হোম গদ্য সিকদার আমিনুল হকের গদ্যকবিতার ভাষা ও তার বিবর্তন

সিকদার আমিনুল হকের গদ্যকবিতার ভাষা ও তার বিবর্তন

সিকদার আমিনুল হকের গদ্যকবিতার ভাষা ও তার বিবর্তন
582
0

সিকদার আমিনুল হকের প্রথম কাব্যগ্রন্থের শিরোনাম দূরের কার্নিশ আর সর্বশেষটি আমরা যারা পাহাড়ে উঠেছি। প্রথম বইয়ের নামকরণের মধ্যে কবি-চরিত্রের যে উদাসীনতা ও বিবিক্ত কিংবা আত্মমগ্নতা ধরা পড়ে, শেষটির নামে এসবের বিপরীতটিই স্পষ্ট হয়। কিন্তু সতর্ক পাঠক লক্ষ করবেন তিনি জগদ্ব্যাপারে সম্পৃক্ততা দেখালেও গভীর উদাসীনতার শাসন সেখানেও ছিল। বাংলা গদ্যকবিতার প্রধান শিল্পীদের একজন সিকদারের গদ্যকবিতা সতত ডানার মানুষে এসে একটি চরম সমুন্নতি অর্জন করলেও এই অসাধারণ ভাষাসৌধের হয়ে ওঠায় প্রথমপর্বের—যাকে চিহ্নিত করা যায় প্রথম তিনটি বইয়ে—গদ্যকবিতার ভূমিকা রয়েছে। দূরের কর্নিশ-এ ২২টি, তিন পাপড়ির ফুল-এ স্থান পাওয়া “এক অশ্বারোহীর গান” শিরোনামের ২৪টি এবং পারবত এই প্রাচীরের শেষ কবিতায় অন্তর্ভুক্ত ৭টি গদ্যকবিতাকে বিবেচনা করেছি তার প্রথমপর্বের রচনা হিশেবে। বই তিনটির প্রকাশকাল যথাক্রমে : ১৯৭৫, ১৯৭৯ ও ১৯৮২। পরবর্তী বা শেষ পর্ব সূচিত হয়েছে সতত ডানার মানুষ থেকে মৃত্যুর পরে প্রকাশিত অপ্রকাশিত অগ্রন্থিত কবিতায় অন্তর্ভুক্ত গদ্যকবিতাগুলি। তার গদ্যকবিতার একক ও প্রথম বই সতত ডানার মানুষ প্রকাশিত হয়েছে ১৯৯১ সালে যার সঙ্গে প্রথম পর্বের ব্যবধান ৯ বছরের। এই সময়টি শুধুই পদ্যকবিতার। আদ্যন্ত গদ্যকবিতার দ্বিতীয় ও সর্বশেষ বই বাতাসের সঙ্গে আলাপ প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালে। এছাড়া আরও বেশ কিছু গদ্যকবিতা পরবর্তী বিভিন্ন বইয়ে ছড়িয়ে আছে।


প্রতীকই সিকদার আমিনুল হকের অন্বিষ্ট ও মাধ্যম নয়, বিচিত্র প্রকৌশলকে তিনি অবলম্বন করেছেন তার গদ্যকবিতায়।


আমরা লক্ষ করি, কবিতার ভাষার সঙ্গে  গদ্যকবিতার ভাষার একটি পরিকল্পিত পার্থক্য রক্ষা করতে পেরেছিলেন তিনি, যেখানে  গদ্যকবিতার ভাষা কাব্যিক হওয়া সত্ত্বেও গদ্যবৈশিষ্ট্যেরই ছিল। আমরা এখানে দেখতে চাইব, তিনি কবিতার ভাষার চাইতে তার গদ্যের ভাষায় কী-ধরনের স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন এবং কিভাবে দুটি আলাদা ভাষা একইসঙ্গে প্রবাহিত হয়েছিল। গদ্যকবিতাকে স্বতন্ত্র একটি সংরূপ হিশেবে না-দেখলেও, তার প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে এর একটি স্বতন্ত্র রূপ ধীরে ধীরে তৈরি হয়ে যাচ্ছিল, যা পরবর্তী লেখকদের নানাভাবে প্রেরণা যুগিয়েছে। আমাদের বর্তমান রচনার উদ্দেশ্য সিকদার আমিনুল হকের গদ্যকবিতার ভাষাকে ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করা এবং তার পদ্যকবিতা থেকে এর স্বাতন্ত্র্যকে অনুভব করা।


দূরের কার্নিশএরউত্তাপের বাইরে


দূরের কার্নিশ-এর মলাটের পেছনের বিজ্ঞাপনে যা-কিছু বলা হয়েছিল তা-কে বলা যেতে পারে সিকদার আমিনুল হকের কবিতার সবচেয়ে অন্তর্ভেদী মূল্যায়ন :

সুন্দর নয় তার ঈপ্সিত নির্যাস, প্রতীক নয় তার মাধুর্যের দুর্নির্ণেয় দিগন্ত, বস্তু নয় বস্তুর অন্তর্নিহিত সোচ্চার ভাবুকতা : সিকদার আমিনুল হকের কবিতার এই হলো বাঞ্ছিত অন্বিষ্ট, ভ্রমণের অতল শর্ত। অথচ লিরিকতা ছাড়াও তার কবিতায় মিতালি ঘটেছে মহৎ নির্লিপ্তির, যার পটভূমি তীব্র ও নীলিমানিমগ্ন। তাই লিরিকে যেমন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর সংখ্যা অল্প, তেমনি বাংলা কবিতায় ‘গদ্যকার কবিতার’ও তিনি অন্যতম পথিকৃৎ। মহৎ কবিতার সমগ্রতা, অচঞ্চল আর্তি ও শুদ্ধ কবিতার জটিল স্বভাব আছে বলেই তার দাবি বিনীত কিন্তু অম্লান।

এই মলাট-লিখন বা বিজ্ঞাপন কবি রচিত যদি না-হয়ও, এ-থেকে স্পষ্ট যে, গদ্যকবিতাকে তখন তিনি আর ফ্রি-ভার্স ভাবছেন না। ‘গদ্যকার কবিতা’ বলে এর ধরনটিকে চিহ্নিত করা হলেও নাম হিশেবে এটি লক্ষ্যভেদী নয়। সামগ্রিকভাবে তার কাব্যিক রচনার বৈশিষ্ট্য হিশেবে যা-কিছু বলা হয়েছে, তার অনেকগুলোই গদ্যকবিতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে। সিকদার আমিনুল হকের ক্ষেত্রে আমরা গদ্যকবিতার ভাষা ও কবিতার ভাষার যে স্বতন্ত্র্ উত্তরকালে প্রত্যক্ষ করেছি, সেটির স্বাক্ষর প্রথম গ্রন্থে কিছুটা লক্ষ করা গিয়েছিল। তার ভাষার প্রবাহ কিভাবে স্বতন্ত্র হয়ে যুগপৎ প্রবাহিত হতে শুরু করল তা পর্যবেক্ষণ করতে হলে দূরের কার্নিশ থেকে বিষয়টি লক্ষ করতে হবে। ওপরের উদ্ধৃতির মতোই যে-প্রতীকবাদিতার কথা তার সম্বন্ধে বলা হয়ে থাকে, সেটিও প্রথম গ্রন্থ থেকেই উদ্ভাসিত হয়েছে এবং পরবর্তীকালে এর বিকাশ ঘটেছে। কিন্তু একমাত্রিক বিকাশে সিকদারের রচনাকে চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। এমনকি যে-প্রতীকগুলো দূরের কার্নিশ-এ দেখা গিয়েছিল, পরবর্তীকালে তাদের অনেকগুলো যেমন পরিত্যক্ত হয়েছিল, তেমনি অবশিষ্টগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল নতুন তাৎপর্য—একইসঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন নতুন নতুন প্রতীক। কিন্তু প্রতীকই সিকদার আমিনুল হকের অন্বিষ্ট ও মাধ্যম নয়, বিচিত্র প্রকৌশলকে তিনি অবলম্বন করেছেন তার গদ্যকবিতায়।

