হোম বই নিয়ে নৈঃসঙ্গ্য, সময়ের ইতিহাস ও বহুরৈখিক প্রেমের পুষ্পায়ন : এয়া

নৈঃসঙ্গ্য, সময়ের ইতিহাস ও বহুরৈখিক প্রেমের পুষ্পায়ন : এয়া

নৈঃসঙ্গ্য, সময়ের ইতিহাস ও বহুরৈখিক প্রেমের পুষ্পায়ন : এয়া
3.29K
0

জুননু রাইন কবি। কবিতা লিখছেন গত শতাব্দীর নয়-এর দশকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকেই। নিজের সামসময়ে বা কিছুটা পরবর্তীকাল থেকে, বাংলাদেশে যারা কবিতা লিখছেন, তাদের মধ্যে যে ক’জন উদারাকণ্ঠী কবিকে আমি অন্তরে পুষে রাখি; জুননু রাইন তাদেরই একজন। বলা চলে, অগ্রোল্লেখ্য ও গুরুত্বপূর্ণ। কবিতা, তারস্বরের শিল্প নয়; এমনকি, ওই শিল্পমাধ্যমটি যখন তীব্র দ্রোহ ও প্রতিবাদকে আশ্রয় করে, তখনও একটা মিহি এবং উদারাস্বরই কেবল কবিতার পক্ষে মানানসই। এ আমার বহু বছরের অভিনিবেশী কাব্যপাঠ ও কবিতাচর্চার অভিজ্ঞতা নিষিক্ত কবিতাভাবনা; কাব্যবিশ্বাস। কবি জুননু রাইনও, গত আঠার-বিশ বছর যাবৎ, কবিতার ভেতর দিয়ে উদারাস্বরের একটি স্নিগ্ধ গুঞ্জনধ্বনিই চর্চা করে আসছেন। অধিকন্তু, বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, তার সমকালীনদের মতো অস্থিরতা দেখান নি বরং সাধনার সাদুপথ অবলম্বন করে, নির্বিকার থেকেছেন এবং অব্যাহত এবাদত-ভঙ্গিমায় এগিয়ে গেছেন কাব্যদেবীর মন্দির লক্ষ্য করে। অতএব, দীর্ঘ দেড় দশকেরও অধিককাল পরে, আলোর মুখ দেখল তার প্রথম কবিতাগ্রন্থ : এয়া


কবি জুননু রাইনের প্রথম কবিতাগ্রন্থ এয়া, আমাদেরকে নিয়ে গেল : মানবসভ্যতার আদিলগ্নের এক ইতিহাস বা পুরাণে


