হোম নির্বাচিত শূন্য দশকের নির্বাচিত প্রবন্ধ

শূন্য দশকের নির্বাচিত প্রবন্ধ

শূন্য দশকের নির্বাচিত প্রবন্ধ
283
0

probondho kafi kamal (1)দশকওয়ারি প্রবন্ধের সংকলন হিসেবে শূন্য দশক তো বটে, বাংলাদেশে সকল দশকে এটিই প্রথম

 

বইটি প্রকাশ পেয়েছে এবারের বইমেলার একেবারে শেষ প্রান্তে। সে কারণে হয়তো নজর এড়িয়ে গেছে অনেকের। আমাদের বিবেচনায় বইটির একটি বিশেষ গুরুত্ব আছে। এখানে একটি দশকে আবির্ভূত লেখকদের নানা বিষয়ে ভাবনা, অনুধাবন ও অনুধ্যানের তড়িৎশিখা আঁকা রইল, মেঘের খাতায় যেন ভুজঙ্গপ্রয়াতে।

‘শূন্য দশকের নির্বাচিত প্রবন্ধ’ প্রকাশ করেছে জয়তী। প্রচ্ছদ এঁকেছেন এস এম সাইফুল ইসলাম। সম্পাদক কবি কাফি কামাল। পরস্পর-এর পাঠকদের জন্য বইটির ভূমিকা প্রকাশিত হলো। তবে, ভূমিকাপাঠের আগে একবার চোখ বুলানো যাক সূচিপত্রে :

সূচি

১. শূন্যদর্শন- আহমেদ ফিরোজ
২. উজানে বাঁধ-বাহাদুরি বনাম ভাটির নদী-দ্রোহ- পাভেল পার্থ
৩. লেখালেখিতে ভাবনার চুরি- শাহনেওয়াজ বিপ্লব
৪. লেখক ও গ্রন্থকার- মুহম্মদ সাইফুল ইসলাম
৫. বাংলা ভাষার সহজীকরণ ও পরিভাষা সমস্যা- অনুপ সাদি
৬. মিডিয়ায় সেন্সরশীপ: হাঙর-কুমির পাশ কাটিয়ে সাঁতার কাটা- কাজল ঘোষ
৭. কাইয়ুম চৌধুরী ও তাঁর শিল্প: একটি ঐতিহাসিক সমীক্ষণ- এসএম সাইফুল ইসলাম
৮. নজরুলের প্রেমিকারা- তৌহিন হাসান
৯. শিল্পীর মানসে রবীন্দ্রনাথের রবিবারের ছুটি মেলে না- বদরুন নাহার
১০. তারেক মাসুদের চলচ্চিত্র- রুবাইয়াৎ আহমেদ
১১. বাঙালির জাতিসত্ত্বা ও বাংলাদেশে কথাসাহিত্য- চন্দন আনোয়ার
১২. প্রাসঙ্গিক কথা: ছোটকাগজ-তৌহিদ এনাম
১৩. মুখোশ মুখর- শুভাশিস সিনহা
১৪. লোকসংস্কৃতি প্রসঙ্গে-মিজান রহমান
১৫. অপ্রাসঙ্গিক প্রাসঙ্গিকতা- সোহেল হাসান গালিব
১৬. কালের যাত্রায় ঢাকার নৃত্যকলা-শেখ মেহেদী হাসান
১৭. কবিতার ভাষা: অভিনব নিরক্ষরতা-এমরান কবির
১৮. সম্ভাবনার সূত্র ধরে বাংলা চলচ্চিত্রের ভবিষ্যত-আশরাফ শিশির
১৯. বাংলা কবিতা, বাংলাদেশে কবিতা: সাম্প্রতিক প্রবণতা- কাফি কামাল
২০. গুঞ্জরিয়া আসে অলি- সৈকত আরেফিন
২১. আমি তোমাকে পুজো দিতে চাই- এহসান হাবীব
২২. পাঠ ও অক্ষরের রাজনীতি- ফজলুল কবিরী
২৩. বাংলা নাট্যশৈলীর আন্তর্জাতিকায়ন প্রেক্ষিত দ্য টেম্পেস্ট-শাহাদাৎ রুমন
২৪. প্রথম দশকের কবিতায় একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতাবোধ: মার্শাল ম্যাকলুহানের ‘পুনর্গোত্রীকরণ’ ধারণা যাচাই- আফরোজা সোমা