শুধু জল নয়, এখানে আছে সমুদ্র ও ঝড়ো হাওয়া―এরাও প্রতীক। ভাষা নিজেই একটি প্রতীকী-ব্যবস্থা, যেহেতু ভাষায় ব্যবহৃত শব্দগুলো কোনো-না-কোনো বাস্তব বস্তু, ধারণা বা ক্রিয়ার প্রতীক। কিন্তু একজন কবি যখন প্রতীক ব্যবহার করেন, তখন তাকে প্রচলিত ব্যবহারের সীমা থেকে মুক্ত করে নেন এবং নতুন তাৎপর্য যোগ করে দেন। এটি করতে হলেও কিন্তু তাকে শব্দটির ব্যবহৃত নানান তাৎপর্যের মধ্য থেকে এক-দুটির ওপর নির্ভর করেই অর্থগত সম্প্রসারণ ঘটাতে হয় বা প্রচলের সীমা ভাঙতে হয়। এই ধরনের ব্যবহারের ফলে এক ধরনের অস্পষ্টতা ও রহস্য সৃষ্টি হয় শব্দটির ব্যবহারগত পরিপ্রেক্ষিতকে ঘিরে। যখন একাধিক প্রতীক সৃষ্টি করেন কবি, তখন এই রহস্যের আবহাওয়া সমগ্র রচনাটিকেই নানাভাবে আচ্ছন্ন করে বলে এদের উন্মোচন ছাড়া পাঠ্যটির মর্মে অনুপ্রবেশ দুরূহ হয়ে ওঠে। সিকদার আমিনুল হকের দূরের কার্নিশ-এর গদ্যকবিতাগুলোতে চেনা ও বহুব্যবহৃত শব্দগুলোই―যেমন : জল, প্রবাহ, মেঘ অঙ্কুর, গাছ, সমুদ্র, ঝড়, পাথর, স্ফুলিঙ্গ, বৃষ্টি ইত্যাদি—নতুন তাৎপর্যে প্রতীকায়িত হয়ে একটি স্বতন্ত্র জগৎ সৃষ্টি করেছে, যেখানে অনুপ্রবেশের জন্য এদের অনুধাবন করা প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। এই প্রতীকগুলো গদ্যকবিতার মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে—সন্দেহ নেই যে, এরা পরস্পর সম্পর্কিত এবং একটি অনুভূতি-জগতের বিভিন্ন মুহূর্তকে শিল্পায়িত করতে ব্যবহৃত হয়েছে। একইসঙ্গে এটিও লক্ষণীয় যে, একটি প্রতীকের মধ্যে একটিমাত্র তাৎপর্য নয়, তিনি তাতে বহুঅর্থের সংশ্লেষ ঘটিয়েছেন পরিস্থিতি অনুযায়ী।

দূরের কার্নিশ-এর গদ্যকবিতায় যে-প্রবণতাগুলো দেখা গিয়েছে, তার অনেকগুলো উত্তরকালে বিকশিত হয়েছিল। গ্রন্থ হিশেবে দূরের কার্নিশ-এর একটি বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়, তিনি পদ্য ও গদ্য উভয় বিন্যাসের রচনাকে বিশৃঙ্খলভাবে না সাজিয়ে, দুটি স্বতন্ত্র অংশে রেখেছেন। রচনা বিন্যাসে স্বতন্ত্র পর্ব সৃষ্টির একটি কারণ হলো, তার গদ্যকবিতাগুলো একটি ভাব-পরিমণ্ডলের অধিবাসী। সবগুলো মিলে একটি বিশেষ অনুভূতির জগৎ নির্মাণ করতে চেয়েছে, আর তা-হলো : শিল্প-তীর্থের উদ্দেশে এক অভিযাত্রা বা সেই অভিযাত্রার বয়ান এই গদ্যকবিতাগুলো। জীবনের বৃহৎ ও সংগ্রামমুখর ক্ষেত্র নয়, একটি ছোট কিন্তু আত্মমগ্ন অংশ তার পর্যবেক্ষণের আওতায়, যেখানে নারী এই অভিযাত্রারই অচ্ছেদ্য অংশ। অন্যদিকে, পদ্যকবিতাগুলোতে রয়েছে বিচিত্র বিষয় ও অভিনিবেশ। দূরের কার্নিশ-এর গদ্যকবিতাগুলো ‘উত্তাপের বাইরে’ শিরোনামের পর্বভুক্ত—এখানে ‘উত্তাপ’ শব্দটির একটি প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে, যা সম্ভবত নির্দেশ করছে শিল্পসৃষ্টির ঘোরগ্রস্ত সময়কে। কিন্তু পদ্যকবিতার অংশগুলো এমন শিরোনামের পর্বে চিহ্নিত নয়। ফলে বোঝা যায়, যে-পরিকল্পনা  গদ্যকবিতার ক্ষেত্রে ক্রিয়াশীল ছিল, পদ্যের ক্ষেত্রে তেমন কিছু ছিল না। গদ্যকবিতাগুলোর সজ্জা বা বিন্যাসেও কবির একটি স্থির পরিকল্পনা ক্রিয়াশীল ছিল—প্রথম গদ্যকবিতার শিরোনাম “উত্তাপের বাইরে” এবং সর্বশেষটি “স্নানের পরে শতাব্দীর দিনগুলি” যারা যথাক্রমে একটি ভাববিশ্বের ভূমিকা এবং উপসংহার নির্দেশ করছে।

গদ্যকবিতায় সিকদার আমিনুল হকের যে-ভাষাভঙ্গি তা অনুচ্চ, প্রতীক-নির্ভরতার কারণে ইঙ্গিতময় এবং আবেগ-শাসিত। ভাষার অন্তর্লীন প্রতীক-প্রবণতার সাহায্যে ধীরে ধীরে একটি কল্প-জগৎকে সৃষ্টি করেছেন যেখানে উপকরণ বা অনুষঙ্গ বেশি নেই, কিন্তু তা স্বয়ংসম্পূর্ণ। পদ্যকবিতাগুলো যখন ছন্দ ও গীতিকাব্যিক স্বভাব আশ্রয় করেছে তখন পঙ্‌ক্তিতে ভাঙা বাক্যগুলো হ্রস্ব ও সংহত হয়েছে—এখানেও স্বর মৃদু; আবেগের প্রবাহ কোথাও কোথাও টের পাওয়া গেলেও তা নিয়ন্ত্রিত। আবার যখন মুক্তছন্দে লিখেছেন, তখন বাক্যগুলো একটু এলানো। একটি বিশেষ ভাব-পরিমণ্ডলের যে-আচ্ছন্নতা গদ্যের ভাষায় বিদ্যমান, পদ্যে তা নেই। বিষয়বস্তু ও প্রবণতাগত কারণেই গদ্যকবিতার ভাষা কাব্যিক, কিন্তু লক্ষণীয় যে, এখানে গদ্যভাষার যে বিশেষত্ব, তারও উপস্থিতি তাৎপর্যপূর্ণভাবে রয়েছে। পদ্যভাষার নিজস্ব শব্দাবলি থেকে বাংলা কবিতা সরে এলেও, গদ্যের ভাষাতে এমন ধরনের কিছু শব্দ থাকে, যা পদ্যে ব্যবহার করা দুরূহ। গদ্য যুক্তিকে মান্য করে অগ্রসর হয়, যে-বৈশিষ্ট্য কবিতার জন্য অপরিহার্য নয়। দূরের কার্নিশ থেকে এর কিছু উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে :

আমি অভিভূত হলে উচ্ছ্বাসের সমস্ত আলোই জ্বলে উঠবে কিন্তু আমি এরকম আচ্ছন্নতার মধ্যে যেতে চাই না। আমি যখন জলের কথা বলি তা যেন আমার ধমনির ভঙ্গিতেও ফুটে ওঠে। অন্তত প্রত্যাশার হাতের মুঠোতেও যেন শীতলতার স্পর্শ এসে লাগে। (“উত্তাপের বাইরে”)

জলের গর্জনের সামনে এসে সব রাস্তাই একদিন থেমে পড়বে! আমার বুকে যে হৃৎপিণ্ডের শব্দ, অজস্র কথা একদিন যাকে গুঞ্জরণ দিয়েছিল, তুঙ্গকালে, তাতেও মুখর উল্লাসের কোনো চিহ্নই একদিন রাখবে না। বালুতে মগ্ন বৃষ্টির মতো, অন্ধকারে অঙ্কুরের জন্মাবার কোনো সুযোগই হয়তো নেই। (“যা একান্তে বলি নি”)

এই গদ্যভাষার পাশে তার দূরের কার্নিশ-এর ছন্দবদ্ধ পদ্যকবিতার ভাষাকে রাখলে সহজেই এদের ভিন্নতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে :

