুলাই ছিল ওইখানেই লিখতে থাকলাম। তাও সাহিত্য পাতা না।

তুহিন খান

খুব ভাঙচুর, বিদ্রোহ বা শুধুই গিমিকের যে প্রবণতা একালের কবিদের, বা সব নতুন কবিরই, আপনার ভিতরে কি সেইরকম কিছু জাগে নাই তখনও? বা এখনও? আপনি এক লেখায় বলছেন, কবিতা ধ্যানের মতো লাগে আপনার কাছে। এইটাই কি এর কারণ?

অনুপম মণ্ডল

আমার খুব ভাঙচুর করার ইচ্ছে কখনোই হয় নাই। আমি নিজেকে খুঁড়ে যতটুকু পেয়েছি তারই অনুবাদ করে গেছি মাত্র। এর বেশি কিছু না।


ঐশী বলে কিছু আছে কি আমার জানা নাই। থাকলেও আমার উপর ভর করে নি। কবিতা ব্যাপারটাই আমার কাছে নির্মাণের।


তুহিন খান

মানে, ধ্যানের ব্যাপারটাই কাজ করে ভেতরে?

অনুপম মণ্ডল

বলতে পারেন ওইটাই। খুব শান্ত স্নিগ্ধ কিছু। যা মৌন কিন্তু ধ্বনিময়। আমি তার জন্যই অপেক্ষা করেছি।

তুহিন খান

এই সূত্র ধইরা, আগের আলাপটারে একটু স্টপ রাইখা, অন্যদিকে যাই। কবিতারে কি আপনার প্রোফেটিক কিছু মনে হয়? ঐশ্বরিক? কবিতার ব্যাপারে এই ধারণা একসময় ছিল। কিন্তু একালের কবিরা প্রায় সবাইই এই ধারণাটারে ডিনাই করেন। তারা কবিতারেও নির্মাণের ব্যাপারই ভাবেন, এমনকি, কবিতায় ‘ভাব’ যে ব্যাপার, একেও তারা ‘অভিজ্ঞতা’র সুমিত প্রকাশ বলেই ব্যাখ্যা করেন। আপনি কবিতার এই জায়গাটাকে কিভাবে দেখেন? এই প্রশ্নের সাথে জুড়ে দিতে চাই, উপমহাদেশের দুটি প্রধান ধর্মেরই ধর্মগ্রন্থ, কবিতার প্রভাবাধীন।

অনুপম মণ্ডল

ঐশী বলে কিছু আছে কি আমার জানা নাই। থাকলেও আমার উপর ভর করে নি। কবিতা ব্যাপারটাই আমার কাছে নির্মাণের। আমি একটার পর একটা দৃশ্য নির্মাণ করি। একটু একটু করে। যতখানি নিখুঁত তাকে করে তোলা যায়।

তুহিন খান

ধ্যান বা ভাবের ব্যাপারটা সেক্ষেত্রে কী? আপনার এক লেখায় এই ধ্যানকে আপনি ঋষীর ধ্যানের সাথেও তুলনা করেছিলেন…

অনুপম মণ্ডল

ধ্যান ব্যাপারটাকে আমি কিছুটা এইভাবেই দেখেছি, যেমন ধরুন কোনো একটা বিষয় নিয়ে যে একাগ্রতা, অবিচলতা। একজন চোখ বন্ধ করে বসে রয়েছে। স্তব্ধ। অথচ তার ভেতরে কত ধ্বনি প্রতিধ্বনির বিচ্ছুরণ ঘটে চলেছে। ওইটুকুই মাত্র নিয়েছি আমি আমার কবিতাকে ব্যাখ্যা করতে।

তুহিন খান

সেক্ষেত্রে, ব্যাপারটারে ‘একাগ্রতা’ অর্থে নিয়েছেন আপনি, এরকম বলা যায়। তাই তো?

অনুপম মণ্ডল

হ্যাঁ।

তুহিন খান

আগের আলাপে ফিরি। প্রথম কবিতা ছাপার পরে অনুভূতিটা বলেন। কারো সাথে শেয়ার করেছিলেন ওইসময়? কোনো কমপ্লিমেন্ট?

অনুপম মণ্ডল

শেয়ার করি নাই। তবে ওই ঘটনার পরে ভেবেছিলাম কবিতা লেখার চেষ্টা করা যাক কিছুদিন। তার পর থেকেই লিখছি। প্রথম দিকে লেখা না প্রকাশিত হলে লিখতাম না আর। অন্য কিছু ট্রাই করতাম।

তুহিন খান

অন্য আর কী ট্রাই করতেন তখন? গল্প লিখতেন? না প্রথম প্রেমের ওইখানেই ইতি?