জুননু রাইন, আমাদেরকে দীর্ঘ প্রতীক্ষায় রেখে, অবশেষে, এই যে এয়া নামক কবিতাগ্রন্থ নিয়ে উপস্থিত; যার শুলুক-সন্ধানে, আমরা এখন চলে যেতে চাই ব্যাবিলনের উদ্যানে। দেখতে চাই, সেখানে, মেসোপটেমিয়া সভ্যতায়, কিভাবে কী অর্থে প্রস্ফুটিত হয়েছিল : এয়া ফুল! আমাদের পৃথিবীতে, সবচে’ প্রাচীন সাহিত্যকর্মটির নাম : গিলগামেশের মহাকাব্য। মেসোপটেমীয় এই মহাকাব্যটি পাঁচটি দীর্ঘকবিতার সমন্বয়ে, খ্রিস্টজন্মের ২১০০ বছর আগে, রচিত হয়েছিল। ওই মহাকাব্যে, পাঁচটি সুমেরীয় কবিতা দিয়ে বিধৃত হয়েছে উরুকের রাজার ঘটনাবলী। টাইগ্রিস ও ইউফ্রেতিস নদীর মধ্যবর্তী ভূখণ্ডই উরুক রাজ্য। মহাকাব্যটির প্রধান চরিত্র গিলগামেশই, ধারণা মতে, সেই রাজ্যের রাজা। ওই মহাকাব্যের পঞ্চম স্বর্গে বর্ণিত আছে এক মহাপ্লাবনের গল্প। উরুক রাজ্যে, ইউফ্রেটিসের কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছিল এক নগর; এত বর্ধনশীল যে, দেখতে দেখতে সেখানে অধিবাসী-সংখ্যার যেন বিপ্লব ঘটে গেল। শোরগোল, আওয়াজ-চিৎকার এতই উচ্চনাদী হলো যে, দেবতাদের বিশ্রাম ও নিদ্রায় বিঘ্ন ঘটতে শুরু করল। দেবতাদের প্রধান এনিল সিদ্ধান্ত দিলেন : শহরটিতে মহাপ্লাবন দিয়ে ধ্বংস করা হোক ওই চিৎকারসর্বস্ব জনগোষ্ঠীকে। মানবজাতির এহেন অপরাধের শাস্তি হতে পারে এক মহাপ্লাবন। শহরটির গোরাপত্তন করেছিলেন ইউনাপাসথিম নামের এক শান্তিপ্রিয় মানুষ। তার এবং তার প্রিয় অনুসারীদের শহর ছিল ওটা। আলো, জল ও প্রজ্ঞার দেবতা এয়া চিন্তা করলেন, ইউনাপাসথিমের মতো নিরীহ মানুষটাকে এমন শাস্তি দিলে, অবিচার হবে। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন : আগাম সতর্কতা দিয়ে রক্ষা করবেন তাকে। স্বপ্নযোগে, ইউনাপাসথিমকে সতর্ক করলেন। তাকে বিশালাকৃতি নৌকা বানানোর পরামর্শ দিলেন, যাতে তার অনুসারীদের ছাড়াও, সকল প্রাণী ও উদ্ভিদের নমুনা সংরক্ষণ করা সম্ভব হতে পারে। ইউনাপাসথিম সেটাই করলেন। তারপর শুরু হলো টানা ছয়দিন ছয়রাতের প্রবল বর্ষণ। নৌকায় সংরক্ষিত মানুষ, প্রাণী ও উদ্ভিদ ব্যতিত সবকিছু ভেসে গেল প্রবল স্রোতে। সপ্তম দিনে যখন বর্ষণ থামল, স্রোত ও জল স্তিমিত হলো; ইউনাপাসথিম প্রথমত পায়রা, দ্বিতীয়ত আবাবিল পাখি, তৃতীয়ত কাক পাঠালেন জলের গভীরতা যাচাইয়ে; কোনোটাই যখন ফিরে এল না, তিনি বুঝলেন : কোথাও ভূখণ্ড জেগেছে, নৌকার আর প্রয়োজন হচ্ছে না পাখিদের। তখন তিনি, ওইসব পাখি যেদিকে উড়ে গিয়েছিল সেই দিকে নৌকা চালিয়ে স্থলভাগের দেখা পেলেন। এভাবেই, এয়া’র সুবিবেচনায় রক্ষা পেল মানবজাতি। যদিও, মনুষ্যকুলের এভাবে রক্ষা পেয়ে যাবার কারণে, এয়া অভিযুক্ত হয়েছিলেন দেবতা-সমাজে। সেটা এক ভিন্ন প্রসঙ্গ এবং অন্যত্র আলোচ্য।

তো, কবি জুননু রাইনের প্রথম কবিতাগ্রন্থ এয়া, আমাদেরকে নিয়ে গেল : মানবসভ্যতার আদিলগ্নের এক ইতিহাস বা পুরাণে। সেখানে, মানবহিতৈষী এয়ার পরিচয় জানা গেল, গিলগামেশের মহাকাব্য থেকে। ওই মহাকাব্যের প্রধান চরিত্র গিলগামেশ ছিলেন পৃথিবী পর্যটক ও অভিযাত্রী। বর্তমান কবির পরিচয়, আমরা পেতে পারি, এয়া শীর্ষক কবিতাগ্রন্থে। এখানে, প্রারম্ভিক পনের-ষোল সতেরটি কবিতার ভেতর দিয়ে উঠে এসেছে: নৈঃশব্দ্য-প্রিয় নির্জন এক কবির আত্মপরিচয়, তার বসবাসের পরিবেশ ও প্রতিবেশ পৃথিবী, তার যাপিত জীবনের সময় ও সেই সময়ের কদর্যনন্দন, ভূখণ্ডপ্রেম এবং সেই ভূখণ্ডের বিপন্নতার যন্ত্রণাক্লিষ্ট দীর্ঘশ্বাস ও হাহকার। অতপর, এই সামগ্রিক সংকট থেকে বেরিয়ে এসে, নিরাপদ ও সুন্দর জীবনে পদার্পণের স্বপ্নে, একজন এয়া’র জন্য বাসনা। জুননু রাইনের এই এয়া হতে পারে : কবির ব্যক্তিগত প্রেমের দেবী কিংবা তার পরিবেশ-প্রতিবেশ পৃথিবীকে শাপমুক্ত করবার জন্য আবির্ভূত কোনো পরিত্রাণ ভাবনা। সে বিষয়ে কোনো অনুমান বা উপসংহার টানতে গেলে, কবিতার পাঠে পাঠেই উন্মোচন করা সম্ভব, সেই অন্তর্নিহিত সত্যকে।