আহত হৃদয় একা, করপুট ধরে থাকে একা
শোকার্ত গৃহের কাছে নিরাশ্রয় জটিল লন্ঠন।
শিকড় নেমেছে একা, জল যায়, সেও বুঝি একা
আহত হৃদয় ঢাকা, জরায়ুর কবোষ্ণ জীবন।     (“একা”)

আমার হাতের কাছে উঠে আসে মূলভাষা, লোকাচার, উদাসীন
একা একা
তোমার বিচারে ওরা সবকিছু, অথচ আমার বিচারে কেন
সব নয়
আমার স্বপ্নের কাছে ওরা সব নয়, সনাতনও নয়!   (“ভিন্ন কররেখা”)

পদ্যকবিতায় ছন্দ-মাত্রা মেলানোর বাধ্যবাধকতা শব্দ নির্বাচনে কিছু বিধি মেনে চলে, গদ্যে এ-ক্ষেত্রে অনেকবেশি স্বাধীনতা ভোগ করে। এ কারণে কবিতার প্রথম উদাহরণে শব্দ-সংক্ষেপের কারণে এক ধরনের সংহতপ্রকাশ লক্ষণীয়। পরের উদ্ধৃতিতে পূর্ণযতি না-থাকলেও, বাক্যগুলো দীর্ঘ নয়। একই শব্দ বা শব্দগুচ্ছকে বারবার ফিরিয়ে এনে ধ্বনিসম্মোহন সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন তিনি। এর বিপরীতে গদ্যে অনুপ্রাসের দিকে কোনো ঝোঁক দেখা যায় না এবং এর ভাষায় বাক্যিক দৈর্ঘ্য পদ্যের বাক্যের চেয়ে বেশি। তিনি জটিল বাক্য ব্যবহারে উৎসাহ দেখিয়েছেন গদ্যে, যেখানে পূর্বপক্ষকে কেন্দ্র করে কথার বিস্তার ঘটে।


স্বর ও সুরের ওঠাপড়াকে ধারণ করতে যে গদ্যভাষা চাই, তাতে উপনীত হওয়ার পথে “এক অশ্বারোহীর গান” একটি নিরীক্ষা; এরপর আকাঙ্ক্ষিত গদ্যভাষা সম্ভব হয়েছে দীর্ঘ দশকের অপেক্ষার পর সতত ডানার মানুষ-এ।


সিকদার আমিনুল হকের এই গদ্যভাষা, যা দূরের কার্নিশ-এ উদ্ভূত, তার প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো, এটি অনেক বড় পরিসরকে আয়ত্তে নিতে পারে নি। অল্প কিছু অনুষঙ্গেই আবর্তিত হয়েছে, যা এই রচনাগুলোরও সীমাবদ্ধতা। কিন্তু এর পাশাপাশি স্মরণীয় সাফল্য হলো পদ্যকাঠামোর কবিতার ভাষার সঙ্গে এটি স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করতে পেরেছে এবং এ-কারণেই চিন্তা ও ভাবের জটিলতা বা মনস্তাত্ত্বিক কূটাভাসকে সহজেই সাঙ্গীকৃত করতে পেরেছে, যা পদ্যকাঠামোর বিন্যাসে সম্ভব হয় নি। দূরের কার্নিশের গদ্যকবিতার ভাষাতে অন্তঃশীল থাকা লিরিকের প্রবাহ পাঠকের কানে অনেকসময় ধরা পড়ে যায়। শব্দ ও অনুষঙ্গের পুনরাবর্তন এবং ধ্বনিগত অনুপ্রাসকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা সবসময় সফল হয় নি। কোথাও কোথাও গদ্যের প্রবাহে পদ্যের ধ্বনিক-আবহ ঢুকে পড়েছে। এটি গদ্যভাষাকে সহায়তা করে, যেমনটা আমরা রবীন্দ্রনাথের লিপিকাতে দেখতে পাই; কিন্তু সিকদারের গদ্যকবিতার ভাষার স্বভাব ঠিক এটি নয়। এই গদ্যভাষাই বিবর্তিত হয়ে সতত ডানার মানুষ-এ একটি পরিণত রূপ লাভ করেছে। যদিও বিবর্তনটিকে গদ্যের মধ্য দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা কঠিন, কারণ তিনি সতত ডানার মানুষ-এর আগে দীর্ঘদিন কোনো গদ্যকবিতা লেখেন নি। এর আগে সর্বশেষ গদ্যকবিতা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮২ সালে পারাবত এই প্রাচীরের শেষ কবিতা গ্রন্থে, এবং তার আগে তিন পাপড়ির ফুল-এ ১৯৭৯ সালে। ভাষাগত দিক থেকে এই দুটি বইয়ের গদ্যকবিতায় দূরের কার্নিশ পর্বের ভাষা থেকে কিছু বিবর্তন চোখে পড়ে।পারাবত এই প্রাচীরের শেষ কবিতার অন্তর্ভুক্ত ৭টি  গদ্যকবিতা ‘উত্তপ্ত সন্ধ্যার অতিথি’ শিরোনামের পর্বে চিহ্নিত, যেগুলো তিনি ১৯৭৫ সালে লিখেছিলেন বলে গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তিন পাপড়ির ফুল-এর  গদ্যকবিতাগুচ্ছ “এক অশ্বারোহীর গান” এর রচনাকাল জানা না-গেলেও ভাষাগত বৈশিষ্ট্যের বিচারে অনুমিত হয়, এগুলো সম্ভবত ‘উত্তপ্ত সন্ধ্যার অতিথি’র পূর্ববর্তী নয়।


পারাবত এই প্রাচীরের শেষ কবিতাউত্তপ্ত সন্ধ্যার অতিথি


‘উত্তপ্ত সন্ধ্যার অতিথি’র  গদ্যকবিতাগুলো দূরের কার্নিশ-এর ‘উত্তাপের বাইরে’র লেখাগুলোর কাছাকাছি সময়ের হওয়ায় এগুলোর ভাবজগতে ও চারিত্র্যে কিছু সাধারণ ঐক্য রয়েছে। পর্বের শিরোনামে যদিও ‘উত্তাপ’ শব্দটির ব্যবহার উভয়ক্ষেত্রে একই প্রেরণাজাত না-ও হতে পারে এবং সম্ভবত দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে ‘এক গ্রীষ্ম-সন্ধ্যায়’ গদ্যকবিতাগুলো ‘বিনা মার্জনায় ও প্রায় অলৌকিক প্রেরণায় লেখা হয়েছিল’ বলে এদের ‘উত্তপ্ত সন্ধ্যার অতিথি’ হিশেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দূরের কার্নিশ-এ ‘উত্তাপ’ কবিতা রচনার মুহূর্ত কিংবা কল্পজগতে বসাবাসের ঘোরগ্রস্ত সময়কে নির্দেশ করলেও এখানে ‘উত্তপ্ত সন্ধ্যার অতিথি’র এই সপ্তকের আর কোথায়ও শব্দটি ব্যহৃত হয় নি; কিন্তু সার্বিক চিহ্নায়ন বিবেচনায় এই ব্যবহারের পেছনে পূর্ব-ব্যবহারের স্মৃতি নেই, তা বলা কঠিন। দূরের কার্নিশ-এর সঙ্গে এই লেখাগুলোর সাদৃশ্য এখানে যে, এখানেও কবিতা ও শিল্পসৃষ্টির আবহকে ঘিরেই কথামালা উৎসারিত হয়েছে, সমস্ত অভিজ্ঞতাকে প্রতীকায়িত করে এটির জগৎকে তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু পার্থক্য ভাষায়, ভাষার ব্যবহারের প্রকৌশলে, যা থেকে কবির ভাষার পরিবর্তনকে অনুভব করা সম্ভব হয় আমাদের। ভাষার এই বদল ঘটেছে অনুষঙ্গের ও প্রতীকের নতুন বিবেচনায় এবং স্বতন্ত্র কাব্যিক অনুসন্ধিৎসায়। এখানে নারী ও যৌনতাকে নতুন ও বলিষ্ঠভাবে দেখার কারণে ভাবজগতেই একটি পরিবর্তনকে বুঝতে পারি আমরা, ভাষা যাকে অনুসরণ করে তার সূচনা করেছে। এই গদ্যকবিতাগুলোতে নারী, যৌনানুভূতি ও যৌন-সম্মিলনকে যথাক্রমে কল্পনাশক্তি ও নারী, শিল্পাকাঙ্ক্ষা এবং কবিতা লেখার মুহূর্তের সঙ্গে একাকার করে দেখেছেন সিকদার, যেটিকে তার পরবর্তী গদ্যকবিতাগুলোতে কোনোভাবে ছাপ রাখতে দেখব আমরা।