অনুপম মণ্ডল

না গল্প না। প্রথম প্রেমের ওইখানেই ইতি। সম্ভবত ম্যাথটা ভালো করে করতাম। বা ধরুন সাধারণ জ্ঞানের বইটা… হয়তো ব্যাংকের চাকরিটা হয়ে যেত। যেটায় রিটেনে বাদ পড়েছিলাম অঙ্ক না পারার কারণে।

তুহিন খান

ভালো প্রসঙ্গ। ক্লাসের পড়া পড়ে না লেখকেরা, চাকরি-বাকরি করে না, এমন ধারণা প্রচলিত আছে। আপনার ছাত্রজীবন, বিশেষত ভার্সিটি-লাইফের পড়াশোনা এবং পরবর্তী এইম ইন লাইফ নিয়া কিছু বলেন। ক্যারিয়ার চিন্তাটা কী ছিল আসলে? কী হতে চেয়েছিলেন?

অনুপম মণ্ডল

শিক্ষক হতেই চেয়েছিলাম। যেটা আজ করছি। কিন্তু এইটা একটা ভুল ডিসিশান ছিল আমার জীবনের। সব থেকে।

তুহিন খান

এরকম কেন মনে হচ্ছে?

অনুপম মণ্ডল

অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা। তা ছাড়া পড়াশোনা ব্যাপারটা আর আগের জায়গায় নাই। পরিবেশটা আমার পছন্দ হচ্ছে না।

তুহিন খান

এগুলা বদলে গেলে শিক্ষকতা ভালো লাগবে? মানে, টিচিং ইটসেল্ফ—এর প্রতি কোনো খেদ নাই, তাই তো?

অনুপম মণ্ডল

পরিবেশটা বদলালে ভালো হতো। সেটা যে সম্ভব না, আপনি নিজেও জানেন হয়তোবা।

তুহিন খান

হুম। শিক্ষকতার প্রসঙ্গে একটু অন্যরকম একটা প্রশ্ন করি। আপনার আব্বার শিক্ষকতা আপনার ভিতরে কি কোনো বিশেষ প্রভাব ফেলছিল? মানে উনি যে একজন টিচার, এই ব্যাপারটা আপনার মনে আলাদা কোনো অনুভূতি তৈয়ার করছিল কিনা?

অনুপম মণ্ডল

না। উনিই আমাকে শিক্ষক হতে নিষেধ করতেন। সবসময়। কারণটাও অর্থনৈতিক।

তুহিন খান

শিক্ষকের মোরাল মর্যাদার ধারণাটা মিডলক্লাস ফ্যামিলিগুলায় থাকে। সেরকম কিছু কি ছিল না?

অনুপম মণ্ডল

আমি পড়তে ভালোবাসতাম। আগেই বলেছি। ওইটাই একমাত্র কারণ। ভেবেছিলাম এই পেশায় থাকলে পড়তে পারব। এই তো। আর কিছুই না।

তুহিন খান

আগের আলাপে যাই আবার। প্রথম কবিতা ছাপা হওয়ার পরে, ঢাকার কবিতাবলয়ের সাথে যোগাযোগ ঘটল কিভাবে?

অনুপম মণ্ডল

ঢাকার কবিদের সাথে পরিচয় সম্ভবত ২০১৩/১৪। আমি কবিতা মেইল করতাম তাদের। আর কবিতা কেমন লাগল—পরে ফোন দিতাম। ওই সময় যারা আমাকে গ্রহণ করেছিল, মানে, কবিতা পড়ে কিছু বলেছিল, পরে তাদের সাথেই যোগাযোগ হয়েছে বেশি। কোনো নির্দিষ্ট দল, গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেট কিছুই আমাকে টানে নাই। আমি নির্দিষ্ট কোনো পত্রিকায় লিখি নি। মিথ্যা কারোর গুণগানও করি নাই। ওইগুলা আমার ভালো লাগে না।


কবিতা দিয়ে মেয়েদের মুগ্ধ করা যায় কি? জানি না। আমি পাই নি তেমন কাউকে।


তুহিন খান

প্রথম কবিতা ছাপা হওয়া [২০০৯] আর ঢাকার কবিদের সাথে যোগাযোগ [২০১৩-১৪] এর মাঝখানে মোটামুটি ৪-৫ বছর। এই সময়টাতে আপনার কাব্যচর্চা কী রকম ছিল? খুলনার সাহিত্যিকদের সাথে পরিচয়-টয় ছিল? ঢাকার কবিদের সাথে যোগাযোগের আগ্রহটা কেন হইল? এজন্য বলছি, আমাদের এখানে ঢাকার সাথে যোগাযোগরে, সাহিত্য কেন, সবকিছুর জন্যেই খুব গুরুতর ধরা হয়। অনেক কবিই অবহেলিত বা আড়ালে থেকে যান এই ব্যাপারটার কারণে। আপনার ক্ষেত্রে কোন জিনিশটা কাজ করছিল, এই যোগাযোগের ক্ষেত্রে?

