হোম বই নিয়ে ফুটে আছে গ্রন্থিল থোকা-থোকা ভাষা

ফুটে আছে গ্রন্থিল থোকা-থোকা ভাষা

ফুটে আছে গ্রন্থিল থোকা-থোকা ভাষা
1.28K
0

আন্দালীবের কবিতার সাথে আমার প্রথম পরিচয় ভারতীয় একটি অনলাইন সাহিত্যের কাগজের মাধ্যমে। তখন আমি কবিতার ছাত্র; এখনকার চেয়েও কাঁচা। তো সেখানে দেখলাম আন্দালীব নামের এই তরুণ কবিটি বাংলাদেশের। আমি কিছুটা অবাক হয়ে যাই। বাংলাদেশের কবিতার সাথে তার কবিতাকে মেলাতে পারি না। শব্দব্যবহার একদম অন্যরকম, যত্রতত্র ইংরেজি; অনেক শব্দ ছিল দুর্বোধ্য; কিন্তু অদ্ভুত রকমের সাবলীল। তখন মনে হয়েছিল, আন্দালীবের সমস্ত খেলা এবং যুদ্ধ শব্দ-নিয়ে; শব্দ নিয়ে নানা কসরৎ করতেই তিনি ভালোবাসেন।


শব্দ তার তরবারি, সামনে থাকে বলে আগে চোখে পড়ে, কিন্তু তার নিরীহ ঢাল হলো চিন্তা-ভাবনা ও বোধের বিস্তৃতি—এটিই হয়তো সময়ের পর সময় তাকে কবিতার ময়দানে জিইয়ে রাখবে। 


ভাবতাম তার নানা নিরীক্ষা স্রেফ শব্দেই। আস্তে আস্তে টের পেলাম, শব্দ আন্দালীবের বর্ম; বরং তিনি যুদ্ধ করেন অন্যান্য অনুষঙ্গ দিয়েই। শব্দ তার তরবারি, সামনে থাকে বলে আগে চোখে পড়ে, কিন্তু তার নিরীহ ঢাল হলো চিন্তা-ভাবনা ও বোধের বিস্তৃতি—এটিই হয়তো সময়ের পর সময় তাকে কবিতার ময়দানে জিইয়ে রাখবে। আস্তে আস্তে আন্দালীব নামের মানুষটি ধীরে ধীরে ঢুকে যেতে থাকেন আমার মগজে। এরপর একদিন জানা গেল, এই তরুণটি শুধু বাংলাদেশের কবিই না, ঢাকাতেই থাকেন তিনি। এরকম একটি অবস্থায়ই হাতে পেলাম বৃশ্চিকসূর্যের নিচে; ২০১১ থেকে ২০১৫-এর মধ্যে লিখিত কবিতাগুলিকে মলাটবন্দি করেছেন আন্দালীব। আমার জন্য বহুল আরাধ্যই ছিল সেই মলাট দুইটির অভ্যন্তরস্থ কবিতাগুলি।

কার পদচিহ্ন ধরে আমরা পৌঁছুব
ন্যায়পরায়ণ সিংহের আস্তানায়?
আমাদের তো সুনির্দিষ্ট রাস্তা জানা নেই।
জানা আছে মন্দ্রপাহাড়, কলারবোন
ভেঙে ফেলার অস্ফুট শব্দ। এরচে’ বরং
ঘুমন্ত হরিণ ছানাদের জাগিয়ে তোলা যাক।
…হাঁটতে-হাঁটতে
ভেঙে ফেলা যাক জঙ্গলের সমস্ত আইন।
[জঙ্গল]

মন্দ্রপাহাড়, কলারবোন ভেঙে ফেলার অস্ফুট শব্দ অনুসরণ করে কিভাবে পৌঁছুনো যায় ন্যায়পরায়ণ সিংহের আস্তানায়—বলতে বলতে আমরা শুনতে পাই আন্দালীবের নির্মোহ স্বর, এরচে’ বরং ঘুমন্ত হরিণ ছানাদের জাগিয়ে তোলা যাক। এরপরেই তিনি বলেছেন জঙ্গলের সমস্ত আইন ভেঙে ফেলার কথা। আমরা টের পাই, এই জঙ্গল রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে আমাদের বাসযোগ্য শহরে, আমাদেরই পৃথিবীতে। সমস্ত সিস্টেম ভেঙে ফেলার গোপন ইচ্ছে আমাদেরও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে তখন। এমন বেশ কিছু কবিতা, কিংবা কবিতাংশ পাওয়া যাবে আন্দালীবের কবিতায়, যারা অতিমাত্রায়ই সংবেদনশীল। এবং সেসব সংবেদনশীলতা পরবর্তীতে সংক্রমিত করে পাঠককে। আপাতদৃষ্টে যাকে কখনো কখনো মনে হতে পারে শব্দের বাহুল্যমণ্ডিত, অথচ একটু মনোযোগ দিলেই সেখানে খুঁজে পাবেন শ্লেষ, খুঁজে পাবেন প্রেম, ঘৃণা। পাবেন আনন্দ, বিষণ্নতা, বিরহ।