দূরের কার্নিশ-এ আনন্দমুখর ঘরকে বেদনার মুকুট পরানোর সুপ্ত আকাঙ্ক্ষার মাধ্যমে যে উদাসীনতা ও বৈরাগ্যকে জাগ্রত দেখেছিলাম আমরা, এখানে তার বিপ্রতীপ মনোজগতের উত্থান লক্ষণীয়―সম্পৃক্ততা, স্বতঃস্ফূর্ততা ও কামনাবিহ্বলতার মধ্য দিয়ে শিল্প-সারাৎসারকে উপভোগ। ফলে আগের প্রতীকগুলোতেও নতুন রং লেগেছে এখানে; দূরের কার্নিশ-এ যে ‘জল’ ছিল শান্ত, এখানে তাকেই লক্ষ করি বদলে যেতে : ‘তুমি কি কল্পনা করতে পারো, পাহাড়ি খাদের আর্তময় চঞ্চল জল?’ দূরের কার্নিশ-এ বর্হিবাস্তবতাকে এড়িয়েই গিয়েছিলেন সিকদার, কিন্তু এখানে এসে দেখতে পাচ্ছি চারপাশের পৃথিবীর চাপকে অনুভব ও স্বীকার করে নিতে হয়েছে তাকে। এর অবশ্যম্ভাবী ফল হলো ভাষার ক্রমপরিবর্তন :

বলিষ্ঠ বাহুর নিচে মর্মরিত স্বপ্ন। তুমি কি কল্পনা করতে পারো, পাহাড়ি খাদের আর্তময় চঞ্চল জল? বিনিদ্র রাত্রিকে ধন্যবাদ, এই উদ্দাম অশান্ত রাত্রিকে, ছলনা ও মেদের মতো অলস স্মৃতিকে।

আমাকে কেন বুঝবে না! তুমি থামতে বললেই আমি থামতুম। যেমন গোটানো পালের নৌকো গল্প বলতে চায় গোধূলি জলের সামনে। তুমি বললে আমি ঋতু বদলের আগে কখনো বলতুম না সেই ঝোড়ো গান, শোকার্ত জল আর পাথরের দুরন্ত নির্বাসনের গল্প।

একই গদ্যভাষার ভেতরে আমরা কি সতত ডানার মানুষ-এর ভাষাকে আকার পেতে দেখি না? যদিও এটি ততটা কুশলতা অর্জন করে নি, তবু দেখতে পাই এখানে কবির ভাষার পূর্ববর্তী অন্তর্মুখীনতার খোলস ভেঙে পড়ছে। দূরের কার্নিশ-এর ভাষাতে যে অবদমন ক্রিয়াশীল ছিল, কবি তার অর্গল মুক্ত করে দিতে চাইছেন এখানে। সতত ডানার মানুষ ও পরবর্তী গদ্যকবিতায় যে দ্যোতকগুলোকে আমরা ঘুরে ফিরে নানান রঙে উপস্থিত হতে দেখব, তাদের আর্বিভাবকে এখানে চিহ্নিত করা যায়। যেমন : স্মৃতি, রাত্রি, জল, সাবান, নারী। ‘জল’ সতত ডানার মানুষ-এ পরিত্যক্ত হয়েছে, এবং অন্যগুলো পূর্বমেজাজ থেকে সরে এসেছে। যে নারী দূরের কার্নিশ-এ ছিল, পারাবত এই প্রাচীরের শেষ কবিতায় তাকে পাই না আমরা, কিন্তু ইনিই সতত ডানার মানুষ থেকে পরবর্তী অন্যসকল গদ্যকবিতার জগৎকে শাসন করেন। এ কারণেই দেখতে পাই, উদ্ধৃত অংশগুলোর ভেতরেও যৌনতার বুনন কত নিবিড় ও লক্ষ্যাভিসারী। এই বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে শেষ গদ্যকবিতাটিতে আবিষ্কার করি আমরা, যখন তিনি বলেন—

আহ, তোমার শরীরে না-কি, হে কুমারী, তা তো জানতুম না! প্রবালে গড়া তোমার বুকের প্রতিশ্রুতি আর ঋতুর নকশা, মুকুরে নগ্ন উরুসন্ধির ছায়া যেখানে, আহ, সেইখানে নাকি!

খুবই ছোট এই গহ্বর, বালিতে ও ঝিনুকে ঢাকা রূপকথা। কোনো গুঞ্জরন [ণ] নেই, হিম মৃত্যুর শীতলতা… বিশাল পাতার আচ্ছাদন। লন্ঠন জ্বালাতে পারবো না, এতই তুচ্ছ আজ রক্তের গর্জন।

(“এক অশ্বারোহীর গান”)

দূরের কার্নিশ এবং পারবত এই প্রাচীরের শেষ কবিতার মধ্যবর্তী তিন পাপড়ির ফুল-এ “এক অশ্বারোহীর গান” পর্বে একই শিরোনামে ২৫টি গদ্যকবিতা রয়েছে, যারা তারকাচিহ্নের সাহায্যে স্বতন্ত্র। এখানেও একটি একক পরিকল্পনার রূপায়ণ করতে চেয়েছেন কবি—সবগুলো গদ্যকবিতার মধ্য দিয়ে একটি অনুভব-বিশ্বকে গড়ে তোলা। সিকদার আমিনুল হকের ইতঃপূর্বের গদ্যকবিতাগুলোতে লেখকের কবিতা-কেন্দ্রিক অভিজ্ঞতার বর্ণনাই মূল উপজীব্য; চারপাশের জীবন ও অভিজ্ঞতা তার মধ্যে প্রতিফলিত হয়ে তাৎপর্য সৃষ্টি করেছে। ফলত, তিনি যখন বিভিন্ন অনুষঙ্গ ব্যবহার করেন, তা তার বাস্তব পরিপ্রেক্ষিতকে নির্দেশ করে না; বরং সেটি একটি প্রতীকীমূল্য অর্জন করে এবং লেখক-সৃষ্ট জগতের অংশ হিশেবে সে-জগতের বাস্তবতার নির্মাণে ভূমিকা রাখে। “অশ্বারোহীর গান”-এর সমাপ্তির বাক্যটি তাই প্রণিধান পেতে পারে : ‘পৃথিবী, তবু তোমার বারবার জন্ম হোক।’ এই পৃথিবী যে আমাদের জীবন-যাপনের বাস্তব ক্রীড়াক্ষেত্র নয়, তা সহজেই বোঝা যায়। কল্পনার ভুবনের বারবার জন্মানোর আহ্বান বা আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়ে তাৎপর্যের ক্রমরূপান্তর ও বহুমাত্রিকতারও একটি স্বীকৃতি কবির দিক থেকে পাঠক লাভ করেন, যা এই  গদ্যকবিতাগুচ্ছেরও বৈশিষ্ট্য। এই বাক্যটির মাধ্যমে যে সমাপ্তিহীন উপসংহার রচিত হলো, তা গদ্যভাষাকে নিরন্তর বিশোধন ও রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অভীষ্টের দিকে অগ্রসর হওয়াকেই নির্দেশ করে, অর্থাৎ যাত্রার চেষ্টা ও যাত্রা আছে শুধু—সতত ডানার মানুষ যেমন একটি আপাত গন্তব্য কিন্তু চূড়ান্ত নয়। এই গদ্যকবিতাগুচ্ছের নাম “এক অশ্বারোহীর গান”, যা অভিযাত্রার সঙ্কেতকেই প্রোজ্জ্বল করে তোলে। এই অভিযাত্রার পথটিকেই উদ্ভাসিত দেখি এখানে গদ্যকবিতার পর গদ্যকবিতায়।