অনুপম মণ্ডল

খুলনার কারো সাথেই আমার কোনো যোগাযোগ ছিল না কোনো কালেই। এখনও নাই। আমি খুব মিশুক না। হয়তো ওই কারণে বা অন্য একটা কারণ আছে, এদের সাথে আমার চিন্তার পার্থক্য। ডাকিনীলোক-এর কবিতাগুলা লিখেছিলাম ১৫-তে। তার আগে জীবনানন্দ ঘরানার কিছু লিখতে চেষ্টা করেছিলাম। ওইগুলা পরে ফেলে দিয়েছি। ঢাকায় প্রথম কবিতা ছেপেছিল ‘কবিতাপত্র’, পরে সজল সমুদ্র ছাপলেন তার ‘চিলেকোঠা’তে। এটা সম্ভাবত ১৪-র দিকে। ঠিক মনে নাই। ওই সময় কিছু ওয়েবম্যাগেও লিখেছি। ঢাকার কবিদের কাউকেই চিনতাম না। যখন লিখব ভাবলাম, ওদের পড়া শুরু করলাম। জীবনানন্দ থেকে একেবারে ৯০ আর শূন্যের দশক। যাদের লেখা ভালো লাগত তাদের সাথে যোগাযোগ রাখতাম। কবিতা পাঠাতাম। অবশ্য দুই একবার এমন করেছি। আমার দিক থেকে এইটুকুই ছিল। কিন্তু তারা কেন আমাকে গ্রহণ বা বর্জন করছে আমি নিজেও জানি না।

তুহিন খান

জীবনানন্দ দিয়া শুরু করেছিলেন। ওই সময়টাতে, মানে প্রথম বই করার আগের সময়টাতে, জীবনানন্দ থেকে নিয়া আর কারে কারে পড়লেন বিশেষভাবে? কে কে ওই সময়টায় প্রিয় হইল?

অনুপম মণ্ডল

সোহেল হাসান গালিব, অনন্ত সুজন, পিয়াস মজিদ, তারিক টুকু, আন্দালীব, মজনু শাহ, বিজয় আহমেদ, আপন মাহমুদ, অভিজিৎ দাস, রাশেদুজ্জামান, সজল সমুদ্র আরো অনেক অনেক, মনে পড়ছে না আর।

তুহিন খান

আচ্ছা। প্রথম বইটা কিভাবে কখন করলেন, এই কাহিনিতে ঢুকব। তার আগে আগে, অন্য একটা প্রশ্ন করি, প্রেম কখন এল? কবিতা লেখার আগে, না পরে?

অনুপম মণ্ডল

আগে। প্রথম বইটা করে দিয়েছিলেন মাজুলদা [মাজুল হাসান]। তিনি পাণ্ডুলিপি চেয়ে নিয়েছিলেন। পরে ‘চৈতন্য’-কে পাঠিয়েছিলেন।

তুহিন খান

আপনার জীবনে প্রেমের সাথে কবিতার কি কোনো কানেকশন আছে কোনোভাবে?

অনুপম মণ্ডল

না। কবিতা দিয়ে মেয়েদের মুগ্ধ করা যায় কি? জানি না। আমি পাই নি তেমন কাউকে। প্রথম যে মেয়েটার সাথে আমার সম্পর্ক হয়েছিল তার সাথে সম্পর্কটা আমি রাখতে পেরেছিলাম। ওই সময় লেখা দূরে থাক, কিছুই পড়ি নি আমি। কিছু গল্পের বই বিক্রি করতে হয়েছিল আমার। কবিতা লিখেছি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরে।

তুহিন খান

ছ্যাঁকা খেয়ে কবি, এরকম কিছু নাকি? হা হা হা!

অনুপম মণ্ডল

নাহ্। সম্পর্কটা আমিই টানতে পারছিলাম না। আমিই ভেঙে দিয়েছিলাম। আর একটা বিষয় যে, বাস্তবজীবনের কোনো মেয়েই আমার কবিতাকে প্রভাবিত করতে পারে নাই। আমার কবিতায় তাদের অস্তিত্ব নাই।

তুহিন খান

আপনার কবিতায় মানুষই নাই, এমনতর অভিযোগও আছে!

