হোম বই নিয়ে বৃষ্টি ও এলিজির বাইরের ইমেজারি

বৃষ্টি ও এলিজির বাইরের ইমেজারি

বৃষ্টি ও এলিজির বাইরের ইমেজারি
2.21K
0

কবিতা নিয়ে আলোচনা লিখতে বসলে চেক কবি মিরোস্লাভ হোলুবের একটা কথা মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন—‘কবিতা সম্পর্কে আলোচনার সময় কবিতা, শব্দ ও শব্দহীনতাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে অন্য কোথাও চলে যায়—কোনো সংরক্ষিত আশ্রয়স্থলে।‘ আশঙ্কা তাই থেকেই যায়। পরন্তু, নতুন শতকের কবিতা; সর্বদাই যা কিনা মূর্ত নয়!

কালিক বিচারে কবি হাসান রোবায়েত একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকের কবি। ‘ঘুমন্ত মার্কারি ফুলে’ তাঁর প্রথম কাব্য। একই সঙ্গে কাব্যপ্রচেষ্টাও। বইটা পড়তে পড়তে কবির মনস্তত্ত্ব বোঝার চেষ্টা করছিলাম। দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীর পটভূমিকায়, শহরের এককোণে , নিরালায় বসে, প্রায় বিচ্ছিন্ন যেন কেউ নিঃশব্দে কবিতা লিখছে! যিনি অবলীলায় বিষয়ের ভেতর চলে যেতে পারেন, ব্যক্তি-চরিত্রের মননের প্রক্ষেপকে বাদ দিয়ে নয়; বরং ব্যক্তির অনুভূতিকে বিষয়ের গভীরে সঞ্চারিত ক’রে। যেন বস্তুকে দেখা নয় বস্তুর ভেতর দিয়ে দেখা। যেখানে আবেগের উচ্ছলতা নয়, আছে সংহত আবেগের প্রকাশ। তা এমনি যে, পড়তে গেলে প্রথমেই মনে হয়— কবিতাটা আবেগবর্জিত, কিন্তু আশ্চর্য বাস্তবতা হলো—সংহত আবেগের মধ্যে দিয়ে তাঁর অধিকাংশ কবিতাই ‘অবয়বী’ হয়ে উঠেছে। যেমন পড়ি—

‘ব্রিজ পেরুলেই অন্য ঋতুর দেশ।
কেন যে তাঁবুগুলো আরেক নোভায়
বিদেশি বিন্দুর পাশে—
ট্রাফিকের বাঁশি হয়ে, কোড়ল হয়ে, ফুটছে ডুমুর তলায়
তুমি ও তোমার দিকে ইশারালিপির পাশে ডাক দেয়
ভোরে।’

[মা ও মায়াবন। পৃষ্ঠা ১১]


বস্তুত রোবায়েতের কবিতা ঐ ইশারালিপিই। সান্দ্র ও বহুস্তরসজ্জিত তাঁর ভাষা।


বস্তুত রোবায়েতের কবিতা ঐ ইশারালিপিই। সান্দ্র ও বহুস্তরসজ্জিত তাঁর ভাষা। প্রায়ই তাঁর রিদম, একটি বা দুটি ইমেজ, আর কিছু বিষয়, যা বারবার ফিরে আসে। স্যাক্সফোনের মতো চর্চা। কানকে পূর্ণতর করে রাখা, ছবি তোলার আলোকসম্পাতের মতো। এই তাঁর কাব্যসূত্র। তবে পড়তে গেলে সেই চিরচেনা কাব্যসূত্রের লেখাগুলোই এক-একটি গ্রিক পুরাণের সেই গোলকধাঁধা মনে হয়। সেখানে যে কেউ অনায়াসে জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে প্রবেশ করতে পারে; কিন্তু বাকি জীবন তাকে খুঁজে চলতে হয় বেরুনোর রাস্তা। রোবায়েতের কিছু কবিতার প্রতিবেশ এমনই আচ্ছন্ন। যেমন—

কী অসংখ্য চোখ
      উড়ছে
            নামছে

এলিজির বাইরে আর বৃষ্টি হলো না কোথাও!

[শ্রী মন]

 

দণ্ডিত পালকের নিচে সামান্য ময়ূর
তুমিও বয়ে যাও ধীরে।
ঠুমরি ফুলের কাছে সে দারিদ্র্য কী গভীর লাল !
একদা পোলের পাশে অবিকল ফুটে ওঠে
লাটিমের ঝিম।

বিমূর্তই ধর্ম যখন; জগতের সব জল ভিন্ন অধিকার।

[সামান্য ময়ূর]