“এক অশ্বারোহীর গান”-এ গদ্য ও কবিতার সমন্বয় কিভাবে ঘটেছে? এখানেও ভাষা প্রতীকাশ্রিত, যা কবিতার চারিত্র্য, কিন্তু গদ্যস্বভাবের বাক্যের ব্যবহার এখানে বেড়েছে। উপমা, চিত্রকল্প, উৎপ্রেক্ষা ইত্যাদি উপকরণকে তিনি প্রথাগতভাবেই ব্যবহার করেছেন, যেমনটা কবিতায় ঘটে থাকে। স্মরণীয় যে, গদ্যকবিতাকে কবিতাই বিবেচনা করেছেন তিনি। ফলে বেশিরভাগ উপকরণের অনুপ্রবেশ কবিতার তরফ থেকে ঘটবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু গদ্যে লিখছেন বলে গদ্য বিষয়ক একটি সচেতনতাও লক্ষণীয়। বাক্যিক স্তরে তিনি এমন ধরনের শব্দ ব্যবহার করেন, যা গদ্যে স্বাভাবিক, কবিতায় বিরল। বাক্য-বিন্যাসেও সেটি লক্ষণীয়। শব্দের ক্ষেত্রে তৎসম শব্দ তার পছন্দ সম্ভবত এদের গাম্ভীর্যপূর্ণ আবহের জন্য, অনুরণন সৃষ্টির জন্যও অনেকটা :

প্রাতঃকাল যেহেতু, বেদনার যথার্থ অর্থ সেহেতেু হৃদয়কে চৌচির করছে না। কিন্তু করবে! আর নিষ্ফল হবে তোমাদের হাতের পরিচর্যাময় এই ভোর।

অথচ দিবাবসানে এর পরিচ্ছন্ন অর্থ তাৎপর্য নিয়ে আসবে।

আর আমরা শুনলুম বাতাসের দীর্ঘশ্বাস, বুঝলুম একটি কবিতা কত অসুন্দর, যদি সেখানে থাকে এক অসমতল ঘটনা।

বাক্যগুলো সাধারণত দীর্ঘ নয়। আবার বেশ দীর্ঘ বাক্যও আমরা পাচ্ছি, তখন তাদের গড়ে তোলা হয়েছে ছোট ছোট উপবাক্যে এবং প্রচুর কমার সাহায্যে, যেন পর্যাপ্ত বিরতির সাহায্যে একটি ছন্দময় ধ্বনিসংগীত পাঠকের শ্রুতিকে কবিতার তৃপ্তি দেয়। এই গদ্যকবিতাগুলোতে কবিকে ধ্বনিগত দিকটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে দেখি আমরা, যা আগে ও পরে আর দেখা যায় নি। লিপিকার গদ্যে যে ধ্বনিসংগীতের অস্তিত্ব পাঠক তার গদ্যত্বকে অতিক্রম করেও শ্রুতিতে অনুভব করতে পারে, এখানেও তার প্রয়োগ আমাদের কান এড়ায় না। এ-সবকিছুর পক্ষে নিচের অংশগুলো উদ্ধার করতে চাই :

যতদিন বেঁচেছিলাম, যতদিন আমার বারান্দার পাশে হায়েনার চিৎকার, যতদিন রক্তস্রাব আর লবণ আমার জানালার নিচে; ততদিন পৃথিবীর বিশাল হাতের অহংকার ধোয়া হবে এই সাবানে।

পাথর ও জলরাশির সামনে ভাবনামগ্ন যারা তারা শোনে নি। বিশাল তোরণের নিচে দ্বাররক্ষী তারাও হয়তো নয়! আগমন-বার্তা একটি গল্পের মতো সবাই বিশ্বাস করে না। মেয়েদের অন্তর্বাসের মতো হাতের কম্পন তাকে সন্তর্পণে খুলে রেখে দেয়।

যখন বলেছিলে এই পদচিহ্নের প্রয়োজন আছে, স্মৃতি আর আলিঙ্গনের; অভিভূত হয়েছিল আমাদের কণ্ঠস্বর। নারীর উর্বরতার ভেতরে কেন আমরা প্রার্থনা করি প্রতি রাত্রিতে… স্পন্দিত হলো সেইভাবে আমাদের ঠোঁট, নখের ভেতরে আমাদের জলধারা, আর কর্কশ স্নায়ুর চিৎকার।

এই বাক্যগুলো ব্যবহারের মধ্য দিয়ে এক স্বতঃস্ফূর্ত কবিকে আমরা পাই যিনি একটি ভাষা ও বাক্য-কাঠামো খুঁজছেন, এবং সন্দেহ নেই যে, একটি বয়নযোগ্য নিজস্ব ভাবজগৎও, যাদের  গদ্যকবিতায় সার্থকভাবে বিন্যস্ত করা যাবে। “এক অশ্বারোহীর গান”-এ সে অনুসন্ধান একটি উত্তর পেয়েছে, যাকে নিয়ে পরিপূর্ণ সন্তোষ তিনি লাভ করেন নি; কেননা এর ভাবজগৎ মহাকাব্যিক ও বিশদ বর্ণনার পরিসর দাবি করে, যার জন্যে গদ্যের আশ্রয় জরুরি ছিল কিন্তু এই গদ্যভাষায় কবিতার লাবণ্য অত্যন্ত প্রবল, শুধু তৎসম শব্দকে আশ্রয় করে সুরের বৈচিত্র্য অর্জিত হয় নি। স্বর ও সুরের ওঠাপড়াকে ধারণ করতে যে গদ্যভাষা চাই, তাতে উপনীত হওয়ার পথে “এক অশ্বারোহীর গান” একটি নিরীক্ষা; এরপর আকাঙ্ক্ষিত গদ্যভাষা সম্ভব হয়েছে দীর্ঘ দশকের অপেক্ষার পর সতত ডানার মানুষ-এ।


সতত ডানার মানুষ


সিকদার আমিনুল হকের সবচেয়ে প্রশংসিত ও উদ্ধৃত গ্রন্থ সতত ডানার মানুষ (১৯৯১)। বাংলা গদ্যকবিতার ভাষা বর্ণনাত্মক এই গ্রন্থে একটি স্বতন্ত্র চূড়াকে অধিকার করেছে, যেখানে কাব্যিকতা ও গদ্যত্বের একটি অদ্বয় সম্বন্ধ রচিত হয়েছে। এতে গদ্যকবিতাগুলোকে তিনটি পর্বে বিন্যস্ত করা হয়েছে: ‘শৈশব আমাকে পরিয়ে দিয়েছিল প্রেমের দস্তানা’, ‘মৃত্যু অন্য এক শীতল শৈশব’ ও ‘প্রতিভা এক বিশাল বৃত্ত’। পর্বগুলোর নাম থেকে রচনাগুলোতে শৈশবস্মৃতির একটি প্রভাব থাকার ধারণা আমাদের হয়। প্রথম পর্বটি যেখানে প্রেম ও নারী কর্তৃত্বের ভূমিকা গ্রহণ করেছে, সেখানে শৈশবের অভিজ্ঞতার প্রভাবকে আমরা লক্ষ করি। গদ্যে আখ্যান রচনার ঝোঁক এ-পর্যন্ত সিকদারের মধ্যে দেখা যায় নি এবং এটি তার প্রবণতা নয়, যদিও পরে এ-ধরনের কিছু লেখা আমরা পাব।


সিকদার আমিনুল হকের গদ্যকবিতার অভীষ্ট চূড়া নারী, যৌনতা বা মৃত্যুচৈতন্য থেকে অনেক দূরবর্তী


এখানে মন্থরভাবে একজন কথক আত্ম-উন্মোচনের ভঙ্গিতে নিজের অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি ও কল্পনার বয়ান করছেন। কার উদ্দেশে এই বয়ান—পাঠকের প্রতি, না-কি নিজের প্রতি? সতত ডানার মানুষ-এর প্রথম আলোচক মিনার মনসুরের যেমন মনে হয়েছে তিনি ‘কথাগুলোও সম্ভবত নিজেকেই শোনান’ (‘দীর্ঘতম এক শীতনিদ্রার পর’, পৃ. ৫১)। কেমন করে এটি ঘটে? নিজেকে কিভাবে পরিণত করা যেতে পারে অপরে? এখানে তো কোনো অশ্বারোহী নেই, যে তার শিল্পিসত্তারই অংশ, যেমনটি তিন পাপড়ির ফুল-এ দেখা গিয়েছিল—তাহলে এ-উচ্চারণ নিজের অন্তর্গত কার উদ্দেশে? দূরের কার্নিশ-এর উদ্দিষ্ট ‘তুমি’ এখানে প্রত্যাবর্তন করেছে। তবে এখানে ‘তুমি’ বা এর বহুবচন ‘তোমরা’ আরও প্রসারিত পরিসরে পরিণত হয়েছে, যাতে অনেককেই এর মাধ্যমে সম্বোধন করা হয়েছে―নারী, পাঠক, কবিতা, প্রহরী, মৃত্যু ইত্যাদি। ‘তুমি’ তাই হয়ে উঠেছে বহুস্বরের মুখোশ। ‘তুমি’ মুখোশের আড়ালে যাদেরকেই আমরা পাই না কেন, তারা প্রত্যেকেই, এমনকি কখনো কখনো পাঠকও, কবির সৃষ্ট জগতের চরিত্র—সে-অর্থে বলা চলে কবিরই অংশ এরা এবং বহন করে চলেছে তারই ভাবানুভূতির ভার। এ কারণেই সম্বোধিত ‘তুমি’কে পাঠক বলে ভাবতেই পারি আমরা—পাঠককে লক্ষ করে সমস্ত উচ্চারণ করছেন কবি, যে-পাঠক একইসঙ্গে অনুপস্থিত উপস্থিতি এবং কবির নিজের সত্তার মধ্যে তৈরি করে নেওয়া অপর-সত্তা বা জগৎ। ফলে এসব উচ্চারণ পাঠককে সামনে রেখে নিজেকেই বলা বাক্যপরম্পরা, যে নিজ বা অহম হচ্ছে একটি  যৌগিক সমগ্র।

