হোম সাক্ষাৎকার অনস্তিত্বের কবি আলোক সরকার

অনস্তিত্বের কবি আলোক সরকার

অনস্তিত্বের কবি আলোক সরকার
347
0

সা ক্ষা কা

কবি আলোক সরকারের কবিতার সাথে কৌরবের পাতায় আমার অনেক দিনের পরিচয় থাকলেও ওঁর প্রতি মনোযোগ গাঢ় হয়েছিল কৌরব থেকেই প্রকাশিত ওঁর কবিতাভাবনা ও জীবনদর্শন নিয়ে লেখা অন্তর্লোক বইটা পড়তে বসে। প্রথমেই একটা নাড়া লেগেছিল ওঁর লেখায় তর্কযুক্তি ও বিশ্লেষণের প্রবল আগ্রহ দেখে। কবির উপলব্ধ জগৎ ও বিজ্ঞানজগতের মধ্যেও মনে হয়েছিল দুস্তর ব্যবধান। আরও একটা ব্যাপার ছিল—বিশ্বজীবনকে একটা বিপরীত দিক থেকে উপলব্ধি করা। যে বোধ থেকে তিনি বলেন, “আলো প্রতিমুহূর্তে দেখছে, দেখার আনন্দে মেতে উঠছে”। এখানে দ্রষ্টা আমি নয়—আলো। অথবা, “অমাবস্যা কিছুই দেখায় না অথচ তার ভিতরে একটা পরিশ্রম আছে, একটা পরিব্যাপ্ত ব্যর্থতা”। আমি লক্ষ করেছিলাম, ওঁর মনোজগতে আলো হাওয়া অন্ধকার সবই সজীব প্রাণীর মতো চৈতন্যময়। ওঁর কল্পনায় ‘চৈত্রের শুকনো পাতা গাছ থেকে ঝরে পড়ে বেদনায়, বৃক্ষমায়ের প্রতি নীরব উচ্চারিত তার কান্না’। কেন এই কান্না?—আমি ভেবেছিলাম। অথচ, ন্যাশপাতি গাছের শুকনো পাতাগুলো ঝরে পড়লে, যেন  টেবিলের ওপর চুলের খুস্কি পড়ে আছে বলে মনে হয়েছিল এক অ্যামেরিকান কবির [‘April Inventory’/ Snodgrass]। কবিতায় ওঁর দৃষ্টিকোণ আমাকে যুগপৎ আগ্রহী এবং দূরবর্তী করে তুলেছিল। ক্রমে ক্রমে লক্ষ করেছিলাম, ওঁর কবিতার মূলে আছে সবল রেখায় আঁকা একটা অনস্তিত্বের ক্যানভাস।


“আমার ব্যক্তিগত জীবনেও এক অমাবস্যা আছে। খুব নিবিড় জমাট একটা অন্ধকার”। এইখানে এসে আমি কান পাতি ওঁর কবিতায়।


আমি চেয়েছিলাম ওঁর কাছ থেকে এই বিষয়ে কিছুটা জেনে নিতে, কারণ এই সবই ওঁর কবিতাকে স্বতন্ত্র করেছিল। আমি দেখেছিলাম, ওঁর কাব্যতত্ত্বের বাগানে যেসব বীজ-শব্দ, তারা সবই শুরু হয়েছে অ-অক্ষরে;—অনুপস্থিতি, অন্ধকার, অস্বীকার, অসাফল্য, অনুকাঙ্ক্ষা, অলক্ষ, অপূর্ণ, অস্তিত্বহীন, অসম্পূর্ণ, ইত্যাদি। এইসব শব্দসূত্র ধরে ক্রমে পৌঁছে যাওয়া ওঁর কাব্যদর্শনের কেন্দ্রে। আমার অনুরোধে, অন্তর্লোক বই থেকে পড়ে শোনাচ্ছিলেন তিনি, “সব শিল্পই ধ্বনিত করছে পরিশ্রম, পরিশ্রমের আর্তি, সব শিল্পই শেষপর্যন্ত ঢলে পড়ছে বিষাদের দিকে। যা তাকে পূর্ণতার দিকে এগিয়ে দিয়েছে, তা-ই অবসিত হয়েছে অপূর্ণতায়, অসম্পূর্ণতায়”।

এই সেই অ-অক্ষর, যার উৎসে রয়েছে এক ‘অমূলসম্ভব রাত্রি’। এই সেই রাত্রি, যা যুক্ত করেছে কবির উপলব্ধ জগৎ আর ব্রহ্মাণ্ডবিজ্ঞানীর জগৎকে। এইখানে এসে তাঁর সাথে আমার যোগসূত্র গড়ে ওঠে। আলোক সরকার লিখেছেন, “আমার ব্যক্তিগত জীবনেও এক অমাবস্যা আছে। খুব নিবিড় জমাট একটা অন্ধকার”। এইখানে এসে আমি কান পাতি ওঁর কবিতায়।

আমাদের মনোজগতে যে রহস্যময় আলো-আঁধার এবং ভ্রান্ত চিন্তাপদ্ধতির অসফলতা, তাই নিয়ে আমার সম্প্রতি (২০১৭ সালে) নির্মিত ছবি ‘উত্তরমালা, বেরিয়ে এসো প্লীজ’। কবিদের জন্য, কবিদের নিয়ে, এই পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবিতে অংশ নিয়েছেন বাংলাভাষার নয়জন প্রবীণ ও নবীন কবি। প্রবীণদের তিনজনই দিকপাল কবি—মণীন্দ্র গুপ্ত, আলোক সরকার ও সমীর রায়চৌধুরী। তিনজনের জীবনদর্শন, কাব্যভাষা এবং শব্দনির্বাচনের যে প্রেক্ষাপট, তার উজ্জ্বল ভিন্নতাই আমাকে বিপুল উৎসাহে আকৃষ্ট করেছিল তাঁদের প্রতি। আর ছবি তৈরির ফাঁকে ফাঁকে সুযোগ হয়েছিল নানা বিষয় নিয়ে আলাপচারিতার।

ছবি করতে গিয়েই ওঁর সাথে আমার প্রথম আলাপ; হালতু-র রামলাল বাজারে ‘আনন্দ নিকেতন’ নামের বাড়িটার দোতলায়, ওঁর ফ্ল্যাটে। আগে তো কখনো কোথাও দেখা হয় নি, তবে ওঁর কবিতা পড়েছিলাম কৌরবে এবং আরও কিছু পত্রিকায়। ছোট্ট ড্রয়িং রুমটায় আমি অপেক্ষা করছিলাম। শোয়ার ঘর থেকে হুইলচেয়ারে করে ওঁকে নিয়ে এলেন একজন পরিচারিকা। তারপর, ঘরের ভেতরে ঢুকে হুইলচেয়ার থেকে নেমে, খালি পায়ে, খুব ধীরে ধীরে, এক দেওয়াল থেকে আরেক দেওয়াল, কাচের আলমারি, বুক সেলফ, সব কিছু ছুঁয়ে ছুঁয়ে, অপর প্রান্তে জানালার নিচে সোফায় এসে বসলেন, আমার কাছেই। মুখে হাসি। পেছনের জানালার পর্দা দিয়ে প্রয়োজনের চেয়েও বেশি রোদ, সেই আলোয় ওঁর সিল্যুয়েটের সাথেই আমার কথা শুরু হয়েছিল। একটু পরেই এলেন মিনুদি, ওঁর স্ত্রী, সাথে চা বিস্কিট মিষ্টি। কাচের আলমারি থেকে বের করে দেখালেন ওঁর কবিতার বই, আকাদেমি-স্যামসুঙ্গ যৌথ পুরস্কারে (২০০৯) পাওয়া ভারী ব্রোঞ্জের তৈরি রবীন্দ্রনাথের স্ট্যাচুয়েট। সেই প্রথম আলাপেই কৌরব পত্রিকা নিয়ে ওঁর শ্রদ্ধা এবং উৎসাহ আমি লক্ষ করেছিলাম। আমাকে দিয়েছিলেন ওঁর দুটো কবিতার বই, অমূলসম্ভব রাত্রি এবং আশ্রয়ের বহির্গৃহ; কাঁপা অক্ষরে নাম লিখে দেওয়া সেই উপহার। আমি ওঁকে আমার কবিতার বই দেওয়ার সাহস মোটেই করি নি, দিয়েছিলাম আমার দুটো গদ্যের বই, কোরাল আলোর সিল্যুয়েট এবং মোটরহোম, যার মধ্যে মোটরহোম প্রস্তাবনা ছাড়াও ছিল ‘সিম্ফনি কবিতা’ নামের একগুচ্ছ সাউন্ডস্কেপ কম্পোজিশান। বই দুটো হাতে নিয়ে পাতা উল্টিয়ে তখনি একটু পড়ে দেখলেন।

