হোম সমালোচনা বাঙাল বুদ্ধিজীবীর নিখিল জীবন

বাঙাল বুদ্ধিজীবীর নিখিল জীবন

বাঙাল বুদ্ধিজীবীর নিখিল জীবন
991
0

পথিক: ক্ষণকের তরে বস মোর শিরে
ফাতেহা পড়িয়া যাও নিজ নিজ ঘরে;
যে জন আসিবে মোর সমাধি পাশে
ফাতেহা পড়ে যাবে মম মুক্তির আশে।
অধম মনিরুজ্জামান নাম আমার
‘ইসলামাবাদী’ বলে সর্বত্র প্রচার।


‘বাঙালি’ আর ‘বাঙাল’ দুই ভাবের ভেতরে খানিক বিদ্যাবুদ্ধির কুসংস্কার আছে। আর আছে ক্ষমতাকেন্দ্রের কূট-রাজনীতির মারপ্যাঁচ। কেন এই সংস্কার আর কুসংস্কারের রাজনীতি?


বাঙালি আধুনিক কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত একদা মম চিত্তে ঘোষণা করেছিলেন ‘দাঁড়াও পথিক বর, জন্ম যদি বঙ্গে,—তিষ্ঠক্ষণকাল’। মধুসূদনের এ বাণী এখন ক্ষণকালে নাই, ভবিতব্যই তার তিষ্ঠ বলে বিবেচিত। কাল পেরিয়ে পরকালেও পৌঁছেছে। মধুসূদনের মতো এমতো এপিটাফ পাড়লেন বাঙাল বুদ্ধিজীবী মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী (১৮৭৫-১৯৫০)। রচনার মাথায় আমরা ‘বাঙাল’ শব্দটি ব্যবহার করেছি। ‘বাঙালি’ আর ‘বাঙাল’ দুই ভাবের ভেতরে খানিক বিদ্যাবুদ্ধির কুসংস্কার আছে। আর আছে ক্ষমতাকেন্দ্রের কূট-রাজনীতির মারপ্যাঁচ। কেন এই সংস্কার আর কুসংস্কারের রাজনীতি? এমন প্রশ্ন তোলার সুযোগ করে দেয়ার জন্য কবি ও নাট্যকার অভীক ওসমানকে ধন্যবাদ। কারণ তিনি সম্পাদনা করেছেন মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এছলামাবাদীর খণ্ডজীবন ‘হতাশ জীবন’

আদিতে আমরা ‘বাঙালি’ ও ‘বাঙাল’ এ দুটি শব্দ নিয়ে জিজ্ঞাসার সূত্রপাত করেছিলাম। অর্থবিদ্যা কহে—জাতিগোষ্ঠীর ধারণা মানলে দু’শব্দের অর্থমতো কোনো ফারাক নাই। ফারাক শুদ্ধ ধ্বনিগত। জাতিগোষ্ঠীর গোড়া—যা ‘বাঙালি’ তাই ‘বাঙাল’। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে জাতিরাষ্ট্রের বেলায়। তবে কি জাতিরাষ্ট্র ‘বাঙালি’ আর ‘বাঙাল’ পদাবলিকে দুইভাগে ভাগ করেছে? দোষটা নিছক রাষ্ট্রেরই—একথা বলেই আমরা খানিকটা পার পেতে পারতাম হয়তো! জাতি তাতে পাত কিংবা জন্মেরই নামান্তর মাত্র। শুদ্ধ রাষ্ট্রের গায়ে দোষ চাপালে খানিক বেআক্কেলে ঠেকে। রাষ্ট্রের দোষ শ্রেণি বিভাজন—একথা সকলেই মানবেন। কিন্তু ভাষার ভেতর যে বিদ্যাবুদ্ধির কুসংস্কারের ভদ্দরলোকি আছে সেটা ঠেকাবে কে? সেই কুসংস্কার কেমন? শ্রেণি বিভাজিত বিদ্যাবুদ্ধির জগতে ভদ্দরলোকি বিশ্লেষণে ‘বাঙালি’ সেই, যে ‘আধুনিক’। আর ‘বাঙাল’ বলা হয় ঠিক ‘গ্রাম্য’ বা ‘গাঁয়া’ অর্থে। ঔপনিবেশিক মনাক্রান্ত কোনো কোনো লেখক এহেন ভাবকে তুচ্ছ করতে ‘চাষাঢ়ে’ শব্দটি ব্যবহার করেন। অনাধুনিক ওর্ফে বাঙাল সমাজে ‘বাঙালি’ শব্দখানি ভাবগতভাবে তেমন নতুন অর্থ খাড়া করে না। দুই শব্দ সমার্থবোধক। ভারতের প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী রণজিত গুহের সাহিত্য ধর্মতত্ত্ব মানলে বলতে হবে ‘বাঙাল’ মালটা ‘সাব-অলটার্ন’ বটে! এই হচ্ছে সাংস্কৃতিক পুঁজির খেলা। মনিরুজ্জামান এছলামাবাদীকে আমরা সাংস্কৃতিক পুঁজির দিকে ঠেলিলাম না। আমরা দেখব, সাংস্কৃতিক পুঁজি তাঁকে কিভাবে বেলছে। আর এহেন ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’ (Cultural Capital) ভাবের তত্ত্বতালাশ করেছেন ফরাসি বাড়ির দার্শনিক পিয়ের বুর্দো (pierre bourdieu)। আমরা খানিক উছিলা দেখালাম মাত্র। বুর্দোর কহেন, ‘মন বস্তুজগতের রূপক।’ আমরা বলিলাম রূপক বৈ, অন্য কিছু নহে। ফলে আমাদের দেখার যে দৃষ্টিভঙ্গি সেটাও শ্রেণিশাসিত। এই শাসন ইতিহাসের সত্য দূরে ঠেলে রাখে। মনিরুজ্জামান এছলামাবাদীও ইতিহাসের চাপা পড়া আরেক ইতিহাস। সেটা কেমন?


