হোম বই নিয়ে মতিহারের কিংবদন্তি কবি আপেল আবদুল্লাহর ‘লেট ট্রেন’

মতিহারের কিংবদন্তি কবি আপেল আবদুল্লাহর ‘লেট ট্রেন’

মতিহারের কিংবদন্তি কবি আপেল আবদুল্লাহর ‘লেট ট্রেন’
1.16K
0

গানের চরণে আছে—‘সেখানে সাঁইর বারামখানা’।

বিখ্যাত এই গানটি পুরোপুরি তার মতোই আছে। তা সত্ত্বেও ‘বারামখানা’ শব্দটিকে একটু আলাদা করে নিতেই হচ্ছে, একটা ভিন্ন প্রেক্ষাপটকে আমলে নেওয়ার সুবিধার জন্য। আজও জনসংস্কৃতির প্রতিধ্বনিতে ‘বারামখানা’ শব্দটি শুনলেই মনের মধ্যে কেমন যেন একটা ঘোরলাগা ভাব জাগে, উত্তেজনায় চকচক করে ওঠে চোখ! যতই যা কিছু হোক, এই বারামখানা কিন্তু  ছেঁউড়িয়ার লালন সাঁইজির নয়। সাঁইজির জগৎ ভিন্ন।

তবে সাঁইজির জগৎ থেকেই এই ‘বারামখানা’ শব্দটি ধার করা। এটা ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তখনকার নির্মীয়মাণ রবীন্দ্র কলাভবনের পাশে—তরুণ বোহেমিয়ান কবিদের গুরু কবি মোশতাক দাউদীর মাথা গুঁজবার অস্থায়ী ঠাঁই। সত্তরের অন্যতম কবি জামিল রায়হানের বর্ণনায়, ‘একটা বড় আম গাছের ছায়ায় নির্মিত অস্থায়ী সেমিপাকা ঘর’। দাউদীর বারামখানা নামেই যাকে চিনত সবাই, জানত মতিহারের আড্ডা প্রিয় কবিদের জায়গা।

ক্যাম্পাসের ছোট-বড় সকল সৃষ্টিশীল তরুণ কবিরই মঞ্জিলে মকসুদ ছিল বারামখানা নামের এই আড্ডাটি। মধ্যমণি যথারীতি মোশতাক দাউদী। মূলত নিকটাত্মীয় ঠিকাদার, ভগ্নিপতি নূরন নবীর বদান্যতায় হলের পরিবর্তে দাউদীর থাকার অস্থায়ী ব্যবস্থা ছিল এটি। সেই ভদ্রলোক রবীন্দ্র কলাভবন বানাচ্ছিলেন, দাউদীর দায়িত্ব ছিল ভগ্নিপতির অবর্তমানে নির্মাণ কাজের খোঁজ খবর রাখা। বারামখানার আড্ডায় আপেল আবদুল্লাহ এবং রেজা হক শান্তি তো ছিলেনই। প্রায় নিয়মিত বা অনিয়মিতভাবে আরও অনেকেই আড্ডা দিতেন বা নিদেনপক্ষে সাহিত্য বিষয়ক খোঁজখবর করতেন। লিখতেন না অথচ সাহিত্য পছন্দ করতেন এমন বন্ধুরাও সম্পৃক্ত থাকতেন ‘আড্ডা’র সাথে। কবিতাপত্র ‘আড্ডা’য় লিখেছেনও কেউ কেউ। এমন সব ধরনের বন্ধুদের মধ্যে থেকে পাওয়া নামগুলোই শুধু তুলে ধরছি। তবে যাদের নাম পাওয়া যায় নি পরবর্তীতে প্রাপ্তি সাপেক্ষে তা যুক্ত করা হবে। এরা হলেন—শুভেন্দু ইমাম, সুমন রহমান, জামিল রায়হান, রেজাউল করিম, আহমেদ সফিউদ্দিন, তসিকুল ইসলাম রাজা, কৌশিক আহমেদ, কাজী মুস্তফা, কাজী আশফাক, সেকান্দার আলী, শামসুল আলম সরদার, সারোয়ার আলম সরদার, ভাস্কর চৌধুরী, মলয় কুমার ভৌমিক, শাহনেওয়াজ গামা, কামাল মাহমুদ, অর্পণ উজ জামান, মাহমুদ হাসান, রায়হান রাহমান, মনজু রহমান, মল্লিকা সরকার, শেরিফা নার্গিস আক্তার রেখা, জ্যোৎস্না ইয়াসমিন, এলিনা খান, দিলরুবা, উম্মে মুসলিমা, নাসরীন আহমেদ, নীলুফার ইয়াসমিন, জাহাঙ্গীর আবদুল্লাহ, বেলায়েত হোসেন বাবলু, লাইলাক শহীদ, কে এম শহীদুল হক, সোহেল আমান, আলী মাহমুদ, মোহাম্মদ রেজাউল কাবীর, শেখর কুমার রায়, সরকার মাসুদ, অসীম কুমার দাস, মোকতার হোসেন, খয়বর হোসেন, গোলাম কিবরিয়া পিনু, রফিকুর রশীদ, হাবিবুর রহমান হাবু, আরিফুল হক কুমার, হোমায়রা নাজনীন সোমা, তারিক-উল ইসলাম, আবু মুসা বিশ্বাস, সৈয়দ শামসুল আলম, দীপক রঞ্জন চৌধুরী, সৈয়দ মোজাম্মেল হক, মীর মূর্তজা আলী বাবু, শাহ আলম চুন্নু প্রমুখ।


সামরিক শাসনের অবরুদ্ধ দশায় প্রতীকী ভাঙচুরের মধ্য দিয়ে সংঘটিত শিল্পচর্চার এই অভিনব অভ্যুদয় আজও মতিহারের পুরনো লোকজন মনে রেখেছে।


