হোম বই নিয়ে মাহফুজামঙ্গল : একটি স্বতন্ত্র শক্তিমন্ত মৌলিক কবিতার বই

মাহফুজামঙ্গল : একটি স্বতন্ত্র শক্তিমন্ত মৌলিক কবিতার বই

মাহফুজামঙ্গল : একটি স্বতন্ত্র শক্তিমন্ত মৌলিক কবিতার বই
431
0

কবি ও কথাসাহিত্যিক মজিদ মাহমুদের বয়স ৫১ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ ১৬ এপ্রিল ২০১৭, ৩ বৈশাখ ১৪২৪। এ উপলক্ষে তার জন্মস্থান ঈশ্বরদীর চর গড়গড়িতে শুরু হয়েছে উৎসব অনুষ্ঠান। পরস্পরের পক্ষ থেকে তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। তার সর্বাধিক আলোচিত কবিতার বই মাহফুজামঙ্গল নিয়ে লিখেছেন কবি কাজী নাসির মামুন…


মজিদ মাহমুদের মাহফুজামঙ্গল কাব্যগ্রন্থে মাহফুজার ভূমিকা অনেকটা রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনদেবতা’র মতো। চিত্রা পর্বে এসে রবীন্দ্রনাথের এই ‘জীবনদেবতা’র উন্মেষ আমরা লক্ষ করি। ‘আত্মপরিচয়’-এ রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন : এই যে কবি, যিনি আমার সমস্ত ভালোমন্দ, আমার সমস্ত অনুকূল ও প্রতিকূল উপকরণ লইয়া আমার জীবনকে রচনা করিয়া চলিয়াছেন, তাহাকেই আমার কাব্যে আমি ‘জীবনদেবতা’ নাম দিয়াছি।

অর্থাৎ শুধু তার কবিতার অন্তঃঅনুপ্রেরণা হিশেবেই কাজ করে নি এই ‘জীবনদেবতা’, তার জীবনের ‘অনুকূল ও প্রতিকূল’ উপকরণে চালিকাশক্তি হিশেবে কাজ করেছে। রচনা করেছে তার সামগ্রিক বাস্তব এবং নান্দনিক বা শৈল্পিক সত্তা। ‘তুমি যা বলাও আমি বলি তাই’—এই দাসত্বের সূত্রধরেই কবি তার গোটা জীবন তার দেবতার কাছে সমর্পিত রেখেছেন। নিজের পথে কবি আর চলতে পারেন নি। কেননা ‘পদে পদে’ তার সেই দেবতা ‘ভুলাইলে দিক’। অবশ্য শেষ পর্যন্ত ওই পথই কল্যাণকর বলে বিবেচিত হয়েছে। মাঙ্গলিক আলোর বাইরে জীবনের অন্ধকার তথা নেতির দিকে তার কবিতা আলোকপাত করে নি বলে তিরিশি অভিযোগটি এ ক্ষেত্রেও ‘জীবনদেবতা’র পরিণতির মধ্য দিয়ে পরিপুষ্ট হয়ে ওঠে। কেননা ‘অঙ্গে অঙ্গে অমৃত বৃষ্টি’ ঝরিয়ে ‘জীবনের অধিষ্ঠাত্রী দেবী’ রূপে পরিণতি পায় তার সেই ‘জীবনদেবতা’। কিন্তু কে এই ‘জীবনদেবতা’ তথা তার অন্তরের মানস-সুন্দরী? মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ঠিকই বলেছেন : ‘জীবনদেবতা’ যেন যুগপৎ কবির দেবতা এবং প্রিয়া।

মাহফুজামঙ্গল কাব্যগ্রন্থেও মাহফুজাকে একই সঙ্গে দেবী এবং প্রিয়ার ভূমিকায় দেখি। মজিদ মাহমুদ যখন বলেন : তোমার সান্নিধ্যে এলে জেগে ওঠে প্রবল ঈশ্বর, তখন প্রেমের শারীরিক কাঠামো ভেঙেচুরে যায়। শরীর ছাপিয়ে অশরীরী ঈশ্বরের প্রবল দাপট যেন আমরা টের পাই। ফলে প্রেম হয়ে ওঠে একই সঙ্গে শারীরিক এবং প্লেটোনিক। এই প্রেম প্লেটোনিক, কেননা ঈশ্বরের সঙ্গে একমাত্র আধ্যাত্মিক প্রেমই সম্ভব। আবার এই প্রেম শারীরিক, কেননা শরীর ছুঁয়ে যে স্পর্শসুখ অনুভূত হয়, তার বর্ণনাও তার কবিতায় অগণিত। দুইটি সাবলীল পঙ্‌ক্তির মধ্য দিয়ে এই ভালোবাসার দ্বৈতরূপ তিনি রূপায়ণ করেছে।