দীর্ঘ এক কবিতা-যাত্রার কোনো অবকাশে, কবি যখন যন্ত্রণাদ্যুতি ছড়িয়ে দেন এই বলে যে : ‘‘তোকে দেখি না কতদিন/ তোর নাম বারান্দার সামনের ডালিম গাছের/ ডালে বসে উড়ে যাওয়া দোয়েল পাখি/ তোর নাম শেষ বিকেলের অশ্রুর মতো/ ঝরে পড়া ক্লান্তির হাসি।’’; তখন, অনিবার্য হয়ে ওঠে : কোনো এক ‘তুই’-এর আগমনাকাঙ্ক্ষা। সেই ‘তুই’ কি এয়া? কবির মনোদেবী? কাব্যমানসী? আমাদের সমকালীন যাতনা ও দুর্দশার পরিত্রাতা দেবী? কেননা, দাদুর মুখে আমরা যে গল্প শুনছি : ‘একদেশে ছিল এক রাজা’—তারপর তো, ‘অন্ধকারের শব্দ থেমে গেলে/ জোছনায় ধোয়া শীতল বাতাসে/ গল্পগুলো কান পাতলো ইতিহাসে। … কিন্তু, ‘দাদুর মৃত্যুর পরেও—/ একদেশে রাজা একজনই রয়ে গেল।’ [কবিতা : ‘একদেশে ছিল এক রাজা’]; এবং নিজস্ব নির্জনতা ও নৈঃসঙ্গ্যের ভেতর কবি হয়তো, পূর্ব কবিপুরুষের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে, কখনও গেয়ে ওঠেন : …‘প্রথমেই বলেছিলাম আমি একা/ সেই চিৎকারে বারবার বলেছি মানুষ একা’… তখন, পাঠক হিশেবে, নিজেকেও একা এবং বিপন্ন-ব্যর্থ মনে হয়।


জীবনকে দেখবার ও লিখবার বিশিষ্ট একটা ভঙ্গিমা ইতোমধ্যেই অর্জন করেছেন এই কবি।


কবির গ্রন্থের পৃষ্ঠায় চোখ রেখে দেখি, তিনি বলছেন : ‘আমার ব্যর্থতাগুলো এক একটি উদ্ভট রং প্রসব করে। আমি নিতে চাই না। ফেলানী, তনু, সাত খুন, বিশ্বজিৎ, সাগর-রুনী, হযরত আলী, আয়েশা, হলি আর্টিজানকেও আমি মানি না। অথচ আমি এড়াতে পারছি কিনা তা নিয়েই আমার ঘুমের সঙ্গে যুদ্ধ’ [কবিতা : ব্যর্থতাগুলোর গভীর সফলতা]। এসব কবিতার পঙ্‌ক্তিগুলো পাঠ করতে করতে বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করি : যে যন্ত্রণার অধিগর্ভে ডুমুরবীজ হয়ে আমরা বেঁচে আছি, সেই রূঢ়-বাস্তব পৃথিবীই কবিরও পৃথিবী। অতএব, নিজের চোখে দেখতে সাহস না-করা সেই পৃথিবীকে দেখব বলে, কবির দেখনভঙ্গিমাকেই আশ্রয় করতে হয়; এবং দেখতে পাই, ঘটমান স্বপ্নের ভেতর বর্ণনা করছেন কবি : ‘‘…‘আমাকে বাঁচান, যে হাতটা চাপা পড়ে আছে সেই হাতটা কেটে ফেলে হলেও আমাকে বাঁচান।’ টিভি সাংবাদিকের হয়ে আমার প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়েছিল ওই শ্রমিককে—আপনার এত তাড়া কিসের? আপনি একহাত নিয়ে হলেও আবার কালকে সকাল সাতটার মধ্যে কারখানায় যেতে না পারলে মাইনে কাটা যাবে?’’ [কবিতা : সাভার ট্র্যাজেডি ২৪/৪/১৩]। সেই মর্মান্তিক ছুঁয়ে, আবার আমরা একা ও নিঃসঙ্গ্য হয়ে যাই। সেই অক্ষম ও ব্যর্থ জীবনের সাযুজ্য খুঁজতে খুঁজতে, নিজেকে কাকতাড়ুয়া মনে হয়। আমাদের উপলব্ধিতে আসে : ‘‘একা থাকার জন্য সে ছেড়েছিল রক্তমাংসের জীবনের স্বাদ/ কত রাত্রি তার ওপর বয়ে যায় ভয়াল অন্ধকার/ তারপরেও সে ফসলের স্বপ্নে ভরিয়ে দেয় কৃষকের অন্তর।/ একা থাকতে থাকতে দেখে ফেলল কোনো এক রাতে/ দাঁড়িয়ে আছে সে একারই সাথে।’’ [কবিতা : কাকতাড়ুয়া]। সান্ত্বনাস্বরূপ, শ্লেষ ও যন্ত্রণাজারিত চিন্তারাজ্যে উঠে আসে, আরও কিছু কথা : ‘‘জীবন অনেক বড় হতে হয়/ সুউচ্চ টাওয়ার, পাহাড়, গাছের মতো নয়/ বড় হতে হয় ঘাসের মতো/ দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হয় পদপিষ্টতা সহ্য করে।’’ [কবিতা : জীবন]। কিংবা, ‘‘খুন হতে হতে খুন শব্দটিই মরে গেলে/ তোমার কিছুই করার থাকবে না বাহাদুর/ তখন আমরা ভয়কে বিজয়ী ঘোষণা করব/ প্রতিবাদকে বেঁধে দেব তনুর ওড়নায়/ হযরত আলী আর আয়েশার/ জীবনকে পুঁতে রাখব ট্রেনের নিচে।’’ [কবিতা : মহামান্যের বিষণ্ন বাগানে ]।