অনুপম মণ্ডল

জানি না, এমন কেউ বলেছে কিনা।

তুহিন খান

বলেছেন। ‘শিরিষের ডালপালা’য় দেয়া এক সাক্ষাৎকারে হুজাইফা মাহমুদ এই অভিযোগ করেছিলেন। উনি অবশ্য অভিযোগ হিশেবে কথাটা বলেন নাই।

অনুপম মণ্ডল

ও আচ্ছা। ভুলে গিয়েছিলাম। ওর বোঝার ভুল। আমি পরে ব্যাখ্যা দিয়েছিলাম।

তুহিন খান

আচ্ছা, প্রথম বইয়ের কথা বলছিলেন। মাজুল ভাই বের করলেন বইটা। প্রথম বই বের করার সময় কেমন অনুভূতি হইল? প্রশ্নটা মুন্নী সাহা করলে যে উত্তর দিতেন, ওইটা দিয়েন না! হা হা!

অনুপম মণ্ডল

আমার তেমন কোনো অনুভুতি হয় নি। তবে বইয়ের কোয়ালিটি আমাকে টানে নাই।

তুহিন খান

কোন কোন ব্যাপারগুলি টানে নাই?

অনুপম মণ্ডল

প্রিন্ট, বাইন্ডিং, আমার ভুলে অনেক বানান ভুল হইছিল, কবিতা বাছাই ভালো হয় নি। বইটা আরেক বার লিখব আমি।

তুহিন খান

ও মানে, বই নিয়াও সন্তুষ্ট ছিলেন না?

অনুপম মণ্ডল

হ্যাঁ।

তুহিন খান

প্রোডাকশন নিয়া ক্ষোভগুলা প্রকাশকরে বলছিলেন?

অনুপম মণ্ডল

না। উনি ওনার জায়গায় ঠিক ছিলেন। ওটাই ওনার বেস্ট ছিল। আমার ভালো লাগে নাই। তবে প্রকাশক আমার বইটা ফ্রি-তে করেছিলেন। এইটাও ওনার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার একটা কারণ ছিল। দ্বিতীয়, বইটার যেখানে প্রকাশকই পাচ্ছিলাম না…

তুহিন খান

আপনার প্রথম বইটার কবিতাগুলিতে খুব দীর্ঘ লাইন প্রায় নাই-ই, ছোট ছোট চিত্রকল্প নিয়া এক ধরনের মিউজিকাল টোনে লেখা কবিতাগুলি। টানাগদ্য কি তখন টানত না?

অনুপম মণ্ডল

ঐ সময় টানাগদ্য পড়ি নি আমি। পড়লেও মনে রাখার মতো না।

তুহিন খান

সোহেল হাসান গালিব, মজনু শাহ এরা তো টানাগদ্যে লিখতেন!

অনুপম মণ্ডল

জেব্রামাস্টার বা রক্তমেমোরেন্ডাম আমাকে প্রভাবিত করতে পারে নি। ভালো লেগেছিল মাত্র। এত মুগ্ধতা ছিল না। বা তৈরি হয় নি।

তুহিন খান

কিন্তু টানাগদ্য টুলসটা?

অনুপম মণ্ডল

টানাগদ্য লেখার ইচ্ছে তৈরি হয়েছিল মূলত লিপিকা, রসাতল বা জন্মান্ধকবিতাগুচ্ছ পড়ে। এমনকি সতত ডানার মানুষ-ও আমাকে টানে নি।

তুহিন খান

আপনার প্রথম বইয়ের ভূগোলটা, আপনার এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, একেবারেই কাল্পনিক। আবার কিছুটা অন্য ভূগোলের ছাপও আছে। তো, কবিতা লিখতে এসে পরিবেশ-প্রতিবেশ আপনারে সেভাবে প্রভাবিত করতে পারল না কেন? সিকদার আমিনুল হকের কথা আসল যেহেতু, বিদেশি ভূগোলের ছবক কি ওখান থেকে কিছুটা প্রভাবিত হয়েই পাওয়া?

অনুপম মণ্ডল

আমার ঐ ভূগোলটা ধরতে সাহায্য করেছে লোরকা। সিকদার আমিনুল হক অনেক পরে পড়েছি। খুব এলোমেলোভাবে।


জীবনটাকে এখন পর্যন্ত আমার কাছে কুৎসিত আর দুর্বিষহ মনে হয়েছে। এইটরে নিয়ে লেখার তাই তেমন তাগিদ অনুভব করি নি।


তুহিন খান

হিস্পানি কবিতা কিভাবে পড়া শুরু হলো?