প্রাথমিক আলাপের পরে আমি ওঁকে বুঝিয়ে বলেছিলাম আমার ছবির পরিকল্পনার কথা, যার শুটিং শুরু করবো কয়েকদিন পরেই। কবিমনের আলো-অন্ধকারে যে রহস্যময় জগৎ, তাই নিয়ে কথা হবে, প্রশ্ন হবে, শুনে উনি বোধহয় একটু চিন্তিত (আমি বেশ মজার সাথে লক্ষ করেছিলাম), এমনকি একটু নার্ভাসও। উনি ঠিক আন্দাজ করতে পারছিলেন না, কী হতে চলেছে ব্যাপারটা।


Alok_Akademi-Samsung award 2009
ভারতের সাহিত্য আকাদেমি ও কোরিয়া-র সামস্যুং কোম্পানি প্রদত্ত ‘রবীন্দ্র সাহিত্য পুরস্কার’।

আমি

না, সিনেমায় আমি কবিতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন করবো না। আমার প্রশ্ন কোনো কবিতা নিয়ে নয়। আমার প্রশ্ন হবে মনের ভেতরের জগৎ নিয়ে।

আলোক

মনের ভেতরের জগৎকে আমি গুছিয়ে বইতে বলে দেওয়ার চেষ্টা করেছি।

আমি

হ্যাঁ, হ্যাঁ।

আলোক

সেরকমভাবে প্রশ্ন করলে কিছু বলা যাবে না।

আমি

চিন্তার কিছু নেই। সেই মুহূর্তে যা মনে আসে,… চিন্তার কিচ্ছু নেই।—ছবির কাজ শুরু করার আগে, এই প্রস্তুতিপর্বে আমি চেয়েছিলাম ওঁর সাথে আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে ক্রমে ওঁর বাচনভঙ্গি, কথ্যরীতি, শব্দচয়ন, যুক্তিবিন্যাস ও চিন্তাপদ্ধতির সঙ্গে কিছুটা পরিচিত হয়ে ওঠা। চিনতে চেয়েছিলাম ওঁর যুক্তি-ফাটলগুলো। তখন ওঁর বয়স পঁচাশি, তাই বার্ধক্যজনিত অস্পষ্টতা ছিল কথায়, উচ্চারণে। তবু মুগ্ধ হয়ে শুনেছিলাম, কবিতাপাঠ, কবিতা নিয়ে পরীক্ষার কথা, বিশেষত নিজের কবিতা নিয়ে ওঁর একাগ্র নিরীক্ষণ।

আলোক

খুব ছোটবেলা থেকেই আমার ধারণা হয়েছিল যে, কবিতা বিষয়নির্ভর নয়, কবিতা গঠননির্ভর। একটা কবিতার বই আমি বার করেছিলাম, সেটা বেরিয়েছিল ১৯৫০ সালে। সব বানানো কথা, আর আমি বানানো জিনিসটাকেই পছন্দ করি। আমি সত্য জিনিসকে তো পছন্দ করিই না। বানানোর ক্ষমতা, যাকে আমি বলি নির্মাণ। কবিতা মানেই নির্মাণ। তৈরি করতে হবে।… কীভাবে রচনা করেছি, সেটাই মূল কথা। কী নিয়ে রচনা করেছি, সেটার ততটা দাম নেই।

আমি

সে-সময়ে এসব আপনার মনে হয়েছিল, কারো কবিতা পড়ে, নাকি…?

আলোক

কারো কবিতা পড়ে হয় নি, নিজে নিজেই মনে হয়েছিল। যখন কবিতা লিখলাম আমি, … কবিতা লিখেছি কারণ, ভালো একটা কিছু করবো, সেটা কী আমি জানি না। কিন্তু লেখা আমি শুরু করি শব্দ দিয়ে, একটা পঙ্‌ক্তি দিয়ে। তার সঙ্গে খেলা করতে করতে এক জায়গায় গিয়ে দেখলাম, এখানেই থামা উচিত।

আমি

এই পঙ্‌ক্তিটা আসছে কীভাবে? এরা কি বিষয়নির্ভর?

আলোক

এরা নিজের থেকেই আসে।  না, বিষয়নির্ভর নয়।

আমি

স্মৃতিনির্ভর? দৃশ্যনির্ভর?

আলোক

সবকিছু নির্ভর হতে পারে। কারণ, এর মধ্যে আমার দেখা কিছু কিছু জিনিস এসেই যায়। কিছু ঘটনাও এসে যায়। কিছু শিক্ষা, ধর্ম। নিজের ধর্ম কী, সেটাও এসে যায়, নানা জিনিসই এসে যায়। কিন্তু আমার লক্ষ্য তো তাই নয়, আমার লক্ষ্য হচ্ছে কবিতাটা। এগুলোও থাকুক। এমনভাবে এদের রাখি আমি, সাজাই, সাজাব, যাতে এটা একটা কবিতার জায়গায় পৌঁছয়।… কবিতা কী, তা এ’পর্যন্ত কেউ বলতে পারে নি। বলতে পারবে না। গান শুনে আনন্দ হয়, সাধারণ লোক বললে কিছুই বলতে পারবে না। আমিও বলতে পারব না, গানের ব্যাপারে আমি আনাড়ি একেবারে। কিন্তু আনন্দ তো হয়, সেটা ঠিক। সেটা কী, বলতে গেলে খুব অসুবিধে হয়।… আমার কবিতায় আমার জীবনের কোনো প্রভাব নেই, এটা আমি এক জায়গায় লিখেছিলাম।

আমি 

সত্যি এটা মনে হয়েছে?

আলোক

হ্যাঁ, এটা আমার মনে হয়েছে।

আমি

জীবনের, মানে জীবনযাপনের কোনো প্রভাব নেই?

আলোক

হ্যাঁ, জীবনযাপনের (প্রভাব নেই)।

আমি

জীবনস্মৃতির প্রভাব?

আলোক

আমার কবিতায়… জীবন, অর্থাৎ জীবনের ঘটনাবলীর কথা বলেছি আমি। জীবনে অনেক ঘটনা ঘটেছে, আমি মহাযুদ্ধ দেখেছি। আমি দুর্ভিক্ষ দেখেছি। আমি পরাধীন দেশের যে জ্বালাযন্ত্রণা, সেটাও আমি একেবারে অনুভব করি নি, তা নয়। সেই দেশে স্বাধীনতা দেখেছি, আমি স্বাধীনতা সংগ্রাম দেখেছি। বিচিত্র অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে আমার জীবন শুরু হয়েছে। তার মধ্যে ক্রাইসিস আমার ব্যক্তিগত জীবনে অনেক এসেছে। যেমন আমার চোদ্দ বছর বয়সে… ঠিক এখন মনে করতে পারছি না, চোদ্দ বছর বয়স হবে, আমার বাবা মারা যান। তার ফলে আমার জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেছিল। আর্থিক অনটন তীব্র, সেটা বোধহয় সারা জীবনই আমার সঙ্গে আছে।

আমি

কলকাতায় তখন?

আলোক

কলকাতাতেই, এবাড়িতে নয়, অন্য একটা বাড়িতে থাকতাম আমরা। সেখানে আমার অনেক ভাইবোন, তাদের সঙ্গেই থাকতাম। খুব যে কষ্ট হয়েছে তা বলতে পারব না। আমার দাদারাও খুব ভালো। বাবা মারা যাবার পর দাদারা আমায় যথেষ্ট সাহায্য করেছেন। কিন্তু তারাও খুব বড়লোক ছিলেন না। একেবারেই বড়লোক না। কাজেই দারিদ্রটা অত্যন্ত আমাকে, মানে টর্চার করেছে আমার ওপর। তো আমি এসব নিয়ে ভাবি নি। আমার একটা মজা হচ্ছে, আমি এটা ছোটবেলা থেকেই একটা জিনিস আমি দেখেছি, আমার জীবনে দুঃখের তো সীমা নেই, ঘটনা অনেক ঘটছে। ঘটলেই আমি ভাবি এর একটা শেষ আছে। সব ঘটনাই কিন্তু এক জায়গায় উঠে শেষ হয়ে যাচ্ছে। এটাও শেষ হয়ে যাবে, আমি নিজের মনেই বলতাম।


আমি সত্য জিনিসকে তো পছন্দ করিই না। বানানোর ক্ষমতা, যাকে আমি বলি নির্মাণ। কবিতা মানে নির্মাণ।


আমি

তার মানে, একটা আশা সবসময় রয়েছে। হতাশার চেয়ে আশাই বেশি।

আলোক

আস্থা। আস্থাটা আমার কাছে হতাশার চাইতে অনেক বেশি।

আমি

কিন্তু অন্তর্লোক বইতে আপনার লেখায় আমি যা দেখলাম, খুব বিষাদের কথা আছে। এবং আস্থার চেয়ে অনাস্থার কথা বেশি আছে। দেখার চেয়ে না-দেখার কথা বেশি আছে।

আলোক

হ্যাঁ, সেইটা সব সত্য।

আমি

আলোর চেয়ে অন্ধকারের কথা বেশি আছে। তাই না ?