নারী বিষয়ে অভিসন্দর্ভ রচনাই কি এই গদ্যকবিতাগুচ্ছের অন্বিষ্ট? সিকদার আমিনুল হকের গদ্যকবিতার অভীষ্ট চূড়া নারী, যৌনতা বা মৃত্যুচৈতন্য থেকে অনেক দূরবর্তী—এরা বরং তার ভাব ও ভাষা-বয়নের সহযোগী উপকরণ, যা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হবে। আমাদের তখন সহজেই জিজ্ঞাসা জাগ্রত হয়, নারী ও যৌনতা আশ্রিত কিন্তু আত্মমর্যাদাবোধে ভাস্বর এই কল্পনা ও ভাষাজগৎ কিভাবে তৈরি হলো, কিংবা কোথায় তিনি পেলেন? কিংবা নারীদের এই উপস্থিতির পেছনে কোন প্রেরণা নিহিত আছে? এই জিজ্ঞাসার উত্তরের সূত্র তার লেখাতেই নিহিত আছে :

ভোরের বাতাস যেহেতু স্মৃতি আক্রান্ত, তাই তার কোনো চাঞ্চল্য নেই। সারারাত্রি মাছের ঘুমন্ত শরীরের অর্জন করা আঁশটে গন্ধ আর স্থির জলের নরম বাষ্প একযোগে উঠছে নদীর প্রথম স্তরে, মাল্লারাই যার ঘ্রাণ পায়।

[…] অনেকদিন আগের গল্প। তথাপি আমাদের শৈশব আর স্মৃতি থেকে উঠে আসছে নারী আর মাল্লাদের এই সব রূপকথা। আমার দেশ; এই সব রূপকথা দিয়ে তৈরি একটি বিশাল রূপময় গল্প!

শুধু শৈশব নয়, স্মৃতিসমগ্রই এই নারীদের উৎস। তাই লক্ষণীয় শৈশব আর স্মৃতি শব্দের আগে ব্যবহৃত ‘আমাদের’ শব্দটি—কেন এই বহুবচনের প্রয়োগ করলেন কবি? কেন দেশকে বললেন ‘আমার’? অর্থাৎ গদ্যে ধৃত এই বিবরণের ভেতর শুধু তার নয়, অন্যদেরও স্মৃতি ও শৈশবের অভিজ্ঞতার কথা আছে। এই সম্মিলিত অভিজ্ঞতা ও স্মৃতির মাধ্যমে যে কল্প-পৃথিবী নির্মীয়মাণ তার প্রতীক হিশেবে ‘দেশ’ শব্দটিকে যদি গ্রহণ করি এখানে, তাহলে এই দেশ কিন্তু সিকদার আমিনুল হকেরই, যা নারীর রূপকথায় নির্মিত হতে চলেছে অচিরেই।

সতত ডানার মানুষ-এর গদ্যভাষায় এর পূর্ববর্তী গদ্যকবিতার ভাষা থেকে যে সমুন্নতি দৃশ্যমান, তা বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে। সিকদার আমিনুল হক কবিতা বিষয়ে প্রচলিত ধ্রুপদী ধারাণাকে গ্রহণ করেছিলেন, তার লেখা বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থের সমালোচনা থেকে এমন সিদ্ধান্তে আমরা আসতে পারি। উপরন্তু, দীর্ঘদিন  গদ্যকবিতাকে ফ্রি-ভার্স হিশেবে ভেবেছিলেন, সেটিও স্মরণ করতে পারি। দূরের কার্নিশ-এর গদ্যে যে পরিশ্রুত স্বর আমরা লক্ষ করি, তার সঙ্গে কবিতার ভাষার দূরত্ব কিছুটা রয়েছে। তার সমকালে অনেকেই সেখানে কবি অরুণ মিত্রের প্রভাব লক্ষ করেছিলেন। এরপর বিশেষ ভাষিক পরিবর্তন ঘটে তিন পাপড়ির ফুল-এর “এক অশ্বারোহীর গান”-এ। আমরা সেখানে স্বল্প দৈর্ঘ্যের বাক্য ও তাতে ছন্দস্পন্দন সৃষ্টির প্রয়াস লক্ষ করলাম, কবিতার কিছু ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্যকে গদ্যে আত্মীকরণের মাধ্যমে। সে-গদ্যকে কবিতার মতো পঙ্‌ক্তি ভেঙে লেখা যেত। অবশ্য বিষয়বস্তুর যে পরিকল্পনা সেখানে বিদ্যমান, তাতে গদ্যই কবির প্রথম পছন্দ হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সতত ডানার মানুষকে স্থাপন করতে পারি, যেখানে বাক্য তার কাব্যিক স্বভাবকে অক্ষুণ্ন রেখেও মর্মমূলে গদ্যেরই আওতাভুক্ত। এখানে তিনি অনায়াসে সুদীর্ঘ বাক্য ব্যবহার করেছেন, ধ্বনিগত অনুরণনকে চেষ্টা করেছেন এড়িয়ে যেতে; কিন্তু তা-সত্ত্বেও এদের ভেতরের কাব্যিক বৈশিষ্ট্য পাঠককে ঠিকই আক্রান্ত করে। আমরা উদাহরণ হিশেবে কিছু দীর্ঘ বাক্য উদ্ধার করতে চাই :

সেই কালো মহিলা, শাদা মহিলার চেয়েও যার লাবণ্য আর শীতল স্পর্শ আমার তালুতে জাদু রচনা করতো আশ্চর্য হীরক শৈশবে, তাকে দেখবার সাধ এখনও আমার উঁচু আর বিশাল। তাঁর চুল লেবু পাতার গন্ধকেও হার মানায়। পাতালের অন্ধকারের মতো আমার ওপর যখন নুয়ে পড়তো চুলের গুচ্ছ—সে কি জানতো বালক কবি তার নিশ্বাসের স্নিগ্ধ আগুনে জন্ম নিচ্ছিলো তার যৌবনের প্রথম প্রণয়ের আগেই।

যে মানুষ বস্তুত মৃত্যুর মুহূর্তে খুব আশ্চর্য একটি উপমাও তার সন্তান, স্ত্রী কিংবা পরিজনের সামনে উচ্চারণ করে যেতে পারে না―সে কি থাকতে পারতো না আরও নিশ্চুপ, আলস্যময় আর মদ খাওয়ার মতো নগ্ন?