অনুপম মণ্ডল

লোরকার কবিতা প্রথম কোথায় পড়ি মনে নাই। সাজ্জাদ শরিফের একটা অনুবাদের বই আছে লোরকার। ভালোবাসাটা ওইখান থেকেও হতে পারে।

তুহিন খান

ওই বইটা পড়ছিলেন আপনি?

অনুপম মণ্ডল

অনেক বার। আছে আমার কাছে। ওর পরে কোলকাতার একটা বই পেয়েছিলাম সাত সমুদ্র সাত আকাশ নামে। হিস্পানি কবিতা ও গল্পের এক অসাধারণ সংকলন।

তুহিন খান

আগের প্রশ্নের আরেকটা অংশ ছিল, আপনার প্রথম বইটায় আপনার ভূগোল-পরিবেশ-প্রতিবেশ কেন আসলো না? এইটা কি সচেতন ব্যাপার ছিল? বা, নিজের ভূগোল-পরিবেশ আসাটা জরুরি ব্যাপার কিনা কবিতার জন্যে, এইটাও প্রশ্ন কইরা রাখি।

অনুপম মণ্ডল

জরুরি কি না জানি না। কবিতার উপর কোনো কিছুই চাপিয়ে দিতে আমি রাজি না। আমি বলেছি আগেই যে, ঐ সময় প্রচুর স্প্যানিশ কবিতা পড়েছি আমি। তো তাদের ঐ জগৎটা আমাকে আকৃষ্ট করল খুব। ফলে তুষার, অলিভ এইগুলা আসতে থাকল আমার কবিতায়। তবে এখনও যে আমার ভূগোলটা আমি লিখেছি, তা কিন্তু না। খুব কমই লিখেছি। আমি আসলে একটা নতুন জগৎ কল্পনা করে, তাকেই প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছি সব সময়।

তুহিন খান

কবিতায় স্বদেশের ভূগোল আনা, স্বদেশের কৃষ্টি-কালচাররে গ্লোরিফাই করা এগুলোকে এক ধরনের এন্টি-কলোনিয়াল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা হয়, সাধারণত কলোনির শাসনে দীর্ঘদিন থাকা দেশগুলাতে… তো সেই জায়গা থেকে এই ব্যাপারগুলারে কি আপনার আরোপই মনে হয়… ধরেন যে, আহসান হাবীবের দুই হাতে দুই আদিম পাথর বা আল মাহমুদের সোনালি কাবিন?

অনুপম মণ্ডল

এইটাকে আমি একটু অন্যভাবে দেখি। কবিতায় আরোপিত বিষয়গুলো সম্ভবত ফুটে ওঠে, তার দীনতা নিয়েই। প্রিয় ভূমি থেকে দূরে থাকলে, বা কারোর শাসনে থাকলে হয় কি, একটা স্পেস সে তৈরি করে নেয়, আলাদাভাবেই। হয়তো ওইখান থেকে কিছু একটা সৃষ্টি হয় বা হতে চায়।

তুহিন খান

মানে, এই যে এন্টি-কলোনিয়াল অ্যাপ্রোচ, এইটারে কি আপনি সাপোর্ট করেন? বা এইটা কি শিল্পসাহিত্যে জরুরি ভাবেন?

অনুপম মণ্ডল

এইটারে আমার জরুরি মনে হয় নাই। আমি সাপোর্টও করি না।

তুহিন খান

আচ্ছা। দ্বিতীয় বইটার কথায় আসি। অহম ও অশ্রুমঞ্জরি-র কবিতাগুলা লেখার আগে কী ভাবতেছিলেন? একটা বই হয়ে যাওয়ার পরে, নতুন কিছু করার যে তাড়না, ভয় এইগুলা কি হইছিল? এর প্রস্তুতিপর্বটা বলেন।

অনুপম মণ্ডল

প্রথমে কিছুদিন ডাকিনীলোক-এর মতোই কবিতা লিখেছি। আমার ক্ষেত্রে হয় কি, একটা বই হয়ে যাওয়ার পরে কিছুই লিখতে পারি না। মাথাটা ফাঁকা হয়ে যায়। তো পরে একটা বই পেয়েছিলাম রামকৃষ্ণ কথামৃত, ওইখান থেকে এই বইয়ের মূলসুরটা তৈরি।

তুহিন খান

আপনি প্রথম জীবনে জীবনানন্দ-প্রভাবিত ছিলেন। জীবনানন্দের ধারাটা মূলত বিনয়-উৎপল হয়ে বর্তমানের তরুণদের আকৃষ্ট করেছে। আপনি জীবনানন্দকে এড়াতে গিয়েই কি রামকৃষ্ণ বা এই ভাষাটারে অবলম্বন করলেন?