শুরুতেই যেমন বলেছিলাম ‘সেখানে সাঁইর বারামখানা’ গানটির কথা। তার আরো দু’টি চরণ হচ্ছে—‘বুঝেও তা বুঝতে নারি/ কীর্তিকর্মার কী কারখানা’। এখানে ‘কীর্তিকর্মার কী কারখানা’ কথাটির বাউলিয়ানা ব্যাখ্যায় আমি যাচ্ছি না। বরং আমাদের সিধা ব্যাখ্যায় বন্ধুত্রয়ীর কথাই বলি—মোশতাক দাউদী, আপেল আবদুল্লাহ এবং রেজা হক শান্তি। যারা পরে হয়ে পড়লেন মতিহার ক্যাম্পাসের কবিতা আন্দোলনের কীর্তিকর্মা বা কিংবদন্তি। আশির দশক, এমনকি নব্বইয়ের কিয়দংশ পর্যন্ত প্রায় দুই দশক তাদের সূচিত এক সর্বপ্লাবী প্রভাবের ধারায় বিমোহিত ছিল মতিহার ক্যাম্পাস। চলমান সামরিক শাসনের আমলে মতিহার ক্যাম্পাসে লিটল ম্যাগ, কবিতা পাঠ, দর্শনীর বিনিময়ে কবিতা অনুষ্ঠান, আবৃত্তি, নাটক, গণসংগীত, প্যালেস্টাইনের প্রতি সংহতি জানিয়ে কবিতা পাঠ অত সহজ ছিল না। এগুলোর বেশিরভাগের আয়োজনের পিছনে ঐ তিন বন্ধুর কিছু না কিছু ভূমিকা ছিলই। এরকম একটা উদ্যোগের কথা বরং বলেই ফেলি, লিখেছেন বাংলা বিভাগের সুমন রহমান : ‘‘তখন আমাদের মাথায় অজস্র আইডিয়া ভুরভুরি কাটে। মোশতাক দাউদী বলে, লিটলম্যাগ বের করতে হবে। নাম হবে আড্ডা।’’

কথা ও কাজের মিল তৈরির পরের গল্পগুলো বেশ মজার। কবিতাপত্র ‘আড্ডা’র প্রচ্ছদের জন্য ছবি তোলার পাগলামিতে আর সবার সাথে বিপুল উদ্যমে জড়িয়ে পড়লেন আহমেদ সফিউদ্দিনও। একদা তিনি ছিলেন রাজশাহীতে দৈনিক বাংলার রিপোর্টার, পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্টার হয়েছিলেন। মোশতাক দাউদী সদলবলে পরামর্শ করে তাকে নিজেদের দলে ম্যানেজ করলেন। তার কাছে তখন ভালো কোয়ালিটির একটা ক্যামেরা ছিল। এর আগে নীহারবানু হত্যাকাণ্ডের পর তার অসাধারণ রিপোর্টিং দেশবাসীকে কাঁদিয়েছিল। পরে বইও লিখেছেন ‘নির্বাসিতা নীহার বানু’ নামে। তো আহমেদ সফিউদ্দিনও দলে ভিড়ে গেলেন। এখন দাউদীর পরিকল্পনায় কবিতাপত্র ‘আড্ডা’র প্রচ্ছদের জন্য জুতোর ছবি তুলতে হবে। সদলবলে ঝাঁপিয়ে পড়লেন সবাই সবেধন নীলমনি সেই কোয়ালিটি ক্যামেরা নিয়ে।

কী ঘটল? শুনে নিই আহমেদ সফিউদ্দিনের সরস বর্ণনায় :

‘‘জুতো খুঁজছি আমরা। তুমুল আড্ডবাজের একজোড়া জুতো। সবার চোখ ছাত্রদের পায়ের দিকে। জিন্স পড়াদের দিকেই নজরটা বেশি। ভাই, কিছু মনে করবেন না। আপনার জুতোর তলাটা একটু দেখব। থমকে যাবার পর বুঝিয়ে রাজি করানো। না, চলবে না। নতুন জুতো। ছবিতে সোলের ডিটেইলস্ আসতে হবে। পুরনো জুতো চাই। অনেক খুঁজেও পছন্দসই জুতো পাওয়া গেল না। হতাশ আপেল আবদুল্লাহ, রেজা হক শান্তি। অবশেষে হঠাৎ নজর পড়ল দলনেতার জুতোর দিকে। দাউদী আপনার পা উঠান।’’