এখানে ‘শ্রী মন’ কবিতাটির কথাই ধরা যাক। ‘এলিজি’ শব্দটি নিজেই শোকের প্রতিবেশকে ধারণ করে। বৃষ্টি তার যথাযোগ্য সমার্থক। তার মধ্যেও রোবায়েত লিখছেন—‘অসংখ্য চোখ/ উড়ছে/ নামছে !’ এ পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। কিন্তু আশ্চর্য হবার মতো উল্লম্ফন হলো, যখন বলা হচ্ছে— ‘এলিজির বাইরে আর বৃষ্টি হলো না কোথাও!’ কী বলা যায় এই বক্তব্যকে? স্যাটায়ার? থার্ড রিয়েলিটি? উইট? না, রোবায়েতের এই বক্তব্য, এই অ্যাপ্রোচকে প্রচলিত কোনো ট্রেন্ডে চিহ্নিত করা যায় না।

একদা উৎপলকুমার বসু বলেছিলেন—‘কবিতার বাস্তবতা যেন ভেঙে পড়ার জন্যই সৃষ্টি হয়।’ রোবায়েতের বেশকিছু কবিতার নেপথ্যের বাস্তবতা, দেখা যাচ্ছে—ভেঙে পড়ছে। পরন্তু অভিধানগত অর্থ থেকে একেকটি শব্দকে রোবায়েত কত যে ভিন্ন ও দূরবর্তী অর্থে প্রতিস্থাপন করেছেন, সেটা মুগ্ধ করে।

যদিও শব্দের প্রচলিত অর্থের বন্ধনকে ভেঙে ফেলার প্রচেষ্টা কবিতার ইতিহাসে নতুন কোনো ঘটনা নয়। পাশ্চাত্যে পল এলুয়ায়, টি.এস. এলিয়ট থেকে শুরু করে হোর্হে লুই বোর্হেস পর্যন্ত যেমন, বাংলা কবিতাতেও তেমন লক্ষ করা যায় গত শতকের আশির দশকে আবির্ভূত কয়েকজন কবির কবিতায়। বলতে দ্বিধা নেই, ‘ঘুমন্ত মার্কারি ফুলে’ তারই অংশীদারত্ব উজ্জ্বলভাবে বহন করছে।


জগতে আমরা যেভাবে নিজেকে উপস্থাপন করি বা যে ভূমিকায় অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত হই, সেটাই পারসোনা।


ভাষার সবচেয়ে জটিল, সংহত, তির্যক প্রকাশ থাকে কবিতায়। থাকে ‘উক্তি ও উপলব্ধির অদ্বৈত’ অর্থের সঙ্গে ধ্বনিজালের, ধ্বনির সঙ্গে দ্যুতিময় চিত্রের মিলনে ভাষার এক দ্যোতনাময় ইন্দ্রজাল রচিত হয় কবিতায়। শব্দের সৃষ্টির চৌহদ্দির মধ্যে বুঝিবা কবিতা এক স্বয়ংসম্পূর্ণ জগৎ; বলা ভালো ‘ total complex’। রোবায়েতের কবিতার টোটাল কমপ্লেক্স অর্থের দ্যোতনাকে ভেঙে এগিয়ে যেতে চায় আরো অন্য কোনো দূরবর্তী অর্থের দ্যোতনায়। যেমন—‘লোকটা কোনোদিন পার হতে পারছে না কলিংবেল।’ ‘ক্রাচ’ কবিতায় দেখা যাচ্ছে ‘বসন্ত জুম করা নদী’। ‘ফুল’ কবিতায় আছে ‘কোথাও ভেঙে পড়ছে শিউলির ঘ্রাণ।’ ‘কপারের স্মৃতি’ কবিতায় দেখা যাচ্ছে ‘দূরে, পাতা নড়ে হিংসার চেয়েও ধীরে।’ হিংসা কি দেখা যায়? তার গতি-প্রকৃতি? ধীর নাকি দ্রুত? মূলত এইভাবে উপলব্ধির জগতে রোবায়েত আমাদের টেনে নিয়ে যান। আক্রান্ত করেন। যেখানে মূর্ত ও বিমূর্ত একাকার হয়ে গেছে। ভাষা ও উপলব্ধি গড়ে তুলেছে যৌথ অবচেতনের একান্ত অন্তর্গত জগৎ। সে জগতের স্মৃতি, কল্পনা, সংশয়, ইচ্ছা এবং ঘোর আমাদেরকে একীভূত করে। তাড়না যোগায়। যে জগতের কেন্দ্রীয় বিষয় ‘আর্কিটাইপ’। ইগো, স্যাডো, এনিমা, আর এনিমাসের পাশাপাশি পারসোনা তার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এর সরল অর্থ ‘মুখোশ’; জগতে আমরা যেভাবে নিজেকে উপস্থাপন করি বা যে ভূমিকায় অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত হই, সেটাই পারসোনা। কেউ কেউ বলে পারসোনা হলো তা-ই যা আমরা নিজস্বতা প্রমাণের জন্য ক্রমাগত ভান করি। বলা যায়, সমাজ এবং নিজের সঙ্গে এক ধরনের বোঝাপড়া। রোবায়েতের কিছু কবিতায় সেই ‘বোঝাপড়া’ বেশ বোঝা যায়। ‘ডিলেমা’ তার একটি। লিখেছেন—‘কেউ কি সমুদ্রে বসে ভান করে ঢেউয়ের!’