আলোক 

হ্যাঁ, তাই তো আছে। ‘না’, আমার জীবনে কোথাও ধর্মই ‘না’, এটা লেখা পড়লে বোঝাই যাবে। একটা কবিতা পড়েছিলাম, ‘না’। ‘পাখিটা মাথা উঁচু করে বলল, না’। এই ‘না’ আছে একটা। সব ব্যাপারে থাকার মধ্যে একটা না আছে।… আমার মুশকিল হচ্ছে, আমি যে কবিতা লিখি,… প্রথম দিকে একটা কবিতার বই আমি বার করেছিলাম, উতল নির্জন। সেটা বেরিয়েছিল ১৯৫০ সালে।

রবীন্দ্রনাথ কবিতা লিখতে জানতেন না, একথা বলার আমাদের কোনো উপায় নেই। কিন্তু এটা আমদের সচেতন হতেই হয়। প্রথম সচেতনতা হচ্ছে আমার ব্যক্তিত্ব। আমার নিজের। আমি কবিতা লিখছি আমাকে নিয়ে,… আমাকে নিয়ে নয়। আমার কবিতার কোনো বিষয় নেই। এমন একটা কিছু লিখব, যা আমার।

আমি

মৌলিক।

আলোক

মৌলিক। [টেবিলের ওপর আমার গদ্যের বইটা ইঙ্গিতে দেখিয়ে বললেন] এই মৌলিকতা যথেষ্ট আছে এতে। বাক্যবিন্যাসেই আছে। সেটা আছে।

আমি

খুব বদল দরকার। আমি খুব নতুনের খোঁজ করছিলাম।

আলোক

বদলটদল জানি না। বদল কী আছে? আমি লিখছি যখন, আমার হলো। আমার মানেই বদল হয়ে গেল। আমরা চাইছি কী? অন্যের কবিতার সাথে আমার কবিতা মিলবে না।… কিম্বা হয়তো মিলতেও পারে। আমার একটা বই আছে, আশ্রয়ের বহির্গৃহ । আমার সবচেয়ে প্রিয় বই। অমূলসম্ভব রাত্রি-ও খুব প্রিয়।

আমি

আশ্রয়ের বহির্গৃহ মানে?

আলোক

বহির্গৃহ মানে, বাইরের ঘর। আশ্রয়ের বহির্গৃহ মানে কী, আমি জানি না।

আমি

আপনার কবিতাসমগ্র তো বেরিয়েছে। তাতে আছে এই বইটা?

আলোক

না, কবিতাসমগ্র যে দুখণ্ড বেরিয়েছে, তাতে নেই। ওটা তো অনেক পরের লেখা। আর একটা খণ্ড বেরোচ্ছে, ছাপা হয়ে গেছে। তাতে থাকবে।

আমি

ও, তাতে থাকবে আশ্রয়ের বহির্গৃহ। ওটা কারা বের করেছেন?

আলোক

‘দিয়া’ বলে একটা আছে, দিয়া পাবলিশিং। কলেজস্ট্রিটে আনন্দ পাবলিশার্সের যে দোকান আছে, তার কাছেই।

আমি

আচ্ছা, আমি খবর নেব।

আলোক

(কবিতায়) সব বানানো কথা। আর আমি বানানো জিনিসটাকেই পছন্দ করি।… আমি সত্য জিনিসকে তো পছন্দ করিই না। বানানোর ক্ষমতা, যাকে আমি বলি নির্মাণ। কবিতা মানে নির্মাণ। একটা তৈরি করলাম।

আমি

ঠিক।

আলোক

তৈরি করলাম, তার উপাদান কী জানি না। আমার কাছে শব্দ কিছু আছে, আর একটা জিনিস আছে, ধ্বনি।… অমূলসম্ভব রাত্রি আপনি পড়েন নি?

আমি

না।

আলোক

আমার এখানে আছে। ওটা আপনাকে দিয়ে দিচ্ছি। ওটাও আমার খুব প্রিয় বই। একটা নতুনত্ব আছে ছন্দে। ধরুন, গদ্যছন্দ যেটা, ভাবতে হবে ওর ছন্দহীনতা। হীনতা যেটা, সেটাই তো স্বাভাবিক। রৌদ্রময় অনুপস্থিত। ছন্দময় বিশৃঙ্খলা। এইসব কথা আমি বারবার লিখেছি। রৌদ্রময় অনুপস্থিত, সেটা কী? সে অনুপস্থিত। সে আছে, রৌদ্রময়, কিন্তু অনুপস্থিত। সে নেই। এই ‘না’ কথাটা।

আমি

এই যে ছন্দময় বিশৃঙ্খলা বললেন, যেটা আমরা… যেমন বিজ্ঞানে ‘কেওস থিওরী’ নিয়ে কথা বলি। তো, আমি এই যে ছবিটা করলাম স্বদেশ সেনের ওপরে, তার মধ্যে আমি দেখিয়েছি এই ছন্দময় বিশৃঙ্খলা। কেওসের মধ্যে কীভাবে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে এবং তার ছন্দ আবার তৈরি হচ্ছে। আবার সেটা ভাঙছে এবং আবার তৈরি হচ্ছে। এটা একটা এক্সপেরিমেন্ট দিয়ে দেখানো হয়েছে।

আলোক

হ্যাঁ, কিন্তু সবটার মধ্যে একটা ধ্বনি আছে। আমি যেটা ফিল করেছি, লিখতে লিখতে একটা ধ্বনি আমি শুনতে পেয়েছি। এই ধ্বনিটাই আমি লিখেছি। একটার পর একটা লিখে যাচ্ছি, সেদিন একটা তরুণ ছেলে এসে বলল, ‘আপনার কবিতা আমি কিচ্ছু বুঝি না। কী মানে আপনার কবিতার?’… তা আমি ওকে বললাম, দেখো, মানেটানে খুঁজলে আমি কিচ্ছু বলি নি। মানে নিয়ে তো লিখি নি আমি। ‘মানে কিছুই যায় না বোঝা, সেই মানেটাই খাঁটি’; এটা রবীন্দ্রনাথের লেখা। তাইই তো। মানে বুঝবে তুমি কী? আর মানে যদি বোঝাই যেত, তবে কবিতা লিখতে বসতুম না। মানে বুঝি আমি কি? ইলিশ মাছ খেতে খেতে তার একটা স্বাদ বুঝি। এটা তো স্বাদের মানে নয়, বিস্বাদের মানেও নয়।

আমি

এটা হয় অনেকের। তার জন্যে একটা স্কুলিং, একধরনের প্রস্তুতিও লাগে পাঠকের। তার হয়তো ছিল না সেটা।

আলোক

গড়ে ওঠে নি।

আমি

হ্যাঁ, গড়ে ওঠে নি।

আলোক

ধ্বনিটা, তুমি ধ্বনিটাকে শোনো। একটার পর একটা লাইন যে আসছে, সেটা কিন্তু আমি খুব ধ্যানস্থ হয়ে লিখেছি। সেটা আজেবাজে নয়। মানে জিগ্যেস করতে বললেই আমি বলে দেবো একটা বড় কথা যে, বোঝেন নি? মার্ক্স বলেছেন এই, বা দান্তের ডিভাইন কমেডিতে এই ছিল। এসব বলে টলে… আমি পারব না। হো হো হো…।

আমি

 হো হো হো…। যেটা সমালোচকরা করে। অধ্যাপকরা যেটা করে।

আলোক

হ্যাঁ, এটা কিছুই নয়। আমার কবিতা সত্য অর্থে কিচ্ছু নয়। এই কিছু না-কে আমি সাধনা করে পেয়েছি। কবিতা মানেই তোমার যে বহির্জীবন, যা আমরা উপভোগ করি, তা নয়। তার বাইরে একটা শব্দ আমি শুনতে পেয়েছি, আমি তাকেই লিখছি। কবিতায় একটা ধ্বনিকে আমি লিখে দিয়েছি। কিন্তু তার মধ্যে আমি নিজে উপস্থিত আছি। এই ব্যক্তিত্বতা বেজে উঠেছে কিনা সেইটাই লক্ষ্য। আর কিছুই লক্ষ্য নয়। এইসব প্রবন্ধ, যা অন্তর্লোকে লিখেছি, তাও কিন্তু একটা ধ্যান থেকে আমি লিখেছি। ঠিক যে একটা লজিক্যালি… একটা ফিলোজফিকাল এসেজ এগুলো যদি কেউ বলে… বলতে পারবে না।


বই বার করার আগে পর্যন্ত ভেবেছি, এই যা লিখলাম, একটা নোবেল পুরস্কার আমি অবশ্যই পাচ্ছি।


আমি

কিন্তু আজকে কেন বলছেন যে, যা লিখেছেন অন্তর্লোকে সেই লেখার সঙ্গে, সেই কথার সঙ্গে আজকের কথা ঠিক মেলানো যাবে না?

আলোক

মেলানো যাবে না।

আমি

কেন? সরে এসেছে কি কিছু ভাবনা চিন্তা?