জীবনসংশ্লিষ্ট যত রকমের অনুভূতি ও উপলব্ধি থাকা সম্ভব, সে-সবের মধ্যে যেগুলো উদ্ভাবনী; সেই উদ্ভাবনীকে যখন উপস্থাপন করা হয় এমন এক ভাষায়, যে ভাষা ওই উদ্ভাবনীটির জন্য অনিবার্য ভাষা; (অর্থাৎ প্রকাশের লিখিত বা বাচনিক অন্যকোনো উপস্থাপনভঙ্গিমায় প্রকাশ অসম্ভব) তখনই সৃজিত/ রচিত/ নাজিল হয় কবিতা। সেটা গল্প, নাটক, উপন্যাস, গান বা প্রবন্ধ নয়; সেটা কবিতা। কবিতা, আসলে, এক ধরনের ইশারাভাষা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই, উপস্থাপিত টেক্সটটি নয়, বরং উপস্থাপিত টেক্সটের ইশারা থেকে অলিখিত এবং অভীষ্ঠ অপর এক বা অসংখ্য টেক্সটে পৌঁছে যাওয়াই কবিতার মূলকথা। উপস্থাপিত টেক্সটি একটি সড়ক মাত্র; যে সড়ক ধরে কবিতাটির কাছে পৌঁছানো যায়। কবিতা, প্রকৃত প্রস্তাবে, শব্দচিত্রে উপলব্ধির দৃশ্যায়ন। কবি জুননু রাইনের কবিতা পাঠ করতে করতে, কবিতা বিষয়ে এইসব প্রতীতী আরও বেশি স্পষ্ট হয়। জীবনকে দেখবার ও লিখবার বিশিষ্ট একটা ভঙ্গিমা ইতোমধ্যেই অর্জন করেছেন এই কবি। অধিকন্তু, যে সময়ের ভেতরে বসে তিনি জীবন ও জগৎকে দেখছেন, তার অবয়বটিকেও মূর্তায়ন করছেন সুদক্ষতায়। বেশিরভাগ কবির কবিতায় যে বিষয়টির অনুপস্থিতি লক্ষণীয়, তা হলো : নিজের সময়কে তারা ধারণ করেন না, কবিতায়। জুননু রাইনের ক্ষেত্রে, বলতেই হবে : তার কবিতা কেবল সময়কে ধারণ ও ব্যাখ্যাই করে না; তাকে, ময়নাতদন্ত করে তুলে ধরে সময়ের প্রকৃতি ও স্বরূপ। সামসময় থেকে ইতিহাসে এবং ইতিহাস থেকে সামসময়ে অবিরাম ভ্রমণই কবিতার তূরীয় বুননশৈলী; জুননু রাইনের কবিতা, শিল্পরসের অন্তনির্হিত এই কৃৎকৌশলকেই ধারণ ও লালন করে। এমত বয়ানের সমর্থন খুঁজতে, আবারও, এয়া গ্রন্থের কবিতাগুলোতে মনোনিবেশ করা যাক! কবি বলছেন : ‘‘আমি আজরাইল দেখি নি/ প্রভু,/ ক্রসফায়ার দেখেছি।’’—তো, কেমন সেই দেখা? ‘‘প্রতিটি স্বপ্নকে আতঙ্ক জাপটে ধরে ঘুম পাড়ায়/ প্রতিটি ঘুম বাতাসের পোড়া গন্ধ হয়ে উড়ে যায়/ প্রতিটি পাখি মানুষকে অনিশ্চিত মৃত্যুর স্বাভাবিকতা শেখায়।’’ [কবিতা : অনীহাকে অদৃশ্য হুমকি]