অনুপম মণ্ডল

না। জীবনানন্দ-প্রভাব আমি ডাকিনীলোক-এই ত্যাগ করেছি। রামকৃষ্ণের বইটা হঠাৎ করেই পাওয়া। কলেজ লাইব্রেরিতে। তো ওইটার সাথে আমি আরো অনেক কিছুই মিশিয়েছি। উপনিষদ, রবীন্দ্রনাথ, গীতা এবং বিভূতিকে।

তুহিন খান

অহম ও অশ্রুমঞ্জরি নিয়া শিরিষের ডালপালায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে আপনি অনেক কিছুই বলছেন। অহম ও অশ্রুমঞ্জরি নিয়া আমি কিছু ডিফ্রেন্ট প্রশ্ন করি। টানাগদ্যের চিন্তাটা আসলো কিভাবে?

অনুপম মণ্ডল

আমি মূলত জন্মান্ধকবিতাগুচ্ছ, লিপিকা বা রসাতল থেকে বেরিয়ে এসে একটা বই করতে চেয়েছিলাম।

তুহিন খান

এই বইটার ভাষারে ঠিক বর্তমান কবিতার যে চলতি ভাষা, তার ভিতরে ফেলা যায় না। নামটারেও। এটারে কেউ কেউ বলছেন, ভাষা থেকে পিছিয়ে পড়া। এইটাকে আপনি কিভাবে দেখেন? একজন কবি তো যেকোনো ভাষায়ই লিখতে পারেন। কিন্তু এই যে যুগের সহজাত ভাষাকাঠামো, এর থেকে আলাদা হয়ে আপনার যে প্রয়াস, এটা কি পশ্চাদমুখী মনে হয়?

অনুপম মণ্ডল

এই নামটা রেখেছিলেন কবি মাদল হাসান। আমার প্রথম বইয়ের জন্য রেখেছিলেন। ওইটায় রাখা হয় নি। পরের টায় রেখে দিলাম। ‘যুগের সহজাত ভাষাকাঠামো’ বলে আমি কোনো কিছুকেই স্বীকার করি না। আজকের ভাষাটারেই যদি আপনি মানদণ্ড ধরে নেন, আগামীর একজন কিন্তু আজকের ভাষাটারে খারিজ করে দেবে।  কবিতা লেখার কোনো মানেই থাকবে না তখন।

তুহিন খান

হ্যাঁ। কিন্তু সেক্ষেত্রে, ভাষা তো আসলে আগাবে, পেছাবে না। এই আগানো বা পেছানোর কোনো মানদণ্ড কি আছে? ধরেন, ভাষাকে নতুনভাবে ব্যবহার করতে গিয়ে কেউ জসীমউদ্‌দীনের টুলস ফলো করল। ব্যাপারটা কেমন হবে?

অনুপম মণ্ডল

জসীমউদ্‌দীনের টুলসও ঘষে-মেজে ইউজ করা যাইতে পারে। রামায়ণ বা মহাভারত-এর ভাষাটারেও লক্ষ করতে পারেন।

তুহিন খান

কবি হাসান রোবায়েত বলছিলেন, আপনার এই বইয়ের ভূগোল ভারতবর্ষ। উদাহরণে তিনি রামগিরি পর্বত আর গঙ্গার কথা উল্লেখ করছিলেন। আপনি প্রত্যুত্তরে বলছিলেন, পাহাড়টা বাদ দেবেন। কেন বাদ দিতে চাইলেন? চাপে পড়ে? আপনি সনাতন ধর্মের, ফলে ভারতবর্ষ বা ভারতের প্রতি কোনো পক্ষপাত এসে যায় কিনা, এরকম কোনো চাপ কি আপনি ফিল করেন?

অনুপম মণ্ডল

চাপ না। শব্দটারে পরে ভাল লাগছিল না আর। ভারতপ্রীতি না, বিভূতিভূষণের ডায়েরি থেকে শব্দগুলা ঢুকেছিল আমার ভেতর।

তুহিন খান

আচ্ছা, আপনি বললেন যে, উপনিষদের কিছু টুলস আপনি নিয়েছেন। এই যে ধর্মগ্রন্থ থেকে কবিতার টুলস নেওয়া, এর দুইটা দিক আছে। এক তো এই যে, কেবল নন্দনের খাতিরেই গ্রহণ। আরেক হলো, ওই গ্রহণের ভিতরে লুকিয়ে থাকা পলিটিক্স, কেবল নন্দনের খাতিরে না, বরং ওই চিন্তাকে প্রতিষ্ঠা করারও বাসনা, যেমন ফররুখ বা আল মাহমুদ, বা রবীন্দ্রনাথের অনেক গান, যেগুলো ধর্মীয় বোধ ও প্রতীতি থেকেই উৎসারিত। তো এই যে দুই ধরনের গ্রহণ, এর মধ্যে প্রথমটার রূপটা সেক্যুলার, আকছার কবি-সাহিত্যিক সেই উদ্দেশ্যেই এইসব গ্রহণ করেন, কিন্তু ফররুখ বা রবীন্দ্রনাথের মতো যাদের চেতনায়ও ওই আদর্শের প্রতি পলিটিক্যাল পক্ষপাত ছিল, তাদের কবিতারে আপনি কিভাবে দেখেন? ধরেন, রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি বা ফররুখের সাত সাগরের মাঝি অথবা আল মাহমুদের বখতিয়ারের ঘোড়া?