তারপর? ইউরেকা! সংক্ষেপে পরের গল্পটুকু হলো—উত্তেজিত সবাই দ্রুতপায়ে দাউদীকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়ায় হাজির। জুতোশুদ্ধ দাউদীর পা রাখা হলো টেবিলের ওপর। পাশে চায়ের কাপ আর সিগারেটের প্যাকেট—পুরোটাই আড্ডার অ্যাকশন। আহমেদ সফিউদ্দিনকে আর পায় কে, তিনি মনের সুখে ছবি তুললেন। মোশতাক দাউদী করলেন অলঙ্করণ। প্রকাশের পর দেখা গেল ‘আড্ডা’ কবিতাপত্রের প্রচ্ছদ জুড়ে একজোড়া জুতো। ক্যাম্পাস ও ঢাকার সর্বত্রই মহা আলোড়ন। সে সময় প্রচ্ছদের এই আইডিয়া ছিল প্রচলিত সুরুচির বাইরে, রীতিমত বৈপ্লবিক ও প্রথাবিরোধী। আজও পুরনো সময়ের কেউ কেউ দেখা হলে এই অভিনব প্রচ্ছদ এবং আড্ডার কথা বলে। ‘বারামখানা’ থেকে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই পুরো সময়টা ছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রজন্মের জন্য সৃষ্টিশীল সোনালি সময়। পরের টুকু ছিল শিবির নিয়ন্ত্রিত আতঙ্কের ক্যাম্পাস।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সোনালি সময়টাতে আড্ডা, রণক্ষেত্রে, স্পর্ধা, জন্মান্তর, ঝল্লকণ্ঠ, জেগে আছি, সুন্দরম, অহংকার, দ্রোহী, কথা, বাউরী বাতাস, চত্বর, ছড়াপত্র-গ্রেনেড, উত্তর নক্ষত্র প্রভৃতি লিটলম্যাগের ছড়াছড়ি। সবটাতেই বন্ধুত্রয়ী—মোশতাক দাউদী, আপেল আবদুল্লাহ এবং রেজা হক শান্তি কোনো না কোনোভাবে অবদান রেখেছেন। আজ আমার খুবই বলতে ইচ্ছা করে, এ সময়টায় মতিহার ক্যাম্পাস ছিল স্বল্প পরিসরে কথিত দাদাবাদের প্রতীকী প্র্যাকটিস গ্রাউন্ড। সৃষ্টিশীল তারুণ্যের পাগলামির মধ্য দিয়ে থিয়োরির অনেক কিছুই কমবেশি সেখানে ঘটেছিল তাদের অজান্তেই। এগুলো হয়তো পরবর্তীতে আরও বুঝা যাবে। দাদাবাদ নিয়ে অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর সংক্ষিপ্ত ভাষ্য হলো :

‘‘চিত্রকর্মে ও সাহিত্যে একটি প্রবল প্রতিবাদী আন্দোলন, ১৯১৬ সালের দিকে জুরিখে ট্রিস্টান জারা, হান্স আর্প, হিউগো বল এবং রিচার্ড হুয়েলসেনবেক দাদাবাদের সূত্রপাত করেন। এঁদের বক্তব্য ছিল, শিল্প সম্পূর্ণ স্বাধীন ও মুক্ত; কোনো নিয়ম শৃঙ্খলা, ঐতিহ্য, প্রথা বা আদর্শের শৃঙ্খলে তা বন্দি নয়।’’

মতিহার ক্যাম্পাসে এ্ই বর্ণনার প্রায় বেশিরভাগ লক্ষণই তখন তরুণ কবিতা কর্মীরা জেনে বা না জেনে হোক রপ্ত করেছেন। সামরিক শাসনের অবরুদ্ধ দশায় প্রতীকী ভাঙচুরের মধ্য দিয়ে সংঘটিত শিল্পচর্চার এই অভিনব অভ্যুদয় আজও মতিহারের পুরনো লোকজন মনে রেখেছে।

‘কীর্তিকর্মার’ এই কারখানায় কবিতা পত্রিকা ‘আড্ডা’র অন্যতম কারিগর কবি আপেল আবদুল্লাহ ছিলেন কবি মোশতাক দাউদীর প্রধান সহচর, বন্ধু ও সতীর্থ। সবাইকে নিয়ে লিটলম্যাগ করেছেন, কবিতা আন্দোলন করেছেন। আড্ডার আগে সম্পাদনা করেছিলেন ‘স্পর্ধা’। স্পষ্টতই তারা সে সময়ে প্রথা বা ট্র্যাডিশন ভাঙচুর করে সাহিত্যের আঙিনায় নতুন ডাইমেনশন আনার চেষ্টা করেছিলেন ভাবনায়, প্রচ্ছদ পরিকল্পনায়, অনুষ্ঠান আয়োজনের উদ্যোগ প্রভৃতির মাধ্যমে। এই গ্রুপটি ক্যাম্পাস ছেড়ে যাওয়ার পরবর্তী প্রায় দুই দশক পর্যন্ত মতিহার ক্যাম্পাসে তরুণদের মধ্যে তাদের প্রবর্তিত রুচি ও ভাবনার একটা প্রভাব দেখা যায়। এই কীর্তি তৈরিতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কবি আপেল আবদুল্লাহরও রয়েছে কমবেশি অবদান।

আমি বিশ্বদ্যিালয়ে সবেমাত্র ভর্তি হয়েছি, নবীন কবি যশোপ্রার্থী একজন। মনের মধ্যে সাংস্কৃতিক ভাবনা। তখন সবার মুখে মুখে সদ্য সমাপ্ত রাকসু নির্বাচনের টাটকা গল্প। সবাই জানত সাহিত্য সম্পাদক পদে তিনবন্ধুর মধ্যে দু’জন দু’টো প্যানেল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। অন্যজন নিউট্রাল রোলে ছিলেন। ভোটের আগে, ভোটের সময় এবং ভোটের পরেও সবাই অবাক হয়ে দেখল ত্রয়ী বন্ধুদের কোনো পরিবর্তন নাই। তারা একই রকম আছেন। আমার কাছে তখন মোশতাক দাউদী, আপেল আবদুল্লাহ, রেজা হক শান্তি—এই নামগুলো ছিল যুগপৎ শিহরন ও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

রাকসু নির্বাচনের সেই ঘটনাটি শব্দায়নের প্রতিষ্ঠাতা কবি তারিক-উল ইসলামের বর্ণনা থেকে শুনে নিই :

‘‘ছাত্র ইউনিয়ন সমর্থক মোশতাক দাউদী আর আওয়ামী লীগের ছাত্রলীগের সমর্থক রেজা হক এবং জাসদ ছাত্রলীগে সক্রিয় ছিলেন আপেল আবদুল্লাহ। তখন বিরোধ ছিল এ তিন সংগঠনের মধ্যে। কিন্তু কখনই এ তিন বন্ধুর কোনোদিন বিরোধ দেখি নি। ১৯৮০’র রাকসু নির্বাচনে মোশতাক দাউদী দাঁড়ালেন পত্রিকা সম্পাদক পদে। সাহিত্য সম্পাদক পদে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেন আপেল আবদুল্লাহ ও রেজা হক। এতে জিতলেন রেজা হক। অল্প ভোটের ব্যবধানে হেরে গেলেন আপেল আবদুল্লাহ। ভোটের মধ্যেও বিরোধ সৃষ্টি হলো না তাদের। বরং রেজা হকের সম্পাদনায় রাকসুর যে অনবদ্য প্রকাশনা ‘রণক্ষেত্রে’ তা তারা সম্মিলিতভাবেই করেছিলেন।’’