নিজের সময় ও পরিবেশ-প্রতিবেশ পৃথিবীর বৈরিতার ভেতর বিপন্ন, বিষণ্ন ও একা থেকে ক্রমহ্রাসমানে ভগ্ন ও ভগ্নাংশ হতে থাকা, কবিকে বলতে শোনা যায় : ‘‘তোমাকে আমার যেন কিছুই বলার নেই—/ শুধু নাম ধরে ডাকা ছাড়া…’’ [কবিতা : খুশবু]—এবং এই কবিতাটি পাঠের ভেতর দিয়েই কবি আমাদেরকে নিয়ে যাচ্ছেন এয়া নামক সেই উদ্যানে, অতঃপর, আমরা যে উদ্যানের গোলক ধাঁধার ভেতর বহুদিনের জন্য আটকে যাব। কবিতাগ্রন্থের এই পর্বে, উদ্বোধনী কবিতায়, একটি সময়কে রচনা করেন কবি, এভাবে : ‘‘ তখন একা একা হাঁটতুম, একা মানে একাই, যাওয়া থাকত না, দাঁড়ানো থাকত না, শোনা থাকত না, বলা থাকত না, ফেরা থাকত না, তোমাকে দেখা বা না দেখার ভয়ও থাকত না, শুধু রাত্রির কথা বলা থাকত।’’—আর তারপর, কবি তার প্রেয়সী বা পরিত্রাণ দেবীর উদ্দেশ্যে বলেন : আলোর কসম, আমি একা এবং একাই তোমার দিকে হাঁটছিলুম,/ পৃথিবীর সব ডাক তোমাকেই ডাকছিলুম।’’ [কবিতা : এয়া-১]। মানুষের বিস্মৃতিপ্রবণতাকে কটাক্ষে এনে, কবি, এয়া’কেই বলেন: ‘‘ধর,/ আমাদের মনেপড়াগুলো দূরে গেল।/ গেল ফুল ফুটতে, ফসল ফলতে/ বনে আগুনের প্রতিবাদে—জলে আগুন দিতে।/ কিংবা মানুষের সঙ্গে সবুজের দূরত্বের ইতিহাস লিখতে।’’ [কবিতা : এয়া-২]। গ্রন্থটির এই পর্বে ৩৬টি কবিতায়, ময়নাতদন্তের হ্যাজাক আলো পড়ছে এয়া’র ওপর; যেখানে, এয়াকে কেন্দ্র করে অঙ্কিত হয়েছে বহুরৈখিক ও বহুবর্ণিল বৃত্ত, যা একক বৃত্ত নয়। স্বদেশ ও সমকালের বিরূপ-বাতাসের মধ্যে, এয়া—কখনও তার কাঙ্ক্ষিতা, কখনও হৃৎযন্ত্রণার উৎস, কখনও অবিকল্প পরিত্রাণ; আবার কখনও-বা সহস্রাব্দ প্রাচীন কোনো অনুপস্থিতির বর্তমান উপস্থিতি। উপস্থাপনের নিজস্ব ভঙ্গিমা রপ্ত করা কবি, স্বদেশের পরিত্রাণ-কাঙ্ক্ষায়, প্রেমারাধ্যস্বরূপ সৃষ্টি করলেন যে এয়া’কে, তারই উদ্দেশ্যে, নিজের চূড়ান্তপ্রায় বাসনা ব্যক্ত করেছেন, এভাবে: ‘‘একদিন ঘরের মধ্যের পাহাড়ে তোমাকে দেখব/ বুকের মধ্যে তোমাকে দেখব প্রিয় বাঘ/ একদিন তোমার মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়বো/ মৃত্যুর শান্ত পুকুরের আশ্চর্য ডুব’’ [কবিতা : এয়া-২৯]।