মাহফুজা তোমার শরীর আমার তছবির দানা
আমি নেড়েচেড়ে দেখি আর আমার এবাদত হয়ে যায়।

ইংরেজ কবি জন ডানের কবিতায় অন্তঃপ্রেরণায় ছিল এই শরীরবৃত্তীয় প্রেম। শরীর হচ্ছে মাধ্যম। শরীরী প্রেমের মধ্য দিয়ে পৌঁছানো যাবে ঈশ্বরে। মজিদ মাহমুদও তার শারীরিক তথা জাগতিক প্রেমকে একটি মহাজাগতিক পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছেন। ফলে তার কবিতা একরৈখিক গণ্ডিতে বাঁধা পড়ে নি। বহুরৈখিক মাত্রায় উপনীত হয়েছে। আর তাই মাহফুজা এবং ঈশ্বর একই সত্তায় লীন হয়ে গেছে। ঈশ্বর তথা মাহফুজা তো তারই মানস-দেবতা। আর তাই হয়তো ঈশ্বরকে ডাক দিলে মাহফুজা সামনে এসে দাঁড়ায়।


মাহফুজা ঠিক এই জায়গায় একেশ্বরের প্রতীকী ব্যঞ্জনায় সমাদৃত হয়ে ওঠে মজিদ মাহমুদের প্রেমের দর্শনে।


মাহফুজামঙ্গলে মজিদ মাহমুদের প্রেমপ্রবণতা একই সঙ্গে একেশ্বরবাদী এবং পৌত্তলিক ঘরানার। তার প্রেমের কবিতার এটিও একটি বহুমাত্রিক দিক বলে মনে হয়। তার ধ্যানে, জ্ঞানে, কর্ম-পরিকল্পনায় তথা জীবনের সকল স্তরে মাহফুজার একচ্ছত্র অবস্থান এবং আধিপত্য তাকে রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনদেবতা’র মতো সর্বময়ী করে তুলেছে। মাহফুজা আছে বলেই অন্য কোনো ‘দেবতা’র অবস্থান পোক্ত হয় নি মজিদ মাহমুদের জীবনসত্তায়। হৃদয়বৃত্তির সকল স্তরেই পলকা হয়ে গেছে অন্য কোনো দেবদেবীর অধিষ্ঠান। আর অত্যন্ত সরলভাবেই তিনি বলেন : মাহফুজা তুমি তো দেবী/ আর আমরা তোমার গোলাম। আর শেষটায় জুড়ে দেন : পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হোক তোমার শাসন। অর্থাৎ মাহফুজাকে তিনি তার প্রেমপ্রলুব্ধ হৃদয়ের অধিপতি হিশেবেই দেখতে চান না, তিনি চান মাহফুজার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হোক এক ঐশ্বরিক শাসন। মাহফুজা ঠিক এই জায়গায় একেশ্বরের প্রতীকী ব্যঞ্জনায় সমাদৃত হয়ে ওঠে মজিদ মাহমুদের প্রেমের দর্শনে। রোমান্টিক ব্যক্তিনিষ্ঠতা ডিঙিয়ে এক বস্তুনিষ্ঠ ক্লাসিক্যাল পরিণতির দিকে তার প্রেম যেন আরও বলিষ্ঠ হয়ে ওঠে। প্রেমের এই উপলব্ধি নতুন এবং স্বতন্ত্র তো বটেই।

সুফিবাদে আমরা যেমনটি দেখি : প্রেমের মধ্য দিয়ে ঈশ্বরে বিলীন হবার আকাঙ্ক্ষা। ‘ফানাফিল্লা’র অনন্য জগতে ঈশ্বরের সঙ্গে মিলিত হবার প্রয়াস। কিন্তু প্রেম পরিণতি পেলেই ভক্তিমার্গে উচ্চকিত সেই প্রেম। তারও আগে শুরু হয় মান-অভিমান, বিরহ প্রহর। চলমান হাহাকার সেই প্রেমের বিরহকে প্রজ্বলিত করে দেয়। মজিদ মাহমুদের কবিতাতেও সেসবের বিস্তর প্রয়োগ লক্ষ করবার মতো :