কিন্তু দু:খের বিষয়, মতিহার ক্যাম্পাসের অন্যতম কিংবদন্তি কবি আপেল আবদুল্লাহ পরবর্তীতে জীবনের হিশাবনিকাশে বাঁধা পড়ে সময়ের তুলনায় একটু দেরিতেই তার কবিতাগুলো নিয়ে ‘লেট ট্রেন’-এ উঠেছেন। কবি আপেল আবদুল্লাহর ‘লেট ট্রেন’-এর সমগ্র যাত্রার কিছু রূপ একঝলকে দেখা যেতে পারে। কবি নিজেও জানেন—জীবন বড় আনন্দের, সুখ-দুঃখ ও সংগ্রামে ভরা। জীবনে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে রহস্যময় সৌন্দর্যে ভরা সত্যের নিজস্ব একটা চির অবস্থান থাকে। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে বেধের ভিন্নতায়ও গাঢ় হয় প্রেম। যেমন ‘লেট ট্রেন’-এ বললেন :

‘‘দারুণ তাড়াহুড়ো আমার সব তাতেই সবাই জানে
শুধু তুমিই বলে দিলে
আমি বড় দেরি করি। গভীর রাতের লেট ট্রেন’’

প্রথম কবিতাতেই জীবনের প্রথমদিককার সেই প্রাণবন্ত আড্ডার সুর, সংলাপধর্মীতা। জীবন সচল থাকে আড্ডার মধ্য দিয়েই। ‘ফিরে আসা’ কবিতায় বন্ধুদের মনের কবিতা-তৃষ্ণা ও পরস্পরকে উস্কে দিয়ে সৃজনের পথে আগের মতোই ঠেলে দেয়ার জন্য ভালোবাসার যে প্রকাশ ঘটেছে, তা আমার অনুভবে কালোত্তীর্ণ। ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা’—গানটি আজও মানুষকে যেমন বিষাদিত, স্মৃতি আচ্ছন্ন করে; এই কবিতাটিও সেই রকম হাহাকারকে অসম্ভব মায়ায় আগলে রেখেছে। কবিতায় দ্রোহের যে সুর পাই যা অনুরাগ, তাচ্ছিল্য, উদাসীনতা ও প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে জীবনের আনন্দমুখরতাকে ডেকে নেয়—এরকম জীবন্ত কবিতা এখনও বড়ো দুর্লভ। যেমন ‘ফিরে আসা’ থেকে বলা যায়—

‘‘কামাল লেখে আর কতদিন কবিতা থেকে এই স্বেচ্ছা নির্বাসন?
মনে কি পড়ে সেই সব দিন? মোমেন বলে—লেখালেখি ছাড়িস না ব্যাটা
চালিয়ে যা তোর হতে পারে
লিখব, লিখব উত্তর শুনে হাসে, বলে
অলিখিত মহাকাব্যের কবি হয়ে
শালা মরে যাবি, হবে না তোর হবে না।’’


যেখান থেকে উত্থান সেখানেই মানুষকে বারবার যেতে হয়—মর্মমূল ছুঁয়েই তো উদ্ভিদ জন্মা্য়।


সময়ের সাথে জীবনের ধারাবাহিকতার সম্পর্ক থাকে। মানুষের জীবনে এক সময় যোগাযোগের মাধ্যম হিশেবে চিঠি এই সম্পর্কটাকে নিবিড়ভাবে রাঙিয়ে রেখেছিল। আজও কানে বাজে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘রানার’ কবিতাটি। মানুষ আজকাল চিঠি লেখে না, এটা বলা যাবে না। তবে চিঠি লেখা কমে গেছে। দরকার/অদরকারের সেই যোগাযোগের ধরনও পাল্টে গেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানুষের জীবনটাকেই বদলে দিচ্ছে। যার কারণে রাত জেগে স্ত্রী কিংবা প্রেমিকা চিঠিতে কপোত এঁকে মিনতি করে বলে না—‘‘যাও বন্ধু বলো তারে সে যে ভোলে না মোরে’’। চিঠিতে মন খুলে কথা বলার সেই দিনগুলো আজ আর পাওয়া যায় না। সুকান্ত তো বলেই গেছেন চিঠি যখন একটি ঐতিহ্যিক প্রথা ছিল, তখন মানুষের জীবন বিকাশের আবশ্যিকতায় সেই চিরসত্য উপলদ্ধি। যেমন—

‘‘কত চিঠি লেখে লোকে—
কত সুখে, প্রেমে, আবেগে, স্মৃতিতে, কত দুঃখে ও শোকে।’’

অন্যদিকে কবি আপেল আবদুল্লাহর ‘চিঠি’ কবিতায়ও আক্ষেপ ঝরে পড়ল। তিনি বিষণ্ন কণ্ঠে স্বীকারোক্তি করলেন। নিজেই গিয়ে দাঁড়ালেন প্রশ্নের মুখোমুখি—‘চিঠি কি হারিয়ে গেল’ সভ্যতার এই ক্ষণে? তার আগে দেখে নিই তার স্বীকারোক্তির ধরন—

‘‘বহুদিন লিখি নি চিঠি, চিঠি তো পাই না কারো
মন খুলে লেখা হৃদয়ের বাঁধন আলগা করা রাতজাগা চিঠি—
বাবার চিঠি, বন্ধুর চিঠি, প্রেমের চিঠি, দ্রোহের চিঠি, কলাময় চিঠি
শিল্পিত চিঠি—‘‘যাও বন্ধু বলো তারে সে যে ভোলে না মোরে’’
নীল খামে কপোত আঁকা চিঠি
চিঠি কি হারিয়ে গেল?’’