●   ●   ●

ভূমিকা

বাংলাদেশের সাহিত্যের ধারাবাহিক অগ্রগতি দেশের সীমানা পেরিয়ে এখন সমাদৃত বৃহত্তর পরিমণ্ডলে। আমাদের সাহিত্যকে প্রতিনিয়ত পুষ্ট করে চলেছে সৃজনশীলতা ও মননশীলতা। তবে বাংলায় গদ্য বা প্রবন্ধচর্চার ইতিহাস খুব বেশি পুরনো নয়। চিঠিপত্র ও দলিল-দস্তাবেজ লেখার প্রয়োজনে সূত্রপাত ঘটেছিল বাংলা গদ্যের। পর্তুগীজ ধর্মপ্রচারক মানোএল দা আস্‌সুম্পসাঁউ-এর রচনারীতি বাংলা গদ্যের অন্যতম আদি নিদর্শন। একটি সরল কাঠামো নিয়ে আঠারো শতকে বাংলা গদ্যের সূচনা হয়। রামমোহন রায়, অক্ষয়কুমার দত্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা গদ্যের একটা ঐশ্বর্যমণ্ডিত সাধু গদ্যভাষা নির্মাণ করেন। প্রমথ চৌধুরীর প্রবর্তনায় এই গদ্য কাঠামোর একটা মৌল পরিবর্তন ঘটে, যা আজকের চলতি গদ্য হিসেবে পরিচিত। সন্দেহ নেই এই গদ্য একটি দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত।

কবিতা ও কথাসাহিত্য পাঠককে তাৎক্ষণিক আনন্দ দেয়, উদ্দীপ্ত-অনুপ্রাণিত করে। প্রবন্ধ সন্ধান দেয় নতুন দিগন্তের। বিষয়ের ভেতর-বাহির, অস্থিমজ্জার শাঁস তুলে ধরে পাঠকের সামনে। জাগিয়ে তোলে পাঠকের মন। বাংলা সাহিত্যে কবিতা ও কথাসাহিত্যের পাশাপাশি প্রবন্ধচর্চাও এগিয়েছে সমান্তরালভাবে। সৃজনশীল ও মননশীল সাহিত্যে আমাদের সামগ্রিক অর্জন মূল্যায়নে নানা সময়ে প্রকাশিত হয়েছে বিশেষ সংকলন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কবিতা ও ছোটগল্পের দশকওয়ারি বেশ কিছু সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। সে তুলনায় চিন্তাশীল সাহিত্যের সংকলন হাতেগোনা। বিশেষত দশকওয়ারি প্রবন্ধের কোনো সংকলন এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। এর কারণ উদঘাটনেও খুব বেগ পেতে হয় না। তাৎক্ষণিক আনন্দের উপলক্ষ না-হওয়ায় প্রবন্ধের প্রতি বৃহত্তর পাঠকের আগ্রহ বরাবরই কম। পাঠক ও বিক্রয়-স্বল্পতার কারণে প্রবন্ধের সংকলন প্রকাশে প্রকাশকের আগ্রহও ক্ষীণ।

শূন্য দশকের কবি-সাহিত্যিকদের অনেকেই প্রবন্ধচর্চা করছেন। কবিতা, গল্প ও উপন্যাস রচনা, চলচ্চিত্র নির্মাণ কিংবা নাট্যচর্চার পাশাপাশি তারা চর্চা করেছেন প্রবন্ধের। কেউ প্রবন্ধচর্চা করেছেন প্রয়োজনের তাগিদে, কেউ স্বতঃস্ফূর্ততায় আবার কেউ-বা দৈনিকের ফরমায়েশে। আশ্চর্য রকম ব্যতিক্রমও রয়েছেন কয়েকজন। যাঁরা প্রবন্ধকেই করেছেন ধ্যান-জ্ঞান। শিল্প-সাহিত্য, সমাজ ও রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম-দর্শন, প্রেম-নারীবাদ, প্রযুক্তিসহ সব ধরনের বিষয়ই এখন প্রবন্ধের বিষয়বস্তু। আকার-প্রকারেও এসেছে বৈচিত্র্য। বিষয়বস্তু নির্বাচন, ভাষাব্যবহার, বাক্যবিন্যাস রীতিতে পরস্পরের মধ্যে রয়েছে লক্ষণীয় স্বাতন্ত্র্য।