আলোক

আলোকিত সমন্বয়—এটা আমার দ্বিতীয় বই। প্রথম বইয়ের নাম উতল নির্জন। সেটা লিখেছিলাম সতের আঠার বছর বয়সে। বই প্রকাশ করেছিলাম উনিশ বছর বয়সে।

আমি

উনিশ শ পঞ্চাশ সালে ?

আলোক

হ্যাঁ, উনিশ শ পঞ্চাশ সালেই লেখা আছে।

আমি

সেই বছর আমার জন্ম হচ্ছে।

আলোক

তাই নাকি?

আমি

 হ্যাঁ।

আলোক

সেই সালেই। বই বেরুল না, বই প্রকাশ হয়েছে ১৯৫০ সালে। কবিতাগুলো লিখেছি তার আগে। সেই কবিতাগুলো লিখে, আমি ভাবলাম যে কিছুই লেখা হয় নি। (বই) বার করলাম। বই বার করার আগে পর্যন্ত ভেবেছি, এই যা লিখলাম, একটা নোবেল পুরস্কার আমি অবশ্যই পাচ্ছি। পেয়ে যাচ্ছি, বই বার করে।

আমি

হো হো হো…। এটা প্রথম বইটা?

আলোক

হ্যাঁ, প্রথম বইটা। কিন্তু সেটা খুব প্রশংসা পেয়েছিল।

আমি

উতল নির্জন বইটা ?

আলোক

হ্যাঁ। কিন্তু আমি দেখলাম, আমার পছন্দ হলো না কবিতাগুলো। কোথায় একটা এ আছে, বাধা ঠেলল। তা আমি লিখতে শুরু করলাম। সে এমন কবিতা, প্রকাশিত হলো কবিতা পত্রিকায়। কবিতা, পূর্বাশা, সাহিত্যপত্র বিষ্ণু দের কাগজ, এখানে সেসব কবিতা প্রকাশিত হলো। এবং আমি একটা মোটামুটি খ্যাতিও পেয়ে গেলাম তরুণ কবিদের মধ্যে, এত সব ভালো কাগজে লিখছে। কিন্তু একদিন আমি দেখলাম, এই যে কবিতা লিখেছি এর মধ্যে আমার ব্যক্তিত্ব নেই কিছু। আমিই নেই!

আমি

এটা নিজে বুঝতে পারলেন?

আলোক

নিজেই বুঝতে পারলাম, কেউ বলে নি। কেউ বলে নি, সবাই ভালোই বলেছে। কিন্তু আমি কিছুতেই এটা সমর্থন করতে পারলাম না।

আমি

বাঃ।

আলোক

কবিতা লিখতে গেলে, একটা কবিতা লিখতে হবে। সেটা… ‘আলোকিত সমন্বয়’ ব’লে বই একটা লিখলাম। সেটা দ্বিতীয় বই। সেটা লিখে আমি তৃপ্তি পেলাম। ‘মাঠের মধ্যে মস্ত বড় দরজা, রাজপ্রাসাদ / কালো বেণি ? নাকি সুদূর… নাকি নিবিড় শীতল সাপ? / ঈশান কোণে মেঘ, কিন্তু ঝড় এখনও আসে নি… / তুমি বেঁচে আছো, আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি/ ঘাসের ওপর তরোয়ালের মতন আলো/ এবং তোমার ভালোবাসার চোখ’… এবং ইত্যাদি, এইভাবে। ‘কারা আমার মুখে তাদের ঘৃণার দৃষ্টি রাখল/ অক্ষমতা, দেখো দেখো ঈশান মেঘ সারা আকাশ ঢাকল/ ধুলো উড়ছে’। … এই যে লাইনগুলো বলছি, এগুলো সব কিন্তু ছন্দে লেখা। … ছন্দটা ধরতে পেরেছেন?

আমি

হ্যাঁ, হ্যাঁ।

আলোক

না, গদ্যে লেখা?

আমি

না, গদ্যে নয়, ছন্দ রয়েছে তো। অন্ত্যমিল নয়।

আলোক

অন্ত্যমিল নেই।… বিষ্ণু দে-কে দিলাম একটা বই। আমাকে খুব ভালোবাসতেন। তা, দিতেই উনি, সেটা কৌরবের একটা সংখ্যায় আমার লেখায় আছে, উল্টেপাল্টে দেখলেন কিছুক্ষণ। দেখে বললেন, ‘আমি কিন্তু গদ্যে কবিতা লেখা পছন্দ করি না’।

আমি

বললেন উনি?!

আলোক

বললেন। আমি বললুম, ওর দুটি বাদ দিয়ে আর কোনো কবিতাই গদ্যে লেখা নয়। উনি বললেন, ‘কেমন? কী করে?’ তো, আমি তো শোনালাম। উনি বললেন ‘ঠিক আছে’। এই যে আমি পড়লাম, আমি লেখক বলেই বললাম ছন্দ। ওটা কিন্তু গদ্যলাইন সবগুলো। ‘মাঠের মধ্যে মস্ত বড় দরজা, রাজপ্রাসাদ/ কালো বেণি ? নাকি সুদূর… নাকি নিবিড় শীতল সাপ?/ ঈশান কোণে মেঘ, কিন্তু ঝড় এখনও আসে নি…’

আমি

এই তো, এই তো ছন্দ আছে।

আলোক

ছন্দ আছে। কিন্তু মানে কি আছে? কতকগুলো টুকরো টুকরো আছে। আর, ‘তুমি বেঁচে আছো, আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি’—এটা একেবারেই গদ্য লাইন।… ‘ঘাসের ওপর তরোয়ালের মতন আলো/ এবং তোমার ভালোবাসার চোখ’ এটার এমনিতে কোনো মানে নেই। অর্থ দাঁড়াচ্ছে না। কিন্তু এই অর্থহীনতা আমি খুব পছন্দ করেছিলাম। আর রৌদ্রময় অনুপস্থিত, সেটাও আমার কাছে খুব উল্লেখযোগ্য বই।

কোনো ছন্দেই আমি লিখি নি, আবার সব ছন্দেই লিখেছি। ‘জলপরীর শুয়ে থাকা সাগরবেলার রৌদ্রে’ –এটা কী ছন্দ? ‘এইরকম স্বাভাবিক যেন স্বাধীনতার স্বচ্ছতা’। এটা, স্বাধীনতার স্বচ্ছতা, ঠিক অক্ষরবৃত্তে পড়ে না কখনোই। কখনোই পড়ে না। কিন্তু ছন্দটা আছে।… “হেমন্তবেলাশেষের ফসল দিলেম তরীপরে”। এটা কি গদ্যে লেখা, নাকি ছন্দে লেখা? এটা রবীন্দ্রনাথের গান একটা। কিন্তু গানে লিখেছেন উনি।

আমি

ভালো গদ্যের মধ্যেও ছন্দ আছে।

আলোক

ভালো গদ্যের মধ্যে ধ্বনি আছে।

আমি

আমার ছন্দ নিয়ে পড়াশোনা একদম নেই। একাডেমিক একেবারেই নেই। আমি জানিই না কাকে বলে অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, ইত্যাদি। শেখার চেষ্টাও করি নি। কখনো এক সময়ে ঐ ছন্দের বারান্দা, ছন্দের ক্লাশ, এইসব বইগুলো দেখেছিলাম, আমার পছন্দ হয় নি। নিজের মতো করে লিখেছি। তো, ভালো গদ্যের মধ্যেও তো সেই ছন্দ আছে। এমনভাবে আছে যে, ভালো গদ্য লিখতে গেলে, তার মধ্যেও, লেখা হয়ে গেলে, একটা বাক্যের মধ্যে দুটো শব্দকে সরিয়ে দিলে সবটা নড়ে যায়। এমনভাবে তারা কন্সট্রাকটেড হয়।

আলোক

Alok_Sahitya Akademi 2015
সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার ২০১৫, শোনো জবাফুল কাব্যগ্রন্থের জন্য।

হ্যাঁ, একেবারেই আছে, কন্সট্রাকটেড।

আমি

এমনভাবে কন্সট্রাকটেড হয় যে, তার একটা অন্তর্নিহিত ঝংকার তৈরি হয়।

আলোক

ঠিক আছে, তার জায়গা নিজে নিজে তৈরি করে নিচ্ছে।

আমি

হ্যাঁ, ওটাই তার অ্যারেঞ্জমেন্ট। ছন্দ বলতে আমি একটা অ্যারেঞ্জমেন্টকে বুঝি।


আলোক

হ্যাঁ, অ্যারেঞ্জমেন্ট। অ্যারেঞ্জমেন্ট। ওটা বাধা পায় কখন, যদি আমি কোনো প্রচলিত ছন্দকে সামনে রেখে লিখি। সেইসব লেখা আমি লিখতাম। যেমন… ‘স্বপ্ন নিয়ে সারা দুপুর করি খেলা’, যে কবিতাগুলোকে আমি পছন্দ করি নি। সেগুলো ছাপা হয়েছিল সব বড় কাগজে, কিন্তু … ‘এই এখনি মেঘ ছিল, এই এখনি ছায়া হলো, এই এখনি’… ইত্যাদি। এই ছন্দ একেবারেই আমার মনে হয়েছিল যে, এই ছন্দে আমার কাজ কিচ্ছু হবে না।