তুমি অক্ষত অমীমাংসিত থেকে যাও শেষে
তখন আমার গগনবিদারী হাহাকার
অতৃপ্তিবোধ
আরও হিংস্র আরও আরণ্যক হয়ে
ক্রুদ্ধ আক্রোশে তোমাকে বিদীর্ণ করে
তোমাকে ছিন্নভিন্ন করে
তুমি ছিন্নভিন্ন হয়ে
তুমি ক্ষয়িত ব্যথিত হয়ে
আবার ফিরে আস অখণ্ড তোমাতে
আমার বিপক্ষে অভিযোগ থাকে না তোমার
কারণ তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে পারে না যেতে
আমাদের দাসের জীবন। (দাসের জীবন)

এমন অযোগ্য কবিকে তুমি সাজা দাও মাহফুজা
যে কেবল খুঁজেছে তোমার নরম মাংস
তবু তোমার স্নেহ আমাকে ঘিরেছে এমন
এই অপরাধে কখনো কর নি সান্নিধ্য ত্যাগ। (খবর)

মানুষের কষ্ট দেখে তোমার কাঁপবে না বুক
মানুষের সুখ দেখে তোমার জাগবে না রোমাঞ্চ
কেবল তোমার অহংকার
নিষ্পলক চেয়ে রবে ভবিষ্যের দিকে… (তোমার অহংকার)

তুমি চলে যাবে?
তুমি চলে যাও মাহফুজা
কাঙালের মতো আর বাড়াব না হাত
শুধু সাথে করে নিও না যদি
কোনোকালে অজান্তে করে থাকি পাপ। (কেন তুমি দুঃখ দিলে)

মিলনের শুভদিন কোনোদিন আসবে না আমাদের
অপেক্ষায় কেটে যাবে আহ্নিক গতি
বছর বছর যাবে নতুনের সমাগমে
অবনত রয়ে যাব সনাতন বিষয়ের কাছে
আমার বয়স যদি বেড়ে যায় একশ বছর
সত্তর হাজার কিংবা অনন্তকাল
তুমি তত দূরাস্ত হয়ে যাবে আমার কাছে
কেননা তোমার গতি সমদূরবর্তী সমান্তরাল লাইনের মতো।
…………..
মলুয়ার মদিনার দুঃখের কাসুন্দি ঘেঁটে মনসুর বয়াতি
আমাদের বিরহের ধৈর্যের কাহিনি শোনায়। (শুভদিন)

এ তো গেল প্রজ্বলিত হাহাকার, বিরহ এবং বিষোদ্‌গার। এই গ্রন্থভুক্ত ‘মঙ্গলকাব্য’ অংশে ভক্তিমার্গ যেন উচ্চকিত হয়ে উঠেছে :

যেন কোনো দিন প্রবঞ্চিত না হই তোমার ওম
সারাক্ষণ ঘিরে থাকে আমাকে যেন তোমার ক্ষমা। (তিন)

এমন অভিকর্ষের কথা নিউটন শোনেন নি কোনোদিন
আমার তো জানা নেই কিভাবে শোধ হবে মাহফুজার ঋণ। (চার)

মাহফুজা আমার জীবন আমার জবান তুমি
করেছ খরিদ, তাই তোমার গোলাম আমি
তোমার হুকুমের বিরুদ্ধে কেউ পারবে না আমার
স্বাতন্ত্র্য ছুঁতে, আমার ধ্বনি, আমার কবিতা, আর
আমার সন্তান, সব সম্পদ তোমারই নামে। (পাঁচ)

আমার মতো হয়তো শত কোটি মানুষের প্রণাম
তোমার পায়ে আসলে শুভক্ষণে পেতে পারি ক্ষমা। (ছয়)


মাহফুজামঙ্গলে মাহফুজা একটি রূপক বা প্রতীকের ব্যঞ্জনায় প্রতিষ্ঠিত বলে কোনো কালসীমানায় আটকে নেই।


উপর্যুক্ত পঙ্‌ক্তিতে ভক্তের দীনতাকে স্পষ্ট করে তুলেছেন কবি মজিদ মাহমুদ। আবারো বলছি ‘জীবনদেবতার’ মতোই একটি অন্তঃঅনুপ্রেরণা হিশেবে নিয়ন্ত্রণশক্তির ভূমিকা নিয়েছে মাহফুজা। ‘মোর কথা লয়ে তুমি কথা কহ’—সরাসরি এরকম উক্তি হয়তো মাহফুজামঙ্গল থেকে উদ্ধৃত করা সম্ভব নয়। কিন্তু মজিদ মাহমুদের কবিতার অন্তর্জগতে ‘জীবনদেবতা’র মতো একটা ‘অধরা’ সত্তা হিশেবে মাহফুজার অস্তিত্ব আমরা টের পাই :