এই আক্ষেপ যখন কবির মনে, তখনও কবি আপেল আবদুল্লাহ ‘নিখোঁজের খোঁজ’ চাইলেন। অসামান্য দরদে একটা গল্প বললেন— ক্যাম্পাস জীবনের গল্প। আপ্রাণ চেষ্টার ভঙ্গিতে সবার উদ্দেশ্যে পৌনঃপুনিকভাবে অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে বিশেষ একজনের সন্ধান চাইতে লাগলেন। সেলুলয়েডে টানা আত্মজীবনী যদি বলি, তা শাদামাটা মনে হলেও আদ্যোপান্ত রঙিন ও বর্ণাঢ্য। অতিশয়োক্তি নাই, নিতান্তই নাটকের সংলাপের মতো। রোমান্টিকতায় রূপ নেয়া স্মৃতি কাতরতায় মনটা উদাস হয়ে যায়। ‘নিখোঁজের খোঁজ’ নামের এই সুন্দর কবিতাটির পুরোটা তুলে ধরা গেল না, তবে কিছু অংশ তুলে ধরলাম। নিখোঁজের খোঁজ পেলে কোন ঠিকানায় জানাতে হবে সেটা শেষে বলা হলেও এখানে শুরুতেই উল্লেখ করছি। যেমন-

‘‘তার খবর পেলে—দয়া করে
কবি উম্মে মুসলিমা, কুশিয়ারা, ঢাকা এ ঠিকানায় জানাবেন।’’

তার আগে একজন কথার জাদুকর যেভাবে একের পর এক কথার জাল বিস্তার করতে থাকে, সেরকম করে নিখোঁজের খোঁজ পাওয়ার জন্য মরিয়া প্রচেষ্টায় অনবরত কথা বলেছেন। নিখোঁজ জনকে খুঁজে পাওয়ার জন্য অনেকগুলো মিসিং লিংক ছিল। সেগুলো দিয়ে শ্রোতাকে কনভিন্স করার চেষ্টা করেছেন। তার মধ্য থেকে দু’টো মিসিং লিংক এখানে উল্লেখ করছি—

‘‘মতিহারে কবিতা লিখত—তাঁর খোঁজ জানেন?
চিনলেন না? ঐ যে যারা স্পর্ধা দেখাত
আড্ডা দিয়ে পড়ে থাকত আলী আর জয়নালের ক্যান্টিনে
অনেক বড় বন্ধুর দল হলেও যারা বলত
প্রত্যেক মানুষই ঈশ্বরের মতো একাকী

এরপরও যদি না চেনেন—তাহলে সহজ করে বলি
ওই যে বোহেমিয়ানের দল—যারা মতিহারের পানিতে আগুন জ্বেলে দিত
শূন্যে ইমারত গড়ত
আর মাঝে মাঝে পাখনা মেলে আকাশে উড়াল দিত
তাদেরই একজন—সে আবার হাতে কলম তুলে নিয়েছে’’

প্রয়াত কবি মোশতাক দাউদী স্মরণে ‘হা বন্ধু হা সখা’ লিখলেন। সেখানে সর্বব্যাপ্ত হাহাকারের আদি-অন্তহীন অদৃশ্য রোদন দেখা গেল। যদিও এই বিলাপের কষ্টচিত্র আঁকা অসম্ভব একটি কাজ। এ শুধুই অনুভবের—

‘‘যতি নেই কমা নেই নেই কোনো বিরাম চিহ্ন
শূন্য প্রান্তরে ধু-ধু মরীচিকাময় দুপুর ডাকে
হাহাকার জাগে’’

মোশতাক দাউদী যার এমন বন্ধু, তার তো ‘হা বন্ধু হা সখা’ বলে ধ্রুপদি বিলাপের অন্তহীনতার মধ্যে নিমজ্জন থাকবেই। যেখান থেকে উত্থান সেখানেই মানুষকে বারবার যেতে হয়—মর্মমূল ছুঁয়েই তো উদ্ভিদ জন্মা্য়। বটগাছের ছায়া হয় অন্যদের আশ্রয়। মতিহার ছুঁয়ে যারা আজ সর্বত্র পল্লবিত—কিংবদন্তির সুবাস ছড়ায়। তাদের তো সেখানে যেতেই হয়, যেতে হবে বারবার। কবি আপেল আবদুল্লাহও তাই যেতে চেয়েছেন, যাবেন বলেছেন। গেলে কী কী করবেন তার একটা লম্বা ফিরিস্তি দিয়েছেন ‘যাবো’ কবিতায়। যেমন-

‘‘হলে যাবো না খাবো না—
রবীন্দ্র চত্বরের ঘাসে শুয়ে বাবলার হলুদ ফুল গুণবো
একটার পর একটা বাস ফেল করবো
প্রিয়সব নারীদের অবজ্ঞাভরে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া দেখবো
ইউক্যালিপ্টাসের বাকলে দুঃখ দূরতমার কাছে লিখবো—
জানা ছিলো না কবিতার মতো
অন্ধকার খনির তলা থেকে তোমাকে মেহনত করে তুলে আনতে হয়
আর একবার যাবো—আমূল আন্দোলিত হতে যাবো।
সবকিছু উলট-পালট দেখে নেবো
যাবো আর একবার যাবো—যাবো বারবার।’’