আমি

ঠিক, তখন ওরকমই ছিল। তখন কেন, এখনও তো ঐ রকম।

আলোক

হ্যাঁ।

আমি

আপনি আজকেও যদি মেইন স্ট্রিমের কাগজগুলো দেখেন, দেশ পত্রিকা, বা…

আলোক

তাই। মেইন স্ট্রিম ট্রিম আমার কাছে কিছু না। আমার স্ট্রিম।

আমি

তারা এই রকম, তারা এখনও এইভাবে। যেসব কবিতা আবৃত্তি হয়…

আলোক

আমি কিছুতেই লিখব না। যা আছে মেইনস্ট্রিমে, তার মতো লিখব না।

আমি

একদম। মেইন স্ট্রিম বলতে আর কিছুই নয়, প্রাতিষ্ঠানিক স্ট্রিম, যারা প্রতিষ্ঠানের মদতপুষ্ট।

আলোক

আর আমার কাছে ‘মেইন’ ব্যাপারটাই হচ্ছে আমি।

আমি

হ্যাঁ, তাই তো।

আলোক

আমি লিখছি, আমি বলছি, আমি দেখছি। একটা নতুন জিনিস না দেখতে পেলে, এটা পড়লে বোঝা যাবে। আমি রাধার ওপরে একটা কবিতা লিখেছিলাম…। এছাড়া আর কোনো দায়িত্ব নেই। তখন সমাজের ওপর দায়িত্ব নিয়ে, আমার ছোটবেলায়, অনেক কবিতা লেখা হতো। পঞ্চাশের শুরুতে। সেটা কিছুটা শঙ্খ ঘোষ পেয়েছেন, সামাজিক দায়িত্ব। উনি পালন করে যান, পালন করেন। যাই হোক, সেটা ভালো খারাপ আমার কিছু বলার নেই।

আমি

‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’।

আলোক

হ্যাঁ, এই ধরনের খুব সমাজসচেতন কবিতা উনি লেখেন। সে-সময়ে সুভাষবাবু ছিলেন সবচেয়ে প্রিয় কবি। পঞ্চাশ সালে সুভাষবাবু কবিতার রাজা। সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। এই ধরনের কবিরা প্রচুর লিখতেন। রাম বসু। সিদ্ধেশ্বর সেন। তারা সব বামপন্থী কবিরা এইটা করতেন। কিন্তু আমার কাছে, আমি ধরেই নিয়েছিলাম এইসব দায়িত্ব আমার নেই। এসব দায়িত্ব যাদের আছে তারা করুক, তারা খুব ভালো লোক। কিন্তু আমি ভালো লোক খারাপ লোক কিছুই না, আমি একজন মানুষ।  কিন্তু এই ‘একজন’ কথাটাই হচ্ছে আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নিজের আমি। যা লিখব নিজের মতো লিখব। এইসব কবিতাগুলোও কিন্তু খুব অযতনে লেখা।

প্রাকৃতিক ফসল, নিজেকে নির্মাণ করে নি। কিন্তু একটা গাছ তো হয়েছে। যা নির্মিত হয়েছে। গাছের পুরো ব্যাপারটাই, আমি জানি, নির্মাণ একটা। গাছের শিকড়ের কাজ, পাতায় তার সঞ্চার, রৌদ্রালোক থেকে খাদ্য সঞ্চয় করা, ইত্যাদি একটা রয়েছে। আদিমতা, এই আদিম ছবি। এই আদিমতার দিকে আমার ঝোঁক, অর্থাৎ আদিম প্রাকৃতিক ফসল, যা নিজেকে নির্মাণ করে নি, যা নির্মিত হয়েছে। যা কিছু নির্মিত, তা-ই দায়দায়িত্বহীন। এইটা আমার খুব ভালো লাগত। আমার নির্মাণ, আমার। আমাকে চা করতে বলা হয় নি, পায়েস করতেও বলা হয় নি। আমি একটা জিনিস তৈরি করেছি, এইটুকুই। ওই সামাজিক দায়িত্বের কথা আমি মনে একেবারেই আনি নি। আমি কারো কাছে দায়বদ্ধ নই।

আমি

ঠিক।

আলোক

দায়বদ্ধ নই, তাই দায়দায়িত্বহীন। ‘যেমন অলাজ আঁধার, আজ পর্যন্ত কোনো সাজপোশাক পেল না’। আঁধারের কোনো সাজপোশাকই নেই। ‘দ্বিতীয় বিন্যাস পরিস্থিতি’। একটা নিজের বিন্যাসে, একটা দ্বিতীয় পরিস্থিতির মধ্যে সে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখা যাক বা না যাক, তাতে কী আছে? সে দেখাতেও চায় না নিজেকে। অলাজ সে, বটেই, কিন্তু একটা পরিস্থিতি শুধু।


এক অদ্ভুত বিষাদ, ভয় এবং চঞ্চলতা ক্রমশ তাঁকে গ্রাস করছিল। আমাকে দেখে, ওঁর জীবনের পুরোনো দিনের কথা বলে, খুব উৎসাহিত হতেন।


আমি

এই কবিতার নাম দিয়েছেন আপনি ‘নববিধান’। আর এটা পড়ছেন আপনি ‘আশ্রয়ের বহির্গৃহ’ থেকে, তাই তো?

আলোক

নববিধান। হ্যাঁ, হ্যাঁ। ‘একটা কণাও তাৎপর্য নয়। সে তা জানেই না। সে শুধু নিরতিশয় অনুল্লেখ’।অনুল্লেখ তো বটেই, অত্যন্ত অনুল্লেখ। ‘তার কোনো দিকে কোনো উন্মোচন শর্ত হবে না। তার  দিকে কোনো অনির্ণয় নেই’। অনির্ণয় আবার কী ? যা কিছুই নয় তার অনির্ণয় আবার কী?

আমি

এগুলোই আমি বলছিলাম, এই যে ‘অনুল্লেখ’, ‘অনির্ণয়’…

আলোক

হ্যাঁ, হ্যাঁ, এই ‘অ’ কথাটা  আমার কবিতায় খুব আছে।

আমি

এটাই আমি দেখছিলাম, ওই অন্তর্লোক বইতেও তাই দেখলাম।

আলোক

কোথায় দেখলে?

আমি

অন্তর্লোক-এর লেখাগুলোতে।

আলোক

ও, আচ্ছা। তা-ই আছে। ‘অনির্ণয় বস্তুকে চিহ্নিত করে, অনির্ণয় বস্তুকে প্রমাণ করে। অনির্ণয় নির্মিত হবার দিকে অভিযাত্রা। তার শঙ্খধ্বনি আছে, পূজামাল্য আছে। পূজামাল্য বিশ্বদেবতাকে অবধারিত করেছে। ওই, ওই সেই বিকাশমান, তার স্তোত্রপাঠ নতুন শব্দ আনছে। শব্দের প্রকারান্তর নববিধান’। এইটা খুব উল্লেখযোগ্য কবিতা আমার আরকি। এইটাই বলতে চাইছি।… এমন কিছু নয় যে, আমি কিছু নয়—সে কথাটাও সে বলছে না। তারও কিছু নেই। এটা আমি বলি। পোস্টমডার্ন কবিতা অনেকে অনেকভাবে লিখেছে। ঠিক কোনটাকে নেবো আমি, ঠিক করাই আছে। কৌরবকে পোস্টমডার্ন বলাই যায়। কৌরবের বেশিরভাগ কবিতা। কিন্তু কৌরব আমার কবিতা ছাপত। কৌরবের একটা সভায় আমাকে সম্বর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। সেটা আমি খুব আগ্রহ করে নিয়েছি, কারণ এরাই তো আসল পাঠক, আসল লোক বুঝে আমায় সম্মান দিচ্ছে। সেটা খুব সমারোহ করে সম্মান দিয়েছিলেন, খুব তৃপ্ত হয়েছিলাম।

আমি

হ্যাঁ, হ্যাঁ। সেটা কলকাতায় হয়েছিল।

আলোক

হ্যাঁ। আমার কবিতা বিনয়ের একটা ধারার মধ্যে পড়ে, অংশত। শেষদিকের কবিতাগুলো, আমার ভালো লাগে। কিন্তু বিনয়ের ঐ প্রথমদিকের অঘ্রাণের অনুভূতিমালা ইত্যাদি, ওটা জীবনানন্দের ভেতর থেকে ওঠা জিনিস, ওটা কেন আমি ভালো বলব? কিন্তু শেষদিকের কিছু কবিতা অবশ্যই আছে, যেটা অনন্যসাধারণ। আমি দেখলাম, বিনয়ের শেষদিকের কবিতা খুব আত্মচিহ্নিত কবিতা।

