হোম গদ্য পাঠকের চোখে : অতীত একটা ভিনদেশ

পাঠকের চোখে : অতীত একটা ভিনদেশ

পাঠকের চোখে : অতীত একটা ভিনদেশ
679
0

‘আমি মেনে নিয়েছি দাদির ভার্সনটা—দাদির ধারণা, মজ্জেল বাঁশিতে ফুঁ দিতে না পেরে দম আটকে মারা গেছে!’—কথাটি; কিংবা ‘বাঁচে বাঁচে, গরীব মরে গেলিই বাঁচে—কান্না মিশিয়ে উত্তর দেয় নানি।’—কথাটি; অথবা ‘আল্লাহ আর ভগবান এক আকাশেই থাকেন, সমস্যা যত সব মাটিতেই!’—এই কথাটি, কথাগুলো, যে আপাত সরল কথা, তাতে সন্দেহ কী! কিন্তু এমন নিঃসন্দেহ সরলতার মাঝেই যে নিহিত আছে বহুকৌণিকতা, তা কথাসাহিত্যিক জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের চোখে ধুলো দিতে পারে নি। তিনি ঠিকই ধরে ফেলেছেন আর বলেছেনও :

মোজাফ্‌ফর-এর গল্পের আপাত সরল কাঠামো, সাবলীল বর্ণনাভঙ্গি পাঠককে দ্রুত গল্পের ভুবনে প্রবেশ করিয়ে দেবে যদিও সামান্য সময় পার হলেই তিনি সম্মুখীন হবেন নানা সম্ভাবনার, বহুকৌণিক গল্পজগতের। সচেতন পাঠক সেটিকে পরাবাস্তব, জাদুবাস্তববাদ বা অতি-আধুনিক গল্পের জগৎ—যে-নামেই চিহ্নিত করুন না কেন গল্পের পাঠতৃপ্তি কী পাঠযোগ্যতা বিন্দুমাত্র ব্যাহত হয় না তাতে।


যে ব্যস্তসমস্ত ব্যক্তি এই গ্রন্থের অন্তত প্রথম গল্প ‘বাঁশিওয়ালা মজ্জেল’ পড়বেন, পরের গল্পগুলো পড়ার সময় তিনি নিজেই বের করে নেবেন।


হ্যাঁ, গল্পকার মোজাফ্‌ফর হোসেনের গল্প নিয়েই আমাদের এই আলাপ। আর এ আলাপটা তার অতীত একটা ভিনদেশ গল্পগ্রন্থটি নিয়েই চলুক! সম্প্রতি বইটি ‘এক্সিম ব্যাংক-অন্যদিন হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করায় বইটি সম্পর্কে সম্ভবত বহুসংখ্যক পাঠক ইতোমধ্যে জেনে গেছেন। তাই আমি যা-ই বলি না কেন, সবটাই হয়তো হবে নতুন বোতলে পুরনো মদের মতো। তারপরও বাংলাসাহিত্যের সম্ভাবনাময়ী এই নিরীক্ষক গল্পকারের গল্পগুলো আমার ভেতরে যে-শব্দব্যঞ্জনা বাজিয়েছে, যে-অনুরণনে অনুরণিত হচ্ছে আমার অন্তরাত্মা, তার প্রকাশ না-করেই-বা থাকি কী করে! তাই তো আমার পাঠতৃপ্তি থেকেই বলছি—যে ব্যস্তসমস্ত ব্যক্তি এই গ্রন্থের অন্তত প্রথম গল্প ‘বাঁশিওয়ালা মজ্জেল’ পড়বেন, পরের গল্পগুলো পড়ার সময় তিনি নিজেই বের করে নেবেন। কথাসাহিত্যিক জাহানারা নওশিন এই বইয়ের যে-নিগূঢ়তাকে বলেছেন ‘যেন দেহহীন লাবণ্য বিলাস’, সেই নিগূঢ়তাই যেকোনো গল্পপাঠককে ‘অতীত একটা ভিনদেশ-এ পাঠনিবিষ্ট রাখতে সক্ষম। এ আমি হলফ করে বলতে পারি।