আধুনিক কবিতা দুর্বোধ্য, পরাবাস্তবতার ওপরে ভর করে তা পাঠক থেকে সহস্র মাইল দূরে সরে যাচ্ছে।


13453124_1123404557682964_1941165004_o
প্রকাশন : চৈতন্য ।। প্রচ্ছদ : নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

আধুনিকের যুগ পার করে আমরা প্রবেশ করেছি উত্তরাধুনিকে; শুনছি সেটাও পার করে ফেলেছি আমরা। অন্য কোন যুগে প্রবেশ করছি কে জানে! আমার কাছে আধুনিক শব্দটিকেই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য এবং আধুনিক মনে হয়। আধুনিক একসময় পুরনো হয়ে যায়, সেখানে নতুন করে আসে আরেক আধুনিক, আবার সেটিকে অস্বীকার কিংবা স্বীকার করে সৃষ্টি হয় অন্য আরেক আধুনিকের। পূর্বের আধুনিকগুলো ক্রমশ পুরাতন হয়ে যেতে থাকে। এর মধ্যে কেউ কেউ সময়কে অতিক্রম করতে পারেন। যারা পারেন তারাই টিকে যান, যতটুকু সময়কে ছুঁতে পারেন, ততটুকু সময় পর্যন্ত। ধান ভানতে শিবের গীত না গেয়ে আবার মূল পয়েন্টে আসি। আধুনিক কবিতার বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে ইদানীং, যেমন : আধুনিক কবিতা দুর্বোধ্য, পরাবাস্তবতার ওপরে ভর করে তা পাঠক থেকে সহস্র মাইল দূরে সরে যাচ্ছে। এইসব অভিযোগ মাথায় নিয়ে কবিরা লিখে যাচ্ছেন আধুনিক কবিতা। পাঠক নিজে যথেষ্ট প্রস্তুত হচ্ছে না, অথচ কবিরাও তাদের কাছে যাওয়াকে পুরোপুরি অস্বীকার করতে পারছে না, আবার হালকা স্বরে লিখতেও পারছে না—এমন কিছু দ্বিধাময়তার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলা কবিতা।

এই দ্বিধাসঙ্কুল পরিবেশেই কবিদের মধ্যে ভর করছে আরও পরাবাস্তবতা, আরও দুর্বোধ্যতা। রূপক, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্পের দোহাই দিয়ে সত্যিকার অর্থে কষ্টকল্পিত কিছু জিনিসেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে বাংলা কবিতা। আর পাঠকও একধরনের প্রস্তুতি নিয়েই রেখেছেন এই কবিতা সম্পর্কে। অনেকটা ব্যাটসম্যান যেমন আগে থেকেই অনেক সময় প্রস্তুত হয়ে থাকেন বড় শট হাঁকানোর, কিংবা আগেই ডিফেন্স করার। ক্রিকেটবোদ্ধা মাত্রই জানেন, আগাম এ ধরনের প্রস্তুতির ফল কখনোই ভালো হয় না। কবিতাতেও বর্তমান পাঠক এ ধরনের কিছু প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। ফলে সত্যিকারের ভালো বলে মারতে গিয়ে তারা অহরহ বোল্ড হয়ে যাচ্ছে, কিংবা কট বিহাইন্ড হয়ে ফিরে যাচ্ছে (পড়ুন ভালো কবিতা থকেও তারা বঞ্চিত হয়ে ফিরে যাচ্ছে পুরনো ডেরায়)। সত্যিকারের উপমা তারা বুঝতে পারছেন না, রূপক ধরতে পারছেন না। ইঙ্গিতকে ভাবছেন বোবার ব্যর্থ প্রচেষ্টা। এবার আন্দালীবে ফেরত আসি :