খোদ ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে বাংলা ও আসামের মুসলমানদের নিয়ে বিপ্লবী দল গঠন করেন। বিপ্লবী সরকার গঠনের পরিকল্পনায় নেতাজী সুভাষ বসুরও সহচর ছিলেন তিনি।


13351068_10154194407582170_1428450217_o
মৌলানা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী (১৮৭৫—১৯৫০)

অভীক ওসমানের আগে মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এছলামাবাদীর আত্মজীবনী সম্পাাদনা করেছেন শামসুজ্জামান খান। খানের সম্পাদনা বহিতে ‘হতাশ জীবন’ স্থান পায় নাই। ফলে খানের সম্পাদিত বস্তুকে খণ্ডিত আত্মজীবনী বলা শ্রেয়। অভীকের সম্পাদনাও অখণ্ড নয়। তবে দুটো রচনাকে এক করলে এছলামাবাদীর আত্মজীবনীর খিল আর নিখিলের ভাবধর্ম বুঝতে সহজ রাস্তা মিলবে। খান আর অভীকের বহিতে সম্পাদনায় সতর্কতার অ-ভাব বিলকুল বিদ্যমান। দেখা মিলছে ‘মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী’ নামের বানানের নানা রকম কাণ্ডকীর্তি। শামসুজ্জামান খানের সম্পাদিত বহিতে ‘এছলামাবাদী’ শব্দকে লিখেছেন ‘এসলামাবাদী’। আর অভীক ওসমান এটাকে সংস্কার করে লিখেছেন ‘ইসলামাবাদী’। এই বানান সংস্কারের কোপানলে পড়েছে খোদ ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন’ (সনদ ১৯৮৮)! আর ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পথ ধরেছে ‘মুক্তিযোদ্ধা ফাউন্ডেশন’ (সনদ ১৯৯৮)! ‘এছলামাবাদী’ পদকে ‘এসলামাবাদী’ বা ‘ইসলামাবাদী’ বলার পেছনে কি বিদ্যা-বুদ্ধির সংস্কার নাই? তবে প্রশ্নটি শামসুজ্জামান খান ও অভীক ওসমানের প্রতি তোলা থাকল। এ প্রশ্নও উঠতে পারে, এরকম বানান সংস্কার চাই কিনা আমরা? কোনো এক আদি কবি বলেছেন, নামে কি আসে যায়! কবির কথায় নির্মম রসিকতা আছে। রসিকতা এমনই আদি নাই, খাটে আছে। না হলে কিভাবে রূপান্তর ঘটে ‘এছলাম’ শব্দের ‘এসলাম’ আর ‘ইসলাম’। এই এক আধুনিক প্রমিত রোগ বটে! ভাষাবিৎ রোমান ইয়াকবসন খানিকটা টের পেয়েছেন।

