হোম গদ্য লেখক-পাঠকের প্রস্তুতি-পথরেখা

লেখক-পাঠকের প্রস্তুতি-পথরেখা

লেখক-পাঠকের প্রস্তুতি-পথরেখা
592
0

জর্জেস সিমেনঁর বলেছেন :

I think that if a man has the urge to be an artist, it is because he needs to find himself through his character, through all his writing.

এই যে আত্ম-আবিষ্কারের তাগাদা, সেখান থেকেই হয়তো লেখক হয়ে উঠতে চান অনেকে। কিন্তু এমনি-এমনিই তো আর লেখক হয়ে ওঠা হয় না। চর্চা করতে হয়। আবার চর্চা করলেই যে-কেউ শিল্পী হয়ে উঠবেন তাও নয়। তবে শিল্পী হয়ে উঠতে হলে চর্চা চাই-ই চাই। মানে লিখতে বসার আগে প্রাথমিক পর্যায়ে হলেও একটা ছোটখাটো প্রস্তুতিপর্ব সারতে হয়। এ-কথা কে না-জানেন যে, নিজে কোনো গাছ হয়ে উঠতে চাইলে আগে শেকড়টা তৈরি করতে হয়। কিন্তু এখানেও একটা কথা থেকে যায়—আচ্ছা, লেখালেখির শেকড়টা যে তৈরি করব, তা করবটাই-বা কিভাবে?

এ প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়ে গেল। ১৯৩৮ সালে আমাদের বুদ্ধদেব বসু তার ‘লেখার ইস্কুল’ প্রবন্ধে বলছিলেন :

আমি এক-এক সময় ভাবি, লেখার একটা ইস্কুল খুললে কেমন হয়। বিজ্ঞাপনে দেখেছি, বিলেতে অনেক ইস্কুল আছে যারা পত্রযোগে গল্প লিখতে শেখায়।

লেখার ইস্কুল! সে আবার কী? কী শেখানো হবে সেখানে; আর শেখাবেই-বা কে এবং কিভাবে? এতগুলো প্রশ্ন তখন এমনিতেই মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। তবে প্রশ্নের-পর-প্রশ্নে আমাদের মেতে ওঠাটা আর হয় না, যখন বুদ্ধদেব নিজেই বলে দেন :

আমি ভেবে দেখেছি যে লিখতে শেখার একটিমাত্র উপায় আছে—পড়া।

মানে বইপড়া। বই পড়েই গদ্যপদ্যের কলকব্জার মেকানিকস হতে হয়। এছাড়া আর উপায় কী! যখন ‘লেখাতে হাতে ধরে শেখাবার কিছুই নেই’, তখন তো বইয়ের পাতা থেকেই বই-লেখার পাঠ নিতে হবে। আমাদের ধারণা, সে-কথা ভেবেই হামীম কামরুল হক পাঠকের সামনে এনেছেন তার ছোটগল্প লেখকের প্রস্তুতি ও অন্যান্য বিবেচনা বইটি।


সবাই যেমন লেখক নন, গণ্ডা গণ্ডা বই প্রকাশ করেও নন, তেমনি শত শত বই পড়েও পাঠকই হয়ে উঠতে পারেন না অনেকে।


বইটির প্রথম প্রবন্ধটিই আমাদের অর্থাৎ পাঠকদের উদ্দেশে লেখা। শিরোনাম, ‘ছোটগল্প-পাঠকের প্রস্তুতি’। আর তাছাড়া ফ্ল্যাপের শুরুতে সে-কথা বলেও দেয়া হয়েছে। ফ্ল্যাপের প্রথম বাক্যটিই এমন, ‘যারা ছোটগল্প পড়তে চান, বা পড়েন; ছোটগল্প লিখতে চান, বা লেখেন—তাদের জন্যই এই বই।’ তো আমরা যেহেতু ছোটগল্প পড়তে চাই, পারলে দুএকটা লিখতেও চাই, সেহেতু সে-আগ্রহেই বইটি হাতে নেয়া।

বিভিন্ন সময় প্রকাশিত হওয়া ছয়টি প্রবন্ধের সমন্বিত রূপ চৌষট্টি পৃষ্ঠার এই বইটি বের করেছে কথাপ্রকাশ। বইটিতে পাঠকের প্রস্তুতিমূলক প্রবন্ধটির পরে ক্রমান্বয়ে আলোচিত হয়েছে, ‘ছোটগল্প : প্রবণতা ও প্রয়াসের একটি হাতুড়ে তদন্ত’, ‘ছোটগল্প বনাম খাটোগল্প’, ‘ছোটগল্প : সংস্কার ও পালাবদলের সূত্রধরগণ’, ‘ছোটগল্প-লেখকের প্রস্তুতি’, ‘ছোটগল্পকারের পথ ও প্রতিজ্ঞা’। আত্মতাড়নায় একই বই একাধিকবার পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, বইটি বিস্তর আলোচিত হবার দাবি রাখে। সংক্ষিপ্ত কলবরে হলেও আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় কথাগুলো একমলাটে ঠেসে দিয়েছেন হামীম কামরুল হক। বেশ সরল, সবল ও সহজ ভঙ্গিতে ছোটগল্পের একটি সংজ্ঞাও দাঁড় করিয়েছেন তিনি—‘আদতে আত্মমুকুরে পৃথিবী ও জীবনকে দেখাটাই গল্পের জায়গা জমি, এবং সেখানে খোঁড়াখোঁড়ির ফসলই ছোটগল্প।’