প্রচলিত মিথ এবং সেই কেন্দ্রিক জিজ্ঞাসাগুলি মানুষের মনের ভিতরের যে ক্ষোভ বা বিস্ময় তৈরি করেছে কবি আপেল আবদুল্লাহ তা তুলে ধরতে চেয়েছেন।


সেই চিরায়ত বোহেমিয়ান, সেই নির্ভেজাল রোমান্টিকতা, সেই অনিয়মের ভাণ্ডার থেকে সৌন্দর্য আহরণ, সেই দুঃখবিলাস, সেই বারবার নিজেকে ফিরে পাওয়ার বাসনা—এই সকল ভাববিলাস গুচ্ছবদ্ধ রাখা একমাত্র কবির পক্ষেই সম্ভব। মতিহারের কিংবদন্তি কবি আপেল আবদুল্লাহই পেরেছেন কবিতায় মতিহার ক্যাম্পাসকে ভালোবাসার এই প্রতিশ্রুতিময় বাগান তৈরি করে তার সুবাস ছড়িয়ে দিতে।

অন্যদিকে জীবন তো থেমে নাই। কবিকে তাই এবার পরিণত জীবনের সুবাস গায়ে মাখতে হয় ‘কমরেড’ কবিতায়। তার নাতি হয়েছে—নাতির আবার আপন ইচ্ছাধীন কার্যক্রম—জোর করে কিছু চাপানো যায় না। তাতে হিতে বিপরীত হয়। নাতির সাথে দাদা-দাদির খুনসুটি, ওফ্ এত আনন্দ জীবনে! জীবন বড়ো সুন্দর। ‘কমরেড’-এ এই দৃশ্যের কী কোমল, নরম স্নেহার্দ্র উচ্চারণ—

‘‘আপন মনের রাজা সে
যখন খুশি হয়, দয়া করে খায়, কথা শুনে, কবিতা শোনায়
দিদিয়ার খেলার সাথী সে সারাক্ষণ গায়ে লেগে থাকে
পেলব নরম বুকে ওম নিয়ে দিদিয়ার গান শুনে
মায়ার আবেশে অবশেষে ঘুমায়’’

কবি নির্ভীক হন—তিনি থাকেন অতীন্দ্রিয় ক্ষমতার অধিকারী। যে কোনো পূর্বাভাস উপেক্ষা করে বিপদ টের পাওয়ার ক্ষমতা তার রয়েছে। ‘কবির চোখ’-এ তার একটি নিটোল উদ্ধৃতি পাওয়া যাচ্ছে ‘কবির চোখ কোনো বিপদে কাঁপে না’। এই অনুসিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার আগের প্রেক্ষাপটটি ছিল এরকম—

‘‘কবে কোন দুঃসহ সঙ্কটে
কালো রুমাল উড়িয়ে তুমি বলেছিলে বিপদ
আমি বুকের বাম পকেটে হাত রেখে দেখেছি
দুরুদুরু হৃদকম্পন ঠিক আছি ঠিক আছি শব্দ করেছিল
বেতারে জলহাওয়ার সংবাদ শুনেছিলাম
কোন বিপদই নেই
কোন বন্দরেই হবে না দেখাতে কোন বিপদ সংকেত
একি সঙ্কেতহীন কিছু
আমি সোজা এগোতে থাকলাম।’’

‘প্রত্যাবর্তিত ঋত্বিক’ কবি আপেল আবদুল্লাহর কুহক আচ্ছন্নতা থেকে মুক্তি পাওয়ার একটি সৎপ্রচেষ্টার অঙ্গীকার মাত্র। কিছু একটা পাওয়ার জন্য, কিছু একটার ডাক শোনার জন্য, কিছু একটা উতলা ক্ষণের টানে তিনি ফিরে ফিরে আসছিলেন। কিন্তু জানছিলেন ‘কেউ অপেক্ষায় নেই তোমার জন্য’। কী নিরতিশয় অভিমান-এর তো কোনো জবাব হয় না। কবির ভাষাতেই শুনে নিই—

‘‘চলেই তো গিয়েছিলে তবে কেন ফিরে এলে
কোন সে দূরাশা তোমাকে শোনাল ঋত্বিকের প্রত্যাবর্তন
প্রিয় কেউ কি অপেক্ষায় ছিল? কেউ কি উপেক্ষা দেখাল
তবে কেন আর এত কটুগন্ধ পোড়া নাভিশ্বাস।
প্রিয় কোনো নাম কোনোদিন ডাকবে না’’

কবি আপেল আবদুল্লাহর আরো কয়েকটি ভিন্ন মেজাজের কবিতা, যেমন—‘এই বরেন্দ্রে এই প্রাচীন জনপদে’, ‘ইতিহাসে ভুল ভূগোলে ভাগ’, ‘পিতার জন্য প্রার্থনা’ এবং ‘বাসনা মোহন প্রশস্তি’, ‘চাবুক চর্চিত পিঠ’-এর সংক্ষিপ্ত উল্লেখ করছি।

সবাই জানে রাজশাহী প্রাচীন বরেন্দ্র জনপদ নামে পরিচিত। এর হাওয়ায় হাওয়ায় বিদ্রোহের গল্প, অরণ্য আর আদিবাসীর গল্প, মানুষের ঘাম-শ্রম-উৎপাদনের গল্প, কৃষক বিদ্রোহ ও তেভাগার আন্দোলনের গল্প সুবাস ছড়ায়। এই প্রাচীন জনপদের সেই সব অহংকারসমূহ স্মরণ করলেন কবি আপেল আবদুল্লাহ এই ভাবে। তার শুরুর অংশবিশেষ দেখে নিই—