ইতিহাসের সাধারণ পুঁজিতে বলা হয়, উপমহাদেশে উনিশ শতক বাঙালির জাগরণের কাল। তবে কি আগের শ’ শ’ শতকে বাঙালি ঘুমিয়ে ছিল? তার আগে কি বাঙাল ওর্ফে বাঙালি জাগে নি? জেগেছে নিশ্চয়। আঠার শতকের পঁচাত্তরে চাটগাঁয়ের পটিয়ায় আড়ালিয়ার চরে জন্ম মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এছলামাবাদীর। মাতৃভাষার পাশাপাশি মাত্র ৮ বছর বয়সে আরবি আর ফার্সি ভাষার ব্যাকরণ কোশেশ করেন তিনি। খান সম্পাদিত জীবনীতে এছলামাবাদীর বয়ান: ‘আমি নিজ সহপার্টিদিগকে অতিক্রম করিয়া বারবার উচ্চশ্রেণির পুস্তক পড়িবার দিকে অগ্রসর হইতে থাকায় শেষ ভাগে আমার সমশ্রেণিতে কেহই ছিল না। আমার শ্রেণিতে আমি একাই পড়িতে লাগিলাম।’ মওলানা একা একা পড়লেও জীবন কাটিয়েছেন সাধারণ মানুষের কাতারে। খোদ ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে বাংলা ও আসামের মুসলমানদের নিয়ে বিপ্লবী দল গঠন করেন। বিপ্লবী সরকার গঠনের পরিকল্পনায় নেতাজী সুভাষ বসুরও সহচর ছিলেন তিনি। চুয়াল্লিশে তিনি চাটগাঁয়ে গ্রেফতার হন। কারাবরণ করেছেন কলকাতায় ও লাহোরে। দুস্থ মানুষের জন্য সুস্থ ব্যবস্থা, সাংবাদিকতা… আরও কত কী করলেন এছলামাবাদী!


‘হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়’ নামক রচনায় রবি ঠাকুর বাঙালি হিন্দু-সমাজের সংকীর্ণতাকে চিহ্নিত করেছিলেন। বাতলে ছিলেন উত্তরণের পথও।


বেশির ভাগ সমালোচকের চোখে এছলামাবাদী সমাজ-সংস্কারক। শুদ্ধ সংস্কারক বললে তাঁকে খানিকটা খাটো করা হয়। বরং বলা যেতে পারে তিনি সমাজগঠক। তিনি মনে করতেন, সমাজের কু-সংস্কারের তলানিতে থাকা (বাঙালি) মুসলমানকে বিদ্যা-বুদ্ধির জগতে না আনলে জনগণের মুক্তি মিলবে না। তিনি খেটে খাওয়া নিষ্পেষিত মানুষকে মুক্তির পথ দেখানোর লড়াই করেছেন। খোদ ধর্ম যাকে ধারণ করে আছে। ধর্মকে বর্ম কিংবা খাটো করে নয়, ধর্মকে শিক্ষা ও সংস্কৃতির কোঠায় নিয়ে আসা। তো অভীক ওসমান ‘হতাশ জীবন’ বহির ভূমিকায় পাড়লেন, ‘মওলানার সঙ্গে একমাত্র তুলনীয় শুদ্ধ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর!’ কেন ও কী কারণে তুলনীয় সে ব্যাখ্যা দেন নি। তবে এছলামাবাদীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মিলের চেয়ে অমিলই বেশি। সেই এক অন্য কুঠুরি। ভাবের তর্কে মেলানো যাক। ভাবের কুঠুরির কথা বললে রবীন্দ্রনাথের ‘হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়’ নামক রচনার সঙ্গে এছলামাবাদীর ‘আরবী বিশ্ববিদ্যালয়’ ভাবনার খানিক মিল রয়েছে। ‘হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়’ নামক রচনায় রবি ঠাকুর বাঙালি হিন্দু-সমাজের সংকীর্ণতাকে চিহ্নিত করেছিলেন। বাতলে ছিলেন উত্তরণের পথও। তার সমালোচনাও অতুলনীয়। এছলামাবাদীর ‘আরবি বিশ্ববিদ্যালয়’ গঠনও বাঙালি মুসলমান-সমাজের সেই রকম সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে আসার পথ্য। একথা রগরগে সত্য হয়ে আছে।