রবীন্দ্রনাথকেও তুমি দাও নি ধরা
কাজীদা অভিমানে তোমার বিপরীতে
ফিরায়েছে গাল
আবার কেন ধরেছ অনুজের পাছ
তুমি ছাড়া নেই আমার কবিতার বিষয়
যেমন ছিল না কীটসের
বোদলেয়ার নেরুদাও খুঁজেছে তোমাকে

এ তো গেল মাহফুজামঙ্গলে মজিদ মাহমুদের একেশ্বরবাদী প্রবণতার কথা। একেশ্বরবাদী কিন্তু একমাত্রিক নয়। বহুমাত্রিক। এর বাইরেও তার প্রেমের একটা পৌত্তলিক ঘরাণা আছে। সেখানে মাহফুজা একই সঙ্গে দেবী এবং মানবী। অবতার রূপে নেমে আসা দেবতার মতো সেখানে মাহফুজার বহুধা বিভক্ত রূপ। সেখানে ‘অসম্ভব বিশ্বাসে নগ্ন হয়ে আছে তুষার-স্তন’। তার সেই বিশাল দেহে হেঁটে বেড়ায় পেঙ্গুইন। সেই মাহফুজাকে দেশীয় সীমানা ডিঙিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে হেঁটে বেড়াতে হয়। যেতে হয় ‘ন্যান্সি রিগানের শয়ন কক্ষে’ ‘যেখানে লেখা আছে তৃতীয় বিশ্বের বাঁচবার হিশাব।’ আবার কখনো-বা সেই মাহফুজাকে ‘জানলেই কিয়ামত হবে’ এবং মানুষ ‘নিজেরাই পরস্পর মেতে রবে ভ্রূণ হত্যায়।’ সেই মাহফুজাকে ‘পারে না ছুঁতে’ ‘আমাদের মধ্যবিত্ত ক্লেদাক্ত জীবন।’ আর তিনি নিজে সেই বহুধা বিভক্ত রূপের আঁধার মাহফুজাকে তর্জনী ধরে হাঁটা শিখিয়েছেন, নিজের মমত্ব দিয়ে করেছেন মহান। তাকেই পৌত্তলিক ঘরানায় অর্ঘ্য দিয়ে বলেছেন :

তাই নিজ হাতে মূর্তি গড়েছে আমার ভাস্কর
অর্ঘ্যরে যোগ্য করে গেঁথেছে মালা তোমার পূজারি

মাহফুজামঙ্গলে মাহফুজা একটি রূপক বা প্রতীকের ব্যঞ্জনায় প্রতিষ্ঠিত বলে কোনো কালসীমানায় আটকে নেই। বিশেষত আমাদের ঐতিহ্যগত মিথের ব্যবহারে অতীতকে সমসাময়িকতায় এবং সমসাময়িকতাকে অতীতের মূল্যায়নে লীন করে দিয়েছেন মজিদ মাহমুদ। তার কবিতা ভাষায় বোধগম্য কিন্তু ভাবে গভীর। ফলে কোনো আরোপিত টেকনিকের দ্বারস্থ হতে হয় নি তাকে। ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক যুগে ওয়ার্ডসওয়ার্থ কবিতায় সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাকে ব্যবহারের কথা বলেছিলেন। কেননা সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায় একটি স্বতঃস্ফূর্ত সংবেদনশীলতা থাকে। আরো থাকে দার্শনিক ঋদ্ধতা। বাংলাদেশের মানুষের আটপৌরে মুখের ভাষাকে কবিতায় ব্যবহারের মধ্য দিয়ে মজিদ মাহমুদ সেই দার্শনিক ঋদ্ধতাকে নতুন করে যাচাই করেছেন। ভাষার সেই ব্যবহার সরল কিন্তু সিদ্ধ। সেই ভাষাকে তিনি কোনো বিশেষ ছাঁচে ফেলে পরিশীলনের চেষ্টা করেন নি। এই ক্ষেত্রে তার সাহস এবং পারঙ্গমতা আশির কবিতার মৌলধারার দিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। তার শক্তিই প্রমাণ করেছে তিনি স্বতন্ত্র এবং নিজের জায়গায় মৌলিক।

Kazi Nasir

কাজী নাসির মামুন

জন্ম ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩; মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশা : অধ্যাপনা।

প্রকাশিত বই :
লখিন্দরের গান [কবিতা, লোক প্রকাশন, ২০০৬]
অশ্রুপার্বণ [কবিতা, আবিষ্কার প্রকাশনী, ২০১১]

ই-মেইল : kazinasirmamun@gmail.com
Kazi Nasir