‘‘এসো এই বরেন্দ্রে, বদ্বীপ থেকে এদেশ গড়ে ওঠার পূর্ব জমিনে
উঁচু-নিচু এবড়ো থেবড়ো আঁকাবাঁকা আলপাথে এসো সাবধানে
ধূলোয় ধূসরিত জনপদ দিয়ে রুক্ষ্ম হাওয়ায় ঘামে ভিজে এসো
সোঁদাগন্ধ লালমাটি আর শস্য ধান্যের এই প্রাচীন জনপদে।

এককালে এই জনপদ গহিন অরণ্য ছিলো
ভিল, কোল, সাঁওতাল আর রাজবংশীরা এই অরণ্যভূমে
ফনিমনসা, ধুতরা আর বাবলার ঝোঁপে জঙ্গলে শ্বাপদের সাথে
প্রকৃতি মানব হয়ে অরণ্য ভালোবেসে জীবন কাটাতো।’’

কবি আপেল আবদুল্লাহর ‘ইতিহাসে ভুল ভূগোলে ভাগ’ আরেকটি উল্লেখযোগ্য কবিতা। কবিতার একপ্রস্থ অভিপ্রায় দেখলে মনে প্রশ্ন জাগে—কেন এই প্রতীকী তাচ্ছিল্য বা অভিমান? চার পর্বের এই সিরিজের ‘এক’ নম্বর কবিতাটি থেকে এর একটা ভাবাবেগ নিরূপণ করা যেতে পারে। কবির চিরবিদ্রোহী সত্তার তীব্র তাচ্ছিল্যতা অনেক মানুষকে সঙ্গী করেই এগোতে থাকে। এই দেশে প্রচলিত মিথ এবং সেই কেন্দ্রিক জিজ্ঞাসাগুলি মানুষের মনের ভিতরের যে ক্ষোভ বা বিস্ময় তৈরি করেছে কবি আপেল আবদুল্লাহ তা তুলে ধরতে চেয়েছেন। সেই মিথনির্ভর কাল থেকে বর্তমান অবধি ইতিহাসের ধারাবাহিকতা কিংবা ভৌগোলিক বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের অবস্থা পরিবর্তনের জন্য যে লড়াই-সংগ্রাম চলে আসছিল। এ লড়াই ছিল ইতিহাসের প্রতিটি স্তরে শোষণ-বঞ্চনা-সংগ্রাম-গণহত্যা-অবরুদ্ধকালের বিরুদ্ধে। যার প্রেক্ষিতে একজন মহানায়কের অনিবার্য উপস্থিতি চিহ্নিত হয়। যার কারণে ইতিহাস বদলে গিয়ে সেই বেশিরভাগ মানুষের জীবনে মিথগুলোর অন্তর্নিহিত স্পিরিট এবং ভৌগোলিক বিস্তারের ভুল শুধরে বাস্তবে সুফলভোগীতে পরিণত হওয়া। কবি আপেল আবদুল্লাহ এই সিরিজের প্রথম পর্বে এর আংশিক রূপ চিহ্নিত করলেন, এভাবে—

‘‘সেই ছোট্টবেলা স্কুলে, ইতিহাসের সাথে হয় দেখা
হাত ধরাধরি করে ভূগোলও ছিলো তার সাথে
আজ বুঝি ইতিহাসে ভুল, ভূগোলের ধরিত্রী কাটাছেঁড়া
এদেশ নাকি সুখে ভরা ছিলো সব ভুল কথা
ফরমায়েসি কল্পলোকে আমরা হয়ে আছি দিশেহারা
টাকায় সাতমন চাল পাওয়া যেত, কড়ি ছিল কার কাছে?
গোয়ালভরা গরু ছিলো কে দুধ খেত তার?
পুকুর ভরা মাছ ছিলো—পুকুর ছিলো কার কার?
এসব কিংবদন্তি বাজে কথা, মধ্যযুগীয় মিথে ভরা
রাজায়, নবাবে, বাদশাতে, বেনিয়া ব্রিটিশে
দালাল জমিদার, চৌধুরী, তালুকদার, রায়বাহাদুর, খানবাহাদুরে
আর আশরাফ কুলীনের বর্বর আঁতাতে দখল হয়েছিল সব
করায়ত্ত করছিল সব সম্পদ যশ, তিনভাগ মানুষের উপকথা ওসব
সাতানব্বই ভাগ মানুষ ইতিহাসে নিরুদ্দেশ।’’


জীবনকে নতুন করে বিনির্মাণ করতে তারুণ্যের বার্তা ‘লেট ট্রেন’ বহন করে এনেছে।


‘পিতার জন্য প্রার্থনা’, ‘লেট ট্রেন’-এর একটি মর্মছোঁয়া কবিতা। আমরা শঙ্খঘোষের ‘বাবরের প্রার্থনা’ পড়েছি। সেটি একরকম বার্তা বয়ে এনেছিল, আর এটি অন্য ধরনের। সন্তানের চোখে পরিবারের জন্য পিতার উদয়াস্ত পরিশ্রম, ব্যক্তিত্ব, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, প্রতিবেশি-আত্মীয়-পরিজন সকলের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণসহ অসংখ্য স্মৃতিময় দিক জেগে উঠেছে। এই আবেগ-অনুভব আরো তীব্র হয়েছে যখন কবি পিতার শেষযাত্রায় সামিল হতে পারেন নি। হৃদয়ভাঙ্গা সেই উচ্চারণ বা স্বীকারোক্তি আমাদেরকে কেমন যেন অবশ করে দেয়। যেমন—

‘‘পিতা আমি অক্ষম পুত্র একজন
আপনি আমায় ক্ষমা করবেন।
আপনার জানাযায় আমি শরিক হতে পারি নি
কফিনে মোড়ানো আপনার সুবাস
শেষবারের মতো শান্তির ঘুমের পবিত্র মুখটি
দেখা হয় নি আমার ’’