মোটা দাগে এছলামাবাদীর আত্মজীবনীকে দুইভাবে দেখা যেতে পারে। তাঁর একপদে খিল, আর অন্যপদে নিখিল। যে জীবন তিনি সমাজ ও মানুষের জন্য অর্জন করেছেন সেটাকে আমরা বলছি খিল। কেননা খিল মানে অর্জিত জীবনের চাবি। যে চাবি সমাজ গঠনে কাঠি হিশাবে মানুষ কাজে লাগায়। তবে নিখিল মানে যার খিল নাই। নিখিল তো দৃষ্টের বাইরে। যার নিয়ন্ত্রণের ভার মানুষের নাই। এছলামাবাদী তাকে বলছেন ‘অদৃষ্টবাদ’। ‘হতাশ জীবন’ রচনায় তাঁর দর্শন, ‘ধনদৌলত যে, খোদাতালার হাতে তাহা আমি বিশ্বাস করিয়া পথ পাইতেছি না। চেষ্টার ফল তাহাও অদৃষ্টের সহিত জড়িত। শত লোকে চেষ্টা করে কিন্তু সফলকাম হয় না। স্কুল-কলেজের হাজার হাজার ছাত্র চেষ্টা করে কঠোর পরিশ্রম করে, কিন্তু অনেকে পাশ করিতে পারে না। মানুষের পক্ষে মেধাবী হওয়া অলস ও উদ্যমশীল এবং যত্নবান হওয়া ইহাও স্বাভাবিক। যাহা স্বাভাবিক তাহা অদৃষ্ট। কেহ বলে, চেষ্টা না করিলে অদৃষ্ট কেমন করিয়া ফল দিবে? যাহার অদৃষ্টে বা প্রকৃতিতে চেষ্টা নিহিত আছে, সে চেষ্টা না করিয়া অলসভাবে কিছুতেই বসিয়া থাকিতে পারিবে না। আর যার প্রকৃতিতে চেষ্টা উদ্যম নিহিত নাই, সে শত চেষ্টা করিতে চাইলে চেষ্টা আসিবে না। ইহারই নাম ‘অদৃষ্টবাদ’।


অতীত ইতিহাসের ‘শূন্যস্থান’-ই তাঁর ‘হতাশ জীবন’ নামক রচনার প্রাণকাঠামো।


‘হতাশ জীবন’ রচনায় ভাব-দর্শনের সঙ্গে তাঁর জীবনের যে বিষয়টি গোচরে এসেছে সেটা পারিবারিক ভাবনা। পারিবারিকভাবে ঠিক উন্নাসিক ছিলেন তা নয়, তবে সময় তাঁকে নিয়ে গেছে ইতিহাসের দিকে, মানুষের দিকে। অতীত ইতিহাসের ‘শূন্যস্থান’-ই তাঁর ‘হতাশ জীবন’ নামক রচনার প্রাণকাঠামো। অতীতের দিকে তাকিয়ে নিজের আত্মসমালোচনাও করেছেন তিনি। ভাব আর যুক্তিই তার নেপথ্য কারণ।

অভীক ওসমান সম্পাদিত এছলামাবাদীর ‘হতাশ জীবন’ বহিতে সংকলিত হয়েছে ‘হতাশ জীবনের পরের রচনা’। বস্তুত সন-তারিখ মেলালে সেটা ‘হতাশ জীবনের আগের রচনা’। এই ধরনের আত্মজীবনীতে নির্ঘণ্ট বা টীকা থাকা দরকার, কেননা তাতে সাধারণ পাঠকের সুবিধা হতো। বহির মুখবন্ধ লিখেছেন অধ্যাপক অনুপম সেন।

পাঠক এছলামাবাদীর বহি দুটি পড়লে ঠকবেন কী না জানি না, তবে আঠার-উনিশ শতকের বাঙাল মুসলমান সমাজের সদর-অন্দরের সমাজচিত্র এতে পাবেন। এটা নিশ্চিত। এই নিশ্চিত কাজটির জন্য অনুপম সেন, শামসুজ্জামান খান ও অভীক ওসমানকে সাধুবাদ।

আমিন!

সাখাওয়াত টিপু

সাখাওয়াত টিপু

জন্ম ১৯৭১, সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম। লেখক ও চিন্তাবিদ।


প্রকাশিত বই :
কাব্যগ্রন্থ—
১. এলা হি বরষা
২. যাহ বে এই বাক্য পরকালে হবে
৩. শ্রী চরণে সু
৪. বুদ্ধিজীবী দেখ সবে
৫. কার্ল মার্কসের ধর্ম


সম্পাদনা ও গবেষণা—
১. জাতীয় সাহিত্য (ভাষা ও দর্শনের কাগজ)
১. চাড়ালনামা (নাসির আলী মামুনসহ যৌথ)


ই-মেইল : shakhawat.tipu@gmail.com
সাখাওয়াত টিপু