শেষ কথা স্বৈরশাসক আর দুর্ধর্ষ বর্বর বিজয়ী সম্রাটের মুখেই মানায়; যাঁদের দম্ভ আর শক্তির একটি করুণ ডানা মৃত পতঙ্গের মতো সমুদ্রের বালির ওপর অতি নির্বাসনে পড়ে থাকে।…

এই বাক্যগুলোর দৈর্ঘ্য এদের কাব্যিক অভিঘাত তৈরিতে যেমন সমস্যা তৈরি করে নি, তেমনি কাব্যিক বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করেও এরা গদ্যত্বকে বর্জন করে নি। এদের কাব্যিকতা ধ্বনিগত রণনশীলতায় নয়, যেহেতু তা অনুপস্থিত, বরং খুঁজতে হবে এদের উপমা, চিত্রকল্প তৈরির প্রবণতার ভেতরে। পঙ্‌ক্তিতে না ভেঙে গদ্যের মতো সাজিয়ে লেখার মধ্যেই এই গদ্যভাষার বিশেষত্ব নয়। এখানে আমরা বাক্য ব্যবহৃত হতে দেখি তা কবিতার পদ্য-কাঠামোতে ব্যবহারযোগ্য নয়। সিকদার এসব বাক্যে এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করেছেন, যেগুলো এদের গদ্যত্বকে নিশ্চিত করেছে আমাদের জন্য। যেমন : প্রসঙ্গত, বস্তুত, প্রকৃতই, বাস্তবিকই, পৃষ্ঠপোষকতা, অম্ল-আক্রান্ত, ধর্তব্যের মধ্যে ইত্যাদি। এসব গদ্যগন্ধী শব্দই শুধু নয়, বাক্যিক বিন্যাসেও তিনি গদ্যের সকল প্রকৌশলকেও এখানে অনুমোদনযোগ্য বলে ব্যবহার করেছেন। এদের উপস্থিতি বাক্যের গদ্যস্বভাবকে যেমন সংহত করেছে, তেমনি রচনাটি কবিতার মাধুর্য থেকে বিচ্যুত হয় নি। এ-দিক দিয়ে বিচার করলে তার গদ্যকবিতার ভাষাতে গদ্য ও কবিতার যথাযথ সমন্বয় সাধিত হয়েছে, যেটি ইতঃপূর্বে বাংলা গদ্যকবিতায় দেখা যায় নি।

সতত ডানার মানুষ-এর শুরুতে, আমরা স্মরণ করতে পারি, কবির অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল ডানার উদ্দেশে, যে ডানা শৈশবেই পুড়ে গিয়েছিল, তাকেই আবার ক্রমে ফিরে পেতে দেখি নারী ও মৃত্যু উভয় সঞ্জীবনীর ভেতর দিয়ে—লক্ষ করা ছাড়া উপায় থাকে না যে, এই নারী এবং মৃত্যু তারই দুটি ডানা, যারা প্রকৃতপক্ষে ভাষার পদ্য ও গদ্য প্রবাহেরই অপরনাম। এদের যুগল ব্যবহারেই তিনি হয়ে ওঠেন লক্ষ্যভেদী, গভীর ও উড্ডয়নশীল :

তারার দিকে আমি উড়ে চলেছি। এবং আমি একা যাচ্ছি। আমার সামনে মদিরা কিংবা স্বর্গীয় উত্থানের কোনো পানপাত্র নেই। এবং কোনো দাসত্বের কাছে যত ছোট প্রতিশ্রুতিই হোক না কেন, আমি রাখি নি। আমি একা, এবং নারীর কামনা-মদির নখ ও দুরন্ত নদীর মতো চুল থেকেও মুক্ত।

[…] যখন একা থাকি, তাই হয়! নিঃশব্দের ওপর আমি ভেসে চলি। আমার ডানার ছায়া পড়ে উঁচু দালানের চিলেকোঠার ঘুলঘুলিতে। এবং এত উঁচুতে উঠি যে টাকশালের নতুন পয়সার মতো চকচকে তোমাদের সর্বশেষ পাপ কিংবা দয়ার্দ্র হৃদয় আমি দেখতে পাই।

নারী কিংবা মৃত্যু কেউই নয়, এই উড্ডয়নপথে তার লক্ষ্য প্রকৃতপক্ষে কবিতা, যাকে তিনি বিশেষ অর্থে চিহ্নিত করেছেন :

কবিতা উজ্জ্বল হও। তুমি বাঁচো। এবং সুবিশাল নারীর প্রশস্ত নিতম্বের মতো দায়িত্ববোধে আবৃত হও।

মানুষকে তর্ক করতে দাও। জুয়োখেলার ত্রুটি নিয়ে সে চালাক ছুরি। তার পথ ছেড়ে দাও। সমুদ্র আর বালির দ্বীপ তাকে ডাকে। আসবাবের বার্নিশ তাকে দিক আত্মবিশ্বাস! গণিকার প্রণয়সংগীতে সে টুকরো টুকরো করুক তার শৈশবস্মৃতি…

কিন্তু কবিতা, তুমি তো সম্রাট! তোমাকে নিয়ে গল্প করবে ক্ষত-বিক্ষত সৈনিক, যারা তোমাকে দ্যাখে না। তুমি সেই কিশোরীর অন্তর্বাস, বৃদ্ধেরা যার রং পর্যন্ত আঁচ করতে পারে না। বেতের চেয়ারে বসে যারা কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

শুধু এই বাকবিভূতির সাহায্যে নয়, সতত ডানার মানুষ ও এর পরবর্তী সমগ্র গদ্যকবিতার কাজের মধ্য দিয়েও তা প্রতিফলিত। এ-জন্য আমরা দেখতে পাই গদ্যের পোশাক পরেও তার এই রচনাগুলো কবিতার দাবিকে প্রকট ও উজ্জ্বল করে তুলতে পারে এবং কবিতার সীমাকে প্রসারিত করে গদ্যকবিতার জন্য সংরূপের দাবিকেও একইসঙ্গে স্পষ্ট করতে পারে।


বাতাসের সঙ্গে আলাপ


সিকদার আমিনুল হকের গদ্যকবিতার যে-অভিযাত্রা সতত ডানার মানুষ (১৯৯১)-এ শুরু হয়েছিল, ছয় বৎসর পরে প্রকাশিত বাতাসের সঙ্গে আলাপ (১৯৯৭)-কে তারই ধারাবাহিক পরিণতি হিশেবে দেখা যেতে পারে। পূর্ববর্তী গ্রন্থটির ভাব-পরিমণ্ডল ও প্রকৌশলের অনেককিছুই এখানে বজায় থাকলেও, কিছু বিষয়ে এই বইটি স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল। এর পশ্চাৎ-মলাটে বইটি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘গদ্যের এই সাম্প্রতিক গ্রন্থটি এক ভিন্ন অভিযান’। এই ভিন্নতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে, এবং একইসঙ্গে সাদৃশ্যও, অনুসন্ধান করা যেতে পারে :

সতত ডানার মানুষ পড়তে গিয়ে একজন পাঠক অনুভব করেন, এর ভেতরে কবির কল্পনা বিশেষ লক্ষ্যে নিয়োজিত, যার মাধ্যমে একটি ভাবপরিমণ্ডলকে পরিস্ফুট করে তোলা হয়েছে। তিনটি অংশে গ্রন্থটি বিভক্ত। এক শিরোনামের নিচে প্রায়শই একাধিক গদ্যকবিতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাতাসের সঙ্গে আলাপ-এর প্রতিটি  গদ্যকবিতার শিরোনাম আছে এবং এদের কোনো পর্ববিভাজন নেই। একটি একক পরিকল্পনার অন্তর্গত ভাবজগতের অংশ নয় এই গদ্যকবিতাগুলো।

ইতঃপূর্বের গদ্যকবিতায় আখ্যানের দিকে কবির ঝোঁক দেখা না-গেলেও, এখানে দুয়েকটি লেখায় আখ্যান যেমন আছে, তেমনি অনেক লেখাতেই আখ্যানের আভাস রয়েছে।

এই বইয়ের অধিকাংশ কবিতার উপজীব্য বিষয় হলো কবিতা। কবিতার অভিজ্ঞতা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অংশত শিল্প-সমালোচন—ইত্যাদিকে নিয়েই লিখেছেন গদ্যকবিতাগুলো। এই বৈশিষ্ট্য অন্যত্রও দেখেছি আমরা। তবে এক্ষেত্রে কিছু পার্থক্যও রয়েছে।

প্রতীকের ব্যবহার সতত ডানার মানুষ-এ কমে এসেছিল। এখানেও সেটি বজায় আছে।

এখানে তার গদ্যকবিতার ভাষা আরেকটি বিবর্তনকে আত্মস্থ করেছে : হ্রস্ববাক্যের সাহায্যে বর্ণনাকে এগিয়ে নেওয়া। এতে এ-বাক্যগুলোকে গতিশীল মনে হয়, সতত ডানার মানুষের মতো মন্থর নয়।


সিকদার আমিনুল হক গদ্যকবিতাকে কবিতারই একটি বৈচিত্র্য হিশেবে গ্রহণ করলেও, লক্ষণীয় যে, এর বিশেষত্ব বা চারিত্র্য বিষয়ে কিছু স্বতন্ত্র বিবেচনাকে তিনি স্থির করে নিয়েছিলেন।