‘বাসনা মোহন প্রশস্তি’ কবি রচিত সুন্দর একটি প্রেমের কবিতা। পড়ার পর বুঁদ হয়ে বসে থাকতে ইচ্ছা করে। ইচ্ছা করে নিজের জীবনের গল্পগুলোর সাথে মিলিয়ে—গলা ফাটিয়ে দুনিয়াকে জানান দিতে যে, আমিও জানি ভালোবাসার রংধনুতে জীবন কত সুন্দর! যেমন, এই কবিতাটির অংশবিশেষ—

‘‘তুমি কেমন করে বারে বারে হও সুন্দর
একদিন গোলাপ ফুল তোমার হাতে দেখে
ভেবেছিলাম তুমি বুঝি গোলাপ কন্যে।
তুমি তো তা নও
তুমি যে বারে বারে এক এক রকম সুন্দর।
একদিন তুমি সুবাস ছড়াতে ছড়াতে গেলে
আমি ভাবলাম তুমি বুঝি আতর
তুমি তো তা নও।
কালো শাড়ির আঁচলে প্রজাপতি দেখে
তোমার তারিফ করে বলেছিলাম
প্রজাপতি মেয়ে আঁচল এত উড়াইওনা ধরা পড়ে যাবে।
তুমি হাসলে নিঃশব্দে নির্মল
বুঝলাম সুনয়না তুমি নীরব সুন্দর।’’

দ্রোহ ও চেতনায়, নরম মনের সংবেদনশীল প্রপঞ্চে কবি আপেল আবদুল্লাহ সবসময় ইতিহাসের রোদে, ঝড়-ঝঞ্জায়, ক্রান্তিকালে নিয়ত দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছেন। পিঠে দু’শ বছরের স্বাধীনতাহারা জীবনের তীব্র যন্ত্রণা তিনি অনুভব করতেন। পাঁচটি চতুর্দশপদীর সিরিজ ‘চাবুক চর্চিত পিঠ’। দু’শ বছরে জনপদের বিকাশের ধারা, অসংখ্য আর্তনাদ,  ভূ-লুণ্ঠিত সম্ভ্রম, লড়াই-সংগ্রাম ও বিদ্রোহ বয়ে গেছে। ‘চাবুক চর্চিত পিঠ’-এর দু’টি চরণে তার ভার বহন দেখে নিই—

‘‘পিঠে তুলে নেয় মাঝি শত বছরের ইতিহাস
প্রতুল সময় তার বোঝা পিঠে সঙ্গী মহাকাল।’’

এবার ‘কিশোরীর জন্য’ নামের একটি পুরো কবিতা তুলে ধরতে চাই। কবিতাটিতে হালকা চালে সহজ ভাষায় মনস্তত্ত্ব নিয়ে রচিত হয়েছে অপূর্ব বোঝাপড়া। একটা নির্দিষ্ট প্রজন্মের একটা নির্দিষ্ট সময়কাল কবির চোখে যেভাবে উদ্ভাসিত হয়েছে তারই একটি খণ্ডচিত্র ‘কিশোরীর জন্য’—

‘‘সকাল দশটার বয়সী
কিশোরীরাই খানিক ভালোবাসা জানে
হাতে ধরে থাকে শুদ্ধ সকালের চিঠি
বুকে উথাল পাতাল দুপুরের আমন্ত্রণ
কিশোরীরা কিশোরীই থাকে।

সকাল দশটার বয়সী
কিশোরীরাই খানিক ভালোবাসা জানে
চোখে চোখে বলে কথা মুখ খোলে নাকো
দুপুরে জানালা যার দেখায় বিনুনী
কিশোরীরা কিশোরীই থাক

সকাল দশটার বয়সী
কিশোরীরাই খানিক ভালোবাসা জানে
বুকের গোপন থেকে প্রথম পীরিতি
বাড়িগুলো ঘুম গেলে মাঝ রাতে টানে
কিশোরীরা কিশোরীই থাক

সকাল দশটার বয়সী
কিশোরীরাই খানিক ভালোবাসা জানে
সমর্পিত সারাক্ষণ কপোত জীবন
পোষ মানে হারে জিতে মাটির মতন
কিশোরীরা কিশোরীই থাক।’’

মতিহারের কিংবদন্তি কবি আপেল আবদুল্লাহর ‘লেট ট্রেন’ যখনই ছাড়ুক না কেন তাতে কবিতার কমবেশি ক্ষতি হয়েছে বা হয় নি। স্বদেশ, সমাজ, সমকাল, রাজনীতি, সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য, অর্থ-বাণিজ্য সংলগ্ন সর্বব্যাপ্ত ক্ষয়িষ্ণুতাকে ভেঙে জীবনকে নতুন করে বিনির্মাণ করতে তারুণ্যের বার্তা ‘লেট ট্রেন’ বহন করে এনেছে। এটা দেরিতে আসায় ক্ষতি তো কিছু হয়েছেই—আরো বই মানে আরো কবিতা। লেট ট্রেন দেরি করে আসায় আমাদের জন্য এই সুযোগ সংকুচিত থেকেছে। এখন লাইনে সবুজ সিগন্যাল দেখতে পাচ্ছি। আশা করছি, ইন টাইমে এখন থেকে ট্রেনগুলি আসতে থাকবে।

 

Firoz ahmad

শেখ ফিরোজ আহমদ

জন্ম ১ আগস্ট ১৯৬৩, চাঁদপুর।
অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : উন্নয়নকর্মী।

প্রকাশিত বই :
পাতকীর ছায়া [কবিতা, অন্তরীপ প্রকাশনী, বগুড়া, ১৯৮৭]
কালের পৃষ্ঠায় [প্রবন্ধ, যুক্ত, ঢাকা, ২০০৮]
মাতরিশ্বা [কবিতা, ভাষাচিত্র, ঢাকা, ২০১০]

ই-মেইল : firozbangla@yahoo.com
Firoz ahmad