এই যে ছোটগল্প, বাংলা ছোটগল্প, যার সম্পর্কে বলা যায়, বাংলা ভাষায় যে পরিমাণ প্রকৃত ছোটগল্প লেখা হয়েছে তা নিয়ে কোনো পাঠক সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারবেন। আর হয়তো এ-কারণেই, অর্থাৎ বাংলা ছোটগল্পের আয়তন, গুণগত কি পরিমাণগত, বোঝাতে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন :

ছোটগল্পই হলো বাঙালির মহাভারত।

অথচ দুঃখের বিষয় ছোটগল্প কী, তার স্বরূপ এবং ভাষা, নির্মাণকৌশলের নানান দিক নিয়ে বোধকরি একটি পরিপূর্ণ বই এখনো বাংলাসাহিত্যের পাঠকরা পান নি। কিন্তু কথা তো এই, ছোটগল্প পাঠক যত সমৃদ্ধ হবেন ছোটগল্প লেখক ততটাই সতর্ক হবেন। হয়তো এ দিকটি বিবেচনায় রেখে হামীম তার আলোচনার শুরুই করেছেন পাঠকের প্রস্তুতি নিয়ে। সেখানে তিনি বেশ স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছেন—‘লেখক যেমন হুট করে জন্ম নেন না। একই ব্যাপার ঘটে পাঠকের ক্ষেত্রে। যারা লেখেন, তারা সবাই যেমন লেখক নন, গণ্ডা গণ্ডা বই প্রকাশ করেও নন, তেমনি শত শত বই পড়েও পাঠকই হয়ে উঠতে পারেন না অনেকে।’

কেন, যারা লেখেন, তারা সবাই লেখক নন কেন? লেখক হতে গেলে কি প্রস্তুতি লাগেই? কেন লাগে, কোন পথে লাগে, কতটুকু লাগে? এসব স্বাভাবিক প্রশ্নেরই সাবলীল উত্তর দিয়েছেন হামীম তার বইয়ে। বলতে গেলে পুরো বইয়ে এসব নিয়েই আলোচনা করেছেন তিনি। তবে বইটির ‘ছোটগল্প-লেখকের প্রস্তুতি’ ও ‘ছোটগল্পকারের পথ ও প্রতিজ্ঞা’ প্রবন্ধ দুটিতে একটু খোলামেলাভাবেই আলোচিত হয়েছে এ বিষয়গুলো।

‘ছোটগল্প-লেখকের প্রস্তুতি’র শুরুতেই বলেছেন, ঠিক কোন কোন কাজগুলি করলে কেউ একটি লেখা সম্পন্ন করতে পারেন তার সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা নেই। তবে সবচেয়ে বড় কথা, লেখালেখি যে-বিরাট একটা শৃঙ্খলা দাবি করে, সেই দাবিটি আমাদের এদেশের লেখকরা খুব কমই পূরণ করে থাকেন।….মারিও ভার্গেস য়োসা সুন্দর করে বলেছেন :

প্রেরণা আসে নিয়মিত কর্ম-প্রচেষ্টা থেকে।

তবে প্রতিদিন লিখতে বসলেই যে লেখা ভালো হবে, তারও তো কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ লেখালেখির উৎকর্ষ কিভাবে দেখা দেয় সেটি রহস্যময়। তারপরও প্রতিদিন লিখতে বসার কাজটা একজন লেখকের ন্যূনতম কাজ।…. বাঙালি লেখকদের স্বভাবকে ‘বাঙালি নারী’ বিষয়ক একটি প্রবচনের সূত্রে বলা যায়—তারা প্রায় সবাই ‘কাঁচা বয়সে পাকা, পাকা বয়সে কাঁচা’ হয়ে যান। ছোটগল্প লেখার ক্ষেত্রে সেটি আরো বেশি প্রযোজ্য।

একই প্রবন্ধে হামীম এও বলেন—’বলার দরকার নেই, তবুও বলতে হয়, অনেকেই নিজের সামর্থ্যের চেয়ে বেশি কিছু করতে গিয়ে হতাশ হয়েছেন। লেখা ছেড়ে দিয়েছেন। এর উলটো দিকে আছে সমালোচক ও পাঠকের চাওয়া। তারাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে লেখকের কাছ থেকে বেশি আশা করেন। ক্ষেত্রবিশেষে তাকে কটু-সমালোচনা করেন। তাতে ঝাঁঝ বেশি থাকলে লেখক আহত হন। হতোদ্যম হন কেউ কেউ। কিন্তু সত্যিকারের লেখক নিন্দা-প্রশংসার কোনোটাতেই দমে যান না বা অতি আনন্দিত হন না। তার কাজ লেখা। লেখা অভিমানের কোনো জায়গা নয়। কেউ কটু কথা বলল বলে, স্বীকৃতি খ্যাতি রাতারাতি জুটে গেল না বলে লেখা ছেড়ে দিলেন—তেমন লোকের না লেখাই ভালো। উপেক্ষা ও অপেক্ষা-ই এক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ। স্বীকৃতির বিচারে নিজের লেখাকে বিচার করার কোনো মানে নেই।