অনুপম মণ্ডল

গীতাঞ্জলি বা ফররুখের সাত সাগরের মাঝি অথবা আল মাহমুদের বখতিয়ারের ঘোড়া একটাও আমার পড়া হয় নাই। তবে ধর্মকে আমি নন্দনের খাতিরে নিতেই আগ্রহী। কোনো মত প্রচার করাটাকে আমার পছন্দ না।

তুহিন খান

এটা কি শিল্পসাহিত্যে যেকোনো মতপ্রচারের বিপক্ষেই আপনার বক্তব্য?

অনুপম মণ্ডল

না। আমি শুধু ধর্মটারে নিয়েই এই সমস্যা দেখি।

তুহিন খান

আপনার এখন পর্যন্ত প্রকাশিত কবিতায় প্রকৃতি আর প্রাণ (আমি মানুষ বললাম না, আপনার কবিতায় মানুষকে প্রাণী হিশাবেই দেখি, মানুষ হিশাবে না)-ই মূল উপজীব্য হইয়া রইছে। আপনি কি আর্ট ফর আর্টে বিশ্বাসী? ধরেন, এই যে মানুষ হিশাবে মানুষের যে ইতিহাস, অগ্রযাত্রা, সংগ্রাম ও যাপন, মানুষের সম্ভাবনা ও নির্বুদ্ধিতা এসব থেকে আপনার কবিতা মুখ ফিরিয়ে রেখেছে কেন? বা আরো অনেকের কবিতা? এসব কি কবিতায় আনা যায় না? কবিতা কি শুধুই ব্যক্তিগত অনুভূতি বা শৈলীর ইতিহাস (মালার্মে যেমন বলেছিলেন)? এটা পুরাতন তর্ক, জীবনানন্দ তার কবিতার কথায় এ ব্যাপারে বলেছেন, আপনার এ ব্যাপারে বক্তব্য কী?

অনুপম মণ্ডল

মানুষের যে ইতিহাস, অগ্রযাত্রা, সংগ্রাম ও যাপন এইগুলা বাদ দিলে তো শিল্পের একটা বড় অংশই বাদ পড়ে যাবে। সেটা উচিত বলেও আমার মনে হয় না। আমিও এনেছি। তবে খুবই আবছাভাবে। পুরোটা পারি নি। আসলে চাইও নি আমি।

তুহিন খান

এই না চাওয়া কি সচেতন নাকি অবচেতনেই? সেরকম কোনো তাগিদ অনুভব করেন নাই?

অনুপম মণ্ডল

সচেতন। জীবনটাকে এখন পর্যন্ত আমার কাছে কুৎসিত আর দুর্বিষহ মনে হয়েছে। এইটরে নিয়ে লেখার তাই তেমন তাগিদ অনুভব করি নি।


রোবায়েত আর হুজাইফার কবিতা আমার ভালো লাগে। আর [কেউ] তেমন টানে না।


তুহিন খান

আপনি সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র। ব্যক্তিগতভাবে সমাজচেতনা, পলিটিকাল কনশাসনেস আপনার প্রখর থাকার কথা। কিন্তু একইসাথে আপনার মানসচরিত্র এর একদমই উলটো। আপনি কি পলিটিকাল কোনো কনসাশনেস ফিল করেন? কখনও? সেগুলো কি লেখালেখিকে প্রভাবিত করতে চায়?