আমি

তবে ফিরে এসো চাকা আমার খুব প্রিয়।

আলোক

ওটা ষাটের প্রথম দিকে লেখা বোধহয়। যাক যা বলছিলুম আমি, কিন্তু এদের ব্যাপারটা, ওই মলয় রায়চৌধুরী, হাংরি। ওদের ব্যাপারটা আমায় কোথাও আটকে দিত। ওরা খুব সপ্রাণ কবি। এবং নিজেকে, নিজের আত্মপ্রত্যয় থেকে লেখা। কিন্তু কোথায় একটা দেখাবার ঝোঁক আছে। সেই আঁধারের মতো সে অলাজ নয়। দেখানোর ঝোঁক। আমি আছি, আমি দেখাচ্ছি, দেখ, এই যে। দেখানো কেন? লোককে চমকে দেবার একটা ব্যাপার? (আমার মনে হয়) আমার কিছুই দায় নেই। পাঠক আছে, তুমি শুনছ, এরা বলছে শোনাতে তাই শোনাচ্ছি। সেখানে আমার অভিনয় করারও কিছু নেই। কিছুই নেই। ওই অলাজ। অলাজ মানে অসজ্জা, একেবারে এটা আমি দেখাচ্ছি তোমায়। এরই সাধনা, এর জন্যেই বিশ্বমালা প্রস্তুত হয়েছে। এ-ই মালা পাবে শেষ পর্যন্ত, যদি কিছু না নিয়ে, কিছুনা-র থেকে একটা হ্যাঁ করে তোলে। এই হ্যাঁ কথাটা আমি কখনো ব্যবহার করব না, করে ফেললাম। কিন্তু হ্যাঁ-ই আছে, একটা অস্তিত্ব। একটা অস্তিত্ব যদি আমি তৈরি করতে পারি, তাহলে আমি লিখব। আমার কারো কাছে কোনো দায়িত্ব নেই।

২.
দারুণ আগ্রহ নিয়ে জীবনের শেষদিন অব্দি উনি অপেক্ষায় ছিলেন আমার ছবিটা দেখার। বলেছিলেন, কবিদের মনোজগৎ নিয়ে এমন কাজ বাংলায় এই প্রথম। আমার দুর্ভাগ্য, ওঁকে আমি ছবিটা দেখাতে পারি নি। ছবির কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই প্রয়াত হয়েছিলেন সমীর রায়চৌধুরী ও আলোক সরকার। ছবির শুটিংপর্ব শেষ হলে, আমার অনুরোধে প্রত্যেক কবিই আমাকে লিখে জানিয়েছিলেন তাঁদের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া; তখনও পুরো ছবিটা ঠিক কীভাবে নির্মিত হয়ে উঠবে তা নিয়ে ওঁদের কারোরই সম্পূর্ণ ধারণা ছিল না। শুটিংয়ের পরে সেভাবেই আলোক সরকার লিখে জানিয়েছিলেন, রুলটানা কাগজে, কাঁপা কাঁপা হস্তাক্ষরে। খুবই স্বতঃস্ফূর্ত সেই লেখা।

“যে কোনো সংকটের মুখোমুখি হলে আমার প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব আমাকে পরামর্শ দেয় ঝাঁপিয়ে পড়, তারপর দেখা যাবে। আমি সাধারণত লক্ষ্য নির্দিষ্ট করে যাত্রা শুরু করি না, আমার অভিজ্ঞতা আমাকে স্মরণ করায় সোনারপুর ঠিক করে যাত্রা শুরু করলে তুমি শুধু সোনারপুরই দেখবে কদাচ হিমডাঙা নয়। অনির্দিষ্ট ভ্রমণের যে হাজার সম্ভাবনা তার একটিও তোমার অভিজ্ঞতা হবে না। শংকর লাহিড়ী বলা মাত্র আমি কাজে নেমেছি নির্ভার, বলা যেতে পারে নিশ্চেতন, চুল আঁচড়ানো আছে কিনা তা নিয়ে বিচলিত হই নি, জামা ধবধবে, প্রয়োজন মতো যা যা মনে হয়েছে তা বলে গেছি, অতিপ্রাজ্ঞতা আর অতিসারল্য—দুটোর কোনোটাকেই প্রশ্রয় দিই নি—বুক থরথর করে নি, চোখ নিদ্রাচ্ছন্ন। স্বতঃস্ফূর্ত কথোপকথন, তাতে নাকি অবচেতন মন সম্মানিত হয়। তবু সব নিয়ে একটা সমগ্রতার দিকে যাওয়া হয়, হোক না হোক ও সব নিয়ে আমার কণামাত্র ভাবনা নেই।”

ছবির পোস্ট-প্রোডাকশান পর্বে, আমি তখন আপ্রাণ চেষ্টা করছি স্টুডিওতে সম্পাদনার কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করে আনতে, আর মাঝে মাঝে ছুটে যাচ্ছি কবি আলোক সরকারের বাড়িতে, তাঁর রোগশয্যার পাশে। এত দ্রুত ওঁর শারীরিক সমস্যাগুলো বেড়ে যাচ্ছিল, রোগ ছড়িয়ে পড়ছিল শরীরে। এক অদ্ভুত বিষাদ, ভয় এবং চঞ্চলতা ক্রমশ তাঁকে গ্রাস করছিল। আমাকে দেখে, ওঁর জীবনের পুরোনো দিনের কথা বলে, খুব উৎসাহিত হতেন।

অসুস্থতার খবর পেয়ে একদিন সকালে আমি ওঁকে দেখতে গিয়েছিলাম। গরফায়, সেই ফাঁকা বাড়িতে কিছুক্ষণ ওঁর সাথে একান্তে। ওঁর ছেলে এসেছেন আমেরিকা থেকে। সঙ্গে নাতিও। তাদের সবাইকে নিয়ে আলোকদার স্ত্রী গিয়েছেন কাজে, ফিরবেন সন্ধ্যায়। একজন আয়া রয়েছেন ঘরে। তিনিই আমাকে নিয়ে গেলেন ভেতরের ঘরে। ড্রয়িং রুমের বদলে শোওয়ার ঘরে গিয়েই বসতে হলো। কবি শুয়ে আছেন বিছানায়। আমারই অপেক্ষায় রয়েছেন বললেন। শরীর খুব দুর্বল, কিছু খেতে ইচ্ছে করে না। ডাক্তার দেখেছেন; রক্ত পরীক্ষা ও আল্ট্রাসোনো হয়েছে—সবই নর্মাল। তবে সোডিয়াম পটাশিয়াম মাঝে মাঝে নড়ে যায়। তখনো কেউ জানে না ওঁর শরীরে কোলন ক্যান্সারের কথা, ডাক্তারও বোঝেন নি।

আমাকে দেখে খুব উৎসাহিত। সিনেমার কথা জিগ্যেস করতে আমি ওঁকে ছবির তিন মিনিটের ট্রেলারটা দেখালাম, মোবাইল স্ক্রিনে, কানে হেডফোন লাগিয়ে। খুব খুশি হলেন। হঠাৎই বললেন, ‘তোমার মোটরহোম বইটা পড়েছি। পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। কিন্তু আমি ঠিক করতে পারি নি (ওই জার্নিতে) লোকে কী করে কী করবে, তবে ছবি তুলতে আমি জানি। বইটা পড়ে আমি খুব বিচলিত হয়েছিলাম যে এই ধরনের বই তো আর নেই। দ্বিতীয় কিছু নেই। এটাই প্রথম। এটা আমাকে আকর্ষণ করেছিল, তবে আমার এ ছিল যে, এই জার্নির সাথে লোকে ছুটতে পারবে কিনা’। —আরো অনেক কথা হলো। শুরুতে খুব গ্লুমি হয়ে শুয়ে ছিলেন। কথা বলতে বলতে ক্রমশ উজ্জ্বল। মৃত্যুভাবনা উধাও। কবিতা শোনালেন ওঁর শোনো জবাফুল বই থেকে, যে বইটার জন্যে উনি পেয়েছেন ২০১৫ সালের সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার। আমার ভয় হচ্ছিল, বেশি কথা  বললে ওঁর যদি শরীর খারাপ হয়। কিন্তু ওনাকে তখন কথায় পেয়েছে।

আলোক

শোনো জবাফুল খুব শান্ত ভাবে ভালোবাসার লেখা। কী ভালোবাসা? না, যা আছে তাকে ভালোবাসো। সেই প্রথম কবিতাটা আমি বলছি, ছোট ছোট কবিতা। ‘শোনো জবাফুল, তোমার মাটি সরস আছে তো? তোমার শরীরে রোদ্দুরের কাপড় আছে তো? মাটি সরস না থাকলে, গায়ে রোদ্দুরের কাপড় না থাকলে, তুমি কী করে অমন সুন্দর ফুল ফোটাতে?’–এইটাই। এই রকম সব ছোট ছোট কবিতা।