‘কী এমন আছে সেই গল্পে?’—এ প্রশ্নটা আমারও; উত্তরটা আমিও খুঁজছি। আপাত দৃষ্টিতে দেখা যায় গল্পটা দাঁড়িয়ে আছে একজন বাঁশিওয়ালার বাঁশি বাজানোকে ঘিরে। তবে এর মূল সুর যে সময়ে অন্তর্লীন, শেকড় যে সুগভীরে প্রোথিত, তা সচেতন পাঠক মাত্রই টের পান। যে-মানুষটি একরাত অসুস্থ হলে, বাঁশি শুনতে পাবে না বলে, যে-গ্রামবাসীরা একসময় বিচলিত হয়ে পড়ত, দূর থেকে কবিরাজও ডেকে আনত, সে-গ্রামবাসীই কোনো এক সাফি হুজুরের ফতোয়ায় একজোট হয়ে সে-মানুষটিরই বাঁশি বাজানোর অধিকার কেড়ে নেয়! এমনকি গ্রাম থেকেও তাড়িয়ে দেয় সেই মানুষটিকে। তাড়ানোর দু-বছর বাদের এক প্রচণ্ড গরমপড়া দিনে মজ্জেলের লাশ পাওয়া যায় কথকদের ব্যাঙগাড়ির মাঠের শ্যালো মেশিনের কাছে। ‘লোকমুখে মৃত্যুর কত কারণ শুনেছি—কোনো একটা ঠিক ছিল হয়তো, কিংবা কোনোটাই না।—আমি মেনে নিয়েছি দাদির ভার্সনটা—দাদির ধারণা, মজ্জেল বাঁশিতে ফুঁ দিতে না-পেরে দম আটকে মারা গেছে! মৃত মজ্জেলকে দেখতে যেতে আমার মন সায় দেয় নি। ওর লুঙির কোঁচরে বাঁশিটা গোঁজা ছিল, আর কিছু ছিল না সঙ্গে—যারা দেখতে গিয়েছিল তাদের মুখে শোনা।’ আর সেই বাঁশির সুর শুনেই সেদিনের প্রায় পনের বছর পরে, কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের এক পরাবাস্তব জগতে, মজ্জেলের সঙ্গে দেখা হয় কথকের। ‘মজ্জেলই আমাকে প্রথম চিনল, তাও চাঁদনি রাতে একসমুদ্র আলোয় আমার কাঁপা কাঁপা অবয়ব দেখে।’ তাদের মধ্যে কথা হয়; অতীতের কথা, ভিনদেশের কথা। তারপর ‘আমরা আর কেউ কোনো কথা পাড়ি না। সহসা দুজন যেন দুটো প্রাচীন বৃক্ষের ন্যায় অসংখ্য ঘটনার সাক্ষী হয়ে প্রায় কোনো ঘটনাকেই আর ঘটনা মনে না করে নির্বিকার বসে থাকি। মাথার ওপর দিয়ে রোজকার মতো পথ কেটে কেটে নিঃশব্দে বাড়ি ফেরে একথালা চাঁদ। সমুদ্র শেষবারের মতো পাড়ে গুটিয়ে যেতে থাকে। ভাটা যে কেবলই ভাটা নয়, বিশাল সমুদ্রের ছোট হয়ে যাওয়ার চেষ্টা, সিসিফাসের সেই ব্যর্থ চেষ্টার নামান্তর তা আর ক’জনই বা বোঝে!’ সত্যিই তো, আমরা ক’জনই-বা বুঝি সেই সত্য? তবে পাঠ শেষে যেটুকু বুঝি : সমৃদ্ধ বাংলা ছোটগল্পে ‘বাঁশিওয়ালা মজ্জেল’ গল্পটি একটি অনবদ্য সংযোজন। এ-গল্পগ্রন্থেই এমন অন্তত আরেকটি গল্প আছে, সেটি হচ্ছে : লাশটি জীবিত লাশের। অতীত একটা ভিনদেশ সম্পর্কে কথাসাহিত্যিক স্বকৃত নোমান মন্তব্য করেছেন :