এত কেন ঘোড়া দাবড়াচ্ছো হে তর্কবাগীশ? তোমার দিকেই
চেয়ে আছে যখন আগ্নেয়াস্ত্র সুন্দর!…
[ট্রিগার হ্যাপি]


অনেক গল্প আন্দালীব ঢেকে দিতে সক্ষম হয়েছেন কবিতার মোড়কে। তার কবিতায় প্রেম আছে, সেখানে এক ধরনের অস্থিরতাও দেখতে পাই আমরা।


‘বৃশ্চিকসূর্যের নিচে’র প্রথম কবিতাটিই শুরু এভাবে। এই কবিতার শেষে যখন বলছেন, ‘কিছু দেখলেই লোকে বলছে—ফায়ার!’ এখানে কোনো দুর্বোধ্যতা নেই। আছে রূপক, ইঙ্গিত। আমাদের নিজেদের গল্পই শোনা যাচ্ছে এখানে। এমন অনেক গল্প আন্দালীব ঢেকে দিতে সক্ষম হয়েছেন কবিতার মোড়কে। তার কবিতায় প্রেম আছে, সেখানে এক ধরনের অস্থিরতাও দেখতে পাই আমরা। সম্ভবত এই অস্থিরতাই তার কবিতার প্রেমকে কবিতা হিশেবে আরও আঁটসাঁট করে তোলে, রহস্যময় এবং ইঙ্গিতময় করে তোলে। অবশ্য এক ধরনের মিস্টিরিয়াস ঘরানার দিকে আন্দালীবের ঝোঁক সবসময়েই লক্ষণীয়।

আমার অসুখ হলে কেউ জানে না
প্রতিবার কী আনন্দে কেঁপে ওঠে মধ্যহ্রদ।
…আমার অসুখ হলে কেউ জানে না
একটা টি-ব্যাগ
কী ঝলমলে আলো ছড়ায়!
[আমার অসুখ হলে]

কিংবা এটিও পড়া যায় :

এই চাঁদ হারাবেই। তাকে আর কাছে পাবে না।
যৌনতা জাগানিয়া গাছের বিস্তার পেরিয়ে
সবকিছু একদিন শূন্যতায় ডুবে যাবে।
তুমি দেখবে না আর কারো চিবুকের তিল,
দেখতে পাবে না ক্ষতচিহ্নেরা কেমন সন্তর্পণে
বেড়ে উঠছে!
[বিমর্ষ ছায়ার ভ্যালি]

কখনো কখনো আন্দালীবের কবিতা যথেষ্ট যান্ত্রিক মনে হয়। কঠোর মনে হয়। অন্তত আমাদের চেনা পথের তো মনেই হয় না। আন্দালীবও সম্ভবত নিজেকে এভাবে প্রকাশ করতেই অভ্যস্ত। তবে হঠাৎ করে যখন যান্ত্রিকতার বর্ম ভেদ করে উঁকি দেওয়া মসৃণ শরীর আবিষ্কার করি, যখন দেখি আমাদেরই গন্তব্যে তিনি আরও দ্রুত পৌঁছে গেছেন তার বাহনে, তখন মনে হয় আন্দালীবের মুন্সিয়ানাই এই ভঙ্গি। এই ভঙ্গিতেই তিনি সর্বাপেক্ষা সাবলীল। আবিষ্কারের পর আমরাও তাকে এই ভঙ্গিতেই চাইব। তিনি শোনাবেন তার নিজস্ব স্বপ্নের কথা, আমরা শুনব যে আমাদের স্বপ্নের কথাই আসলে তিনি বলছেন।

কাউকে বলি নি স্বপ্নের কথা। ধেয়ে আসা হারপুনের কথা।
তবু সকলেই জানে তরঙ্গবিলাপ। জানে এ মোহন মৃত্যুবাণ
রচনা করছে কারা।
[স্বপ্নের কথা]


হাওয়ালেখ সিরিজের কবিতাগুলোকে এই গ্রন্থের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কবিতা মনে হয়েছে। দশটিই অসাধারণ।