বাতাসের সঙ্গে আলাপ-এ  গদ্যকবিতার ক্ষেত্রে যে-কাজটি কখনো করেন নি আগে, আখ্যানের ব্যবহার, করতে চেয়েছেন। কিন্তু সম্পূর্ণ আখ্যান নয়, বর্ণনাত্মক গদ্যকবিতাই তার মূল ক্ষেত্র বলে, আখ্যানের প্রসঙ্গ দ্রুত বর্ণনাত্মক হয়ে উঠেছে। তবে কবিতার ভেতরে বিশেষভাবে আখ্যান বা গল্প ব্যবহার তার অভিপ্রেত নয়; অনেকগুলো কৌশলের এটি একটি মাত্র। যেহেতু অনেকটা স্বীকারোক্তির ধরনে তিনি বর্ণনা করেন, বিশেষত সতত ডানার মানুষ-এর লেখাগুলোতে, সেহেতু আত্মজীবনীর নানান বিচূর্ণ অংশ বিভিন্ন মুখোশে প্রবেশ করেছে। বাতাসের সঙ্গে আলাপ-এ তার ধারাবাহিকতা আছে। পূর্ববর্তী গ্রন্থটিতে স্মৃতি আর অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছিল মূল উৎস, এখানে বাতাসের সঙ্গে আলাপ-এ তা নয়। এখানে অভিজ্ঞার জগৎ, তা নিজের কিংবা অপরের যাই হোক-না-কেন, তার সঙ্গে নিজের কল্পনার জগৎও উৎস হিশেবে ভূমিকা রেখেছে।

এই গ্রন্থের গদ্যভাষার বৈশিষ্ট্য সতত ডানার মানুষ-এর তুলনায় অনেকখানি স্বতন্ত্র, যা এর অনুচ্ছেদে বাক্যের বিন্যাস ও বাক্য-দৈর্ঘ্যরে মাধ্যমে প্রকাশিত এবং এদের সম্মিলিত ফল ভাষায় গতিসঞ্চার করেছে এবং সৃষ্টি হয়েছে লেখক/ কথকস্বরের নৈকট্য বা সম্পৃক্ততা। অনেকগুলো স্বল্প-দৈর্ঘ্যরে বাক্যের পর একটি দুটি দীর্ঘবাক্য বর্ণনার গতিতে বৈচিত্র্য সৃষ্টির জন্যই ব্যবহৃত হয়েছে। যে উদাসীনতা, দূরত্ব, সর্বজ্ঞসত্তার নিয়ন্ত্রণ ও স্মৃতির চাপ পূর্ববর্তী গ্রন্থে বিদ্যমান ছিল এখানে তার প্রভাব হ্রাস পেয়েছে। এর ফল বাক্য-দৈর্ঘ্যকে প্রভাবিত করেছে কিংবা উল্টোভাবে বাক্য-দৈর্ঘের হ্রস্বতা ভাব-প্রবণতার দিককেও কিছুটা প্রভাবিত করেছে। এখানে নিজের কবিতা ও শিল্পচর্চা বিষয়ে তার আত্মবিশ্বাস ও দৃপ্ততা প্রায়ই প্রকাশিত হয়েছে।

বাতাসের সঙ্গে আলাপ-এর পর গদ্যকবিতার তৃতীয় গ্রন্থ তিনি রচনা করতে পারেন নি। পরিকল্পিত ও একক ভাবানুভূতির জগৎ-সমৃদ্ধ গদ্যকবিতার পরিবর্তে বিচ্ছিন্নভাবে বেশ কিছু গদ্যকবিতা আমরা পাই, যা বিভিন্ন গ্রন্থে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এগুলোর মধ্যে বিচিত্র ভাবনার ছাপ আছে এবং প্রকরণগত দিক থেকেও কিছু বৈচিত্র্যকে শনাক্ত করা সম্ভব কিন্তু স্বতন্ত্র ভাববিশ্বকে পাওয়া সম্ভব নয় যেটি সতত ডানার মানুষ এবং বাতাসের সঙ্গে আলাপ-এ সম্ভব হয়েছে।

সিকদার আমিনুল হক গদ্যকবিতাকে কবিতারই একটি বৈচিত্র্য হিশেবে গ্রহণ করলেও, লক্ষণীয় যে, এর বিশেষত্ব বা চারিত্র্য বিষয়ে কিছু স্বতন্ত্র বিবেচনাকে তিনি স্থির করে নিয়েছিলেন। এটি তার গদ্যকবিতার ভাষা ও বিষয়বস্তুর দিকে মনোযোগী হলে স্পষ্ট হয়। দূরের কার্নিশ থেকে বাতাসের সঙ্গে আলাপ পর্যন্ত যে  গদ্যকবিতা তাতে তিনটি বিষয় আমাদের কাছে স্পষ্ট :

এক. পদ্যে লেখা কবিতা ও গদ্যকবিতা উভয়ের জন্য স্বতন্ত্র ভাষাকে সৃষ্টি ও ব্যবহার করতে চেয়েছেন।

দুই.  গদ্যকবিতাকে চেষ্টা করেছেন কাব্যগ্রন্থের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র পর্বে বা অংশে রাখতে কিংবা স্বতন্ত্র গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করতে।

তিন. গদ্যকবিতাগুলোকে অনেকটা সিরিজ রচনার মতো, একটি পর্ব বা গ্রন্থের সমস্ত রচনাকে একটি সমগ্র হিশেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন—একটি ভাবসমগ্রের অংশ হিশেবে এদেরকে অনুভব করতে পারি আমরা।

সিকদার আমিনুল হকের গদ্যকবিতা ভাষাগত দিক দিয়ে বার বার বাঁক পরিবর্তনের মাধ্যমেই অগ্রসর হয়েছে, এই ভাষিক বিবর্তন ভাবগত দিককেও প্রভাবিত করেছে। তার গদ্যকবিতা গদ্যে লিখিত হওয়া সত্ত্বেও কাব্যিক উপকরণ ও প্রকৌশলের দিকে পক্ষপাতের কারণে কবিতার দিকেই ভারসাম্যটিকে অনুগত রাখে। বাক্যিক কাঠামো বা বিন্যাসের ক্ষেত্রে ব্যাকরণিক যে-শৃঙ্খলা রয়েছে তাকে বিপর্যস্ত করার কোনো প্রয়াস তার মধ্যে পরিলক্ষিত হয় না। বিষয়বস্তুগত দিক দিয়ে তিনি তিরিশি আধুনিকতাবাদী সাহিত্য-কাঠামোর বাইরে পা ফেলেন নি। গদ্যকবিতার যে বিশেষত্ব তিনি অর্জন করেছেন, তা ভাষাগত দিক থেকে বিচার্য মূলত। তার কবিতায় পাঠক একজন ভ্রমণপিপাসু দ্রষ্টাকে দেখতে পায়, যে দেখার সঙ্গে সঙ্গে নিজের জীবনদর্শনকেও এতে অঙ্গীভূত করে নেয়। একই কথা তার গদ্যকবিতার জন্যও প্রযোজ্য। এখানেও একজন প্রাজ্ঞ ভ্রামণিককে পাই, যে বস্তু থেকে বস্তুর অন্তর্নিহিত সত্তায়, দৃশ্য থেকে দৃশ্যাতীতে এবং অনুভূতি থেকে সংবেদনের গভীরে প্রবেশ করতে চায়। সাধারণভাবে যৌনতা কিংবা মৃত্যু তার প্রিয় প্রসঙ্গ হলেও এদেরকে অনুসরণ করে নতুন শিল্পবোধে উপনীত হওয়া তার অভীষ্ট বলেই তিনি উচ্চারণ করতে পারেন এ-কথা :

সব শব্দের জয়, গন্ধ আর ক্ষমতার চিত্র আমি জানি। ভ্রমণের হাল্কা চোখ নিয়ে আমি আসি নি। আমার চোখ প্রাচ্য দেশের। এর ঠান্ডা গভীরতা সেই রুমালের মতো; বাক্স খুললেই যার গুমোট গন্ধ আর পরিণত ভাঁজ ঝুর ঝুর করে ঝরে পড়বে। (“যে-সব শব্দ আমি জানি”)

রাশেদুজ্জামান

রাশেদুজ্জামান

জন্ম ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৭৬;টঙ্গী, গাজীপুর।
বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
পেশা : সরকারি কলেজে শিক্ষকতা।

প্রকাশিত বই:
পাখি ও প্রিজম [কবিতা, ২০০৮, র‌্যমন পাবলিশার্স]
ঘুমসাঁতার [কবিতা, ২০১২, বনপাংশুল]

ই-মেইল : rashed_kobi@yahoo.com
রাশেদুজ্জামান