সৌন্দর্য ও সৌকর্যের মুখোমুখি পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেবার এক নান্দনিক শিল্পশৈলী হয়ে উঠছে, কবি জুননু রাইনের কবিতাগুলো


জীবন ও জগৎ সম্পর্কে একজন ব্যক্তিমানুষের অনুভব, উপলব্ধি ও অনুভূতিকে লিখিতভাবে প্রকাশ করাই আসলে সৃজনী রচনাকর্মের মূল কথা। নিজেকে, নিজের ও নিজেদের জীবনকে এবং সেই জীবনের পরিপার্শ্ব—ছুঁয়ে, কবি, জগৎটাকে কী চোখে দেখছেন—সেটাই তো কবিতায় বলবার বিষয়। জীবন সম্পর্কে কবির যে দৃষ্টিভঙ্গি সেগুলোই তার কবিতা। কবি জুননু রাইন, সেই কবিতাই লিখেছেন। ফলে, তার কবিতাগুলো হৃদয় ও মস্তিষ্কের সম্মিলিত আকরবিন্দু থেকে উঠে আসা নির্যাস : স্বদেশের, সমকালের। কালের নন্দনতত্ত্ব বলছে, সহজ উপস্থাপন যখন ভাবনাবিভূতির প্রভাবে দীর্ঘস্থায়ী চিন্তনসৌন্দর্যের দার্শনিক অবকাঠামো নির্মাণ করে, তখনই কবিতা সেটা হয়ে ওঠে। শিল্পের এই করণকৌশলই একুশ শতকীয় কবিতার ভিত্তি। এসব কথা জুননু রাইন খুব ভালোভাবেই জানেন এবং বিশ্বাস করেন। এয়া কবিতাগ্রন্থটি আমাদের সামনে এইসব সত্যের প্রামাণিকী।

কবিতা যে কেবল ভারি ভারি আভিধানিক শব্দে বিশেষণবহুল জটিলতর পঙ্‌ক্তি গঠনের বাহাদুরিতে থেমে থাকে নি; বরং অন্তর ছোঁয়া সহজিয়ায় হৃদয় ও মস্তিষ্কে ঝাঁকুনি তুলে চিন্তন সৌন্দর্য ও সৌকর্যের মুখোমুখি পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেবার এক নান্দনিক শিল্পশৈলী হয়ে উঠছে, কবি জুননু রাইনের কবিতাগুলো, এখানে, সেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে; এবং তাকে একবিংশ শতাব্দীর অপরিহার্য কবি হিশেবে অভিষিক্ত করছে।

বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিতে, এই সবুজ বদ্বীপে যখন অমোচনীয় অন্ধরাত; প্রতিটি অনুভূতিপ্রবণ মানুষের হৃদিস্পন্দনের ওপর চেপে বসেছে অনড় পাথরের বৃহত্তম চাঙ্গড়; কোথাও কোনো আলো নেই, ফুল ফুটছে না; উদ্বাস্তু হয়ে যাচ্ছে গানের পাখিরা; আর শ্রাবণঢলের মতো ঝরছে অন্ধকার—এয়া’র হাত ধরে, অভ্রভেদী আলোক তিরের মতো গতিশীলতায়, হাঁটতে শুরু করলেন এই যে কবি—তিনি যেন, অবাধে, একটা বাতিঘরের দিকে টেনে নিতে পারেন আমাদের আশা ও আকাঙ্ক্ষার গতিপথকে; এটাই আমার প্রত্যাশা ও আশীর্বাদ।

জয়তু কবিতা।

রহমান হেনরী

জন্ম ১৪ জানুয়ারি, ১৯৭০; নাটোর জেলায়। বর্তমানে স্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাস করছেন। কবি, বিশ্বকবিতার বাঙলায়ন কর্মী। আঠারোটির অধিক কবিতাগ্রন্থের জনক হেনরী বাংলাদেশ সরকারের নির্বাহী বিভাগে কর্মরত।

‘পোয়েট ট্রি’ নামক একটি কবিতা-কাগজ সম্পাদনা করেন।

ই-মেইল : poettree2008@gmail.com