তিনি শোনান আমাদের বাগানে ফুটে থাকা গ্রন্থিল থোকা-থোকা ফুলের কথা। বাফেলো-শিংয়ের মতো বাঁকানো, শারীরিক শৌর্যের কথা। সেসব বর্ম ভেদ করে আমরা শুনি আমাদের ভাষার কথা। পরিহাসতরল কথার সমুদ্রে ডুবে থাকা পৃথিবীর তলদেশের কথার গুঞ্জরন। তার চোখে আমরা দেখি শীতকাল, তার স্নায়ুতে আমরা টের পাই রোষতপ্ত হাওয়ায় মন্দ্রধ্বনির বাঘের নেমে আসার শঙ্কা। প্রতিটি কবিতাই আলাদা আলাদা সব অনুভূতি দিতে থাকে আমাদের, ঘোরগ্রস্ত করে। আর অদ্ভুত ঘোর আর মায়া নিয়ে আমরা হেঁটে বেড়াতে থাকি বৃশ্চিকসূর্যের নিচে

হাওয়ালেখ সিরিজের কবিতাগুলোকে এই গ্রন্থের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কবিতা মনে হয়েছে। দশটিই অসাধারণ। আর আন্দালীবের নিজস্ব যে স্বর তৈরি হয়েছে এতদিনে, এই কবিতাগুলিই মূলত তার সুস্পষ্ট সাক্ষ্য বহন করে। পারলে পুরো বইটিই তুলে দিতাম। অন্তত হাওয়ালেখ সিরিজের কবিতাগুলি। কিন্তু মুগ্ধতার জন্য আলোচনা কিংবা কবিতার অংশবিশেষ পাঠ পাপ, বরং কবিতার গ্রন্থটি পড়াই উৎকৃষ্ট। তারচে বইটি থেকে প্রিয় কিছু পঙ্‌ক্তি তুলে দিচ্ছি :

● হারিয়ে যাওয়া মানুষের মুখ কী কারণে অমন নক্ষত্রসংকাশ
● মানুষের চামড়ায় মোড়ানো/ শোকবই পড়ে জেনেছি—/ জগতে তুমিই সুন্দর,/ বাকি সব উৎকট, মিথ্যে
● বাতাসের গায়ে ছড়িয়ে আছে অশেষ/ য়ুকালিপ্টাস রেণু। বিষণ্ন পৌরকর্মীর দল আনমনে সেইসব/ বোতলে ভরছে।
● মানুষ জেনে গেছে পতনের শব্দ মূলত জাগতিক সংকেত এক পুনরায় জেগে ওঠার
● জিরাফের উচ্চতা থেকে লাফিয়ে নামছে/ ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার
● হরতনের রানী/ আজ কার তরে রাজদণ্ডখানি বিলিয়ে দিচ্ছে!

শূন্য দশকের কবিসংখ্যা কমতে কমতে প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। এই বিপন্নতার মধ্যেও আন্দালীবের কবিতা তার নিজ বৈশিষ্ট্য নিয়ে জ্বলজ্বল করছে। বিচিত্র স্বাদ এবং বর্ণ নিয়ে তিনি এখনো উপভোগ করছেন কবিতাকে; নানা বৈচিত্র্যময় বৃশ্চিকসূর্যের নিচে’ই তার প্রমাণ। এইসব বৈচিত্র্যময়তার মধ্যে একটি শব্দ শুধু বেশি চোখে বিঁধে আছে : হরিণ। এই প্রাণীটির প্রতি কবির আলাদা কোনো দুর্বলতা আছে সম্ভবত। কামনা করছি ‘রেঙ্গুন থেকে আসা বিষণ্ন তারার আলোয় অমরতার লোভে পৃথিবীর ছাত থেকে চন্দ্রাহত মানুষেরা একদিন একে-একে সমুদ্রে ঝাঁপ দেবে’—আন্দালীবের বইয়ের এই শেষ পঙ্‌ক্তিতে লুকায়িত কামনা পূর্ণ হোক।

রাসেল রায়হান

রাসেল রায়হান

জন্ম ৬ ডিসেম্বর, ১৯৮৮; বাগেরহাট। ঢাকা কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে মাস্টার্স। বর্তমানে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কর্মরত।

প্রকাশিত বই:
সুখী ধনুর্বিদ [কবিতা; প্লাটফর্ম, ২০১৬]
বিব্রত ময়ূর [কবিতা; প্রথমা, ২০১৬]

ই-মেইল : rasahmed09@gmail.com
রাসেল রায়হান