অনুপম মণ্ডল

সমাজচেতনা আমার ভেতরেও কাজ করে। কম বা বেশি। তবে তাকে ঠিক কবিতায় আনতে মন সায় দেয় নি। আমার কবিতাকে আমি কিছুটা দূরেই রাখতে চেয়েছি। জাগতিক বিষয় থেকে।

তুহিন খান

এই বইয়ের প্রকাশকই পাইতেছিলেন না, কিন্তু বইটা তো পুরস্কার পাইয়া গেল! পুরস্কার পাওয়ার ব্যাপারটা নিয়া কিছু বলেন।

অনুপম মণ্ডল

ভালো লেগেছে আমার। অন্তত বইটা বেরিয়ে গেল। আমি ভেবেছিলাম বইটা এক ফর্মায় করে ফেলব। সেটাও একটা আলাদা ব্যাপার হতো যদিও। তবু বইটা অগ্রদূত খুবই যত্ন নিয়ে করেছে। এইটা ভালো লেগেছে আমার।

তুহিন খান

পুরস্কার নিয়া তো সবসময়ই নানান কন্ট্রোভার্সি-টার্সি হয়। আবার পুরস্কার পাওয়ার পরে একটা প্রত্যাশাও তৈয়ার হয়। তো এই দুই মিলা কোনো চাপ কি অনুভব করতেছেন এখন?

অনুপম মণ্ডল

না। ঐ ব্যাপারটাই তো ভুলে গেছি। কারণ না ভুলে উপায়ও ছিল না। আর প্রত্যাশা বা অপ্রত্যাশা থেকে লেখার কোনো উন্নতি বা অবনতি হয় কি, আমি জানি না। অন্তত আমার ক্ষেত্রে এরা কোনো প্রতিক্রিয়াই তৈরি করতে পারে নি।

তুহিন খান

একজন তরুণ কবির জন্য পুরস্কার কতটুক জরুরি/ক্ষতিকর? আপনার অভিজ্ঞতা জানতে চাই, যেহেতু আপনি পুরস্কার পাইছেন।

অনুপম মণ্ডল

জরুরি কিছুই না। তবে ক্ষতি করতে পারে। যদি এই ব্যাপারটাই চেপে বসে। যদি আত্মতৃপ্তি তৈরি হয়। তবে ক্ষতি করতে পারে।

তুহিন খান

এখন কী লিখতেছেন?  সামনে কী পরিকল্পনা? আপনি গল্পকার হইতে চাইছিলেন। গল্প-টল্পের কথা ভাবতেছেন? মানে, সাহিত্য নিয়া আপনার এখন কী প্ল্যান?

অনুপম মণ্ডল

কিছুই লিখছি না। হয়তো এক বা দুই বছর পরে আবার লিখব। একটু প্রস্তুতি নিচ্ছি। তাছাড়া সময়টাও আমার খুবই ভালো যাচ্ছে না। আমি অপেক্ষা করছি। গল্পকার হওয়ার কোনো ইচ্ছেই আর বেঁচে নাই। আপাতত পড়ছি। যা সামনে পাচ্ছি।

তুহিন খান

একজন তরুণ যখন শিল্পসাহিত্য করতে আসে, তখন, এই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, তার জন্য সবচাইতে করুণতম কষ্টটা কী? আপনার অভিজ্ঞতা থেকে বলেন।

অনুপম মণ্ডল

বিনয় মজুমদারের কথাটারে ঠিক নিতে পারছি না আমি, যে, ভালো লেখা ট্রাঙ্কের তলা থেকে বার করে পড়া হবে। একটা পত্রিকার অভাব রয়েছে। আর রয়েছে প্রকাশকের অভাব। মিসগাইডের পাল্লায় পড়তে পারে কেউ কেউ। যা তার কবিতার জন্য খুবই ক্ষতির কারণ হতে পারে।

তুহিন খান

আপনার সমসাময়িক দু একজন অপ্রিয় কবিতা-লেখকের নাম বলেন। প্রিয় তো সবাই জিগ্যেশ করে। হা হা হা!

অনুপম মণ্ডল

রোবায়েত আর হুজাইফার কবিতা আমার ভালো লাগে। আর [কেউ] তেমন টানে না।

তুহিন খান

আপনার জীবনের লক্ষ্য তাইলে শেষমেশ কী দাঁড়াইল?

অনুপম মণ্ডল

কিছুই না। কোনো লক্ষ্যই নাই আসলে আমার।

তুহিন খান

অনুপমদা, আর কিছু বলবেন? এই যে কথাটা, আলাপটা ফুরায়ে গেল, রাত আড়াইটা, খারাপই লাগতেছে!

অনুপম মণ্ডল

আমারও। খুবই উপভোগ করেছি। আমার তেমন কিছুই বলার নাই। আপনি ভালো থাকবেন। অন্তত সুস্থ থাকার চেষ্টা করবেন।

তুহিন খান

আপনেও ভাল থাকবেন অনুপম ভাই। আপনার জন্যে অনেক শুভকামনা।


ঈদসংখ্যা ২০১৮

তুহিন খান

জন্ম ৩ মার্চ ১৯৯৬; কুমিল্লা। সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত।

ই-মেইল: tuhinkhan01996@gmail.com