সেদিন কবি আলোক সরকারের বিছানার পাশে বসে কথা বলতে বলতে বুঝেছিলাম ওঁর ভেতরে এক ধরনের ভয়,—মৃত্যুভয় চেপে বসেছে। কখনো তাকে স্বীকার করছেন, কখনো সোচ্চারে বলছেন ‘আমি প্রকৃতির নিয়ম মানি না’। যুক্তি এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে কখনো। আমি অবাক বিস্ময়ে ওঁকে লক্ষ করি। আমার ‘উত্তরমালা’ সিনেমায় মৃত্যু নিয়ে আলোচনা আছে কবিদের সাথে। কবি সমীর রায়চৌধুরীর মৃত্যুর পরে শবদেহের পাশে দাঁড়িয়ে আমার মনে পড়েছিল মৃত্যু মুহূর্তটি সম্বন্ধে তাঁর অদ্ভুত বর্ণনার কথা, যা সিনেমায় রয়েছে। মাত্র কিছুদিন আগে ক্যামেরার সামনে যেভাবে তিনি আমায় বুঝিয়েছিলেন। সেখানে কিন্তু ভয়ের কোনো প্রসঙ্গ ছিল না। কিন্তু আলোক সরকার প্রথমেই বলেছিলেন তাঁর ভয়ের কথা।

৩.
আজ ২০ অগস্ট, ২০১৬ -একলা বাড়িতে তিনি বিছানায় শুয়ে আছেন, পাশে বসে অসহায় আমি তাঁকে আলোকময় জীবনের কথায়, কবিতার কথায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। একটা অন্ধকার ওঁকে ভয় দেখাচ্ছে। উনি বলেই ফেললেন, ‘জানি না  মৃত্যু কোথায় নিয়ে যাবে, কোন অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে আমায়’। শুনে আমার মনে হলো ওঁকে বের করে আনতে হবে ঐ অন্ধকার সুড়ঙ্গ থেকে। কবিতা দিয়েই চেষ্টা করতে হবে। ভাবলাম ওঁকে কি আমি ড্রয়িং খাতা আর রং-বাক্স এনে দেবো? বলব সবুজ ঘাসের দেশ, বহতা নদী, পাখি, প্রজাপতি, ঝরাপাতা আর কচিপাতা আঁকতে? কিন্তু আমি তো জানি ওঁর হাত কাঁপে, হাতের লেখাই বোঝা যায় না। একবার মনে হলো বাইরে এখন যদি বর্ষাকাল না হয়ে বসন্ত হতো। মনে হলো ওঁর জীবনের সকল অর্জিত জ্ঞানের নিরাপদ আশ্রয়ে ওঁকে ফিরিয়ে আনতে হবে। উনি নিজেই পারবেন এই মৃত্যুভয়কে কাটিয়ে উঠতে। আরও অন্তত পাঁচ বছর কি মনের আনন্দে বাঁচতে পারবেন না? হয়তো।


অগ্রাহ্য করাটা আমার কাজ নয়, আবার গ্রাহ্য করাটাও যেমন কাজ নয়। আমার কাজ হচ্ছে একটা সৃষ্টি করা।


ফিরে আবার মৃত্যুর কথায়। বললেন, বন্ধুরা সবাই মারা গেছে। দুএকজন যারা বেঁচে আছে, আজকাল ফোন করতে ভয় করে। এসব মৃত্যুকে আমি কীভাবে নিয়েছি আমি জানি না। এখন বেঁচে থাকতেও ভয়। দেখলাম সবচেয়ে পাপী আমি, কারণ আমি সবচেয়ে বেশি বেঁচে আছি। এবং শংকর চট্টোপাধ্যায়, বিমল রায়চৌধুরী, যারা সব উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপন করতো, কিন্তু তারা সব ঠিক সময় মতো চলে গেল। সব চলে গেল, কেউ নেই, দীপঙ্কর ছিল, সব।  হ্যাঁ, সত্যেন আচার্য্য আছে’।

বললেন, ‘একদিন শংকর চক্রবর্তীকে আমি বললাম এই ছবিটার কথা।  সে বলল, ‘আমি তো জানি না। এই খবরই জানি না যে এরকম একটা কাজ হচ্ছে, পরে জানলাম’। ও জানতোই না’। আমি বললাম আলোকদা, আপনাকে ওই  সিনেমা আমি বাড়িতে এসে দেখিয়ে যাব, আপনি মনে জোর রাখুন।

আমি ঠিক বুঝতে পারছি না ওঁর ভেতরটা কতখানি রাত্রিময় হয়ে আছে। বললেন, ‘আমি জ্যোতিষশাস্ত্র চর্চা করেছি। সমর্থন পেয়েছি। যেমন আমার ছকে একটা ঘটনা আছে যাতে আমি দীর্ঘদিন বাঁচব। এটা আছে। আবার এটাও আছে যে জীবনে সাকসেসফুল হবো’। এ-কথায় ওঁর চোখমুখ ক্রমশ উজ্জ্বল। এরপর অনেক কথা হলো। জীবনানন্দ, ইয়েটস, দেরিদা।

আমি

আপনার একটা কবিতার বইয়ের নাম অমূলসম্ভব রাত্রি। এই রাত্রি কী রকম? কী তার লক্ষ্মণগুণ? এ কি কোনো অদ্ভুত আঁধার?

Poet Alok Sarkar_Aug'16
মৃত্যুর কয়েক মাস আগে, রোগশয্যায় কবি আলোক সরকার।

আলোক

‘এমন একটা রাত্রি যার কোনো পটভূমি নেই। যে রাত্রির কোনো মূল নেই, শিকড় নেই, ভূমিকা নেই, ঐতিহ্য নেই। শিকড়কে বাদ দিয়ে যা সম্ভব হয়েছে, অমূলসম্ভব হয়েছে, সেটা নিশ্চয়ই আমাদের কাছে খুব বিস্মিত হবার ব্যাপার।’ এই বইটি নিয়ে, নিশ্চয় জানেন আপনি যে…

আমি

আমাকে ‘তুমি’ বলুন, আলোকদা।

আলোক

হ্যাঁ। ঐ যে আর্যনীল, সে তো উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিল বইটার, সেটা বেরিয়েছিল কৌরবে। আসলে, ঐ বইটা ছন্দে লেখা নয়। কিন্তু রেগুলার একটা ছন্দ আছে, যেটা ব্যাকরণ বইতে পাওয়া যাবে না। যাই হোক, অমূলসম্ভব কথাটাই খুব গুরুত্বপূর্ণ। শিকড়হীন, ঐ হওয়াটা, রাত্রিটা হয়েছে। মূল জোর আমার রাত্রির ওপর। এটা কিন্তু কোনো কবিতার সঙ্গে, পূর্ববর্তী কোনো মহৎ লেখকের লেখার সঙ্গে সাযুজ্য নেই।

আমি

এটা সেই রাত্রি, যাকে নিয়ে জীবনানন্দ লিখেছেন ‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ’—সেরকম তো নয়?

আলোক

না না, মোটেই নয়। ‘অদ্ভুত আঁধার’ মানে যেখানে মানুষ খুব নিচে নেমে গেছে । ‘যারা অন্ধ সবচেয়ে তারা আজ বেশি করে দেখে’। এইটা ছিল। ওটা ইয়েটস-এর সেকেন্ড কামিংস-এর প্রায় অনুবাদ। ওটা অনুবাদ। আমার নিজের ওসব কবিতার প্রতিবাদ আছে। কারণ, অমূলসম্ভব তো নয়, ওটার বেশ মূল আছে। মূলে দাঁড়িয়ে লেখা। যেমন, ‘হায় চিল’। মূলে ভিত্তি করে লেখা। ট্রাডিশানকে পাশে রেখে,… অগ্রাহ্য করাটাকে আমি খারাপ মনে করি। অগ্রাহ্য করাটা আমার কাজ নয়, আবার গ্রাহ্য করাটাও যেমন কাজ নয়। আমার কাজ হচ্ছে একটা সৃষ্টি করা। একটা হওয়া। এই হওয়াটাকে আমি চাই। ওই রাত্রিটাই আমার লক্ষ্য। আমার যে প্রথম বই উতল নির্জন, যা আমার সতের আঠার বছর বয়সে লেখা, সেখানে আমি একটা কবিতা লিখেছিলাম, সতের বছর বয়সে, ‘তা আমি নেবো বা কেনো আমার যা নয়’। তাতে আমার ইন্টারেস্ট নেই, যা হওয়ার কথা তা হয়েছে। যৌবনের কিছু ধর্ম আছে, আমি তা পালন করব কেন? তা তো আমার নয়। আমি জানি, এই যে যৌবন একে প্রকৃতি ব্যবহার করছে, যৌবনকে ব্যবহার করছে। করে, আমাকে প্রকৃতির পারপাসটা সার্ভ করবে। প্রকৃতির পারপাস সার্ভ করার জন্য কিছু প্রাকৃতিক ধর্ম আছে, আমাকে পালন করতে হবে। আমি তা করতে দেবো কেন? আমি নিজেই নিজেকে তৈরি করব। এই জায়গা থেকে, প্রতিজ্ঞাটা এইখানে। তা আমি নেব বা কেন? বারবার দেখি যে, প্রকৃতি নিজেই একটা বিদ্রোহ করে। বসন্ত আসার সঙ্গে সঙ্গে গাছ থেকে তার পাতা সব ঝরে যায়। একটা প্রকৃতির যেন নির্নিমেষ অন্বেষণ তার, একটা একটা পাতা ছিঁড়ে ভাসিয়ে দেয়। তারপরে নতুন পাতা হয়। প্রকৃতি রাখতে চায় না। যা আছে তাকে ধ্বংস করে দাও। পুরোনো পাতাকে জলে ভাসিয়ে দেয়। দিয়ে, আরেকটা কিছু হয়। এবার যে গাছটা হয়, সেটা আমার পুরোনো চেনা গাছটা নয়। তার মধ্যে একটা দৃপ্ত কণ্ঠ আছে যে, তুমি যা করতে চেয়েছিলে আমাকে দিয়ে আমি তা করি নি। আমি নতুন আগন্তুক, আমি এসেছি। ‘নবীন আগন্তুক, নবরূপ তব যাত্রার পথে চেয়ে আছে উৎসুক’ —এটা রবীন্দ্রনাথের লাইন। এই নবযাত্রার পথে আমার চেয়ে আসা আছে। …