বইটির পাঠক হিশেবে আমাদের প্রাপ্তি সন্তোষজনক। সেই পাঠতৃপ্তি থেকেই আমাদের চাওয়া, প্রস্তুতির এই প্রয়োজনীয় বইটি পৌঁছে যাক সব শ্রেণির লেখক-পাঠকের হাতে হাতে।


আর এর পরের প্রবন্ধ ‘ছোটগল্পকারের পথ ও প্রতিজ্ঞা’য় হামীম কামরুল হক যোগ করেছেন আরেকটি দুঃখজনক সত্য। ‘আমাদের সাহিত্যে একটি বিশেষ অপচর্চা (ব্যাড প্র্যাকটিস) আছে : কেউ কেউ মনে করেন, আমাকে একই সঙ্গে কবি, ছোটগল্পকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার আরো যা যা, পারলে সিনেমার পরিচালক—সব কিছু হতে হবে। সর্বোপরি আমাকে একটি বিশেষ দশকে ঠাঁই পেতে হবে।’ তবে এর পরপরই হামীম এও বলেন, ‘কেবল ছোটগল্পই চর্চা করে যাওয়া সাহিত্যের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ চর্চা। সবাই তো আর আন্তন চেখভ, হোর্হে লুই বোর্হেস, বা এলিস মুনরো বা হাসান আজিজুল হক হয়ে উঠতে পারেন না। সাহিত্যের পথ এমনিতেই ক্ষুরধার, ছোটগল্পকারের পথ তার চেয়েও ধারাল। কিন্তু ছোটগল্পে টিকে থাকার একটি সুগভীর অর্থও আছে।….কিন্তু প্রতিজ্ঞা ছাড়া সেই জায়গা থেকে কি কারো এগিয়ে যাওয়া সম্ভব?’

হয়তো সম্ভব নয়; তবু আমাদেরকে তা সম্ভব করে নিতে হবে। আর আমরা পারবও, কেননা আমাদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ আছেন। একদিকে মূলত ছোটগল্পকার রবীন্দ্রনাথ, অন্যদিকে বোর্হেস—বোধ করি এই দুয়ের ছোটগল্প নিবিড়ভাবে পাঠ ও অনুশীলনে গড়ে উঠতে পারে এই সময়ের ছোটগল্পকারের প্রতিজ্ঞার জায়গা।

এভাবেই শব্দের সম্মোহনী শক্তিতে পাঠককে ধরে রেখে প্রস্তুতি’র সংক্ষিপ্ত অথচ প্রয়োজনীয় কথাবার্তা সেরে নেন হামীম কামরুল হক তার ‘ছোটগল্প-লেখকের প্রস্তুতি ও অন্যান্য বিবেচনা’য়। সবমিলিয়ে বেশ স্পষ্ট করেই বলা যায়, এই বইটির পাঠক হিশেবে আমাদের প্রাপ্তি সন্তোষজনক। সেই পাঠতৃপ্তি থেকেই আমাদের চাওয়া, প্রস্তুতির এই প্রয়োজনীয় বইটি পৌঁছে যাক সব শ্রেণির লেখক-পাঠকের হাতে হাতে। আরো শাণিত হতে থাকুক আমাদের বোধশক্তি, চিন্তন-ক্ষমতা আর পাঠাভ্যাস। এই প্রত্যাশায় ‘ছোটগল্প-লেখকের প্রস্তুতি’র শেষ কথাগুলো পড়তে পড়তে আমাদের আলোচনার ইতি টানছি—

আমরা যারা বর্তমানে বাংলায় লেখালেখি করি, তাদের ব্যর্থতা অনেক। এর কারণও অনেক। সবচেয়ে বড় কারণ তো আমরা নিজেরা। কিন্তু আগামী দিনের লেখকরা অনেক বেশি সম্ভাবনাময়—এই বিশ্বাস কখনোই মন থেকে সরিয়ে দিতে পারি না। তাদের হাতে মহৎ কিছু না হোক বৃহৎ কিছু হবে, বা বৃহৎ কিছু না হোক মহৎ কিছু হবে, বা দুটো মিলিয়ে কিছু না কিছু হবে—এই আশা থেকেই যায়।

মুহিম মনির

জন্ম ২০ জ্যৈষ্ঠ; ১৪০১ বঙ্গাব্দ (০৩ জুন, ১৯৯৪ খ্রি.); নেজামপুর, নাচোল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ। চতুর্থ বর্ষের ছাত্র : এমবিবিএস; এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ, দিনাজপুর।

ই-মেইল : monirulislamdjmc24@gmail.com