13446032_1123404707682949_1560942005_o
প্রকাশন : চৈতন্য ।। প্রচ্ছদ : রাজীব দত্ত

এত এত মুগ্ধতার পরও, ‘ঘুমন্ত মার্কারি ফুলে’ পড়তে পড়তে কিছু প্রশ্নও উঠে এল। সন্দেহ নাই, শব্দ-সংশ্লেষের ক্ষেত্রে রোবায়েত সিদ্ধহস্ত। অনেক ক্ষেত্রেই দুটি বিপরীত কিংবা দূরবর্তী শব্দকে তিনি পাশাপাশি বসিয়ে দিয়েছেন। যেমন—‘মর্মরবিতান’, ‘বিদেশিবিন্দু’, ‘মর্মপরিখা’, ‘শিসজাতক’, ‘রক্তট্রায়াল’, ‘বন্ধনশ্বাস’, ‘চিরদূর’, ‘চিরকরবীর দেশ’, ‘তীরবিতান’ প্রভৃতি। বলাবাহুল্য শব্দের এই ডি-কন্সট্রাকশন বা ভাষার কংক্রিটাইজেশন কাব্যের নতুন অভিনিবেশ সমৃদ্ধ করে। কিন্তু পৃথিবীর সব মহৎ গ্রন্থই কিন্তু এক ধরনের কোমল আবেশকে স্বীকার করে। ধারণ করে। জার্মান দার্শনিক হাইডেগার বলেছিলেন—‘ভাষা কবিতার উপাদান নয়। কবিতাই ভাষাকে সম্ভবপর করে।’ হাইডেগারের বক্তব্য নিয়ে তর্ক হতে পারে। কিন্তু এটাও সত্য যে, কবিতাকে মানুষের মুখাপেক্ষী হয়ে উঠতে হয়। কেননা সব সৃষ্টিতত্ত্বেই কিন্তু ‘প্রাণ’ প্রতিষ্ঠার কথা বলা আছে। রোবায়েতের কবিতায় সেই কোমল আবেশ এবং প্রাণ যাই বলি না কেন, তারই অভাব। পরন্তু কয়েকটি শব্দের প্রয়োগ ও অ্যাসথেটিকস নিয়েও প্রশ্ন জাগল। যেমন—‘রোশনি আক্তার’ কবিতায় আছে ‘একটা টস করা কয়েন’ বা ‘জংশন’ কবিতায় আছে, ‘সেইসব ডিটেইল।’ কিন্তু কবিতার ক্ষেত্রে তা বোধ করি আরো বিকল্প কিছু হতে পারত। আরো ব্যঞ্জনাময়। তারপর বলব—এক ধরনের রিপিটেশন বা পুনরাবৃত্তির কথা। যেমন—

‘কোথাও সমুদ্র আছে বলে শুরু হয় রোলকল’ [ভাষা]

‘কোথাও কোনো গল্পে হয়তো পেকে আছে লুব্ধ দৃষ্টির প্রতিবেশী’ [নব]

কিংবা

‘কোথাও শূন্যতা নেই’ [শূন্য]

অথবা

‘কোথাও ভেঙে পড়ছে শিউলির ঘ্রাণ’ [ফুল]

কবিতার ভেতরে অনিশ্চয়তা, সংশয় থাকাটা দোষের কিছু নয় নিশ্চয়। সমস্যা হলো, একটি বইয়ে এমন অ্যাপ্রোচ বারবার আসাটা কিছুটা দৃষ্টিকটু বৈকি !

একটি কবিতা (ঘূর্ণ্যমান দেরাজের গান) বাদ দিলে বাকি ৩৬টি কবিতার ক্ষেত্রে রোবায়েত প্রচলিত কোনো ছন্দের আশ্রয় নেন নি। তবে তাঁর কবিতার আলাদা একটি সুর আছে, বোঝা যায়। সেটা অক্ষরবৃত্তের আশেপাশে।

‘ঘুমন্ত মার্কারি ফুলে’র কবিকে অভিনন্দন।

 

সজল সমুদ্র

সজল সমুদ্র

জন্ম ১ সেপ্টেম্বর ১৯৮২, নাগেশ্বরী, কুড়িগ্রাম, বাংলাদেশ। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : শিক্ষকতা।

প্রকাশিত বই :
পত্রে রচিত ভোর [কবিতা, ২০০৫, চিহ্ন]
ডালিম যেভাবে ফোটে [কবিতা, ২০১৪, চিত্রকল্প]

ই-মেইল : sajalsomudro39@gmail.com
সজল সমুদ্র