1617621_10201252816596984_3406988809862733907_o
শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে কবি কাফি কামাল

বাংলাদেশের মননশীল সাহিত্যে শূন্য দশক সময়কালের সামগ্রিক যে অর্জন তা মূল্যায়নের প্রয়োজনে ক্ষুদ্র এ উদ্যোগ। দশকওয়ারি প্রবন্ধের সংকলন হিসেবে শূন্য দশক তো বটে, বাংলাদেশে সকল দশকে এটিই প্রথম। বর্তমান সংকলনে শিল্প-সাহিত্য ও ভাষা-সংস্কৃতির মূল্যায়নমূলক প্রবন্ধকে প্রধান্য দেয়া হয়েছে। প্রবন্ধ নির্বাচনে প্রবন্ধকারের বাছাইকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তবে বয়সের বিচারকেই দেয়া হয়েছে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য। নানা যুক্তিতর্কের বিচারে শূন্য দশকের প্রবন্ধকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৫ সালে জন্মগ্রহণকারী লেখকদের। পাঠক অবশ্যই জানেন, এ সময়ে জন্মগ্রহণকারী কবি-সাহিত্যিকেরা তাঁদের প্রস্তুতি ও প্রকাশকাল মিলিয়ে নিজেদের অবস্থান চিহ্নিত করেছেন শূন্য দশকে। আর ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৫ সালে জন্মগ্রহণকারী কবি-সাহিত্যিক নব্বইয়ের দশকে এবং ১৯৮৬ সাল পরবর্তী সময়ে জন্মগ্রহণকারীরা নির্ণিত হয়েছেন দ্বিতীয় দশকে। দু-একজন ব্যতিক্রমও রয়েছেন। আমরা সে ব্যতিক্রমকে বিবেচনা করতে পারি নি। দশক নির্ধারণে বয়সের এ ধারণার বিষয়ে বিস্তারিত দোহাই এ ভূমিকায় বিনয়ের সঙ্গে উহ্য রাখা হলো।

সংকলিত প্রবন্ধকারদের প্রত্যেকেই আন্তরিকতার সঙ্গে লেখা ও ছাপার অনুমতি দিয়েছেন। শূন্য দশকের প্রথম দিকের একজন মেধাবী কবি ও সাহিত্য-সংগঠক তৌহিদ এনাম। বঙ্গোপসাগরের কটকা পয়েন্টে এক দুর্ঘটনায় তিনি অকালে প্রয়াত হয়েছেন। স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকেই তাঁর ‘প্রাসঙ্গিক কথা : ছোটকাগজ’ প্রবন্ধটি সংকলনভুক্ত করা হয়েছে। লেখক ও সম্পাদক উভয় পক্ষের নানা অসুবিধার কারণে কয়েকজনের প্রবন্ধ সংকলিত করা যায় নি। এ অপূর্ণতা সম্পাদক হিসেবে আমাকে ব্যথিত করবে সবসময়। এ সংকলনের বাইরেও শূন্য দশকের কবি-সাহিত্যিকদের অনেকেই ভালো মানের প্রবন্ধ রচনা করছেন। ভবিষ্যতে হয়তো আরও বৃহৎ কলেবরে এ কালখণ্ডের প্রবন্ধ সংকলন প্রকাশিত হবে। ‘শূন্য দশকের নির্বাচিত প্রবন্ধ’ সংকলন সম্পাদনার ক্ষেত্রে নানা পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন বন্ধুবর কবি ও প্রবন্ধকার আহমেদ ফিরোজ। বন্ধুবর প্রকাশক মাজেদুল হাসান সংকলনটি প্রকাশের ক্ষেত্রে যে আন্তরিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন তার প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। এ প্রকাশনার নিবিড় পাঠে অনুসন্ধিৎসু পাঠকের কাছে বাংলাদেশের সাহিত্যধারার চিন্তাশীল শাখার সমসাময়িক একটি রেখাচিত্র ফুটে উঠবে বলে আমার বিশ্বাস।

কাফি কামাল
ফেব্রুয়ারি ২০১৫