গল্পকে কিভাবে গল্প করে তুলতে হয় সেটা মোজাফ্‌ফরের জানা। তার লেখার হাত আছে, দেখার চোখ আছে। বইটির অন্তত চারটি গল্পের নাম করা যায়, যা সমকালীন গল্পগুলোর চেয়ে আলাদা। আলাদা বৈশিষ্ট্যের।

‘লাশটি জীবিত লাশের’ গল্পের বাস্তবতায় জাদুবাক্য বুনেছেন গল্পকার মোজাফ্‌ফর হোসেন। বায়ানভঙ্গি বেশ সাবলীল; অথচ কী অবলীলায়-না তিনি উন্মোচন করে দিয়েছেন আমাদের উন্নয়নশীল দেশের হালচাল; তৃতীয় বিশ্বে দারুণভাবে প্রভাবশালী ত্রিমুখী শক্তির—কর্পোরেট শক্তি, আমলাতান্ত্রিক শক্তি এবং মিডিয়াশক্তি’র—স্বরূপ। ‘অবশেষ সরকারিভাবে লাশটি দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। পরদিন লাশটির পরিবারের দাবি-দাওয়া নিয়ে বাম ছাত্র সংগঠন, মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন, লেবার ইউনিয়নের একটা খণ্ডাংশ রাজপথে দাঁড়িয়েছে। টক শোতে বুদ্ধিজীবীরা এর চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন। এর আগে এ ধরনের যত ঘটনা ঘটেছে সেগুলো টেনে এনে এর ঐতিহাসিক ডিসকোর্স চলছে। লাশটির পরিবারের নারীগুলোকেও টেলিভিশনে ডাকা হয়েছে। মুখে পাউডার লাগিয়ে পর্দার সামনে কান্নাকাটি করছে তারা। সত্যিই কাঁদছে নাকি কাঁদতে হচ্ছে, সেটি বোঝা যাচ্ছে না। একসময় তাদের কান্না কেউ শোনে নি, এখন গোটা দেশবাসী শুনছে। তাই কান্নাটা যাতে ভালো দেখায় সেদিকে সতর্ক থাকতে হচ্ছে। তাদের স্ক্রিপ্ট মুখস্ত করিয়ে সেটের সামনে আনা হচ্ছে। একেকটি চ্যানেলের স্ক্রিপ্ট আবার একেক রকম, একেক রকম এজেন্ডা তাতে। অত সব না বুঝে, হাতে কটা নগদ টাকা পেয়েই খুশি থাকতে হচ্ছে লাশটির পরিবারকে। সরকার থেকেও দুটো ছাগল দেয়া হবে বলে ঘোষণা এসেছে।’….’লাশটির পরিবারের শেষ অবস্থার কথা জানিয়েই গল্পটির ইতি টানছি। তারা এখন নিজ বসতভিটায়—সর্বস্বান্ত হয়ে পথে বসার অবস্থায়। টাকা পয়সা যা কিছু হয়েছিল, দুর্বৃত্তরা বাড়ি ঢুকে ছিনতাই করে নিয়েছে। অস্ত্রের মুখে ধর্ষণ করেছে লাশটির বউকে, গণধর্ষণ। বাকি তিনজন নারী ধর্ষণের অনুপযুক্ত বলে মন খারাপ করে দৃশ্যপট ছেড়েছে নিরুপায় দুর্বৃত্তরা। এসব খবর অবশ্য জনসম্মুখে আসে নি। কারণ, কথিত দুর্বৃত্তরা এক অদৃশ্য ক্ষমতাবলে গায়েব করে দিয়েছে লাশটির পরিবারের অবশিষ্ট গল্প।’—এমন সাবলীলতায় যা ফুটে উঠেছে তা সুকৌশলে সরিয়ে দিয়েছে আমাদের নগ্নতাঢাকা চাদর। এ-গল্পের একেকটি বাক্য, এমনকি একেকটি শব্দও, লেখক এমনভাবে ব্যবহার করেছেন, যাতে এক গল্পের জমিনে গজিয়েছে আরো শত না-বলা গল্প। অঙ্কুরোদ্‌গম ঘটেছে এ-সমাজের আসল চেহারার; মানবসৃষ্টির কাছে মানবসত্তার অসহায়ত্বেরও। একজন গল্পপাঠক হিশেবে আমি বলব : বর্তমান সময়ের কতিপয় সেরা গল্পগুলোর একটি ‘লাশটি জীবিত লাশের’ গল্পটি। তাই গল্পটি বিস্তর ব্যাখ্যাত হবার দাবি রাখে, যে-দাবি পূরণ হবে আমাদের সাহিত্যবোদ্ধাগণের কলমে, এ প্রত্যাশা পাঠকের।