(চুপ করে ভেবে) যারা ছিল আমার সমবয়সী বন্ধু বান্ধব, তাদের চলে যাওয়া। আজ সকালেই ভাবছিলাম যে, আমার কেউ নেই। যাদের সঙ্গে বড় হয়েছি তাদের একজনও বেঁচে নেই। আমার কোনো ভাই বেঁচে নেই, বন্ধু বেঁচে নেই। আমার কোনো আত্মীয়, মামা কাকা ইত্যাদি, তারা বেঁচে নেই। আমি এক্কেবারে নিঃসঙ্গ। আমার কি ভালো লাগছে?—এই প্রশ্ন নিজের কাছে। শেষ পর্যন্ত এলাম যে, ভালো লাগছে না। কিন্তু আমার ইচ্ছে হলো কী, ভালো লাগুক। তাই তো হবে, এই তো প্রকৃতির নিয়ম। কিন্তু আনন্দ তো পাচ্ছি না আমি। কারণ আমাদের একটা প্রতীক্ষা আছে, চাওয়ার ইচ্ছে আছে। সত্য বলতে, সবাই যে চলে গেল, খাঁ খাঁ করে চতুর্দিক। ধূধূ, হুহু করে। কেউ আমার নিকটজন নেই। কোনো নাম মনে করতে পারি না, দুএকজন বন্ধু এখনও বেঁচে আছে। এই না-বাঁচাটাকে আমার ভালোই লাগছে বোধহয়, এইটা আমার ভালো লাগে না। আমি চাই, এতে আনন্দ পাই আমি। আমি প্রকৃতির নিয়মকে অগ্রাহ্য করব। আমি যে জন্মেছি, তার কোনো মূল, শিকড় থাকবে না। প্রকৃতির রীতির ভেতর দিয়ে আমি জন্মেছি, তা হোক, তা আমি চাই না।

আমি

তবে এটা ভালো লাগছে কি লাগছে না, এই দোলাচলটা রয়েছে।

আলোক

না, ঠিক করা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে আমার ভয়ংকর চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছে করে যে, আমি কেন বেঁচে থাকব। এই যে একটা অজ্ঞান নিয়ম, একটা যাত্রাকাহিনি হচ্ছে, উঁচু হলে নিচে পড়বে, নিচু থেকে ওপরে উঠবে না। এই আমাকে মেনে নিতে হচ্ছে, এই মেনে নিচ্ছি। এই মেনে নেব কেন? আজ সকালেও আমি কিছুক্ষণ প্রার্থনা করেছি যে আমার মৃত্যু হয়ে যাক, এইভাবে জীবনযাপন করব না। কিন্তু সেই জীবনযাপন করি।… একদিন রাতে, দুতিনদিন আগে গলায় কি একটা বেধে গেল, কাশছি, বারবার কাশছি, সেটা আর বেরোচ্ছে না। তো আমি ভাবলাম, তাহলে এতেই কি আমি মারা যাব? তারপরে ভাবলাম, ছি ছি, আমি শেষ পর্যন্ত এইতে মারা যাব যে গলায় একটা কুটো কি বেধে গেছে? এতে মারা যাব? কিন্তু সেই কাশি আর ছাড়ল না। জল খেয়ে, তিন ঘণ্টা ধরে। তারপর আমায় স্ত্রী বলল, একটা ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমোও।

৪.
সেদিন ওঁর রোগশয্যার পাশে বসে, ওঁর কথা শুনতে শুনতে আমার নিজেকে কেমন যেন অসহায় মনে হচ্ছিল। অনর্গল কথা বলছিলেন উনি। দেরিদার তত্ত্বের প্রসঙ্গ তুলে বললেন, ওঁর ‘বিনির্মাণ’ কথাটার কোনো মানে নেই। যা কিছু নির্মিত তা-ই বিনির্মাণ। একটা জল আর চিনি আছে, এ-দুটোকে মিশিয়ে আমি বিনির্মাণ করলাম মিষ্টি জল। সবই তো তাতে আছে।… বিনির্মাণ বলে কোনো কথাই হয় না।

তবে নিজের কবিতা থেকে কোট করতে গিয়ে ভুল করে ফেললেন। ভুল করে যা বললেন সেটা আরও সুন্দর। বললেন, ‘আমিও একটা করেছি কি, টেবিল ঢাকার পরে লাল সুতো ছিল, তারপরে একটা নীল শুধু আমি বসিয়েছিলাম। ‘লাল সুতো-বোনা ফুল মাঝে-মাঝে নীল সুতো ছিল’ এতেই একটা নির্মাণ হয়ে গেল’।—কিন্তু মূল কবিতায় তো আছে, ‘লাল সুতো-বোনা ফুল মাঝে-মাঝে কালো সুতো ছিল’। আমার মনে হলো, এই মুহূর্তে হয়তো ওঁর মনোজগতে ধীরে ধীরে কালোকে সরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে কোনো নীলিমার নীল। না হলে, সুতোর রং তিনি নীল বললেন কেন!

সারা বাড়িতে সেদিন তখন শুধু আমরা দুজন।  মৃত্যুর অপেক্ষায় সম্ভবত ওঁর শেষ কথাগুলো উনি বলে যাচ্ছেন আমাকে। শুধুই আমাকে। বাংলাসাহিত্যের আর কোনো লেখক পাঠক সম্পাদক প্রাবন্ধিক সমালোচক আকাদেমি কেউ সেদিন ছিল না সেই ঘরে, কবির সাথে সেই শেষ আলাপচারিতার সঙ্গী হতে। মৃত্যুর মাত্র কিছুদিন আগে।

শংকর লাহিড়ী

জন্ম ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৫০, জামশেদপুর। তৎকালীন বিহার, এখন ঝাড়খন্ড।

শিক্ষা : শৈলেন্দ্র সরকার বিদ্যালয়, কলকাতা। রিজিওনাল এঞ্জিনীয়ারিং কলেজ, দুর্গাপুর।

পেশা : পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। জামশেদপুরে টাটা স্টীল ইস্পাতপ্রকল্পে ৩৭-বছর কর্মজীবনের শেষে অবসরজীবনে এখন কলকাতায়।

প্রকাশিত বই :

কবিতা—
শরীরী কবিতা (১৯৯০, কৌরব প্রকাশনী)
মুখার্জী কুসুম (১৯৯৪, কৌরব)
উত্তরমালা, বেরিয়ে এসো প্লীজ (১৯৯৬, কৌরব)
বন্ধু রুমাল (২০০৪, কৌরব)
কালো কেটলি (নির্বাচিত কবিতা, ২০১২, ৯’য়া দশক প্রকাশনী)
সমুদ্রপৃষ্ঠাগুলো (কবিতাসমগ্র, ২০১৪, কৌরব)

গদ্য—
মোটরহোম (২০০৩, কৌরব)
কোরাল আলোর সিল্যুয়েট (নির্বাচিত গদ্য, ২০১২, কৌরব)

তথ্যচিত্র (রচনা, প্রযোজনা ও পরিচালনা) :

১. ‘রাখা হয়েছে কমলালেবু’
–কবি স্বদেশ সেনের সময়, জীবন ও কাব্যভাবনা নিয়ে ২০১৫ সালে নির্মিত ১২৭ মিনিটের তথ্যচিত্র।

২. দ্বিতীয় ছবি ‘উত্তরমালা, বেরিয়ে এসো প্লীজ’। কবিতাকে আশ্রয় করে, কবিদের নিয়ে, কবিদের জন্য ২০১৬ সালে নির্মিত ১৩২ মিনিটের তথ্যচিত্র। এতে অংশগ্রহণ করেছেন বাংলা ভাষার নয়জন নবীন ও প্রবীণ কবি, যাঁদের মধ্যে আছেন কবি মণীন্দ্র গুপ্ত, সমীর রায়চৌধুরী ও আলোক সরকার।

ই-মেইল : slahiri4u@gmail.com