অতীত হয়তো কোনো ভিনদেশই হবে; তবে সে-ভিনদেশে কোনো কাঁটাতার নাই। তাই তো আমাদের অতীত, গল্পচরিত্রদের অতীত অবাধে মিলে যায়।


মোজাফ্‌ফর হোসেনের এই গল্পগ্রন্থটি পড়ে আমরা মুগ্ধ হই তার শব্দচয়ন, শব্দবুননের সৌন্দর্য অবলোকন করে। আমরা মুগ্ধ হই তার স্বকীয় নির্মিতির সম্ভাবনা-নির্ভরতায়, বিমানবিকীকরণ দক্ষতায়; চমকে উঠি গল্পের অপ্রত্যাশিত সমাপ্তিতে; আর থ বনে যাই, যখন দেখি : এসব গল্প আমার-আমাদের জীবনের গল্প। যখন ‘কেবল কথা বলতে চেয়েছিলাম’ পড়ি, তখন আসলে কথকের কথানদীর বাঁকে বাঁকে নিজের কৈশোরের পলিমাটিকেই জেগে উঠতে দেখি। আবাস গড়তে চাই সে-পলিতে, কিন্তু পারি না; অতীত নামের ভিনদেশে কেউই আবাস গড়তে পারে না। কেননা, ‘The past is a foreign country, they do things differently there.’ তবুও তো সাধ জাগে, স্বপ্ন দেখি। পড়তে পড়তে নস্টালজিক হয়ে পড়ি; ঋতুকে টেনে আনি আমার সেই সহপাঠিনী জায়গায়, যে পাশের পাড়া থেকে আমাদের স্কুলে পড়তে আসত। কিংবা ‘সুখ-অসুখ’ গল্পের চার বন্ধুকেই-বা কিভাবে আলাদা করি আমাদের বন্ধুবলয় থেকে? তাদের অতীত কৈশোরকে তো আমরা ভিন্ন কারো অতীত বলে ভাবতে পারি না। এভাবেই আপাত নির্মিতিহীন গল্পগুলোও আমাদের মনের মধ্যে নির্মাণ করতে থাকে স্মৃতির মিনার।

অতীত হয়তো কোনো ভিনদেশই হবে; তবে সে-ভিনদেশে কোনো কাঁটাতার নাই। তাই তো আমাদের অতীত, গল্পচরিত্রদের অতীত অবাধে মিলে যায়। ‘স্বপ্ন আর ঘন কুয়াশার ভেতর দিয়ে দেখা বাস্তবের প্রায় বিলীয়মান বাস্তব’-এ স্মৃতিদের এমন মেলবন্ধন গড়ে দেন এই গল্পকার। আমরাও নিজেদের হারানো স্মৃতিগুলোকে ভেসে উঠতে দেখি এসব গল্পের আয়নায়। এতে আমরা বিষণ্ন হই, বিমুগ্ধ হই, বিমোহিত হই। আর তাই গল্প শেষেও আমাদের মন গেঁথে থাকে গল্পের গায়ে। গল্পের ভাঁজে ভাঁজে স্মৃতিসুধার সন্ধানে, সুনিপুণ কৌশলে, এভাবেই আমাদেরকে আটকে রাখেন আমাদের এই সুদক্ষ গল্পকার মোজাফ্‌ফর হোসেন।

ময়ূখ মাহমুদ মনির

জন্ম ২০ জ্যৈষ্ঠ; ১৪০১ বঙ্গাব্দ (০৩ জুন, ১৯৯৪ খ্রি.); নেজামপুর, নাচোল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ। চতুর্থ বর্ষের ছাত্র : এমবিবিএস; এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ, দিনাজপুর।

ই-মেইল : monirulislamdjmc24@gmail.com

Latest posts by ময়ূখ মাহমুদ মনির (see all)